১৪
“ডঃ সুজাতা রায়ের ডেডবডিতে আপনার হেয়ার স্যাম্পল পাওয়া গেছে। ওয়ার্ডবয় সুশান্তর জামাতেও সেই আপনারই হেয়ার স্যাম্পল উপস্থিত। এর কোনো কৈফিয়ত দিতে চাইবেন?”
আপাতত অধিরাজ আর অর্ণবের সামনে খুব শান্তভাবে বসেছিলেন সঞ্জয় বসুর সুপুত্র ডঃ রণজয় বসু। একদম অবিকল বাবার মতনই চেহারা। এককথায় পিতৃমুখী পুত্র। সেই দৃঢ় চোয়াল, ঠান্ডা চাউনি। নিরুত্তাপ উদাসীন মুখ–যেন কিছুই হয়নি। ব্যুরোয় আটকা পড়েও বিন্দুমাত্রও ঘাবড়াননি ভদ্রলোক। উলটে শান্ত, স্থিরভাবে জানালেন, “সরি অফিসার। মনে হচ্ছে আমি আপনাদের হতাশ করব। ডঃ সুজাতা রায় বা ওয়ার্ডবয় সুশান্ত, কাউকেই আমি চিনি না! এরা কারা?”
অর্ণব সন্দিগ্ধ। সাত কাণ্ড রামায়ণ পড়ে রাবণ কার মা। এই নিউজটা রোজ হেডলাইন দখল করছে। ডঃ সুজাতা রায় যখন বেঁচে ছিল তখনও তাকে নিয়ে কম হইচই হয়নি। মারা যাওয়ার পর তো আরও বেশি জলঘোলা হয়েছে। প্রত্যেকটা চ্যানেল, প্রত্যেকটা নিউজ পোর্টাল, সমস্ত নিউজপেপার বাকী সব খবর ছেড়ে এই একটা কেসকেই চেজ করছে। অথচ উনি জানতে চাইছেন, সুজাতা রায় বা ওয়ার্ডবয় সুশাস্ত কে! এটা কী সত্যিই অজ্ঞতা, না উঁচুদরের অ্যাক্টিং?
“সরি ডঃ জুনিয়র বসু…”
অধিরাজকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই বললেন তিনি, “আমি ডঃ জুনিয়র বসু নই। আমার নাম ডঃ রণজয় বসু। কাইন্ডলি ওই নামেই আমাকে ডাকুন। নামের বদলে কোনো সিনিয়র ডাক্তারের জুনিয়র’ তকমা বসিয়ে ইনসাল্ট করবেন না।”
অধিরাজ বাইরে সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন থাকলেও মনে মনে হাসল। সে ইচ্ছাকৃতভাবেই ‘জুনিয়র’ শব্দটা ব্যবহার করেছিল। রণজয় বসুর রি-অ্যাকশন দেখা জরুরি, এবং কথাতেই স্পষ্ট, বাবার পরিচয়ে পরিচিত হতে ওঁর যথেষ্ট আপত্তি আছে। যতটুকু হিস্ট্রি শুনেছে, তাতে থাকারই কথা।
“আই বেগ ইওর পার্ডন ডঃ রণজয় বসু।”
সে এবার শীতল স্বরে ভদ্রলোকের চোখে চোখ রেখে বলে, “ডঃ সুজাতা রায় সেই প্রথম ব্যক্তি যিনি ডঃ সঞ্জয় বসুর বিরুদ্ধে কমপ্লেইন করেন। উনি যে ওঁর বয়স্ক পেশেন্টদের এক এক করে খুন করছেন সেই সন্দেহ ডঃ সুজাতাই প্ৰথম প্ৰকাশ করেছিলেন।”
“তাতে আমার কী!”
রণজয় নিরাসক্ত ভঙ্গিতে বলেন, “যদি ডঃ সঞ্জয় বসু কাউকে খুন করে থাকেন তবে সেটা তাঁর প্রবলেম। এখানে আমার ইনভলভমেন্ট কোথায়? আমি ওই ডঃ এ বি সি ডি বা ওয়ার্ডবয়কে চিনতে যাব কেন? তাকে মার্ডার করার আমার কী দায় পড়েছে?”
ওঁর কথার ভঙ্গিতে আশ্চর্য হয়ে গেল অর্ণব। রণজয়ের কথা শুনে কেউ বলবে না যে উনি নিজেরই বাবার সম্বন্ধে এই বাক্যগুলো আওড়াচ্ছেন। এটা ঠিক কী জাতীয় মনোভাব? অভিমান? রাগ? ক্ষোভ? না ঘৃণা?
“রাইট ডঃ বসু।” সে মসৃণ হাসল, “আপনি ব্যস্ত মানুষ। ওই ডঃ এ বি সি ডি বা ওয়ার্ডবয়কে চিনতে যাবেন কেন? মাই ব্যাড। কিন্তু একটা জিনিস ক্লিয়ার করুন তো। আপনি ডঃ এ বি সি ডি-কে চেনেন না, তারা কে তাও জানেন না। অথচ তারা যে মার্ডার হয়েছেন সেটা বলে দিলেন। এটা কী করে সম্ভব হল ডঃ রণজয়? আপনি তো আর রণজয়ানন্দস্বামী নন যে গণনা করে বলবেন!”
এইবার যেন অতি বড়ো পর্বতারোহীরও পা ক্ষণিকের জন্য পিছলে গেল। অতিবড়ো সাঁতারুও ভুল করল। রণজয় কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটা জোরদার হোঁচট খেলেন। পরক্ষণেই সামলে নিয়েছেন, “আপনিই তো বললেন ভদ্রমহিলার ডেডবডির ওপর আমার হেয়ার স্যাম্পল পাওয়া গেছে। ওয়ার্ডবয়েরও…।”
“হ্যাঁ। অবশ্যই বলেছি। কিন্তু মানুষ তো অনেক কারণে ডেডবডি হতে পারে। হার্ট অ্যাটাকে হতে পারে, অ্যাকিউট নিউমোনিয়ায় হতে পারে, ক্যান্সারে হতে পারে, রোগভোগ তো ছাড়ুন, অ্যাক্সিডেন্ট, বাঘের থাবায়, বন্যায়, সুনামিতে, এমনকি বজ্রপাতেও ‘ডেড’ হওয়ার রেকর্ড কিছু কম নয়। সব কিছু ছেড়ে আপনি মার্ডারকেই চেপে ধরলেন কেন সেনর?” রেশ বরফশীতল স্বরে কেটে কেটে বলে, “আর ওয়ার্ডবয়টিরও যে মার্ডার হয়েছে, বা তার ‘ডেডবডি’-তে আপনার হেয়ার স্যাম্পল পাওয়া গেছে, সেটা তো একবারও বলিনি। নাকি বলেছি?”
