১৮
এবার আর ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার আর সুহাসিনী মিত্ৰকে আলাদা বসানো হয়নি। বরং ইন্টারোগেশন রুমে এঁরা দু-জনেই মুখোমুখি বসে আছেন। যদিও কেউই কারওর সঙ্গে কথা বলছেন না। সেটা অবশ্য অস্বাভাবিকও নয়। কারণ ওঁরা যে একে অপরকে দু-চক্ষে দেখতে পারেন না তা সবাই জানে। ইন্দ্রজিৎ একদিকে তাকিয়ে আছেন, আর সুহাসিনী সম্পূর্ণ উলটোদিকে। যেন অন্যজন আদপেই ওখানে উপস্থিত নেই। একেবারে ভারত-পাকিস্তান অ্যাটিটিউড।
তবে দু-জনের কেউই কিন্তু বিশেষ ভয় পাননি। শুরু থেকেই যথেষ্ট কনফিডেন্ট। সুহাসিনী মাঝেমধ্যেই নিজের শাড়ির ভাঁজ আর চুল হাত দিয়ে নিখুঁত করতে ব্যস্ত। ইন্দ্রজিতের মুখ ভাবলেশহীন হলেও মাঝেমধ্যেই ঘড়ি দেখছেন। যেন তাঁর বিশেষ তাড়া আছে।
ওদিকে অধিরাজের নির্দেশে চাউমিন এখন মলয়া চৌধুরীকে নিয়ে ব্যস্ত। দৃষ্টির নিপাট ভালোমানুষের মতো চেহারা, ছেলেমানুষী লাবণ্যময় মুখ আর পেলব কোমলতা দেখে সবাই তাকে ননীর পুতুল ভাবতে পারে, কিন্তু ইনফর্মার কোনোমতেই ভাববে না। অধিরাজের কাছে যে মুহূর্তে ইন্দ্রজিৎ আর মলয়ার ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্টের রেকর্ড এসে গিয়েছিল সেই মুহূর্তেই তাকে মাঠে নামিয়ে দিয়েছিল সে। বলেছিল,
“বিশেষ কিছু করতে হবে না মিস বন্ড। মলয়া চৌধুরীর মোবাইলের লোকেশন অনুযায়ী উনি এখন ওঁর বাড়ির কাছাকাছি বাজারে আছেন। জেনিথ সিলড। এম এম এন আই কর্তৃপক্ষ আপাতত যতক্ষণ না ডঃ ডেথের কেস ক্লোজ হচ্ছে, ততক্ষণ অবধি ওঁদের টিমকে বসিয়ে দিয়েছে। আর অনেকক্ষণ ধরেই বাইরে আছেন। আশা করছি এখানকার খবর এখনও পাননি। তাই এই সুযোগে বোধহয় আলু, পেঁয়াজ বা শাক-সব্জি কিনছেন। মাছ-মাংসও কিনতে পারেন। আপনি শুধু একখানা বিরাট বাজারের ব্যাগ নিয়ে, নিজের স্পেশাল পাওয়ার ইউজ করে ওঁর সামনে একটি মোক্ষম আছাড় খাবেন। আমাদের সিস্টার মলয়া আবার মাদার টেরেসার মতোই দয়াময়ী। আপনাকে আর কিছু করতে হবে না। যা করার উনিই করবেন। আপনি শুধু পায়ে হাত দিতে গেলেই ‘ওরে বাবা রে, মারে, ঠাকুদ্দাদা রে’ বলে কান্নাকাটি জুড়ে দেবেন। জাস্ট ভদ্রমহিলাকে এতখানি ব্যতিব্যস্ত করে রাখুন যাতে উনি আপনার সেবাতেই লেগে থাকেন। আর একটা কথা…
সে চাউমিনকে মলয়ার পাস্ট হিস্ট্রি এবং মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা বুঝিয়ে বলেছিল। চাউমিন সে কথা শুনে বলল, “এটা ব…বলে ভা… ভালো করেছেন ব….ব…ব….ব…!”
অর্ণব অধৈর্য হয়ে প্রায় খ্যাকখ্যাক করে ওঠে “ব-স! ওটা বস! এই শব্দটা বলার আগে সবসময়ই তুই ‘ডর’ ফিল্মের শাহরুখ খান হয়ে যাস কেন? ক…ক…..ক….ক কিরণ?”
“আরে ব্রো, তুমি বোঝবা না। এসব চাউমিনের ইস্টাইল!”
“দেখেছেন স্যার!” সে খেপে বোম, “ওর যত রাজ্যের তোতলামি আপনার সামনেই শুরু হয়। যখন আমার সঙ্গে কথা বলে, তখন কিন্তু একটুও তোতলায় না।”
অধিরাজ ততক্ষণে আবার অন্যমনস্ক হয়ে কীসব যেন ভাবছিল। এবার প্রায় আঁতকে উঠে বলল, “অ্যাঁ! সে কী। ডর ফিল্মে শাহরুখ খান তো জুহি চাওলার সামনে তোতলাতেন। তুমি কী আমাকে কায়দা করে জুহি চাওলা বলছো!”
“ছা…ছা…ছাড়ুন ব…ব…স! পোলাপান!”
অর্ণব চটে অ্যাটম বম্ব হয়ে প্ল্যান করছিল যে এরপর সে চাউমিনকে স্ট্রেট জলপানই করে নেবে। অর্ণব বয়েসে অধিরাজের থেকেও পাক্কা একবছর দু-সপ্তাহের বড়ো। সে যে বছরের সতেরোই জুলাই জন্মেছে, ঠিক তার পরের বছরের একত্রিশে জুলাইয়ে অধিরাজের জন্ম। প্রোফেশনাল দিক দিয়ে জুনিয়র না হলে তার অধিরাজের ‘দাদা’ হওয়ার কথা। আর এই পাজি মেয়েটা কী না তাকেই ‘পোলাপান’ বানিয়ে দিয়েছে। সে উত্তেজিত হয়ে কিছু বলতেই যাচ্ছিল, তার আগেই হাত তুলে তাকে থামায় অধিরাজ, “হ্যাঁ মিস বন্ড, কী বললেন?”
“বলছিলাম যে এই ইনফোটা কা…কা…”
অর্ণব ফোস ফোস করে বলে, “কাজের।”
“কী করে বোঝলা যে কা… কা… মানে কাজ হইব? কাকতাড়ুয়াও তো হইতে পারত।”
চাউমিনের কথা শুনে দাঁত কিড়মিড় করলেও মুখে কিছু বলল না অর্ণব। রাগে তার মুখ লাল। অধিরাজ কোনোমতে সামাল দেয়, “ওকে…ওকে… মিস বন্ড। আপনি জরুরি তথ্য সব পেয়ে গেছেন। মলয়া চৌধুরীর ছবি আর ওঁর কারেন্ট লোকেশন সব আপনার ফোনে চলে যাবে। যা খুশি তাই করুন। কিন্তু ভদ্রমহিলাকে ডাইনে বায়ে তাকানোর ফুরসত দেবেন না। ওকে?”
“ওকে ব…ব…বস!”
চাউমিনের বুদ্ধি আছে বলতে হবে। এমনিতে সে সাজগোজ করে থাকতে ভালোবাসে। কিন্তু মলয়ার পাস্ট হিস্ট্রি শোনার পর আজ সে এক দুঃস্থ মেয়ের অবতার নিয়েছে, যার বাবা মৃত্যুর দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছেন। দু-বছর ধরে ভেন্টিলেটরে ব্রেনডেড অবস্থায় পড়ে আছেন। একটা বিবর্ণ ছেঁড়া খোঁড়া সালোয়ারে, মলিন ওড়নায়, প্রসাধনহীন ম্লানমুখে সে একেবারে মিসাইলের মতনই আছড়ে পড়েছে মলয়ার নাকের ডগায়। লাস্ট আপডেট পাওয়া অবধি সে সিস্টার মলয়া চৌধুরীর বাড়িতে বসেই কলমি শাক, আলুর দম আর বাটা মাছের সর্বেপোস্ত দিয়ে ভাত সাঁটাচ্ছিল।
“ওইটুকু খাবারে ব্যাটার পেট ভরলে হয়।”
অর্ণব আশঙ্কা প্রকাশ করে, “ও মেয়ে একটা আস্ত রেস্টোর্যান্টই খেয়ে ফেলতে পারে। সামান্য ভাত-মাছ তো নস্যি!”
