২১
সমস্ত গুছিয়ে নিতে আরও সাতদিন সময় লাগল। পুলিস এখন চার্জশিট তৈরি করতে ব্যস্ত। ডঃ সঞ্জয় বসু আপাতত পুলিসি হেফাজতে আছেন। না, ডঃ ডেথ হওয়ার জন্য নয়। বরং প্রমাণ লোপাট করা, পুলিসকে বিভ্রান্ত করা ও এইরকম একটা মারাত্মক সিরিয়াল কিলিংকে চাপা দেওয়ার চেষ্টার জন্য। তাঁর সঙ্গী হয়েছেন ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার ও সুহাসিনী মিত্র। দু-জনেরই বিরুদ্ধে সুশান্তকে খুন করার চার্জ, মার্ডার অ্যাটেম্পট, কন্সপিরেসি, এভিডেন্স ট্যাম্পারিং ও কমন ইনটেনশনের মতো উনকোটি চার্জ লেগেছে। আপাতত ডঃ সরকার আর সুহাসিনীর হাজত থেকে বেরোনোর কোনো সুযোগ নেই। কৌশিক চক্রবর্তী এখনও ডঃ শেঠির আণ্ডারেই চিকিৎসাধীন। যদিও চিকিৎসার বিশেষ কিছু নেই। আগেই তাঁর ডেথ সার্টিফিকেট লিখে দিয়েছিল জীবন। তিনি সেটাকে কভার করতে গিয়ে স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে আরও ত্বরান্বিত করে দিয়েছেন। ডঃ শেঠি দুঃখ প্রকাশ করে বলছিলেন,
“একটা রোগ একজন ডাক্তারকে সিরিয়াল কিসার বানিয়ে দিল। এর চেয়ে প্যাথেটিক আর কী হতে পারে? তবে মনে হয় না পৃথিবীতে ওঁর বিচার হবে। বড়োজোর দুটো কী তিনাট শুনানি অ্যাটেন্ড করার মতোই আয় অবশিষ্ট আছে। নিজের সাজা শোনার সময় নেই। এই ডঃ ডেথের বিচার ওপরওরালার দরবারেই হবে অফিসার।”
অধিরাজ সখেদে মাথা নাড়ল, “কিছু করার নেই ডঃ শেঠি। কৌশিককে ফাঁসিতে ঝোলানোর চেয়েও বেশি ইম্পর্ট্যান্ট ছিল ডঃ ডেথের সত্যিটাকে সামনে আনা। ওটাই আমার ডিউটি। ওঁকে কাঠগড়ায় তোলার পর উনি ফাঁসিতে মরবেন না নিজের এই বিধ্বংসী রোগে, সেটা অদৃশ্য বিচারপতিই ঠিক করবেন। কিন্তু যে যা করেছে, তাকে তার জন্য আইনের মুখোমুখি হতেই হবে।”
“কিন্তু আপনি কৌশিকের আসল রোগটা ধরলেন কী করে?” ডঃ শেঠি সবিস্ময়ে জানতে চান, “আমি একজন নিউরোসার্জেন হয়েও যেটা বুঝতে পারিনি, তা আপনি এত সহজে বুঝে গেলেন কী করে?”
অধিরাজ বিষণ্ণভাবেই জবাব দেয়, “এর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব স্বয়ং ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী আর ডঃ সঞ্জয় বসুর। ওঁদের হাবভাবই আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে রোগটা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টই নয়। ছিলই না কোনোদিন। বরং অন্য কিছু। ডঃ বসুই এই কেসে বারবার লিড দিয়ে গেছেন। ইভেন স্পষ্ট করে বলেও দিয়েছিলেন। আমরাই বোকা যে ওঁর ইশারা ধরতে পারিনি। তার ওপর রোগটাকে ক্যামোফ্লেজ করার জন্য কৌশিক সুপারি কিলার দিয়ে নিজেই নিজের স্পাইনাল কর্ডে এমনভাবে শ্যুট করিয়েছিলেন যে সিম্পটমগুলো আপনাদের বুলেট ইনজুরির ফলাফলই মনে হয়েছিল। নয়তো ইঙ্গিত তো আপনারাও পেয়েছিলেন। ইনফেকশনের দ্রুত ছড়িয়ে পড়া, সি এস এফ টেস্টে স্পাইনাল কর্ডের ইনফেকশন আর ইনফ্লেমেশন, এম আর আই রিপোর্টে ইনফ্লেমেশন আর ল্যাক অব ব্লাড সাপ্লাই, স্প্যাজম সবই উপস্থিত। কিন্তু পুরোটাই আপনারা ওঁর কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের কাল্পনিক হিস্ট্রি আর বুলেট উন্ডের কারণে নর্মাল ভেবেছিলেন। তাই পরীক্ষাগুলো এল এম এন ভার্সাস ইউ এম এন সাইন আর প্যাটার্ন-সহ করাননি। এই টেস্টগুলোই যদি আপার মোটর নিউরোন লেশন বা লোয়ার মোটর নিউরোন লেশন স্টাডি-সহ হত তাহলেই ওঁর আসল রোগটা ধরা পড়ে যেত। কিন্তু সেখানে উনি নিজেই নিজেকে শ্যুট করিয়ে ডাক্তারদের চোখেও ধুলো দিতে সক্ষম হয়ে গিয়েছিলেন। বাঁধিয়ে রাখার মতো মাথা!”
অধিরাজের কথা সম্পূর্ণ ঠিক। ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী আদৌ হার্টের প্রবলেম বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের শিকারই নন। ওঁর হার্টে কোনোদিন কিছু হয়ইনি। বরং যেটা হয়েছিল সেটা আরও বিপজ্জনক এবং দুরারোগ্য। তিনি অ্যামিওট্রফিক ল্যাটারাল স্ক্লেরোসিস বা এ এল এস নামের একটি মোটর নিউরোন ডিজিজে আক্রান্ত ছিলেন। এ এল এস সম্পূর্ণ দুরারোগ্য রোগ যার লাইফ এক্সপেক্টেন্সি মাত্র তিন থেকে পাঁচ বছর। যদিও একমাত্র ব্যতিক্রম, বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এই মারণ রোগের সঙ্গেই যুদ্ধ করে পঞ্চাশ বছরেরও বেশি বেঁচেছিলেন। কিন্তু মেডিক্যাল রিপোর্ট বলছে, কৌশিকের হাতে আর বিশেষ সময় নেই। তিনি এই রোগের চতুর্থ আর ফাইনাল স্টেজে ঢুকে পড়েছেন। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর দেহ সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত হয়ে একটু একটু করে ধ্বংসের পথেই যাবে। ভদ্রলোকের সামনে এখন অবশ, অনড়, প্যারালাইজড হয়ে মরণের অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো রাস্তা খোলা নেই। এই রোগটা যে ওঁকে একশো চুয়ান্নটা খুন করার জন্য তিন বছর সময় দিয়েছে তার পেছনে ডঃ বসুর অবদান সর্বাধিক। কিন্তু তাঁরও আর কিছু করার ছিল না। ডঃ শেঠির নেতৃত্বে কৌশিকের দেহের সম্পূর্ণ ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট আর ডায়াগনোসিস বলছে যে গুলি না খেলেও এবার তাঁর শেষ আশ্রয় সেই হুইলচেয়ারই হতে চলেছিল। তিনি কিছুদিনের মধ্যেই আর চলে ফিরে বেড়ানোর অবস্থায় থাকতেন না। তাঁর মাসল আর নার্ভগুলো একটু একটু করে কাজ করা ছেড়ে দিচ্ছিল। ইনফেকশন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ব্রেনে ব্লাড সাপ্লাইও ক্রমাগত কমছে। এরকম করতে করতেই একসময় লাংসের মাসলও জবাব দিত। তিনি ফুসফুসের প্যারালাইজড হয়ে যাওয়ার কারণে শ্বাস নিতে না পেরে বা কঠিন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে এমনিই মারা যাবেন। হয়তো তার সঙ্গে অন্যান্য অর্গানগুলোও কাজ থামিয়ে দেওয়ার দরুণ মাল্টিপল অর্গ্যান ফেইলিওরই ওঁর নিয়তি হতে চলেছে। সবচেয়ে যেটা ভয়াবহ, এই রোগের কোনো ওষুধ নেই! মৃত্যুই এই যন্ত্রণাদায়ক অসুখের আল্টিমেট মেডিসিন।
ডঃ ডেথের আসল পরিচয় জানার পর স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল গোটা কলকাতা। একজন শারীরিকভাবে অক্ষম ও অসুস্থ মানুষ যে এত বড়ো সিরিয়াল কিলার হতে পারে তা বিশ্বাস করতেই কষ্ট হয়েছিল নগরবাসীদের ও মিডিয়ার। কিন্তু এবার প্রমাণগুলো এতটাই স্ট্রং যে পুলিসের ইনভেস্টিগেশনের দিকে কোনোমতেই আঙুল তোলা যায়নি। ডঃ বসু ও কৌশিকের ডি এন এ স্যাম্পল টেস্টিং-এর রেজাল্ট প্রমাণ করে দিয়েছে যে কৌশিক চক্রবর্তীও সঞ্জয় বসুরই আর এক ‘বায়োলজিকাল সন।” ডঃ সুজাতা আর সুশান্তর দেহের ওপরে পাওয়া হেয়ার স্যাম্পলও হান্ড্রেড পার্সেন্ট ম্যাচ করেছে কৌশিকের ডি এন এ স্যাম্পলের সঙ্গে। পরাজিত কৌশিক শেষপর্যন্ত স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে নিজের মায়ের মার্ডার আর নিজের ওপর মার্ডার অ্যাটেম্পট তিনি একজন কুখ্যাত কন্ট্যাক্ট কিলার বিল্লাকে দিয়ে করিয়েছিলেন। টিম অধিরাজ বিল্লাকে তার দলবল-সহ ধরেছে এবং নিজেদের পুলিসি স্টাইলে মিস অরোরার ফেভারিট ‘কুচুকুচু’ আর ‘গোলুগোলু’র দাওয়াই দিয়ে তাদের পেট থেকে কথা বের করতে সফলও হয়েছে। বিল্লা জানায় যে কৌশিকেরই নির্দেশে তার দলের লোকেরা ইলেক্ট্রিশিয়ানের ছদ্মবেশে মরচুয়ারিতে গ্রেনেড ফিট করেছিল আর এ সি গুলোকে ট্যাম্পার করেছিল। অবশ্য ফর্মালডিহাইড ছড়ানোর কাজটা কৌশিক নিজেই করেছিলেন। জেনিথে র্যাপিডলি পাওয়ারের সমস্যা হওয়ার দরুণ কর্তৃপক্ষ বিরক্ত হয়ে ইলেক্ট্রিশিয়ানদের দিয়ে বারবার সার্ভিসিং করাচ্ছিল। ডঃ চক্রবর্তী সেটা জানতেন এবং সেই সুযোগটাই নিয়েছিলেন। তিনি নিজেই আবার জেনিথ কর্তৃপক্ষকে পাওয়ার গ্লিচের জন্য বেশ কিছু টেকনিক্যাল সমস্যা হচ্ছে বলে কমপ্লেইন করেন ও সার্ভিসিং এর আবেদন করেছিলেন। ওটাই ছিল সুবর্ণসুযোগ। স্বাভাবিকভাবেই ইলেক্ট্রিশিয়ানের বেশে বিল্লাদের কেউ সন্দেহই করেনি।
সে এ ও জানিয়েছে, স্বয়ং কৌশিক তাকে রীতিমতো নির্দেশ দিয়েছিলেন যে পিঠের ঠিক কোথায়, কোন্ অ্যাঙ্গেলে গুলি মারতে হবে। এ-ও বলেছিলেন যে বৃদ্ধা মায়ের গলায় ছুরিটাও কীভাবে চালালে তিনি খুব সহজেই মারা যাবেন। গত ছ-মাস ধরে ভদ্রলোক ‘ডামি’ও সাপ্লাই করে গিয়েছেন ওর প্র্যাকটিসের জন্য! তার জন্য এক্সট্রা টাকাও দিয়েছিলেন পর্যন্ত। বিন্নার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী—
“স্যার, এরকম সানকি ক্লায়েন্ট আমি জীবনে দেখিনি। যখন ওঁর মাকে মারার পর ওঁকে শ্যুট করতে যাচ্ছিলাম, তখন নিজেই ধমকে বললেন, ‘ইউ ইডিয়ট। আরও পাঁচ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে গুলিটা মার। নয়তো স্পাইনাল কর্ডের ঠিক জায়গায় লাগবে না। এতদিন প্র্যাকটিস করে এই শিখেছিস!’ আজব সাইকো আদমি।”
তাকে এক জোরদার থাপ্পড় কষিয়ে, বেচারির আস্ত একটা দাঁত ভেঙে দিয়ে ধমকে উঠেছিল অধিরাজ, “উনি সাইকো। আর তুই কোন্ ধর্মাত্মা হরিশ্চন্দ্র বে?”
