৯
“নাও, ইটস টাইম টু ফেস দ্য মিউজিক’!
অধিরাজের মুখ নির্বিকার হলেও ইস্পাতকঠিন। মাথার ওপরের হালকা আলো চলকে পড়ে তার মখমলি ত্বককে আশ্চর্য ঔজ্জ্বল্য দিয়েছে। অথচ মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। শুধু একটা নিষ্ঠুরতা আর দৃঢ়তা স্পষ্ট। সে ভেলভেটের মতো মসৃণ অথচ অনুভূতিহীন স্বরে বলল, “শুড আই কল ইউ সুহাসিনী মিত্র? অর ডঃ সুহাসী বিশ্বাস? কোটা বেশি পছন্দ করবেন?”
সুহাসিনী আর অধিরাজের মাঝখানে একটি ধাতব টেবিল দু-জনের মধ্যে দূরত্ব বজায় রেখেছে। টেবিলের দুই পাশে রাখা দুটো সাদামাটা মেটালের চেয়ার। ওগুলো কোনো আরাম দেয় না। বরং অস্বস্তিজনক কঠিন। যেন কাউকে ওখানে আনকমফর্টেবলি বসিয়ে তার মনের মধ্যে চাপা উত্তেজনা তৈরি করার উদ্দেশ্যেই বানানো। কেউ যদি দেহের মাংসপেশীগুলোকে আরাম না দিয়ে বসে, তবে সেটাও একরকম ফিজিক্যাল ও সাইকোলজিক্যাল টর্চার তো বটেই।
এমনিতেই ডঃ সঞ্জয় বসু সমেত গোটা টিমটার ওপরই স্নায়বিক চাপ তৈরি করে রেখেছে অধিরাজ। প্রত্যেককেই গতকাল রাতে ব্যুরোতে নিয়ে আসা হয়েছে বা ডাকা হয়েছে। কিন্তু গোটা রাত এবং আজ সকাল পর্যন্ত কোনো জিজ্ঞাসাবাদই করা হয়নি। বরং সবাইকেই রীতিমতো খাতিরযত্ন করা হচ্ছে। সময়মতো শিঙাড়া, চপ, চা, কফি, কোল্ডড্রিঙ্ক, কিংবা ডিনারে বিরিয়ানি, ফ্রায়েড রাইস, ব্রেকফাস্টে ডিম-টোস্ট, পুরি-পরোটা পর্যন্ত সার্ভ করেছে ওরা। কিন্তু একদম নিশ্চুপে। অধিরাজের স্পষ্ট অর্ডার ছিল, “প্রত্যেককে আলাদা আলাদা ঘরে বসাবে। কেউ যেন কারওর মুখ এক সেকেন্ডের জন্যও দেখতে না পায়।; জানতেও না পারে যে কে কে এখানে উপস্থিত আছে। সবাইকে খাতির যত্ন করবে। যদি কারওর মেডিসিন দরকার পড়ে তাও আনিয়ে দেবে। ডিনার, স্ন্যাক্স যা চায় প্রোভাইড করো। ঘুমোতে চাইলেও আপত্তি নেই। কিন্তু, যতক্ষণ না ইন্টারোগেশন রুমে ওরা এক এক করে ঢুকছেন, ততক্ষণ কেউ ওঁদের সঙ্গে একটা কথাও বলবে না। সব কাজই নিঃশব্দে করবে। কোনো প্রশ্নের উত্তর দেবে না। কিছু বললে শুনবেও না। যা হবে সব সাইলেন্ট মোডে। ওকে?”
পবিত্র আর অর্ণব মাথা নাড়ায়। অধিরাজের দৃষ্টি লেডি অফিসারদের দিকে ঘোরে, “সেনোরিটাজ, কারওর সঙ্গে কথা বলবেন না, কাউকে কথা বলতেও দেবেন না। ক্লিয়ার?”
“ক্রিস্টাল স্যার।”
তারপর থেকেই ডঃ সঞ্জয় বসু, রঞ্জন নায়েক, সুহাসিনী মিত্র, সিস্টার শীলা বসাক, ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী, প্রৌঢ়া ও অভিজ্ঞ সিস্টার মলয়া চৌধুরী এবং স্বয়ং ডঃ বসুর সুপুত্র রণজয় বসুর রাতের ঘুম উড়ে গিয়েছে। এসির মধ্যেও ঘেমেই চলেছেন সকলে। কেউ জানেন না যে অন্য রুমে আর কে কে উপস্থিত। কিংবা ভবিষ্যতে ঠিক কী অপেক্ষা করছে তাদের জন্য। সেটাই বোধহয় মানসিক চাপ বাড়ানোর জন্য মোক্ষম দাওয়াই। যতক্ষণ মানুষ একসঙ্গে থাকে, ততক্ষণ ন্যূনতম মনের জোর আর সামান্য সাহসও থাকে। কিন্তু একা হয়ে গেলেই আতঙ্ক, নিরাপত্তাহীনতা—সব একসঙ্গে গ্রাস করে নেয়। সবচেয়ে বড়ো কথা, একা ও নিঃসঙ্গ মানুষ সহজে ভাঙে।
একেই এই অস্বস্তিকর ও অচেনা পরিবেশ সবার মনের ওপরই চাপ সৃষ্টি করছিল। তার ওপর হোমিসাইডের অফিসারদের নৈঃশব্দ তো আরও বড়ো অস্ত্র। প্রত্যেকে ডিনার, স্ন্যাকস বা ব্রেকফাস্ট খাওয়া তো দূর-বারবার শুধু অসহায়ভাবে জিজ্ঞেস করেই চলেছেন যে তাদের এখানে কেন ডাকা হয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদ কেন হবে, কখন হবে, এখনও অফিসার ব্যানার্জির দেখা নেই কেন, কতক্ষণ এখানে থাকতে হবে, আর কত সময় লাগবে, ইত্যাদি, ইত্যাদি। প্রত্যুত্তরে অফিসাররা প্রত্যেকেই এমন একটা শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চলে গিয়েছেন যার কোনো অর্থ নেই। আবার গভীরভাবে ভাবলে ভীষণ অর্থপূর্ণ হতে পারে। যতটুকু দায়িত্ব পালন করার ছিল তাতে ত্রুটি নেই। কিন্তু না তাদের মুখে কোনো অভিব্যক্তি আছে, না একটিও শব্দ। নীরবতা পাষাণভারের মতো প্রত্যেকের বুকের ওপর এমন চাপল যে সারা রাত ওঁরা প্রত্যেকেই জেগে কাটালেন। কেউ একমুহূর্তের জন্যও দু-চোখের পাতা এক করতে পারেননি।
এই গোটা অ্যাকশন ও রি-অ্যাকশনের পর্যায়টা আড়াল থেকে চুপচাপ দেখে যাচ্ছিল ওরা সকলেই। মানুষগুলো টেরই পাননি যে নীরবেই ওঁদের ওপর মনিটরিং চলছে। বিশেষ কিছু অঘটন ঘটেওনি। তবে আত্রেয়ী দত্ত গভীর রাতে এসে অধিরাজকে রিপোর্ট দেয়, “কেউ কিছু পাননি স্যার। কোনোরকম মেডিসিন ইনটেকও করেননি। ডঃ বসুকে দু-বেলা ইনসুলিন নিতে হয়। কিন্তু সেটাও রিফিউজ করছেন। তবে রঞ্জন নায়েককে নিয়ে একটু চিন্তায় পড়েছি।”
“কেন?”
