১৫
অধিরাজের মনে দুশ্চিন্তা আর আশঙ্কা ক্রমাগতই পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছিল। এবার আশ্চর্য একটা কেসের পাল্লায় পড়েছে! তার কেরিয়ারের অন্যান্য খুনীরাও কম ডেঞ্জারাস ছিল না। কিন্তু এই মাস্টারমাইণ্ড সবসময়ই এক কদম এগিয়ে। পুলিস কখন কী করবে সব জেনে বসে আছে। আর এতটাই গুছিয়ে আগে থেকেই সব প্ল্যান করে রাখে যে কেউ কিছু বোঝার আগেই সেটা নিখুঁতভাবে এক্সিকিউট হয়ে যায়। এ কেসের ল্যাজা মুড়ো তো দূর, ধড়ের দেখাই মিলছে না। সম্ভবত ডঃ কৌশিক চক্রবর্তীর রহস্যময় কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের পর থেকেই এই মৃত্যুর তাণ্ডব শুরু হয়েছে। ওটা একটা কি-ফ্যাক্টর। তাই অধিরাজের মনে হয়েছিল যে কৌশিকের কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট সম্পর্কিত মেডিক্যাল রিপোর্টগুলো দেখা দরকার। হয়তো ওটাই সেই স্ফুলিঙ্গ যার পর থেকে এই দাবানল শুরু হয়েছে। যেদিন ইন্দ্রজিৎকে ছেড়ে গোটা টিমটাই ব্যুরোয় ছিল, তখনই প্রত্যেকের বাড়িতে সবার অজান্তে চিরুনি তল্লাশি চালিয়েছিল ওরা। আশা ছিল, কৌশিকের মেডিক্যাল রিপোর্ট, প্রেসক্রিপশন বা মেডিকেশন, বর্তমানে উনি কী ওষুধ খান তা সবই পাওয়া যাবে।
অথচ সে গুড়ে শুধু বালি নয়, সঙ্গে সিমেন্টও বটে। কৌশিকের মা, উর্মিলা চক্রবর্তীর বিরাট মেডিক্যাল ফাইল পাওয়া গেলেও কৌশিকের কোনো রিপোর্টই গোটা বাড়িতে নেই। সব ভোঁ ভাঁ। মেডিসিন ক্যাবিনেটেও যা আছে তা স্রেফ উর্মিলাদেবীরই ওষুধ আর সাধারণ জ্বর, পেইনকিলার বা হজমের মেডিসিন। কৌশিকের রোগের কোনো সিরিয়াস বা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ওষুধের দেখাই নেই।
এমনকী যখন ভদ্রলোকের ওপর মার্ডার অ্যাটেম্পট হল, সেদিনও দু-জনকে দ্রুত হসপিটালে পাঠানোর পর আবার একবার গোটা বাড়ি সার্চ করে দেখেছিল ওরা। কিন্তু তন্নতন্ন করে একটা ওষুধের ফয়েল কিংবা একটা মেডিক্যাল বিলও পাওয়া যায়নি যা কৌশিকের অসুস্থতার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। যা আছে, সবই ওঁর মায়ের। কিন্তু কৌশিকের কোনো মেডিক্যাল ‘হিস্ট্রিই নেই। সব গায়েব! যেন উনি অসুস্থই ছিলেন না কখনও।
আচমকাই অর্ণবের মনে পড়ে গিয়েছিল শীলা বসাকের বয়ান। শীলা জানিয়েছিল যে কৌশিক ওঁর পেছনে পড়েছিলেন। কোনো রোগ নেই ভদ্রলোকের। সবটাই ফর শো! এমনকি সে নাকি স্বচক্ষেই ওঁকে ওয়াকিং স্টিক ছাড়াই গটগটিয়ে হাঁটতে দেখেছে। শীলার স্টেটমেন্ট তো এখন সত্যিই বলে মনে হচ্ছে তার। নয়তো এতদিন ধরে যে লোকটা অসুস্থ, তার কোনো মেডিক্যাল রিপোর্ট বা রেকর্ড নেই কেন!
শুধু তাই নয়, শীলা এও বলেছিল যে কৌশিক ওঁর পূর্বপ্রেমিকার ওপর রীতিমতো শারীরিক অত্যাচার ও ব্রুটাল মলেস্টেশনও করতেন। শীলার মুখে এ স্টেটমেন্ট শোনার পর আত্রেয়ী দত্ত মেয়েটির নাম ঠিকানা খুঁজে বের করে তাকে ইন্টারোগেটও করতে গিয়েছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানা যায় যে সেই মেয়েটির বিয়ে হয়ে গিয়েছে এবং সে বিদেশে সেটলড। মিস দত্তও নাছোড়বান্দার মতো তার বিদেশি নম্বরটি নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিও কলে কন্ট্যাক্টও করে। মানতেই হবে, ডঃ চক্রবর্তীর পছন্দ আছে। তাঁর প্রাক্তন প্রেমিকা মারকাটারি সুন্দরী বটে। কিন্তু কথাবার্তা বড়ো কাঠ কাঠ। মেয়েটি খুব সংক্ষিপ্ত উত্তরে জানায়, “কৌশিক আর আমার ব্রেক-আপের কারণ জাস্ট পার্সোনালিটির ডিফারেন্স আর মতের অমিল। এর মধ্যে কোনোরকম ফাউল প্লে বা ভায়োলেন্স নেই।”
“আপনাদের ঠিক কতদিনের সম্পর্ক ম্যাডাম?”
“বারো বছরের।”
আত্রেয়ী হাঁ। সে বলল, “বারো বছর ধরেও আপনারা বুঝতে পারেননি যে আপনাদের মধ্যে পার্সোনালিটির ডিফারেন্স আর মতের অমিল আছে। আপনারা যে পরস্পরের জন্য ইনকম্প্যাটিবল এটা বুঝতে বারো বছর লেগে গেল।”
“হ্যাঁ।” ওদিক থেকে খুব শান্ত উত্তর এল, “মানুষ ইমোশনাল হয়ে গেলে অনেকরকম ভুল করে। অনেক কিছু ওভারলুক করে। কিন্তু বাস্তবের মাটিতে পা পড়লে তখন ভুল বুঝতেও পারে।”
“কীরকম বাস্তব?”
