১৭
“ক্লেভার! …ভেরি ক্লেভার…।”
ওয়ার্ডবয় সুশান্তর ঘর থেকে নিয়ে আসা একজোড়া ডক্টরস শ্যু-কে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল অধিরাজ। সে যে জুতোটায় কী সৌন্দর্য দেখতে পেয়েছে তা ভগবানই জানেন। অনেকক্ষণ ধরেই ওটাকে দেখেই যাচ্ছে। তার মুখে মৃদু হাসি ভেসে ওঠে, “কখনও কখনও ছোটোখাটো জিনিসই অনেক কিছু বলে দেয়।”
জুতো থেকে যে কী পাওয়া গেল তা এখনও কারওর মাথায় ঢোকেনি। অর্ণবের মনে হচ্ছিল, কৌশিক ঠিক কথাই বলেছিলেন। এখন অধিরাজ প্রায় নাওয়া খাওয়া ভুলে নার্সিসাসের মতোই একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। পার্থক্য একটাই–নিজের প্রতিবিম্বের দিকে নয়। বরং সুশান্তর জুতোর দিকে
পবিত্র, অর্ণব আর লেডি অফিসাররা প্যাটপ্যাট করে তাকিয়েছিল সেদিকেই। একটা নিতান্তই সাধারণ ডক্টরস শ্যু। সেটার সোলটাকে কেউ সযত্নে কয়েক ইঞ্চি কেটে আবার সেলাই করেছে। পবিত্রর থিওরি অনুযায়ী—সুশান্তর ইচ্ছে হয়েছে, তাই সে জুতোর অপারেশন করে হয়তো হাত পাকাচ্ছিল। কে জানে, শীলা বসাকের ডাক্তার হওয়ার মতো তারও সার্জেন হওয়ার ফ্যান্টাসি ছিল বোধহয়। মানুষের ওপর আঁচড় কাটতে পারেনি, তাই জুতোর ওপর প্র্যাকটিস করছিল। এতে আশ্চর্যের কী আছে?
“তুমি শিওর হর্নিখুড়ো যে আশ্চর্যের কিছু নেই?” অধিরাজ তখনও হাসছে, “আর এ ব্যাপারেও শিশুর যে মানুষের ওপর আঁচড় কাটতে পারেনি? ডঃ সুজাতা রায়ের গায়ে তো আঁচড় কাটতে পেরেছিল।”
পবিত্র আচার্য ঘাবড়ে গিয়ে প্রায় তোতলা হয়ে যায়। কী কুক্ষণে যে বার্নিং শিখ কেসের সময়ে ‘রাজশ্রী’কে রোম্যান্টিক মেসেজ পাঠাতে গিয়ে ভুল করে ‘রাজা’-কে পাঠিয়ে দিয়েছিল! তারপর থেকে মাঝেমধ্যেই তার নাম হয়ে যায় ‘হর্নিখুড়ো। ‘ সে আড়চোখে দেখে অর্ণব তার দিকে যথারীতি বম্বাস্টিক সাইড আই-এ জুলজুল করে তাকাচ্ছে। মিস দত্ত হাসি লুকোতে গিয়ে উলটো দিকে মুখ ঘুরিয়েছে। কৌশানী আর টুইঙ্কলের মুখে অবশ্য মৃদু হাসির রেশ প্রকট। সে আপনমনেই গরগর করে বলে, “কেন? তোমার বেবি মোস্তাফা ছাড়া আর কারওর জুতো সেলাই করার পারমিশন নেই। উনি মনোপলি নিয়েছেন নাকি!”
“বেবি মোস্তাফা জুতো ছাড়া আর সবই সেলাই করেন। অবশ্য আমাকে যদি ‘জুতিয়ে লম্বা করা অবজেক্ট’ হিসেবে কল্পনা করো তবে তোমার স্টেটমেন্ট পার্শিয়ালি কারেক্ট। “ বেবি মোস্তাফা ওরফে আহেলির সঙ্গে একটু আগেই অবশ্য কথা হয়েছে অধিরাজের। সে জুতোটার ভেতরের ফুটপ্রিন্ট মিলিয়ে দেখে জানিয়েছে যে নিঃসন্দেহে ওটা সুশান্তরই জুতো। তার ফুটপ্রিন্ট জুতোর ভেতরে তো আছেই, এমনকি ফিঙ্গারপ্রিন্টও জুতোর ওপরে স্পষ্ট। অধিরাজ খুব গম্ভীর ভাবেই জানতে চায়, “আর সেলাইটা? সে বিষয়ে কোনো বক্তব্য নেই?”
“ক্বীঃ!”
আহেলি প্রায় ফোনের ওপার থেকেই এই মারে কী সেই মারে। রেগে গিয়ে বলল, “জুতোর সেলাই নিয়েও এবার বক্তব্য রাখতে হবে?”
“আপনি তো সেলাই এক্সপার্ট। তাই ভাবলাম জুতোর সেলাইয়ের ওপরও কিছু বিশেষজ্ঞের মতামত বা ভাষণ দেবেন। যেমন স্টিচের স্টাইল কী, কী জাতীয় এস্ত্রয়ডারি হয়েছে, বা কোন সুতোয় হয়েছে, ফিনিশিং ভালো করতে গেলে কোন সুতো ব্যবহার করতে হত এটসেট্রা!”
“ধুত্তোর!”
বিরক্ত হয়ে আহেলি দড়াম করে ফোন কেটে দেয়। অধিরাজ ফিক করে হেসে ফেলে আবার জুতোটা দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
“বাইরে হিট ক্রমাগতই বাড়ছে মামা।” পবিত্র আচার্য অসহায়ভাবে বলে, “মিডিয়ার জ্বালায় যে আর টিকতে পারছি না। ওদের এনার্জি দেখে মনে হচ্ছে এইমাত্র কোকেনের সঙ্গে রেড বুলের কম্বো খেয়ে এসেছে। ডঃ ডেথ কে জানি না। কিন্তু এরা যদি এভাবেই চেঁচাতে থাকে তবে সে নিজের কান বাঁচাতে কয়েকদিনের মধ্যেই ‘ওরে থাম থাম, আমিই ডঃ ডেথ।’ বলে বেরিয়ে আসবে। বাইরে অশান্তি, ভেতরে অশান্তি, ঝোপে ঝোপে বাঘ দেখার মতো আমি ঝোপে ঝোপে ডঃ ডেথ দেখছি। আর তোমার এখন দেয়ালা করার শখ হল?”
পবিত্রর কথা মিথ্যা নয়। দু-দুটো অ্যারেস্টের খবরে বাইরে এই মুহূর্তে যেন দাবানলের আগুন লেগেছে। সি আই ডি, হোমিসাইড ব্যুরোর মেইন গেটের বাইরে তখন পুলিসের অতিরিক্ত বাহিনীকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। লোহার ব্যারিকেড দিয়ে ঘেরা পুরো প্রবেশপথ। তার ও-প্রান্তে ক্যামেরার ঝলকানি, বুম হাতে সাংবাদিক, আর টিভি চ্যানেলের লাইভ ভ্যান—সব মিলিয়ে যেন ছোটোখাটো মেলা বসে গিয়েছে। পুলিস আপ্রাণ চেষ্টা করছে তাদের আটকে রাখার। তবু সেই শৃঙ্খল ভেঙে হুঙ্কার তুলে উঠছে মিডিয়ার ভিড়। শ’য়ে শ’য়ে ক্যামেরার লেন্স একসঙ্গে তাক করা।
চ্যানেলে চ্যানেলে লাইভ আপডেট যাচ্ছে—“ব্রেকিং নিউজ: ডক্টর ডেথ গ্রেফতার!”