“ওঁর সুগার ফল করার হিস্ট্রি আছে। কিছু অত্যন্ত জরুরি ও স্টং সাইকোটিক ড্রাগও নিয়ে থাকেন। একেই কিছু দাঁতে কাটছেন না। তার ওপর মেডিসিনও নেননি। যার ফলে একটু আগেই বুক ধড়ফড়, বমি, মাথা যন্ত্রণার মতো প্রবলেম শুরু হয়েছে।” আত্রেয়ী জানায়, “এই অবধি তবু ঠিক ছিল, বাট উনি তো কোনো লিকুইডও নিচ্ছেন না! এরকম হলে তো ডিহাইড্রেশনও হবে স্যার। তখন আমরাই না বিপদে পড়ি!”
অধিরাজ মনে মনে মুচকি হাসল। এটাই তো সে চেয়েছিল! নার্ভের জোরকে বুলডোজার দিয়ে শুঁড়িয়ে দিতে না পারলে প্রতিভাবান শয়তানেরা কখনও মুখ খোলে না! ভুলও করে না। আর আজ পর্যন্ত ডাক্তারদের মতো নিখুঁত মার্ডারার খুব কমই পাওয়া গিয়েছে। এমনকী অনেকেই বলে থাকেন যে সিরিয়াল কিলারদের পরম পূজনীয় খুনী ‘জ্যাক দ্য রিপার’—যিনি বা যাঁর পরিচয় আজও ধরা পড়েনি, তার ডাক্তার হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি প্রবল! ব্রুটাল মার্ডার করার পদ্ধতিও তাই বলে। একজন লেম্যান দুমদাম ছুরি কাঁচি চালিয়ে মানুষের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে ওভাবে বের করে আনতে পারে না। তার জন্য অ্যানাটমি জানা দরকার। প্রতি যুগে প্রমাণিত হয়েছে, একজন ডাক্তারের ক্রাইম ধরা প্রায় অসম্ভব। আর এই কেসে বেশিরভাগ সাসপেক্টই ডাক্তার! জে সি বি মেশিন না হলে চলবে কী করে?
সে দিব্যি বুঝতে পারছিল যে এই ভয়ের পেছনে নিজের কুকর্মের ফাঁস হওয়ার ভয় সবচেয়ে বেশি। অধিরাজ যে কটি নমুনা দেখেছে তাতেই স্পষ্ট, হয়তো বা প্রত্যেকেরই অতীতে কোনো না-কোনো অপরাধ আছে যার প্রমাণ ওঁরা রাখেননি। কিন্তু প্রত্যক্ষপ্রমাণ না থাকলেও দীর্ঘদিনের সহকর্মী বা টিম-মেম্বারের বয়ানও আজকাল শক্তিশালী এভিডেন্স হিসেবে গণ্য হয়। অথচ কেউ জানেনই না যে তাঁর সঙ্গে হোমিসাইডের অফিসে আর কারা আছেন এবং তারা কী বলছেন বা বলবেন! ওদিকে নিজেরা নিখুঁত বয়ান দেওয়ার জন্য প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। সম্ভাব্য প্রশ্নগুলো কল্পনা করে উত্তর ভাবছেন। বারবার সেটাকে সম্পূর্ণ ফ্ল লেস আর লুপহোলবিহীন করার জন্য রিহার্সালও দিয়ে চলেছেন। অথচ বক্তব্য পেশ করার সুযোগই আসছে না। বেচারা লোকগুলো ব্রেনস্টর্মিং করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। ওদের মস্তিষ্কও স্থিরতা এবং শীতলতা হারাচ্ছে। এই ভারসাম্যটুকু নষ্ট করাই তার উদ্দেশ্য। খুনীর হাতে প্রয়োজনমতো দড়ি দিলে সে অন্যকেই ঝুলিয়ে দেবে। অথচ যদি প্রয়োজনাতিরিক্ত বিরাট লম্বা দড়ি দিয়ে দেওয়া হয়, তাবে শেষপর্যন্ত সে কী করবে বুঝতে না পেরে নিজের গলাতেই দড়ি দেয়। এখানে এই অসীম নীরবতা, অনিশ্চয়তা, একাকীত্ব আর অনির্দিষ্ট দীর্ঘ সময়ের প্রতীক্ষাই সেই লম্বা দড়ির কাজ করছে।
অধিরাজ একটা রুবিক কিউব টুকটুক করে মেলাতে মেলাতে বলে, “এক কাজ করুন। ওঁকে একদম সিলড রেডি টু ইট জাতীয় খাবার বা ম্যাগির প্যাকেট আর একটা ব্র্যান্ড নিউ ইলেক্ট্রিক কেটল দিয়ে দিন। আর সঙ্গে একদম আনট্যাম্পারড ও সিলড জলের বোতল। আমার দৃঢ় বিশ্বাস উনি নিজেই রান্না করে নেবেন ও সবই খাবেন।”
“ওকে স্যার।”
আত্রেয়ী নির্দেশ পালন করেছিল। এবং তাতে কাজও হয়েছে। রঞ্জনের পেটে খাবার ও মেডিসিন—সবই গিয়েছে।
