৭
লেডি ইনফর্মার মিস বন্ডের এই বন্ধ-ব্লাস্টিং নিউজটি আসার আগে থেকেই অবশ্য সি আই ডি হোমিসাইড ডিপার্টমেন্ট প্রায় হিরোশিমা নাগাসাকি হয়েই ছিল। যতই প্রণবেশ লাহিড়ী কার্লোস আর প্রিয়া বাজাজের পেছনে দৌড়োন, মিডিয়ার সমস্ত লাইমলাইট পেয়ে বসে আছে—ডঃ ডেথ কেস! তার ওপর স্বয়ং ডঃ সুজাতা রায়, একমাত্র যে মানুষটি সঞ্জয় বসুর বিপরীতে পাহাড়প্রমাণ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তার আচমকা খুন হয়ে যাওয়াটাই জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে পেট্রোলের পিপে উলটে দিয়েছে। সুজাতা যতদিন বেঁচে ছিল, ততদিন কিছু মানুষ তাকে প্রতিবাদী তকমা দিলেও বেশিরভাগ লোকই ‘ফুটেজখোর’, ‘সঞ্জয় বসুকে ডিফেম করার ষড়যন্ত্রকারী’ হিসেবেই দেখছিল। অনেকে তো তারই ফাঁসি দাবি করেছে। কিন্তু যে মুহূর্তে সোচ্চার মানুষটা নীরব হয়ে গেল, ঠিক সেই মুহূর্তেই গোটা শহরের বুকে নেমে এল সন্দেহের মেঘ! ডঃ সুজাতা রায়ের কথাই সত্যি ছিল না তো! এই আশঙ্কা নিমেষেই দাবানলের মতো গোটা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। জেনিধের পেছনের অন্ধকারই কী তাকে গ্রাস করল? তার প্রতিবাদ করাটাই কী খুনের মোটিভ হয়ে দাঁড়াল। সত্যি কথা বলাই কাল হল কী এই সেডি ডক্টরের? হয়তো তার আরও অনেক কিছু বলার ছিল। আরও অনেক বিষয়ে আলোকপাত করতে পারত সে। অথচ সমস্ত বক্তব্য, সমস্ত অজানা তথ্য নিজের গভীরে রেখেই চিরঘুমে তলিয়ে গেল ডঃ সুজাতা!
হ্যাঁ, খুনই বটে। পোস্টমর্টেমের দরকারও ছিল না। সুজাতা রায়ের ঝুলন্ত লাশটাকে যখন মিস বোস আর মিস অরোরা নামিয়ে এনে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিল, তখনই তার গলার দাগের প্যাটার্ন অধিরাজের অভিজ্ঞ চোখকে বলে দিয়েছিল যে এটা কোনোমতেই আত্মহত্যা নয়—খুনই। তবু বিন্দুমাত্রও সন্দেহের অবকাশ না রেখে সে তৎক্ষণাৎ ফরেনসিক টিমকে ডেকে পাঠায় অকুস্থলে।
“রাজা, আত্মহত্যার কোনো চান্সই নেই।”
ডঃ চ্যাটার্জি মৃতদেহ পরীক্ষা করে সখেদে মাথা নাড়লেন, “পোস্টমর্টেমের আগেই বলে দিতে পারি যে এটা মার্ডার। ডঃ রায় নিজে থেকে গলায় দড়ি দেননি। বরং আগে ওঁকে গলা টিপে খুন করে কেউ স্রেফ লাশটাকে ঝুলিয়ে দিয়েছে। এই দ্যাখো…।”
বলতে বলতেই তিনি লাশের হাত, আর পিঠের কিছু অংশ দেখালেন। সেখানে কালশিটে পড়েছে। জায়গায় জায়গায় আঁচড়ের দাগ।
“হতভাগ্য মেয়েটি মরার আগে স্ট্রাগলও করেছিল। কিন্তু নিজেকে বাঁচাতে পারেনি,” তিনি ভুরু কুঁচকে ওর গলার দাগটা দেখে বললেন, “গলায় দড়ির ছাপ তেমন পড়েইনি। বরং একজোড়া শক্তিশালী হাতের ছাপ চেপে বসে আছে। খুনী এখানেই ভুল করেছে। গ্লাভস ইউজ করেনি। উপরন্তু এমন জোরে গলা টিপে ধরেছে যে গলার হাড়ই ভেঙে গেছে। ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া যাবে বলেই মনে হয়।”
বলতে বলতেই তাঁর নজর ঘুরল মিস আহেলি মুখার্জির দিকে। সে তখন ক্রাইম স্পট খুঁটিয়ে দেখে এভিডেন্স কালেক্ট করার চেষ্টা করছিল। হেঁড়ে গলায় হাঁকার দিয়ে বললেন তিনি, “এই যে মিস লি, বার অ্যাট ল। ঘরের মধ্যে খামোখা ট্যুর না করে লাশের গলা থেকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট তোলো।”