আপাতত ডঃ ডেথের কেস সলভ হওয়ায় জনগণ খুশি। গোটা শহর খুশি। জেনিথ আর এম এম এন আই হসপিটাল ও এই ডঃ ডেথ নামের উপদ্রব থেকে মুক্তি পেয়ে আনন্দিত। নয়তো তাদের রেপুটেশন বরবাদ হত। ডঃ চ্যাটার্জি এই মর্মে ভালো মেজাজে আছেন যে তাঁর পরিচিত সহপাঠীটি যতই যা করে থাকুক, একশো চুয়ান্নটা খুন করেনি। ওয়ার্ডবয় রতন মৃত্যুকে মাত দিয়ে জীবনে ফিরেছে, তাতেই সে সন্তুষ্ট। দুটো খুনের জন্য শাস্তি নিশ্চয়ই হবে। দেহটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রাণটা যে বেঁচেছে—এই ঢের। মিডিয়া ফের অধিরাজকে মাথায় তুলে ফেলেছে। এমনকী স্বয়ং এডিজি সেনের তোলো হাঁড়ির মতো মুখেও স্বস্তির হাসি ফুটেছে। অধিরাজের নামে কোনোরকম শো-কজ লেটার আসেনি বা মিস দত্ত আর মিস অরোরাকেও বসিয়ে দেওয়া হয়নি। বরং এডিজি সেন এবার মুখোমুখি ডেকেছেন অধিরাজকে। কঠিন স্বরে জানতে চান, “আমি যদি তোমার এগেনস্টে কড়া স্টেপ নিই, তবেও কী তুমি আমাদের কার্লোসকে ধরতে হেল্প করবে না ব্যানার্জি?”
“হেল্প আমি সবসময়ই করব” অধিরাজ তাঁকে স্যালুট ঠুকে জানায়, “কিন্তু লেডি অফিসারদের দেব না স্যার। আপনি স্বচ্ছন্দে রিপোর্ট করতে পারেন। চাইলে আমি এখনই রিজাইন দিতে পারি।”
“তুমিও আশ্চর্য তে-এঁটে লোক! কিছুতেই নিজের স্ট্যান্ড ছাড়বে না।”
এবার হাসি ছড়িয়ে পড়ল এডিজি সেনের মুখে, “রিজাইন দিতে কে বলেছে? বরং কী সব জুলি, কুলি না পুলিদের কন্ট্যাক্ট দেবে বলছিলে, সেটাই দাও। কথায় কথায় খালি অ্যাটিটিউড।”
টিম অধিরাজের সাফল্যে সবাই খুশি, একমাত্র দুটো লোক ছাড়া। প্রথমজন প্রণবেশ লাহিড়ী। ডঃ ডেথের ধাক্কায় স্বয়ং তিনি মিডিয়া কভারেজ পাননি। কার্লোসের ইম্পর্ট্যান্ট কেসটাও মিডিয়ার লাইমলাইটে এবারও এল না। উলটে এখনও পর্যন্ত কার্লোস আর প্রিয়া বাজাজকে ধরতে পারেননি বলে বেজায় ধাতানি খেয়েছেন। তাই আপাতত পবিত্রর ভাষায় দুখী তমপিশাচ হয়ে ঘুরঘুর করছেন।
দ্বিতীয় দুখী আত্মার নাম স্বয়ং অধিরাজ ব্যানার্জি। বেচারাকে বোধহয় কয়েকদিন বাদেই বোরখা পরে ঘুরতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সে কমই অ্যাক্টিভ। কিন্তু যত রাজ্যের মেয়েরা স্টক করে চলেছে। কোন হতভাগা জ্বলন্ত জেনিথের ওই দেওয়াল বেয়ে উদ্ধারকার্যের ভিডিও তুলে ভাইরাল করেছিল কে জানে। কিন্তু তারপর থেকেই স্বস্তি নেই তার। এই কেসের সাফল্য সেলিব্রেট করার জন্য অধিরাজ একটি ফাইভস্টার রেস্টোর্যান্টের ডাইনিং হল বুক করেছিল। কিন্তু নিজেই রেস্টোর্যান্টের বাইরে মবড় হয়ে গিয়ে যা তা অবস্থা। গাড়ি থেকে নামতে না নামতেই চতুর্দিক দিয়ে ‘স্যার… স্যার’ করতে করতে বিরাট ভিড় এমনভাবে ছেঁকে ধরল যে বেচারার প্রাণ যায় যায় দশা। ছেলেদের ভিড় হলে তবু কথা ছিল। সে ঠিক তেড়েফুঁড়ে বেরিয়ে যেত। কিন্তু এই ভিড়ে মেয়েদের সংখ্যা এত বেশি যে কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না। কেউ অটোগ্রাফ চাইছে, কেউ সেলফি, কারওর বা বায়না, “একবার শুধু সেনোরিটা বলে ডাকুন অফিসার ডেথ, আর কিছু চাই না!” অধিরাজ পরম আতঙ্কে মুখ ফস্কে বলেই ফেলেছিল, অফিসার ডেথ। সে কী সেনোরিটা!”
ব্যস। সুন্দরী ওখানেই চোখ বুজে এমন ধড়াম করে আছড়ে পড়লেন যে অর্ণবও ঘাবড়ে গিয়েছিল, মহিলা মরেই গেলেন বুঝি। পবিত্র তার কানে ফুসফুস করল, “এ মাল পরবর্তীতে সত্যিই অফিসার ডেথ হতে চলেছে। এখানেও কার্ডিয়াক অ্যারেস্টই হবে। তবে ওই অ্যারেস্ট নয়!”
কী জ্বালা! কাজ না করলে লোকে পুলিসকে গালাগালি দেয়। আর কাজ করলে ভালোবাসার চোটে চোখে পুরো সর্ষেফুল দেখিয়েই ছাড়ে। অধিরাজ তো প্রায় দিগন্তবিস্তৃত সর্ষের ক্ষেতই দেখছিল যেখানে শ’য়ে শ’য়ে কাজল তার দিকেই দৌড়ে আসছে। সে নিজে কোনদিকে দৌড় মারবে সেটাই ঠিক করতে পারছিল না। তার মধ্যেই আহেলি কটমট করে তার দিকে একঝলক তাকিয়ে, পাশ কাটিয়ে রেস্টোর্যান্টের দিকে যেতে যেতে বলল, “সবাইকে কিলোদরে সেনোরিটা বলে না ডাকলে হচ্ছে না? শি ইজ অলমোস্ট ইন হেভেন!”
যে মুহূর্তে সে পাশ কাটিয়ে গেল, ঠিক সেই মুহূর্তেই মস্তিষ্কের ভেতরে আবার কিছু ছবি অজান্তেই ভেসে উঠেছে। আজ আহেলির পারফিউমের ব্র্যান্ড আলাদা। তবু তার কণ্ঠস্বরে বহুদিনের পরিচিত কী যেন একটা উষ্ণতা ছিল। অধিরাজের মনে হচ্ছিল, সেই উষ্ণতাকে সে চেনে। তার চলন্ত দেহ ছুঁয়ে যে একঝলক হাওয়া অধিরাজকে স্পর্শ করে গেল—সে স্পর্শ সে আগেও পেয়েছে। কিন্তু কোথায়….? এমন কোনো মুহূর্ত তো তার জীবনে কোনোদিন আসেইনি। তবে এরকম ছেঁড়া ছেঁড়া অপরিচিত ছবি হঠাৎ হঠাৎ মরীচিকার মতো চোখের সামনে ভেসেই বা ওঠে কেন! একটা আবছা মুখ ফিশফিশ করে কী যে বলে তা ঠিক বুঝেও উঠতে পারে না। শুধু মাথার মধ্যে একটা কণ্ঠস্বরই বাজতে থাকে “আমি আছি… কোথাও যাব না…!”