“সরি ম্যাডাম…” মেয়েটি এ-প্রসঙ্গে আর কথা বলতে রাজিই নয়, “দেখুন, আমি এখন বিবাহিত এবং আমার স্বামীও এখানকার একজন রেপুটেড ডাক্তার। আমি নিজেও একটা ডেন্টাল কিনিক চালাই। সো উই আর ওয়েলসেটলড। কৌশিক আমার পাস্ট। আর তার সঙ্গে এই মুহূর্তে আমার কোনো রকম যোগাযোগ তো দূর—টকিং টার্মসও নেই। সে-ও কখনও আমার সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করেনি। আমিও নিজের ফ্যামিলি আর কেরিয়ার নিয়ে ব্যস্ত। অ্যান্ড রাইট নাও, আই অ্যাম এক্সপেক্টিং। তাই ওর ব্যাপারে আমাকে টানবেন না। ইভেন আমি চাই না যে আমার নামও কেউ জানুক। যা অতীত, তা অতীতই। তার জন্য বর্তমান বা ভবিষ্যৎকে অ্যাফেক্টেড হতে দিতে অন্তত আমি চাই না।”
ব্যস, কথোপকথন ওখানেই সমাপ্ত। এই চ্যাপ্টারটাও। মেয়েটি কৌশিক সম্পর্কে আর কোনো কথা বলতে রাজিই নয়। অধিরাজও বলেছিল, “আমার মনে হয় না উনি আর কিছু বলবেন। তাছাড়া সেনোরার কথাও সঠিক। উনি স্পটেও নেই, কৌশিকের লাইফেও নেই। তাছাড়া ওঁর জীবন অনেকটাই এগিয়ে গেছে। তাই ওঁকে ধরে টানাটানি না করাই ভালো।”
মেয়েটির বয়ান শুনে অর্ণবের মনে হয়েছিল যে কারণেই হোক সে ডঃ চক্রবর্তীর ওপর বিরক্ত। তাই কথাই বাড়াতে চায় না। সেক্ষেত্রেও শীলার বয়ানকে ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না। ওপরন্তু যেদিন কৌশিক একটা গোটা রাত ব্যুরোয় ছিলেন সেদিন কোনোরকম ওষুধও ওঁকে খেতে দেখা যায়নি। কেউই অবশ্য সেদিন কোনো ওষুধ খায়নি একমাত্র রঞ্জন ছাড়া। কিন্তু কৌশিকের মতো একজন গুরুতর কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের রোগী ওষুধ খাবেন না, তা কী করে হয়।
এই আইডিয়া মাথায় আসতেই সে অধিরাজকে নিজের ডিডাকশন জানায় এবং সিদ্ধান্তে আসে, “স্যার, আমার তো মনে হয় শীলার কথাই ঠিক। কৌশিকের কোনো রোগই নেই। উনি স্রেফ নিজেকে একজন অসহায় রোগী হিসেবে দেখাতে চান যাতে সেফ সাইডে থাকতে পারেন। হি ইজ জাস্ট প্লেয়িং আ ভিকটিম কার্ড।
“ওয়েল সেইড অর্ণन।”
অধিরাজ হাতের সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিতে দিতে বলে, “তোমার সিদ্ধান্তটা শীলা বসাকের স্টেটমেন্ট আর বিদেশবাসিনী সেনোরার ডায়লগের ওপরই বেস করে কী? ইন দ্যাট কেস দু-জনেরই বয়ান ইনডাইরেক্টলি বলে সেয় সে কৌশিক চক্রবর্তীর অসুস্থতাটা জেনুইন। সেখানে কোনো ঝোল নেই। তিনি ফিজিক্যালি একদমই ফিট নন।”
“অ্যাঁ।”
অর্ণবের বিস্ময়ের অবধি নেই, “সেটা আবার কী করে বোঝা গেল?”
অধিরাজের মুখে একটা অস্বস্তির ছাপ হালকাভাবে ভেসে উঠেও সরে গেল। সে একটু ফ্যাকাশে হাসে, “তুমি সার্জিক্যাল স’ কিলার কেসের সুকোমল পান্ডেকে ভুলে গেলে? নাকি শীলাকে দেখে কমন সিম্পটমগুলো ধরতে পারনি? সেনোরা একজন প্যাথলজিক্যাল লায়ার যে!”
“অ্যাঁঃ। শীলা বসাক প্যাথলজিক্যাল লায়ার?” সে একটু থেমে বলে, “অবশ্য ওর ব্যাগে আঙুল ঘষার বহর দেখে মনে হয়েছিল যে এটা আগেও কোথাও দেখেছি। ভীষণ চেনা। কিন্তু মনে করতে পারিনি স্যার।”
“তোমার চোখ কিন্তু লক্ষণটা একদম পারফেক্ট ধরেছে।” সে মৃদুস্বরে জানায়, “চোখ নামিয়ে কথা বলা, ইতিউতি তাকানো, আই কন্ট্যাক্টে না যাওয়া–সর্বোপরি হয় নিজেরই গায়ে অথবা বা কোনো অবজেক্টে আঙুল ঘষা, এগুলো সবই প্যাথলজিক্যাল লায়ারের লক্ষণ। সর্বোপরি ওঁর কথাই প্রমাণ দেয় যে উনি কী লেভেলের মিথ্যেবাদী।”
অর্ণব বিব্রত, “কিন্তু উনি তো সব ঠিকঠাকই বলেছেন স্যার। আমি তো তেমন কিছু পেলাম না।”
“বেশ। তবে ওঁর কথাগুলো মনে করো।”
অধিরাজ স্মিত হাসল, “শীলা প্রথমেই দাবি করেছিলেন যে উনি হায়েস্ট পেইড পার্সন। এটা কখনও সম্ভব অর্ণব? জেনিখের মতো একটা হসপিটালে যেখানে ডঃ সঞ্জয় বসু, ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার, ডঃ কৌশিক চক্রবর্তীর মতো হেভিওয়েট নাম আছে, সিস্টার মলয়া চৌধুরীর মতো একজন অভিজ্ঞ নার্স আছেন যাঁর নির্দেশে গোটা হসপিটালের সিস্টারদের চলতে হয়, কিছুদিন বাদেই মেট্রন হবেন ভদ্রমহিলা—ইভেন শীলা নিজেই তাঁর আণ্ডারে, সেখানে একজন সাধারণ সিস্টার হিসেবে শীলা বসাক হায়েস্ট পেইড পার্সন। এটা কোনদিক দিয়ে তোমার যুক্তিসঙ্গত মনে হয়?”