বসের আদেশ পাওয়া মাত্রই আহেলি তাড়াতাড়ি এদিকেই এগিয়ে আসে। অধিরাজের পাশ দিয়ে যখন সে দ্রুতবেগে হেঁটে গেল ঠিক তখনই একটা অতি পরিচিত সুগন্ধ ঝাপ্টা মেরেছে তার নাকে। শান্ত, কিন্তু…।
কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন অধিরাজের মাথাটা টাল খেয়ে যায়! এই গন্ধটা তার প্রত্যেকবারই এত পরিচিত লাগে কেন। মিস মুখার্জি যখন হেঁটে গেলেন, তখন ওঁর দেহের উষ্ণতাটাও যেন জন্মজন্মান্তরের এক ঝাপসা স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য চোখে অন্ধকার দেখল সে। চোখের সামনে সব ঝাপসা। শুধু একটা আবছা অবয়ব…একটা অপরিচিত মুখ…উষ্ণতা… কোমল মমতাময় স্পর্শের ওম… আর অদ্ভুত নিরাপত্তামাখা একটা গন্ধ। মাথার মধ্যে কে যেন ফিশফিশ করে বলল, “আমি তোমায় ছেড়ে কোথাও যাব না… আমি এখানেই আছি…।”
কেন যে এমন হয় তা অধিরাজ নিজেও জানে না। মাঝেমধ্যেই স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যে গুলিয়ে যায়। সে নিজেকে সামলে নিয়ে ফের দুর্বল স্বরে বলল, “মিস মুখার্জি… আপনার পারফিউম…!”
আহেলি ফের ঘাবড়ে যায়। ডঃ চ্যাটার্জিও সভয়ে তার দিকে অপলকে তাকিয়ে আছেন। এই কিছুদিন আগেই ছেলেটা বড্ড নিষ্ঠুর আঘাত পেয়েছে। আজও সেই ট্রমা থেকে পুরোপুরি রিকভার করতে পারেনি। এখনই ওর পুরোনো ক্ষত তাজা করে দেওয়ার কোনো মানে হয় না!
আহেলিও ভেতরে ভেতরে দুর্বল হয়ে পড়ছিল। মানুষটা আজও তাকে চিনতে পারল না। ভেতরে ভেতরে সে চিৎকার করে কাঁদতে চাইছিল। তবু প্রকাশ্যে বিরক্ত হয়ে বলে, “আপনি আবার আমার পারফিউমের পেছনে পড়েছেন। আগেই তো বলেছি, এই ব্র্যান্ডটা অনেকেই ব্যবহার করে। আপনার পছন্দ হলে বলুন, বাড়িতে পাঠিয়ে দেব। মেখে বসে থাকবেন।”
এক ঝটকায় অধিরাজের সব ঘোর কেটে যায়। সে রাগতস্বরে বলে, “আমি লেডিজ পারফিউম মাখি না। পারলে একটা লিকুইড বেটাডিন পাঠিয়ে দেবেন। ওটাই আপনার সিগনেচার স্টাইল কী না। আর ওটার গন্ধও আপনার এই বস্তাপচা পারফিউমের থেকে ঢের ভালো।”
তার পারফিউমকে বস্তাপচা বলায় আহেলির নাকের পাটা ফুলে গিয়েছে। সে ব্যঙ্গাত্মক স্বরে বলে, “তার চেয়ে বরং ধাপার মাঠে গিয়ে গড়াগড়ি দিয়ে আসুন। ওটাই আপনাকে স্যুট করে। যত্তসব।”
“আরে, এ তো আশ্চর্য হালুয়া!”
এবার ডঃ চ্যাটার্জি ভুরু পাকিয়ে মাঠে নেমেছেন, “সামনে লাশ পড়ে আছে, আস্ত একটা ক্রাইমসিন উপস্থিত-কোথায় তার ব্যবস্থা করবে, তা নয় ফের কার্গিল ওয়ার লাগিয়ে দিয়েছ তোমরা।”
বকা খেয়ে অধিরাজের সম্বিত ফিরল। সে মাথা নীচু করে অনুতপ্ত স্বরে বলে, “সরি ডক!”
“হোয়াট সরি।” তিনি গর্জে ওঠেন, “পানিপথের মাঠ ফাঁকা আছে, কুরুক্ষেত্র আর পলাশীর প্রান্তরও অ্যাভেইলেবল। সেখানে যেতে যদি আপত্তি থাকে তবে আমার টাকে উঠেই কোস্তাকুস্তি করো না কেন বাপু। ক্রাইমসিনে দাঁড়িয়ে ঝগড়াঝাটি করার মানে কী!”
ভয়ের চোটে আর কথা বাড়ায় না অধিরাজ। বরং অর্ণব, মিস অরোরা আর মিস বোসকে নির্দেশ দেয় গোটা ক্রাইমসিন সিল করে দিতে। কারণ ইতিমধ্যেই বহু কৌতূহলী প্রতিবেশি ও জনতার উকিঝুঁকি মারা শুরু হয়ে গিয়েছে!