“স্যার, আসুন তো।”
অধিরাজ কিছুক্ষণের জন্য বিহ্বল হয়ে থমকে গিয়েছিল। এসব অসংলগ্ন দৃশ্য আর বাক্যের রহস্য ভেদ করার আপ্রাণ চেষ্টাও চালাচ্ছিল। সামান্য টলে গেল সে। সঙ্গে সঙ্গেই অর্ণবের হাত তার হাত শক্ত করে ধরল। পবিত্র আর অর্ণবের হস্তক্ষেপে কিছু মানুষ সরলেও প্রমীলাবাহিনী পথ ছাড়ছিল না। শেষে মিস অরোরা যখন চটে লাল হয়ে ঘুষি বাগিয়ে তাড়া করল তখনই সেই শ্বাসরোধী ভিড় ছত্রভঙ্গ হল। পবিত্র স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলে কপালের ঘাম মোছে, “জয় বজরঙ্গবলী। সত্যিই গদা বড়ো কাজের জিনিস।”
“স্যার…। কৌশিক চক্রবর্তীই যে আসল খুনী, সেটা ঠিক কখন সন্দেহ করেছিলেন?”
ফাইভ স্টার রেস্টোর্যান্টের সুসজ্জিত ডাইনিং হলে বসে কৌশানী বোস জানতে চায়, “আমাদের তো একবারও ওঁকে সন্দেহ হয়নি। উনি ঠান্ডা মাথার শয়তান তা বুঝেছিলাম। রঞ্জন নায়েকের বয়ানে বোঝা গিয়েছিল যে ক্রিমিনাল মাইন্ডেডও বটে। কিন্তু ও গুণ তো অলমোস্ট ওই টিমের সবারই আছে! সবার মধ্যেই কমন। যে কেউ হতে পারত।”
অধিরাজ আনমনে মাথা নাড়ে,
“না মিস বোস, সবাই হতে পারত না। স্বয়ং ডঃ সঞ্জয় বসুর প্রাথমিক পিকিউলিয়ার হাবভাবেই সেটা স্পষ্ট। আপনি নিজেই দেখুন। অশীতিপর, নবতিপর বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর প্যাটার্ন ডঃ সুজাতা রায়ের মতো একজন অনভিজ্ঞ ডাক্তারও নোটিস করলেন। অথচ ডঃ বসু এতটাই বোকা যে অ্যাবনর্মাল ডেথরেট যে ক্রমাগতই বাড়ছে সেটা ওঁর চোখে পড়েনি? লোকটা আর যাই হোক, টপ ক্লাসের ডাক্তার সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ওঁর লেখা প্রেসক্রিপশনই প্রমাণ দেয় যে ঠিক কতখানি মনোযোগ দিয়ে তিনি পেশেন্টের চিকিৎসা করেন। তাঁর আন্ডারে হাজার হাজার পেশেন্ট অ্যাডমিট হচ্ছে। অথচ ওঁর লেখা প্রেসক্রিপশনে প্রত্যেক পেশেন্টের বহুবছর আগের মেডিক্যাল হিস্ট্রিও এতটাই ডিটেইলসে থাকে যে সবাই বুঝবে, উনি প্রত্যেক পেশেন্টের ইন্ডিভিজুয়াল কেসফাইল সযত্নে মেইনটেইন করেন। আমি তো একজন পেশেন্টের ফাইলে ১৯৯৮ সালেরও রেফারেন্স পেয়েছি। আবার অন্যদিকে চূড়ান্ত সাবধানী। যাদের অবস্থা একটু সংকটজনক, তাদেরই রেগুলার মনিটরিঙে রেখেছেন। তার মানে ভাবো, প্রত্যেকটি রোগী, সে পুরোনো হোক কী নতুন–সবার অতীত ও বর্তমানের ফিজিক্যাল কন্ডিশন ওঁর নখদর্পনে। কার গত হওয়ার সম্ভাবনা আছে, আর কার নেই তা তিনি চোখ বুজে বলতে পারবেন। সেক্ষেত্রে এরকম একজন স্কলার, সাবধানী ও অভিজ্ঞ ডাক্তার বুঝতে পারবেন না যে কোথাও কিছু গোলমাল হচ্ছে? অথচ উনি দুমদাম ন্যাচারাল ডেথের সার্টিফিকেট দিয়ে দিলেন? এত বড়ো ভুল কোনো নভিশ ডাক্তার করলে বুঝি। কিন্তু সঞ্জয় বসুর পক্ষে অসম্ভব। বরং সুজাতা অতগুলো খুন হওয়ার পর যা বুঝেছেন, তা খোদ বসুরই সবার আগে বোঝার কথা। অথচ তিনি বুঝলেন না। এটা একদমই অ্যাবসার্ড। আমি শুরুতেই বুঝেছিলাম যে একা সুজাতা নন, ডঃ বসু নিজেও জানেন যে মৃত্যুগুলো সন্দেহজনক। অথচ সেগুলোকে কভার করার জন্যই ওঁর আন্তরিক প্রচেষ্টা। যখন ডঃ সুজাতার কথায় ওঁকে গ্রেফতার করা হল, তখন কেউ কিছু বলার আগেই নিজের অপরাধ চুপচাপ স্বীকার করেনিলেন। চাইলে চুপও করে থাকতে পারতেন। কোর্ট প্রমাণ চায়। মোটিভও লাগে–শুধু বয়ানে কাজ হয় না। ওঁর বিরুদ্ধে কোনোটাই ছিল না। যার জন্য উনি জামিনও পান। ভদ্রলোকের উকিল কী ওঁকে সমস্ত দায় অস্বীকার করার বুদ্ধি দেননি? অথচ প্রত্যেকবার ডঃ বসু কিন্তু একটাই পয়েন্টে স্টিক করেছিলেন, ‘আমিই খুনী। তবে প্রমাণ করে দেখাও।’ এ আবার কী কথা? ওঁর সঙ্গে আমরা থোড়াই কুমির ডাঙা খেলছি যে চেঁচিয়ে বলবেন, “কুমির তোর জলকে নেমেছি, ধরে দেখা।’ ওঁর মতো একজন সেন্সিবল পার্সন এরকম বিটকেল ব্যবহার করেন কেন! ওটাই প্রথমে স্ট্রাইক করেছিল। ডঃ বসু যতই ডঃ বডকিন অ্যাডামসের ডায়লগ আওড়ান বা হ্যারল্ড শিপম্যানের ফ্যান হয়ে থাকুন, তিনি এত নির্বোধ একেবারেই নন। তবে নিজেকে খুনী বলছেন কেন? একবার নয়, প্রত্যেকবার। তার ওপর আমরা যখন ওঁর সঙ্গে সুশান্তর মৃত্যুর আগে কথা বলি, তখন সেই সক্রেটিস মার্কা ডায়লগ মনে আছে? মৃত্যু ‘নিয়তি’র খেলা! যখন জানতে চাওয়া হল যে ডঃ বসু রণজয়কে ছেড়ে কৌশিককেই বেশি প্রেফার করেন কেন, উত্তরটা মনে আছে অর্ণব? ‘কারণ মানুষের কর্মফল!’ এই কথাগুলো যদি বাবা অমুকানন্দ বলতেন তবু বোঝা যেত। কিন্তু বলছেন কে? ডঃ সঞ্জয় বসু! যাঁর পেশাটাই দার্শনিকের উলটোদিকে। তাহলে এই ডায়লগের মানে কী। কার কর্মফল? এর থেকেও বেশি মারাত্মক ডায়লগ তখন দিলেন যখন সুশান্ত মার্ডার হল। তখন স্ট্রেটকাট বলেই দিলেন যে আপাতত হয়তো কৌশিক বেঁচে আছেন, কিন্তু তিনিও মরবেন। যেখানে আজ সুশান্ত শুয়ে আছে, কাল সেখানেই তাঁকে শুতে হবে। কী মারাত্মক ডায়লগ! পরক্ষণেই আবার ওই কথাটা কভার করার জন্য ‘আপনাকেও ওখানে শুতে হবে… সবাইকেই শুতে হয়…’ এটসেট্রা হাবিজাবি বলে গেলেন। কিন্তু আসল ইঙ্গিত একটাই—কৌশিক বাঁচবেন না। একজন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ অমন নিস্পৃহভাবে কথাগুলো বলেন কী করে?”
“অদ্ভূত তো।” এতক্ষণে আত্রেয়ী বলল, “আমরা তো ওঁকেই সাইকো ভাবছিলাম!”
“সেটা ভাবাই স্বাভাবিক।” অধিরাজ কোল্ডড্রিঙ্কের গ্লাসে চুমুক দেয়, “ওঁর বিহেভিয়ারও তেমন। সাধারণভাবে মনে হবে ভদ্রলোকের মাথারই ঠিক নেই বা ছিটগ্রস্ত। নিজের ছেলেকে ছেড়ে উনি কৌশিককে মাথায় তুলে ঘুরছেন। তিনি যখন একদমই নগণ্য তখন একটা প্রেস্টিজিয়াস প্রোজেক্টে তাঁকে কো-অথরও করেছিলেন। আবার সেই বেচারি অত পরিশ্রম করার পর তাঁকে কো-অথরের জায়গা থেকে সরিয়েও দিলেন। কৌশিক কোর্ট কেস করার পরও ওঁর টিমে বহাল তবিয়তে থাকলেন। অসুস্থ হওয়ার পরে সেই প্রতিদ্বন্দ্বীরই প্রাণ দিয়ে সেবা করলেন, তাঁকে বাঁচালেন। কৌশিক ঠিক হয়ে উঠে ফের ওঁর বিরুদ্ধে কেসের তোড়জোড় শুরু করেন। কিন্তু তারপরও উনি ওঁর টিমে বহাল। ওপরন্তু কৌশিকের হিট অ্যান্ড রান কেসটা নিজের প্রভাব খাটিয়ে ক্লোজ করলেন। এর মানে কী!”
“এর মানে একটাই।” পবিত্র মাটন বিরিয়ানির প্লেটে রায়তা তুলে নেয়, “ডঃ বসুর মাথাটা একদমই গেছে! হি ইজ আ ফুল সাইকো!”