অনেক প্রতীক্ষার পর অবশেষে দুপুর বারোটা থেকে ইন্টারোগেশন শুরু হল। আসলে এই বিরতির মধ্যেই হোমিসাইডের অফিসাররা প্রত্যেকটি মানুষের সম্পর্কে তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করতে নেমে পড়েছিল। অর্ণব, পবিত্র ও অধিরাজের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কৌশানী, আত্রেয়ী এবং টুইঙ্কল নানা টিমে বিভক্ত হয়ে গোটা রাত ধরে কলকাতা চষেছে। কখনও কোনো হসপিটালে দৌড়েছে, কখনও পুলিস স্টেশনে। এই কয়েকঘণ্টায় তদন্তের গতিমুখ অনেকটাই বদলাল। ওরা মানুষগুলোর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে ওঁদের বাড়ি সার্চ করে যত তথ্য পারে বের করে আনে। একটা অসহনীয় ক্লান্তিকর রাতের অমানুষিক পরিশ্রমের পর যখন একে একে সবাই ব্যুরোয় ফিরল ততক্ষণে ঘড়িতে ভোর পাঁচটা বাজে। সামান্য কিছু জলখাবার খেয়ে, লেডি অফিসারদের বিশ্রাম দিয়ে ফের বেরিয়ে পড়েছিল অধিরাজরা। সমস্ত তদন্ত সেরে একটু আগেই ফিরেছে।
ইন্টারোগেশন রুমের চাপা টেনশন হাওয়াতেও ছড়িয়ে আছে। সাদামাটা দেওয়ালের একপাশে রয়েছে আয়তাকার কালো কাচের জানলা। আসলে ওটা ওয়ান ওয়ে মিরর। ভেতরে বসা মানুষটা জানেই না যে, বাইরে থেকে তার প্রতিটি অভিব্যক্তি, প্রতিটি কার্যকলাপ লক্ষ্য করা হচ্ছে।
অধিরাজের একপাশে রাখা একটি মাইক্রোফোন ও ছোটো রেকর্ডিং মেশিন। মাঝে মাঝে তার লাল আলো টিমটিম করে মনে করিয়ে দেয়, কথাগুলো কেবল বলা হচ্ছে না, সংরক্ষিত হচ্ছে। সবটাই রেকর্ডেড।
এই ঘরে কোনো উষ্ণতা নেই, নেই মানবিকতার চোঁয়া। আছে শুধু নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি আর সত্যকে চেপে ধরার প্রক্রিয়া।
“আমি এ-বিষয়ে কোনো কথা বলব না,” সুহাসিনী ঠা স্বরে উত্তর দেন, “আপনি আমার উকিলকে ডাকুন।”
“মিস মিত্র অর বিশ্বাস।” অধিরাজের মুখে এতক্ষণে একটা নির্মম হাসি ভেসে উঠল, “মিসই বলছি, কারণ একে আমাদের পুলিস রেকর্ড অনুযায়ী ম্যারিটাল স্ট্যাটাসে লেখা আছে আপনি ডিভোর্সি। উপরন্তু নামের আগে ডঃ বসানোর লাইসেন্স আপনি আগেই হারিয়েছেন। সো, মিসটাই সেফ!”
অধিরাজের ঠিক পেছনে বুকের ওপর হাত জড়ো করে দাঁড়িয়ে ছিল টুইঙ্কল এবং কৌশানী। ওদের মুখ দেখেও মনের কথা বোঝা দায়। আর ওয়ান ওয়ে মিররের ও-প্রান্তে পবিত্র আচার্য আর অর্ণব রুদ্ধশ্বাসে গোটা সওয়াল জবাব শোনার জন্য প্রতীক্ষারত।
“আপনি আমার নাম ভুল বলছেন অফিসার। ইনফ্যাক্ট নামই জানেন না। তাই উত্তর দেওয়ার দায় আমার নয়।”
ক্রিমসন কালারের শাড়ি পরা সুন্দরী মহিলা ব্যুরোতেও ভারা টিপটপ রেখেছেন নিজেকে। কথাবার্তাও যথেষ্ট পলিশড। অর্ণব দাঁতে দাঁত পিষল, সাহস তো কম নয়।
অধিরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তার হাতে একটা নীল রঙের পুরোনো ফাইল ধরাই ছিল। সেখান থেকে বেশ কিছু ফটোগ্রাফ বের করে ছড়িয়ে দেয় টেবিলের ওপরে।
“দেখুন তো চিনতে পারেন কী না!”
সুহাসিনী সবিস্ময়ে দেখলেন ছবিগুলো সব ওঁরই। তিনি বললেন, “এ তো আমার ছবি!”
“আজ্ঞে না।” অধিরাজ মাথা নাড়ছে, “এটা ডঃ সুহাসী বিশ্বাসের ছবি। ভালো করে দেখুন। আপনি শুধু সাজগোজ করা ছবিগুলোই লক্ষ্য করলেন। ওর সঙ্গে কয়েকটা পার্টিকুলার ছবিও আছে যেখানে নিজের নাম লেখা বোর্ড হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মহিলা। তাঁকেও হুবহু আপনার মতনই দেখতে। পার্থক্য একটাই। সেনোরিটা পুলিস স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছেন আর ওঁর হাতের বোর্ডে নিজের নাম লেখা আছে ডঃ সুহাসী বিশ্বাস। এটা পুলিসের বিশেষ ফটোশ্যুটের স্টাইল। ইনি আপনার যমজ বোন নন তো?”
সুহাসিনীর মুখের সব রক্ত কে যেন ব্লটিং পেপার দিয়ে শুষে নিয়েছে। তিনি স্তম্ভিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন অধিরাজের দিকে। যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাসই করতে পারছেন না!