এইবার কথাটা মনে পড়ল অর্ণবের। এই কথাটা সে শুনলেও বিশেষ পাত্তা দেয়নি। অতখানি গুরুত্বপূর্ণ মনেও হয়নি। কিন্তু এইবার স্ট্রাইক করল। এটা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়, বরং হাস্যকর।
“দ্বিতীয় স্টেটমেন্ট, ওঁর নার্সগিরি করার কথাই না, অর্থাভাবে ডাক্তার হতে পারেননি।” দুষ্টু হাসিটা তার মুখে খেলা করছে, “কিন্তু তুমি ওঁর হায়ার সেকেন্ডারির মার্কস দেখেছ? আমরা ওঁর ঘরের আলমারিতে পেয়েছিলাম। টোট্যান্স এগ্রিগেট পার্সেন্টেজ ছিল ফটি ফাইভ পার্সেন্ট। সায়েন্স সাবজেক্টগুলোর মধ্যে অঙ্কে ফেল করেছিলেন। যদিও ওয়েস্ট বেঙ্গল বোর্ড ওটাকে পাকড়াও করে অ্যাডিশনাল সাবজেক্ট বানিয়ে দেওয়ায় শেষ রক্ষা হয়েছে। এইরকম যাঁর মেধা, তিনি যদি দাবি করেন যে তাঁর ডাক্তার হওয়া উচিত ছিল—তবে হয় তিনি নির্লজ্জ রকমের মিথ্যেবাদী, নয় পাগল। এক্ষেত্রে প্রথমটা।”
“হুঁ।”
“থার্ড স্টেটমেন্ট, ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী ওঁর নামে যা তা বলে বেড়ান।” অধিরাজ এবার সজোরেই হেসে ফেলল, “ফ্যান্টাসিরও একটা লিমিট আছে। ডঃ চক্রবর্তী সবার সম্পর্কে মিথ্যে বলতে পারেন। কিন্তু তিনি নিজের গ্র্যাভিটি ও পজিশন সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন। শীলা বসাককে উনি পাত্তাই দেবেন না, ওঁর সম্পর্কে কিছু বলা তো দূর। আদৌ ঠিকমতো নাম জানেন কী না সে বিষয়েও সন্দেহ আছে কারণ প্রত্যেকেই একটা কথা বলেছে কৌশিক সম্পর্কে, ইনকুডিং সুহাসিনীর মতো পি এন পি সি এক্সপার্ট। ভদ্রলোক নিজের কাজ নিয়েই বেশি থাকেন, বাইরের খবরাখবর খুব একটা রাখেন না। তিনি শীলা বসাকের স্ট্যান্ডার্ডের একজন মানুষকে এতখানি গুরুত্ব বা সময় দেবেন? রোমিওর মতো ওঁর পেছনে পড়বেন। যাঁর এক্স গার্লফ্রেন্ড রীতিমতো ডানাকাটা পরী, বিদেশে গিয়ে নিজস্ব ডেন্টাল ক্লিনিক খুলে ফেলার যোগ্যতা রাখেন, তিনি একজন সাধারণ সিস্টারের পেছনে ঘুরঘুর করবেন? ডঃ বসুও দুশ্চরিত্র হতেই পারেন। কিন্তু তাঁর সামনে সুহাসিনীর মতো একজন সুন্দরী অলরেডি উপস্থিত। আর ও ভদ্রলোকেরও প্রেমে পড়ার কিছু নির্দিষ্ট ক্রাইটেরিয়া ও ক্লাস আছে যার মধ্যে শীলা বসাক ফিটই হন না। সুতরাং এই স্টেটমেন্টও মিথ্যে। সেনোরা এটাও দাবি করেছেন যে উনি হ্যাপিলি ম্যারেড। যিনি হ্যাপিলি ম্যারেড আর যার স্বামী এতটাই বলবান যে স্ত্রী-র সম্মান বাঁচাতে দু-দুটো খুন করতে পারেন, তিনি রঞ্জনের মতো ‘চিন্দি’ টাইপ বদমায়েশের ব্ল্যাকমেইলিং-এ ভয় পান কেন। হ্যাপিলি ম্যারেড কাপল তো নিজেদের মধ্যে কোনোরকম সিক্রেট রাখে না। ম্যারেজতখনই ‘হ্যাপি’ হয় যখন স্বামী-স্ত্রীয়ের মধ্যে ন্যূনতম বিশ্বাস থাকে। সেক্ষেত্রে শীলার প্রথমেই উচিত ছিল ওঁর ওয়ার্স হাফকে সব খুলে বলা। মিস্টার তাতে রেগে গিয়ে হয়তো একটু চেঁচামেচি করতেন, স্ত্রী-কে ভুলও বুঝতেন, ফ্লোড়ে দেওয়ার হুমকিও দিতেন, বড়োজোর রাগের মাথায় একটা চড়ও কসিয়ে দিতেন। কিন্তু স্ত্রীকে সত্যি সত্যিই ছাড়তেন না। হয় সত্যিই শীলার কথা মতো রঞ্জনকে প্রহারেণ ধনঞ্জর দেওয়ার তাল করতেন, নয় পুলিসে কমপ্লেইন করতে দৌড়োতেন। রঞ্জনের সাহসের দৌড় কী শীলা জানেন না? তবে তিনি ভয়ের চোটে লেম ডাক হয়ে ব্ল্যাকমেইলড হয়েই গেলেন? এ কেমন ‘হ্যাপিলি’ ম্যারেড! আর যখন জানতে চাইলাম যে ওঁর হাজব্যান্ড মাশরুমের চাষ করেন কী না, উনি বললেন, ‘বাজে কথা!’ যেখানে গোটা হসপিটালের লোক জানে শীলা বসাকের হাজব্যান্ডের সত্যিই মাশরুমের বিজনেস আছে। বিশ্বাস না হলে মিস দত্ত আর মিস অরোরাকে জিজ্ঞেস করো। দুই সেনোরিটা গিয়েছিলেন তো পুলিস হয়ে-কিন্তু রসালো সুপুষ্ট মাশরুমের বড়ো বড়ো ডাব্বা দেখে লোভ সামলাতে না পেরে ‘চোর’ মোড অন করে পটাপট চার পাঁচটা ডাব্বা হাপিশ করে দিয়েছিলেন। একজনের মোটিভ ভালো ভালো রেসিপি বানানোর, অন্যজনের বলাই বাহুল্য খাওয়ার তাল! হোয়াটএভার ইট মে-বি, শীলার বরের মাশরুমের বিজনেস আছে এটা প্রমাণিত সত্য। অথচ উনি বললেন, ‘বাজে কথা!’ এবার বলো, আমার কী বোঝা উচিত? যিনি ‘সূর্য পূর্বদিকে উঠেছে’ মার্কা টুথকেও ডিনাই করেন, ফ্যান্টাসিতে থাকেন, আই কন্ট্যাক্ট করতে চান না, প্রত্যেকটা মিথ্যে কথা বলার আগে নার্ভাস হয়ে ব্যাগে আঙুল ঘষেন—তিনি অবধারিতভাবেই একজন প্যাথলজিক্যাল লায়ার। আমি তো ভাবছিলাম যে উনি কখন বলবেন, ‘আমার নাম শীলাই নয়, ক্যাটরিনা কাইফ। আর আমার বর ভিকি কৌশল!’ কারণ এই জিনিস আমরা আগেও দেখেছি।”
“তা ঠিক।” অর্ণব এবার অসন্তোষ প্রকাশ করে, “তাই বলে আমি আদৌ মিস দত্ত আর মিস অরোরার এই কাণ্ড সাপোর্ট করছি না। এটা রীতিমতো চৌর্যবৃত্তি।”
“অবশ্যই হত অর্ণব।” সে মিটিমিটি হাসে, “যদি না আমি ওই কয়েক ডাব্বা মাশরুমের দাম মিঃ বসাককে দিয়ে দিতাম। সেনরের ডিটেইলস আর ফোন নম্বর জোগাড় করে একদম এম আর পি-র দামেই গুগল পে করে দিয়েছি। পেমেন্টটা সেনর রিসিভও করেছেন। তুমি যদি চাও তবে স্ক্রিনশটও দেখাতে পারি।”
“আপনি যাই বলুন…!” অর্ণব নাছোড়বান্দা, “এ আবার কী। হাতের কাছে মাশরুম পেয়ে অমনি দু-জনে মিলে ঝেঁপে দিলেন? আপনি আবার তার পেমেন্টও করে বসে আছেন। তলে তলে সাপোর্টও করছেন। ওঁদের কিছু বললেন না। স্যার, আপনার প্রশ্রয়ে মিস অরোরা ক্রমাগতই গোল্লায় যাচ্ছেন। আর ওঁর দেখাদেখি মিস দত্তও।” সে মাথা নাড়ছে, “এটা অদ্ভুত মিস দত্তর কাছ থেকে আশা করা যায় না।”
“তুমি বড্ড জাজমেন্টাল হয়ে যাচ্ছ ডার্লিং। সেনোরিটাদের ইচ্ছে হয়েছে, ফাঁকেতালে একটু শপিং না হয় করেই ফেললেন। এমনিতেই একটু শপিং টপিং এ যাওয়ার ফুরসত তো পানই না ওঁরা। তাছাড়া দাম তো দেওয়া হয়ে গেছে। ছোটোবেলায় কখনও পাশের বাড়ির বাগান থেকে আম বা কাঁঠাল চুরি করে খাওনি? কিংবা কুল? আমি তো প্রচুর খেয়েছি।”
“সেটা ছোটোবেলায়। এই ধাড়ি বয়েসে নয়।” আলতো করে চোখ টিপল অধিরাজ, “কখনও কখনও ধাড়ি বয়েসেও একটু ছেলেমানুষি থাকা ভালো। সবাই যদি প্রণবেশদার মতো মুখ লম্বা করে ‘দ্যাখো আমি বাড়ছি মাম্মি’ টাইপের হাবভাব করতে থাকে তাহলে তো গোটা পৃথিবীই নীরস আর ধূসর হয়ে যাবে। তাছাড়া আমি খামোখা ওঁদের ‘জেঠুমণি’ হয়ে বকাবকি করতে যাব কেন? আই অ্যাম নট দেয়ার গার্জিয়ান অ্যাট অল। তোমার বুড়ো হওয়ার ইচ্ছে হলে মহানন্দে হও। কিন্তু আমি কিছুতেই দুষ্টুমি, ছ্যাবলামি বা বদমায়েশি ছেড়ে বুড়ো হতে রাজি নই। উদো আর বুধোর মতোই আমার বয়েস ‘বাও কী তেও’”
“তাই বলে লেডি অফিসারদের এভাবে স্পয়েল করবেন?”