একটু আগেই সুহাসিনী আর ইন্দ্রজিত্থকে নিয়ে ওরা যখন ব্যুরোর ভেতর ঢুকছিল, তখন ভিড় যেন বন্যার মতো গাড়ির ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ আর শাটারের আওয়াজে চতুর্দিক মুখরিত। পুলিসের গাড়ির কাচে ঝলসে ওঠে সুহাসিনী মিত্রর মুখ। এখনও সুসজ্জিতা। ওঁর ড্রেসিং সেন্স দেখলে প্রান্ত ধারণা হয় যে তিনি ব্যুরোয় আসছেন না, বরং র্যাম্পে হাঁটতে যাচ্ছেন। পরনে হাল্কা গোল্ডেন দৃষ্টিনন্দন শাড়ি, মাথায় টপনট। তবু মুখে অদ্ভুত দৃঢ়তা। চোয়াল শক্ত।
অন্যদিকে ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকারকে দেখে বোঝাই দায় যে তিনি গ্রেফতার হয়েছেন। দেখে মনে হচ্ছে ওঁকে বুঝি ব্যুরোর লেট লাঞ্চের ইনভিটেশন দেওয়া হয়েছে। স্টিল কান্সারের কোটের তলা থেকে সাদা কলার উকি দিচ্ছে। সাপের মতো ঠান্ডা অভিব্যক্তি। হালকা হাসি খেলা করছে ঠোঁটে। যেন এই পুরো নাটকটা আগে থেকেই জানা ছিল ওঁর। ক্যামেরার নজর তাঁর ওপর পড়তেই তিনি ভুরু উঁচু করে তাকালেন। সেই দৃষ্টিতে বিন্দুমাত্রও ভয় বা অনুতাপ নেই। বরং এতটাই হিসেবি, যে দেখে মনে হয় তিনি কিছুই হারাননি, বরং ক্রমাগত আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছেন।
“এই মুহূর্তের ব্রেকিং নিউজ, সম্ভবত কলকাতা কাঁপানো ডক্টর ডেথ ধরা পড়েছে। কিন্তু আসল অপরাধী কে?”
“সুহাসিনী মিত্র আসলে সাধারণ ডায়েটিশিয়ান নন। বরং তার আসল নাম–ডঃ সুহাসী বিশ্বাস। তিনি একজন অত্যন্ত চতুর ও প্রতিভাবান মেটাবলিক ডক্টর। যার নামে আগেই একটি পুলিস কেস ছিল। নিজের নাম পালটে জেনিথে কাজ করছিলেন। তিনিই কী তবে পর্দার আড়ালে সিরিয়াল কিলার?”
আর একদল চেঁচাচ্ছিল—
“নামকরা অভিজ্ঞ অ্যানাস্থেসিস্ট ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার, একজন মেডিক্যাল প্রোফেশনাল হয়েও কী মৃত্যুর ব্যাবসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন?”
বাস্তবে দেখা যাচ্ছে সাংবাদিকরাও কল্পনার টক্করে কম যায় না। কেউ বলছে, সুহাসিনীর ভয়াবহ রাগ আর প্রতিশোধস্পৃহার কারণেই বৃদ্ধ বৃদ্ধারা মারা পড়ছিলেন। তাঁর উলটোপালটা ডায়েট চার্টই এই রহস্যময় কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের মূল কারণ। আসলে তিনি সুহাসিনী নন, সুন্দর মুখের আড়ালে পিশাচিনী! কেউ আবার মাইক্রোফোনে চিৎকার করছে যে ইন্দ্রজিৎ সরকার আসলে মেডিক্যাল ইললিগ্যাল ড্রাগ মাফিয়ার অংশ। ওয়ার্ডবয় সুশান্তকে সামনে রেখে তিনিই পেছন থেকে মেডিক্যাল ড্রাগের ইললিগ্যাল র্যাকেট চালাচ্ছিলেন। এমনকী ওঁর মাধ্যমে নাকি ইললিগ্যাল ড্রাগ টেস্টিংও চলত। হতভাগ্য বৃদ্ধ বৃদ্ধারা এই ড্রাগ টেস্টিঙের গিনিপিগ হয়েই মারা গিয়েছেন। জেনিথের বয়স্ক সিস্টার মলয়া চৌধুরীও এই ইললিগ্যাল ড্রাগ ট্রায়ালের অন্যতম হোতা। তবে মাস্টারমাইন্ড নন। হাসপাতালে মৃত্যুর নেপথ্যে ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকারই।
আর একদল আবার শুধু থিওরিতেই সন্তুষ্ট নয়। তারা অধিরাজ বা তার টিমের অফিসারদের দেখামাত্রই ছুটে এসে ভিড় জমাচ্ছে। মুহুর্মুহু ছুটে আসছে ওদের প্রশ্নবাণ,
“… স্যার, নিশ্চিত করা যাচ্ছে কী যে এরাই ‘ডক্টর ডেথ’?”
“….ওদের বিরুদ্ধে কোনো সলিড এভিডেন্স আছে? না প্রমাণাভাবে এবারও পার পেয়ে যাবেন ডঃ সঞ্জয় বসুর মতো?”
“…আপনার মনে হয় না যে আরও কেউ জড়িত আছে? এরা স্রেফ মেঘের দল। এদের পেছনে থাকা মেঘনাদের অস্তিত্বের সম্ভাবনা কী একেবারেই নেই?”
অর্ণব, পবিত্ররা মুখে কুলুপ এঁটেছে। শুধু প্রত্যেক প্রশ্নের উত্তরেই নার্সারি রাইম মুখস্থ বলার মতো বলছে, “তদন্ত চলছে, বিস্তারিত জানানো যাবে না।” আর অধিরাজের সেই পেটেন্ট ঔদ্ধত্যপূর্ণ সংলাপ, “নো কমেন্টস।”
অফিসাররা কেউ উত্তর না দিলেও গুজবের অভাব নেই। কেউ বলছে, দু-জন মিলে কাজ করত, আবার কারওর বক্তব্য এরা কেউই আসল অপরাধী নয়। আসল জিনিয়াস ‘ডক্টর ডেথ’ এখনও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
ফ্ল্যাশলাইটের চোখ ঝলসে দেওয়া আলো, উত্তেজনাময় থমথমে আগুনে পরিস্থিতিতে।
সি আই ডি ব্যুরোর গেট যেন একটা যুদ্ধক্ষেত্র। সাংবাদিকদের প্রত্যেকের বক্তব্যে উঠে আসছে একটাই প্রশ্ন—
“ডক্টর ডেথ কে?”
এর মধ্যেই একটা অদ্ভুত জিনিস বারবার অর্ণবের চোখে পড়ছিল। এই মিডিয়ার ভিড়ের মধ্যেই হুডি পরা এক ব্যক্তি প্রায়ই নিশ্চুপে এককোণে দাঁড়িয়ে থাকে। চেহারার গড়ন দেখলে বোঝা যায়, সে একটি মেয়ে। এখন আদৌ শীতকাল নয় যে হুড়ি পরে ঘোমটাবতী হয়ে ঘুরতে হবে! আবার তাকে দেখে কোনোমতেই সাংবাদিক বলে মনে হয় না। তার সঙ্গে কোনো ক্যামেরাম্যান থাকে না, কিংবা হাতে বুমও নেই। ইডিসুন্দরী একাই যেন চুপচাপ রহস্যময় ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। না প্রশ্ন করে, না নিজের অস্তিত্ব জাহির করতে চায়। বরং ওর হাতের মোবাইলটা নিশ্চুপে ভিডিও বা ছবি তোলে। সেটাও পবিত্র বা অর্ণবের নয়। একমাত্র অধিরাজকে দেখা গেলেই মেয়েটির হাতে মোবাইল উঠে আসে। সম্ভবত অধিরাজকেই সে কভার করে। যেদিন থেকে ডঃ ডেথের কেস উপলক্ষে মিডিয়ার জমায়েত হতে শুরু করেছে, সেদিন থেকেই এই হুডিধারিণীর আবির্ভাব।
অর্ণবের মনে একটু দুশ্চিন্তার তরঙ্গ উঠেছিল। সে পবিত্র আচার্যর সঙ্গে নিভৃতে এ বিষয়ে আলোচনাও করেছে। কিন্তু পবিত্র হেসেই উড়িয়ে দেয়, “অর্পণ, অগাস্ট রোডান বেচারা ‘দ্য থিঙ্কার’ বানিয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন। আমার দৃঢ় ধারণা যে সগগে বসে এখন উনি ছেনি হাতুড়ি দিয়ে মাথা ঠুকছেন আর ভাবছেন যে তখন তোমায় দেখেননি কেন! তাহলে ‘দ্য ওভারথিঙ্কার’-এর মূর্তিটাও গড়ে যেতেন!”