রণজয় একটু থেমে ফের বললেন, “ডেডবডির ওপর আমারই হেয়ার স্যাম্পল পাওয়া গেছে। এবং আমি হোমিসাইডের ব্যূরোতে বসে আছি, যারা মার্ডার কেস নিয়েই কাজ করে। এইটুকুই কী বোঝার জন্য যথেষ্ট নয়?”
“ক্লেভার অ্যানসার।” অধিরাজ একটু হাসল, “কিন্তু মুশকিল হল তদন্তটা ডঃ সুজাতা রায়ের মৃত্যুর জন্য হচ্ছে না। জেনিথ হসপিটালের পেশেন্টদের অস্বাভাবিক মৃত্যু বা প্রবাবল মার্ডারের জন্য হচ্ছে। আপনার ইস্টারোগেশনও তো তার জন্যই হতে পারত। তার জন্য বেচারি ডঃ রায় বা সুশান্তকে ‘মার্ডার’ই কেন হতে হবে?”
এবার বেশ অধৈর্য হয়ে বললেন তিনি, “দেখুন, জেনিথের সঙ্গে আমার দূরদূরান্ত অবধি কোনো সম্পর্কই নেই। আমার পিতৃদেবের আছে। তার জন্য আপনারা তাঁকে কাঠগড়ায় দাঁড় করান -—আমার কোনো অসুবিধে নেই। কিন্তু এর মধ্যে কোনোভাবেই আমি ইনভলভড নই।”
“তবে আপনার হেয়ার স্যাম্পল জেনিথের দুই কর্মীর কাছে পাওয়া গেল কী করে?”
“হাউ ডু আই নো?”
ভদ্রলোক হাত ওল্টালেন, “আমি ওদের কাউকে চিনতাম না!”
“কাউকে চিনতেন না? সিস্টার সুশীলা বা ডঃ সুকান্তকে জীবনে কখনও দেখেননি?”
এই রে! স্যার ফের দু-জনের নাম গুলিয়ে ফেলেছেন। অর্ণব ঠিক করে দিতেই যাচ্ছিল। তার আগেই বিরক্তিমাখা সূরে উত্তর দিলেন রণজয়, “না। আমি ডঃ সুজাতা বা ওয়ার্ডবয় সুশান্তকে জীবনেও দেখিনি। চিনি না। জানি না। এক কথা কতবার বলবেন? আর আমিই বা কতবার এক জবাব দেব?”
“আর ইউ শিওর যে ডঃ সুজাতাই? বা ওয়ার্ডবয় সুশান্ত?” তার তজনী ফের চিবুকের কাটা দাগটা ছুঁয়েছে, “আপনি এককথাই বলেছেন বটে, তবে আমার ভার্সানটা বোধহয় একটু অন্যরকম ছিল। আপনি ঠিক জানেন ওটা সিস্টার সুশীলা বা ডঃ সুকান্ত নয়?”
ইন্টারোগেশন রুমের বাইরে পবিত্র আচার্য আর মিস অরোরা দাঁড়িয়েছিল। পবিত্র চাপা গলায় বলে,
“উত্তেরি! আমি ভাবলাম ব্যাটা নাম ভুলে গেছে। কিন্তু এখন দেখছি, ইচ্ছা করেই দুটো নাম আর ডেজিগনেশন ভুলভাল বলেছে। চেকমেট!”
সে এবার টুইঙ্কলের দিকে তাকাল, “আপনার কী খিদে পেয়েছে মিস অরোরা?”
মিস অরোরা কাঁচুমাচু মুখে মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ স্যার। এই আধঘণ্টা আগেই মাত্র পাঁচটা চিকেন রোল খেয়েছি। ও তো পনেরো মিনিটেই হাজমা হয়ে গেছে। এখন পেটটা আবার পাতলা পাতলা লাগছে।”
“তাহলে নিজের পেট মোটা করে ফেলুন, তার সঙ্গে আমার জন্যও একটু পপকর্ন আর কোল্ডড্রিঙ্ক নিয়ে আসুন। রাজা ঠিক বিল দিয়ে দেবে।”
“আমার পেট মোটেই মোটা নয় পাজি।” অমনি তীব্র প্রতিবাদ, “আমার পেট একদম সলিড। বিলকুল …”
“হ্যাঁ হ্যাঁ। সলমন খানের মতো। আমরা সবাই জানি। হয়তো স্বয়ং সলমন খানও এতদিনে জেনে গেছে।” বলতে বলতেই ফস করে সিগারেট ধরিয়েছে পবিত্র আচার্য, “রাজা ফের দাবা খেলতে শুরু করেছে। উইদাউট পপকর্ন আর কোল্ডড্রিঙ্ক ঠিক এনজয় করা যাবে না। তাড়াতাড়ি করুন।”
“এত কথার দরকার কী বুঝি না।” টুইঙ্কল মতামত পেশ করে, “কানের গোড়ায় দুই লপ্পড় পড়লেই ব্যাটা সব উগরে দিত।”
“লপ্পড় পরে মারবেন মা চণ্ডী!” পবিত্র হাতজোড় করে ফেলেছে, “তার আগে যা যা বলেছি সেগুলো নিয়ে আসুন। বরং দোকানি দিতে দেরি করলে তাকেই না হয় খানদুয়েক লপ্পড় মেরে দেবেন।”
“ঠিক হ্যায়।”
টুইঙ্কল লাফাতে লাফাতে খাবার দাবার আনতে চলে গেল। পবিত্র ফের তামাশা দেখায় মন দেয়।
ইন্টারোগেশন রুমের ভেতরে তখন রনজয় দরদর করে ঘামছেন। বুঝতে পেরেছেন ভুলটা কোথায় হয়েছে! কোনোক্রমে বললেন, “আমি… আমি…!”
