তবুও জীবন জ্বলে – সৈকত মুখোপাধ্যায়
.
অগ্রজ সাহিত্যিক
শ্রীবিপুল দাসের
করকমলে
.
এই উপন্যাসটি কিছুটা সংক্ষিপ্ত আকারে ‘এই সময়’ পত্রিকার উৎসব সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে পূর্ণাঙ্গ রূপটি ফিরিয়ে আনা হল।
সংসারে বহু মানুষ পাশাপাশি বাস করে। তারা কাছে আসে, দূরে সরে যায়। এই যাওয়া-আসায়, এই নড়াচড়ায়, অবিকল কাঁসা-পেতলের বাসনের ঠোকাঠুকির মতন মৃদু ঝংকার ওঠে। যৌথ পরিবারে মানুষ আমি; ছোটবেলা থেকেই মন দিয়ে সম্পর্কের এই ভাঙাগড়া খেয়াল করি। কান পেতে শুনি হৃদয়সংঘাতের অনুরণন ঘর থেকে পাড়া, পাড়া থেকে শহর, শহর থেকে নগরে জলের বৃত্তের মতন ছড়িয়ে পড়ছে।
উপন্যাস লেখার সময়েও এমন অনুচ্চকিত কিছু সুখ-দুঃখের কথাই মনে পড়ে আমার। রাজনীতি, রাষ্ট্রবিপ্লব কিংবা দুর্নীতির মতন জ্বলন্ত সমস্যা নয় তারা। তবু আমার মতন সাধারণ মানুষের জীবন বদলে দেয় এইসব সম্পর্কের টানাপোড়েন। তাদের উপেক্ষা করি কেমন করে?
‘তবুও জীবন জ্বলে’ তেমনই কিছু সমকালীন এবং সাধারণ মানব-মানবীকে ঘিরে গড়ে ওঠা এক কাহিনি। চোখে দেখে শিহরিত হওয়া যায়, এমন ঘটনার ঘনঘটা এই কাহিনির মধ্যে নেই। হ্যাঁ, ভাঙচুরের কথা এখানেও আছে। তবে তার সবটাই ঘটেছে এই কাহিনির চরিত্রদের মনস্তত্ত্বে। রক্তক্ষরণ যদি ঘটে থাকে, তা ঘটেছে রুমি রাতুল তারাপদ কিংবা রমাপদর বুকের ভিতরে।
উপন্যাসটি লিখবার সময় খুব বেশি কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়নি। যে মফস্বল শহরে এই উপন্যাসের অর্ধেক ঘটনাক্রম আবর্তিত হয়েছে এবং যে-কলকাতার পটভূমিকায় আবর্তিত হয়েছে বাকি অর্ধেক, সে সবই আমার হাতের তালুর মতন চেনা জায়গা। এমনকী মানুষগুলোও।
তবে একটা কথা স্বীকার করে নেওয়া ভালো, কাহিনি রচনার স্বাভাবিক নিয়মেই প্রতিটি চরিত্রের মধ্যে মিশে গেছে আমার একাধিক চেনা মানুষের আদল। রুমি কোনো একটি মেয়ে নয়। তার ছোটবেলা যদি তৈরি হয়ে থাকে একজনের আদলে, তাহলে প্রাপ্তবয়স্ক হবার পরে তার মধ্যে পড়েছে অপর এক নারীর ছায়া। সেই হিসেবে বলতে পারি, এই উপন্যাসের সব চরিত্রই কাল্পনিক।
উপন্যাসটি লিখতে-লিখতে কখনো রুমির মতন শীতল নিষ্ঠুরতায় আমার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে, আবার কখনো রাতুলের মতন ভালোবাসার চাপে আমার চোখের কোল ভিজে গেছে। এককথায়, লেখার সময়টুকুতে খুব আনন্দ পেয়েছি—সুখের আনন্দ এবং দুঃখের আনন্দ, দুই-ই। আমার সেই আনন্দের তাপ কিছুটাও যদি পাঠকদের হৃদয়ে সঞ্চারিত হয় তাহলে কৃতার্থ বোধ করব।
সৈকত মুখোপাধ্যায়
১লা চৈত্র, ১৪২৯ সাল






উচ্চাকাঙ্খা ভালো। কিন্তু মনের মানুষকে পেলে ছাড়তে নেই।
Thank you for uploading ❤️