ডঃ ডেথ – সায়ন্তনী পূততুণ্ড
[অসমাপ্ত বই/ কাজ চলছে]
প্রাক্-কথন
করিডরের উজ্জ্বল আলোগুলো আচমকাই যেন একটু ঝটকা খেয়ে লাফিয়ে উঠল। এক, দু-বার দপদপিয়ে হঠাৎই মরণাপন্ন মানুষের মতো নির্জীব হয়ে গিয়েছে তাদের আভা। পিঙ্গল নিষ্প্রভ রশ্মিতে গোটা পরিবেশ কেমন যেন আলো-আঁধারি রহস্যময় হয়ে ওঠে। জনশূন্য, নিস্তব্ধ করিডরে কোথাও কোনো প্রাণের স্পন্দন নেই। সেন্ট্রাল এসির হাওয়ার মৃত শীতলতাও যেন শিরশিরে ইঙ্গিতে বলে যায়—এ-পৃথিবী সাধারণ মানুষের জন্য নয়, বরং এটা অন্য এক অস্তিত্বের জগৎ। অনেক ছায়া, অনেক অদৃশ্য মুখ নিশ্চুপে, চুপিসাড়ে এই পথ দিয়ে সবার অজান্তেই আজও হেঁটে যায়। তাদের দেখা যায় না, ছোঁয়াও যায় না—শুধু অনুভবেই ধরা পড়ে। মৃত্যুও হায়নার মতো খুঁজে বেড়াতে থাকে তার শিকার! এখানে নিত্যদিনই শমনের আনাগোনা। কখন কার শিয়রে গিয়ে দাঁড়াবে কেউ জানে না! বহু অবদমিত ক্রন্দন, স্বজন হারানোর যন্ত্রণা, শোকার্ত মানুষের চিৎকার প্রত্যেকটা দেওয়ালে দেওয়ালে আজও গুমরে মরে। তার ইট-কাঠ-পাথরের গায়ে কান পেতে শুনলেই বুঝি সেই অতীতের ধ্বনি শোনা যাবে। শোনা যাবে অশ্রুভেজা বাষ্পমাখা আদি ও অকৃত্রিম ফিশফিশ, “ডক্টর, আমি বাঁচতে চাই!”
এ জগতে কে না বাঁচতে চায়! এমন সুন্দর একটা পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছে কারওর নেই!! চতুর্দিকে যতই বিশৃঙ্খলা, খুন-জখম, রাহাজানি, রেপ, অ্যাক্সিডেন্ট, রোগ-ব্যাধি, ষড়যন্ত্র, দুর্নীতি কিংবা আতঙ্কবাদের মতো ভয়াবহ বস্তু থাকুক, মানুষ তাদের অত ভয় পায় না যতটা মৃত্যুকে পায়। আই সি ইউ-র বেডে যে যুবক বাইক অ্যাক্সিডেন্টে মৃতপ্রায় হয়ে এসে ভরতি হয়েছে, সে-ও বাঁচতে চায়। তার পা দুটো এমনভাবে ভেঙেচুরে গিয়েছে যে শত চেষ্টাতেও অপারেশন করে ঠিক করা যায়নি। উপরন্তু পেলভিক বোনও ভেঙে চুরমার। তার ভাঙা হাড়ের গুঁড়ো দ্রুত রক্তে মিশে রক্তকেই বিষিয়ে দিচ্ছিল। বোন ম্যারো থেকে ফ্যাট পার্টিকলও ফ্যাট এম্বলিজমের কারণ হতে পারত! তাই উপায়ান্তর না দেখে ডাক্তাররা বাধ্য হয়েই তার দুটো পা-ই কেটে বাদ দিয়ে দিয়েছেন। পেলভিক বোনও আস্ত নেই। মাথায় বিপজ্জনক চোট না লাগলেও মুখ আর চোয়াল বীভৎসভাবে ভেঙে থেঁতলে গিয়েছে। অসম্ভব যন্ত্রণায় ছটফট করছে, গোঙাচ্ছে ছেলেটা। তবু ডাক্তারদের দিকে প্রায় বুজে আসা চোখে এক করুণ আর্তি নিয়ে তাকায় সে। জানে, বেঁচে থাকলে আজীবন ‘ভেজিটেবল’ তথা পঙ্গু, জরাব হয়ে বেঁচে থাকতে হবে। তবু বাঁচার আশায় এখনও লড়ে যাচ্ছে। কিছুতেই মৃত্যুর আশ্রয়ে যাবে না।
কিংবা সেই যুবতী, যে গ্যাং-রেপের শিকার। দুষ্কৃতীরা এতটাই অত্যাচার করেছে তার ওপর যে স্বয়ং ডাক্তাররাও কেঁপে উঠেছিলেন। অ্যাসিড দিয়ে পুড়িয়েছে মুখমণ্ডল। লোহার রড, জ্বলন্ত বাল্ব থেকে বিয়ারের ভাঙা বোতল অবধি কিছুই বাকি নেই যা তার গোপনাঙ্গে ঢুকিয়ে দেয়নি। জানোয়ারগুলো। পেটের অর্ধেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই প্রায় বেরিয়ে এসেছিল বাইরে। তবু সে ভেন্টিলেটরে এখনও নিঃশ্বাস ফেলছে। ডাক্তাররা একের পর এক অস্ত্রোপচার করে বাদ দিচ্ছেন তার ক্ষুদ্রান্ত্রের, বৃহদান্ত্রের অংশ। বাদ চলে গিয়েছে জননাঙ্গ। বেঁচে থাকলেও কোনোদিন সুস্থ জীবনযাপন করতে পারবে না। সম্পূর্ণ নারীত্বের স্বাদ পাবে না। উপরন্তু ধর্ষিতার কলঙ্কের ভয়াবহ দায়ভার বয়ে নিয়ে চলতে হবে আজীবন। এর চেয়ে তো মৃত্যুও অনেক ভালো ছিল। তবু করুণ স্বরে গলে যাওয়া বীভৎস মুখে কোনোমতে ডাক্তারদের অস্ফুটে বলছে, “আমি মরতে চাই না!”
