ডঃ ডেথ – ১৯

১৯

“দা বেস্ট ডক্টর গিভ দেয়ার ‘হার্টস’ বিফোর দেয়ার প্রেসক্রিপশনস।”

এতক্ষণ ডঃ চ্যাটার্জির পাঠানো মিসেস উর্মিলা চক্রবর্তীর পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা খুব মন দিয়ে পড়ছিল অর্ণব। উর্মিলার গলায় ধারালো ছুরির একটাই স্ট্রোক পাওয়া গিয়েছে। একাধিক আঘাতের চিহ্ন নেই। আর ওই এক টানেই ওঁর গলার ক্যারোটিড আর্টারি ও ইন্টারনাল জুগুলার ভেইন, দুটোই কেটে ফাঁক। এই ফ্যাটাল আঘাতই যথেষ্ট ছিল ভদ্রমহিলার মৃত্যুর জন্য। তার সঙ্গে ইন্টারনাল জুগুলার ভেইন কেটে যাওয়ায় সেখান থেকে এয়ারবাবলসও ক্রমাগত ব্লাডস্ট্রিমে ঢুকে পড়ছিল। ফলস্বরূপ এয়ার এম্বলিজম। বাঁচার কোনো সম্ভাবনাই নেই।

‘এয়ার এম্বলিজম’ শব্দটা অর্ণবের মনের মধ্যে একটা আলোড়ন তুলছিল। এই কেসে এয়ার এম্বলিজমের আবির্ভাব এই দ্বিতীয়বার! এটা কী কাকতালীয়? এছাড়াও ডঃ চ্যাটার্জির মতে ভদ্রমহিলা কোনোরকম স্ট্রাগল করেননি। বোধহয় বুঝতেই পারেননি যে ওঁর ওপর কোনো আততায়ী হামলা করতে চলেছে। সবটাই এত আকস্মিকভাবে ঘটেছে যে ফাইটব্যাক বা ধস্তাধস্তি করার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। যিনি ছুরিটি চালিয়েছেন, হয় তিনি একজন মেডিক্যাল প্রফেশনাল, নয়তো অত্যন্ত দক্ষ প্রফেশনাল কিলার যার ছুরির টান কথা বলে। মোদ্দা কথা, খুনীর হিউম্যান অ্যানাটমির জ্ঞান আছে। প্র্যাকটিসড হ্যান্ড ছাড়া আকস্মিক একটানেই অমন নিখুঁত ও ক্লিয়ার ভাবে ক্যারোটিড আর্টারি আর জুগুলার ভেইন একসঙ্গে কেটে দেওয়া একেবারেই সহজ কাজ নয়। ভদ্রমহিলার পেটে হজম না হওয়া মাশরুম, সিচুয়ান পিপারকর্নস, রাইস আর নুডলসের ট্রেস পাওয়া গিয়েছে। অর্থাৎ তিনি ডিনারে চাইনিজ খেয়েছিলেন! তবে তাঁর রক্তে কোনোরকম ড্রাগ বা সেডেটিভের ট্রেস পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ ডিনারে কিছু মেশানো ছিল না। মৃত্যুর আগে তিনি সজ্ঞানেই ছিলেন। ঘরের ভেতরে কোনো অজ্ঞাত ফিঙ্গারপ্রিন্টের স্যাম্পল পাওয়া যায়নি। মা, ছেলে ও বাড়ির কুক কাম বারো-ঘণ্টার কম্বাইন্ড হ্যান্ড ভবেশ ছাড়া আর কারওর ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেই। ভবেশকে ওরা ইন্টারোগেট করেছিল ঠিকই। কিন্তু তার জোরদার অ্যালিবাই থাকার কারণে ক্লিনচিটও পেয়ে গিয়েছে। সত্যি বলতে কী, অ্যালিবাইয়েরও দরকার ছিল না। ভবেশ একজন ছাপোষা গ্রাম্য মানুষ। সে বেচারার পেটে এত বিদ্যাই নেই যে নিজের নামটা ঠিকঠাক সই করবে, হিউম্যান অ্যানাটমির জ্ঞান থাকা তো দূর। ওর মতো একজন মানুষ কারওর গলা নিখুঁতভাবে কাটছে বা কারওর স্পাইনাল কর্ড গুলি মেরে উড়িয়ে দিচ্ছে, এটা ভাবা আর আকাশকুসুম কল্পনা করা একই। তাই অধিরাজ আগেই তাকে বাদ দিয়ে দিয়েছিল।

কিন্তু ফরেনসিক রিপোর্টটা অর্ণবকে বারবার সচকিত করছে। ‘মেডিক্যাল প্রফেশনাল’, ‘প্র্যাকটিসড হ্যান্ড’, ‘হিউম্যান অ্যানাটমির জ্ঞান’, ‘ফাইট ব্যাক না করা’, ‘এয়ার এম্বলিজম’ এবং সর্বোপরি খাদ্যের তালিকায় ‘মাশরুম।” এর সবকটাই কী স্রেফ কো-ইনসিডেন্স? তার মনে বারবার একটা নামই উঠে আসছিল। শীলা বসাক। কোনোভাবে শীলা বসাক ক্রাইমসিনে উপস্থিত ছিল কী? এমন নয়তো যে ডিনার খাওয়ানোর বাহানায় সে ডঃ কৌশিকের বাড়ি গিয়েছিল? ডিনারও খাইয়েছিল। তারপর যখন কৌশিক ও উর্মিলা চক্রবর্তী তাকে সৌজন্যমূলকভাবে বিদায় জানানোর জন্য গেট অবধি এগিয়ে আসেন তখনই আচমকা ওঁদের ওপর হামলা হয়। সেজন্যই দু-জনের রক্তাক্ত, আহত দেহ গেটের সামনেই পড়েছিল। খুনী এতটাই পরিচিত যে ডঃ চক্রবর্তী বা উর্মিলা, কেউই দুঃস্বপ্নে ভাবেননি যে সে আক্রমণও করতে পারে! তাই ফাইট ব্যাকের প্রশ্নই ওঠে না।

