শয়তানের সন্তান – ৩

তিন

দরকার যে পড়ল না, তার কারণ, কারখানা-ঘরের দিকে যখন কিছুটা এগিয়ে গেছি, ঠিক তখনই বাইরের রাস্তা থেকে কেউ ডাকল—রুদ্র!

মহিলার গলা। অবাক হয়ে দেখলাম, কারখানার গেটের বাইরে হাসিদি দাঁড়িয়ে রয়েছে।

ও এদিকে এলো কেমন করে! এই কারখানার যা প্ল্যান, তাতে ব্যারাকবাড়ি এবং তার লাগোয়া উঠোন থেকে বাইরে বেরোতে গেলে কারখানার ভেতর দিয়েই বেরোতে হবে। দ্বিতীয় কোনো রাস্তা তো নেই। আর আমি তো দাঁড়িয়ে রয়েছি কারখানা-ঘরের দরজার সামনেই। ওই দরজা দিয়ে তো হাসিদি বেরোয়নি। মনকে বোঝালাম, অন্য কোনো রাস্তা আছে নিশ্চয়ই, উঠোনের পাঁচিলের গায়ে কোনো ছোট গেট, যার ভেতর দিয়ে বাইরের রাস্তায় বেরিয়ে পড়া যায়।

আমার চোখে চোখ পড়তেই হাসিদি বলল, সব দেখেছি। বিশাখার পাগলামি ভাবছ তো? না। বিষয়টা তার চেয়ে অনেক গভীর। যাই হোক, এখন ওকে নিজের মতন থাকতে দাও। তুমি বরং আমার সঙ্গে চলো। সন্ধেটা খুব সুন্দর, একটু হেঁটে আসি।

একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম—বিশাখা ইতোমধ্যেই কারখানা-ঘরের ভেতরে ঢুকে দরজা ভেজিয়ে দিয়েছে। আমি চেন-তালার ফাঁক দিয়ে গলে হাসিদির পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।

তখনো চৈত্রমাস শেষ হয়নি। আগের দিন বিকেলে একটা ছোটখাটো কালবৈশাখীও হয়ে গিয়েছিল। তাই সন্ধের পর বাতাসে ঠান্ডার আমেজ ছিল। আকাশের গায়ে শহর কলকাতার আলোর দীপ্তি, তাছাড়া আর কোথাও মহানগরীর কোনো চিহ্নমাত্র দেখতে পাচ্ছিলাম না। অবশ্য নির্দিষ্ট সময় অন্তর একটা ভারী কিছু মাটির ওপরে আছড়ে পড়ার শব্দ ভেসে আসছিল। জিগ্যেস করলাম, কীসের আওয়াজ?

হাসিদি বলল, ক্রেন-হ্যামার। বাইপাশের ওদিকে মেট্রোরেলের কাজ হচ্ছে তো। এখান থেকে সোজাসুজি গেলে বেশি দূরে নয়, কিন্তু সেভাবে কেউ যেতে পারবে না। মাঝখানে ওই ট্যাংরা স্লটার-হাউস আছে, কবরখানা আছে। তোমাদের গাড়ি আজ দুপুরে যেভাবে পাক খেতে-খেতে এসেছে, ওইভাবেই যেতে হবে। এই রাস্তাটার নাম জানো?

আমি ঘাড় নাড়লাম।

কবরডাঙা রোড। তবে লোকজন বলে ‘গোরে বিবি কি মহল্লা’। গোরে বিবি মানে ‘সাদা চামড়ার স্ত্রীলোক’। তার কথা নিশ্চয় কাপালি স্যার বলবেন তোমাকে।

কিছুক্ষণ চুপচাপ পাশাপাশি হাঁটলাম। তারপর যেন আর কোনো কথা খুঁজে না পেয়েই হাসিদি বলল, জায়গাটা বেশ অদ্ভুত, তাই না? একবারও মনে হয়, কলকাতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছ?

আমি ঘাড় নাড়লাম। সত্যিই মনে হয় না।

একদিকে ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির টানা পাঁচিল। অন্যদিকে ট্যাংরা স্লটার-হাউসের একইরকম পাঁচিলঘেরা মাঠ। মাঝখানে চাঁদের আলোয় ঘুমোচ্ছে গোরে বিবি কি মহল্লা। যতদূর চোখ যায় কোনো বাড়ি নেই, দোকান নেই। দুপাশে আকন্দ আর বনচাঁড়ালের ঝোপ। ওরকমই একটা ঝোপের গায়ে জাত-সাপের খোলশ ঝুলতে দেখলাম। দুটো বেজি ব্যস্তসমস্ত ভাবে আমাদের সামনে দিয়েই রাস্তা পেরিয়ে গেল।

বললাম, কলকাতায় কত গরিবলোক নেড়িকুকুরদের সঙ্গে মারপিট করে রাস্তার ধারে পড়ে থাকে। তারা কেউ কবরডাঙা রোডে থাকতে আসে না কেন?