আইভিও গোটা ফ্ল্যাট তন্নতন্ন করে এভিডেন্স খুঁজছিল। পরিশ্রমে, উত্তেজনায় তার মাথায় বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠেছে। কিন্তু সহজে সে হার মানার পাত্র নয়। ঘরগুলো তো বটেই, এমনকি সমস্ত আসবাবও পরীক্ষা করেছে। অথচ কোথাও কোনো সামান্যতম দাগও নেই। সে প্রায় মৃত সৈনিকের মতো এসে জানায়, “গোটা ফ্ল্যাটে ফিঙ্গারপ্রিন্ট তো দূর, কোনোরকম দাগই নেই। সম্ভবত কেউ সমস্ত ফ্ল্যাটটাই ধুয়েমুছে সাফ করে দিয়েছে।”
“কাবার্ড, আলমারি আর দরজাগুলো পরীক্ষা করেছ? মেইনডোর?”
ডঃ চ্যাটার্জির প্রশ্নের উত্তরে সে মাথা নাড়ায়, “দেখেছি স্যার। সব ক্লিন! মেইন ডোরে কোনো ফোর্সড এন্ট্রির ছাপও নেই। হয় চাবি দিয়ে দরজা খোলা হয়েছে। নয় স্বয়ং ডঃ সুজাতাই খুনীকে দরজা খুলে দিয়েছেন।”
“সুজাতার ফিঙ্গারপ্রিন্ট?”
“নেগেটিভ!” আইভি আপনমনেই বলে, “আশ্চর্য ব্যাপার স্যার, এমন ঝকঝকে তকতকে ফ্ল্যাট আমি খুব কমই দেখেছি। একদম আনইউজড! অফিসাররা বলছেন যে সুজাতা এখানে থাকতেন। আপনি বললেন ডেথের আগে ভিকটিম স্ট্রাগল করেছে। কিন্তু দেখে মনেই হয় না। ইনফ্যাক্ট বিশ্বাস করাই শক্ত যে আদৌ এই ফ্ল্যাটটা কেউ কখনও ইউজ করেছে। সবকিছু এত গুছিয়ে রাখা যেন ব্র্যান্ড নিউ ফার্নিশড ফ্ল্যাট বিক্রির জন্য কেউ রেডি করে রেখেছিল কিন্তু বায়ার আসেনি। একমাত্র কোনো ইন্টেরিয়র ডেকোরেটরই এমন নিখুঁতভাবে ঘর সাজাতে পারে।”
অধিরাজের চোখের সামনে ভেসে উঠল আর একটা সুসজ্জিত চেম্বারের দৃশ্য। সেটাও ঠিক এতটাই নিখুঁত। তবে সেটা কোনো ইন্টেরিয়র ডেকোরেটরের অফিস নয়।
আহেলি মৃতদেহটা থেকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট তুলতে তুলতেই হঠাৎ থেমে যায়। নীচু স্বরে বলে, “স্যার, আই থিঙ্ক শি ইজ ফাইনালি টেলিং সামথিং।”
“কী বলছে?”
ডঃ চ্যাটার্জি লাশের ওপর ঝুঁকে পড়েন। আহেলি ততক্ষণে মৃতদেহের পোশাক থেকে একটা সূক্ষ্ম অথচ ছোট চুল বের করে এনেছে, “এটা বোধহয় ডঃ রায়ের নয়।”
“না। ডঃ রায় কেশকান্তি মাখতেন বোধহয়। অন্তত ওর ঘন লম্বা চুল তাই বলে।” ফরেনসিক বিশারদ চুলটা নিজের গ্লাভসে নিয়ে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করছেন, “এটা আমার চুলও হতে পারে না কারণ ওই পদার্থটি মিসিং। লেডি কপদেরও নয়। এটা কোনো পুরুষের চুল। কিলারের কী না জানি না। বাট এভিডেন্স ব্যাগে ভরে নাও।”
আহেলি বিনাবাক্যব্যয়ে তাই-ই করল। অন্যদিকে ইনভেস্টিগেটিং টিম প্রতিবেশিদের ও সিকিউরিটি গার্ডদের জেরা করছিল। অর্ণব, মিস অরোরা আর মিস বোস তাদের বয়ান নিতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার–কেউ কিছু দেখেনি, কেউ কিছু জানে না। সুজাতা কারওর সঙ্গে তেমন মিশতও না। তাই কারওরই ওকে নিয়ে মাথাব্যথা নেই। এমনকী সিকিউরিটি গার্ডও গান্ধিজির তিন বাঁদরের কম্বিনেশন হয়ে বসে আছে!
“তিন বাঁদর নয় অর্ণব।” অধিরাজ বলল, “সম্প্রতি চতুর্থ বাঁদরের খোঁজ পাওয়া গেছে। ইনি তিনিই।”
“মানে?”