ভাবতে ভাবতেই অর্ণবের ভুরু অসন্তোষে কুঁচকে গিয়েছে। তাহলে তো কৌশিক চক্রবর্তীর দেওয়া স্টেটমেন্টটাই মিথ্যে! একে তো তিনি অ্যাটাকের টাইমিংটাই বলতে পারেননি। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বলছে যে মার্ডার ও মার্ডার অ্যাটেম্পটটা হয়েছে আফটার ডিনার। মা নিশ্চয়ই ছেলেকে ফেলে আগেই খপখপ করে চাইনিজ খেয়ে নেননি। ওটা মায়েদের স্বভাবই নয়। সুতরাং উর্মিলা যদি চাইনিজ খেয়ে থাকেন, তবে কৌশিকও খেয়েছিলেন। খাবার যখন হজম হয়নি তখন বুঝতে হবে যে ডিনারের পরেই উর্মিলার মৃত্যু হয় ও কৌশিক আহত হন। তাহলে তিনি বললেন কেন, “বোধহয় ডিনারের আগে… আমরা তখনও ডিনার করিনি।” খেয়েছিলেন কী খাননি তা মনে ছিল না? এতটাই আপনভোলা স্বভাবের? না ওই মারাত্মক ঘটনার ট্রমার ফলে ঠিকমতো ঘটনা পরম্পরা মনে করতে পারছিলেন না? আর ওঁর কথা অনুযায়ী যদি মুখে মাস্ক পরা অজ্ঞাত কিলাররাই এই জোড়া খুনের চেষ্টা করে থাকে, তবে উর্মিলা কী বাধা দিতেন না? দু-জনের একজনও কী স্ট্রাগল করতেন না?

সে মনের মধ্যে ভিড় করে আসা প্রশ্নগুলো অধিরাজকে করতেই যাচ্ছিল। কিন্তু সে তখন একশো চুয়ান্নটা ফাইল বারবার পড়ে চলেছে। তার সঙ্গে এখন জেনিথের সেই ফাইলগুলোও উলটে পালটে দেখছে যেগুলোর পেশেন্টরা বেঁচে আছে ও একদম সুস্থ অবস্থাতেই জীবনযাপন করছে। এত গভীর মনোসংযোগে প্রতিটি প্রেসক্রিপশন, ডায়েট চার্ট, ডক্টরস নোট বা মেডিক্যাল হিস্ট্রি খুটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল যে অর্ণব তাকে বিরক্ত করল না। এখন তার বাঁ-হাতটা পেপারওয়েট নিয়ে খেলা করছে। ডানহাতের আঙুলের ফাঁকে ধিকিধিকি জ্বলছে সিগারেট। তার স্তিমিত আলোয় আংটির জবরদস্ত হীরেটা দ্যুতি ছড়ালেও সিগারেটটা নিষ্প্রভ, কারণ তার মুখে বিরাট একটা ছাইয়ের স্তর। অধিরাজ সিগারেট ধরিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এখন যেন সুখটান দিতেও ভুলে গিয়েছে। তাকে দেখলে মনে হয় সে নিজেও জানে না চিন্তার কোন্ অতল গহ্বরে ডুবে আছে। আঙুলগুলোর নড়াচড়া অলস, অনিয়ন্ত্রিত। স্খলিত ওষ্ঠাধর নিজের মনেই বিড়বিড় করে কী যেন বলছে। চোখ-দুটো ফাইলগুলোয় নিবদ্ধ। অথচ দৃষ্টিতে সুগভীর চিন্তার ছাপ। যেন আস্তে আস্তে একটা ঘোর তাকে দখল করে নিচ্ছিল।

অর্ণব এই সিম্পটম বহুবার দেখেছে। সে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবে কী না ভাবছিল। তার আগেই নিজের মৌনতা ভেঙে বলল অধিরাজ, “দ্য বেস্ট ডক্টর গিভ দেয়ার ‘হার্টস’ বিফোর দেয়ার ‘প্রেসক্রিপশনস’—ডঃ সঞ্জয় বসু উবাচ। বেশ লিখেছেন তো!”

অর্ণব ভেবে পায় না ডঃ বসুর এই লেখার মধ্যে অধিরাজ কী এমন বিশেষত্ব খুঁজে পেয়েছে। সে অবাক হয়ে বলে, “স্যার?”

“একা কৌশিক নন। ডঃ বসুও দেখছি প্রেসক্রিপশনে মাঝেমধ্যেই দার্শনিক উক্তি বসিয়ে দেন। আর আমি যদি ভুল না করি তবে গুরুকে দেখেই শিষ্য প্রভাবিত হয়ে এই ডায়লগবাজির স্টাইল কপি করেছেন।”

“তাতে কী হল?”