এবার সে সজোরে হেসে ওঠে, “তুমি বড়ো হিংসুটে ডার্লিং। সবাই জানে যে ব্যক্তিকে আমি সবচেয়ে বেশি আশকারা দিয়ে, প্যাম্পার করে স্পয়েল করেছি সেটা তুমি। আর তুমিও পুতুপুতু করে আমাকে স্পয়েল করেই থাকো। ডোন্ট ওরি, ওই মাশরুম যখন মিস দত্তর কল্যাশে চাইনিজের সঙ্গে তোমার পেটে যাবে তখন কিছুটা স্পয়েল তুমিও হবে।” অধিরাজ একটু থেমে ফের বলল, “একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে। আমরা শীলা বসাকের বাড়ির মাশরুমের স্যাম্পলও পেয়েছি। ওপরন্তু মিস অরোরা এই সুযোগে একটা আস্ত ডাব্বা কাঁচা মাশরুম সাল্টে দিয়েও যখন দিব্যি সলমন খানের মতোই ‘ভাইগিরি’ করে বেড়াচ্ছেন, তখন প্রমাণ হয়ে যায় যে ওটা বিষাক্ত মাশরুমই নয়। আর সুহাসিনীর চিলি মাশরুমও বিষাক্ত ছিল না কারণ শীলাই তাঁকে মাশরুম সাপ্লাই দেয়। ওই দেখেই তো বুঝলাম যে বিষাক্ত মাশরুম হতভাগা রঞ্জন নিজেই কনজিউম করেছিল। সেজন্যই ব্যাটাকে চেপে ধরেছিলাম। ফল কী হয়েছে তা স্বচক্ষেই দেখেছ।”
অর্ণনের চক্ষু ছানাবড়া, “মিস অরোরা কাঁচা মাশরুমও খান।”
“ওঁর সলমন খানের পেট তাই সবই খান। অক্ষয় খান-না-র পেট হলে হয়তো পেতেন না। কিন্তু দ্য পয়েন্ট ইজ-এতে লাভ ছাড়া কোনো ক্ষতি হয়নি।” অধিরাজ যোগ করে, “তবে এই মাশরুমের চক্করে আমরা ডঃ চক্রবতীর হেলথের বিষয় থেকে ফোকাস হারাচ্ছি। যা বলছিলাম, শীলা বসাকের মতো একজন প্যাথলজিক্যাল লায়ার যখন জোর দিয়ে বলেন যে কৌশিক চক্রবর্তী আদতে অসুস্থ নন। তিনি স্টিক ছাড়াই গটগটিয়ে হাটেন, ওঁর ওপর লাইনও মারেন এবং প্রেমিকার ওপর অত্যাচার ও সেক্সুয়াল মলেস্টেশন চালান তখন বুঝতে হবে আসল ফ্যাক্টটা ঠিক এর উলটো। কৌশিক ফিজিক্যালি এর একটাও করেন না বা করতে পারেন না। ওঁর পূর্বপ্রেমিকাও ঠারেঠোরে সেটাই বলেছেন।”
অধিরাজের ওকালতিতে সন্তুষ্ট না হলেও অর্ণব কথা বাড়ার না। স্যারের ওপর কথা বলার বা তার নির্দেশ অমান্য করা ওর স্বভাবেই নেই। তাই মাশরুম এপিসোড গিলে ফেলে আসল পয়েন্টে ফোকাস করল, “কিন্তু তিনি তো ইনকম্প্যাটিবিলিটির দোহাই দিলেন স্যার!”
“ওটা স্রেফ একটা ছুতো। আসল কথাটা নিজেই নিজের মুখে বলে ফেলেছেন। ওঁর পা বাস্তবের মাটিতে পড়েছে, উনি নিজের ভুল বুঝেছেন, এবং সেনোরা অধুনা এক বিদেশের রেপুটেড ডাক্তারের ঘরণী ও প্রেগন্যান্ট, এই কথাতেই কী স্পষ্ট নয় যে কেন উনি ডঃ চক্রবর্তীকে দীর্ঘ বারো বছর সম্পর্কের পরও ছেড়ে গেলেন?”
এবার অর্ণবের কাছেও চিত্রটা একটু একটু করে স্পষ্ট হচ্ছিল। তার মনের মধ্যে ডঃ চক্রবর্তীর এক্স-গার্লফ্রেন্ড সম্পর্কে ক্ষোভও জমে। সে শুধু বলল, “কারণ ভদ্রমহিলা সেলফিশ। চূড়ান্ত স্বার্থপর। উনি বুঝতে পেরেছিলেন যে কৌশিকের অসুস্থতা ওঁর কেরিয়ার ডুম করে দেবে। তাঁর সঙ্গে থাকলে কোনোরকম সুখ-সুবিধা উনি পাবেন না। তাই বিপদের দিনে মানুষটাকে একলা রেখে চলে গেলেন! বারো বছরের ভালোবাসার কী মহিমা!”
অধিরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “অ্যাকচুয়ালি দোষ তুমি সেনোরাকেও দিতে পারো না। ওঁর একটাই ত্রুটি—উনি একজন কমন ওম্যান। আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতোই বিবাহিত জীবনের সবরকম সুখ পেতে চান। অর্থ-সমৃদ্ধি-বিলাস-ব্যসন-শারীরিক ও মানসিক সুখ তো বটেই সর্বোপরি মা হওয়ার পূর্ণতা। যা ওঁকে ডঃ চক্রবর্তী দিতে পারতেন না। একজন হাফ প্যারালাইজড মানুষের সঙ্গে থেকে কী নিজের জীবন-যৌবন নষ্ট করতেন। ইডেন স্টিফে হকিংয়ের মহান স্ত্রী জেন ওয়াইল্ডও ত্রিশ বছরের দাম্পত্য জীবনের পর স্টিফেনের শারীরিক অবনতি ও ঘরের মধ্যে একগাদা অ্যাসিস্ট্যান্ট ও নার্সের ঘোরাঘুরি, স্টিফেনের অ্যাফেয়ার মেনে নিতে পারেননি। যার ফলে স্টিফেন হকিংয়ের সঙ্গে ডিভোর্স হয়েছিল। তিনি নিঃসন্দেহে স্টিফেনকে ভালোবাসতেন, কিন্তু তার জন্য তিন সন্তানের জননী হয়েও তিনি থেমে থাকেননি। ডিভোর্সের দু-বছর পরেই জোনাথন হেলিয়ার জোলকে বিয়ে করেছিলেন। দ্বিতীয় মহান স্ত্রী এলাইন ম্যাসন তো আরও ভালো। তিনি মহানুভবতা দেখিয়ে ওই ফিজিক্যালি ডিজএবল জিনিয়াসকে বিয়ে তো করলেন, কিন্তু