“ওর চোখ, কান, মুখ সবই খোলা। কিন্তু সবকটা ইন্দ্ৰিয়ই স্মার্টফোনে ব্যস্ত থাকে। আমিও ঢোকার সময়ে লক্ষ্য করেছি যে ব্যাটা খুব মন দিয়ে ইউটিউবে একটা জঘন্য ভিডিও দেখছিল,” সে জানায়, “ওই পরিস্থিতিতে খুনী কেন, একটা পেল্লায় ডাইনোসরও যদি দাঁত খিঁচোতে খিঁচোতে ওর পাশ দিয়ে চলে যায়, বা অ্যানাকোন্ডা ওকেই গিলে ফেলে তাহলেও টের পাবে না। বরং ওদের পেটের মধ্যে বসেই ইউটিউব দেখবে। ছেড়ে দাও, পণ্ডশ্রম!”
কিছুক্ষণ পরেই লাশ আর এভিডেন্স নিয়ে ফরেনসিক টিম ল্যাবে ফিরে গেল। ওরাও রুটিনমাফিক তদন্ত করে, ক্রাইমস্পট সিল করে দিয়ে ফিরে যায় ব্যুরোতে। অধিরাজ শুধু অন্যমনস্কভাবে বলল, “শুধু ডঃ রায়ের মৃত্যু হল না অর্ণব। আর একটা দরজা বন্ধ হয়ে গেল। সুশান্ত নামক ক্লোজড ডোর আগেই ছিল। এবার আর একটা ডোরও সিলড হয়ে গেল। এখন চোখের সামনে শুধু দেওয়ালই বাড়ছে। আই মিন ডেড এগু!”
অধিরাজের কথাটা যে কতটা সত্যি তা আগামী বাহাত্তর ঘণ্টাতেই টের পাওয়া গেল। সেদিন ডঃ সঞ্জয় বসু আগে সে যে নার্সিংহোম বা হসপিটালে ছিলেন বা বর্তমানেও ফ্লাইং ফিজিশিয়ান হিসেবে আছেন তার সমস্ত রিপোর্ট নিয়ে বেশ রাতের দিকেই গলদঘর্ম হয়ে ফিরে এল পবিত্র ও আত্রেয়ী। জেনিথের আগে অবশ্য উনি খুব বেশি জায়গায় কাজ করেননি। ব্ল পার্ল হসপিটাল, এম এম এন আই কার্ডিয়াক কেয়ার আর নাওমি নার্সিংহোমেই কেরিয়ারের বেশির ভাগটাই কাটিয়েছেন। এর মধ্যে হায়দ্রাবাদের নাওমি নার্সিংহোমে উনিই কার্ডিওলি বিভাগের হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট ছিলেন। পাঁচ বছর ওখানেই কাটিয়ে তারপর কলকাতায় ফিরে আসেন। ওরা হায়দ্রাবাদের ‘নাওমি নার্সিংহোমের’ সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে। ওখানকার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন ওটা মূলত একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান, এবং মুমূর্ষু বৃদ্ধদেরই চিকিৎসা বেশি করা হয়। সুতরাং ডেথ রেট নিয়ে তাঁদের কোনো মাথাব্যথা নেই। সেটা হাই হলেও তা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ব্লু পার্ল হসপিটালে অবশ্য উনি দীর্ঘ সময় ধরেই আছেন। শুধু মাঝখানে হায়দ্রাবাদে যাওয়ার দরশ কিছুদিন অনুপস্থিত ছিলেন। কিন্তু ফিরে আসার পর ওঁকেই অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে বসিয়ে দিয়েছে ব্লু পার্ল। সেখানেও ওঁর ব্লু রেকর্ড ক্লিন। ডেথ রেট টেন পার্সেন্টও ক্রস করেনি।
কিন্তু মূল সমস্যা ধরা পড়ল এম এম এন আই কার্ডিয়াক কেয়ারের রিপোর্টে। সেখানে গত তিন বছরে ডঃ সঞ্জয় বসুর আন্ডারে আচমকাই মর্টালিটি রেট বেড়েছে। কিন্তু যেহেতু ডাক্তারটি ধন্বন্তরি তাই তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি।
অথচ এইবার সত্যিই খটকা লাগার পালা। মিস দত্ত জানায়, “স্যার, এম এম এন আই এ ডঃ বসু বহুদিন ধরেই আছেন। ওঁর রেকর্ডস বলছে যে তিন বছর আগে পর্যন্ত পার ইয়ার ওঁর পেশেন্টদের মর্টালিটি রেট মাত্র দশ থেকে বারোর মধ্যেই ওঠা নামা করত। তাও অত্যন্ত সিরিয়াস পেশেন্টদের কথাই বলছি। কিন্তু গত তিন বছরে সেটা মিস্টিরিয়াস লেভেলে বেড়েছে। প্রথম বছরে রেটটা পঁচিশে গিয়ে ঠেকেছে। তার মধ্যে দশজন টার্মিনালি ইল ছিলেন। এমনিও মারাই যেতেন। কিন্তু বাকি পনেরোজনের আদৌ মরার কথাই নয়! ওঁদের সবার ডিসচার্জ হওয়ার টাইমও হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় আর তৃতীয় বছর মিলিয়ে সেই রেট চলে গেল সত্তরে।। এখানেও বারোজনকে ক্লিনচিট দিতে পারি। স্বয়ং ভগবানও ওঁদের বাঁচাতে পারতেন না। বার্ট এগেইন দ্যাট সেম প্যাটার্ন।” মিস দত্তের মুখে টেনশনের ছাপ স্পষ্ট, “বাকিরা যে কী করে মারা গেলেন তা স্বয়ং ডঃ বসুও বোঝেননি।”