হাসিদি বলল, জায়গাটার বদনাম তো আজকের নয়। এদিককার লোকজন প্রায় সত্তর বছর ধরে কবরডাঙাকে ভুতুড়ে জায়গা বলে জানে। রাস্তাটার দু-প্রান্তে দুটো বস্তি আছে। একটা তো নিশ্চয় আজ দুপুরে এখানে আসবার পথেই দেখেছ—যেটা পামার বাজারের দিকে পড়ে। অন্যটা ট্যাংরা সাইডে। এখানে কেউ আসবার চেষ্টা করলে বস্তির লোকেরাই তাকে আটকে দেয়। শুনেছি, নকশাল-পিরিয়ডে পুলিশ এখানে লাশ গুম করবার জন্যে ঢুকতে চেয়েছিল। পুলিশকেও ওরা ঢুকতে দেয়নি।

বললাম, তুমি এত কিছু জানলে কেমন করে?

হাসিদি বলল, জানবো না কেন? আমি যে ওই পামার বাজার বস্তিরই মেয়ে। আমার দাদু এই কারখানায় কাজ করেছেন।

কাচ কারখানায়?

না। তখন এটা ছিল ওষুধের কারখানা। সেটার মালিক ছিলেন কাপালি স্যারের দাদু। তারপর ওই বাড়িতেই চিনেমাটির বাসন বানাবার কারখানা তৈরি হল। কাপালি স্যারের দাদু ছিলেন সেই কারখানারও পার্টনার, তবে তখন আর বস্তির লোকেরা কাজ পায়নি। বাইরে থেকে কাজের লোক এসেছিল।

হাঁটতে-হাঁটতে আমরা দুজনে একটা অদ্ভুত জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিলাম। মানে, আমার কাছে অদ্ভুত হাসিদির কাছে নিশ্চয় নয়। ঠিক ওই জায়গাটাতে কসাইখানার পাঁচিলটা হঠাৎই রাস্তা থেকে কিছুটা পিছিয়ে গিয়েছিল। ফলে রাস্তার ধারে একটা খালি জমির টুকরো বেরিয়েছিল। হাসিদি আমার হাতে টান দিয়ে রাস্তা ছেড়ে ওই জমিটার মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল।

ততক্ষণে রাতের অন্ধকার নেমে এসেছিল, তাই ওখানে পৌঁছনোর আগে অবধি বুঝতে পারিনি যে, ওটা সাধারণ ঘাসজমি নয়। পুরোনো আমলের পাতলা-ইট দিয়ে বাঁধানো একটা চত্বর। চত্বরটার মাঝখানে ভাঙাচোরা বেদির মতন একটা স্ট্রাকচার। হাসিদি একবার চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল, এসো রুদ্র। এখানেই বসি।

তাই বসলাম।

আমাদের পেছনে একটা ঝাঁকড়া গাছের ডালে কী যেন একটা রাতপাখি মাঝে মাঝে ডানা ঝটপট করে উঠছিল। সেই শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ ছিল না কোথাও।

কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পরে হঠাৎই হাসিদি একদম বিনা-ভূমিকায় বলল, এই পৃথিবীর ভেতরে আরেকটা পৃথিবী মিশে রয়েছে, বুঝলে। সরবতের মধ্যে যেভাবে চিনি মিশে থাকে, সেইভাবে। কেউ কেউ মাঝে মাঝে সেই অন্য পৃথিবীটায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে। সবাই নয়। হয়তো এক কোটি মানুষের মধ্যে একজন। যারা পারে তারাও সবসময়েও পারে না। কখনো-কখনো পারে। তখন তাকে দেখে এই পৃথিবীর লোকেরা ভাবে অদ্ভুত অ্যাবনর্মাল ভৌতিক।

কিন্তু মোটেই ওসব কিছু নয়। শুধু চলার ভঙ্গির তফাতের জন্যে কি কাউকে অ্যাবনর্মাল কিম্বা ভৌতিক বলা যায়? এই যে তোমাকে সারাক্ষণ পায়ে গোল জুতো পরে হাঁটতে হয়, তার জন্যে কি তোমাকে অ্যাবনর্মাল বলা উচিত? এটাই তো এখন তোমার স্বাভাবিক চলন, তাই না?