“কিছুই নয়,” সে এতক্ষণে সিগারেটটাতে টান মারল, “কিন্তু একেকটা ফাইল একেকটা গল্প। সুহাসিনীর বজ্জাতি সর্বত্র রয়েছে। খিটখিটে বুড়ো বুড়িদের যা পেরেছেন গিলিয়েছেন। যার গ্লুটেনে অ্যালার্জি, তাকে ব্রেকফাস্টে ব্রেড, আর ডিনারে রুটি দিয়ে বসে আছেন। যার ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের হিস্ট্রি তাকে দুধ! দুই পেশেন্টই আর একটু হলেই টপকে যাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত ডঃ বসু ও কৌশিকের হস্তক্ষেপে বেঁচে বাড়ি ফিরেছেন দু-জনই। এইরকম ভুতুড়ি করে কী মজা পান কে জানে! নামকাটা যাওয়ার পরও শুধরোননি মহিলা। ওঁর চার্জশিটে এই পয়েন্টটাও অ্যাড করে দিও তো। সুশান্তকে খুন করার চার্জে নাম তো আছেই। তার ওপর এই ‘অ্যাটেম্পট টু মার্ডারের’ গাদা গাদা চার্জ লাগিয়ে দিও। জেলে বসে চাক্কি পিসিং… পিসিং… অ্যান্ড পিসিং করলে যদি বুদ্ধি খোলে।”

“স্যার” অর্ণব ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “এমনিতেই তো শয়তানের আঁটি। এরপরও বুদ্ধি খোলা খুব প্রয়োজন?”

“শয়তানের আঁটি হতে পারেন। কিন্তু বেসিক্যান্সি উনি ও ডঃ সরকার, দু-জনেই এমন বুদ্ধিমান যে ধরতেই পারেননি যে খুনী ওঁদের ডেকে নিয়ে গিয়েছিল সুশান্তর মুখোমুখি ফেলবে বলেই। সুজাতা ওঁদের কোনো মেসেজই করেননি। করেছিলেন সেই এক ও অদ্বিতীয় ডঃ ডেথ। তিনি দু-জনকেই ক্রাইম সিনে এনে ফেলতে চেয়েছিলেন। এবং এটাও নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন যাতে সুশান্ত ওঁদের দেখতে পায়। বা বলা ভালো ওঁরা যেন দেখেন যে সুশান্ত ওঁদের দেখে ফেলেছে। একদম জিনিয়াস মাইন্ডের ওয়েল ক্যালকুলেটেড টাইমিঙে দুইপক্ষের শুভদৃষ্টির ফুলপ্রুফ প্ল্যানিং বলতে পারো।”

অর্ণব তখনও ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারেনি, “কিন্তু এই শুভদৃষ্টি করিয়ে লাভটা কী হল? ডঃ ডেথ নিজের হাতে খুন করেননি, বরং সুশান্তকে দিয়েই করিয়েছেন। সেক্ষেত্রে ক্রাইমসিন থেকে তাকে দূরে সরিয়ে রাখাটাই স্বাভাবিক নয় কী? নিজের পার্টনার অব ক্রাইমের কীর্তির সাক্ষী দু দু-জনকে রাখবেন কেন?”

অধিরাজের চোখে আবার গভীর দৃষ্টি, “দুটো কারণে। প্রথমত, যাতে সুজাতার মার্ডারে ইন্দ্রজিৎ আর সুহাসিনীকে ফাঁসানো যায়। আর দ্বিতীয় কারণ, যাতে সুশান্তর সাফাই এই দুই মক্কেলকে দিয়ে করানো যায়। সুজাতার খুনের সঙ্গে সঙ্গেই সুশান্ত’র মার্ডারেরও মাস্টারপ্ল্যান তৈরি হয়ে গিয়েছিল কিনা।”

বিস্ময়ে অর্ণব হতবাক, “সে কী!”

“এই খুনীর প্যাটার্ন দেখে অবাক হয়ে যেও না অর্ণব।”

সে আস্তে আস্তে বলল, “লোকটার দাবা খেলার অভ্যেস থাকলে সবাইকে টেক্কা দিয়ে বসে থাকত। ইনি নিজে কিং বা কুইনকে অ্যাটাক করেন না। বরং পরিস্থিতি এমন তৈরি করেন যাতে কিং আর ক্যুইন নিজেরাই মারামারি করে মরে।”

“কী ভাবে?”

“যেমন ধরো, সুজাতা খুব ভালোভাবেই জানতেন যে সুহাসিনী মিত্র আর ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার ডঃ বসুর টিমের লোক। তার আগেই রণজয় বসু ওঁকে হুমকি দিয়েছিলেন। সুজাতার বুঝতে নিশ্চয়ই বাকি ছিল না যে হুমকিটা অবধারিতভাবে ডঃ বসুর কাছের মানুষদের কাছ থেকেই আসছে। এমন অবস্থায় তিনি বেছে বেছে সেই দু-জনকেই হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ করে ডঃ বসুর বিরুদ্ধে নিজের ডিসকভারির কথা জানাবেন ও দেখা করতে চাইবেন যাঁরা ডঃ বসুর সবচেয়ে ক্লোজ? সেনোরিটার প্রাণের ভয় যথেষ্টই ছিল, এবং তিনি পাগলও ছিলেন না। তিনি কোনো ক্লু বা লিড পেলে পুলিসের কাছেই যেতেন, কিন্তু ওই দু-জনের কাছে নৈব নৈব চ।”

“ঠিক। তবে মেসেজটা খুনীই পাঠিয়েছিল?”