“কিন্তু ন্যাচারাল ডেথের সার্টিফিকেট নিশ্চয়ই দিয়েছেন।”
“ইয়েস স্যার।” আত্রেয়ী কন্টিনিউ করে, “তা তিনি দিয়েছেন। তাই কোনোরকম জলঘোলাও হয়নি। যেহেতু সেইসময়ে কোভিড বিধ্বংসী পরিস্থিতিতে ছিল তাই তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠেনি।”
অধিরাজ আনমনে সিগারেট ধরায়, “আর থার্ড ইয়ারে অ্যাকর্ডিং টু লেট ডঃ রায়, জেনিথে তিরানব্বইটা অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। যদিও হিসাব সঠিক কী না জানা নেই। তবে হয়েছে এটা ঘটনা। আর কোনো স্পেসিফিক প্যাটার্ন P”
“হ্যা রাজা।”
এবার পবিত্র মুখ খোলে, “মৃত ব্যক্তিরা প্রত্যেকেই আশি থেকে নব্বইয়ের কোঠায় ছিলেন। অথচ ফিজিক্যালি যথেষ্ট ফিট। এদের মধ্যে দু-জন তো শতায়ু। শালা, আমরা তো তার আগেই টপকাব। অথচ ওঁদের শরীরে সামান্য কার্ডিয়াক প্রবলেম ছাড়া কোনো জটিল রোগ ছিল না। এদের মধ্যে বেশির ভাগেরই স্টেন্ট বসেছে বা বাইপাস হয়েছে। প্রত্যেকেই রিকভারির পথে ছিলেন। বাট এগেইন দ্যাট মিস্টিরিয়াস কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট, কোমা অ্যান্ড ডেথ।”
“আর কিছু?”
“হ্যাঁ,” সে বলে, “এই প্রত্যেক মৃত ব্যক্তি বা মহিলাই ভয়াবহ খিটখিটে মেজাজের ছিলেন। গোটা হসপিটালের স্টাফদের হাড় ভাজা ভাজা করে খাচ্ছিলেন। কথায় কথায় কমপ্লেইন আর হুমকি! ইনফ্যাক্ট ওঁদের নিজেদের আত্মীয়স্বজন, সন্তানেরাই বিরক্ত ছিল। ডঃ বসুর খুরে খুরে দণ্ডবৎ। কী করে যে উনি ওই ভয়াবহ বুড়ো ধানিলঙ্কাদের সামলাতেন ভগাই জানে!”
“আই সি!”
অধিরাজ কী যেন ভাবছে। মৃদুস্বরে শুধু বলল, “বাই এনি চান্স তিন বছর আগে প্রথম অস্বাভাবিক কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের কেসটাই ডঃ কৌশিক চক্রবর্তীর নয়তো।”
“মামা!”
পবিত্র হাতজোড় করে ফেলেছে, “তুমি কী জ্যোতিষশাস্ত্র প্র্যাকটিস করছ! ইউ আর অ্যাবসোলিউটলি রাইট। তিনবছর আগেই ডঃ কৌশিক আর একটু হলেই মায়ের ভোগে যাচ্ছিলেন। হি ইজ দ্য ফার্স্ট কেস অব দ্যাট মিস্টিরিয়াস কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট! কিন্তু যেহেতু মা ভোগ গ্রহণ করেননি তাই ওঁর ডেথ সার্টিফিকেটের কাগজটা বেঁচে গেছে। ভদ্রলোক রীতিমতো হেলদি আর অ্যাকটিভ ছিলেন। অমন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট ওঁর হল কী করে সেটাই আশ্চর্যের। আর ডঃ সঞ্জয় বসু একাই ওঁর চিকিৎসা করেছেন। আর কাউকে ধারে কাছে যেতেই দেননি! এমনকি ওঁর সমস্ত ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট, ক্লিনিকাল টেস্টের রেজাল্টও অন্য কাউকে দেখাতেনই না।”
“সেটাই স্বাভাবিক পবিত্র।”
অধিরাজ ঘোর লাগা কণ্ঠে বলল, “নেট প্র্যাকটিস মানুস একাই করে। আর নিজের সিক্রেট ইনগ্রেডিয়েন্টস ল্যাবরাটের ওপর দশজনকে দেখিয়ে প্রয়োগ করে না। এটা কোকাকোলা কোম্পানির রেসিপির মতোই সিক্রেট।”
“মা-নে।”
পবিত্রর মুখ হাঁ হয়ে যায়, “তুমি বলতে চাও ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী আসলে ল্যাবরাট হিসেবে ইউজড হয়েছিলেন। ওঁর কার্ডিয়াক অ্যারেস্টটা নেট প্র্যাকটিস?”