জিগ্যেস করলাম, তোমরা কি ওরকম?

হাসিদি ওপরে নীচে মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ ভাই। আমরা তিনজনেই ওরকম। আমি এখনো তোমার সম্বন্ধে প্রায় কিছুই জানি না। কাপালি স্যার বলেননি আমাদের। বলবেনও না। উনি আমাদের পছন্দ করেন না। শুধু আমাদের প্রভুর ভয়ে আমাদের এখানে থাকতে দিয়েছেন। তবে আমি নিশ্চিত, তোমার মধ্যেও কিছু ক্ষমতা রয়েছে। তুমিও নিশ্চয় কখনো-কখনো সেই অন্য পৃথিবীতে পা রাখতে পারো। না-হলে কাপালি স্যার নিজে তোমাকে এই কাচ কারখানায় নিয়ে আসতেন না।

মিথ্যে করে বললাম, না, আমি ওসব কিছুই পারি না। আমি খুব সাধারণ একটা ছেলে। এই একটা পৃথিবীই আমার কাছে টু মাচ; অন্য পৃথিবীর ভার আমি বইতে পারব না। কিন্তু তোমরা কেমন একটু বলবে। কী পারো তোমরা?

হাসিদি বলল, পঙ্কজদা আর বিশাখা সম্বন্ধে আমি যেটুকু জানি বলছি। এই কারখানায় আসবার আগে তো আমরা কেউ কাউকে চিনতাম না। তাই ওদের গোটা জীবনের কথা জানি না।

কারখানাটা মাঝখানে অনেক বছর বন্ধ হয়ে পড়েছিল জানো তো? দু-বছর আগে কাপালি স্যার এটাকে সারিয়ে-সুরিয়ে বাসযোগ্য করে তুলেছেন। তারও অনেক পরে, এই ধরো একমাস আগে আমরা এসেছি। আমরা এসেছি আমাদের প্রভুর নির্দেশে। তাঁকে খুব কম লোক চেনে, কিন্তু এখানে তাঁর আসন আছে।

কোথায়? আমি চমকে চারপাশে তাকালাম।

হাসিদি বলল, সবখানেই। এই পুরো গোরে বিবি কি মহল্লাতেই তাঁর অধিষ্ঠান। তিনিই আমাদের এখানে নিয়ে এসেছেন। অবশ্য আমরা একসঙ্গে আসিনি দফায় দফায় এসেছি। আমাদের মধ্যে প্রথম এখানে এসেছিল পঙ্কজদা।

পঙ্কজদা যে বোবা তা তো দেখেছ। সেটা কথা নয়। বোবা তো অনেকই থাকে, কিন্তু পঙ্কজদা অন্যরকমের বোবা। ও একটা কী বলব…মাইকের মতন। মাইকের তো নিজের স্বর থাকে না, যন্ত্রটাকে হাতে নিয়ে যে কথা বলে তার গলাই মাইকের মধ্যে দিয়ে শোনা যায়।

অবাক হয়ে বললাম, কে কথা বলে পঙ্কজদার গলায়?

হাসিদি উত্তর দিল, যারা মারা গেছে, তারা। যে-আত্মারা সেই মুহূর্তে কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে, তারা পঙ্কজদাকে দেখলে লোভ সামলাতে পারে না। ওর মধ্যে দিয়ে তারা জীবিত মানুষদের সঙ্গে কথা বলতে চলে আসে।

পঙ্কজদার বাড়ি ছিল সুন্দরবনের কোন একটা গ্রামে। বছর দুয়েক আগে কোটালের বানের তোড়ে ওর স্ত্রী আর দুই ছেলে ঘরের চাল চাপা পড়ে মারা যায়। ও ঠিক সেই-মুহূর্তে গোয়াল থেকে গরুগুলোকে ছেড়ে দেওয়ার জন্যে বেরিয়েছিল বলে বেঁচে গিয়েছিল। তারপর থেকেই ও বোবা হয়ে যায়।