অর্ণবের তার বিষয়টাকে এই অছিলায় উড়িয়ে দেওয়াটা মোটেই পছন্দ হয়নি। সে প্রতিবাদ করে, “কিন্তু স্যার, সবসময়ই হুড়ি পরে মুখ ঢাকা দেওয়ার মানে কী? তাছাড়া সবসময়ই যেন স্যারকেই কভার করছে।”
“আরে বাবা, হুড়িই তো পরেছে। বিকিনি পরে তো ঘুরছে না।” পবিত্র বিরক্ত, “আর রাজাকে কভার করে না এমন একটা লোক কী বাকি আছে? ও বেচারি বার্গার কিং-এ বসে থাকলেও দেখবে ঠিক কেউ না কেউ সে ফুটেজ তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল করে দিয়েছে। তোমার যদি ওর হুডি পরা আর রাজাকে কভার করায় আপত্তি থাকে তবে পরের বার নিজেই না হয় মহিলার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে বোলো, ‘এই যে, আমাকে দেখুন। আর কাল থেকে হুডির বদলে বোরখা পরবেন।” সে আপনমনেই বিড়বিড় করে, “আমি মরছি আমার জ্বালায়। গোটা হসপিটালের পাব্লিককেই সন্দেহ হচ্ছে। মনে হচ্ছে, সবকটাকে জেলে চালান দিয়ে দিই। কখনও মনে হচ্ছে এ খুনী, কখনও মনে হচ্ছে ও। পুরো মেন্টাল থার্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার চলছে। এর মধ্যে তুমি এই পুঁচকি ব্রেনটাকে ওভারটাইম করাচ্ছ।”
অর্ণব আর কথাই বাড়ায়নি। পবিত্রর কথাও মিথ্যে নয়। সত্যিই ওদের ওপর এই মুহূর্তে প্রচণ্ড প্রেশার। একদিকে মিডিয়া চেঁচাচ্ছে, অন্যদিকে এডিজি শিশির সেন অধিরাজের প্রত্যাখ্যানকে ইগোয় নিয়ে বসে আছেন। তাঁর হাঁড়িমুখ দেখলেই আজকাল ভয় করে। হাওয়ায় খবর ভাসছে যে এই কেসটা শেষ হলেই প্রণবেশ লাহিড়ীর সঙ্গে অসহযোগিতা ও এডিজি শিশির সেনের অর্ডার অমান্য করার জন্য অধিরাজের কাছে অবধারিতভাবেই একটা শো-কজ লেটার আসতে চলেছে। অধিরাজ সে কথা শুনেও আশ্চর্য নিস্পৃহ। তার একটাই কথা, “শো-কজ হোক কী সাসপেন্ডই করা হোক, আমি নাইট ক্লাবের জুলি, মলিদের কন্ট্যাক্ট দিতে পারি। কিন্তু একজনও লেডি অফিসারকে দেব না। ব্যস।”
এই অফিশিয়াল প্রেশার তো আছেই। তার মধ্যে দুই মূর্তিকে অ্যারেস্ট করার পর ওপরমহল থেকে ডাকের পর এক ফোনও আসছে। টপস, নেতা, মন্ত্রী কেউ বাকি নেই। সবারই এক বক্তব্য, “ওরা দু-জন ইনোসেন্ট। অবিলম্বে ওদের ছেড়ে দেওয়া হোক।”
এখানেও অ্যাটলাসের মতো অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অধিরাজ। তার স্পষ্ট বক্তব্য, “রিটনে আর্জি দিন স্যার। সেখানে আপনাকে বলতে হবে যে দু-জনের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়ার পরও কেন আমি ওঁদের ছেড়ে দেব। এটাও বলতে হবে যে আপনি কী করে জানেন যে ওঁরা ইনোসেন্ট। আপনার সঙ্গে ওঁদের সম্পর্ক কী আর কতদিনের। তার সঙ্গে চেরি অন টপ অন হোয়াট বেসিস আপনি ওঁদের ইনোসেন্ট বলছেন এবং যদি এঁরা সত্যিই কোনো না কোনো অপরাধের সঙ্গে সংযুক্ত থাকেন ও সেটা প্রমাণিত হয়ে যায়, আর আপনার অ্যাশিওরেন্সের ফলে দু-জনেই মুক্ত হয়ে ফেরার হতে সাকসেসফুল হন, তবে আপনি এই স্টেটমেন্টের দায় নিতে ও তার পরবর্তী সার্কামস্ট্যান্সেস ভুগতে রাজি আছেন কী না। সবটা স্পষ্ট করে লিখুন। তারপর ভেবে দেখব।”
উলটোদিকের হোমরাচোমরা এতখানি ঔদ্ধত্য আশা করেননি। তিনি এবার প্রায় জ্বলে গিয়ে সাধারণ সৌজন্যবোধটুকুও হারিয়েছেন। প্রায় চিৎকার করেই হুমকি দিলেন, “দু-টাকার আই জি-র সাহস তো কম না। জানিস তোর চাকরি খেয়ে নিতে পারি আমি। টেরও পাবি না, চেয়ার বদলে যাবে। তুলে পুরো গণ্ডগ্রামে ট্রান্সফার করে দেব শালা।”
ভদ্রলোকের ভাষার নমুনা শুনে আক্ষেপে মাথা নাড়ে অধিরাজ, “সরি স্যার। আমাকে রিটনে না দিলে আমি কাউকে ছাড়ব না। আর রইল চাকরির কথা। চাকরি গেলে আর একটা চাকরি ঠিক জুটিয়ে নেব। পেটে অতখানি শিক্ষা আছে। আমার চেয়ার বদলালেও চেয়ারের কাজ থামবে না। মুশকিল হল আপনার চেয়ার কিন্তু বদলাবে না, একদমই সরে যাবে। পাবলিক এমনিতেই এই মার্ডারগুলোর কারণে খেপে লাল হয়ে আছে। তার ওপর আপনার আবদার এই কলের রেকর্ডিং সহ যদি আমি মিডিয়াকে দিয়ে দিই, তবে নেক্সট ইলেকশনে আপনার চাকরি আর চেয়ার, দুটোর একটাও যে থাকবে না। তখন কী করবেন স্যার? আগের মতো চাল-ডাল আর র্যাশনের বিজনেস? না ঝালমুড়ি আর চপের ব্যবসা?”
“কলের রেকর্ডিং।”
উলটোদিকের ব্যক্তি কথা খুঁজে পান না, “তুই আমার কল রেকর্ড করছিস।”
অধিরাজ অর্ণবের দিকে তাকিয়ে চোখ টেপে, “আজ্ঞে। আপনারা প্রায়ই নানারকম বায়না নিয়ে ফোন করেন কী না। আমি আবার গোলা পাবলিক। তাই ভুলে যাওয়ার ভয়ে টপ টু বটম রেকর্ড করে রাখি। আপনি শুনতে চান?”