অধিরাজ কোনো কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ কিছু পেপারস এগিয়ে দেয় ওঁর দিকে, “এটা কী জানেন ডঃ বসু? কল ডিটেইল রেকর্ড বা সি ডি আর। এগুলো সব রুটিন এনকোয়ারিতে করতে হয় আর কী। আমরা প্রাথমিক তদন্তে যেমন হসপিটালের লোকদের বয়ান নিয়েছিলাম, সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ তন্নতন্ন করে দেখেছিলাম, তেমনই সন্দেহভাজন প্রত্যেকের কল লিস্ট বা কল রেকর্ডও বের করেছি। বাকিদের রেকর্ডে তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। কিন্তু আপনার কল ডিটেইল রেকর্ড শো করছে যে বারবার আপনি ডঃ সুজাতা রায়ের ফ্ল্যাটের ল্যান্ডলাইনে ফোন করেছেন। কিন্তু কখনওই পনেরো সেকেন্ডের বেশি কথা বলেননি। কী এমন সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিচ্ছিলেন? আই লাব্বু? ইউ আর মাই টুরু লাভ? নাকি মেরে ঝুলিয়ে দেব?” সে একটু থেমে ঘর্মাক্ত, আতঙ্কিত রণজয় বসুর দিকে জলের গ্লাস এগিয়ে দেয়, “কারণ আপনার কলের টাইমিং বলছে, যখন যখন আপনি ফোন করেছেন, ঠিক তারপরই সুজাতার একটি কল অবধারিতভাবে আমাদের কাছে এসেছে যেখানে উনি কমপ্লেইন করেছেন যে ওঁকে কেউ ওভার ফোন হুমকি দিচ্ছে! এখন বলুন, আতাগাছে তোতাপাখির মতো পুরো গান গাইবেন? না চুপ করে থাকবেন?”
জলের গ্লাসটা এক-নিমেষে ঢকঢক করে শেষ করে ফেললেন রণজয়। এমন খাবি খেতে খেতে জলপান করলেন যে অর্ণবেরই হাসি পেয়ে যাচ্ছিল। সে কোনোমতে নিজেকেই চিমটি কেটে ভয়াবহ গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে থাকে।
“আমি শুধু বাবাকে ডিফেন্ড করতে চাইছিলাম….!” কোনোমতে ঢোঁক গিলে বললেন তিনি, “ওই মেয়েটা বাবাকে ডিফেম করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। আমি শুধু ওকে ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দিতে চেয়েছিলাম…!”
“আর শেষপর্যন্ত তিনি চুপও হলেন।” অধিরাজের স্বরে কাঠিন্য, “যতদূর জানি আপনার বাবা আপনাকে বিন্দুমাত্রও প্রোমোট করেন না। বিশ্বাসও করেন না। যদি তাই হত তবে
নিজের টিমে আপনাকেই রাখতেন, কৌশিক চক্রবর্তীকে নয়। সেই রাগে আপনাদের মধ্যে কথাবার্তা বা মুখ দেখাদেখিও ি নেই। এমনকি আপনি বাড়ি ছেড়েও চলে গেছেন। তবে হঠাৎ করে এত পিতৃপ্রেম উথলে ওঠার কারণ। পিতা ধর্ম, পিতা স্বর্গ—কথাটা মনে পড়ে গিয়েছিল? নাকি পিতার অধর্ম এবং পিতার দেওয়া নরকযন্ত্রণা? কোনটা?”
“দেখুন…”
এবার নিজেকে কিছুটা শান্ত করে রণজয় বললেন, “মানছি ব্যাপারটা ছেলেমানুষি হয়ে গেছে। কিন্তু এর সঙ্গে বাবার প্রোফেশনাল ডিসিশনগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই। উনি যেটা ভালো বুঝেছেন, সেটাই করেছেন।”
“রাইট ইউ আর!”
সে ইতিবাচক মাথা নাড়ায়, “বেসিক্যালি উনি ঠিকই বুঝেছেন। অনেকেই আমাদের জানিয়েছেন যে আপনি যতই ডঃ সঞ্জয় বসুর ছেলে হোন না কেন, ওঁর পাঁচ পার্সেন্ট প্রতিভাও আপনার মধ্যে নেই। বরং ওঁর সুনাম ভাঙিয়েই আপনি খাচ্ছেন। ডঃ সঞ্জয় বসু আপনার বাবা না হলে কেউ আপনাকে চিনতই না। বেসিক্যালি আপনি ওঁর টিমের যোগ্যই নন। ডঃ বসু নিজেও জানেন বিদেশের ডিগ্রি থাকলেই ভালো ডাক্তার হওয়া যায় না। তার সঙ্গে নিজের মস্তিষ্ক ও প্রতিভাও লাগে যা আপনার নেই। ইউ আর আ টোট্যাল ইনকম্পিটেন্ট ডক্টর। সেজন্যই উনি সবসময়ই ডঃ চক্রবর্তীকে প্রেফার করেছেন। ওঁর কাছেই নিজের পেশেন্টদের রেফার করেছেন, আপনার কাছে নয়…!”
মুহূর্তের মধ্যে পিতৃপ্রেমের স্লোগান মুছে গেল। রণজয় নীচু অথচ তীব্র স্বরে বললেন, “কে বলেছে এসব ফালতু কথা? কৌশিক?”