ওর গ্রামের লোকেরা প্রথমে ভেবেছিল, বোধহয় শোকে পাথর হয়ে গিয়েছে। কিন্তু মাসখানেক কেটে যাওয়ার পরে পঙ্কজদা যখন অন্যান্য কাজকর্ম স্বাভাবিকভাবে করতে শুরু করল অথচ কথা বলল না, তখন সবাই বুঝল ও সত্যিকারেই বোবা হয়ে গেছে। ক্যানিং হাসপাতালে ডাক্তার-টাক্তার দেখিয়েছিল, লাভ হয়নি।

তারপর ক্রমশ ওই ব্যাপারটা সামনে এল। শুধু পুরুষদের নয়, কখনো মেয়েদের গলায়, কখনো বাচ্চাদের গলায় কথা বলে উঠতে লাগল পঙ্কজদা। অথচ ও কস্মিনকালেও যে হরবোলা ছিল না সেটা গ্রামের লোকেরা জানত।

হাসিদিকে ওর কথার মধ্যেই থামিয়ে প্রশ্ন করলাম, যেসব মৃতেরা ওর গলায় কথা বলত তারা কি ওর গ্রামেরই মানুষ?

উঁহু। ঘাড় নাড়লো হাসিদি। তাহলে তো একটা সন্দেহের জায়গা থাকত যে, পঙ্কজদা ওর চেনা লোকেদের গলার স্বর নকল করছে। কিন্তু অনেকসময় এমন কেউ এসে ওর গলার মধ্যে দিয়ে কথা বলে যেত যে হয়তো আগের দিনই অচেনা জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়ে বাঘের পাল্লায় পড়ে মরেছে। কিম্বা কিম্বা দূরের কোনো হাসপাতালে বাচ্চা হতে গিয়ে…আর পঙ্কজদা কেন, ওর গ্রামের কেউই তাদের নাম অবধি আগে কখনো শোনেনি। পঙ্কজদার গলায় তারা নিজেরা নিজেদের পরিচয় দিয়ে যাওয়ার পরে সেই পরিচয় ধরে খোঁজ করতে গিয়ে ওর প্রতিবেশীরা জেনেছে, কোথাও ভুল নেই সত্যিই ক’দিন আগে অবধি অমন একজন মানুষ এই পৃথিবীতে ছিল।

তারপর? আমি জিগ্যেস করলাম।

তারপর যা হওয়া স্বাভাবিক, তাই হল। পঙ্কজ মিদ্যাকে তার গ্রামের লোকের ভয় পেতে শুরু করল। ওদের গ্রামে যত অকালমৃত্যু, যত দুর্ঘটনা, সবকিছুর জন্যে তারা এবার পঙ্কজদাকেই দোষারোপ করা শুরু হল। প্রথমে আড়ালে, তারপর সামনাসামনি। গালাগাল ক্রমশ মারধরে পৌঁছে গেল।

এদিকে বাস্তু-বাড়িটা ছাড়া ওই গ্রামে পঙ্কজদার আর বিশেষ কিছু ছিল না। বউ-ছেলেরা মারা যাওয়ার পর থেকে সেই ভিটেটাকেও অসহ্য বোধ হত। তাই পঙ্কজদা একদিন পালালো। কোথায় যাবে, কী করবে জানত না। জাস্ট ক্যানিং থেকে ট্রেনে উঠে শিয়ালদা স্টেশনে নেমেছিল। তবে শিয়ালদায় নামার পর ওকে যেন কেউ হাত ধরে এখানে, এই কারখানায় টেনে নিয়ে এসেছিল। কাপালি স্যার ওকে তাড়াননি। কারখানায় একজন কেয়ারটেকারেরও দরকার ছিল।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হাসিদি বলল, বিশাখাও নিজে থেকেই এখানে এসেছিল। তবে ওর হাঁটাচলা তো দেখেছ। কেমন যেন ঘোরের মধ্যে হাঁটে, তাই না? সেইজন্যেই ও পঙ্কজদাকে ডাক দিয়েছিল ওকে নিয়ে আসার জন্যে।

পঙ্কজদা ওকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে এসেছিল। সেই দৃশ্য আমি দেখেছি। কারণ আমি তার ক’দিন আগেই এখানে চলে এসেছিলাম।

এরকমই এক সন্ধেবেলায় পঙ্কজদার গলা দিয়ে একটা কমবয়েসি মেয়ের আকুল কান্না শুনে চমকে উঠেছিলাম। আমি নিজে এক অলীক রাজ্যের বাসিন্দা, রুদ্র। তবু সেদিন ওই দশাসই লোকটার গলায় সেই কান্না শুনে আমিও কেঁপে উঠেছিলাম। মেয়েটা কাঁদছিল আর বলছিল, আমি কিচ্ছু চিনতে পারছি না। আমাকে নিয়ে যাও। আমার খুব ভয় করছে। বাঁচাও আমাকে।