“খাবারের চেয়ে এখন খবর বেশি ইম্পর্ট্যান্ট অর্ণব।” অধিরাজ ইন্টারোগেশন রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে দুই মক্কেলের হাবভাব দেখছিল আর সিগারেটে চুপচাপ সুখটান মারছিল। এখন কোটার থেকে একটু বেশিই স্মোক করছে সে। অর্ণব আপাতত বাধা দেয়নি। মাথার ওপর এত চাপ থাকলে যে-কোনো স্মোকারের স্মোকিং এর তেষ্টা বেড়ে যায়। কেসটা ভালোয় ভালোয় মিটলে আবার দিনে চারটে স্টিকে তাকে ঠিক নামিয়ে আনা যাবে।
“মিস বন্ড আমাদের পেট ভরালে আমিও ওঁর পেটের যত নেব, কিন্তু দেখা যাক, উনি কতদূর কী বের করতে পারেন।”
“হঠাৎ সিস্টার মলয়াকে সন্দেহ করছেন কেন স্যার? ইন্দ্রজিতের ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্টের ভিত্তিতে?”
“ওটা অবশ্যই একটা বিরাট কারণ। তবে সন্দেহ তখনই হয়েছিল যখন রতনের কেসটায় উনি আগেই এসে আমাদের কাছে চিঠির কথা বলেছিলেন ও চিঠিটা দেখিয়েছিলেন।”
“চিঠি।”
সে সবিস্ময়ে বলে, “সিস্টার মলয়া চৌধুরী যদি নিজেই অপরাধী হন, তবে আমাদের হাতে এভিডেন্স তুলে দেবেন কেন?”
অধিরাজ যথারীতি ধোঁয়ার পারফেক্ট রিং বানাতে বানাতে বলল, “তার কারণ উনি জানতেন যে হসপিটালের এই আকস্মিক মৃত্যুর পেছনে ওঁর কোনো হাত নেই। মহিলা এই কেসে সম্পূর্ণ ক্লিন।”
“তাই যদি হয় তবে ওঁকে সন্দেহের কারণ?”
“প্রথমত ওঁর পাস্ট। মলয়া নিজেই চিকিৎসাব্যবস্থার একটা নিষ্ঠুরতম দিক স্বচক্ষে দেখেছেন। বাবার অসুস্থতা আর তার ট্রিটমেন্টের ভয়াবহ খরচ ওঁদের পথে বসিয়েছিল। উপরন্তু পাওনাদারদের তাগাদায় মা ও চাপ নিতে না পেরে সুইসাইড করেন। একবার ভেবে দ্যাখো, একটা মানুষের রোগ ও চিকিৎসা ব্যবস্থা কীভাবে অন্য একটা মানুষকে অল্পবয়েসেই নি:স্ব আর অনাথ করে দিয়েছিল। কী ট্র্যাজিক পরিণতি! উনি যখন কথাগুলো বলছিলেন তখন ওঁর হাবেভাবেই বোঝা যাচ্ছিল যে ওই ট্রমা থেকে তিনি আজও বেরোতে পারেননি। আর এইরকম কেসের ক্ষেত্রে সহানুভূতিশীল হওয়াই স্বাভাবিক। মলয়া ওই ট্র্যাপে পা দেননি কারণ তিনি রতনের মতো উজবুক নন। জানতেন, যে পেশেন্টের কথা বলা হচ্ছে তিনি ও তাঁর পরিবার, কেউ নি:স্ব হবে না। এই কেসের সমস্ত ভিকটিমরা পয়সাওয়ালাই ছিলেন। চিকিৎসার পেছনে দৌড়ে তাঁদের কারওর সর্বস্বান্ত হওয়ার কথাই নয়। ওপরন্তু প্রত্যেকে রিকভারও করেছিলেন। সেটাও নির্ঘাত জানা ছিল। সেক্ষেত্রে ওঁর প্রথম কাজই ছিল চিঠিটার ব্যাপারে তৎক্ষণাৎ হয় আমাদের ইনফর্ম করা, অথবা জেনিথ কর্তৃপক্ষকে জানানো। যেখানে এরকম একটা অস্বাভাবিক মৃত্যুর লাইন লেগে গেছে এবং তা নিয়ে বাইরেও প্রচণ্ড টেনশন আর জনতা উত্তাল, পুলিসি ইনভেস্টিগেশন চলছে, সেখানে ওঁর রি অ্যাকশন দ্যাখো! উনি স্রেফ তাড়াতাড়ি চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে চুপচাপ বসে রইলেন। ইনফ্যাক্ট যখন ব্যুরোয় ছিলেন তখনও তো জোর করে আমাদের দেখাতে পারতেন। চিঠিটা একটা মারাত্মক এভিডেন্স। উনি কাউকে ইনফর্ম না করে জাস্ট সেটাকে ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকলেন। একবারও মনে হল না, যে ওই কালান্তক চিঠি অন্য কোনো কপালপোড়ার কাছেও পৌঁছোতে পারে এবং সে টোপ গিলতেও পারে? যে সেস্টার ওঁর সঙ্গে ছিলেন তার ইতিহাস, এমনকী রতনের ইতিহাসও জানতেন মায়া। একবারও সন্দেহ হল না যে কেউ এই ট্র্যাপে পা দিতেই পারে? ওঁর উচিত ছিল চিঠিটাকে রেখে দেওয়া ও তখনই কোনো অ্যাকশন নেওয়া। তিনি একাটাও করেননি। ওঁর চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলাই প্রমাণ করে যে ভদ্রমহিলার সাব-কনশাস মন চায়নি যে ওঁর পাস্টহিস্ট্রি কেউ জানুক, বিশেষ করে পুলিস। পৃথিবী গোল্লায় যাক—তিনি সেফসাইডে থাকবেন। প্রশ্ন হল, মহতরমা যদি একদনই ধোয়া তুলসীপাতা হন, তবে এই প্রমাণ লোপাট করার টেন্ডেন্সি কেন?”
অর্ণব তার সঙ্গে সহমত হয়। সত্যিই মলয়ার কাজটা মনে স্ট্রাইক করার মতোই। একজন ডিউটিফুল ও অভিজ্ঞ সেবিকার কাছ থেকে এই ব্যবহার আশা করা যায় না।
অধিরাজ কন্টিনিউ করে, “সেকেন্ডলি, তুমি মিডিয়ার চেঁচামেচি মন দিয়ে শুনেছ?”
“শুনেছি স্যার” অর্ণব একটু বিরক্ত, “ওদের আর কী! ওরা ধোঁয়া দেখলেই আগুন আগুন বলে চিৎকার করে! সেটা উনুনের ধোঁয়া না সিগারেটের তাও দেখে না। ইনস্ট্যান্ট গুলগল্প বানিয়ে ফেলে টি আর পি বানানোর জন্য।”
“রাইট।”
অধিরাজ এবার নিজেই একরাশ ধোঁয়া নাক দিয়ে বের করে বলল, “টি আর পি বাড়ানোর জন্য আগুন আগুন বলে চেঁচায় ঠিকই। কিন্তু এইমাত্রই তুমি বললে, ‘ধোঁয়া দেখে।’ সিগারেটের হোক কী উনুনের, মিডিয়া যখন ‘আগুন’ বলে চেঁচাচ্ছে তখন বুঝতে হবে আশেপাশে কোনোরকম ধোঁয়াও মজুত। ওরা তার ট্রেসই পেয়েছে। আর ওদের মধ্যে একটা থিওরি উঠছিল যে, ইন্দ্রজিৎ সরকার মেডিক্যাল ইললিগ্যাল ড্রাগ র্যাকেটের অংশ। ওঁর মাধ্যমে ইললিগ্যাল ড্রাগ টেস্টিংও চলত। এর মধ্যে মলয়া চৌধুরীও ইনভলভড। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই থিওরিটা এল কী করে? উইদাউট এনি ইনফরমেশন অর এনি লিড মিডিয়া আকাশ থেকে দড়াম করে এই থিওরি নামিয়েছে?” সে মাথা নাড়ে, “উঁহু, মিডিয়া যতই বিরক্তিকর জিনিস হোক, ওদের নেটওয়ার্ক আর গাট ফিলিংসের ওপর আমার সম্পূর্ণ আস্থা আছে। তার ওপর সুহাসিনীও বলেছেন এবং পুলিসের রেকর্ডও বলছে যে এমন কিছু একটা হিস্ট্রি থাকা অসম্ভব নয়। উনি থোড়াই দাতা কর্ণের মতো ওয়ার্ডবয় সুশান্তকে লাখ লাখ টাকা বিতরণ করবেন। এই সুশান্তই সেই ব্যক্তি যে ড্রাগ র্যাকেটে যুক্ত থাকার অপরাধে শ্রীঘরেও থেকেছে। তাকে একজন অ্যানাস্থেসিস্ট এত মাথায় চড়াবেন কেন? আর যদি বা চড়ান তবে তাকে খুন করে ফেলার কারণ কী? লক্ষ্য করো, মিডিয়া মলয়ার নামও নিয়েছে। অন হোয়াট বেসিস? সুশান্তর নাম নিলে বুঝতে পারি, কিন্তু মলয়া সিনে এলেন কেন?”