“একদমই তাই। খুনী চাইছিল যে ওই দু-জনের লোকেশন যেন ওখানেই থাকে। সে দু-জনকেই হাড়ে হাড়ে চেনে। এটাও জানে যে সুহাসিনী মিত্র ঠিক কোন লেভেলের ক্লিনিং এক্সপার্ট আর তার এই পরিষ্কারের বাতিক সর্বজনবিদিত। তাই সে নিজে ক্রাইমসিনকে ছোঁয়নি। বরং এই দু-জনকে এনে ফেলেছে। ডেফিনিটলি নিজেদের ক্রাইমসিনে আবিষ্কার করলে দু-জনেই ভয় পাবেন আর নিজেদের উপস্থিতির প্রমাণ লোপাট করার চেষ্টা করবেন। এ বিষয়ে ইন্দ্ৰজিৎ গোদা লোক হলেও ক্লিনিং আর্টিস্ট সুহাসিনীর ওপর তার সম্পূর্ণ ভরসা ছিল। সুহাসিনী যে ওই ফ্ল্যাট থেকে নিজেদের অস্তিত্বের প্রমাণ মুছে দেওয়ার জন্য ক্রাইমসিনের আপাদমস্তক মেক-আপ করবেন তা তার জানা। আর সেই মেক-আপ দেখলে পুলিস সুহাসিনীকেই সন্দেহ করতে বাধ্য এটাও সে জানত। কারণ মহিলার কাজ করার প্যাটার্নই এত ব্যতিক্রমী ধরনের পরিপাটি যে একটা বাচ্চা ছেলেও ধরে ফেলবে।”

“কিন্তু সুশান্তর এখানে রোল কী স্যার? মার্ডারার মার্ডার করার পর স্পট থেকে পালাবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সে আবার ফিরে এল কী করতে?”

“সে নিজে ফেরেনি।” আত্মমগ্ন ভঙ্গিতে উত্তর এল, “তাকে কোনো ছুতোয় ওখানে ফিরিয়ে আনা হয়েছে যাতে ছয় চক্ষুর মিলন হয়। সুশান্তকে খুনী ভালো করেই চেনে। জানত, তার টাকার নেশা আকাশছোঁয়া। ব্ল্যাকমেইলিঙে জুড়ি নেই। সে ওই দু-জনকে ব্ল্যাকমেইল করবেই। আর ডঃ সরকার যে এবার মরিয়া হয়ে ওকে স্রেফ খুন করতে বাধ্য হবেন–সেটা তার বুঝতে বাকি ছিল না। অ্যাকচুয়ালি ওটাই তার ‘গোল। নিজে উপস্থিত না থেকেও সে শুধু মাইন্ডগেম খেলে একজনকে দিয়ে আর একজনকে সরাচ্ছে। যেমন রতনকে দিয়ে দুটো প্রাণ নিয়ে নিল! তেমনই ডঃ সরকার আর সুশান্তর শুভদৃষ্টির নিট ফল দেখতেই পাচ্ছ। সুহাসিনী আর ইন্দ্রজিৎ ফেঁসে গেছেন। আর সুশান্তও শেষ! যে ডঃ সরকার সুশান্তকে রীতিমতো গার্ড করছিলেন, তিনিই ওকে খুন করতে বাধ্য হলেন। অথচ কেউ বুঝলেন না যে ওঁরা কেউ নিজে থেকে কাজটা করছেন না, ওঁদের দিয়ে করিয়ে নেওয়া হচ্ছে! ইভেন আমরাও কিছুটা হলেও ওর সুতোর টানেই নাচছিলাম। শুধু ডঃ সরকার, সুহাসিনী, সুশান্ত বা রতনকেই নয়, সে আমাদেরও নিজের ইচ্ছেমতো নাচিয়ে ছেড়েছে।” কথাটা বলেই সে হাতের ছবিটা অ্যাশট্রেতে ফেলে বলল, “হোয়াট আ ব্রেন।”

“এত কিছু হয়ে গেল, সিকিউরিটি গার্ডটা কিছু টের পেল না?”

“লে। গান্ধীজির চতুর্থ বাদরের ফান্ডা বলেছিলাম না তোমায়? তিনি তো নাকের সামনে স্মার্টফোন নিয়েই বসে থাকেন। ইনফ্যাক্ট আমরা যখন গিয়েছিলাম তখনও ওনার মোবাইলে ‘লে: উর্ফি’ ভাইরাল রিলস চলছিল। উর্কি জাভেদ ক্যান্ডিস পরে নিজেই আবার সেই ক্যান্ডিস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছিলেন। তিনি সেই দৃশ্য দেখবেন না অ্যাপার্টমেন্টে কে ঢুকল, কে বেরোল তা নজর করবেন?”

“কিন্তু স্যার…” অর্ণব এতক্ষণে নিজের সংশয় প্রকাশ করে, “কৌশিক বেমক্কা অমন ভুলভাল স্টেটমেন্ট দিলেন কেন?”

“কোন স্টেটমেন্টের কথা বলছ?”

“যেদিন ওঁর আর ওঁর মায়ের ওপর অ্যাটাক হল, সেদিন অ্যাটাকের টাইমিংটাই তো ভুল বলেছেন!”

অর্ণব এতক্ষণ ধরে যা ভাবছিল তার সবটাই অধিরাজকে খুলে বলল, “উনি ডিনার খেয়েও বেমালুম ভুলে গেলেন কী করে। তাছাড়া মার্ডারাররা অপরিচিত হলে ওঁরা কেউ স্ট্রাগল করলেন না কেন? ভদ্রলোক কাউকে গার্ড করছেন না তো!”