আর কিছু বলার আগেই লাইনটা কেটে গেল। অর্ণব রুদ্ধশ্বাসে সমস্তটাই শুনছিল। এবার বলল, “লোকটা কিন্তু টিপিক্যাল শয়তান স্যার। খুব পাওয়ারফুলও।”
সে স্থিরদৃষ্টিতে অর্ণবের দিকে তাকায়, “ইয়েস, হি ইজ পাওয়ারফুল। কিন্তু অর্ণব, পশ্চিমবঙ্গে শয়তান শিরোমণি একজনই আছে। সেটা আমি। শেষ দেখেই ছাড়ব। আর এর মধ্যে যদি কোনো উকিল সাহেব ‘বেল’-এর কাগজপত্র নিয়ে আসেন তবে গান্ধীজির তিন বাদর উইথ চতুর্থ বাঁদরের কম্বো হয়ে যেও। যতক্ষণ না আমি বলছি, ততক্ষণ না কোনো পেপার দেখবে, না উকিলসাহেবের কথা শুনবে, না আইনি কথা বলবে। দরকার হলে বলবে, ‘সরি, আমি অফ ডিউটি।’ নয়তো নাকের সামনে ফোন নিয়ে ঘুরবে আর বলবে, “দাঁড়ান দাঁড়ান, জরুরি কাজটা সেরে নিই। তারপর নিশ্চয়ই আপনার কাজ করে দেব। আপনি ততক্ষণ চা আর শিঙাড়া খান।’ গোটা কলকাতার চা আর শিঙাড়া শেষ হয়ে যাক, নো প্রবলেম। কিন্তু তোমার জরুরি কাজ আর শেষ হবে না। যা খুশি করো, কিন্তু যতক্ষণ না আমি চাইছি এই দু-জন কিছুতেই ‘বেল’ পাবে না। অ্যাম আই আন্ডারস্টুড?”
“ইয়েস স্যার।”
তারপর থেকে ওরা সবাই সব অন্ধ বোবা কালা হয়েই আছে। কোনোরকম আর্জি এলেই টিম অধিরাজ ‘অফ ডিউটি’ হয়ে যাচ্ছে। তবে অধিরাজের উত্তর শোনার পর আর কেউ তাকে বিশেষ ঘাঁটানোর সাহস করেনি। শুধু এডিজি সেন থমথমে মুখে বলেছিলেন, “ক্রমাগতই নিজের জেদে শত্রু বাড়াচ্ছ ব্যানার্জি। বাইরে তো বটেই, নিজের ঘরেও।”
অধিরাজ একটু হেসে বলে, “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব করার শখ থাকলে সোশ্যাল মিডিয়ায় টোয়েন্টি ফোর সেভেন ডিউটি দিতাম স্যার। এখানে থোড়াই থাকতাম!”
এরপর আর কোনো কথা চলে না। অগত্যা চতুর্দিকেই এখন খাঁ-খাঁ নীরবতা। কিন্তু কাজের বিরাম নেই। একের পর এক আপডেট এসেই চলেছে। হ্যান্ডরাইটিং এক্সপার্ট জানিয়েছেন যে ওই হিজিবিজি লেখা ও পরের সুন্দর ছাঁদের লেখাদুটোর মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে একটুও মিল নেই ঠিকই, তবে দুটো লেখাই একই মানুষের। যদি প্রথম নমুনার আঁকাবাঁকা হস্তাক্ষর কৌশিকের হয়ে থাকে, তবে পরের স্পষ্ট ও সুন্দর হস্তাক্ষরটিও কৌশিকেরই।
“সেটা কী করে হয়?” সে অবাক, “আপনি দুটো হাতের লেখার স্যাম্পল দেখেছেন? হেডেন অ্যান্ড হেল ডিফারেন্স।”
“অফকোর্স।” হ্যান্ডরাইটিং এক্সপার্ট হাসলেন, “দুটো লেখা দেখার সৌন্দর্যের দিক দিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু লেটার ফর্মেশন্স, সেটারের কন্সট্রাকশন, স্ট্রোকসগুলো যে হান্ড্রেড নার্সেন্ট সিমিলার। লাইন কোয়ালিটিও সেম টু সেম। পেন প্রেশার, স্পিড, পেন লিফটস, রিটন লাইনের কনসিস্টেন্সি, রিদম আর রাইটিং স্কিলও হুবহু এক। এ্যালাইনমেন্টও সেম। মার্জিন, স্পেসিং সিমিলার। প্রথম নমুনার ইম্যাজিনারি বেসলাইন সেকেন্ডটার সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে। দুটো শব্দের মধ্যে গ্যাপ, দুটো অক্ষরের মধ্যে গ্যাপ, স্মল অ্যালফাবেট–যেমন আই, জে-র ওপরের ডটটা পর্যন্ত হুবহু এক। এফ-এর পেট আর টি এর মাথা অথর প্রত্যেকবার তির্যকভাবে কেটেছেন, স্ট্রেট নয়। চোখ না বললেও সায়েন্স বলছে হ্যান্ডরাইটিং হ্যাবিটস সেম টু সেম আর অথরশিপও সেম।”
“আপনি ডঃ সঞ্জয় বসুর স্যাম্পলটা মিলিয়ে দেখেছিলেন?” বিশারদ জানালেন, “ইয়েস। ডঃ বসু আর ডঃ চক্রবর্তীর হ্যান্ডরাইটিঙে আপাতদৃষ্টিতে অনেক মিল থাকলেও দুটো হ্যান্ডরাইটিং সায়েন্টিফিক্যালি ডিফারেন্ট। ডঃ বসুর স্যাম্পলটা ডঃ বসুরই। আর ডঃ কৌশিক চক্রবর্তীর স্যাম্পল ডঃ চক্রবর্তীরই। কেউ কারওর হয়ে লেখেননি। নো ফাউল প্লে হিয়ার।”
কথাটা শুনে অর্ণব বেশ হতাশ হল। অধিরাজের মনোভাব বোঝা দায়। সে শুধু মৃদু হেসে বলে, “থ্যাঙ্কস।”
এরমধ্যেই মিস দত্ত জেনিথের এগারো আর পঁচিশে সেপ্টেম্বরের ডিটেইলস, ফুটেজ আর ফাইল জমা দিয়েছে। কৌশিকের বক্তব্য একদম সঠিক। তিনি যা যা বলেছিলেন, হুবহু তাই-ই ঘটেছে। কোথাও কোনো ভুল নেই। প্রেসক্রিপশন থেকে ঘটনা-পরম্পরা সবেরই নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছেন ভদ্রলোক।
ইতিমধ্যে বিশ্বও ফোন করে জানাল তার আবিষ্কার।
“কৌশিক চক্রবর্তী মনে হয় সত্যি কথাই বলেছেন স্যার।” সে বলল, “দু-হাজার একুশের এগারোই সেপ্টেম্বর ওঁর সেলফোনের লোকেশন দুটো থেকে সাড়ে চারটে অবধি হাইকোর্টই দেখাচ্ছে। তারপর উনি জেনিথেই ফিরেছিলেন। মাঝখানে কোনো পজ নেই। আর পঁচিশ তারিখও দেড়টা থেকে চারটে অবধি তিনি সেই হাইকোর্টেই ছিলেন। আমি বলছি না, ওঁর ফোনের লোকেশন বলছে। কিন্তু ডঃ বসু দু-দিনের একদিনও হাইকোর্টের ধারে কাছেও ছিলেন না। ওঁর লোকেশন ওই দুটো দিন কনস্ট্যান্ট বাড়ি আর জেনিথই শো করছে।”
“থ্যাংকস বিশ্ব। প্লিজ সেন্ড মি ব্যাঙ্ক ডিটেইলস অব অল সাসপেক্টস।”
তাধিরাজ ফোনটা রাখতেই অর্ণস বলে ওঠ, “তার মানে ডঃ চক্রবতীর কথা তাক্ষরে অক্ষরে সত্যি।”
“হ্যা অর্পন” অধিরাজ নাথা নাড়ল, “এই অক্ষর ব্যাপারটিইটি আমাকে বড্ড ডিস্টার্ব করছে। বাট, টয়েস, হি ওয়াজ টেপিং দ্য টুথ। ওঁর কথা সম্পূর্ণ সত্যি।”
“তবে?”