অধিরাজ ফের ‘লে লুল্লু’ স্টাইলে ছাতের দিকে তাকিয়ে আছে। যেন সব তথ্য লুল্লু দিয়ে গিয়েছে। তার এই নীরবতায় আরও ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন তিনি,
“বাবার চয়েস চিরকালই ভুল। ডিসিশন মেকিং-এ ওঁর মতো ব্লান্ডার করতে আজ পর্যন্ত আর কাউকে দেখিনি। ওঁর প্রতিভার কথা বলছেন? বাবার সবচেয়ে বড়ো প্রতিভা হল, প্রত্যেকবার এমন ডিসিশন নেওয়া যেটা ওঁকে ডেস্ট্রয়ই করবে। চিরকাল সুইসাইডাল ডিসিশনই নিয়ে এসেছেন উনি। ইনফ্যাক্ট আমার মা-কে বিয়ে করাটাই ওঁর সবচেয়ে বড়ো ঐতিহাসিক ভুল। বিয়ে করলেন ঠিকই, কিন্তু জীবনেও স্ত্রীয়ের মর্যাদা দেননি, ভালোবাসা, প্রেম তো দুর। তার চেয়ে বরং অন্য নারীদের প্রতি প্রেম বেশি। ওঁর ভালোবাসা কখনও একজনের জন্যই নয়। আজ একে ভালো লাগে, তো কাল ওকে। কিছু কিছু ভালোবাসা থাকে যেগুলো সর্বনেশে ও বিষাক্ত। আমার বাবার ক্ষেত্রেও তাই। হি ইজ অ্যান আনফেইথফুল হাজব্যান্ড, আনফেইথফুল ফাদার, আনফেইথফুল লাভার, আনফেইথফুল সান অ্যান্ড ব্রাদা অলসো। বাবার ভালোবাসা আর সর্বনাশ–প্রায় একই। যাকে যাকে উনি ভালোবেসেছেন, সবাইকে বরবাদ করেই ছেড়েছেন।”
“কীরকম?”
“ওঁর কাছে ভালোবাসার মানুষেরা অনেকটা বাচ্চাদের খেলার পুতুলের মতো। যতক্ষণ খেলছেন, ভালো লাগছে ততক্ষণ বুকে আঁকড়ে রাখবেন। কিন্তু যেই খেলার শখ মিটে গেল অমনিই পুতুলটার ঘাড় মটকে দেবেন, তার চোখ খুবলে নেবেন, তার হাত পা ভেঙে ভেঙে টুকরো করবেন। তারপর আবার নতুন পুতুল পছন্দ হলে সেটার দিকে হাত বাড়াবেন। জানেন, শৈশবে ওঁর কী অভ্যাস ছিল? যে ফুলটা পছন্দ হত, সেটাকে আদর করতেন, গন্ধ শুঁকতেন। কিন্তু যেই শখ মিটে যেত অমনিই ফুলটার পাপড়ি ছিঁড়ে ছিঁড়ে পায়ের নীচে পিষে ফেলে দিতেন। এই অভ্যাস আজও আছে। কয়েকদিন আগেই ‘সিম্বা’, ওঁর ফেভারিট গোল্ডেন রিট্রিভারকে লিখাল ইঞ্জেকশন দিয়ে মেরেছেন। কারণ সিম্বা ওঁর কথা শুনছিল না। ওঁর অর্ডারকে ওবে করছিল না! হি কলড সিম্বা আনফেইথফুল! সেই ছোট্টবেলা থেকে যাকে মানুষ করেছেন, আট বছর ধরে যাকে মাথায় করে রেখেছেন–স্রেফ তার একটা ডিসওবিডিয়েন্সি, বা বলতে পারেন দুষ্টুমির জন্য নিজের হাতেই তাকে শেষ করে দিলেন! এটা আমি স্বচক্ষে দেখেছি। কিন্তু আমার ঠাকুমা বলেন এর আগেও উনি ওঁর অনেক ভালোবাসার ‘পেট’-কে মেরেছেন। ওঁর পোষা কুকুর বিড়ালরা কথা না শুনলেই, বা আদর করার সময় কামড়ে দিলেই উনি তাদের শেষ করে দিতেন। ইভেন একটা কাকাতুয়া ওঁর হাত থেকে বেদানা খেতে গিয়ে ভুল করে হাত ঠুকরে দিয়েছিল। বলা ভালো, তার ঠোঁটে ভুলবশতই লেগে গিয়েছিল। বাবা তৎক্ষণাৎ কাকাতুয়াটার ঘাড় মটকে…!”
রণজয় এক নিঃশ্বাসে গড়গড়িয়ে বলে গেলেন। তারপর হয়তো একটু দম নেওয়ার জন্য বিরতি দিয়েছেন। অধিরাজের ঠোঁটে নীরবে ইন্ডিয়া কিংস জ্বলে ওঠে। সে চুপচাপ পরের কথাগুলো শোনার অপেক্ষা করছে।
“শুনেছি বিয়ের আগে ওঁর মাল্টিপল অ্যাফেয়ার্স ছিল। মেডিক্যাল কলেজের ক্যাসানোভা ছিলেন। কিন্তু যাদের ভালোবাসলেন, তাদের বিয়ে করলেন না। যাঁকে বিয়ে করলেন তাঁকে ভালোবাসলেন না। আমাকে তো চিরকালই ‘দুর ছাই’ করেছেন। কারণ ওঁর পছন্দ একদমই আলাদা। যার জন্য ঠাকুদা-ঠাকুমাকে অবহেলা করেছেন। নিজের বোনকে পর্যন্ত খুন করতে গিয়েছিলেন যেহেতু সে ওঁর পছন্দের ছেলেকে বিয়ে না করে নিজের প্রেমিককে বিয়ে করেছিল। ওঁর ভালোবাসার মানুষ হতে গেলে স্বাভাবিক হওয়া চলে না। যতরাজ্যের উদ্ভট উদ্ভট লোককেই উনি বেশি পছন্দ করেন। এই হচ্ছেন আমার বাবা! দ্য গ্রেট ধন্বন্তরি ডঃ সঞ্জয় বসু!”
“আই সি!” অধিরাজ আগুনে আরও বেশি ঘৃতাহুতি দেয়, “তার মানে আপনি ওঁর পছন্দের তালিকায় পড়েন না। তাই না?”