“তোমার তা মনে হয়নি খুড়ো?” সে চিন্তিতভাবেই বলে, “ডঃ চক্রবর্তীর কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের পরই দ্যাখো ডেথ রেট গ্র্যাজুয়ালি বেড়েছে। প্রতি বছরে একটু একটু করে। দমাস করে আদৌ সেঞ্চুরি হয়নি। অথচ মারা না পড়লেও সবার আগে ডঃ কৌশিকেরই নম্বর এল। এটা কী তোমার নেহাৎই কো-ইনসিডেন্স মনে হয়? ডঃ বসু আবার সেই কৌশিকের ওপরই বা এত মেহেরবান কেন যে নিজের ছেলেকেও ভুলে গেলেন? অ্যানাদার কো-ইনসিডেন্স? তার ওপর যেদিন উনি বেইল পেলেন সেদিনই ওঁর একমাত্র শত্রু সুজাতা রায়ের মার্ডার হল। এতগুলো কো-ইনসিডেন্স হজম করতে আমার রীতিমতো কষ্ট হচ্ছে!”
“তাহলে কী করণীয়?”
অধিরাজ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, “চলো, দুই মক্কেলকে বাজিয়ে দেখি। আমার দৃঢ় ধারণা যে এই দু-জনই কিছু খিচুড়ি রান্না করছে। খেতে না পাই-অ্যাট লিস্ট, গন্ধটা শুঁকে আসি।”
দুঃখের বিষয় কোথাও কোনো গন্ধই পাওয়া গেল না! ডঃ সঞ্জয় বসু একেবারেই ‘সবই মায়া’র পর্যায়ে গিয়ে বসে আছেন। তিনি ডাক্তার কম, দার্শনিক বেশি। বেশি কথা না বললেও স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, “দেখুন, মৃত্যুটা নিয়তির খেলা। এতে আমরা কিছু করতে পারি না!”
প্রথমেই এমন পরমহংস মার্কা ডায়লগ শুনে ব্যোমকে গেল অধিরাজ। সে কী বলবে বুঝে পেল না! শুধু আস্তে আস্তে বলল, “ডঃ চক্রবর্তীকে আপনি নিজের সন্তানের চেয়েও বেশি প্রেফারেন্স দেন! এর কোনো নির্দিষ্ট কারণ?”
“কারণ মানুষের কর্মফল।” তিনি বলেন, “মানুষের কাজই আল্টিমেট কথা বলে। ব্লাড রিলেশন নয়। আর আমি নিজেকে আনবায়াসড বলেই মনে করি। সেটা যদি কেউ না বোঝে তবে তা আমার প্রবলেম নয়।”
অর্ণব আর পবিত্র পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। ইনি কী কয়েকদিন বাদে বাগেশ্বরধামে যাওয়ার তাল করছেন নাকি? না সন্ন্যাস নেওয়ার ইচ্ছে আছে।
মরিয়া হয়ে ফের খোঁচা মারল অধিরাজ, “আপনিও জেল থেকে বেরোলেন, আর ডঃ সুজাতা রায়েরও মার্ডার হল। এটাও কী নিয়তি বা কাকতালীয়?”
“যদি না হয় তবে প্রমাণ করতে পারবেন? সুজাতাও কিন্তু প্রমাণ করতে পারেনি,” ভদ্রলোক এবার হিসহিসে স্বরে জানান, “আমিও তো আপনাদের চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলেছিলাম যে আমিই খুনী! পেরেছেন প্রুভ করতে?”
“মার্ডার… মার্ডার। ক্যান ইউ প্রুভ ইট ওয়াজ আ মার্ডার। …আই থিঙ্ক ইউ কুডষ্ট…!”