কেউ এখানে মরতে চায় না। ভাঙতে ভাঙতে, পুড়তে পুড়তে, জ্বলতে জ্বলতে বাঁচতে চায়। কারণ পৃথিবী এখনও তার অনন্ত সৌন্দর্য নিয়ে লোভ দেখিয়ে চলেছে। জীবন হাতছানি দিয়ে বলে চলেছে, “আয়… আয়… কত কিছু দেখার বাকি আছে। কত আনন্দ, রূপ, রং ছড়ানো। কত অমৃতরস এখনও পান করা বাকি। সব ছেড়ে চলে যাবি? আয়… ফিরে আয়…! তবু অনেকেই আসে না। তবু চলে যেতে হয় জীবনের ওপারে। যন্ত্রণাদায়ক দীর্ঘ লড়াইয়ের পরে কেউ শেষপর্যন্ত আবার আলোয় ফেরে। কেউ আস্তে আস্তে চলে যায় গভীর শান্ত অন্ধকারে। পড়ে থাকে শুধু একটা অদৃশ্য ছায়া আর অস্তিম আর্তনাদ, “আমি বাঁচতে চাই!”
এসবই সে শুনতে পায়, দেখতে পায়। সবকিছু বুঝতেও পারে। সমস্ত অশ্রুত হাহাকারের একমাত্র সে-ই সাক্ষী। কিন্তু মজার কথা, আজও তাকে কেউ চিনতে পারেনি। কেউ দেখতে পায়নি। এক ভাবলেশহীন অস্তিত্বের পেছনে কে দাঁড়িয়ে আছে তা এখনও কেউ জানে না। কেউ বোঝেনি তাকে যে নামেই ডাকা হোক না-কেন, আসলে সাদা পোষাকের তলায় সে এক জমাট অন্ধকার! তার অন্য নাম মৃত্যু—দ্য ডেথ।
এই করিডরে তার নিত্য যাতায়াত। সকাল হোক কিংবা রাত, সবসময়ই অনডিউটি। মরণ কখনওই বিশ্রাম নেয় না। অক্লান্ত বাজপাখির মতো সবসময়ই তৈরি হয়ে থাকে, কখন, কাকে ছোঁ মেরে তুলে নেবে। তাই তারও বিশ্রাম নেই। সতর্ক চোখদুটো সবসময়ই শকুনের দৃষ্টিতে খুঁজে চলেছে তার ইন্সিত জিনিস—শিকার। একটা সাধারণ মানুষের মুখোশের পেছনে কালের করাল হাসি ফুটে ওঠে। আশ্চর্য মজা। এরা কেউ জানেই না যে সাক্ষাৎ যম ওদের মধ্যে ছদ্মবেশে ঘুরছে। মৃত্যুর সওগাত তার হাতে। অথচ কেউ দেখতে পায়নি। কেউ জানতেই পারেনি। কম দিন তো হল না! তিন বছর ধরে সে জাল পাতছে। তিন তিনটে বছর ধরে তার ভেতরের মৃত্যুনীল গহ্বর গ্রাস করে নিয়েছে একেকটা প্রাণ। কতজন হবে? হ্যাঁ, হয়তো প্রায় দেড়শোর কাছাকাছি। অথচ কেউ সন্দেহই করেনি—জানা তো দূর। সে মৃদু হেসে মনে মনে বলে, “আমি জিনিয়াস। অথচ কেউ জানে না।”
করিডরের আলো আরও একবার ফের দপদপিয়ে ওঠে। তার মধ্যে দিয়েই যেন মসৃণগতিতে চলে গেল এক সরীসৃপ। অসম্ভব সন্ত্রস্ত ভঙ্গি তার, সাবধানী ও নিঃশব্দ পদক্ষেপ। যেন সে কোনো কায়া নয়, শুধুমাত্র একটা ছায়া।
কয়েকটা ঘর পরেই সিঙ্গল কেবিনে টান-টান হয়ে শুয়েছিলেন এক আশি বছরের বৃদ্ধ। দিন দুয়েক আগেই পেসমেকার বসেছে ভদ্রলোকের। শারীরিক সমস্যা বা কষ্ট আগের থেকে কম। ক্লান্তিতে, এসির আরামে এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়ার কথা। তবু ঘুম আসছে না। এখন বারোটা বাজে। একটু আগেই হসপিটালের বিরাট ঘড়িটা ঢংঢং করে রাত বারোটার সময় নির্দেশ করেছে। রাত্রি মধ্যযামে হলেও নিদ্রাদেবী ওঁকে কৃপা করেননি। যে সিস্টার তাঁর দেখাশোনা করছিল সে মাত্র এক মিনিট আগেই বিদায় নিয়েছে। এখন