“একদমই না। আর সেটা ওঁর চরিত্রগত দিক দিয়ে সম্ভবও নয়।” রণজয় একটু থেমে উত্তেজিত হয়ে বলেন, “আপনি বললেন না আমি ওঁর যোগ্য নই?”
“ইয়েস। কথাটা কী সত্যি নয়?”
“একদমই সত্যি। কিন্তু তার আগে বাবার যোগ্যতার মাপকাঠিটাও দেখে নিন।”
ওঁর গলায় তিক্ততা, “আপনি জানেন ওঁর টিমে যারা কাজ করেন তারা প্রত্যেকে একেকজন হিস্ট্রিশিটার! সবাই কোল্ডব্লাডেড মার্ডারার! একজনও এমন নেই যে-কোনো বে-আইনি কাজ করেনি বা করে না। আর এরাই ওঁকে ডোবানোর জন্য যথেষ্ট। আর এই যদি যোগ্যতার মাপকাঠি হয়, তবে আমিও একদিন দেখিয়ে দেব যে ওদের থেকে বুদ্ধিতে, মেধায়, বিদ্যায়, কৌশলে, প্রতিভায় রণজয় বসু অনেক এগিয়ে।”
“মানে?”
এতক্ষণে এই গর্দভচর্মাবৃত সিংহের মুখোশটা খসে মুখ বেরিয়ে পড়ল। হিসহিস করে বললেন, “ছোটোবেলা থেকেই বাবা আমাকে আন্ডারএস্টিমেট করে এসেছেন! আমাকে কাওয়ার্ড, ভীতু, এসকেপিস্ট, হাতুড়ে ডাক্তার–এসবই বলতেন। কারণ আমি একটু শান্ত প্রকৃতির। কোনোদিন মারপিট করিনি। উলটে একতরফা মার খেয়েই চলে এসেছি। মেডিক্যালের এন্ট্রান্স অন্যদের মতো একবারে পাশ করতে পারিনি। তিনবার ট্রাই করতে হয়েছে। সেজন্য আমি নাকি হাতুড়ে ডাক্তার। চিটিং করে বিরাট বিরাট সার্টিফিকেট না এনে কষ্ট করে, নিজের ঘামরক্ত ঝরিয়ে, পরিশ্রম করে বিদেশের স্কলারশিপ পেয়ে তবেই পড়াশোনা করেছি। বাবা তো আমাকে একপয়সাও দেননি। কোনোরকম সাহায্যই করেননি। কথায় কথায় ল্যাবটেস্টের অছিলায় ল্যাবগুলোর কাছ থেকে কমিশন খাই না, মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভরা মোটা প্যাকেজ দেখালেই নির্বিবাদে তাদের ভুলভাল ওষুধ প্রেসক্রাইব করি না। সেটা নাকি আমার অপদার্থতা। আমার নাকি কোনো ‘গোল’, কোনো ‘অ্যাম্বিশনই’ নেই। আমার বাবার মতে, ভালো ডাক্তার অনেকেই হয়। কিন্তু লিজেন্ড হতে গেলে যেমন কিছু ভালো কাজ করতে হয়, তেমন এমন কিছু কাজও করতে হয় যা চূড়ান্ত খারাপ! আপাদমস্তক ভগবানরা দুনিয়ায় টেকে না। এখানে টিকতে হলে, বড়ো কিছু করতে হলে শয়তান হতে হয়। এটাই ওঁর ফিলোজফি। আপনি কৌশিকের কথা বলছিলেন না? বেসিক্যালি ওই আর একজন। আমার বাবার জন্য ও-ই একদম ঠিক। বাবার সুযোগ্য বদমায়েশ সন্তান হওয়ার যোগ্যতা ও রাখে বলেই ওর প্রতি এত ভালোবাসা উপছে পড়ে। কিন্তু…”
“কিন্তু? কিন্তু কী?’
“আপনাকে বললাম না? আমার বাবার ভালোবাসার মতো ডেঞ্জারাস ও বিষাক্ত জিনিস কমই আছে। তার নমুনা শুনলেনও তো?” তিনি অদ্ভুতভাবে হাসলেন, “কৌশিকও রক্ষা পাবে না। শুধু একটা ভুল করা দরকার…!”
“সে ওঁর যা-ই হোক…!”
অধিরাজের মুখে ব্যঙ্গাত্মক হাসি, “কিন্তু আপনার কিস্যু করার নেই। আজীবন আপনি মিডিওকার হয়েই থাকবেন। সুজাতাকে বোকার মতো হুমকি দিয়ে, নিজের বাবাকে পুলিসের চোখে আরও সন্দেহভাজন করে তুলতে চাইছিলেন না? ব্যাপারটাকে এমনভাবে সাজাতে চাইছিলেন যেন উনিই সুজাতাকে হুমকি দেওয়াচ্ছেন। কিন্তু নিজেই ধরা পড়লেন। আপনার দ্বারা এই সামান্য কাজটাই ঠিকমতো হল না তো আর কী হবে? এই অবধিই তো আপনার দৌড়। শয়তান হওয়া আর যা-ই হোক আপনার কম্ম নয়। এর বেশি কিছু করার জন্য কলজে লাগে। ইওর ফাদার্স অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন অ্যাবাউট ইউ ইজ অ্যাবসোলিউটলি কারেক্ট। আপনি একজন মধ্যমেধার মানুষ, যে কী না কোনো কাজই পারফেক্টলি করতে পারে না।”
“কোনো কাজ পারফেক্টলি করি না? তাই বুঝি?”
রণজয় বসুর দৃষ্টি একটু যেন ঘোলাটে হয়ে যায়। তিনি মাথা নেড়ে হেসে বলেন, “আপনিও আমায় আন্ডারএস্টিমেট করছেন। বাট, বিলিভ মি …। আমি মাঠে নামলে ওরা কেউ থাকবেই না। বাবা চিরকাল আমার যোগ্যতার প্রমাণ চেয়েছেন। প্রমাণ করে দেব যে আমি ওদের থেকে তো বটেই, এমনকী আমার বাবা ডঃ সঞ্জয় বসুর থেকেও অনেক বেশি প্রতিভাশালী, অনেক বেশি বুদ্ধিমান। ওরা যা ভাবতেও পারে না, আমি তা করে দেখাই। আমি সবকিছুতেই ওদের থেকে অনেক এগিয়ে। দরকার পড়লে শয়তানিতেও। আই অ্যাম দ্য বেস্ট! বাবা কথায় কথায় বলেন না, প্রুভ ইট? আই উইল প্রুভ ইট!”