মৃদুস্বরে বলল অধিরাজ। ডঃ সঞ্জয় বসু হাসলেন, “ডঃ বডকিনস? নট আ ব্যাড আইডিয়া। আপনি প্রুভ করুন যে এর পেছনে আমিই আছি। তারপরই না হয় কথা বলা যাবে।” ইঙ্গিত স্পষ্ট। এবার বিদেয় হও বাপু। অধিরাজ স্থির দৃষ্টিতে তাঁকে দেখছে। তিনিও একদম শুভদৃষ্টি করছেন। চারচক্ষু মিলিত হল ঠিকই কিন্তু চ্যালেঞ্জের ভাষায়। দুই তরবারিতে ঠোকাঠুকি।
বাইরে বেরিয়ে এসে পবিত্র বলল, “লোকটা ঠান্ডা মাথার শয়তান।”
“মে বি, অর মে বি নট।”
অধিরাজ কোনো কথা না বলে এবার ডঃ কৌশিকের দ্বারস্থ হয়। ছিমছাম সুন্দর দোতলা বাড়িতে ভদ্রলোক আর ওঁর মা থাকেন। একেবারেই বাহুল্যবর্জিত জীবনযাপন। তবে এত টাকার দরকার কেন ওঁর? পুরোটাই কী গুজব?
“না।”
কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল কৌশিক অনেক বেশি প্র্যাকটিক্যাল। তিনি বললেন, “আপনারা ভুল শোনেননি। আমি খুব শীগগিরই ডঃ বসুর টিম ছাড়ছি!”
“কেন?”
অধিরাজের দৃষ্টি প্রখর, “এনি স্পেসিফিক রিজন?”
“আমার মা অসুস্থ। ক্যান্সার সার্ভাইভার। কিন্তু তার জন্য মাঝেমধ্যেই ফরেনকান্ট্রিতে ট্রিটমেন্টের জন্য যেতে হয়। তাই আমার টাকার দরকার। আর কৃশানু স্যারের প্যাকেজ অনেক বেশি লুক্রেটিভ। জাস্ট প্রোফেশনাল কজ!”
ভদ্রলোক খুব শান্তস্বরে কথাগুলো বলছিলেন বটে, কিন্তু ওঁর হাত অজান্তেই পেনের পুশবাটনটাকে বারবার অধৈর্যভাবে প্রেস করছে। প্রায় সেকেন্ডে সেকেন্ডে পেনটাকে টিপছেন উনি। আড়াই মিনিটের বক্তব্যে প্রতি সেকেন্ডে পেনটা ওঁর অত্যাচার সহ্য করছিল। প্রাণ থাকলে অভিশাপই দিত—আর জীবনে কিচ্ছু টিপতে পারবি না হতভাগা!
অধিরাজ এখানেও বেশি কথা বাড়ায় না। এখন ওঁরা কেউ মুখ খুলবেন না। মোদ্দা কথা ডঃ বসুই বলে দিয়েছেন, “প্রমাণ চাই, প্রমাণ দাও…। তারপর কথা হবে।”
এভাবেই কেটে গিয়েছে বাহাত্তর ঘণ্টা। চাউমিনের মারাত্মক লিডের আগে কিছু ছোটোখাটো তথ্যই পেয়েছে ওঁরা। যেমন কৌশিক চক্রবর্তী ডাক্তারিতে ঝামেলা না করলেও ড্রাইভিং-এ কেস খেয়েছেন। যখন সুস্থ ছিলেন তখন এক পথচারীকে গাড়ির ধাক্কায় উড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেই কেসে অবশ্য কিছুদিন আগেই বেকসুর খালাস পেয়েছেন। কারণ ডঃ বসুর হস্তক্ষেপ ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার আবার স্ট্রিটড্রাগেরও নাকি যোগান দিয়ে থাকেন। পুলিস ওঁর বাড়িতে রেইড করলেও কোনো এভিডেন্স পায়নি। একবার নাকি অ্যানাস্থেশিয়ার ডোজে এমন গোলমাল করেছিলেন যে রোগী তার প্রভাবেই মারা গিয়েছিল! কিন্তু সেটাও প্রমাণ হয়নি। সুশান্ত ড্রাগ পেডলিং র্যাকেটে ধরা পড়ে তিনদিন হাজতে ছিল। তারপর অজ্ঞাত কারণে সে-ও ছাড়া পেয়েছে।
জেনিথ সম্পর্কে এখন আতঙ্ক তৈরি হয়েছে রোগীদের মনেও। পারতপক্ষে ওখানে কেউ ভরতি হচ্ছে না। হসপিটালটাকে সিল না করা হলেও পবিত্র আচার্য আর সিভিল ড্রেসের পুলিসরা সতর্ক নজর রাখছে প্রতিটা মুভমেন্টের ওপর। তাদের প্রহরাবেষ্টনী এড়িয়ে কাকপক্ষীরও ঢোকার উপায় নেই। অন্যদিকে ডঃ বসু, ডঃ চক্রবর্তী, ডঃ সরকার সমেত গোটা টিমকেই শ্যাডো করছে ইনফর্মাররা। তবে একটু আগেও কোনো ব্রেকিং নিউজ আসেনি।
আর এইমাত্র যোগ হল সুহাসিনীর কীর্তি। অর্ণবের বারবার মনে হচ্ছিল –এরা সবাই ডঃ ডেথ। একজনও স্বাভাবিক নয়। প্রত্যেকেই আস্ত যমদূত!