“এটা নকল… নকল এভিডেন্সও হতে পারে।…আপনারা আমায় মিথ্যে অপবাদের জালে জড়ানোর জন্য এসব ডকুমেন্টস বানিয়েছেন…।”
কথাগুলো বললেন বটে, কিন্তু আত্মবিশ্বাসের অভাব স্পষ্ট। অধিরাজ মৃদুস্বরে বলে, “বড্ড পরিশ্রম করান আপনি।”
এবার সে মেডিক্যাল কলেজের আইডি কার্ড, দু-একটা হসপিটালের সচিত্র পরিচয়পত্র এবং একটা পুরোনো ভোটার কার্ড, পাসপোর্ট ও ড্রাইভিং লাইসেন্সও বের করে এনেছে। এমনকী নাম বদলানোর এফিডেবিটের কাগজপত্রও ওঁর নাকের সামনে টেবিলে ছড়িয়ে দিয়ে বলে, “এগুলো সব আপনার কলেজ, কোর্ট এবং স্বয়ং আপনার বাড়ি থেকেই তুলে নিয়ে এসেছি। প্রমাণও দিয়ে দিতে পারি। স্যাটিসফায়েড?”
পরম আফসোসে ঠোঁট কামড়ালেন সুহাসিনী। ডকুমেন্টসগুলো নষ্ট না করার আক্ষেপ তার ক্রোধকে চরম সীমায় নিয়ে গিয়েছে। অর্ণবের মনে হয়, একমুহূর্তে ওঁর শান্ত ও হাসি হাসি চোখদুটো সম্পূর্ণ বদলে গিয়ে যেন বাঘিনীর চোখের মতো জ্বলে উঠল। মুখের লালিত্য সরে গিয়ে একটা ভীষণ ঠান্ডাভাব ভেসে ওঠে। ধারালো চোয়াল কঠিন। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে ভীষণ শীতল ও হিসহিসে কন্ঠে বললেন, “আপনাদের আমার বাড়িতে বিনা অনুমতিতে সার্চ করা উচিত হয়নি। দিস ইজ ইললিগ্যাল। আমি একটা কথাও বলব না। আমার উকিলকে ডাকুন।”
“বাট হোয়াই?” অধিরাজের গলায় বিস্ময়, “উকিল তো তখনই আসবেন যখন আপনি অ্যারেস্টেড হবেন, কিংবা কোনো স্পেসিফিক চার্জ আপনার ওপর দেওয়া হবে। আপনি আপনার লিগাল রাইটগুলো যদি না জানেন তবে আমিই বলে দিচ্ছি। লয়্যার বা অ্যাডভোকেট তখনই লাগে যখন আপনাকে গ্রেফতার করা হয়, বা আপনি পুলিসের সঙ্গে কোনোভাবে কমফোর্টেবল না হন, কিংবা কমপ্লেক্স লিগ্যাল ইস্যুর ক্ষেত্রেও উকিলের উপস্থিতি প্রয়োজন। কিন্তু এর একটাও তো আপনার ক্ষেত্রে খাটে না।”
“খাটে না।”
এবার ভদ্রমহিলা নিজেই কনফিউজড হয়ে গিয়েছেন, “মানে?”
“মানে আপনাকে আদৌ অ্যারেস্টই করা হয়নি!” অধিরাজ মিটিমিটি হাসছে, “কোনো চার্জেস আপনার বিরুদ্ধে নেই। আপনিই সেই ব্যক্তি যিনি পুলিসের সঙ্গে মোস্ট কমফোর্টেবল। এটা প্রথমবার নয়, এর আগেও আপনি একাধিকবার পুলিসের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন তার প্রমাণও আমাদের কাছে আছে। সো, আনকমফোর্টেবল হওয়ার বায়না করা যাবে না। কোনো কমপ্লেক্স লিগ্যাল ইস্যুর শিকারও আপনি নন। বিশ্বাস না হলে আমি আপনাকে আমাদের রেকর্ডসও দেখাতে পারি। সেখানে রিটানে এর মাধ্যে একটা কথাও নেই। শুধু এইটুকু বলা হয়েছে যে জেনিথের রোগীদের মৃত্যুর ইনভেস্টিগেশনের সুবিধার জন্য আপনাকে নেহাৎই রুটিন এনকোয়ারির জন্য ডাকা হয়েছে। এনকোয়ারি শেষ হলে আপনি আজকের লাঞ্চটা বাড়িতে বসেই করবেন।” বলতে বলতেই সে নমনীয় আড়মোড়া ভাঙে, “অবশ্য আমাদের দয়াবান ভারতীয় সংবিধান আপনাকে চুপ থাকার অধিকারটাও ফ্রি-তে দিয়েছে। রাইট টু রিমেইন সাইলেন্ট। আপনাকে আবার শুধু বলতে হবে, ‘আমি একটা কথাও বলব না।’ কিন্তু তার আবার সাইড এফেক্ট হিসাবে আইনি লেজুড়ও আছে। যে মুহূর্তে আপনি আপনার সাইলেন্ট থাকার রাইটটি প্রয়োগ করবেন, সেই মুহূর্তেই কিন্তু নিজেই নিজেকে আইনি পরিভাষায় ‘ইনক্রিমিনেট’ও করবেন। অর্থাৎ আপনার সাইলেন্সই চিৎকার করে বলে দেবে যে আপনি অপরাধী। তখন কিন্তু সেনোরিটা আপনার উকিল সত্যিই লাগবে। কারণ অ্যাট দ্যাট ভেরি মোমেন্ট আমরা আপনাকে স্ট্রেট গ্রেফতার করে চার্জেস লাগাব। এই পালটা রাইটটাও আবার আমাদের ভারতীয় আইন দিয়ে রেখেছে। তখন আপনি উকিলের সামনেই বয়ান দেবেন, কোর্টে দৌড়বেন, শুনানি সামলাবেন, বেইল না পাওয়া অবধি জেলেও থাকতে পারেন। তবে হয়তো এবার ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার আপনাকে স্পনসর করবেন না। ইটস ইওর চয়েস। হয় আপনি আজ বাড়িতে বসে ‘লাঞ্চিত’ হবেন, নয় হাজতে বসে ‘লাঞ্ছিত’ হবেন। আপনার মর্জি।”
সুহাসিনীর চোখ বিস্ময় বিস্ফারিত। ফের নীচু গলায় বললেন, “ডঃ ইন্দ্ৰজিৎ সরকার আপনাদের কী বয়ান দিয়েছেন? উনি আমাকে কোন দুঃখে স্পনসর করবেন?”