শোনা যায় অসহায় পতিদেবকে মারধোর, অবহেলা ও ফিজিক্যাল অ্যাবিউজ করতেও কসুর করেননি। যে লোকটার তুলনা একমাত্র আইনস্টাইনের সঙ্গেই হতে পারে, তাঁকেও যদি জীবনের সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক শেষ বারোটা বছর একাই থাকতে হয় তো ডঃ চক্রবর্তী কোথাকার কোন হনু যে তাঁর জন্য এক নারী সবকিছু ছেড়ে দিয়ে সেবায় সারাজীবন কাটিয়ে দেবে?” সে মাথা নাড়ে, “উহু, ওটা হয় না। জেন হকিংও যা পারেননি, তা একজন সাধারণ মেয়ে কী করে পারবে? সেই গিল্টও বোধহয় মনের মধ্যে আছে। তাই কৌশিক সম্পর্কে সেনোরা কিছু বলতেই রাজি নন।”
অর্ণব এবার ধীরে ধীরে বলে, “বুঝলাম। অর্থাৎ ডঃ চক্রবর্তী সত্যিই ফিজিক্যালি ফিট ছিলেন না। কিন্তু তাতেও তাঁকে আমি ক্লিনচিট দিতে পারছি না। উনি সুস্থ হচ্ছিলেন এবং হাঁটতেও পারতেন। একটু খুঁড়িয়ে চলা ছাড়া তেমন কোনো প্রবলেম ছিল না।”
“ক্লিনচিট কাউকেই দেওয়া যাবে না। ডঃ কৌশিক চক্রবর্তীকেও নয়। হয়তো উনি ফিজিক্যালি ফিট নন। কিংবা টেনশনে সেদিন ওষুধ স্কিপ করেছেন, কিন্তু তাই বলে ওঁর শাণিত শয়তানের মস্তিষ্কটিকে একেবারেই অবজ্ঞা করা যায় না। কাউকে খুন করার জন্য ওঁর ফিজিক্যালি ফিট হওয়ার দরকার নেই। আমাদের কেরিয়ারে আমরা এমন মার্ডারারদেরও দেখেছি যারা ওঁর থেকেও ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড পার্সন। উনি তো তবু সুস্থ হচ্ছিলেন।” বলতে বলতেই তার ভুরু কুঁচকে যায়, “আমার কাছে সবচেয়ে যেটা চিন্তার বিষয়, তা হল ভদ্রলোক এত ভুগলেন, প্রায় মৃত্যুর দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলেন, এত চিকিৎসা হল, কিন্তু তার কোনো রেকর্ড নেই! কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের হিস্ট্রি বা ইসিজি রিপোর্ট, মেডিক্যাল হিস্ট্রি, মেডিসিন–কিচ্ছু নেই। ওষুধ সব গেল কোথায়? সব গায়েব। এটা কী করে সম্ভব?”
“এর উত্তর তো শুধু ডঃ চক্রবর্তীই দিতে পারবেন স্যার। অবশ্য যদি তিনি কথা বলার মতো অবস্থায় আসেন।”
“হুঁ।”
সে চিন্তামগ্ন স্বরে বলল, “ডঃ শেঠি তো বলছেন, ওবেলা ডঃ চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বলা যাবে হয়তো। যদিও কথাগুলো এলিয়ে জড়িয়ে যাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটা ডিটোরিয়েট করবে এবং একটা সময়ে আর কথা বলার ক্ষমতা ওঁর থাকবে না। তবু, আগেও ওঁর স্পিচ খুব স্বাভাবিক ছিল না। হয়তো কান খাড়া করে শুনলে বুঝে নিতে পারব। তার আগে বরং বাকি জিনিসগুলো দেখে নিই।”
বাকি জিনিস বলতে স্টেট ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির জেনিথের অগ্নিকাণ্ডের ওপর রিপোর্ট, এম এম এন আই হসপিটাল আর জেনিথের শেষ তিন বছরের অ্যাবনর্মাল ডেথগুলোর কেস ফাইল। আত্রেয়ী দত্ত নেহাৎই একটা রাফ হিসেব বলেছিল। সমস্ত ঝাড়াই বাছাই করে এম এম এন আই আর জেনিথ মিলিয়ে তিনবছরে মোট একশো চুয়ান্নটি অস্বাভাবিক ‘কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে’ মৃত্যুর কেসফাইল পাওয়া গিয়েছে। সেগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়েই দেখছিল অধিরাজ। এস এফ এস এলের রিপোর্ট পড়তে পড়তেই ওর মুখে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে, “এই দ্যাখো অর্ণব, আমাদের খুনীর মস্তিষ্কটি কী পরিমাণ ধারালো।”
সে অর্ণবের দিকে রিপোর্টটা এগিয়ে দেয়। অর্ণব দেখল এস এফ এস এল তাদের তদন্ত ও এভিডেন্সের ওপর ভিত্তি করে প্রায় গোটা ঘটনাই যুক্তিযুক্তভাবে ব্যাখ্যা করেছে। তারা জানিয়েছে যে জেনিথের মরচুয়ারির ওই এসির ব্লাস্ট বা শর্টসার্কিট আদৌ স্বাভাবিক নয়। ভিকটিম, তথা রতন সে রাতে মরচুয়ারির একটি এমন ক্যাবিনেট খুলেছিল যেটির ভেতরে একটি কম পাওয়ারের থার্মাল গ্রেনেডের উপস্থিতি টের পাওয়া গিয়েছে। ক্যাবিনেটের মুখের দিকে মেস্টেড তারের অংশ সাক্ষী দেয় যে গ্রেনেডের পিনের সঙ্গে একটি তারকে ক্যাবিনেটের মুখে এমনভাবে আটকে দেওয়া হয়েছিল যাতে ক্যাবিনেটটাকে ওপেন করা মাত্রই তারের টানে গ্রেনেডের মুখের পিন বা ক্যাপ খুলে যায় এবং চার