“ওয়াইল্ড গেস?”
“সম্ভব। কিন্তু সেই ওয়াইল্ড গেসের পেছনে কোনো বেস নিশ্চয়ই আছে। একজন অ্যানাস্থেসিস্টের কাছেই সবরকম ড্রাগ অ্যাভেইলেবল থাকে। ডঃ চ্যাটার্জি একদম শুরুতেই কথাটা বলেছিলেন মনে আছে? তার পক্ষে ড্রাগের ইললিগ্যাল মেডিক্যাল ট্রায়াল দেওয়াও খুব সহজ। কিন্তু একজন ওয়ার্ডবয়কে দিয়ে পুরোটা সম্ভব নয়। আর একজনকে দরকার যিনি অত্যন্ত অভিজ্ঞ, ঠান্ডা মাথার মানুষ, রহস্য লুকিয়ে রাখতে জানেন এবং যাঁর টাকার প্রয়োজন আছে। সবক-টা ক্রাইটেরিয়াতেই মলয়া ফিট করছেন। তিনি শীলার মতো হঠকারী নন। তাই পার্টনার অব ক্রাইম হওয়ার জন্য পারফেক্ট। সবচেয়ে বড়ো ক্রাইটেরিয়া ওঁর নিজের দুর্বিষহ অতীতের অভিজ্ঞতা।”
“এর সঙ্গে মলয়ার পাস্ট হিস্ট্রির কী সম্পর্ক স্যার?”
অর্ণবের কথায় মৃদু হাসল সে, “সচরাচর ইললিগ্যাল মেডিক্যাল ট্রায়ালের জন্য যে পেশেন্টদের দরকার পড়ে, তারা কেউই সুস্থ ও ধনবান হতে পারে না। যে লোকটা ওষুধ বা অন্য ট্রিটমেন্টেই রিকভারী করছে ও ট্রিটমেন্টের খরচ বহন করার ক্ষমতা তার বা তার পরিবারের আছে, তার ওপর কী টেস্ট করবেন ওঁরা? পরিবার যদি টের পায় তবে গণধোলাই দিয়েই মারবে। ডঃ ডেথ যাদের বেছে নিচ্ছে, এরা তাদের আদৌ টার্গেট করবে না। বরং এই জাতীয় ট্রায়ালের জন্য এমন পেশেন্টদের দরকার যারা মরতে চলেছে। হয় কোমায় আছে, নয় মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ধুঁকছে। হসপিটাল ও মেডিক্যাল সায়েন্স জবাব দিয়ে দিয়েছে যে খোদ ভগবান ছাড়া এই পেশেন্টকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। একমাত্র সেই পেশেন্টের ওপরই নতুন, আন-অ্যাপ্রুভড বা ক্লিনিক্যালি নট টেস্টেড ড্রাগের অ্যাপ্লাই হয়। ড্রাগটা কতটা কার্যকরী নয়তো তা বোঝা যায় না। যদি ড্রাগটার মধ্যে কিছু গুণ থাকে, তবে পেশেন্ট কিছুটা হলেও রিকভার করবে। আর না হলে ফৌতই হবে। রিকভার করে কিছুদিন বাঁচলে ভালো। আর পটল তুললেও দুঃখ নেই, কারণ সেটাই হওয়ার কথা ছিল। এক্ষেত্রে পেশেন্টপার্টি যদি শিক্ষিত ও কনসার্নড হয় তবে তারা এটা হতেই দেবে না। কেউ নিজের পরমাত্মীয়কে গিনিপিগ বানাতে চায় না। একমাত্র সেই পেশেন্টপার্টির ক্ষেত্রেই ব্যাপারটা সম্ভব যারা একদমই ‘কালা অক্ষর ভৈস বরাবর’ বা অল্পশিক্ষিত। যারা ট্রিটমেন্টের বিল আর টানতে পারছে না, অলমোস্ট দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। একমাত্র তারাই ডাক্তাররা তাদের ‘হোপলেস’ পেশেন্টকে নিয়ে কী করছে তা নিয়ে মাথাই ঘামাবে না। ওপরন্তু যদি তাদের বলা যায় যে অমুক ডাক্তারবাবু দয়াপরবশ হয়ে পেশেন্টের চিকিৎসা করাবেন ও চিকিৎসার খরচ তিনিই বহন করবেন, তখন পেশেন্টপার্টি হাতে চাঁদ পায়। তারা ডাক্তারবাবু কী করছেন, কী ওষুধ দিচ্ছেন তা নিয়ে বিন্দুমাত্রও মাথা ঘামাবে না কারণ জানে, এমনিতেও পেশেন্টের বাঁচার আশাই নেই! তখন ডাক্তারবাবুই ওদের কাছে ভগবান। তিনি যেখানে যেখানে টিপসই করতে বলবেন, সেখানেই নির্বিবাদে করে দেবে। বুঝতেও পারবে না কীসে থাম্ব ইম্প্রেশন দিল! এখানেই তো আসল ট্যুইস্ট। এইজন্যই ইন্দ্রজিৎ সরকারকে আজ পর্যন্ত ধরা যায়নি, বা কোনো প্রমাণ তাঁর বিরুদ্ধে পাওয়া যায়নি। তবে এসব ক্ষেত্রে ডাক্তারবাবু নিজে অ্যাপ্রোচ করেন না। তিনি দয়াবান হলেও তাঁর গ্র্যাভিটি নেই? সেজন্য একজন মিডিয়াম লাগে। আর এই জাতীয় পরিবারকে বোঝা, তাদের মনস্তত্ত্ব, দু:খ, কষ্টের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া, দুর্বলতাগুলোকে ডিটেক্ট করা মলয়া চৌধুরী ছাড়া আর কে পারবেন? তার ওপর ওঁর ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট! মজার কথা জেনিথ আর এম এম এন আইয়ের সিসিটিভির অবস্থা দেখেছ? পাওয়ার গ্লিচের জ্বালায় আর্থক সময়ই রেকর্ডিং হয় ঝাপসা, নয় ব্ল্যাঙ্ক ফুটেজ। এম এম এন আইয়ের খবর জানি না। কিন্তু জেনিথের সিস্টারদের রেস্টরুম একদম মেইন ইলেক্ট্রিক্যাল রুমের একদম অপোজিটে। যেহেতু ওদিকে সিস্টারদের রেস্টরুম তাই তাদের প্রাইভেসির খাতিরে ওই সাইডে কোনো সিসিটিভি নেই।”
বলতে বলতেই সে হাসে, “অতএব দুয়ে দুয়ে চার।”
কথাটা বলেই আচমকা থেমে গেল অধিরাজ। এই মুহূর্তে তাকে সম্পূর্ণ পাথরের মূর্তি বলে মনে হচ্ছে! সে প্রায় বজ্রাহতের মতো কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে বলল, “তাই তো… তাই তো…”
এই শব্দটা অর্ণবের অত্যন্ত পরিচিত। তার সমস্ত স্নায়ু টান-টান হয়ে যায়। তার মানে এবার সমস্ত জটই বুঝি খুলল।
“স্যার।”
অর্ণব তার কাঁধে হাত রেখে তাকে সচকিত করার চেষ্টা করে, “কী হল?”
অধিরাজ ওর অসাবধানী স্পর্শে ক্ষণিকের জন্য কেঁপে ওঠে। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “অর্ণব… এটা আগে ভাবিনি কেন…?”
“কী ভাবেননি স্যার?”
অধিরাজ এর উত্তরে কিছু বলার আগেই তার মোবাইল শব্দ করে ওঠে। চাউমিনের নম্বর থেকে প্রায় দশ মিনিট দৈর্ঘ্যের একটা ভিডিও ঢুকেছে
“পরে বুঝিয়ে বলব” সে ভিডিওটাকে চালিয়ে দেয়, “আগে এটা দেখা যাক।”
প্রায় দশ মিনিট ধরে দৃষ্টির পাঠানো ভিডিও অধিরাজের ফোনে চলল। দুই অফিসার হাঁ করে গোটা ফুটেজ দেখছে ও ডায়লগ শুনছে। ওটা দেখতে দেখতেই মুগ্ধ ভঙ্গিতে বলল অধিরাজ,
“তোমায় বলেছিলাম না অর্ণব, এই মিস চাউমিন বন্ড যতই আছাড় খান, লম্বা রেসের ঘোড়া। এক্সেলেন্ট।”
অর্ণব চাউমিনের ওপর যতই চটে থাকুক, মনে মনে তার প্রশংসা না করে পারল না। অধিরাজের সত্যিই ঘোড়া বেছে নিতে কোনো ভুল হয়নি। প্রতি মুহূর্তে দৃষ্টি দত্ত ওরফে অধিরাজের চাউমিন বন্ড প্রমাণ করে দিচ্ছে যে সে কতখানি চতুর ইনফর্মার! হয়তো বা পুরুষ খবরিদেরও টেক্কা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে সে।
“স্যার… এ তো…!”