“দুঃখে কী আনন্দে জানি না,” অধিরাজ আস্তে আস্তে বলল, “তবে এটা ঘটনা যে তিনি বয়ান দিয়েছেন। কিন্তু এক্ষেত্রেও আমি আমার সাইলেন্ট থাকার রাইটটিই প্রয়োগ করব।”
ভদ্রমহিলার মুখের রেখাগুলো এবার দুশ্চিন্তার ছায়ায় ঢেকে গেল। তিনি বেশ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, “বেশ। আপনার যা প্রশ্ন করার তা করুন। চেষ্টা করব উত্তর দেওয়ার।”
“ইন্টেলিজেন্ট।”
তার মুখে দেবশিশু মার্কা হাসিটা ফ্ল্যাশ করে ওঠে, “আমরা শুনেছি যে জেনিথে যে বৃদ্ধ মানুষদের সন্দেহজনক মৃত্যু হয়েছে, তাদের সঙ্গে আপনার রীতিমতো মনোমালিন্য ঘটেছিল? এটা কী সত্যি?”
ওঁর চোখে এবার সতর্কতা, “এটা নিশ্চয়ই আপনাকে রঞ্জন নায়েক বলেছে। তাই না?”
অধিরাজ এবার সিলিঙের দিকে তাকিয়েছে। সে আবার রাইট টু রিমেইন সাইলেন্ট মোডে গিয়েছে।
এবার সুহাসিনীর ধৈর্য জবাব দেয়, “দ্যাট নিনকপুপ পার্সন। আপনি জানেন, এই সেম কথা ও আর একটু হলেই ডঃ বসুকেও বলতো। কোন লেভেলের পাগল কে জানে।”
“সেইজনাই বুঝি অত যত্ন করে আমন্ড কেক আর চিলি মাশরুম রেঁধে খাইয়েছিলেন। শুনলাম বেচারি তারপর থেকে বাইরের খাবার খাওয়া ছেড়েই দিয়েছেন।”
তিনি এবার পুরো নির্বাক চলচ্চিত্র। মনে হল মাথায় ষোলোশো ভোল্টের বাঞ্জ পড়েছে। হতবিহবল হয়ে বোধহয় বোঝার চেষ্টা করছেন যে এইসব গূঢ় তথ্য অধিরাজের কানে গেল কী করে! কে তুলল। ইন্দ্রজিৎ সরকার? রঞ্জন নায়েক? না কৌশিক চক্রবর্তী।
অধিরাজ বাইরে গাম্ভীর্য বজায় রাখলেও মনে মনে হাসে। এই ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসিটা মাঝেমধ্যে বড়ো কাজে আসে। মহিলা যত বেশি কনফিউজ হবেন তত খবর বের করা সহজ হবে।
“ব্যাপারটা এত সহজ নয় অফিসার।”
সুহাসিনী এবার উষ্ণ ও অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছেন, “আপনি যাদের কথা বিশ্বাস করছেন তারাও মোটেই সুবিধার লোক নয়। ওরা সবাই সবাইকে কভার করছে। আপনাকে তো আমি আগেই বলেছিলাম যে ডায়েটিশিয়ানকে কেউ মানুষ মনেই করে না। আমার সঙ্গে পার্টিকুলার ওই বৃদ্ধ বৃদ্ধাদেরই শুধু নয়, জেনিথের নিরানব্বই শতাংশ রোগীদেরই মনোমালিন্য হয়। কিন্তু তাই বলে আমি কিলোদরে ওঁদের মেরে বেড়াব? তাই যদি হত, তবে জেনিথের একটি রোগীও আজ বেঁচে থাকত না। তাছাড়া এত কষ্ট করে নাম ধাম পালটে কেরিয়ারটা আবার নতুন করে শুরু করেছি। স্রেফ কতগুলো পেশেন্টের খিস্তিখেউড়ে সেটাও শেষ করব?”
“বাইট ইউ আর।”
অধিরাজ ওঁর কথায় সমর্থন জানায়, “এটা সত্যিই লজিক্যাল কথা বলেছেন।”
সামান্য সহানুভূতি পেয়ে এবার তিনি বলতে শুরু করেন, “আর রঞ্জন নায়েকটা যেমন লম্পট তেমন মিথ্যেবাদী। ওর যে আমন্ডে অ্যালার্জি তা আমার জানার কথাই নয়। আমি তো চকোলেট কেকের কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু ওর এক্স প্রেমিকাই আমায় বলেছিল যে আমন্ড পেস্টও ভেতরে দিয়ে দিতে। আবার ও-ই আমাকে বলেছে যে মাশরুম রঞ্জনের ফেভারিট ডিশ! এমনকী ও নিজেই আমাকে প্রয়োজন মতো মাশরুম সাপ্লাই করে। ওর বর নিতান্তই ছোটো স্কেলে মাশরুম চাষ করে কী না।”
এবার উপস্থিত সবক-জন অফিসারেরই মুখে উঠেছে। রঞ্জনের এক্স প্রেমিকা। সে আবার কে।
“কেন?” ওঁর মুখে আবার শাণিত ধারালো হাসি, “আপনার সোর্স আপনাকে এই খবরটা দেয়নি? রঞ্জন শীল বসাকের মধ্যে তিনবছর আগে ভয়াবহ প্রেম চলচ্চি?”