অর্ণবের প্রশ্নটার উত্তর দেওয়ার আগেই মিস বোস জানাতে চায়, “আপনি কী কৌশিক চক্রবর্তীকে সন্দেহ করছিলেন স্যার?”
“ইয়েস সেনোরিটা।”
ওর দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকায় সে, “একা কৌশিক নন, আমি সবাইকেই সন্দেহ করছি। আমার লিস্ট থেকে কেউ বাদ নেই। ডঃ সঞ্জয় বসু, ডঃ ইন্দ্ৰজিৎ সরকার, সুহাসিনী মিত্র, ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী, রঞ্জন নায়েক, শীলা বসাক, মলয়া চৌধুরী ইভেন ডঃ রণজয় বসু, সবাই আমার রাডারে আছে।”
ইতিমধ্যেই একটা মেইল ঢুকল অধিরাজের মেইলে। সাসপেক্টদের ব্যাঙ্কের ডিটেইলস পাঠিয়ে দিয়েছে বিশ্বজিৎ। সে কম্পিউটারে প্রায় নাক ঠেকিয়ে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে জরিপ করছে দেখে কৌশানী একটু ইতস্ততঃ করে বলে, “কিন্তু কৌশিক তো অসুস্থ! নিজেই ভিকটিম। এখন তো বাঁচবেন কী না সে বিষয়েও সন্দেহ আছে। তিনি এরকম পটাপট খুন করবেন কী করে?”
অধিরাজকে ব্যাঙ্ক ডিটেইলস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়তে দেখে এবার তার হয়ে পবিত্র আচার্যই মিস বোসকে উত্তর দিল, “আমি ওই ব্যাটাকে একটুও বিশ্বাস করি না। শুনলেন না রঞ্জনকে কীরকম মারাত্মক দুর্বুদ্ধি দিয়েছিল শীলাকে ফাঁসানোর জন্য!”
সে গড়গড়িয়ে বলে যায, “কে জানে, ওর ওপর যে অ্যাটাক হয়েছিল সেটা নিজেই করিয়েছে কী না। ওর মোটিভ যথেষ্ট স্ট্রং। একেই ডঃ বসু ওর সমস্ত কৃতিত্ব ছিনিয়ে নিয়েছেন। তার ওপর কার্ডিয়াক অ্যারেস্টটাও তাঁরই কৃপায় কী না কে জানে! এমনকি তাকে এরা সবাই মিলে ফাঁসানোর চেষ্টাও করেছিল। কপালজোরে বেঁচে গেলেও রাগ থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাছাড়া ওর মা অন দ্য স্পট মারা গেলেও ও এখনও বেঁচে আছে। রঞ্জন নায়েককে দেওয়া আত্মঘাতী বুদ্ধিটা ইগনোর করা অসম্ভব।”
এবার মিস আত্রেয়ী দত্ত বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরভঙ্গিতে মুখ খুলল, “স্যার, আপনি বলতে চান যে কৌশিক আগে থেকেই রঞ্জনের মতো নিজের সার্ভাইভাল প্রব্যাবিলিটি সম্পর্কে শিওর হয়ে, প্র্যাকটিস করে তবেই নিজেকে উন্ডেড করেছেন? রঞ্জনের ব্যাপারটা আলাদা ছিল। কিন্তু এক্ষেত্রে তবে কৌশিককে নিজের গোটা স্পাইনাল কর্ডের বিভিন্ন অংশে গুলি মেরে মেরে দেখতে হত যে ঠিক কোন অংশে লাগলে উনি মরবেন না। যেটা প্র্যাকটিক্যালি ইম্পসিবল।” সে থেমে যোগ করল, “তাছাড়া যে মানুষটা নিজের মা-কে এত ভালোবাসেন, তাঁকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য জলের মতো পয়সা খরচ করেছেন, বিদেশে ট্রিটমেন্ট দিতেও কসুর করেননি এবং ওই মা ছাড়া সত্যিই যাঁর জীবনে আর কেউ নেই, তিনি কী মা-কেও এভাবে খুন করবেন? ইজ ইট পসিবল? সরি যদি আমি ভুল বলে থাকি।”
অধিরাজ প্রশংসা-মাখা চাউনি ওর দিকে ছুড়ে দিয়ে বলল, “কোনো ভুল নেই আপনার কথায় মিস দত্ত। ইনফ্যাক্ট আপনার কথা হান্ড্রেড পার্সেন্ট সত্যি। সাধে কী আপনাকে হোমিসাইডের মিস মার্পল বলি।”
আত্রেয়ী একটু লজ্জা পেয়ে মুখ অবনত করে ফেলেছে, “থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।”
পবিত্র তবু তর্ক ছাড়বে না, “মানলাম মিস দত্তর কথা ঠিক। কিন্তু তুমিই বলো রাজা, এদের মধ্যে একটা লোকও আছে যাকে ক্লিনচিট দেওয়া সম্ভব? ডঃ বসু কৌশিকের ওপর মেহেরবান। ভালো কথা। কিন্তু সেই মেহেরবানি থেকেই ওর পুরো পরিশ্রম ঝেড়ে দিয়ে নিজের নামে করে ফেললেন। কৌশিক ওঁর নামে কেস ঠুকল। তারপরই সেই বিখ্যাত কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট যার কোনো রেকর্ডই নেই! আবার নিজেই কৌশিককে চিকিৎসা করেন্টরে সুস্থ করলেন। কিন্তু সুস্থ হয়েই কৌশিক ওঁর ইন্টারন্যাশনাল পুরষ্কারপ্রাপ্তি পণ্ড করল ও তলে তলে ওঁরই রাইভ্যালের সঙ্গে হাত মেলাল। তারপরও ভদ্রলোক কৌশিককে নিজের প্রভাব খাটিয়ে হিট অ্যান্ড রান কেস থেকে মুক্ত করলেন! হোয়াট টাইপ অফ টুরু লাভ অ্যান্ড হেট রিলেশন ইজ দিস? এ কেমন বালুবাসা?”
বলতে বলতেই সে দু-হাতে মাথা চেপে ধরে, “ওদিকে রণজয় বসু নিজের বাপ আর তার চ্যালার ওপর খার খেয়ে বসে আছে। সে নাকি নিজেকে প্রমাণ করেই ছাড়বে। রঞ্জন হতচ্ছাড়া মিটমিটে ডান। ওর কীর্তি শুনে তো মনে হচ্ছে যে শীলাকে ফাঁসানোর জন্য ব্যাটা সবকিছু করতে পারে। তার ওপর মার্সিডেথের উপকারিতার ওপর লেকচারও ঝাড়ে। আবার শীলাও শয়তানের আঁটি। একে তো প্যাথলজিক্যাল লায়ারের কোনো ভরসা নেই। তার ওপর রঞ্জনের ব্ল্যাকমেইলিং থেকে বাঁচার জন্য সেও মার্ডার করতে পারে। যেহেতু রঞ্জনের পাস্ট হিস্ট্রি আছে, তাই যদি অ্যানাস্থেশিয়ার ডোজে পেশেন্ট মরে তবে রঞ্জনের দিকেই আঙুল ওঠা স্বাভাবিক! ও মহিলারও ডঃ বসু আর কৌশিকের ওপর বেজায় রাগ। অন্যদিকে ইন্দ্ৰজিৎ সরকারকে দ্যাখো। ঠান্ডা মাথার শয়তান। অনেক কুকীর্তি করেছেন কিন্তু একটাও প্রমাণ ছাড়েননি। সবাই জানে যে উনি মেডিক্যাল ড্রাগের ইললিগ্যাল র্যাকেটের সঙ্গে যুক্ত –কিন্তু কেউ আজ পর্যন্ত ওঁর কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারেনি। পারফেক্ট শয়তান। সুশান্তকে অত প্যাম্পার করতেনই বা কেন। আবার অন্যদিকে সুহাসিনী আর এক উপদ্রব। অলরেডি রাগের মাথায় এক খিটখিটে পেশেন্টকে ভুলভাল খাবার খাইয়ে পটলধামে পাঠিয়েছেন। নাম-কাটা ডাক্তার। তবু শিক্ষা হয়নি। জেনিথেও কয়েকজন রোগীর ওপর একই ফান্ডা অ্যাপ্লাই করেছেন। বাইরে থেকে বোঝার উপায়ই নেই যে মহিলা কতবড়ো ক্রিমিনাল। এদের মধ্যে একটাই কমন ফ্যাক্টর। সবাই সুশান্তকে পছন্দ করে আর সুশাস্ত সুজাতাকে খুন করে নিজেও টপকে গেছে। এবং সমস্ত কথা জেনে ও শুনে সঞ্জয় কহিল, ‘আমিই খুনী। তবে প্রমাণ করো।”
পবিত্র আচার্য ক্লান্ত হয়ে চেয়ারে বসে পড়ে, “আমার মনে হচ্ছে একটা টিমের মধ্যেই ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, আমেরিকা, রাশিয়া, ইরাক, ইউক্রেন আর চীন একসঙ্গে খেলছে। কেউ কাউকে দেখতে পারে না, সুযোগ পেলেই ইন্দো-সিনো ওয়ার, ইন্দো-পাক ওয়ার, ইউক্রেন ভার্সাস রাশিয়া বা আমেরিকা বনাম ইরাক যুদ্ধ লাগিয়ে দেবে। অথচ এরা নাকি সুযোগ্য ও বিশ্বস্ত টিমমেট! ওঃ, রাজা–আমায় একবালতি জল দাও, ডুবে মরি।”
“নাইস সামারি পবিত্র।” অধিরাজ দুষ্টু হাসল, “কিন্তু তুমি সিস্টার মলয়া চৌধুরীকে বাদ দিয়ে গেলে কেন?”