অর্ণব হতবাক হয়ে দেখে ওঁর চাউনি আর হাসিতে এই মুহূর্তে কোনো সুস্থ মানুষের লক্ষণই নেই। বরং তিনি একটা চূড়ান্ত অবসেসড মানুষ যে নিজেকে সেরা প্রমাণ করার জন্য, নিজেরই বাবাকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য সবকিছু করতে পারেন। যে-কোনো পর্যায়ে যেতে পারেন। এ কী আদৌ কোনো ডাক্তারের কথা। না মানসিক রোগীর।
তার মেরুদন্ড বেয়ে হিমেল স্রোত নেমে গেল। কিছুক্ষণের জন্য যেন একটা জড়তা তাকে গ্রাস করে নেয়। রণজয় বসু যা যা বলছেন, সজ্ঞানে বলছেন তো? তাছাড়া সঞ্জয় বসুর চরিত্রও যা শুনল তাতে তার রক্ত হিম হয়ে গিয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ কথা—এরা সবাই ডাক্তার! হাজার হাজার, লাখ লাখ প্রাণ ওঁদের হাতে! কত মানুষের বাঁচা-মরা যে নির্ভর করে তার ঠিক নেই। অথচ এরা তো নিজেরাই মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়ে একেকজন ভয়াবহ খুনী। …
অর্ণব কতক্ষণ ওখানেই স্তম্ভিত ও বাহ্যজ্ঞানরহিত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তার ঠিক নেই। সম্বিৎ ফিরল অধিরাজের মোলায়েম কণ্ঠস্বরে, “অর্ণব, তুমি এবার শ্বাস নিতে পারো। রণজয় বসু আপাতত গেছেন। চাইলে একটু বসে রেস্টও নিয়ে নাও। অনেক কাজ পড়ে আছে।”
অর্ণব প্রায় ধপ করে বসে পড়েছে সামনের চেয়ারে। কোনোরকমে স্খলিত গলায় বলল, “স্যার, আপনি ওঁকে ছেড়ে দিলেন! এ লোকটাকে তো হয় জেলে নয় মেন্টাল অ্যাসাইলামে ঢোকানো উচিত! শুধু উনি নন, ওঁর বাবাকেও। ডঃ চ্যাটার্জি কার অ্যাডভোকেসি করছিলেন?”
“ডক ডঃ বসুর যে রূপটা দেখেছিলেন তারই অ্যাডভোকেসি করছিলেন।” সে মুচকি মুচকি হাসছে, “আমিও ওঁর বয়ান মিলিয়ে দেখেছি। উনি ঠিকই বলেছেন। কলেজ জীবনে ডঃ বসু প্রচুর আহত জীবজন্তুদের সযত্নে সেবা করতেন। এবং সত্যি সত্যিই একটি চড়ুইপাখির ছানার মৃত্যুতে কেঁদে ভাসিয়েছিলেন। ডঃ চ্যাটার্জির স্টেটমেন্ট একদম সত্যি! কিন্তু উনি এটা জানতে পারেননি যে যেসব আহত কুকুর-বিড়ালদের পরিচর্যা সঞ্জয় বসু করেছিলেন, তাদের আহত তিনি নিজেই করেছিলেন। আর যে চড়ুইয়ের ছানাটার মৃত্যুতে ওঁর শোক উথলেছিল, তাকেও উনি নিজের হাতেই মেরেছিলেন।”
তথ্যগুলো যেন এক একটা বাজের মতো অর্ণবের মাথায় পড়ছিল। সে অতিকষ্টে বলে, “আপনি… কী করে….।”
“ইনফর্মাররা কী করতে আছে ডার্লিং?” সে ঘাড় কাত করে সেই শিশুসুলভ হাসি হাসল, “তাছাড়া মিস চাউমিন বল্ডকে একদমই আন্ডার এস্টিমেট কোর না। তিনি আমার নির্দেশেই সুহাসিনীকে ছেড়ে ডঃ বসুর সবচেয়ে বড়ো রাইভ্যাল ডঃ কৃশানু রায়কে চুপচাপ শ্যাডো করছিলেন। কৃশানু সঞ্জয়ের থেকে বেশ কয়েকবছরের জুনিয়র হলেও পু-জনের মধ্যে একসময় দারুণ বন্ধুত্ব ছিল। ডঃ চ্যাটার্জি একটা সময়ের পর আর সঞ্জয়ের কন্ট্যাক্টে ছিলেন না। কিন্তু কৃশানু সহপাঠী না হলেও, ডঃ বসুর হসপিটালেই, ওঁর আন্ডারেই ইনটার্নশিপ করেছিলেন। তাই ডকের চেয়ে বেশি তথ্য তাঁর কাছেই থাকার কথা। তবে এইসব খবরের তথ্যসূত্র তিনিও নন, তাঁর স্ত্রী। মিসেস চন্দ্রাবলী রায়। তিনি কপালগুণে সঞ্জয়ের কলেজেই পড়তেন এবং ওঁদের সঙ্গে একই হসপিটালে কয়েকবছর ইন্টার্নশিপও করেছেন।” সে হাসতে হাসতেই জুড়ল, “সঞ্জয় আর কৃশানুর লাভ ইন্টারেস্টও কমন ছিল। অধুনা মিসেস চন্দ্রাবলী রায়ের পেছনে একসময় সঞ্জয়ও কম ঘোরেননি। কিন্তু চন্দ্রাবলী মেডিক্যাল কলেজে পড়াকালীন নিজের চোখে গুণধর পূজ্যপাদ সিনিয়রকে ইচ্ছাকৃতভাবে রাস্তার কুকুর আর বিড়ালদের গাড়ি চাপা দিতে বা পেটাতে দেখেছিলেন। তারপর তাদের পরিচর্যাও করতে দেখেছেন। উপরন্তু চড়ুই পাখির ছানার গলা টিপেও মারতে তিনিই দেখেন। ভয়ের চোটে কাউকে কিছু বলেননি। কিন্তু তোমার মনে হয় এরকম চরিত্রের কোনো পুরুষকে কোনো নারী জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেবে? যে ভালোবাসা দেখানোর জন্য নিরীহ পশুদের ওপর আগে অত্যাচার করে বা ভালোবেসে একটা ছোট্ট পাখির ছানাকে গলা টিপে মাবে, তার ভালোবাসা থেকে দূরে থাকাই ভালো। তিনি স্বাভাবিকভাবে কৃশানুকেই বেছে নিয়েছিলেন। আর তারপর থেকেই কৃশানু ওঁর বন্ধু থেকে রাইভ্যালে প্রোমোটেড হয়েছেন। তবে কলেজের কীর্তি কৃশানু আজও জানেন না। ওটা চন্দ্রাবলী চেপেই গিয়েছেন।”
“কিন্তু… কিন্তু চাউমিন এগুলো জানল কী করে!”