“আপাতদৃষ্টিতে তেমনই মনে হয়। আর নিজেকে সাইকো কিলার বলে ঘোষণা করেও বসে আছেন।”
অধিরাজ একটু থেমে বলল, “তোমরা যখন ওঁকে সাইকো ভাবছিলে, তখন আমার সন্দেহ হচ্ছিল, উনিই সবচেয়ে বেশি লজিক্যাল লোক নন তো? আমার ওঁকে মহাভারতের শকুনি কম, পুত্রস্নেহে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র বলে বেশি মনে হয়েছিল। আমার সন্দেহ হল, এমন নয়তো যে সব মিথ্যেবাদীর ভিড়ে একমাত্র ডঃ বসুই একের পর এক অপ্রিয় সত্যি কথাগুলো বলছেন? টুথ, ট্রুথ অ্যান্ড ওনলি টুথ। এবং তিনিই সবচেয়ে কম ব্লান্ডার করে লজিক্যাল স্টেপগুলো নিয়েছেন।”
“কীরকম লজিক্যাল?”
আহেলি প্রতিবাদ করে, “একটা বই লেখার পর কো-অথরের নাম সরিয়ে ফেলাটা কোন দিক দিয়ে সত্যবাদিতা ও লজিক্যাল?”
“ওটার বিষয়ে পরে আসছি মিস মুখার্জি। যদি কিছুক্ষণের জন্য ডঃ বসুর ওই প্রবঞ্চনা আর কৌশিকের বিরুদ্ধে নেগলিজেন্সের অভিযোগ তুলে তাঁকে বসিয়ে দেওয়ার ঘটনাটাকে বাদ দিই—তবে কী পুরো কেমিস্ট্রিটা পিতা-পুত্রের মনে হয় না? ডঃ বসু কৌশিকের বাবা সম্পর্কে বলতে গিয়ে কী বলেছিলেন মনে আছে? কৌশিকের বাবাই তো একজন ব্যাকস্ট্যাবার। বেইমানি কৌশিকের রক্তে। এটা কী আদৌ উনি ডঃ সুধাংশু চক্রবর্তী সম্পর্কে বলছিলেন? যিনি আমেরিকায় সেটল হওয়ার পর একে তো দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বিবাহ করেন, ওপরন্তু ডঃ বসুর দ্য লাস্কার অ্যাওয়ার্ড পাওয়া বানচাল করেন, উক্তিটি কী তাঁর উদ্দেশ্যে?”
সে একটু চুপ করে থেকে বলল, “ বোধহয় তা সম্ভব নয়! আমরা জানি যে ডঃ বসু নিজেই ডন জুয়ান কেস। ওঁর সুপুত্র
রণজয়ের কথা মনে করো। তাঁর কথা অনুযায়ী যাকে ডঃ বসু বিয়ে করেছেন তাকে ভালোবাসেননি, আবার যাকে ভালোবেসেছেন তাকে বিয়ে করেননি। উনি নিজেই একজন ক্যাসানোভা। এক নারীতে সন্তুষ্ট নন। যার অ্যাফেয়ারের শেষ নেই, নিজের চরিত্রই এরকম, তিনি কোন মুখে সুধাংশুকে উর্মিলাকে ডিভোর্স দেওয়ার জন্য ব্যাকস্টাবার বলবেন? অসম্ভব। আমি তাই ডঃ বসুর এই বিটকেল বিহেভিয়ারের মানে খুঁজতে বসলাম। আর সেটাই আমাকে প্রচুর সম্ভাবনার সামনে এনে দাঁড় করাল।”
“বাট হাউ?”
“সিম্পল খুড়ো!”
পবিত্রর ‘হাউ’ শুনে অধিরাজ হেসে ফেলল, “ডঃ বসু বারবার বলছেন, আমিই খুনী। কেন? এমন নয়তো যে আসলে উনি নিজের রক্তকেই ‘খুনী’ বলছেন। যিনি ডঃ ডেথ, তিনি যে ওঁরই ‘ওন ব্লাড’ সেটা তো সুজাতা ও সুশান্তর বড়ির ওপর হেয়ার স্যাম্পলের ডি এন এ-ই বলে দিয়েছিল। কিন্তু আমি তখনও ধন্দে। যে খুনী নিজের ফিঙ্গারপ্রিন্ট পর্যন্ত রাখে না, সে মাথার চুল ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে কেন। হয় মিসলিড করার জন্য, অথবা সে টের পায়নি যে তার হেয়ারফল হচ্ছে! মিসলিড করলে অত্যন্ত বোকার মতো কাজ করেছে কারণ রণজয় বসুর ঠাসা ও কেয়ারি মারা হেয়ারস্টাইলই বলে দেয় ওঁর হেয়ার লসের সম্ভাবনা খুব কম। বাবার মতোই রণজয়ও ঘন চুলের অধিকারী ও স্বাস্থ্যবান মানুষ। হেয়ারফল তো ওঁর জিনে আছে বলে মনেই হয় না। তাহলে ক্রাইম সিনে ওঁর চুল রাখা কিলারের বোকামি। আমরা যদি ‘বায়োলজিকাল সন’-এর চক্করে না পড়ে ডাইরেক্ট ক্রাইমসিনের হেয়ারের সঙ্গে রণজয় বসুর হেয়ার স্যাম্পল মিলিয়ে দেখতাম তাহলেই পুরোপুরি মিলত না। এত বোকা সে নয়। সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় সম্ভাবনাটা প্রবল। খুনীর নিজেরই হেয়ারফল হচ্ছে, কিন্তু ও পাব্লিক তখনও টের পায়নি। হেয়ারফলের অনেক কারণ হতে পারে। কিন্তু একটা অবধারিত কারণ তাদের মধ্যে হল ভগ্নস্বাস্থ্য। অথচ তিনি ডঃ বসুর বায়োলজিকাল সন। ডক কিন্তু বারবার এই শব্দটাই বলেছেন। আমাদের কাছে অপশন ছিল না তাই রণজয়কেই ধরেছিলাম। হিসেবে যখন মিলল না, তখন বাধ্য হয়েই আমি আবার ভাবতে বসলাম। এমন নয় তো, যে এই ক্যাসানোভাটি যাকে বিয়ে করে ভালোবাসেননি, তার তরফ থেকে যেমন একটি পুত্র বিদ্যমান, তেমন যাকে বা যাদের ভালোবেসেছেন কিন্তু বিয়ে করতে পারেননি, করেননি—তাদের ঘরেও ওঁর ঔরসজাত পুত্রসন্তানের অস্তিত্ব আছে? ওঁর যা চরিত্র আমরা শুনেছি, তাতে এটার সম্ভাবনা প্রবল। ইনফ্যাক্ট, এটা হওয়ার চান্সই সবচেয়ে বেশি। ইন দ্যাট কেস কে হতে পারে সেই মানুষটি। ইন্দ্রজিৎ সরকার ওঁর সমবয়সী। সুহাসিনীকে ওঁর কন্যা যে ভাববে সে পাগল। রঞ্জন নায়েক হতেই পারে না। ও ব্যাটাকে ডঃ সরকারের জন্য ডঃ বসু বাশ গিলে টিমে রেখেছিলেন। নয়তো আর একটু হলেই শীলার কথায় পুলিসে দিতে যাচ্ছিলেন। নেতি নেতি করে পড়ে রইলেন একজনই। ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী, যাঁকে উনি চোখে হারান। তিনি ওঁর শুধু প্রিয় শিষ্য নন। পুত্র হওয়ার চান্সও আছে। আর এই বাস্তবটা সুধাংশু চক্রবর্তীর সঙ্গে ওঁর সম্পর্ক এবং সম্পর্কের ভাঙন সুন্দর জাস্টিফাই করে। সুধাংশু নিজে বিয়ে করার পরও তাঁর পরমবন্ধু ডঃ বসুকে অন্ধবিশ্বাসে ফ্যামিলির অংশ হিসাবেই মেনে নিয়েছিলেন। নয়তো মিঞাঁ বিবির বেড়াতে যাওয়া, অনুষ্ঠান বা ডিনার পার্টিতেও বন্ধুকে সামিল করতেন না। এতটাই বিশ্বাস। আবার অন্যদিকে যদি ভেবে দ্যাখো তবে নিজের স্ত্রী-ছেলেকে ত্যাগ করা বা ডঃ বসুকে চিরশত্রু বানিয়ে দেওয়ার পেছনে সেই বিশ্বাসভঙ্গই যথেষ্ট জোরালো মোটিভ। সেইজন্যই গায়ের জ্বালায় দ্য লাস্কার অ্যাওয়ার্ড থেকে ওঁকে বঞ্চিত করতে চাইছিলেন। কারণ সুধার বিশ্বাসকে গরল বানিয়েছিলেন খোদ ডঃ বসুই। তাই সঞ্জয় কৌশিকের বাবাকে ‘ব্যাকস্ট্যাবার’, ‘বেইমান’ বলেছিলেন। সেটা কোনোমতেই সুধাংশু হতে পারেন না, স্বয়ং তিনিই। ওঁর মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে ভাবতে ভাবতেই আমি বুঝতে পারি—কৌশিকও নিঃসন্দেহে ওঁরই ঔরসজাত পুত্রসন্তান। এটা উনি নিজেই বলেছেন। যখন কৌশিকের গুরুত্ব ওঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, তার উত্তরে একদম স্ট্রেট জানান কৌশিক ওঁর কর্মফল। সমঝদার কো ইশারা হি কাফি। ডঃ চক্রবর্তী ওঁর ছেলে এবং সম্ভবত সেই বায়োলজিকাল সন যার হেয়ার স্যাম্পল আমরা পেয়েছি। রণজয়ের হেয়ারফল না হলেও কৌশিকের ডেফিনিটলি হত। হার্ট ডিসিজ হলেও হত। কিংবা টার্মিনাল ইলনেস হলে তো আরও হত। আমি শুরু থেকেই সন্দেহ করেছিলাম যে কৌশিকের রোগটা দুরারোগ্য কোনো অসুখই বটে। আর এমন ভগ্নস্বাস্থ্যের মানুষেরই অজান্তে সবচেয়ে বেশি হেয়ারফল হয়। তাই আমার ফেভারিট সাসপেক্ট কৌশিকই ছিলেন।”
“টার্মিনাল ইলনেস সেটা আবার বুঝলেন কী করে ব…ব…ব…স!”