অধিরাজ মৃদু হাসল, “তোমার প্রথম প্রশ্নের উত্তর এই ফাইলগুলোতেই আছে। কৌশিক চক্রবর্তীর নেচারই এরকম! মাঝে মাঝেই অত্যন্ত অন্যমনস্ক ও অগোছালো প্রকৃতির হয়ে যান। তুমি খাওয়ার কথা বলছ? অ্যাকর্ডিং টু সাম মেডিক্যাল ফাইলস, উনি তো এ-ও ভুলে গিয়েছেন যে কোন পেশেন্টকে অ্যাটেন্ড করেছেন, আর কাকে করেননি। এর মধ্যে অন্তত চারটে কেস আছে যেখানে উনি কোনো পেশেন্টকে একইদিনে পরপর দু-বার ঠিক দশ মিনিটের ডিফারেন্সে ভিজিট করে দু-রকম আলাদা আলাদা মেডিকেশন প্রেসক্রাইব করে বসে আছেন। সম্ভবত অ্যাসোসিয়েটসদের মধ্যে কেউ তাঁকে মনে করিয়ে দিয়েছিল যে অলরেডি তিনি এই পেশেন্টটিকে দেখে গিয়েছেন এবং দশ মিনিট আগেই আলাদা মেডিকেশন দিয়েছেন। তাই দ্বিতীয় প্রেসক্রিপশনটা যতখানি লিখেছিলেন পুরোটা কেটে দিয়ে শুধু নোট লিখে দিয়েছেন, ‘ফলো দ্য প্রিভিয়াস ওয়ান।’ আবার এক জায়গায় স্বয়ং বসু দুপুর বারোটায় ওঁকে ‘রেফারাল লেটার’ দিয়ে নোট লিখেছেন, ‘কনসাল্ট ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী অ্যাসাপ।’ মূর্তিমান সেদিন হসপিটালেই উপস্থিত ছিলেন কারণ যে বেড নম্বরের পেশেন্টকে তাঁর কাছে রেফার করা হয়েছিল, তার আগের ও পরের বেড নম্বরের দু-জন পেশেন্টের ফাইলে উনি বারোটা বেজে পাঁচ ও বারোটা বেজে দশে প্রেসক্রিপশন লিখে বসে আছেন যেখানে মেডিসিনের ডাক্তারের হস্তক্ষেপের প্রয়োজনই ছিল না। আবার নিজেই ভুল বুঝে একটা লম্বা দাগ দিয়ে প্রেসক্রিপশন দুটো কেটেও দিয়েছেন। কিন্তু উক্ত বেডনম্বরের পেশেন্টটির কাছে পৌঁছোতে ওঁর আরও পাঁচ ঘণ্টা সময় লেগেছে। কী বলবে একে? যে লোক কোন বেড নম্বরের পেশেন্টের কাছে যেতে হবে সেটাই প্রায় ভুলে যান, কাকে ভিজিট দিয়েছেন, কাকে দেননি, কোন দিকে রাউন্ডে গেছেন, কোন দিকে যাননি তাও গুলিয়ে বসে থাকেন—তিনি স্পাইনাল কর্ডে গুলি খাওয়ার পর ট্রমাটাইজড অবস্থায় মনে রাখবেন যে গুলির আগে অন্য কিছুও খেয়েছিলেন কী না। এটা আদৌ অ্যাবনর্মালই নয়, বরং ওঁর মতো ‘ভোলানাথ’-এর জন্য সম্পূর্ণ নর্মাল। ইভেন হাতের লেখারও কোনো ধারাবাহিকতা নেই। কোনো ফাইলে সুন্দর। কোনো ফাইলে যাচ্ছেতাই। ওঁকে সুহাসিনীর একদম অপোজিট বলা যেতে পারে। চূড়ান্ত অন্যমনস্ক আর আন-অর্গানাইজড হয়ে যান মাঝেমধ্যেই।” সে হাসল, “বললাম না, একেকটা কেসফাইল একেকটা গল্প। ভাগ্যিস যাদের ক্ষেত্রে গুলিয়েছেন তারা বহাল তবিয়তে এই ধরাধামেই আছেন। নয়তো ভদ্রলোকের কপালে দুঃখ ছিল।”

“আর মাস্ক-পরা লোক দেখেও স্ট্রাগল না করা? উনি কী স্ট্রাগল করতেও ভুলে গিয়েছিলেন?”

“না। সেটা উনি ভোলেননি। অ্যাকচুয়ালি ওটা করা ওঁদের দু-জনের কারওর পক্ষেই সম্ভব ছিল না।” অধিরাজ বুঝিয়ে বলল, “উর্মিলা বয়স্ক ও ক্যান্সার পেশেন্ট। ক্যান্সার রোগটার ট্রিটমেন্ট ও তার সাইড এফেক্টে মানুষ ‘স্মথ’ হয়ে যায়। রিফ্লেক্স অ্যাকশনও তেমন কাজ করে না। ওঁর যে-কোনো ব্যাপারে রি-অ্যাক্ট করতে বা স্ট্রাগল করতেও সময় লাগত। তার আগেই যদি কেউ ধারালো ছুরির ঘায়ে গলাটাই ওভাবে কেটে দেয় তবে তো স্ট্রাগলের প্রশ্নই ওঠে না। আর ডঃ চক্রবর্তী নিজেই বা কোন ‘মি. ফ্ল্যাশ?” তিনিও তো সবে প্যারালাইজড অবস্থা থেকে রিকভার করছিলেন। তোমার ফেভারিট অনন্ত আম্বানির রিফ্লেক্সও বোধহয় ওঁর থেকে বেটার। তার ওপর স্পাইনাল কর্ডে একটা গুলি এসে হিট করলে কেউ ঘুষোঘুষি করার পর্যায়ে থাকে না। হ্যাঁ, অবশ্য জুনিয়র আম্বানি থাকতে পারেন, কারণ বেচারা বুলেটের ওঁর স্পাইনাল কর্ড অবধি পৌঁছতে কয়েক বছর সময় লাগবে। আদৌ বুলেটটা পৌঁছোবে, না রাস্তাতেই আটকে গিয়ে নিজেই খাবি খাবে, সে বিষয়েও আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। হোয়াটএভার, সেক্ষেত্রে ফাইট ব্যাক সম্ভব ছিল। কিন্তু ডঃ চক্রবর্তীর গায়ে ওরকম দুর্ভেদ্য বর্ম নেই। তাই বুলেট স্পাইনে লাগার পর তিনি আর কিছু করার অবস্থাতেই ছিলেন না।”