পঙ্কজদা সম্মোহিতের মতন কারখানা থেকে বেরিয়ে গেল।

তুমি দৃশ্যটা কল্পনা কর রুদ্র! একটা মেয়ের ডাক শুনে পঙ্কজদা তাকে উদ্ধার করতে চলেছে, যে-ডাকটা আসছে ওর নিজের গলার ভেতর থেকে। এর প্রায় ঘণ্টাখানেক বাদে পঙ্কজদা একটা মেয়েকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে উঠোনে পা রাখল।

সেই প্রথমদিনেও বিশাখার পরনে এইরকমই কোরা কাপড় জড়ানো ছিল। তবে কাপড়টা ছিল জলে কাদায় মাখামাখি। শুধু কাপড় নয়, ওর গোটা শরীর। আমি পঙ্কজদাকে বললাম, মেয়েটাকে কারখানা-ঘরের মধ্যে শুইয়ে দাও আর জল গরম করে নিয়ে এসো। একটা আব্রুর ব্যাপার আছে তো। আমাদের ওই ছোট্ট বাথরুমের মধ্যে একটা অচৈতন্য মেয়ের সব কাপড়-চোপড় খুলে ধোয়া-মোছা করানো সম্ভব নয়।

পরদিন ওর জন্যে পামার বাজার থেকে আরো বেশ কিছুটা সাদা মার্কিন কাপড়ের থান আর কয়েক শিশি অগুরু কিনে আনলাম। ততক্ষণে বুঝে গেছি, ও দুটি জিনিস ছাড়া ওর চলবে না। একটু আগে যখন বিশাখা তোমার গালে গাল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়েছিল, তখন অগুরুর গন্ধ পাওনি?

তখন মনে করতে পারিনি। হাসিদির কথায় সুগন্ধীর নামটা মনে পড়ল। ঘাড় নেড়ে জানালাম, হ্যাঁ। পেয়েছিলাম।

তারপর বুঝলে রুদ্র, সেদিন যখন বিশাখার গা মুছিয়ে দিচ্ছি, তখনই প্রথম ওই বন্ধ-ফার্নেসের মধ্যে নিজে থেকে আগুন জ্বলে উঠতে দেখেছিলাম। সেদিনই তিনি প্রথমবারের জন্য আমাদের কাছে তাঁর অস্তিত্বের প্রমাণ রেখেছিলেন।

আমি একটু বিরক্ত হয়ে বললাম, বারবার কার কথা বলছ বলো তো?

হাসিদি বলল, পরে বলব। আগে কাপালি স্যারের কাছ থেকে ঘুরে এসো। এখন বললে বুঝতে পারবে না।

আমি কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললাম, মনে হচ্ছে সবটাই বানিয়ে-বানিয়ে বলছ।

হাসিদি রাগল না। শান্তভাবেই প্রশ্ন করল, কেন?

তুমিই একটু আগে বলেছিলে, শুধু মৃত-মানুষদের আত্মারাই পঙ্কজদার মুখ দিয়ে কথা বলে। কিন্তু বিশাখা তো একটা জলজ্যান্ত মেয়ে। বানিয়ে বলতে গিয়ে তুমি নিজের গল্প নিজেই গুলিয়ে ফেলেছ।

হাসিদি মুচকি হেসে বলল, আর বিশাখা যদি জ্যান্ত মেয়ে না হয়? পঙ্কজদা সেদিন যখন ওকে পাঁজাকোলা করে ধরে কারখানায় ঢুকেছিল, তখন আমি কিন্তু ওর মধ্যে কোনো প্রাণের লক্ষণ দেখিনি। জানো তো, মরার পরে কিছুক্ষণ মানুষ বুঝতে পারে না যে, সে মারা গেছে। সেইজন্যেই বিশাখার আত্মা বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করছিল। এর মধ্যে কোনো ভুল নেই।