চাউমিন এতক্ষণ গাউগাউ করে একগাদা বাটার নান, শাহি পোলাও, মাটন রেজালা, কাবাব গিলছিল। এবার ফুরসত পেয়ে জানতে চায়, “কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে কেউ মরে না।”
“তা মরে না। কিন্তু ডঃ বসুর বিহেভিয়ারই প্রমাণ করে যে কৌশিক চক্রবর্তী বেশিদিন বাঁচবেনই না। একে তো আমাদের মুখের ওপর ওই বিস্ফোরক বক্তব্য রেখেছিলেন। দ্যাট ওয়াজ নাথিং বাট দ্য টুথ। উনি কৌশিককে খুনের হুমকি দিচ্ছিলেন না। ওপরন্তু ওই গুরুত্বপূর্ণ বইটা থেকে অ্যাজ আ কো-অথর ওঁর নাম সরিয়ে দেওয়াটাই পুরো ব্যাপারটা জাস্টিফাই করে। সবাই এটাকে প্লেগিয়ারিজম ভাবছেন। কিন্তু আমি বুঝেছিলাম যে এটা ডঃ বসুর প্র্যাকটিক্যাল সিদ্ধান্ত যা প্রুভ করে তিনি আগেই বুঝেছিলেন কৌশিক বাঁচবেন না!”
সে আর একটু কোল্ডড্রিঙ্ক পান করে, গলা ভিজিয়ে ফের বলে, “মিস মুখার্জি অভিযোগ তুলছিলেন যে ডঃ বসু কৌশিককে বঞ্চিত করেছেন। তা উনি করেননি। বরং, উনি জানতেন যে দ্য লাস্কার অ্যাওয়ার্ড ‘লিভিং’ পার্সনরাই পেতে পারে। মানে অ্যাওয়ার্ডটা পেতে হলে বেঁচে থাকা জরুরি। শুধু তাই নয়, উনি এটাও জানতেন যে উক্ত পুরষ্কারের সঙ্গে নোবেল পুরষ্কারের কানেকশন মারাত্মক। দ্য লাস্কার অ্যাওয়ার্ড ঘরে ঢুকলে নোবেলও আসবে। কিন্তু আবার এখানেও প্যাঁচ। দ্য লাস্কার অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার সময় যদি কৌশিক জীবিতও থাকেন, নোবেল পাওয়ার আগে কিছুতেই থাকবেন না। নোবেল প্রাইজ পাওয়ার প্রসেস দীর্ঘতর। অতদিন উনি বাঁচবেন না। আর নোবেল পসথুমাসলি দেওয়া হয় না। দুই লেখকের মধ্যে একজন টপকে গেলেই ওটা হাতছাড়া হয়ে যায়। কৌশিকের মৃত্যু অবধারিত। কিন্তু তার জন্য ভারতবর্ষও এই দুটো অ্যাওয়ার্ড থেকে বঞ্চিত হবে? বঞ্চিত তো আসলে কৌশিকের নিরলস পরিশ্রমও হবে। যে বইয়ের জন্য ঘাম-রক্ত ঝরিয়ে দিলেন, সেই বই একটুর জন্য দেশের নাম উজ্জ্বল করবে না। একটাই অপরাধ। যে মানুষটা খেটে মরল, সে আর বেশিদিন বাঁচবে না। এটা একটা কথা হল। কৌশিকের এই রক্ত জল করা পরিশ্রমের কোনো মূল্য নেই? ডঃ বসুর মনে হয়েছিল, এটা রীতিমতো অবিচার। ওঁর ছেলে মারা গেলেও তাঁর কীর্তি তো অমর হয়ে যেতে পারে। আমার দৃঢ় ধারণা, উনি ডঃ চক্রবর্তীর গুরুতর অসুস্থতার আগেই টের পেয়ে গিয়েছিলেন। সিম্পটম আগেই শুরু হয়েছিল। ওঁর মতো ব্রিলিয়ান্ট ডাক্তারের বুঝতে অসুবিধে হয়নি যে রোগটা দুরারোগ্য অ্যামিওট্রফিক ল্যাটারাল স্কলেরোসিস বা এ এল এস। যার কোনো চিকিৎসাই নেই। তিনি নিজের সন্তানের পরাজয় কী করে মেনে নিতেন? তাই বুকে পাথর রেখে কৌশিকের নামটা সরিয়ে দিলেন। যাতে বইটা নির্বিঘ্নে সৰ্বশ্ৰেষ্ঠ পুরষ্কারটা পেতে পারে। ওঁর ভালোবাসার সন্তানের কাজ মর্যাদা পায় ও অমর হয়ে থাকে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এটা নোবেল পেলেই ডঃ বসু ভূমিকাতেই বিরাট করে কৌশিকের অবদান ও পরিশ্রমের কথা স্বীকার করতেন ও মর্যাদা দিতেন। কিন্তু ডঃ চক্রবর্তী পুরোটাই উলটো বুঝলেন। রাগে অন্ধ হয়ে। নিজের বাবার বিরুদ্ধেই কেস ঠুকলেন। তাঁরও দোষ নেই। তিনি জানবেন কী করে যে মারণ রোগ ওঁর মধ্যে বাসা বেঁধেছে? তখনও তিনি আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ। নিজেই রোগের লক্ষণগুলো টের পাননি। আর স্বয়ং কোন বাবা প্রাণে ধরে ছেলেকে বলতে পারেন যে ‘তুমি মরতে চলেছ।’ যদিও এরপরই কৌশিক নিজের দূরারোগ্য রোগের কথা জানলেন। লোকটার মানসিক অবস্থা একবার ভেবে দেখুন। সত্যিই তিনি বিরাট প্রাপ্তির দিকে এগোচ্ছিলেন। ডঃ বসু যে ওঁর বাবা তা নির্ঘাত মায়ের কাছ থেকেই শুনেছিলেন। নয়তো একটা লোক বঞ্চিত হয়, ব্যাকস্ট্যাবড় হয়, মেন্টরের নামে কেসও ঠোকে, তবু তাঁকে ছেড়ে যেতে পারে না কেন? কৃশানু রায়ের কাছে যেতে হলে তো আগেই যেতে পারতেন। গেলেন না কেন? মোস্ট প্রব্যাবলি ঠিক সেই মুহূর্তেই উর্মিলা ওঁকে আসল পিতৃপরিচয় জানিয়েছিলেন। তাই দু-জনের মধ্যে যতই মনোমালিন্য হোক, কেউ কাউকে ছাড়তে পারেননি।”
বলতে বলতেই অধিরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “টিপিক্যাল বিষাক্ত ভালোবাসা। তোকে জ্বালাবও, প্রয়োজনে নিষ্ঠুরও হব, আবার বুক দিয়ে আগলাবও, সেবাও করব। কিছুতেই ছাড়ব না! রণজয় বলেছিলেন না ওঁর বাবার ভালোবাসা বিষাক্ত? ঠিক তাই। কিন্তু এটা উনি বলেননি যে বিষাক্ত হলেও সেটা ভালোবাসাই। তাও ধৃতরাষ্ট্রের মতো অন্ধ। তাই নিজের রক্তের দায় নিয়ে নিজেই নিজেকে খুনী বলেন। আমাদের ব্লু-ও দেন। এমনকী তিনি জানতেন যে কৌশিকই ফ্রাস্টেশন থেকে এই কীর্তি করছেন। আফটার অল, নিজের সন্তানের কাজ আর মনস্তত্ত্বকে বাবা ছাড়া আর কে বুঝবে? উনি ওঁকে থামানোর জন্যই ‘মেডিক্যাল নেগলিজেন্স’-এর অভিযোগ পর্যন্ত আনেন। যাতে এই শেষের কটা দিন ওঁর প্র্যাকটিস করা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কৌশিক এমন মাস্টারপ্ল্যান বানালেন যে ডঃ বসুকে হার মানতে হল! সব দায় নিজের ঘাড়ে নেওয়া ছাড়া পুত্রস্নেহে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র আর কী-ই বা করতে পারতেন?
ওদিকে আমি পড়েছি ফাঁপরে। ডঃ সঞ্জয় বসুর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বুঝতে বাকি ছিল না। অথচ বাকিটা অধরা। প্রমাণ করব কী করে? শুধুমাত্র একটা ভুলের দরকার ছিল। সেই ভুলটাই কৌশিক চক্রবর্তী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে নিজের বয়ান দিতে গিয়ে করলেন। নিজের অ্যালিবাই সুপারস্ট্রং রাখতে গিয়ে সেকেন্ড আর ফোর্থ স্যাটার্ডে যে কোর্ট বন্ধ থাকে তা গুলিয়ে ফেললেন। আর ওটাই ছিল তুরুপের আসল তাস! ওই স্টেটমেন্টটাই প্রমাণ করে দিল যে কৌশিকই অপরাধী। নয়তো মৃত্যুশয্যায় শুয়েও কেউ এমন মিথ্যে কথা বলে? উঁনিই সুশান্তকে নিজের বডি ডাবল বানিয়ে এই গেম খেলছিলেন। সিস্টার মলয়ার সঙ্গে ওঁর ভালো সম্পর্ক ছিল। তাই ওঁদের র্যাকেট, কখন পাওয়ার গ্লিচ হয়, কখন সিসিটিভি ক্যামেরা অচল হয়ে যায় তাও জানতেন। যে মুহূর্তে সিসিটিভি অকেজো বা আবছা হয়ে যেত, সেই মুহূর্তেই নিজের কাজ চটপট সেরে ফেলতেন। যেমন মলয়া জানতেন যে কৌশিকের আসল রোগটা কী। এবং মৃত্যুর আগে তিনিই দ্বিতীয় মানুষ যিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে কৌশিকই খুনী। কারণ এই সিসিটিভি আর পাওয়ারের ফেইলিওরের সুযোগটা খুনী সম্পূর্ণভাবে নিচ্ছিল। আর সেটা মলয়া, ডঃ সরকার এবং সুশান্ত ছাড়া একমাত্র আর একটা লোকই জানে। ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী। যার সঙ্গে মলয়া ও সুশান্ত, দু-জনেরই দুর্দান্ত কানেকশন। তিনি জানবেন না তো কে জানবে! মলয়া কৌশিকের পরিস্থিতি জানতেন। মায়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত! নিজে কয়েকদিন বাদেই মরবেন অথচ কয়েকটা টাকার জন্য যন্ত্রণার সঙ্গে লড়াই করে রক্ত জল করছিলেন। মলয়া চৌধুরী নিজের জীবনের সঙ্গে কৌশিককে গভীরভাবে কানেক্ট করে ফেললেন। ভয়ও ছিল, যে পাছে নিজের অজান্তেই মুখ ফস্কে সত্যিটা পুলিসকে বলে ফেলেন। তিনি কৌশিকের অবস্থা দেখে ওঁকেই সাপোর্ট করলেন। তাই ভাবলেন, ভদ্রলোককে শান্তিতেই মরতে দেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত। নিজে অনেক যুদ্ধ করে বহুবছর বেঁচেছেন। কৌশিক এই অবস্থায় গ্রেফতার হলে সে মানুষটারও যন্ত্রণার শেষ থাকবে না। তাই ‘লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ নিজের জীবনের ল্যাম্পটাই সায়ানাইড দিয়ে ফুঁ মেরে বুজিয়ে দিলেন! কী অদ্ভুত মানুষ।” সে সহানুভূতি মাখা কণ্ঠে বলল, “ওই একটা মানুষের মৃত্যুর জন্য আমার আফসোস থাকবে। মহিলা কৌশিককে বাঁচাতে খামোখাই নিজের প্রাণটা দিলেন। তিনিও ইললিগ্যাল কাজকর্ম করেছেন ঠিকই। কিন্তু ওই টিমের সমস্ত সদস্যদের মধ্যে একমাত্র ওঁরই মনে দয়া, মায়া, মমতা—সর্বোপরি মানবিকতা বস্তুটা ছিল।”
“কিন্তু কৌশিকের যে ওই অ্যামিওট্রফিক ল্যাটারাল স্কলেরোসিস না কী যেন হয়েছে, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বা হার্টের কোনো টার্মিনাল রোগ নয়—সেটাই বা কী করে বুঝলে?”