বিস্ময়ে সে কী বলবে ভেবে পায় না। অধিরাজ হাতের সিগারেটটা শেষ করে পাশের ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে বলে, “চলো, এবার দেখি ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার কতখানি নিজেকে ‘কুল’রাখতে পারেন। এইবার ওঁর শ্রীঘর বাস স্বয়ং ভগবানও আটকাতে পারবেন না। আর সুহাসিনীর জন্য মিস অরোরাকে ডেকে নাও। এই মুহূর্তে ওঁকেই প্রয়োজন।”
“ও কে স্যার।”
মুহূর্তের মধ্যেই হুকুম তালিম হল। মিস অরোরা প্রায় হনুমানের মতোই লাফ মেরে এসে প্রকট হয়েছে। হয়তো বুঝেছে যে আজ তার দিন। অধিরাজের হাসি হাসি চোখ তার ওপর ন্যস্ত হল।
“মিস অরোরা, ভেতরে ঢোকার আগেই জানিয়ে দিই….” তার চোখেমুখে দুষ্টু হাসি খেলা করছে, “এই ভদ্রমহিলা কিন্তু নিজের সৌন্দর্য আর হেয়ার স্টাইল নিয়ে খুব অবসেসড। সম্ভবত ওটাই ওঁর দুর্বলতা।”
“আন্ডারস্টুড স্যার।”
আর কথা না বাড়িয়ে জুতোয় খটখট শব্দ তুলে তিনজনই ঢুকে পড়ল ইন্টারোগেশন রুমে। ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার বোধহয় অপেক্ষা করে করে বোর হয়ে গিয়েছিলেন। ওদের দেখে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে পেল্লায় হাই তুললেন। সুহাসিনীর চোখে সতর্কতা। কিন্তু তিনি আপাতত কোনোরকম রি-অ্যাকশন দিলেন না। শুধু হাত দিয়ে একবার চুল ঠিক করে নিলেন।
অধিরাজও নীরবে ওঁদের সামনের চেয়ারটা টেনে নিয়ে গভীর দৃষ্টিতে দু-জনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তার মুখেও কোনো শব্দ নেই। তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে অর্ণব আর মিস অরোরা। অর্ণব চুপচাপই দাঁড়িয়েন্সি। কিন্তু টাঙ্গ হাতা গোটাতে ব্যস্ত। হাতের ওপর থেকে পার্ট কিছুটা সরাডেক্ট তার দারা সিং মার্কা ডাম্বেল-ভাঁজা মাসলগুলো যেন ঘুম ভেঙে উঠে উকি মারতে শুরু করেছে।
আবার বেশ কিছুক্ষণ সেই অসহ্যকর নীরবতা। উপস্থিত সকলেই যেন স্ট্যাচু স্ট্যাচু খেলছে। শুধু সুহাসিনী একবার ভয়ে ভয়ে টুইঙ্কলের মাসলগুলো দেখে নিলেন। একবার যেন চিন্তার ছায়া ওঁর মসৃণ মুখমণ্ডলে পড়ে সরে গেল। তারপর সমস্ত নীরবতা ভেঙে আস্তে আস্তে বললেন,
“কল মাই অ্যাডভোকেট। আমি আমার উকিলকে ছাড়া একটা কথাও বলব না। যথেষ্ট হয়েছে।”
অধিরাজ ঘাড় ঘুরিয়ে মনোরম গ্রীবাভঙ্গিতে টুইঙ্কলের দিকে তাকিয়েছে। শুধু ওইটুকু ইশারাই যথেষ্ট। মিস অরোরা এবার সত্যিই ভীমের গদার ওপর আছড়ে পড়ে সুহাসিনীর ওপর! তাঁর সযত্নলালিত, রেশমী চুল নির্মমের মতো চেপে ধরে হিড়হিড় করে টেনে প্রায় ফেলেই দিয়েছে চেয়ার থেকে। সুহাসিনী কিছু বলার বা অভিব্যক্তি প্রকাশ করার আগেই তাঁর মুখের ওপর ওই ঢাই কিলো হাতের র্যান্ডম থাপ্পড় একের পর এক পড়তে থাকে। মিস অরোরা এলোপাথাড়ি চড় মারতে মারতে বলল, “ক্যায়া বোলেগি শা–লি? স্যার নে কুছ পুছা হ্যায়?…কুছ পুছা হ্যায় তেরে কো…?…কুছ বোলনে কী জরুরত যব হ্যায় হি নেহি তব বোলেগি ক্যায়া?”
এরকম আকস্মিক আক্রমণ সুহাসিনী আশাই করেননি। তিনি কী করবেন, কীভাবে এই ভয়ংকর রণচণ্ডীর হাত থেকে রক্ষা পাবেন বুঝতে পারছিলেন না। টুইঙ্কল তাঁর স্টাইলিশ চুলের গোড়া ধরে এমন টান মারল যে মহিলা প্রায় কঁকিয়েই ওঠেন। বেশ কিছুটা চুলও উপড়ে উঠে এল তার হাতে। কিন্তু মিস অরোরা ফের একটা থাপ্পড় কষিয়ে দিয়ে বলে,
“চুপ থাক শালি। নিজেই তো বলেছিস যে যতক্ষণ না ‘ওকিলসাব’ আসছে ততক্ষণ কিছু বলবি না। তাহলে বলছিস কেন? তোর বলার সময় আসেনি। এখন আমি বলব। আর তার জন্য কোনো ‘ওকিল-কোকিলের’ জরুরতই নেই।”
বলতে বলতেই সে সুহাসিনীর ঠ্যাং ধরে তাঁকে পুরো উলটো করে ঝুলিয়ে দিয়েছে। অমন সুন্দর শাড়ির পুরো দফারফা। রীতিমতো ফড়ফড় করে কোমরের কাছটা ছিঁড়ে গেল। তবে শালীনতার দিকে টুইঙ্কলের পুরো নজর আছে। সে এমনভাবে শাড়িসুদ্ধই তাঁর পা চেপে ধরেছে যাতে শাড়িটা মাথার দিকে নেমে না আসে বা খুলে না যায়। ভয়ে, যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে বললেন তিনি, “আপনারা…আপনারা এটা করতে পারেন না…। ইটস গ্রুসাম টর্চার।…আমি আপনাদের এগেনস্টে কোর্টে যাব…”
“কেন?” এবার অধিরাজ ভীষ। নিস্পৃহ আর শান্ত স্বরে বলল, “আমরা তো আপনার কথা শুনেই চলছি। আপনি বলেছেন অ্যাডভোকেট না আসা অবধি মুখ খুলবেন না। আমরা কী তার এগেনস্টে একটা কথাও বলেছি? কোনো প্রশ্ন করেছি আপনাকে? করেছি কী অর্ণব?”
পেছনে দাঁড়িয়ে অর্ণবও এবার হাতা গোটাচ্ছিল। সে ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকারকে প্রায় খুনীর দৃষ্টিতে দেখে নেয়, “আমরা তো কোনো কথাই বলিনি।”
“তবে এটা কী?”
ইন্দ্রজিৎ সুহাসিনীর করুণ অবস্থা দেখে ব্যোমকে গিয়েছেন। এবার ওঁর নিস্পৃহ মুখে ভয় আর রাগ, দুটোই দেখা গেল। অফেন্স ইজ অলওয়েজ দ্য বেস্ট ডিফেন্স। তিনি ক্রুদ্ধস্বরে বললেন, “তাই বলে একজন মহিলাকে এইভাবে মারবেন। এটা বে-আইনি।”
অধিরাজ নমনীয় ভঙ্গিতে অলস আড়মোড়া ভাঙছে, “ডঃ সরকার, বিলিভ মি, এখানে কোনো আইনই ভাঙা হচ্ছে না। মিস অর মিসেস মিত্র বা বিশ্বাসকে যিনি অল্পবিস্তর আদর করছেন তিনি একজন লেডি অফিসার। আমরা তো কেউ কথাই বলছি না। ইনফ্যাক্ট কথা বলার প্রয়োজনই নেই। বলবও না, শুনবও না। মিস অরোরার হাত অবশ্য সবে হাই তুলছে। তবে কথা এখনও বলেনি। যখন বলবে, তখন আইন ভাঙবে কী না জানি না, তবে হাড়গোড় ভাঙার প্রবল সম্ভাবনা! এইটুকু অ্যাশিওর করতে পারি, ওঁর গায়ে একটা আঁচড়ও পড়বে না। কীভাবে মারলে দাঁতের পাটি খুলে গেলেও গালে কালশিটে বা অন্য কোনো ছাপ পড়ে না, বা সাময়িক পড়লেও মিলিয়ে যায় তা মিস অরোরা খুব ভালোভাবেই জানেন। সো টেক আ চিল পিল।”
“এটা কী তবে?”