“উনিও আছেন!”
বিস্ময় বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকায় পবিত্র, “সে কী! উনিই তো রতনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড়ো এভিডেন্সটা দিয়েছিলেন!”
“রাইট, এবং তিনি নিজের হাতে ওই দুই পেশেন্টকে মারেননি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে চিঠিটা উনি নিজেই T লেখেননি! ওঁর জীবনেও ট্র্যাজেডি আছে। সর্বোপরি…”
অধিরাজ নিজের ল্যাপটপটা পবিত্রর দিকে ঘুরিয়ে দেয়, “বিশ্বর রিপোর্ট অনুযায়ী ভদ্রমহিলার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে প্রতি মাসে ডঃ সরকারের অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় দেড় লক্ষ টাকা। যায়। প্রশ্ন হল, কেন?”
“খুড়ো।’
পবিত্র হাতজোড় করে ফেলেছে, “আমায় খ্যামা দাও। আমার মাথা বোঁ বোঁ করছে। যে-কোনো সময়ে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হতে পারে। আর যদি হয়, তবে আমায় খালপাড়ে ফেলে এস, তবু জেনিথে বা ডঃ বসুর আণ্ডারে ভরতি কোর না।”
অধিরাজ হেসে ফেলে এবার টুইঙ্কল অরোরার দিকে ডাকিয়েছে, “আপনার কিছু বক্তব্য আছে সেনোরিটা?”
টুইঙ্কল প্রশান্ত মুখে বলল, “স্যার, এদের সবকটাকে একঘণ্টা আমার সঙ্গে ছেড়ে দিন। সবকো উলটা করকে অ্যায়সা মারুঙ্গি কে দুধ কা দুধ, পানি কা পানি হো যায়েগা।” সর্বনাশ! অর্ণব প্রমাদ গোণে। ইনি তো শর্টকাটে শর্টসার্কিট লাগাবেন। ‘ঘণ্টাখানেক সঙ্গে টুইঙ্কল’ থাকলে আর কাউকে খুঁজেই পাওয়া যাবে না। হোমিসাইডে হাহাকার কেস হয়ে যাবে।
“তোমরা সবাই সব কিছু বললে, কিন্তু এই জুতোটার বিষয়ে কেউ একটা শব্দও বললে না। অথচ এটাই অনেক কিছু বলছে!”
আবার সেই জুতো। পবিত্র কপাল চাপড়াল, “রাজা, ওই জুতোটাই বরং আমাদের সবার মাথায় মারো। একটা জুতো নিয়ে জুতোজুতি করার চেয়ে ওটাই বেটার অপশন। ওর মধ্যে আছেটা কী?”
অধিরাজ জুতোটাকে নিয়ে সযত্নে নাড়াচাড়া করতে করতে বলল, “একটা মেজর প্রশ্নের উত্তর। জানতে চাও? তবে পরে দ্যাখো।”
“হ্যাত্তেরি!”
বিরক্ত হয়ে পবিত্র জুতোটা পড়ার চেষ্টা করে। কিন্তু জুতোর সাইজটা তার পায়ে ছোটো হচ্ছে। অনেক চেষ্টার পরেও ফিট হল না। শেষে গলদঘর্ম হয়ে হাল ছেড়ে দিয়ে সে বলল, “মাইরি, এবার এই জুতোটাকে পরানোর জন্য কী সিন্ডারেলাকে তলব করতে হবে?”
“সিন্ডারেলাকে দরকার নেই” অধিরাজ অর্ণবের দিকে তাকায়, “তুমি ট্রাই করো। জুতো পরতে হয়, নইলে পিছিয়ে পড়তে হয়।”
অর্ণব একবারের জন্যও জানতে চাইল না যে কেন সে অন্যের সেলাই করা ডক্টরস ণ্ড্য পরবে। বরং নির্বিবাদে জুতোটা পরে ফেলল। আর আশ্চর্যজনকভাবে তার পায়ে একদম মাখনের মতো স্মুদলি ঢুকেও গিয়েছে সেই ডক্টরস শ্যু। পবিত্র বিড়বিড় করে, “আমার চিরকালই সন্দেহ ছিল যে রাজার সিন্ডারেলা আসলে অর্ণব। আজ প্রমাণও হয়ে গেল।”
“লেগেছে?”
অধিরাজ বেজায় খুশি হয়ে বলল, “এবার একটু হেঁটে দেখাও তো।”
“লেঃ পচা। এই ডায়লগটা তো সেই আদ্যিকালের মেয়ে দেখতে যাওয়া পাত্রপক্ষ বলত। ‘একটু হেঁটে দেখাও তো মা!” পবিত্র বলে, “ইনফ্যাক্ট প্রেম করার সময়ে রাজত্রীকেও আনি একথা বলিনি।”
“বললে তুমি আর নিজেই ইাঁটার অবস্থায় থাকতে না খুড়ো। এখন মাথায় ফুলদানি পড়ছে, তখন ঠ্যাঙে বাঁশ কিংবা হকিস্টিক পড়ত।”
বলতে বলতেই সে অর্ণবের দিকে তাকিয়েছে, “সরি ডার্লিং, এখানে রেড কার্পেট নেই। তবু একটু হেঁটে দেখাও।”
ওর কথামতো হাঁটতে গিয়েই আসল প্যাঁচটা টের পেল অর্ণব। দুটো পাটি দেখতে এক হলেও একটার সোল কেটে ছোটো করা। যার জন্য কিছুতেই স্বাভাবিকভাবে পা ফেলা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে, একটা পা ছোটো, অন্যটা বড়ো। সে দাঁতে দাঁত চেপে আপ্রাণ স্বাভাবিকভাবে হাঁটার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রত্যেকবারই তার পা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। একটা পা দ্রুত পড়লেও অন্য পা-টা পড়তে দেরি হচ্ছে। ফলস্বরূপ রীতিমতো খোঁড়াচ্ছে সে। কিছুতেই দ্রুত ও মসৃণ ছন্দে হাঁটতে পারছে না।
“এ কী! অর্ণব খোঁড়া হয়ে গেল কী করে।” পবিত্রর বিস্ময়ের অবধি থাকে না, “ওর তো প্যারালাইসিস হয়নি। কিন্তু অবিকল…”
“হাঁটার ভঙ্গিটা হুবহু ডঃ কৌশিক চক্রবর্তীর মতো তাই না?”