এ তো ব্রেকিং নিউজ! যে একটা কথা বলতে গিয়ে যেনে নেয়ো একসা হয়, সে কী না ‘রং দে তু মোহে গেরুয়া’ গাইছে! এ-ও সম্ভব।
সুহাসিনী জানান যে-কোনোদিন এই দুটোর প্রেমের জ্বালার বিরক্ত হয়ে খোদ ডঃ বসুই ওদের খুন করবেন। ঠিক তিন বছর আগে নাইট ডিউটির সময় শীলা বসাক কোনো এক ঘুমন্ত পেশেন্টকে আই ভি ড্রিপ চালু করে দিয়ে রঞ্জনের সঙ্গে রাসলীলা করতে স্টোররুমে ঢুকেছিল। ভগবান জানেন যে ওদের প্রেম করতে এত সময় কেন লাগে! কিন্তু সেই কাকেই কখন স্যালাইনের বোতল সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল কেউ জানেই না। ভদ্রমহিলা এমনিই হার্টের পেশেন্ট। তার ওপর ফ্যাটাল পরিমাণের এয়ার বাবলস ওঁর হার্টে ঢুকে গিয়েছিল। এয়ার এম্বলিজমের ধাক্কা নিতে না পেরে পেশেন্ট ওখানেই মারা যায়। গোটা ঘটনাটা জানতে পেরে ডঃ বসু রাগের চোটে দু-জনের নামেই পুলিসে ‘মার্ডারের’ চার্জ দিয়ে এফ আই আর করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার কোনোমতে তাঁকে শান্ত করেন। অন্যদিকে রঞ্জন ভয়ের চোটে সব দায় শীলার ঘাড়েই চাপিয়ে দিয়ে বলেছিল, “আমি কিছু করিনি। যা করেছে শীলা করেছে।” আবার শীলা রঞ্জনকেই মার্ডারার বলে বসেছিল। তার মতে, রঞ্জন নাকি প্রায়ই বলে থাকে, যে মানুষগুলো কষ্ট পাচ্ছে তাদের মুক্তি দেওয়া উচিত! এরপরই দু-জনের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। শীলা অন্য একজন ছোটোখাটো মাশরুম ব্যাবসায়ীকে বিয়ে করে। কিন্তু রপ্তান এখনও ওর পেছন ছাড়েনি। গুজব আছে, যে শীলার সঙ্গে বেশ কিছু ঘনিষ্ঠ ও আপত্তিকর ফটো তার মোবাইলে সেভড রয়েছে। সেগুলোর মাধ্যমেই রঞ্জন শীলাকে ব্ল্যাকমেইল করে ওর সঙ্গে রঙিন সময় কাটাচ্ছে।
গোটা বিষয়টা জানিয়েই তিনি হাসলেন, “সো আমার রঞ্জনকে মারার দরকার নেই। গুজবটা যদি সত্যি হয় তবে কোনোদিন শীলাই রঞ্জনকে যমের দোরগোড়ায় পাঠাবে।”
“মিঃ নায়েক মার্সিকিলিঙে বিশ্বাসী? সত্যিই?”
অধিরাজ সুহাসিনীর দিকে ঝুঁকে পড়ে প্রশ্নটা করে। তিনি শুধু ঠান্ডা স্বরে বলেন, “আস্ক রঞ্জন।”
“ফাইন” সে বলল, “আপনি বাড়ি যেতে পারেন, তবে শহর ছেড়ে যাবেন না।”
যথারীতি এরপরই ডাক পড়ল শীলা বসাকের। তাকে দেখে মিস অরোরা পেছন থেকে মন্তব্য করে, “বিচারি লড়কি। তাকে কেউ ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করায় না কেন। একে তো কুচুকুচু করাও যাবে না। ফুঁক মারলেই মোমবাত্তির মতো নিভে যাবে।”
রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে কথাটা শোনামাত্র আচমকাই অর্ণব আপনমনেই বিড়বিড় করে উঠল, “অরুন্ধতী, মেরি মোমবাত্তি!….”
“অ্যাঁ! সে কী!”
পবিত্র আচার্য ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে দেখছে, “অ্যাদ্দিন মঞ্জুলিকা আর চন্দ্রমুখীর নাম শুনেই তো কাঁপতে জানতাম। ওদিকে পেছনে পেছনে আবার ‘অরুন্ধতী মেরি মোমবাত্তি’ও চলছে। সে বেলায় ভয় করে না? এত বড়ো উন্নতি হল, আর আমি জানতেও পারলাম না!”
অর্ণব একটা বিষম খেয়ে ব্যাপারটা চেপে গেল। আচার্য স্যার আজকাল প্রায়ই তাকে ‘তুমব্বাদ’ দেখানোর তাল করছেন। সে-ই কোনোমতে এখনও ঠেকিয়ে রেখেছে। কে জানে, অরুন্ধতীর ঠ্যালায় আজই না দেখিয়ে দেন! কী কুক্ষণে যে ডায়লগটা বলতে গিয়েছিল।
ওদিকে শীলা বসাককে দেখে মনে হচ্ছিল যে অলরেডি সে ‘তুমব্বাদ’-এর সেটেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। অলরেডি বাঁশপাতার মতো কাঁপছে তার হাত পা। বারবার জিভ দিয়ে চেটে নিচ্ছে শুকনো ঠোঁট। ডান হাতের নখ বারবার খামচে ধরছে বা হাতের তালু। মেয়েটি ব্যাগের স্ট্যাপ এত জোরে আঙুল দিয়ে চেপে ঘষছে যে আঙুলের গাঁটগুলো পর্যন্ত লাল হয়ে উঠেছে। এরপর না ছাল চামড়াই উঠে যায়।
অর্ণবের হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়ে যায়। এটা কী এই মেয়েটির মুদ্রাদোষ? তবে তো…!
“দাদি, সো যা। ওয়ারনা হস্তর আ যায়েগা।”
অর্ণব এবার পবিত্রর দিকে বিরক্তিমাখা চোখে তাকাতেই সে বলে, “হোয়াট? এই মেয়েটার নাম শীলা হতে পারে। কিন্তু আমার ওকে দেখে ক্যাটরিনার চেয়ে তুমব্বাদের দাদির কথাই মনে পড়ছে। ও জানে না যে হস্তর স্বয়ং ওর সামনেই বসে আছে!”