ভয়ার্ত ইন্দ্ৰজিৎ প্রায় চেঁচিয়ে ওঠেন, “এ তো থার্ড ডিগ্রি। আপনারা একজন মহিলাকে উলটো করে ঝুলিয়ে রেখেছেন…. ইটস… ইটস…।”
“থার্ড ডিগ্রি কই?” অধিরাজের নম্র প্রতিবাদ, “একটু ‘যোগা’ই তো শেখাচ্ছেন মিস অরোরা। আপনারা ডাক্তাররা তো ভালোভাবেই জানেন যে যোগাসন শরীরের জন্য কতখানি উপকারী। পুলিস বলে কী সমাজসেবাও করব না?”
আর কোনো শব্দই বোধহয় খুঁজে পেলেন না ভদ্রলোক। টুইঙ্কল এবার বাদুড়ের মতো ঝুলন্ত সুহাসিনীর হাতে ফোন ধরিয়ে দিয়ে বলল, “লে, ফোন কর কোন বাপকে করবি। যতক্ষণ না ও পাবলিক এসে পৌঁছয় ততক্ষণ তোকে উলটা লটকেই রাখব।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ… শিওর মিস অরোরা” অধিরাজ গভীর ___ স্বরেই বলে, “প্লিজ ক্যারি অন। আমার মনে হয় না ওঁর তাতে কোনো অসুবিধে হবে। উনি অত্যন্ত ফিগার ও সৌন্দর্য কনশাস। যৌবন ধরে রাখতে হলে শীর্ষাসন করা খুব প্রয়োজন। বাবা রামদেব আর শিল্পা শেঠিকে দেখেননি? নো প্রবলেম, গো অ্যাহেড।”
ওইরকম উলটো অবস্থায় কেউ কাউকে ফোন করতে পারে। সুহাসিনী একবার চেষ্টা করতেই তাঁর পা ধরে এক জোরদার ঝাঁকুনি মারল মিস অরোরা। সঙ্গে সঙ্গেই হাত থেকে সেলফোনটা ফস্কে পড়ে গিয়েছে মাটিতে। অধিরাজ শুধু বলল, “উপপপস।”
“এখানে একজন মহিলাকে টর্চার করা হচ্ছে আর আপনি মজা দেখছেন।”
ইন্দ্রজিৎ গর্জন করে ওঠেন, “দেখে নেবো… ওঁকে ফোন করতে দেবেন না তো? আমিই করছি।”
“প্লিজ, প্রসিড…।”
নম্রস্বরে বলল অধিরাজ। তার মুখ গম্ভীর। কিন্তু চোখে হাসি খেলা করছে। এই দুই নির্বোধ পুরো কনফিডেন্ট ছিল যে ওপরমহল তাদের ফোন করে বাঁচিয়ে নেবে। তাই অ্যারেস্ট হওয়ার মুহূর্তেই উকিলকে ফোনটাও করেনি। ওরা এটাও জানে না যে কয়েক সেকেন্ড আগেই ব্যুরোর বাইরে শক্তিশালী জ্যামার অন হয়ে গিয়েছে। অর্ণবের মিস অরোরাকে ফোন করে ডেকে নেওয়া মাত্রই পবিত্র আচার্য জ্যামার অন করে দিয়ে বসে আছে। এখন শত চেষ্টাতেও বাইরে ফোন যাবে না। এমনকী যে উকিল ওঁদের ছাড়াতে এসেছিলেন তিনি এখনও মিস বোস আর মিস দত্তের পাল্লায় পড়ে ঘেঁটে আছেন। একজন ‘অফ ডিউটি’ বলে কেটে পড়েছেন। অন্যজন ফোনে কোনো কাল্পনিক জজসাহেবের সঙ্গে সেই যে কথা বলা শুরু করেছেন, সে বাক্যালাপ আর শেষ হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের জাস্টিসের ফোন তো কাটা যায় না। আদালত অবমাননায় কে ফাঁসতে চায়? উকিল সাহেব বহুক্ষণ অপেক্ষা করে শেষে বেগতিক দেখে এডিজি সেনের কাছে দৌড়েছেন। কিন্তু এডিজি সেনও ওদের কাউকে ফোনে পাচ্ছেন না। কিছুক্ষণ পর হয়তো সশরীরেই এসে হাজির হবেন। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ নেই। তিনি নিজেও জানেন যে অধিরাজ আইনের ফাঁকগুলো দিয়ে প্রয়োজনে চমৎকার গলে যেতে পারে। আর জেদের নমুনা তো আগেই দেখেছেন।
মিস অরোরার থাবায় ঝুলন্ত সুহাসিনী চেঁচিয়ে, কেঁদে কেটে অস্থির হচ্ছেন দেখে অধিরাজ সহৃদয় স্বরে বলে, “ওঁর বোধহয় শীর্ষাসন পছন্দ হচ্ছে না সেনোরিটা। অন্য কোনো পশ্চার ট্রাই করবেন?”
‘জরুর।”
এবার তাঁকে মেঝের ওপর আছড়ে ফেলতেই সুহাসিনী নিজের দুটো হাতে ভর দিয়ে ওঠার চেষ্টা করেন। কিন্তু টুইঙ্কল কিন্তু ওঁর পা তখনও ছাড়েনি। যেই তিনি হাতের ওপর ভর দিয়েছেন, সেই মুহূর্তেই পা-দুটোকে সে ওপরে তুলে এমনভাবে বেঁকিয়ে দিয়েছে যাতে গোটা শরীরটাই ধনুকের মতো বেঁকে গেল। সুহাসিনী যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠলেন। বেচারি হাতও সরাতে পারছেন না কারণ হাতের সাপোর্ট সরে গেলেই পুরো মাথামুখ সুদ্ধ নীচে আছড়ে পড়বেন। ঘাড়ের হাড় যদি বেঁচেও যায়, তবু দাঁত ভাঙা অবধারিত। ওদিকে টুইঙ্কল তাঁর পুরো দেহটাকে এমন ‘ইনভার্টেড কমা’র মতো বেঁকিয়ে বসে আছে।
“এসব… কী!”
ডঃ সরকারের হাত থেকে ফোনটা প্রায় খসে পড়ব পড়ব করছে। বলাই বাহুল্য আপ্রাণ চেষ্টা করেও তিনি লাইন পাননি। কোনোমতে বললেন, “এটা কী করছেন?”
“ইয়ে….” অধিরাজ মাথা চুলকে বলল, “এটা অৰ্ধ বৃশ্চিকাসন। হাত, কাঁধ, ঘাড়ের মাসলের জোর আর স্পাইনাল ফ্রেক্সিবিলিটির জন্য পারফেক্ট। আমি তো রোজই করি। তবে আমার মনে হয় পূর্ণ বৃশ্চিকাসনটা বেস্ট। মিস অরোরা… পা-দুটো মাথায় ঠেকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন নাকি একবার?”
“ইয়েস স্যার।”
তার আসুরিক বল প্রয়োগে সুহাসিনীর দেহটা এখন একদম বৃশ্চিকের মতোই বেঁকে গিয়েছে। হাত সরালেই পড়ে মেরুদণ্ড ভাঙবে। ওদিকে যন্ত্রণায় তলপেট, পিঠ, কাঁধ আর পায়ের পেশী ফেটে যাচ্ছে। তার ওপর টুইঙ্কল প্রচণ্ড প্রেশার দিয়েও ওঁর পা দুটো মাথার সঙ্গে লাগাতে না পেরে এবার ফ্রাস্ট্রেটেড হয়ে ফের মাথার চুল খামচে ধরে মুণ্ডুটাকে টেনে ওপরে লিফট করার চেষ্টা করছে। যাতে পা-দুটো মাথা স্পর্শ করে। সুহাসিনীর মনে হল আজ তাঁর সমস্ত চুল এই মেয়েটাই গোড়াসুদ্ধ উপড়ে ফেলবে। অথবা টানের চোটে মাথাটাই না ধড় থেকে আলাদা হয়ে যায়। তিনি কাতরে ওঠেন, “ছেড়ে দিন… প্লিজ, ছেড়ে দিন।…আপনি যা জানতে চাইবেন বলব… প্লিজ…!”