“এটাও ডঃ বসুর অবদান। যদিও স্বীকার করতে বাধা নেই যে প্রথম দর্শনেই আমারও অদ্ভুত লেগেছিল। জানতে পেরেছিলাম যে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে কৌশিক প্যারালাইজড হয়েছিলেন। ওঁর দেহে তার চিহ্নও ছিল। কিন্তু ভদ্রলোকের মুখের বাকা ভাবটা আমার স্বাভাবিক কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের বলে মনে হয়নি। বরং মুখের ভাব আর অস্বাভাবিক হাসিটা অবিকল স্টিফেন হকিংয়ের মুখের এক্সপ্রেশনের সঙ্গে হুবহু মেলে। আর ওয়াকিং স্টিক নিয়ে চলার ভঙ্গিটাও স্টিফেনের মতোই যখন হকিং হাঁটতে পারতেন। সর্বোপরি কথা বলার সময় ওঁর গলার আওয়াজটা শুনেছো? কফ বসা ঘড়ঘড়ে আওয়াজ। ওটাও একদমই স্বাভাবিক নয়। কার্ডিয়াক প্রবলেমে গলার আওয়াজ অমন হয় না। বরং ওরকম আওয়াজ পালমোনারি ফাইব্রোসিস, নিউমোনিয়া বা সি ও পি ডির পেশেন্টদের হয়। এককথায় বলতে গেলে, কার্ডিয়াক প্রবলেমের ক্ষেত্রে নয় পালমোনারি বা ফুসফুসের সমস্যায় ওই ধরনের ঘড়ঘড়ে আওয়াজ আসে। একটু অস্বাভাবিক লেগেছিল, তবে তখন অত মাথা ঘামাইনি। অথচ যখন দেখলাম যে ওঁর মেডিক্যাল হিস্ট্রিই হাওয়া, আর ডঃ শেঠি জানালেন যে উনি কোনোরকম মেডিসিন নেন না। ডঃ সঞ্জয় বসুও জানিয়েছেন যে কৌশিকের মেডিকেশনের দরকার নেই—তখনই সন্দেহটা গাঢ় হল। মিস দত্তেরও সন্দেহ হয়েছিল যে ব্যুরোয় থাকাকালীন হার্টের রোগে ভোগা পেশেন্ট একটাও ওষুধ খাননি কেন! ডঃ সঞ্জয় বসুর সুগারের প্রবলেম তাই ইনসুলিন নেন। একদিন ইনসুলিন না নিলে ওঁর তেমন কোনো মারাত্মক ক্ষতি হত না। অতখানি সিরিয়াস প্রবলেমও ছিল না। কিন্তু একজন হার্ট পেশেন্টের সঙ্গে কিছু না কিছু মেডিসিন থাকবেই। অ্যাকর্ডিং টু ডক্টর শেঠি, অন্তত একটা সর্বিট্রেট থাকা জরুরি। সেটাও নেই! এটা কী করে সম্ভব! যে সঞ্জয় বসু সিরিয়াস বা সাধারণ পেশেন্টদেরও ১৯৯৮ এর রেকর্ডও রেখে দিয়েছেন, তিনি কৌশিকের কোনো রেকর্ড রাখবেন না কেন? স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মানুষটা সম্পূর্ণ ফিট এখনও হয়নি, অথচ তিনি কোনো মেডিসিনই নেন না। এটা কী করে পসিবল।”
বলতে বলতেই সে অর্ণবের দিকে তাকায়, “তোমার মনে আছে যে আমরা মলয়াকে নিয়ে আলোচনা করার সময়ে বলেছিলাম যে একমাত্র হসপিটাল আর মেডিক্যাল সায়েন্স যে রোগীকে জবাব দিয়ে দিয়েছে, একমাত্র তাদের ওপরই ইললিগ্যাল ড্রাগ টেস্টিং হতে পারে। কারণ যে মরবেই তার জন্য কোনো নিদান বা ওষুধই নেই! অ্যাট দ্যাট ভেরি মোমেন্ট ওই কথাটাই আমার মাথায় স্ট্রাইক করল। রিপোর্ট বা মেডিকেশন তখনই থাকে না যখন চিকিৎসাবিদ্যাও হাল ছেড়ে দেয়। আর কৌশিকের মেডিক্যাল হিস্ট্রির গোপনীয়তা, তাঁর ওষুধ ছাড়াই জীবনযাপন দেখে মনে হল–উনি এমন কোনো রোগে ভুগছেন না তো, যার কোনো ওষুধ বা চিকিৎসাই নেই। এমন কোনো অসুখ, যা জানার পর ওঁর ডাক্তার প্রেমিকাও ওঁকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন দীর্ঘ বারো বছরের সম্পর্ক ছেড়ে। তিনি জানতেন, কৌশিকের সামনে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। নয়তো যে লোকটা রিকভার করছে, তাকে ছেড়ে দীর্ঘদিনের প্রেমিকা চলে যায় না। বরং আরও কিছু বছর অপেক্ষা করে। মনে আছে অর্ণব? তখনও একবার আশ্চর্যভাবে স্টিফেন হকিংয়ের জীবনের প্রসঙ্গই উঠেছিল। আমার মনে হয়েছিল–এটা আদৌ কাকতালীয় নয়। বাহ্যিক দিক দিয়েও স্টিফেন হকিংয়ের সঙ্গে মিল পাচ্ছি, আবার ব্যক্তিগত জীবনেও সেই একই ট্যাজেডি। কার্ডিয়াক প্রবলেমের চেয়ে পালমোনারি প্রবলেম থাকার লক্ষণ বেশি। ওপরন্তু হোপলেস কেসের মতোই এখানেও কোনো ওষুধের অস্তিত্ব নেই। ডঃ সঞ্জয় বসু’র মেডিসিনের দরকার নেই টাইপের ডায়লগটাই চিৎকার করে বলছিল—মেডিসিনের দরকার নেই কারণ কৌশিক সমস্ত চিকিৎসার উর্ধ্বে। তার ওপর যে লক্ষণগুলো ডঃ শেঠি গুলি লাগার পর কৌশিকের দেহে পেয়েছিলেন, সেই স্পাইনাল কর্ডের ইনফ্লেমেশন, ইনফেকশন, ল্যাক অব ব্লাড সাপ্লাই ইন ব্রেন, মেরুদণ্ডের দুরবস্থা—ওগুলো সব আশ্চর্যজনকভাবে অ্যামিওট্রফিক ল্যাটারাল স্কলেরোসিস বা এ এল এসের সিম্পটমের সঙ্গে মিলছে। গত তিনবছর ধরে জেনিথ আর এম এম এন আই হসপিটালে মৃত্যু হচ্ছে। আর এ এল এসের ক্ষেত্রে মানুষের বেঁচে থাকার মেয়াদ মাত্র তিন থেকে পাঁচ বছর! তাছাড়া খুনগুলোর ফ্রিকোয়েন্সি দ্যাখো। মিস দত্ত রাফলি বললেও এটা বোঝা গেছে যে প্রথম বছরে অস্বাভাবিক মৃত্যুর হার কম। দ্বিতীয় বছরে সেটা লাফ মেরে অনেকটাই বেড়েছে। আর তৃতীয় বছরে এসে সেটা তো প্রায় সেঞ্চুরির পথেই চলেছিল! এতটাই ধড়বড় করে লাশ পড়ছিল যে সুজাতা রায় পর্যন্ত অবাক হয়েছিলেন! খুনীর এত তাড়া কীসের? বাকি সিরিয়াল কিলাররা তো দশ-বিশ-ত্রিশ বছর ধরে ধীরে সুস্থে মানুষ মেরেছেন। কিন্তু এই ডঃ ডেথের মধ্যে কোথাও একটা প্রচণ্ড তাড়া আর অস্থিরতা দেখতে পাচ্ছ না? এটা আত্মবিশ্বাসের চেয়েও বেশি মরিয়া হয়ে যাওয়ার লক্ষণ। কেন? তবে কী ডঃ ডেথের নিজের হাতেই আর সময় নেই? নয়তো তার এত তাড়া কীসের? সব পয়েন্টগুলো যদি একসঙ্গে বসাও, দেখবে গোটা সিনারিও পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। ডঃ সঞ্জয় বসুর উদ্ভট হাবভাব, কৌশিকের মেডিসিনের দরকার নেই, তার রেকর্ডহীন অসুস্থতা, মেডিসিন না খাওয়া, ওষুধের প্রয়োজন নেই, এ এল এসের সিম্পটম–যেটাকে ঢাকার জন্য নিজেকেই স্পাইনাল কর্ডে গুলি খেতে হল, এ এল এসের শটটাইম নন কিওরেবল লাইফস্প্যান আর কোনোরকম চিকিৎসা না থাকা, মাসল আর নার্ভ দুর্বল হয়ে যাওয়ার জন্য হেয়ারপকেট শিথিল হয়ে চুলের ঝরে পড়া—সব একসঙ্গে বসিয়ে দ্যাখো। একদম খাপে খাপে মিলছে। তার ওপর ডাইরেক্ট এভিডেন্স না থাকলেও ডঃ বসুর মনস্তাত্ত্বিক এভিডেন্সও দিব্যি মিলে যাচ্ছে। এছাড়া কৌশিক চক্রবর্তী’র দিক দিয়েও কম মনস্তাত্ত্বিক লক্ষণ ছিল না।”
“কীরকম?”