“আ..আমি কিছু জানি না স্যার।”
শীলা বসাক কাঁপা গলায় বলল, “আমি তো শুধু অর্ডারমতো কাজ করি। ওষুধের বিষয়ে কিছু জানি না।”
“ট্রু” সে এবার ঠান্ডা স্বরে বলে, “ইনফ্যাক্ট অনেকেই তো এমন কথা বলেন যে আপনি আপনার পেশার ব্যাপারেও কিচ্ছু জানেন না। ইউ আর টোট্যান্সি আ ওয়ার্থলেস অ্যান্ড মোস্ট ইনকম্পিটেন্ট পার্সন। আপনি ডঃ বসুর টিমের কলঙ্ক!”
একপলকে যেন গোটা দৃশ্যটাই চেঞ্জ হয়ে যায়। শীলা বসাকের ভীতু ভীতু মুখোশটা এক ঝটকায় খসে পড়ল। তার চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে উঠেছে, “এসব কথা কে বলেছে আপনাকে? ডঃ বসু বলেছেন?”
অধিরাজ কোনো কথা না বাড়িয়ে শুধু মৃদু হাসল, “হেয়ার সে রিপোর্ট সেনোরা।”
“আপনি জানতে চাননি যে আমি মোস্ট ইনকম্পিটেন্ট হওয়া সত্ত্বেও তিনবছর আগেই স্যাক না করে এত এত স্যালারি দিয়ে ডঃ বসু আমায় পুষছেন কেন?”
‘তিনবছর আগে’ শব্দটা মুখ থেকে বেরোনো মাত্রই অধিরাজ বুঝল যে সুহাসিনী শীলার গাফিলতির ব্যাপারে সত্যি কথাই বলেছেন। সে দুঃখপ্রকাশ করে, “রিয়েলি? আপনার স্যালারি অনেক, তাই না?”
“আই অ্যাম দ্য হায়েস্ট পেইড পার্সন! অ্যাকচুয়ালি আমার নার্সগিরি করার কথাই নয়। ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু গরীবের ঘরের মেয়েরা ডাক্তার হয় না, তাই পেটের দায়ে নাসগিরি করছি,” শীলা চাপা ক্রোধে বলে, “আর আপনার ডঃ বসু আমাকে ইনকম্পিটেন্ট বলেন কোন সাহসে?”
অধিরাজ একটু চুপ করে থেকে এবার তুরুপের তাসটা ফেলে, “আমি কিন্তু একবারও বলিনি যে ডঃ বসু এসব বলেছেন। আপনার ভুল হচ্ছে না তো?”
এবার যেন একটা ঝাঁকুনি খেল শীলা। তার মুখ বিবর্ণ হয়ে যায়। সে এতক্ষণ অধিরাজের সঙ্গে আই কন্ট্যাক্ট করেই কথা বলছিল। এবার চোখ নামিয়ে ফেলল। কানের পাশের চুল বেয়ে শীতল ঘাম ফোঁটায় ফোঁটায় পড়ছে। অর্ণব লক্ষ করল যে ব্যাগের স্ট্যাপের ওপর আঙুলের ঘষা খাওয়ার ফ্রিকোয়েন্সি আরও বেড়ে গেল।
“তবে কে বলেছে? কৌশিক চক্রবর্তী?”
অধিরাজ নীরবে, শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সে কোনো উত্তরই দিল না। শীলা নিজে থেকেই বকতে থাকে “ওঁকে একদম বিশ্বাস করবেন না স্যার। ও লোকটা ভীষণ মিথ্যেবাদী। আমার নামে যা তা কথা বলে বেড়ায়।”
“শুনছিলাম যে আপনার পূর্ব প্রেমিক নাকি আপনাকে ব্ল্যাকমেইল করেছেন বলে আপনি তাকে খুন করার চেষ্টা করেছিলেন?”
এই মুহূর্তে পুরো দরদর করে ঘামছে শীলা। সে শুধু বলে, “বাজে কথা। আই অ্যাম হ্যাপিলি ম্যারেড। আর রইল রঞ্জনের কথা? ও তো সব জায়গায় মুখ মারতে চায়। ডঃ বসুও অনেকবার এ চেষ্টা করেছেন। আমার কাউকে মারার দরকার নেই। আমার স্বামীই দু-জনকে খুন করে দেবে।”
“আপনার স্বামীই তো মার্ডার অ্যাটেম্পট করেছিলেন। ভায়া মাশরুম?” সে খোঁচাল, “মনে নেই আপনার? উনিই তো মাশরুম চাষ করেন।”
“এটা কে বলেছে? ডঃ কৌশিক না? বাজে কথা। ও লোকটাও আমার পেছনে পড়েছিল। কোনো রোগটোগ নেই ওর। সব ফর শো! আমি নিজের চোখে ওঁকে ওয়াকিং স্টিক ছেড়ে রীতিমতো গটগট করে হাঁটতে দেখেছি। উনি ওর প্রেমিকার ওপর রীতিমতো শারীরিক অত্যাচার করতেন ও সেক্সুয়ালি টর্চার করতেও ছাড়তেন না। মেয়েটা তবু টিকে ছিল। শেষপর্যন্ত বছরখানেক আগে ব্রেক আপ করে চলে গিয়ে বেঁচেছে!”
“হো-লি-শি-ট!”
পবিত্র আচার্য বলে ওঠে “এটা কী হচ্ছে অর্ণব? গৃহদাহ না দিওয়ালি?”
“দিওয়ালি!”
“আমরা ছোটোবেলায় দিওয়ালিতে কুকুরের ল্যাজে কালিপটকা বেঁধে ছেড়ে দিতাম না?” পবিত্র আচার্য বলে, “এখানেও রাজা তাই করছে! ওরকম একটা শান্তশিষ্ট ‘সাইলেন্স প্রিজ’ হসপিটালে এইরকম র্যান্ডম ব্লাস্ট হয়ে চলেছে তা কে জানত?”
“সুজাতা জানতেন।” অর্ণবের মুখে দুশ্চিন্তা, “সেজন্যই শেষ পর্যন্ত মারা গেলেন।”
শীলাকে আর বেশি কিছু জিজ্ঞাসা না করে ছেড়ে দিল অধিরাজ। সে মনে মনে বুঝতে পারছিল যে জেনিথের কার্ডিওলজি ডিপার্টমেন্টের অবস্থা যদি এই হয় তবে সেখানে অস্বাভাবিক মৃত্যুর হার বাড়বে বই কমবে না। ডঃ সঞ্জয় বসু এই নমুনাদের নিজের টিমে অ্যাপয়েন্ট করেছেন কেন। উনি কী সত্যিই ফাঁসিকাঠে ঝুলতে চান? জীবনের প্রতি অনাসক্তি? নাকি নিজের কেরিয়ার নিজেই বরবাদ করতে চান…!