“আমাদের কিছু জানারই নেই তো কী প্রশ্ন করব?” সে ঘটঘট করে মুণ্ডুটাকে দু-পাশে নাড়ায়, “যা জানার সব জানা হয়ে গেছে। আপনি বরং আপনার উকিল আসা অবধি একটু যোগাসনের ট্রেনিংই নিন। সৌন্দর্য আর যৌবন ধরে রাখতে হবে না?”
সুহাসিনী আর্তনাদ করে ফেঁসে ওঠেন, “আমি যোগা করতে চাই না… ব্যথায় মরে যাচ্ছি… প্লিজ, ছেড়ে দিন… সাইটি আপনার…।”
“মরে যাবেন বলছেন? কিন্তু শবাসন তো একদম লাস্টে ছিল।”
সে টুইঙ্কলের দিকে তাকায়, “কী করণীয় মিস অরোরা?”
মিস অরোরা দড়াম করে তাঁকে উলটে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলল, “পোপটরানির মতো বলতে থাকলে ভালো। নরতো এরপর স্যার জিমন্যাস্টিকস বা অ্যাক্রোব্যাটিক্স শিখিয়ে দেব। এমনিতেই সালা ওলিম্পিকে মেডেল আসছে না।”
বলতে বলতেই সে সবলে ফের চুল ধরে টেনে তুলেছে সুহাসিনীকে। আজ মহিলার অর্ধেক চুলই মায়ের ভোগে গেল!
“আপনিও একবার ট্রাই করবেন নাকি ডঃ সরকার? মিস অরোরার দুঃখ যে জিমন্যাস্টিকে গোল্ড মেডেল আসছে না। অর্ণব কিন্তু এ বিষয়ে স্পেশালিষ্ট। অনেককে প্রোদুনোভা ভল্টও শিখিয়ে ছেড়েছে!”
ইন্দ্ৰজিৎ প্রায় লাফিয়ে ওঠেন, “অফিসার…
আমার কোনো ট্রেনিঙের দরকার নেই। আগে জিজ্ঞাসাবাদ করে তো দেখুন যে কো-অপারেট করছি কী না! তারপর না হয়…”
“হ্যাঁ। তারপর না হয় ট্রাই করা যাবে। ট্রেনিংয়ের লাস্ট পশ্চার কিন্তু শবাসন।”
সে ইন্দ্রজিতের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিশফিশ করে বলল, “ফর ইওর কাইন্ড ইনফরমেশন, একা ডাক্তাররাই জানে না যে কীভাবে খুনের পর প্রমাণ লোপাট করতে হয়, পুলিসও জানে। আপনারা যেমন পারফেক্ট ক্রাইম করতে পারেন, তেমন আমরাও পারি। মাইন্ড ইট।”
কোনোমতে মাথা ঝাঁকালেন ইন্দ্রজিৎ। অর্থাৎ কথাটা তাঁর মনে থাকবে। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, “জ–ল!”
“ফর দ্য ডায়েটিশিয়ান টু,” অধিরাজের দৃঢ় নির্দেশ, “নয়তো উনি যা ঘামছেন তাতে ডিহাইড্রেশন অবধারিত। ওঁর বোলতি বন্ধ। তাই আমিই প্রেসক্রাইব করে দিলাম।”
মিস অরোরা আর অর্ণব সঙ্গে সঙ্গেই জলের গ্লাস এনে দিল। দুই মক্কেলই এমনভাবে জল খেলেন যেন এরপর গোটা পশ্চিমবঙ্গেই খরা আসতে চলেছে।
এবার ধীরে সুস্থে বিশ্বর দেওয়া কল লোকেশনের প্রিন্ট আউটের কপি দু-জনের দিকেই এগিয়ে দিল অধিরাজ।
“ডঃ সুজাতা রায়ের মৃত্যুর সময়ে এবং পরে আপনারা দু-জনেই মার্ডারস্পটে উপস্থিত ছিলেন। এর কোনো এক্সপ্ল্যানেশন আছে?”
এবার দু-জনেরই মুখ খুলে গেল। সুহাসিনী মিত্র হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন, “আমরা ওর কোনো ক্ষতি করতে যাইনি। বরং সুজাতাই আমাদের মেসেজ করে ডেকেছিল ওখানে যাওয়ার জন্য। ও বলেছিল, ডঃ ডেথ কেসের খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু এভিডেন্স ও পেয়েছে যা ডঃ বসুকে জেলে পোরার জন্য যথেষ্ট।”
“সেজন্যই আপনারা দৌড়ে চলে গেলেন? শুধু এভিডেন্স দেখার জন্য?”
ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার মাথা নাড়েন, “না। আমি ওকে বুঝিয়ো সুঝিয়ে থামানোর জন্য গিয়েছিলাম। ও যেভাবে উঠে পড়ে লেগেছিল তাতে আমাদের সবার ক্ষতি হত অফিসার।”
সুহাসিনী মিত্র জীবনে এই প্রথম বোধহয় ইন্দ্ৰজিৎকে সাপোর্ট করেন, “উনি ঠিকই বলেছেন। আমরা দু-জনেই একসঙ্গে পৌঁছেছিলাম। তবে সময়ের একটু আগেই পৌঁছে গিয়েছিলাম বলে কিছুক্ষণ ওয়েট করি। মাঝখানে একবার ওকে মেসেজ করে জানতেও চাই যে যাব কী না। সুজাতা বলল, ঘণ্টাখানেক পরে আসুন। তাই ঘণ্টাখানেক পরেই গিয়েছিলাম। দরজা খোলাই ছিল। কিন্তু ভেতরে অন্ধকার থাকার জন্য ওকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। শেষে বেডরুমে গিয়ে দেখি…”
“ওর বডিটা ঝুলছে।”
ইন্দ্রজিৎ সরকার সতর্কভাবে বললেন, “কিন্তু আমরা ওকে মারিনি। বিশ্বাস করুন। ডঃ বসুর কেরিয়ার শেষ হলে আমাদেরও কেরিয়ার শেষ হয়ে যেত। আমরা শুধু সুজাতাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে থামাতে চেয়েছিলাম।”
“আর তিনি থামলেনও।” ওর দৃষ্টি সুহাসিনীর দিকে ঘোরে, “যদি আপনারা কিছুই না করে থাকেন তবে ক্রাইমসিন ক্লিন করার মানে কী! আপনারা জানেন না যে মার্ডারস্পটে ওরকমভাবে এভিডেন্স ট্যাম্পার করা যায় না। ওটা ক্রাইমসিন, আপনার ক্লিনিক নয় যে ঝকঝকে তকতকে পরিষ্কার করে রাখবেন!”
সুহাসিনী একবারের জন্য কেঁপে উঠলেন। হয়তো প্রতিবাদও করতে যাচ্ছিলেন। তার আগেই ওঁকে বাধা দিল সে,
“উঁহু…উঁহু..! ভুলেও অস্বীকার করার চেষ্টা করবেন না বা ডঃ সরকারের ঘাড়ে দোষ চাপাবেন না। একটা মেয়ের ঘর কীভাবে পারফেক্টলি সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতে হয় তা শুধু আর একটা মেয়েই জানতে পারে। আর অকুস্থলে সেদিন একজন মহিলাই উপস্থিত ছিলেন। আপনি। আর আপনার সাজানো গোছানো এবং ডেকোরেশনের স্কিল–মাশাল্লাহ। সবসময়ই ক্লিন, ক্লিয়ার আর টিপটপ। ওরকম পারফেক্ট ডেকোরেশন আর ক্লিনিং সেন্স মেয়েদের মধ্যেও খুব কমই থাকে, ছেলেদের তো ছাড়ুন।”
অধিরাজ একটি বিরতি দিয়ে বলে, “প্রথমদিনই আপনার ক্লিনিকের সৌন্দর্য দেখে এতটাই ইমপ্রেসড হয়ে গিয়েছিলাম যে ঝাঁ চকচকে ওয়েল ডেকোরেটেড ক্রাইমসিন দেখে প্রথমেই আপনার মুখটাই মনে পড়েছিল। এত সুন্দর ক্রাইমসিন আমি বাপের জন্মেও দেখিনি। তখনই রোভিমান এটা কার কীর্তি। কিন্তু কিছু করতে পারিনি। কারণ হাতে প্রাণ ছিল না। এখন আছে। কাইন্ডসি ক্রাইমসিনের সাজসজ্জার কারণটা বলবেন কী?”