ডিউটিতে পালা বদলের সময়। রাতের সিস্টার একটু পরেই চলে আসবে। যদিও মেয়েটাকে বিশেষ পছন্দ করেন না তিনি। কাজের চেয়ে আড্ডা মারতেই বেশি ভালোবাসে। আর এক নম্বরের ফাঁকিবাজ। এতক্ষণে তার চলে আসার কথা। অথচ এখনও সে রাজরানি এসে পৌঁছোননি। নির্ঘাত রাস্তায় কোনো ওয়ার্ডবয়ের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করতে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। যতক্ষণ থাকে ওটাই করে। তাছাড়া বড়ো বেশি সাজগোজ করে মেয়েটা যা তাঁর একেবারেই পছন্দ নয়। হাবেভাবে যেন মাধুরী দীক্ষিতের মাসতুতো বোন। অমন বজ্জাত মেয়ে তাঁর ঘরে জন্মালে চাবকিয়ে ঠিক করে দিতেন। আর কর্তৃপক্ষও ওদের সব মাথায় তুলে রেখেছে! এদের রোয়াব দেখলেই বিরক্তি লাগে। আজকালকার ছেলেমেয়েরা সেবা নামক পদার্থটা ঠিকমতো শেখেইনি। ঘটাং করে ইঞ্জেকশন দেয়। একটা ক্যাথিটার লাগাতে প্রায় আধমরা করে ফেলে। ফটাং করে চ্যানেল ঢুকিয়ে দেয়। পেশেন্টের কী হাল হল তা দেখার দায়িত্ব তাদের নয়। আর সুযোগ পেলেই অন্য কোনো কেবিনে টিভি দেখতে কেটে পড়ে। সেবার কী ছিরি!
ভাবতেই ভুরু কুঁচকে গেল তাঁর। কতক্ষণ সময় তো হয়ে গেল। মেয়েটা এখনও এসে পৌঁছোল না কেন? এইভাবে পেশেন্টকে একা ফেলে রাখাটা কী ধরনের সভ্যতা। পেসমেকার বসানোর সময়ে ডঃ বসু হাসতে হাসতে বলেছিলেন, “আপনি আরামসে সেঞ্চুরি করবেন স্যার। ডোন্ট ওরি।” কিন্তু সিস্টারদের যা অবস্থা দেখছেন তাতে সেঞ্চুরি তো দূর, ওদের হাতেই না মারা পড়েন।
“কী হল স্যার? এখনও জেগে যে! ঘুম আসছে না?”
আচমকা একটা কণ্ঠস্বরে তাঁর চিন্তাসূত্র ভেঙে গেল। গলার আওয়াজটা পরিচিত, তাই চমকে ওঠেননি। পদশব্দে প্রকট, মানুষটি তার মাথার কাছেই এসে দাঁড়িয়েছে। সরাসরি না তাকিয়ে উলটোদিকের দেওয়ালে তার ছায়ার দিকে চোখ রেখে বিরক্তিমাখা স্বরে বললেন, “না। ঘুম আসছে না। কী করে আসবে? এই নার্সিংহোমের যা পরিষেবা দেখছি তাতে ঘুম আসার বদলে উড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক!”
ছায়াটা নড়েচড়ে ওঠে, “আপনার ইনসমনিয়া আছে তাই না?”
তিনি উদ্ধতভঙ্গিতে জবাব দেন, “হ্যাঁ। আছে। কী করবেন? ঘুম পাড়ানি গান শোনাবেন? লুলাবি?”
ছায়া মৃদু হাসল, “ডোন্ট ওরি স্যার।” তার কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস, “গান না গাইলেও আমি আপনাকে এখনই ঘুম পাড়িয়ে দেব। জাস্ট এক সেকেন্ড।”
বৃদ্ধ আপনমনেই গজগজ করলেন। ছায়ামূর্তি তখন তাঁর আই ভি ড্রিপ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তিনি সেদিকে তাকানোর প্রয়োজনও বোধ করলেন না। বরং একরাশ বিরক্তি নিয়েই চোখ বুজলেন।
ছায়ামূর্তিটি বলেছিল যে তাঁকে ঘুম পাড়িয়ে দেবে। কিন্তু এটা বলেনি যে সে ঘুম আর কখনোই ভাঙবে না।






Leave a Reply