আমি হতভম্ব হয়ে বসে রইলাম।

হাসিদি বলল, বিশাখা এমনিতে মরাই। শুধু ওর শরীরটা মরেনি। মরবে না। ও জোম্বি হয়ে গেছে। দুপুরে বিশাখাকে ওর ফ্যানেভাত খাওয়া নিয়ে প্রশ্ন করেছিলে না? ও প্রতিদিনই তাই খায়। জোম্বিরা নুন খেতে পারে না। ওর মাসিক হয় না। সেই যে কোরা কাপড় আর অগুরু দিয়ে ওর মৃতদেহকে ঢাকা হয়েছিল, সে দুটো জিনিসের মায়াও ছাড়তে পারে না। এরকম আরো অনেক রহস্য আছে মেয়েটার মধ্যে। আমাদের তিনজনের মধ্যে ওকেই মনে হয় প্রভু সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। কী জানি, হয়তো মরে গেছে বলেই।

মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছিল। ভাবছিলাম, খুব ভিড়ের মধ্যে দিয়ে যখন আমরা হেঁটে যাই, তখন যাদের সঙ্গে ধাক্কা লাগে, তারা সকলেই কি স্বাভাবিক মানুষ? যদি তাদের মধ্যে একজন পঙ্কজ মিদ্যা থাকে কিম্বা একজন বিশাখা? শুধু ওদের কথাই বা ভাবছি কেন? আমি নিজে কী? আমাকে দেখে কেউ বুঝতে পারবে, দু-পায়ে চামড়ার গোল-গোল জুতো পরে যে ছ’ফুটিয়া ছেলেটা সামনে দিয়ে চলে গেল, তার মাথার ভেতরে সারাক্ষণ একটা শুঁয়োপোকা গুটি বুনে চলেছে?

সেই রাতচরা পাখিটা হঠাৎ আমাকে প্রচণ্ড চমকে দিয়ে পেছনের গাছটা ছেড়ে কসাইখানার দিকে উড়ে গেল। যাবার সময় আমার চিন্তার সুতোটাও কেটে দিয়ে গেল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসিদিকে জিগ্যেস করলাম, আর তুমি? তোমার কোনো করিশমা নেই?

হাসিদি একটু ঢং করে বলল, থাকলেই বা বলব কেন? তুমি বলেছ তোমার করিশমার কথা? যেদিন তুমি বলবে সেদিন আমিও বলব। চলো এখন উঠি।

বেশ, তাই বোলো।

আমরা উঠে পড়লাম। পাশাপাশি হাঁটতে-হাঁটতে পৌঁছে গেলাম কারখানার গেটে। গেটটা যখন খুলছিলাম তখন হাসিদি আমার পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, ও নেই।

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে কারখানার দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলাম। সবুজ ফসফোরেসেন্সের ভেতর দিয়ে হেঁটে পেছনের দরজা, সেই দরজা খুলে আবার উঠোন, ব্যারাকবাড়ি। অবাক হয়ে দেখলাম, হাসিদি রান্নাঘরে গ্যাস-উনুনের সামনে দাঁড়িয়ে রুটি সেঁকছে। আমাকে দেখে বলল, বাবা! অনেক দূর চলে গেছিলে মনে হচ্ছে।

আমি বললাম, মানে! তুমি জানো না কোথায় গিয়েছিলাম? সত্যিই ভালো অ্যাকটিং করতে পারো। আচ্ছা, তুমি কোনদিক দিয়ে ঢুকছ বেরোচ্ছ বলো তো।

হাসিদি চাটুটা উনুন থেকে নামিয়ে কিছুক্ষণ স্থিরদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে আস্তে-আস্তে বলল, এখানে ঢোকা-বেরোনোর একটাই রাস্তা। তুমি কি আমাকে বাইরে দেখলে?

আমি অবাক হয়ে বললাম, কী যা-তা বলছ? মাথা খারাপ হল তোমার? কার সঙ্গে এতক্ষণ বসেছিলাম? কে আমাকে পঙ্কজদা আর বিশাখার গল্প শোনাল? ভূতে?

হাসিদি আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বলল, না, ভূত কেন হবে? আমিই। আমিই ছিলাম তোমার সঙ্গে। আসলে এই পৃথিবীতে দুজন হাসি মণ্ডল আছে। একজনের সঙ্গে আরেকজনের দেখা হয় না। তবে অন্য অনেকেই একইসময়ে দু-জায়গায় দুজনকে দেখেছে। আজ যেমন তুমি দেখলে।

আমার মাথাটা কেমন যেন ঘুরে গেল। একটা চেয়ারের ব্যাকরেস্ট আঁকড়ে ধরে বললাম, ও কি তাহলে আসল হাসিদি নয়?

কে জানে! হাসিদি থমথমে মুখে বলল, হয়তো আমিই আসল হাসি মন্ডল নই।