সে অর্থপূর্ণ হেসে শূন্যস্থান পূরণ করল, “এবার যদি ওকে আমরা একটা ডক্টরস কোট পরিয়ে, হাতে ওয়াকিং স্টিক দিয়ে জেনিথের এন্ট্রান্সে বা করিডোরে সিসিটিভি ক্যামেরার দিকে পেছন ফিরে হেঁটে যেতে বলি, তবে সবারই মনে হবে ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী যাচ্ছেন। সেই মন্থরভঙ্গিতে খুঁড়িয়ে ট্রেডমার্ক হাঁটা, একই হাইট, চেহারার গড়নও মোটামুটি এক, এমনকী সমস্ত হসপিটালকর্মীদের মধ্যে একমাত্র তিনিই ডক্টরস ত্য পরেন। ওঁর শারীরিক অবস্থায় সাধারণ শক্ত জুতো পরা অসম্ভব। মুখ যদি না দেখা যায় তবে ক্যামেরা থেকে শুরু করে মানুষ পর্যন্ত যে কেউ ওকে শুধু ডক্টরস ণ্ড্য আর হাঁটার ভঙ্গি দেখেই কৌশিক বলে আইডেন্টিফাই করবে। বাকিটা দেখতেও যাবে না। আর ওয়ার্ডবয় সুশান্তর হাইট, চেহারার গড়ন, এমনকী চুলের স্টাইলও অনেকটাই কৌশিকের সঙ্গে মেলে। পার্থক্য শুধু এই অস্বাভাবিক ওয়ার্কিং স্টাইল যেটা অতিবড়ো অভিনেতাও নকল করতে পারবে না। তাই সিন্ডারেলাকে বিশেষ জুতোর শরণাপন্ন হতে হয়েছে যেটার একটার সোল কেটে ছোটো করে এমনভাবে রেডি করা যে যে-ই পড়ুক, তার হাঁটা বিকৃত হবেই। খুঁড়িয়ে খুড়িয়েই চলতে হবে। আর এটাই আমাদের সবচেয়ে বড়ো প্রশ্নের উত্তর।”
অধিরাজ ল্যাপটপে দু-হাজার একুশ সালের এগারোই সেপ্টেম্বরের ফুটেজটা চালিয়ে দিয়েছে,
“এই দিনে, এই সময়ে কৌশিকের বয়ান অনুযায়ী তিনি হসপিটালে আদৌ ছিলেনই না। হাইকোর্টে ছিলেন। তাঁর মোবাইল লোকেশনও তাই বলছে। তঅথচ ফুটেজ দ্যাখো।”
ওরা সবাই অবাক হয়ে দেখল অবিকল ডঃ কৌশিক চক্রবর্তীর ভঙ্গিতেই হাতে ওয়ার্কিং স্টিক নিয়ে, ডাক্তারদের সাদা কোট পরে এক ব্যক্তি জেনিথের ওয়ার্ডগুলো ভিজিট করছে। সেই নির্দিষ্ট পেশেন্টটির আই ভি-তে ইঞ্জেকশনও পুশ করল সে। তার মুখ এমনভাবে ক্যামেরা থেকে আড়াল করা যে শুধু ফুটেজ দেখে বোঝা অসম্ভব যে ওটা ডঃ চক্রবর্তী কোনোভাবেই নন। তার ওপর ফুটেজও অস্পষ্ট। জেনিথে এমনিতেই পাওয়ার গ্লিচ বা ফ্লিকারের হিস্ট্রি আছে। যার ফলে বিশেষ বিশেষ সময়ে সিসিটিভি ক্যামেরা হয় ফেল মারে, নয়তো অস্পষ্ট ফুটেজ দেয়। এটাও সেরকমই একটা ফুটেজ।
“এটাই আমার প্রশ্নের উত্তর।” তার চোখ যেন জ্বলজ্বল করছে, “আমি বারবার ভাবছিলাম যে একই সময়ে একটা মানুষ একই সঙ্গে দু-জায়গায় কীভাবে উপস্থিত থাকে। যদি সেদিন ডঃ চক্রবর্তী হাইকোর্টে থাকেন, তবে জেনিখের ফুটেজে তিনি এলেন কী করে? আসলে তিনি তো আসেনইনি। যিনি এসেছেন তিনি ওয়ার্ডবয় সুশান্ত। এইবার তোমাদের প্রশ্নের জবাব…”
সে এবার সুশান্তর মৃত্যুর দিনের ওই সময়ের ফুটেজ চালাল, “পবিত্র এবং আমরা সবাই ভেবে মরছিলাম যে সুশান্তকে শুধু লিফটের ক্যামেরাতেই দেখা গেল কেন? সে ঢুকল কোন পথে? না তাকে জেনিথের এন্ট্রান্সে দেখা গেছে, না করিডরে। তাহলে আচমকা সে লিফটে এসে পড়ল কী করে! আর এই হল তার উত্তর!”
ওরা সবিস্ময়ে দেখল সুশান্তকে লিফটে দেখার ঠিক আধঘণ্টা আগে জেনিথের মেইন গেট দিয়ে ঢুকছেন ডঃ চক্রবর্তী। হাতে সেই ওয়াকিং স্টিক, খুড়িয়ে চলায় স্পষ্ট জড়তা, মাথা নীচু থাকার দরুণ আবছা আলোয় মুখ দেখা সম্ভব নয়। তবু চেহারার গড়ন আর হাঁটার ভঙ্গি বলে দেয় ওটা ডঃ চক্রবর্তী।
“নাও, সি দ্য করিডরস।”
এবার করিডোরেও ডঃ চক্রবর্তীকে দেখা গেল। সেখানেও দৃশ্য একই। ভদ্রলোক মাথা নামিয়ে সেই পেটেন্ট ভঙ্গিতেই লাঠি ঠুকঠুক করে একটি বিশেষ কেবিনের দিকে যাচ্ছেন।
সাধারণত যাদের পায়ে জোর কম, তারা চলার সময়ে পায়ের দিকেই বেশি লক্ষ রাখেন। এতে তাদের চলতে সুবিধা হয় এবং কিছুতে স্লিপ করে বা পায়ে বেজে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও কম। তাই ইাঁটার সময়ে কৌশিকের মনোযোগ পায়ের দিকেই থাকে। এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়। ফলস্বরূপ মুখ দেখাই যাচ্ছে না।
“কিন্তু এটা সুশান্ত না হয়ে স্বয়ং ডঃ চক্রবর্তীও তো হতে পারেন স্যার,” কৌশানী বোস বলল, “সেদিন জেনিধে তিনি উপস্থিত থাকতেই পারেন কারণ সেদিন তো আর কোর্টের ডেট ছিল না।”
“ইউ আর রাইট সেনোরিটা। কোর্টের ডেট থাকলেও কিছু আসে যায় না কারণ এই এন্ট্রিটা কোর্ট আওয়ার্সের অনেক পরে। হতেই পারে যিনি ঢুকলেন তিনি স্বয়ং ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী। তাহলে প্রশ্ন হল, এই ভদ্রলোক কে?”