অধিরাজ একটু চিন্তামাখা স্বরে বলল, “তাছাড়া ওঁদের বাড়ি থেকে একটু দূরে একটা দোকানের সিসিটিভি ফুটেজে তিনজন মাস্কড ম্যানের ছবিও দু-তিন সেকেন্ডের জন্য ধরা পড়েছে। যদিও সে ফুটেজ দেখে মাস্কের ভেতরে সলমন খান বসে আছেন না শাহরুখ খান তা বোঝার উপায় নেই। কিন্তু কৌশিক ভুল বলেননি।”

অর্ণবের মনে তবু একটা প্রশ্ন খচখচ করছিল, “ওঁরা অত রাতে গেটের সামনেই বা কী করছিলেন?”

“গেটে তালা লাগাচ্ছিলেন। এই কাজটা অনেকেই করে।” অধিরাজ বলল, “কৌশিক যেখানে পড়েছিলেন তার একটু দূরেই ঝোপের মধ্যে তালা চাবিও পড়েছিল। আগের দিন আমরা পাইনি। তবে পরের দিন পবিত্র ওটাকে উদ্ধার করতে পেরেছিল। কিন্তু গেট বন্ধ করার আগেই কাণ্ড ঘটে গেল।”

সে ফের আপনমনেই অনির্দিষ্টের উদ্দেশ্যে বলতে থাকে, “ডককে ওই একশো চুয়ান্নটা ফাইলই পাঠিয়েছিলাম। উনি সুহাসিনীর প্রায় চারশো চোদ্দ পুরুষের শ্রাদ্ধ করে ছেড়েছেন। অপারেশনের কেসগুলোয় অ্যানাস্থেশিয়ার কোয়ালিটি আরও বেটার হতে পারত কিংবা কয়েকটা কেসে ডোসেজ আরও অ্যাক্যুরেট হতে পারত বলে জানিয়েছেন। কিন্তু তাতে ক্ষতি কিছু হয়নি। তবে ডঃ বসু আর কৌশিকের প্রেসক্রিপশনকে একদম ফুল মার্কস দিয়ে দিয়েছেন। ওঁর বক্তব্য অনুযায়ী একদম বেস্ট ট্রিটমেন্টই ওই একশো চুয়ান্নজনকে দেওয়া হয়েছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। যে মেডিসিনগুলো দুই ডাক্তার প্রেসক্রাইব করেছিলেন, তার থেকে বেটার কোনো অপশন ছিল না। তাও ওঁরা মারা গেলেন। একটা লোক চায়নি মানুষগুলো বাঁচুন…. তাই এতগুলো লোকের পরিশ্রম জলে গেল… সবই বুঝতে পারছি… সবকটা পাজল ঠিক জায়গায় বসে গিয়েছে… ব্যক্তিটিকে স্পটও করে ফেলেছি…কিন্তু যা ভাবছি সত্যিই কী তাই…?…ভুল হচ্ছে না তো!”

অর্ণব বুঝতে পারল এবার অধিরাজ আপনমনেই শূন্যের উদ্দেশ্যে বিড়বিড় করবে। তারপর একসময় একদম চুপ করে যাবে। ইতিমধ্যেই দীর্ঘ দেহটা এলিয়ে দিয়েছে চেয়ারে। চোখ অর্ধনিমীলিত। দৃষ্টিতে অতলান্তিক নেশাচ্ছন্ন গভীরতা।

সে ওখান থেকে মানে মানে কেটে পড়ে। অর্ণব জানে যে কখন স্যারকে একা ছাড়তে হবে, আর কখন আগলে রাখতে হবে। বেরিয়ে যাওয়ার আগে তবু একবার মৃদুস্বরে বলল, “চেষ্টা করবেন সিগারেটের আস্ত প্যাকেটটা আজকেই শেষ

না করার।”

“উঁ?…হুঁ…হুঁ…।”

অর্ণব দীর্ঘশ্বাস ফেলে। একটা শব্দও অধিরাজের কানে যায়নি। এখন তার কানের কাছে ঢাক-ঢোল-কাঁসর তো দূর, বোফর্স কামান দাগলেও কিচ্ছু হবে না। তার ধ্যানভঙ্গ করা এখন অসম্ভব।

সে অধিরাজের কেবিনের বাইরে বেরিয়ে আসতেই অফিসার পবিত্র আচার্যকে দেখতে পেল। কিন্তু ওর চোখে চোখ পড়ামাত্রই বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে ওঠে। পবিত্রর মুখে সচরাচর দুশ্চিন্তা নামক বস্তুটি দেখা যায় না। অনেক কঠিন পরিস্থিতিতেও সে ফিচেল মার্কা অ্যাটিটিউড নিয়ে ঘোরে। তাতে অবশ্য সহকর্মীদের সুবিধাই হয়। এত টেনশনের মধ্যে অন্তত কোথাও তো একটু রিলিফ পেতে হবে!