“আর কী করতাম?” সুহাসিনী আধোবদন হয়ে বললেন, “আমরা প্রথমে অন্ধকারে এদিক ওদিক ঘুরেছি। যার ফাঙ্গা আমাদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট আর ফুটপ্রিন্ট, অন্যান্য এভিডেন্স, পার্সপিরেশন, হেয়ার স্যাম্পলও থাকতে পারত যার জন্য ফরেনসিক আমাদের ধরে ফেলতে পারত। আমরা আগেই লাশ দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। উপরন্তু করেনসিক টিম আমাদের দু-জনকে প্রমাণসমেত ধরবে এটা ভেবেই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম অফিসার।”
“তাই ক্রাইমসিন পুরো সাফা করে দিলেন।” অধিরাজের মাথা এবার ইন্দ্রজিতের দিকে ঘুরে যায়, “সঙ্গে সুশান্তকেও! কেয়া বাত!”
“বা-জে ক-থা! কে বলেছে?”
অধিরাজের হাসিটা তরোয়ালের মতো নিষ্ঠুর ও তীক্ষ্ণ, “আপনাদের হসপিটালের সিসিটিভি ফুটেজ।”
এবার গোটা ফুটেজটাই মোবাইলে ওঁর নাকের সামনে ধরে দেখায় অধিরাজ। ইন্দ্রজিৎ প্রথমে অস্বীকার করার চেষ্টা করতেই ডঃ কৌশিক চক্রবর্তীর বডি ডাবলের ট্রিকস জুতো-দুটো সমেত বুঝিয়ে দিয়ে বলল, “আমার দৃঢ় বিশ্বাস ওই সাদাকোট আপনার কেবিনেই আছে। আর ডঃ চক্রবর্তীকে জিজ্ঞেস করলেই উনি বলবেন যে সম্প্রতি একটি ওয়াকিং স্টিক ওঁকে আপনি প্রেজেন্ট করেছেন। আমাদের ফরেনসিক টিম হয়তো একটু চেষ্টা করলে তার থেকে সুশান্তর ডি এন এ স্যাম্পলও পেয়ে যেতে পারে। কেন টাইম ওয়েস্ট করছেন ডঃ সরকার। এভাবে প্রত্যেকবার গাছে ওঠা দরকার?”
ইন্দ্রজিৎ দরদর করে ঘামছিলেন। এবার মরিয়া হয়ে একটু জোরেই বলে উঠলেন, “আর কী করতাম? সুশান্ত আমাদের মার্ডার স্পটে দেখে ফেলেছিল। আমি বোকার মতো সুজাতার লাশের কাছেই দাঁড়িয়েছিলাম। আর সুহাসিনী তখন পুরো ক্রাইমসিন ক্লিন করতে ব্যস্ত ছিল। ওই পরিস্থিতিতেই ভগবান জানে কোথা থেকে সুশান্ত এসে পড়েছিল ওখানে। ও আমাদের দু-জনকেই দেখে ফেলেছিল। এমনকী মার্ডারার ভেবেও বসেছিল। যতবার ওকে বুঝিয়েছি যে আমরা অ্যাক্সিডেন্টালি পৌঁছে গিয়েছিলাম, ও কিছুতেই মানবে না। শেষে তো ব্ল্যাকমেইলিং চালু করে দিল যে যদি ওকে আশি লাখ টাকা না দিই, তবে ও আপনাদের বলে দেবে যে আমিই সুজাতাকে মেরে ঝুলিয়েছি। আর সুহাসিনী গোটা ক্রাইমসিন ক্লিন করেছে।”
ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকারের চোখ জ্বলে ওঠে, “এক নম্বরের বেইমান! কম করেছি আমি ওর জন্য? তারপরও শালার চাহিদা বেড়েই যাচ্ছিল। আমাকে আর সুহাসিনীকে ব্ল্যাকমেইল করেই যাচ্ছিল। আমরা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তাই…”
“সুশান্তকেও সাফা করে দিলেন। তাও আবার অ্যালকোহলের সঙ্গে ক্রিস্টাল মেথের কম্বিনেশন দিয়ে! এটা কার বুদ্ধি? আপনার? না সুহাসিনীর পার্টনারশিপও আছে?”
ডঃ সরকার হাত দিয়ে কপালের ঘাম মুছছেন, “ক্রিস্টাল মেথের বুদ্ধিটা আমারই ছিল। কিন্তু কীভাবে গেলাব বুঝতে পারছিলাম না। সুহাসিনীই বুদ্ধি দিল মদের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে। আগেও বলেছি, মদ আর মেয়ের দোষ ওর চিরকালই ছিল। তার ওপর সিফিলিস শরীরটাকে ঝাঁঝরা করে দেওয়ার জন্য ওই কম্বিনেশন ও নিতে পারত না।”
অধিরাজ মুচকি হাসল, “ইউ নো স্যার, আমাদের ফরেনসিক এক্সপার্ট পর্যন্ত আপনার অলৌকিক ক্ষমতা দেখে হিংসে করছিলেন যে উইদাউট এনি ল্যাব টেস্টিং অর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট আপনি সুশান্তর লাস্ট ফাইভ মিনিটসের অমন নিখুঁত বর্ণনা দিলেন কী করে। শুরু থেকেই ওঁর অদ্ভুত একটা সন্দেহ ছিল আপনার ওপর। এখন দেখছি, ডককে সত্যিই দীপিকা পাড়ুকোণের লেটেস্ট ফিল্ম বা মিস ইয়ের নতুন থ্রিলারটা গিফট করতেই হবে। ওঁর ডিডাকশন একদম সঠিক ছিল। ওভারকনফিডেন্ট হয়ে ওইটাই চরম ভুল করেছেন আপনি। এবার এটাও স্বীকার করুন যে ইউ আর দ্য সো কলড ডঃ ডেথ। রাইট না?”
“না… না।”
ইন্দ্ৰজিৎ প্রায় আর্তনাদ করে ওঠেন, “আমি ওঁদের কাউকে মারিনি… আমি শুধু সুশান্তকেই…”
অধিরাজের ভুরু সন্দেহে বেঁকে যায়, “ইললিগ্যাল মেডিক্যাল ড্রাগের ট্রায়ালের দরুণও একজনকে মারেননি বলছেন?”
“ইললিগ্যাল মেডিক্যাল ট্রায়াল।”
ভদ্রলোক বিস্ময়ে, আতঙ্কে কথাই খুঁজে পাচ্ছেন না। যেন ওঁর মাথায় গোটা ব্রহ্মাণ্ডই ভেঙে পড়েছে।
“আপনারা কথায় কথায় প্রমাণ চান।”
সে জানায়, “কিন্তু এবার আমাদের হাতে সলিড প্রমাণ আছে। নিন, চক্ষুকর্ণের বিবাদভঞ্জন করুন।”
বলতে বলতেই অধিরাজ চাউমিনের পাঠানো ভিডিও ফুটেজটা চালিয়ে দিয়েছে। সেখানে চাউমিন, তথা বেচারি গরীব মেয়েটি হাউহাউ করে মলয়ার সামনে কাঁদছে আর বলছে, “আমাদের গলায় দড়ি দেওয়া ছাড়া আর উপায় নেই! বাবাকে বাঁচানো যাবে না। তার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বাড়িটাও চলে যাবে… ব্যাঙ্ক নিলামে তুলে দেবে… আমরা কোথায় যাব?”
উলটোদিকে মলয়ার ছবি একদম স্পষ্ট। তিনি বেচারি ক্রন্দনরতা মেয়েটির কাঁধে হাত রেখেছেন। সহৃদয় কণ্ঠে বললেন, “তোর কষ্ট আমি বুঝতে পারি মা। এই পেশেন্টরাও বড্ড স্বার্থপর হয়। নিজেদের প্রাণের জন্য ফ্যামিলিকেও বরবাদ করে ছাড়ে…।”
“এখন তো আমাদের কেউ ধারও দেয় না,” চাউমিনের কান্নাজড়ানো গলা শোনা যায়, “সবাই বলে, আগের টাকা শোধ করো। সব জায়গায় ধার। বাবার সমস্ত বন্ধু বান্ধব, আমাদের আত্মীয় স্বজন, এমনকি মুদির দোকান, সব্জিওয়ালার দোকানেও! দু-বেলা, দু-মুঠোও জোটে না। বাবার চিকিৎসা করাব কী করে?”