অধিরাজ ল্যাপটপে আরও একটা ফুটেজ চালিয়ে দেয়, “এর ঠিক দশ মিনিট পরের ফুটেজ দেখুন…”
আশ্চর্য ব্যাপার। ঠিক দশ মিনিট পরেই আবার ডঃ চক্রবর্তীকে জেনিথের গেটে দেখা গেল। তিনিও সেই একই ভঙ্গিতে আপনমনেই হেঁটে যাচ্ছেন। অথচ তাঁকে প্রথমবার এন্ট্রি নেওয়ার পর গেট থেকে একবারও বেরোতে দেখা যায়নি তবে এই দ্বিতীয়বার এন্ট্রি সম্ভব হয় কী করে? উপরন্তু তিনি যখন করিডর দিয়ে আপনমনেই হেঁটে যাচ্ছিলেন তখনই কোনো এক পেশেন্ট পার্টি তাঁকে পেছন থেকে ডাকল। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি থমকে দাঁড়িয়ে মুখ ফিরিয়ে তাকালেন। এবার ক্যামেরায় স্পষ্টভাবে ধরা পড়ল ডঃ কৌশিক চক্রবর্তীর মুখ! কোনোরকম গ্লিচ বা ফ্রিকার না হওয়ার দরুন চিনতে একটুও অসুবিধে হয় না। ইনি স্বয়ং ডঃ কৌশিকই বটে।
“মা-ই গ-ড!”
পবিত্রর মাথায় হাত, “এ ফুটেজ তো আমরাও দেখেছিলাম। কিন্তু কোনোরকম সন্দেহই হয়নি। বরং এটাই ন্যাচারাল ছিল। ডঃ চক্রবর্তী জেনিথে যখন খুশি ঢুকবেন বা বেরোবেন–এটাই স্বাভাবিক। ওঁর ওপর নজরও ছিল না। আমরা সুশান্তকে দেখে এতটাই এক্সাইটেড ছিলাম যে…”
“এই ডাবল এন্ট্রি তোমাদের চোখেও পড়েনি! তোমরা ভেবে মরছিলে যে সুশান্ত হঠাৎ কথা নেই বার্তা নেই, লিফটে এল কী করে। তোমরা তার এন্ট্রির ওপর কনসেনট্রেট করেছিলে, যার জন্য এটা দ্যাখোনি যে ডঃ চক্রবর্তী হসপিটাল থেকে একবারও না বেরিয়ে পি সি সরকারের মতো ডাবল এন্ট্রি নিয়েছেন। পরের বার যেহেতু মুখ স্পষ্ট তাই প্রথমজনই ওঁর বডি ডাবল, তথা মি. সুশান্ত। এটা আমার মাথাতেও আসত না। কিন্তু মিস বোস আর মিস অরোরা জুতোটাকে ঠিক সন্দেহ করে তুলে এনেছিলেন বলেই গেমটা ধরা পড়েছে। আমি যদি ভুল না হই, তবে ডঃ চক্রবর্তীর এরকম ডাবল এন্ট্রি আগেও বেশ কয়েকবার হওয়া অসম্ভব নয়। সুশান্তর ভাবভঙ্গিতেই স্পষ্ট যে সে কনফিডেন্ট। একটুও নার্ভাস নয়। তার মানে এই কাণ্ড সে আগেও করে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আর ডঃ চক্রবর্তীই সুশান্তর মিসিং হওয়ার খবর বলতে গিয়ে জানিয়েছিলেন যে একমাত্র সুশান্তই তাঁর সঙ্গে সঙ্গে থাকে। রীতিমতো হেল্পিং হ্যান্ড। তাই কৌশিকের মুদ্রাদোষ, চলা ফেরা, ইঞ্জেকশন পুশ করার স্টাইল মিমিক করা তার কাছে জলভাত। ডঃ চক্রবর্তীর বডি ল্যাঙ্গোয়েজ এতটাই ইউনিক যে মুখ না দেখলেও চেনা যায়। তাই ওঁর ছদ্মবেশ ধরাই সবচেয়ে সহজ ছিল সুশান্তর পক্ষে।”
“কিন্তু লিফটের ফুটেজে ওর গায়ে তো হোয়াইট কোট বা হাতে স্টিক ছিল না।”
পবিত্রর প্রশ্নের উত্তরে অধিরাজের দৃষ্টি আত্মমগ্ন হয়ে আসে, “কারণ ততক্ষণে সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। দরদর করে ঘামছিল বেচারা। ওই পরিস্থিতিতে কোট খুলে ফেলাই স্বাভাবিক। ওয়াকিং স্টিকের কথাও মনে ছিল না। প্রথমবারের ফুটেজে সে ছদ্মবেশে যার কেবিনে গিয়ে ঢুকেছিল, সে-ই শেষ করে দিয়েছে ওকে। ওই বিশেষ কেবিনের দিকের ফুটেজ দ্যাখো।”
আবার চলল সেই আগের ফুটেজ। প্রথম ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী, তথা ওয়ার্ডবয় সুশান্ত মুখ নীচু করে একজন বিশেষ মানুষের কেবিনে ঢুকল। খানিকক্ষণ পরেই সেই বিশেষ মানুষটির সঙ্গে বেরিয়ে এল এক ওয়ার্ডবয়। কিন্তু হাবেভাবে স্পষ্ট যে সে সুস্থ নয়। রীতিমতো টলছে। সিসিটিভি ফুটেজ ফের কয়েকসেকেন্ডের জন্য ঝাপসা। শুধু এইটুকু দেখা গেল যে ওয়ার্ডবয়টি ওই বিশেষ ভদ্রলোকের পিছু পিছু গেল। তার মুখ অস্পষ্ট।
“হসপিটালের মধ্যে ওই ওয়াকিং স্টিক বা ডাক্তারদের কোট থাকা অস্বাভাবিক নয়। আমার ধারণা সুশাস্ত ও-দুটো যেখানে ফেলে এসেছিল সেখানেই আছে। বা হসপিটালের ভেতরের জিনিসপত্রের সঙ্গে মিশে গেছে। কিন্তু ওর এই বিশেষ প্রজাতির জুতোর উপস্থিতি খুনীকে ধরিয়ে দিতে পারত। এটা বিপজ্জনক এভিডেন্স ছিল। আততায়ী নিজের কাছে রাখতেই পারত না। তাই জুতোটা ওর বাড়িতেই কায়দা করে রেখে এল।”
পবিত্র শিউরে ওঠে, “তার মানে তুমি বলতে চাও সুশান্তকে….”
“ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার খুন করেছেন। আর এটাই ফ্যাক্ট।” অধিরাজের কন্ঠ ইস্পাতকঠিন, “সে ওঁর কেবিনে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় গিয়েছিল। কিন্তু বেরোল অসুস্থ অবস্থায়। তারপর লিফটের সেই মারাত্মক ফুটেজ ও অবশেষে মরচুয়ারিতে গল্পের সমাপ্তি। আমার ধারণা যদি ভুল না হয়, তবে লিফটের ফুটেজের পর পাওয়ার ফের ফ্লাকচুয়েট করেছিল। এটি সুশান্তর মরচুয়ারির যাত্রাটা আর দেখা যায়নি।”
“রাইট ইউ আর।”
পবিত্র স্তম্ভিত, “সত্যিই তখন কিছুক্ষণের জন্য পাওয়ার ফের গ্লিচ করছিল। ক্যামেরা ফুটেজ ধরতে পারছিল না।”
“হ্যাঁ।” সে বলল, “আর আমি যদি ভুল না করি তার এ পেছনে আমাদের মহান মাদার টেরেসা সিস্টার মলয়া চৌধুরীর মাসিক দেড় লক্ষ টাকার কিঞ্চিৎ অবদান আছে।”
“হো-য়া-ট।”
পবিত্র যেন এখনই অজ্ঞান হয়ে যাবে, “বলো কী!”
“বিশ্বাস না হলে নিজের কানেই শুনে নিও।”
অধিরাজ রহস্যময় হাসল, “একজন ডঃ ডেথ এবার প্রমাণসমেতই ধরা পড়েছেন। ইটস টাইম টু ফেস ডঃ ইন্দ্ৰজিৎ সরকার, দ্য মার্ডারার অব ওয়ার্ডবয় সুশান্ত!”
“একজন ডঃ ডেথ।” কথাটা শুনেই গা শিরশির করে উঠল অর্ণবের।
তার মানে আরও একজন আছেন! এবং তিনি ইন্দ্রজিৎ নন, আসল মেঘনাদ! আসল মাস্টারমাইন্ড!