সে এবার সবাইকে ছেড়ে স্বয়ং ডঃ বসুকে নিয়েই পড়ল। তিনি আগে যা বলেছিলেন, আজও তাই বললেন। বেশি কথা বলতে তিনি আদৌ ইচ্ছুক নন। সেই একই বাক্য। আগে প্রমাণ করুন। তারপর কথা বলা যাবে। অস্থিরভাবে বেঞ্চের ওপর টকটক করে আঙুল ঠুকতে ঠুকতে বললেন, “জাস্ট লিভ মি। আমি আগেই বলেছি আমিই খুনী। আপনারা প্রমাণ না করতে পারলে আমি কী করব?”
“আপনার ডঃ বড়কিন, তথা জন বড়কিন অ্যাডামসের কোটেশনগুলো খুব প্রিয়। তাই না?”
ডঃ বসুর চোখের পাতা থিরথির করে ওঠে “হ্যাঁ। লোকটার বুকের পাটা ছিল। মুখের ওপর সত্যিটা বলার সাহস রাখতেন। তবে আমার আবার ডঃ হ্যারল্ড শিপম্যানকে বেশি পছন্দ! জিনিয়াস ম্যান।”
কথাগুলো শুনে টুইঙ্কল, কৌশানী, পবিত্র আচার্য এবং অর্ণব আঁতকে ওঠে। এসব কী ভুলভাল বলছে লোকটা। উনি আদৌ জানেন যে কী বলছেন? কাদের প্রশংসা করছেন!
“গট ইট।”
অধিরাজ প্রশ্ন পালটায়, “আপনি কতদিন ধরে জানেন যে ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী আপনাকে ডিচ করছেন? হি ইজ আ ব্যাকস্ট্যাবার!”
এবার অদ্ভুতভঙ্গিতে হেসে ফেললেন তিনি, “আমি তো শুরু থেকেই জানতাম ও এটাই করবে! ওর বাপ যেমন, ছেলেও তো তেমনই হবে। পয়জন আইভির লতায় কখনও গোলাপ ফুটতে দেখেছেন অফিসার? আমি একদম প্রাথমিক পর্যায় থেকেই জানি যে ও বিশ্বাসঘাতক।”
“আপনি ওঁর বাবাকে চেনেন?”
“ওর জন্মের অনেক আগে থেকেই চিনি। বলতে পারেন, হাড়ে হাড়ে চিনি এবং জানি। সেও আনফেইথফুল ছিল। কৌশিকও তাই!”
‘সেইজন্যই উনি মরতে বসেননি তো? নেহাৎ কপালজোরে বেঁচে গেছেন।”
অধিরাজ একটু ঝুঁকে প্রশ্নটা ছুড়ে দিল। ডঃ বসু মৃদু হাসলেন, “আপনার মনে হয় কৌশিক বেঁচে গেছে?”
এবার অবাক হওয়ার পালা অধিরাজের। সে বিস্ময়বিহ্বল কণ্ঠে বলে, “উনি বাঁচেননি?”
“এখন বেঁচে আছে ঠিকই। তবে বেশিদিনের জন্য নয়।” তিনি হাসতে হাসতেই খুব সহজ স্বরে জানান, “কাল সুশান্ত যেখানে শুয়েছিল, ক-দিন পরে কৌশিকও সেখানেই শোবে। সবাইকেই ওখানেই শুতে হয় অফিসার…!”
বলতে বলতেই তিনি অধিরাজের দিকে ঝুঁকে পড়ে ফিশফিশ করে বলেন, “একা ও কেন। সবাই ওখানেই যাবে। ইনফ্যাক্ট আপনিও একদিন ওই ট্রলিতেই শোবেন। ওটাই ফাইনাল ডেস্টিনেশন।”
এই উত্তরের ধাক্কায় কিছুক্ষণের জন্য স্বয়ং অধিরাজও বাকশক্তি হারিয়ে ফেলে। অর্ণবের রক্ত হিম হয়ে যায়। এসব কী উলটোপালটা বলছেন ডঃ বসু…! মাথাটা কী পুরোটাই গিয়েছে!
“স্যা-র।… স্যা-র।”
ওরা প্রত্যেকেই বিস্ময়ের ঘোরে ছিল। কিছু বলার ক্ষমতাও ছিল না। সম্বিত ফিরল আত্রেয়ী দত্তের উত্তেজিত ডাকে। আত্রেয়ীকে আজ ইন্টারোগেশনে রাখেনি অধিরাজ। সে বরং বারোটার পর থেকে জেনিথেই নীরব প্রহরায় ছিল। অর্ণব আর পবিত্র দেখল মিস দত্ত ঘর্মাক্ত কলেবরে উম্মাদের মতো দৌড়তে দৌড়তে এদিকেই আসছে।
“মিস দত্ত।”
অধিরাজ তার অবস্থা দেখে নিজেই দ্রুত ইন্টারোগেশন রুম থেকে শশব্যস্তে বেরিয়ে আসে। উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলল—
“কী হয়েছে?…আপনি এখন এখানে?… আপনার জেনিথে থাকার কথা ছিল না?”
মিস দত্ত কোনোমতে শ্বাস টানতে টানতে বলল, “স্যার, জেনিথে জাস্ট এই মাত্র আরও দু-জন অশীতিপর পেশেন্ট মারা গিয়েছেন। সেম প্যাটার্ন… সেই কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট… সেই একই সিম্পটম!”
অধিরাজ শুনতে পেল ইন্টারোগেশন রুমের ভেতরে তখনও হাসছেন ডঃ সঞ্জয় বসু। হাসতে হাসতেই উম্মত্তের মতো বলছেন—
“সবাই যাবে… কেউ পার পাবে না। … কেউ না!”