“ওঁর জন্য খুব ইজি।” সে জানায়, “চন্দ্রাবলী এখন ডাক্তারি ছেড়ে হোমমেকার হয়েছেন। তবে ওঁর সাহিত্য পড়ার প্রবল নেশা। আর মিস বন্ড নিজেই সাহিত্যের ছাত্রী। ক্রাইম থ্রিলারের ওপর মিসেস রায়ের মারাত্মক ফ্যাসিনেশন। তাই যে লাইব্রেরিতে মিসেস রায়ের যাতায়াত সেখানেই একজন সিরিয়াস পাঠিকা হিসেবে মিস বন্ডও ঢুকেছেন ও ক্রাইম থ্রিলারের জ্ঞান দিয়ে, ভালো ভালো বই সাজেস্ট করে মহিলাকে বোল্ড আউট করেছেন। বর্তমানে ডঃ ডেথের কেসটা সবচেয়ে বেশি আলোচ্য বিষয়। তাই মিস বন্ডের ওঁকে ইমপ্রেস করে, পটিয়ে পাটিয়ে খবর বের করতে একটুও কষ্ট হয়নি।”
অর্ণব এখন রীতিমতো চোখে অন্ধকার দেখছে, “স্যার, আমার এখন সঞ্জয় বসুকেই ডঃ ডেথ বলে মনে হচ্ছে। তবে রনজয় বসুও কম যান না।”
“হুঁ।”
অধিরাজের চোখে শাণিত সতর্কতা, “ভুলে গেলে চলবে না যে রণজয়ের ধমনীতে কিন্তু সঞ্জয়েরই রক্ত বইছে। দু-জনের মধ্যে জেনেটিক কানেকশন আছে। তাই এমন ভাবার কোনো কারণ নেই যে রণজয়ের মধ্যে সঞ্জয়ের হিংস্রতা নেই। বরং অনেক বেশিই থাকার কথা। আর সেই হিংস্রতা আগ্নেয়গিরির মতো আগুনমুখো। এক্সপ্লোডেড হলে সব ছারখার করে দেবে।”
“রণজয় সঞ্জয়ের থেকে বেশি ডেঞ্জারাস কী?”
অর্ণবের কাঁধে সস্নেহে হাত রাখল অধিরাজ, “নিঃসন্দেহে। সঞ্জয়ের কীর্তিগুলো ভয়াবহ। কিন্তু রণজয়ের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে একবার দ্যাখো। দুনিয়ায় এমন কোনো শিশু নেই যে বাবার ভালোবাসা, প্রোটেকশন বা স্নেহ-আদর চাইবে না। তার বদলে কী পেয়েছেন? অবহেলা, বিরক্তি, কটূক্তি, ‘অপদার্থ’ বিশেষণ। ওঁর কথাবার্তায় মনে হল চাইল্ডহুড টুমা থাকাও অসম্ভব নয়। রণজয়ের কথার মধ্যে যতখানি রাগ-ঘৃণা ছিল, ঠিক ততটাই বাবার অ্যাটেনশন পাওয়ার, তাঁর কাছে নিজেকে প্রমাণ করার অদম্য ইচ্ছে আর ক্ষুধাও ছিল। এগুলোও কিন্তু একধরনের বিষাক্ত ভালোবাসা। অবহেলা, তিরস্কার পেতে পেতে ভদ্রলোক একদম ডেসপারেট হয়ে গেছেন। যে-কোনো মূল্যেই নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেই ছাড়বেন। ইভেন তার জন্য শয়তান হতেও আপত্তি নেই। কারণ সঞ্জয়ের ফেভারিট লোকগুলো সব শয়তান! ইন্টারেস্টিং বাট ট্র্যাজিক।”
“স্যার, ওঁকে আরও কিছুদিন আটকে রাখতে পারতেন” সে আস্তে আস্তে বলছে, “ওঁর মধ্যেও ডঃ ডেথ হওয়ার চান্স প্রবল…!”