“স্যার…।”
সে বলল, “ডঃ বসু ডাক্তারদের টিম বানিয়েছেন না ক্রিমিনালদের টিম। এরা তো প্রত্যেকেই অর্ধেক আসামী! পুলিসের খাতায় নাম তোলার কম্পিটিশন চলছে নাকি? স্পেশাল কোনো ভাতা দিচ্ছে গভর্নমেন্ট?”
“আসামী কিনা জানি না।” সে মাথা নাড়ে, “তবে অভিযুক্ত তো বটেই। এমন টিম নিয়ে ডঃ সঞ্জয় বসু কোন্ মিশনে নেমেছেন কে জানে!”
অর্ণব এর প্রত্যুত্তরে কিছু বলতেই যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই তার ফোন সশব্দে বেজে ওঠে। সে তাড়াতাড়ি ফোনটা রিসিভ করতেই ওদিক থেকে পবিত্র আচার্যর গলা ভেসে আসে—
“অর্ণব, তোমরা তাড়াতাড়ি জেনিথে চলে এস। আর্জেন্ট!”
“কী হয়েছে স্যার?” অর্ণব উত্তেজিত। সে ফোনটাকে লাউডস্পিকারে দিয়ে দেয়, “আবার কোনো গোলমাল?”
পবিত্র বোধহয় শ্বাস নিতেও ভুলে গিয়েছে। এক নিঃশ্বাসে বলল, “জাস্ট একঘণ্টা আগে জেনিথের লিফটের সিসিটিভিতে ওয়ার্ডবয় সুশান্তকে দেখা গেছে। অথচ এন্ট্রান্সে ওর ঢোকার কোনো ফুটেজ নেই। করিডরে বা ফ্লোরের কোনো ক্যামেরায়ও ধরাই পড়েনি। শুধু লিফটের সিসিটিভিতেই পাঁচমিনিটের ফুটেজে ওকে দেখা গেছে।”
“তাতে কী?” অধিরাজ জানতে চায়, “লিফটে ঢুকেছে যখন তখন হসপিটালেও ঢুকেছে। অ্যারেস্ট করো লোকটাকে।”
“আরে, পেলে তো অ্যারেস্ট করব।”
পবিত্র বলল, “বিশ্বাস করবে কী না জানি না, ও পাবলিক লিফটে ঢুকে পাগলের মতো পাঁচ মিনিট ধরে শুধু সবকটা ফ্লোরের বাটন টিপছিল! প্রত্যেকটা ফ্লোরে থেমে লিফট থেকে বাইরের দিকে উকি মারছিল, আবার এমন ভাব করছিল যেন কেউ ওকে ফলো করছে। এরকম পাঁচ মিনিট ধরে লুকোচুরি খেলার পর ও ফার্স্টফ্লোরে লিফট থেকে বেরোল। তারপর থেকে বেমালুম হাওয়া! সিসিটিভি ক্যামেরায় আর ওর কোনো ফুটেজই নেই। না এন্ট্রান্সের ক্যামেরায় দেখা গেছে, না এক্সিটের। লোকটা যেন লিফট থেকেই পুরো হাওয়ায় মিলিয়ে গেল রাজা! আমরা এতক্ষণ ধরে তন্নতন্ন করে খুঁজেও ওকে পাইনি। প্রত্যেকটা ওয়ার্ড, কেবিন, ওপিডির চেম্বার, আই সি ইউ, রেস্টরুম, ক্যান্টিন–কিচ্ছু বাদ দিইনি। কিন্তু …”
পবিত্রর কন্ঠে অসহায়তা স্পষ্ট। স্বাভাবিক। একটা লোক কোথা দিয়ে হসপিটালে ঢুকল জানা নেই। বেরোতে তাকে দেখা যায়নি। উপরন্তু লিফটের ওই পাঁচ মিনিটের অস্বাভাবিক ফুটেজ সুশাস্ত কাকে ভয় পাচ্ছিল? কার থেকেই বা পালাচ্ছিল। যদি হসপিটাল থেকে সে না বেরিয়ে থাকে তবে গেলই বা কোথায়। সে আর যা-ই হোক, পি সি সরকার বা হুডিনি নয়। “পবিত্র।” অধিরাজের কণ্ঠে স্পষ্ট নির্দেশ, “একবার মর্গ বা মরচুয়ারিটাও খুঁজে দ্যাখো। আমার দৃঢ় ধারণা সুশান্ত হাওয়ায় মিলিয়ে না গেলেও হসপিটাল থেকে আদৌ বেরোয়নি। মর্গটা ভালো করে দেখবে। আমরা আসছি।”
“ওকে, কাম শাপ!”
লাইন কেটে গিয়েছে। কিন্তু মরচুয়ারি। অর্ণবের মাথায় যেন বাজ পড়ল।
আবার একটা মৃত্যুর সম্ভাবনা। মানে আরও একটা ডেড এণ্ড?