প্রশ্নটা না করেই পারল না অর্ণব। সব কিছু তো তারও চোখের সামনেই ছিল। অথচ সে এগুলোকে কোনো ব্লু বা এভিডেন্স বলেই ধরেনি! অথচ স্যারের চোখে কোনো কিছুই ফায়নি।
“এইজন্যই বলছিলাম যে পেশেন্টদের ফাইলগুলোই একেকটা গল্প। প্রথমতো ডঃ চক্রবর্তীর হাতের লেখা। এখানেও দ্যাখো, ডঃ সঞ্জয় বসু আর ডঃ চক্রবর্তীর লেখার ছাঁদ আর প্যাটার্ন একদম একরকম। যেন একজন অন্যজনকে নকল করেছেন। নীচে কমেন্ট বা মোটিভেশনাল স্পিচ লেখার প্রবণতাটা শুরু শিষ্যের হতে পারে। কিন্তু হাতের লেখার এতখানি সিমিলারিটি। এটাও জেনেটিক রিলেশনের কারণে হওয়া সম্ভব। তবে আমি ডঃ চক্রবর্তীর দুই ধরনের হাতের লেখার নমুনায় বেশি চমকে গিয়েছিলাম। কোথাও একদম দায়সারাভাবে হিজিবিজি প্রেসক্রিপশন লিখেছেন, কোথাও আবার ভীষণ সুন্দর হস্তাক্ষরে নিখুঁত ডিটেলিং-সহ। আশ্চর্যের কথা, যে পেশেন্টরা সুস্থ হয়ে বাড়ি গিয়েছিল, তাদের ফাইলে ওঁর এই চমৎকার হস্তাক্ষরের মেডিক্যাল মহাভারত অনুপস্থিত। একমাত্র সেই ফাইলেই এই অপূর্ব হ্যান্ডরাইটিং আছে, যার পেশেন্টরা মারা গিয়েছেন। এই তফাত পুরো চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিল যে কৌশিক চক্রবর্তীর মনস্তাত্ত্বিক লক্ষণ একজন খুনীর। আর এটা তিনি সম্পূর্ণ অবচেতনে করছেন। যে পেশেন্টকে তিনি মারবেন না, তার প্রতি তেমন মনোযোগ নেই। তাই দায়সারা হ্যান্ডরাইটিং। কিন্তু যাদের মারবেন, তাদের প্রতিটা মুহূর্তের আপডেট তিনি ফাইলে লিপিবদ্ধ করছেন। এত সুন্দর হস্তাক্ষরে, এমন যত্নে যেন ওগুলো ওঁর ট্রফি, যা দেখে উনি পরবর্তীকালে আনন্দ পাবেন! এটা একজন পাক্কা সিরিয়াল কিলারের টেন্ডেন্সি! ওঁর রিমার্কসগুলোও দ্যাখো। ডঃ বসুর রিমার্কসে অনেকবার লেখা আছে, ‘ওয়েলকাম টু লাইফ’, ‘গেট ওয়েন্স সুন।’ কিন্তু কৌশিক লিখেছেন ‘ডক্টর ইজ ইন, পেইন ইজ আউট,’ বা ‘ডক্টর অন, পেইন হ্যাজ গন’ টাইপের মন্তব্য। যার অর্থ ডাক্তার আসার সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রণাও শেষ। কোথাও পেশেন্টের প্রতি শুভকামনা নেই। আর ওঁর ফিলোজফি অনুযায়ী তো জীবনটাই যন্ত্রণা। তাই ওই আপাতনিরীহ লাইনের নীচেই লুকিয়ে ছিল কৌশিকের মনের বিকৃতি। ডাক্তার এসে জীবন নামক যন্ত্রণা শেষ। তার নীচে স্মাইলি। ওটা রসিকতা নয়। প্রেসক্রিপশনের মতো সিরিয়া ডকুমেন্টসে কেউ স্মাইলি দেয় না। যে পেশেন্টরা বেঁচে ফিরেছেন তাদের একটি প্রেসক্রিপশনেও কিন্তু স্মাইলি নেই। অথচ ওই একশো চুয়ামটি ফাইলের প্রত্যেক প্রেসক্রিপশনে স্মাইলি। মানে, অবচেতনে ডাক্তার একটুও সিরিয়াস নন। একাধারে তিনি যত্ন সহকারে, গভীর মনোযোগে প্রেসক্রিপশন লিখছেন, অন্যদিকে স্মাইলি দিয়ে বোঝাচ্ছেন আমি একদন সিরিয়াস নই। যত্নের ত্রুটি রাখিনি। কিন্তু এ প্রেসক্রিপশন তোমার কোনো কাজে লাগবে না বাপু! শেষে সব ফক্কা! কী ভয়ংকর মানসিক বৈকল্য।”
অর্ণবের বুকের ভেতরে শিরশিরে অনুভূতি। আহেলি বিস্ময় বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছে। পবিত্রর চোখে অবিশ্বাস। মিস দত্ত আর মিস বোসের মুখে স্পষ্ট আতঙ্ক। এমনকি টুইঙ্কলও ঘাবড়ে গিয়েছে। এ কেমন মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়! এ কী জাতীয় ভয়াবহ বিধ্বংসী ও বিকৃত উল্লাস! একটা প্রেসক্রিপশনই প্রকট করে দেয় এক চিকিৎসকের খুনী হয়ে ওঠার নিষ্ঠুরতম মনোভাব। যেন লাশের পাহাড়ে চড়ে মজা দেখতে চাইছেন।
“এছাড়া ওঁর আর একটি বদভ্যাস বা মুদ্রাদোষও আছে। উনি পেনের পুশবাটনটা ধরে প্রেস করতেই থাকেন। হয়তো ডঃ বসু ওঁর হাতের মাসলের অ্যাক্টিভিটি ঠিক রাখতে এরকম কিছু প্র্যাকটিস করতে বলেছিলেন। কিন্তু সেটাও ওঁর অবচেতন মনের খুনীকেই বারবার বের করে আনছিল।”
অধিরাজ একটু শ্বাস টেনে নিয়ে বলল, “প্রথমবার যখন ওঁর বাড়িতে যাই, তখনও উনি পেনের পুশবাটনটাকে আড়াই মিনিটে অজস্রবার পুশ করেছিলেন। অর্ণব লক্ষ করেনি। কিন্তু আমি গুণে দেখেছিলাম ভদ্রলোক আড়াই মিনিটে একশো বাহান্নবার পেনটাকে পুশ করেন। দ্বিতীয়বার যখন হসপিটালে বসে সার্জারির কাগজপত্র সাইন করছিলেন, তখনও সেই একই কাণ্ড। আমি সেবারও চুপচাপ গুণছিলাম। ওই সময়ে কৌশিক একশো বাহান্ন নয়, একশো চুয়ান্ন বার পেনটাকে পুশ করেন। প্রথমবার ওই দুই পেশেন্ট মারা যাননি তাই একশো বাহান্ন। পরের বার আরও দু-জন পেশেন্টের মৃত্যু ঘটায় সেটা একশো চুয়ান্নতে গিয়ে ঠেকেছে। এটা উনি সচেতনে করেন না। কিন্তু অবচেতন মন ঠিক হিসাব রেখেছে যে কজনকে তিনি খুন করেছেন। ওটাই ওঁর জীবনের একমাত্র স্যাটিসফ্যাকশন। কৌশিক বুঝতে পেরেছিলেন যে ওঁর অস্তিম সময় ঘনিয়ে এসেছে। তাই একদম ডেসপারেট আর ডেলিবারেটলি খুন করছিলেন। একটা পেসমেকার অপারেশনের পেশেন্টকে কোন ওষুধ মেরে ফেলবে, বা কোন অ্যানাস্থেটিক ড্রাগের কম্বিনেশন ডেডলি, তা একজন মেডিসিন গুলে খাওয়া ডাক্তার ভালোভাবেই জানেন। তার ওপর মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য ছায়াসঙ্গী সুশান্তকেই নিজের বডি ডাবল বানিয়ে ফেলেছিলেন। যখন কৌশিক উপস্থিত নেই, তখন সুশান্ত ওই লিখাল ইঞ্জেকশন ইনজেক্ট করে দিত। আর যখন কৌশিক উপস্থিত, তখন নিজেই কাজটা করতেন। সুশান্ত অন্য কোথাও প্রক্সি দিত। ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী যে আসলে কোথায় আছেন, তা বুঝতে না দেওয়ার জন্যই এই কাণ্ড। কিন্তু সুজাতাকে মারার সময় উনি সুশান্তর মার্ডারের ব্লু প্রিন্টও বানিয়ে ফেলেছিলেন। ওঁকে শুধু ডঃ সরকার আর সুহাসিনীকে ওখানে ডাকতে হত। সেটা যখন সফল হল, তখন কোনো কিছুর অছিলায়, অথবা ক্রাইমসিন দ্বিতীয়বার চেক করার বাহানায় সুশান্তকে নিয়ে ফেললেন ওঁদের সামনে। তিনি নিশ্চিত ছিলেন, এরপর ইন্দ্রজিৎ সুশান্তকে আর বাঁচতে দেবেনই না। ঠিক তাই হল। একটাও ব্লু রাখবেন না তিনি! তার জন্য যা-ই করতে হোক না কেন! সিস্টার মলয়া সমেত তিনজনকে টাইপ করা চিঠির মাধ্যমে মেন্টাল ব্ল্যাকমেইল করলেন। মলয়ার কাছ থেকেই বোধহয় তিনজনের হিস্ট্রি শুনেছিলেন। রতন ফাঁদে পা দিয়ে ওঁর কাজ করেও দিল। কিন্তু তার আগেই কাজটা যে-ই করুক তার মৃত্যুর চমৎকার বন্দোবস্ত করে রাখলেন। কৌশিক চক্রবর্তী অগোছালো, ভুলো মনের হতে পারেন। কিন্তু বুদ্ধির দিক দিয়ে বোধহয় সর্বশ্রেষ্ঠ! আরও মজার বিষয়, তিনি এতটাই অন্যমনস্ক যে পেশেন্টের বেড গুলিয়ে ফেলেন, ভিজিট করতে ভুলে যান। আবার যে পেশেন্টের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে এবং যেদিন হয়েছে, সেদিন সকালের সমস্ত ঘটনা, পেশেন্টের ভাইটালস, প্রেশার কত ছিল, ব্লাড সুগার কত ছিল, কী মেডিসিন চলছিল, সব একদম নিখুঁতভাবে গড়গড়িয়ে বলে যান। অর্থাৎ যাকে খুন করবেন তার অন্তিম লগ্নের সমস্ত ইতিহাস পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মনে রাখেন। ওটাই যে তাঁকে আনন্দ দেয়!”