কিন্তু আজ তাকে দেখে চমকে উঠল অর্ণব। এ কী। পবিত্র আচার্যের মুখ অস্বাভাবিক রকমের গম্ভীর। বিবর্ণ ও রক্তশূন্য! সেই চিরপরিচিত গোঁফের ফাঁকে ফাজিল হাসিটা আর নেই। তার জায়গায় থমথম করছে প্রবল দুশ্চিন্তা! যেন তার ওপর দিয়ে প্রবল ঝড় বয়ে গিয়েছে।

অর্ণব দ্রুত পায়ে ওর দিকেই এগিয়ে যায়, “কী হয়েছে স্যার?”

পবিত্রর মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, এখনই সে হার্টফেল করবে। কোনোমতে ধরা গলায় বলল, “সিস্টার মলয়া চৌধুরী ইজ ডেড অর্ণব! এই জাস্ট খবর পেলাম। রাজা কোথায়?

বিস্ময়ে অর্ণবের মুখ থেকে কথা সরে না। এটা কী করে সম্ভব! মলয়াকে তো কিছুক্ষণ আগেই টুইঙ্কল আর মিস দত্ত অ্যারেস্ট করেছিল। চাউমিন অবশ্য তার আগেই ওখান থেকে কেটে পড়েছে। সে ‘অল ক্লিয়ার’ সিগনাল দেওয়ার পরেই দুই লেডি অফিসার গিয়ে পৌঁছেছিল তাঁকে অ্যারেস্ট করার জন্য। তিনি তখন চাউমিনের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে সদ্য ইন্দ্রজিতের গ্রেফতারির খবর পেয়েছেন। মিস অরোরা আর আত্রেয়ী যখন বাড়ির কলিংবেল বাজাল তখন ঘরের ভেতরে টিভিতে ওই নিউজটাই চলছিল। ভদ্রমহিলা নিশ্চয়ই শুনেছেন যে রিপোর্টাররা ওঁর নামও জুড়ছে ইন্দ্রজিতের ইললিগ্যাল ড্রাগ টেস্টিং র‍্যাকেটের সঙ্গে। অথচ পালাবার চেষ্টা আদৌ করেননি। বরং যখন দুই লেডি অফিসার ওঁকে অ্যারেস্ট করল তখন খুব সহজেই ব্যাপারটা মেনে নিয়েছিলেন। একদম বিনা প্রতিবাদে, টু শব্দটিও না করে চলে এসেছিলেন দু-জনের সঙ্গে।

আত্রেয়ী আর টুইঙ্কল অবশ্য এতখানি সহযোগিতা আশাই করেনি। তাদের আরও বিস্মিত করে ভদ্রমহিলা শুধু মৃদু স্বরে জানতে চেয়েছেন, “আমায় কী হ্যান্ডকাফ পরতে হবে?”

আত্রেয়ী বিস্ময় চেপে সহজসুরেই জানিয়েছিল, “আপনি যদি কো-অপারেট করেন, তবে কিছুই পরার বা পরানোর দরকার নেই। শুধু আমাদের সঙ্গে আসুন।”

টুইঙ্কলের হাত নিযপিষ করছিল মহিলার ঘেঁটি ধরে হিড়হিড় করে টেনে পুলিসের গাড়িতে তোলার জন্য। কিন্তু আত্রেয়ী চোখের ইশারায় তাকে বারণ করে। মলয়া নিজে যদি কোনো সিনক্রিয়েট না করেন, তবে কোনোরকম জোর খাটানোর প্রয়োজনই নেই। ব্যাপারটা স্মুথ থাকাই ভালো।

মলয়া সেরকম কোনো চেষ্টাও অবশ্য করেননি। শুধু নিজের ব্যাগ আর প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে নেওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করেছিলেন। আত্রেয়ীরা কোনোরকম আপত্তি করার কারণও খুঁজে পায়নি। তিনি অবশ্য মেডিসিন আর হ্যান্ডব্যাগটা নিতে পাঁচ মিনিটের বেশি সময়ও নেননি। ওঁকে অ্যারেস্ট করেই অধিরাজকে ইনফর্ম করে দিয়েছিল দুই অফিসার। মিস দত্তই ডিটেলে জানিয়েছিলেন সব ঘটনা। অধিরাজ মহিলাকে সরাসরি ব্যুরোয় নিয়ে আসতেই নির্দেশ দিয়েছিল। আপাতত সিস্টার মলয়াকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করার পরিকল্পনাই ছিল ওদের। তারপর কাল সুহাসিনী মিত্র আর ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকারের সঙ্গে পাঠিয়ে দেওয়া হত কোর্টে। মলয়া উগ্রস্বভাবের মানুষ না হওয়ার দরুণ তাঁকে নিয়ে যে-কোনো সমস্যা হতে পারে তা কেউ ভাবেইনি। এই বয়েসে তিনি চলন্ত গাড়ি থেকে লাফিয়ে পালাতে যাবেন, সেটা কোনোমতেই সম্ভব নয়। তাছাড়া ওঁর বিরুদ্ধে প্রমাণও সলিড। কোনোমতেই ছাড়া পেতেন না। তাই কোনোভাবেই মুক্তির পথ খোলা ছিল না ওঁর সামনে।