থেকে পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যেই গ্রেনেডটা ব্লাস্ট করে। তবে থার্মাল গ্রেনেড বা এই বিশেষ গ্রেনেডটি এত শক্তিশালী ছিল না যে সামনে দাঁড়ানো মানুষটিকে ছাই করে দেবে। তাই রতন আহত হলেও পুড়ে ‘মদনদেব’ হয়নি। সচরাচর এরকম জ্বালিয়ে ভস্ম করা থার্মাল গ্রেনেড একমাত্র হলিউডের অ্যাকশন ফিল্মেই পাওয়া যায়। এস এফ এস এল এবং বম্ব স্কোয়াড, দু-জনেরই বক্তব্য যে ওটি ‘থার্মাইট’ গ্রেনেড হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ অকুস্থলের মেটালের দরজা, জানলা কিছুটা গলে গিয়েছিল। আর থামাইট গ্রেনেডের বিশেষত্ব ওটাই। সে ধাতু গলাতে সক্ষম ও তার সঙ্গে মারাত্মক হিট তৈরি করতেও ওস্তাদ। খুনী রতনকে গ্রেনেড দিয়ে ওড়াতে চায়নি। সম্ভবও ছিল না। কারণ তার পরিকল্পনা আরও বেশি নিখুঁত ছিল।
ফরেনসিক রিপোর্ট অনুযায়ী, মরচুয়ারির এসিগুলোর ওয়্যারিং-কে আগে থেকেই সামান্য ডিস্টার্বড করে রাখা হয়েছিল। এতে এমনিতে বিশেষ কিছুই হবে না, যতক্ষণ না যন্ত্রগুলো ওভার হিটেড হয়ে যাচ্ছে বা ঘরের তাপমাত্রা প্রায় ২০০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট ছাড়াচ্ছে। তাই ট্যাম্পারড হলেও এসিগুলো আগে তেমন কোনো বিপজ্জনক প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। কিন্তু যে মুহূর্তে থার্মাইট গ্রেনেডের বিস্ফোরণ হল, ঠিক সেই মুহূর্তেই ওই বন্ধ ঘরের ভেতরের উষ্ণতা তিন থেকে চারহাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট ক্রস করেছিল। ফলস্বরূপ সবক-টি ট্যাম্পারড এসি ওভারহিটেড হয়ে গিয়ে ব্লাস্ট করতে থাকে। খুনী এইটুকুতেই সন্তুষ্ট থাকেনি। মরচুয়ারির মেঝেতে ফরম্যালডিহাইডের অতিরিক্ত মাত্রায় উপস্থিতিও লক্ষ করা গিয়েছে। সম্ভবত সে কন্টেনারগুলো ঢেলে দিয়েছিল। ডেডবডিগুলি পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ায় সেগুলোর ল্যাব টেস্টিং সম্ভব না হলেও লাশগুলোর ওপরেও এই মারাত্মক জ্বলনশীল কেমিক্যালের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা প্রবল। সব মিলিয়ে রতনকে জ্যান্ত অবস্থাতেই চিতায় চাপিয়ে দেওয়ার প্ল্যানিংই তার ছিল। এবং এই গোটা প্ল্যান এক্সিকিউট করার জন্য তার রতনের সামনে বা কাছাকাছি থাকার কোনো প্রয়োজন ছিল না। কী মারাত্মক আই কিউ দেখেছ লোকটার!” অধিরাজ চিন্তিত স্বরে বলল, “কী ভয়াবহ মাথাই না খেলিয়েছে। আমরা যদি গিয়ে না পৌঁছতাম তবে রতন বাঁচতই না। জেনিথের এই অগ্নিকাণ্ডকে ডঃ বসু নির্ঘাত নিজের প্রভাব খাটিয়ে ন্যাচারাল শর্ট সার্কিট বলে চালিয়ে দিতেন। রতনের বেঁচে যাওয়ায় ও ব্যাটা একটা অন্তত ডিফিট খেয়েছে। কিন্তু পালটা ডিফিটও দিয়েছে।”
অর্ণব বুঝল যে অধিরাজ কৌশিক চক্রবর্তীর ওপর হামলার কথা বলছে। সে জানতে চায়, “মেডিক্যাল ফাইলগুলো থেকে কিছু পাওয়া গেল স্যার?”
“উঁ?”
সে একমনে কী যেন চিন্তা করছিল। অর্ণবের ডাকে চিন্তাসূত্র ছিঁড়ে গেল। একটা সিগারেটের স্টিক নিয়ে আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে বলে, “আমি তো মেডিসিনের খুব বেশি কিছু বুঝি না। ও-বেলা ডঃ চক্রবর্তীর স্টেটমেন্ট নেওয়ার আগে এগুলোকে ডকের কাছে জমা করে দেব। উনি যদি উদ্ধার করতে পারেন কিছু। তবে আপাতদৃষ্টিতে বেশ কিছু জিনিস বুঝাতে পারছি যেগুলো বেশ ভাবাচ্ছে।”
“কী?”
সে চিন্তিত স্বরে বলে, “যেমন সুহাসিনী এখানেও ডায়েট চার্টে বজ্জাতি করেছেন। অন্তত পঁয়তাল্লিশটা কেসে এমन ডায়েট দিয়েছেন যা পেশেন্টের পক্ষে ক্ষতিকর হতে পারে। এমনকী হাই ডায়াবেটিক পেশেন্টকে কুকিল্প, এনার্জি ড্রিঙ্ক এমনকি ফুট জুস পর্যন্ত দিয়ে বসে আছেন। ভদ্রমহিলা সুন্দরী হলেও ওঁর হাতের লেখা অতি জঘন্য। আবার পাশাপাশি ডঃ সঞ্জয় বসুর হাতের লেখায় যেন মুক্তো ঝরছে। এত সুন্দর প্রেসক্রিপশন যে টাইপ করার প্রয়োজনই নেই। মেডিসিন কী দিয়েছেন তা ডক না দেখলে বোঝা যাবে না। তবে সবচেয়ে বেশি চিন্তায় ফেলেছে ডঃ কৌশিক চক্রবর্তীর হাতের লেখা!”
তার কপালে চিন্তার ভাঁজ লক্ষ্য করে অর্ণব জানতে চায়, “কীরকম স্যার?”