মুহূর্তের জন্য মলয়ার চোখ জ্বলে ওঠে। তারপর তিনি শান্তস্বরে বললেন, “কোন হসপিটালে ভরতি আছেন তোর বাবা?”
চাউমিন একটা কাল্পনিক মফস্বলের হসপিটালের নাম করে। মলয়া তাকে সহানুভূতিমাখা স্বরে বোঝান, “দ্যাখ, তোর প্রবলেম আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু ওই হসপিটালে রাখলে শুধু বিলই বাড়বে। কাজের কাজ কিছু হবে না। ওই হসপিটালে সব ফেসিলিটিও নেই। আমি যা বলছি তা যদি করতে পারিস, তবে হয়তো তোর বাবা বাঁচতেও পারেন।”
চাউমিন কাঁদতে কাঁদতেই জানতে চায়, “কীভাবে দিদি?”
“জেনিথ হসপিটালের নাম শুনেছিস?” মলয়া বললেন, “ওখানে ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার আছেন। সাক্ষাৎ ধন্বন্তরি। পারলে উনিই তোদের বাঁচাতে পারেন। এখন অনেক নতুন নতুন আর অ্যাডভান্সড মেডিসিন বেরিয়েছে। উনি সেগুলো : ফ্রিতেই দিয়ে থাকেন। তার ওপর তোদের একপয়সাও খরচ করতে হবে না। সব দায়িত্ব ডঃ সরকারের। বরং উনিই এত ভালো মানুষ যে পেশেন্টের পরিবারকেও টাকা পয়সা দিয়ে হেল্প করেন।”
চাউমিন চোখ মুছে অবিশ্বাস, বিস্ময় আর আশার মিশ্রণ দু-চোখে নিয়ে তাকায়, “সত্যি।”
“একদম সত্যি।”
মলয়া এরপর তাকে সবকিছু খুলে বললেন। নিজের অতীতের কথাও গোপন করলেন না। স্বাভাবিকভাবেই চাউমিন অনেকটাই সহজ হল। তার হাবভাবেই স্পষ্ট যে সে মলয়াকে বিশ্বাস করছে।
এরপর মলয়া আস্তে আস্তে তার ব্রেনওয়াশ শুরু করলেন। তিনি জানান যে এম এম এন আই আর জেনিথে এই বিশেষ সুবিধা পাওয়া যায়। ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার নিজেই কোমাটোস বা মৃত্যুপথযাত্রী রোগীদের নতুন ওষুধ দিয়ে ঠিক করে তোলেন। সবসময়ই অবশ্য সাকসেসফুল হন না। কিন্তু বেশ কিছু ক্ষেত্রে রোগীকে আরও কিছুদিন বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। এই নতুন আর অ্যাডভান্সড মেডিসিন যদি কাজ করে তবে চাউমিনের বাবা বেঁচেও যেতে পারেন। সবচেয়ে বড়ো কথা, তাঁর চিকিৎসার জন্য এক টাকাও আর খরচ করার দরকার নেই। তেমন হলে ডঃ সরকার অর্থসাহায্য করবেন। কপাল ভালো থাকলে চাউমিন চাকরিও পেতে পারে। এর জন্য শুধু তাকে কয়েকটা পেপার সই করতে হবে। আর কিছু লাগবে না।
প্রথমদিকে কিন্তু কিন্তু করলেও শেষ পর্যন্ত তিনি নানারকম লোভ আর টোপের মাধ্যমে চাউমিনকে কনভিন্স করেই ছাড়লেন। ভিডিও এখানেই শেষ।
“এটা একদম ‘র’ ফুটেজ। কোনো এডিটিং নেই। আপনার কিছু বলার আছে?”
ইন্দ্রজিৎ বুঝলেন যে আর রক্ষা নেই। এবার চূড়ান্ত ফাঁসা ফেঁসেছেন। অগত্যা উপায়ান্তর না দেখে সবই স্বীকার করে নিলেন। হ্যাঁ, তিনি দুই হসপিটালে আনএথিক্যাল মেডিক্যাল ট্রায়াল চালাতেন। অ্যানাস্থেটিক ড্রাগের ইললিগ্যাল বিজনেসও ছিল। একদিকে সুশান্ত হেল্প করত। অন্যদিকে মলয়া। মলয়ার কাজ ছিল ইললিগ্যাল ড্রাগ ট্রায়ালের জন্য উপযুক্ত পেশেন্ট ও তার পরিবার খোঁজা। এবং সেই দুঃস্থ পরিবারকে বাই হুক অর ক্রুক নানাভাবে লোভ দেখিয়ে রাজি করানো। কিন্তু তাদের টার্গেট সেইসব পেশেন্টই হত যারা দীর্ঘদিন ধরে কোমায় আছে কিংবা মেডিক্যাল সায়েন্স যাদের জবাব দিয়েছে। সুস্থ ও অর্থবান পেশেন্টদের ধরে তারা টানাটানি করতেন না। সেটা অত্যন্ত রিস্কি। আর জেনিথ আর এম এম এন আইয়ের পাওয়ার সাপ্লাইয়ের ঘোটালা সুশান্ত আর মলয়াই করত। সুশান্ত সবসময়ই নিজের পাওনা গন্ডা বুঝে নিত। মলয়াকেও নিয়মিত টাকা দিতে হত ওঁর সার্ভিসের জন্য।
“সুশান্তকে কৌশিকের বডি ডাবল কে বানিয়েছিল। আপনি?”
“না। আমি নই।” ডঃ সরকার চিন্তিত স্বরে বললেন, “ইনফ্যাক্ট এই আইডিয়া ওর মাথায় এল কী করে সেটাই বুঝিনি। কিন্তু আমাদের কাজে লেগে গিয়েছিল। বিলিভ মি।”
তিনি ব্যাকুলভাবে অধিরাজের হাত চেপে ধরেন, “আমি যা করেছি তা স্বীকার করে নিয়েছি। সুশান্তকে মার্ডার না করে উপায় ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে করেছি। কিন্তু একটা সুস্থ পেশেন্টকেও মারিনি। বরং যাদের নিয়ে কাজ করতাম, তারা ন্যাচারালিই মরত! তাদের বাঁচারই কথা নয়, আগেই মরে ছিল। আমি সব কিছু হতে পারি। বাট ডঃ ডেথ নই!”
অধিরাজ নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, “আই বিলিভ ইউ। আপনি ডঃ ডেথ হতেও পারেন না।”
“থ্যাংকস… থ্যাংকস অফিসার!”
অধিরাজের চোখে প্রশান্তি। তার থিওরি সম্পূর্ণ সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। সে মিস অরোরাকে বলল, “ইমিডিয়েটলি মলয়া চৌধুরীকে গ্রেফতার করার বন্দোবস্ত করুন। আধঘণ্টার মধ্যে ওঁর অ্যারেস্টের খবর যেন পেয়ে যাই।”
“ইয়েস স্যার।”
টুইঙ্কল আদেশ পালন করতে চলে গেল। অধিরাজ এবার ফের ডঃ ইন্দ্রজিতের দিকে ঝুঁকল,
“এতখানি যখন বললেনই, তখন এই ড্রাগ র্যাকেটের কিংপিনের নামটাও বলে দিন। কে এই মহান ব্যক্তি?”
তিনি ফের মুখ মুছলেন। তারপর কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, “কার্লোস। …এর পেছনে কার্লোসই আছে।”
“ওঃ গ-শ।”
সে মুচকি হাসল, “হোয়াই অ্যাম আই নট সারপ্রাইজড? এই নামটাই আশা করছিলাম। ইউ পিপল থিঙ্ক দ্যাট ইউ আর ভেরি স্মার্ট। বাট সামটাইমস কপস আর স্মার্টার দ্যান ইউ…!”
বলতে বলতেই সে অর্ণবের দিকে ঘুরেছে।
“আর কী? প্রণবেশদাকে জানাও যে লেডি অফিসার না দিলেও একজন ল্যাডা কার্লোসের কালো হাতকে গিফট করতে পারি আমরা। তারপর উনি তাকে পাঞ্চিং ব্যাগ বানাবেন না তক্তা সে ব্যাপারে আমাদের কোনো ইন্টারেস্ট নেই। দ্যাখো, হুজুর যদি একটু শান্ত হন।”
“ইয়েস স্যার।”
কথাটা ছুড়ে দিয়েই অধিরাজ গটগট করে বেরিয়ে গেল ইন্টারোগেশন রুম থেকে। দুই মূর্তি তখনও বাজে পোড়া গাছের মতো বসে আছেন।
যেন জ্বলেপুড়ে নিষ্প্রাণ একরাশ ছাই!