“তাই বলে নিজের মাকেও ছাড়লেন না!” আত্রেয়ী ব্যথিত, “কেউ নিজের মা-কে ওইভাবে মারতে পারে?”
“পারে মিস দত্ত।”
অধিরাজ স্যালাডের প্লেট থেকে কিছুটা স্যালাড তুলে নেয়, “প্রচণ্ড ভালোবাসলে তবেই পারে। একেই বোধহয় রণজয় বিষাক্ত ভালোবাসা বলেছিলেন যা উত্তরাধিকারসূত্রে কৌশিকও পেয়েছিলেন। মা অসুস্থ, বয়স্ক। ছেলে আর কয়েকদিনের অতিথি। তিনি টের পাচ্ছিলেন যে সমস্ত নার্ভ কাজ করা ছেড়ে দিচ্ছে। একেই আর বেশিদিন বাঁচবেন না। তার ওপর যে রোগটাকে এতদিন লুকিয়ে রেখেছেন সেটাও আর চেপে রাখা যাবে না। আস্তে আস্তে সবাই জানবে। সর্বোপরি, তিনি অসাড়, অবশ হয়ে একটা জীবন্ত লাশেই পরিণত হতে যাচ্ছেন। এই অবস্থায় ওঁর ক্যান্সার পেশেন্ট বয়স্ক মায়ের কী হত? ছেলেই তো তাঁর দুনিয়া। সে চোখের সামনেই তিলে তিলে শেষ হচ্ছে তা কী কোনো মা সহ্য করতে পারেন? উপরন্তু ওঁর মৃত্যুর পর উর্মিলার কী হবে? কোথায় যাবেন তিনি? তাঁর জন্যও একটা নিঃসঙ্গ, ধীর অথচ করাল মৃত্যু অপেক্ষা করছিল। কৌশিক সেটাকে অনেক বেশি সুখকর করে দিলেন। সাধারণত ক্যান্সার পেশেন্টরা স্পাইসি খাবার খায় না। অথচ সেদিন উর্মিলা চাইনিজ খেয়েছিলেন। মোস্ট প্রব্যাবলি ওটাই তাঁর ফেভারিট ফুড যা বহুদিন কপালে জোটেনি। কৌশিক ওঁর মা-কে সবচেয়ে সুখকর ও মধুর মৃত্যু উপহার দিলেন। ছেলের সঙ্গে সময় কাটানো, শেষবারের মতো তৃপ্তি করে নিজের পছন্দের ভালোমন্দ খাবার এনজয় করা। আর ছুরির এক টানেই কিছু বোঝার আগেই মৃত্যু। উর্মিলা তো বোধহয় ঠিকমতন কোনোরকম যন্ত্রণাও টের পাননি। বড়োজোর কয়েক সেকেন্ড নড়াচড়া করলেও করতে পারেন। তারপরই সব শেষ। কৌশিকের বিষাক্ত ভালোবাসা তাঁর মায়ের সব যন্ত্রণা দূর করে দিল। আবার ওটাই এই কেসের আর একটা টার্নিং পয়েন্ট!”
“সেটা কী করে রাজা?”
পবিত্রর প্রশ্নের উত্তর খুব ধীরগতিতেই দিল সে, “একবার ভেবে দ্যাখো, যার হাতে গান আছে সে তো দু-জনকেই শ্যুট করবে। কিংবা যার অস্ত্র ছুরি, সে মায়ের সঙ্গে সঙ্গে ছেলেকেও স্ট্যাব করেই মারবে। একজনকে পিঠে গুলি মারল, আর অন্যজনের গলায় ছুরি চালাল, এ আবার কেমন মোডাস অপারেন্ডি। আমি আবার ধন্দে পড়লাম। আর শেষপর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে এলাম যে ঊর্মিলাকে অত্যন্ত সংক্ষেপে মারারই প্ল্যান ছিল। কিন্তু কৌশিকের স্পাইনাল কর্ড গুঁড়িয়ে দেওয়াই মূল উদ্দেশ্য, মারা নয়। যাতে এরপর যখন উনি হুইলচেয়ারে বা মৃত্যুশয্যায় সম্পূর্ণ প্যারালাইজড হয়ে পড়ে থাকবেন, যেটা অসুখের কারণে এমনিই হত, সেই পরিণতিটাকে জাস্টিফাই করা যায়। যেভাবেই হোক, আসল অসুখটাকে তিনি রিভিল করতে চাননি। একজন ট্র্যাজিক হিরো বা ভিলেনের মতোই কারওর দয়ার পরোয়া না করেই যেতে চেয়েছিলেন। তাঁরও সম্পূর্ণ ভরসা ছিল বাবার প্রচণ্ড ভালোবাসার ওপর। তিনি জানতেন ডঃ বসু আপ্রাণ তাঁর ভেতরের রাক্ষসটাকে থামানোর চেষ্টা করছেন। যার জন্য মেডিক্যাল নেগলিজেন্সের আরোপ আনতেও দ্বিধা করেননি। কৌশিকের আশা ছিল ছেলের ইতিহাস তিনি চেপেই যাবেন আর অভিশপ্ত জীবনটাকে মুক্তি দেবেন। হলও তাই। ডঃ সঞ্জয় বসু সব দায় নিজের মাথায় নিয়ে, নিজের দানব হয়ে যাওয়া সন্তানকে অভিশাপের হাত থেকে মুক্তি দিতে পৌঁছেও গেলেন। অদ্ভূত ভালোবাসা। সত্যিই, ভালোবাসার চেয়ে ভয়াবহ বস্তু আর এই পৃথিবীতে নেই। একটা মানুষ ভালোবাসার খাতিরে কী-ই না করতে পারে।”
অধিরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর আস্তে আস্তে বলে, “কৌশিক নিঃসন্দেহে খুনী। কিন্তু ওঁর মোটিভ আমাকে কিছুটা হলেও বিচলিত করেছে। তাঁর জীবন ওঁকে মাত্র চার পাঁচ বছর সময় দিয়েছিল। ওঁর মতন একান প্রতিভাবান ডাক্তার এই পৃথিবীকে কত কিছুই না দিতে পারত। কত আশা, কত আনন্দ তাঁর প্রতীক্ষায় ছিল। কত পেশেন্ট জীবন ফিরে পেতে পারত। অথচ একটা দুরারোগ্য রোগ সব কিছু ছিনিয়ে নিল। তিনি চোখের সামনে দেখছেন বৃদ্ধাশ্রমের অবহেলিত পরিত্যক্ত বৃদ্ধ বৃদ্ধারা অকারণে দীর্ঘ জীবন কাটিয়ে যাচ্ছেন। অথবা কিছু খিটকেলে লোক, যাদের বাঁচা মরায় কারওর কিচ্ছু এসে যায় না, তারা মহা আরামে এখনও বেঁচে আছেন। আর স্বয়ং তিনি, যে মানুষটার অপেক্ষায় তাঁর পরমাত্মীয়দের পথ দেখার কথা, গোটা বিশ্ব যাঁকে স্যালুট করতে চাইছে, তাঁর বাঁচার কোনো অধিকার নেই। এখান থেকেই অসহায় রাগে, অবুঝ ক্ষোভে, অসহ্য ঈর্ষায় জন্ম নিল আর এক ডঃ ডেথ! আমি বেঁচে থাকা ডিজার্ভ করি। অথচ বাঁচব না। আর এই লোকগুলো কারওর প্রয়োজনে লাগে না, কেউ ওদের পরোয়া করে না! অথচ আমার হাত ধরেই ওরা অন্যায়ভাবে বেঁচে থাকবে? কেন? আমি যদি না থাকি, তবে এই তথাকথিত অপ্রয়োজনীয় জঞ্জালরাও থাকবে না। কী অসহায় আর করুণ রাগ। একটা মানুষ একবিন্দু জলের জন্য হাহাকার করতে করতে তেষ্টায় মরে যেতে যেতে দেখছে যে আরও কতগুলো মানুষ একগাদা জল ছড়িয়ে ছিটিয়ে, লুটিয়ে পুটিয়ে স্রেফ নষ্ট করছে। এ কী সহ্য হয়?”
সে আপনমনেই আত্মমগ্নভাবে বলে, “কৌশিকের নাম মার্ডারার হিসাবেই চিরকাল লেখা থাকবে। কিন্তু আমি জানি, উনি আসলে ভিকটিম ছিলেন। মর্তের বিচারক কী করবেন জানি না, কিন্তু যাঁকে আমরা পরম করুণাময় বলি তিনি নিশ্চয়ই বুঝবেন এই খুনীটিই আসলে সবচেয়ে বেশি ভালনারেবল, যন্ত্রণাকাতর ও অসহায় পেশেন্ট।”
গোটা ডাইনিং হল নিস্তব্ধ। কারওর মুখে কোনো কথা নেই। ওই নৈঃশব্দই মুখর হয়ে বলে দিল যে হয়তো বা সকলেই অধিরাজের সঙ্গে একমত!