“সি দিস।”
সে দু তিনটে ফাইল একসঙ্গে খুলে অর্ণবের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, “একদম প্রথমদিকের পোর্শনে যখন কৌশিক মেডিসিন প্রেসক্রাইব করছেন তখন ওঁর হাতের লেখা দ্যাখো। সুহাসিনীর চেয়েও জঘন্য। সেটা হওয়াই সবচেয়ে স্বাভাবিক। কারণ একেই ওঁর হাত স্টেডি নয়, তার ওপর ডাক্তারদের জঘন্য হ্যান্ডরাইটিং এর বদনামও আছে। কিন্তু কয়েকটা পেজ পরেই পুরো সিন চেঞ্জ…।”
সে কয়েকটা পাতা উলটে দেখায়, “এই দ্যাখো, ফের ডঃ চক্রবর্তীর হাতের লেখা। আগের প্রেসক্রিপশনটা প্রায় সংক্ষিপ্ত ছিল। কিন্তু এখানে লম্বা হয়েছে, পেশেন্টের শারীরিক অবস্থার ডিটেলিং বেড়েছে। সর্বোপরি ওঁর হাতের লেখা দেখেছ? আগেরবার ব্যাকটিরিয়া মার্চ করছিল। এবার মনে হচ্ছে ছাপানো হরফ। ইনফ্যাক্ট তুমি যদি ওঁর সাইনের প্যাটার্ন হাত দিয়ে চেপে ধরে ডঃ বসুর হ্যান্ডরাইটিং এর সঙ্গে মিলিয়ে দ্যাখো তবে মনে হবে দুটো হ্যান্ডরাইটিং-ই সেম।”
আশ্চর্য। অর্ণব বিস্মিত দৃষ্টিতে ডঃ চক্রবর্তীর প্রেসক্রিপশন দেখছিল। ভদ্রলোক যে ডাক্তার হিসেবে অত্যন্ত মজাদার তা ওঁর ট্যাগলাইন দেখলেই বোঝা যায়। প্রতিটি স্বাক্ষরের নীচে ‘ডক্টর ইজ ইন অ্যান্ড পেইন ইজ আউট’, ‘ডক্টর অন অ্যান্ড পেইন হ্যাজ গন’ এর মতো সুন্দর মোটিভেশনাল ক্যাপশন লিখেছেন। তার নীচে হাসিমুখের স্মাইলি। এমন প্রেসক্রিপশন দেখলে যে-কোনো পেশেন্টের কষ্ট অর্ধেক কমবে।
কিন্তু অস্বাভাবিকতা সেখানে নয়। ওই স্লোগানটা অনেক ডাক্তার অনেকভাবেই দিয়ে থাকেন। স্মাইলি ওঁর রসিক স্বভাবের পরিচয় বহন করে। কিন্তু হাতের লেখা। একই মানুষের হাতের লেখায় এমন আকাশ পাতাল তফাত কী করে হয়। শুরুর দিকের প্রেসক্রিপশন পড়াই দায়। ওটা হাতের লেখা না পেশেন্টের ইসিজির চড়াই উৎড়াই তা বোঝাই অসম্ভব। কিন্তু ক্রমান্বয়ে সেই এবড়োখেবড়ো হস্তাক্ষরই মুক্তোর মতো সুন্দর, সুসজ্জিত ও অসম্ভব গোছানো হয়ে গিয়েছে। পরের প্রেসক্রিপশনগুলো যেন ধরে ধরে, অত্যন্ত যত্নে লেখা। অধিরাজের কথা সম্পূর্ণ সঠিক। ডঃ চক্রবর্তীর নাম না থাকলে ওটাকে ডঃ বসুর প্রেসক্রিপশন বলে চালিয়ে দিতে একটুও অসুবিধে হয় না।
“একটা মানুষেরই এরকম ডঃ জেকিল আর মি. হাইড টাইপের হ্যান্ডরাইটিং হয় কী করে? স্ট্রেঞ্জ।”
“এমনও তো হতে পারে যে ডঃ চক্রবর্তীর লিখতে অসুবিধে বা কষ্ট হচ্ছে দেখে ডঃ বসুই ওঁর কথামতো প্রেসক্রিপশনটা লিখে দিয়েছেন?”
“না। ওটা হতে পারে না,” সে অর্ণবের থিওরি শুনে মাথা নাড়ে, “ডঃ বসু এসব ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রোফেশনাল। তিনি অন্য কারওর প্রেসক্রিপশন লিখবেনই না। যদি বা লেখেন, তবে তার নামে সিগনেচার তো করবেনই না। এখানে ডঃ কৌশিক চক্রবর্তীর নামের সিগনেচার জ্বলজ্বল করছে। তাও সুন্দর হস্তাক্ষরে। ফ্যাক্সিমিলিও নয়।”
কথাটা বলেই অধিরাজ অর্ণবের দিকে আলগোছে তাকিয়েছে, “কল দ্য হ্যান্ডরাইটিং এক্সপার্ট ইমিডিয়েটলি। আমি জানতে চাই দুটো লেখাই কৌশিকের কিনা। আর সম্ভব হলে জেনিথ থেকে এমন কিছু ফাইলসও আনাও যেখানে পেশেন্ট বেঁচে আছেন এবং ডঃ বসু ও ডঃ চক্রবর্তী, দু-জনেরই হাতে লেখা প্রেসক্রিপশন সেই ফাইলে উপস্থিত। আমি দেখতে চাই, সেখানেও ডঃ কৌশিকের হাতের লেখার প্যাটার্ন এরকমই কী না।”
“ইয়েস স্যার।”
অর্ণব কথা না বাড়িয়ে আদেশ পালন করতে চলে গেল। অধিরাজের হাতে এতক্ষণে ফস করে জ্বলে ওঠে লাইটার। সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে সে চোখ বুজে নিজের দেহটাকে এলিয়ে দেয় চেয়ারে। আস্তে আস্তে বলে—
“কিউরিঅসার অ্যান্ড কিউরিঅ সার অ্যান্ড কিউরিঅসার… টু দি পাওয়ার ইনফিনিটি।”