অধিরাজ কিছু বলার আগেই এবার জুতো গটগটিয়ে রুমের ভেতরে পবিত্র আচার্য ঢুকে আসে। কারওর মতামতের অপেক্ষা না করেই একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়ে বলল, “আমি তো যেদিকে তাকাচ্ছি সেদিকেই ডঃ ডেথ, সিস্টার ডেথ, ওয়ার্ডবয় ডেথ–সবই দেখতে পাচ্ছি। ইনফ্যাক্ট আমরা যাদের যাদের সন্দেহ করছি বা ধরতে যাচ্ছি, তারাই হয় মার্ডার হচ্ছে, নয় হাফ মার্ডার হচ্ছে। এটা কিন্তু অ্যালার্মিং।”
কথাটা পবিত্র ভুল বলেনি। প্রথমে ওয়ার্ডবয় সুশান্ত মারা পড়ল। এখন ওয়ার্ডবয় রতন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা কষছে। সুজাতা আর কী কী জানত তা আর জানা সম্ভব নয়। সুশান্ত তার খুনী। কিন্তু সেও মরল। ওখানেও ডেড-এন্ড। এরপর দ্বিতীয় একজন ওয়ার্ডবয়কে ম্যানিপুলেট করে খুন করানো হল। রতনও খুনী। কিন্তু সে-ও ছাড়া পায়নি। এখনও সে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। তবে তার কাছে বিশেষ তথ্য পাওয়া যায়নি।
শেষে সন্দেহের তীর গেল ডঃ কৌশিক চক্রবতীর দিকে। কিন্তু সেখানেও বাধা। তাঁর মা-কে বাচানো সম্ভব ছিল না। কণ্ঠনালী একটানেই কেউ দ ফাঁক করে দিয়েছিল। ওখানেই স্পট ডেড। কিন্তু কপালগুণে কৌশিক আপাতত প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন। তবে তাঁর অবস্থাও ভালো নয়। তাঁকে ছুরি না মারলেও গুলি মারা হয়েছে। সবচেয়ে ভয়ের কথা, সেই গুলি তাঁর স্পাইনাল কর্ডের থোরাসিক স্পাইনে এখনও আটকে আছে। টপ নিউরোসার্জেন, ডঃ শেঠিও হাত লাগাতে ভয় পাচ্ছেন। কৌশিকের আগের মেডিক্যাল হিস্ট্রি ও বর্তমানের স্বাস্থ্যের দুর্বল অবস্থা দেখে নিউরোসার্জেনরা ওঁকে ও.টিতে তুলতেই চাইছেন না। আশঙ্কা, পেশেন্ট অপারেশন থিয়েটারেই কোলাপ্স্ করবে। সাবার ডক্টর শেঠি এ-ও জানিয়েছেন যে থোরাসিক স্পাইনে গুলি লাগার ফলে প্যারালাইসিস থেকে যেটুকু রিকভারি হয়েছিল, তার দ্বিগুণ ক্ষতি হল! আর কোনোদিন তিনি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন না। স্টিক নয়, আশ্রয় হুইলচেয়ার। কারণ স্পাইনাল কর্ডে গানশটের ধাক্কায় কোমরের তলা থেকে ফের কমপ্লিট প্যারাপ্লেজিয়া তথা প্যারালাইসিস হয়ে গিয়েছে। এখন নিউরোলজিক্যাল নানারকম সমস্যার সঙ্গেও প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হবে তাঁকে। কারণ বুলেটটা মেরুদন্ডে ফ্র্যাকচার আর ডিসলোকেশনও ঘটিয়েছে। ওপরন্তু ওঁর ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণে যদি বুলেটটাকে কখনওই বের করা না যায়, তবে সেটা আস্তে আস্তে স্পাইনাল ক্যানালগুলোতে ইনফেকশন ছড়াবে। তারপর গোটা শরীরকে বিষাক্ত করবে। অর্থাৎ কৌশিকের ডাক্তারি কেরিয়ারের অকালমৃত্যু তো ঘটলই, উপরন্তু সার্জেনরা ভয় পাচ্ছেন যে সাময়িকভাবে প্রাণটা রক্ষা পেলেও কৌশিকের সামনে একটা অসম্ভব পেইনফুল ও স্লো ডেথ ছাড়া আর কিছুই নেই। একটু একটু করে কষ্ট পেতে পেতে একদিন মৃত্যুর কোলেই ঢলে পড়তে হবে। দুনিয়ার কোনো সার্জেনের ক্ষমতা নেই, ওই বিধ্বংসী বুলেটটাকে ওঁর স্পাইনাল কর্ড থেকে বের করে আনে।
কৌশিক চক্রবর্তী যতই শয়তান হোন, বেইমানি করুন, কিংবা ডঃ ডেথ হওয়ার যোগ্যতা যতই থাকুক–তাঁর এরকম ট্র্যাজিক মৃত্যু কারওরই কাম্য ছিল না। তিনি আস্তে আস্তে আরোগ্যের পথে যাচ্ছিলেন। মেডিক্যাল কেরিয়ার আবার ডানা মেলছিল। ডঃ বসুর সঙ্গে আইনি যুদ্ধও চালিয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু নিয়তি তাঁকে চিরদিনের জন্য থামিয়ে দিল। যেমন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিল রতনকে। যদি প্রাণে বেঁচেও যায়, বৃদ্ধ মা-বাবার একমাত্র অন্ধের যষ্টি ও সংসারের একমাত্র কামানেওয়ালা মানুষটি পরিবার সুদ্ধ এরপর স্রেফ না খেতে পেয়েই মরবে। ভগবান জানেন, এরপর কার পালা।
পবিত্রর কথায় আস্তে আস্তে মাথা নাড়ল অধিরাজ। “সমস্ত সাসপেক্টদের সিকিউরিটির বন্দোবস্ত করো পবিত্র।” সে ফিশফিশ করে বলে, “কাউকে ছাড়বে না। কৃশানু রায়কেও নয়। আমরা এখনও জানি না যে মাস্টারমাইন্ড কে। কিন্তু সে আছে…। ডেফিনিটলি আছে…। আবারও কোনো না কোনো মৃত্যু ঘটা অসম্ভব নয়…”
“আবার মৃত্যু। কার?”
প্রশ্নটা একসঙ্গে পবিত্র ও অর্ণব দু-জনেই করল। দু-জনের মুখই ভয়ে বিবর্ণ।
“জানি না।” সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “জানলেও হয়তো ঠেকানো যাবে না। এইটুকু বলতে পারি, অতিরিক্ত ভালোবাসা—তা নিজের প্রতি হোক কী অন্যের প্রতি, তার চেয়ে বড়ো বিধ্বংসী জিনিস আর কিছু নেই!”
বলতে বলতেই অধিরাজ আকাশের দিকে তাকায়। ঈশান কোণে জমে আছে ধূম্রবর্ণ মেঘ। বাতাসে গুমোট ভাব। গাছপালার একটা পাতাও নড়ছে না…!
ঝড় আসবে?