কিন্তু তারপর পবিত্র যা জানাল তাতে নিজের কানকেই বিশ্বাস হয় না অর্ণবের। আত্রেয়ীর বয়ান অনুযায়ী, ব্যুরোর এক কিলোমিটারের মধ্যে ঢুকতে না ঢুকতেই ঘটল অঘটন। একটা অদ্ভুত পরিচিত গন্ধ তার নাকে এসে ঝাপ্টা মারে। যেন কেউ আমন্ড অয়েলের শিশির মুখ খুলে দিয়েছে। হালকা বাদাম তেলের বাস পেয়ে তার সমস্ত স্নায়ু টান-টান হয়ে যায়। সে একঝটকায় বিদ্যুৎবেগে মলয়ার দিকে ফিরল। উত্তেজিত স্বরে বলে, “কী করছেন আপনি? অ্যাঁ?”

“টু-উ লেট অফিসার।”

মলয়ার মুখে তখনও মৃদু হাসি খেলা করছে। যদিও চোখে মুখে কষ্টের ছাপ স্পষ্ট। একটু জড়ানো স্বরে বললেন, “অফিসার ব্যানার্জির সত্যিই তুলনা নেই। ঠিক ধরে ফেলেছেন। শুধু একটাই ভুল হয়েছিল তাঁর।”

বলতে বলতেই তিনি ঢলে পড়লেন আত্রেয়ীর কোলে। সে টের পেল, মহিলা স্থির হয়ে যাচ্ছেন। সায়ানাইড।…. নি:সন্দেহে সায়ানাইড। কিন্তু অ্যাম্পুলটা কোথায় ছিল? ব্যাগে? মেডিসিন বক্সে নয়তো? এর আগেরবার উনি আদৌ কোনো ওষুধ সঙ্গে নেননি। খানওনি। অথচ এবার ওষুধ নিয়ে যাওয়ার জন্য অদ্ভুত একটা ব্যাকুলতা ছিল ওঁর মধ্যে…।

প্রচণ্ড আফসোসে ঠোঁট কামড়াল আত্রেয়ী। গোটা ঘটনাটাই ওর কাছে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। মেডিসিন বক্সটা নিতে দেওয়াই ভুল হয়েছে। কখন ব্যাগ খুলে ছোট্ট অ্যাম্পুলটা টুক করে মুখে পুরে চিবিয়েছেন তা ওরা কেউ টের পায়নি। চোখে পড়লেও ভেবেছে কোনোরকম মেডিসিন বুঝি। বাদাম তেলের হাল্কা সুবাসটা নাকে না এলে কিছু টেরও পেত না। নীরবেই সব শেষ হয়ে যেত।

ততক্ষণে টুইঙ্কলও লাফিয়ে পড়েছে মলয়ার ওপরে। তারও বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে বাস্তবে কী ঘটল। দু-হাতে ওঁকে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে জ্ঞানে ফেরানোর চেষ্টা করছিল মেয়েটা। দুটো আঙুল বলপূর্বক তাঁর গলায় ঢুকিয়ে বমি করানোর ব্যর্থ চেষ্টাও চালিয়ে গিয়েছে সে, আর আকুলভাবে বলছে, “সিস্টারজি! ইয়ে ক্যায়া কর লিয়া আপনে?”

বলতে বলতেই সে ড্রাইভারের দিকে তাকায়, “ড্রাইভারদাদা, আশেপাশের কোনো হসপিটালে চলো!”

আত্রেয়ী জানত যে হসপিটালে নিয়ে গিয়ে কোনো লাভ নেই। মলয়া একজন বয়স্ক ও অভিজ্ঞ সিস্টার। কতখানি সায়ানাইড খেলে মৃত্যু অবধারিত তা তিনি জানেন। আর সায়ানাইড বিদ্যুতের মতো মৃত্যু আনে। আর কিচ্ছু করার নেই! এখন অসহায়তার চরম সীমায় দাঁড়িয়ে আছে ওরা। মলয়া পালিয়ে যাচ্ছেন।

টুইঙ্কলের ঝাঁকুনি খেয়ে তিনি অতিকষ্টে শেষবারের মতো চোখ খুললেন। অন্তিমবারের মতো প্রদীপের শিখা বুঝি দপ করে জ্বলে উঠল। ঠোঁটের কষ বেয়ে সাদা ফেনা বেরোতে শুরু করেছে। ঠোঁটদুটো থেকে তখনও বাদামের গন্ধ আসছে। নিস্তেজ স্বরে বললেন, “ডঃ ডেথ নয়… সিস্টার ডেথ….!”

এই বাক্যটাই বলার জন্য বুঝি প্রাণটাকে ধরে রেখেছিলেন তিনি। বাক্যটার সমাপ্তি হল। তার সঙ্গে এক অভিশপ্ত জীবনেরও। আত্রেয়ী নিরুপায় দৃষ্টিতে দেখছিল, ওদের সবার সামনে দিয়ে আস্তে আস্তে অসীমে মিলিয়ে যাচ্ছেন সিস্টার মলয়া চৌধুরী। পালিয়ে যাচ্ছে আসামী। অথচ কিছু করার নেই! শৈশব, যৌবন জুড়ে শুধু অশান্তিই পেয়েছেন। এবার বুঝি সমস্ত জ্বালা শান্ত হল! শান্ত হয়ে গেলেন স্বঘোষিত ‘সিস্টার ডেথ।’ খুনীকে আর ধরা গেল না!

আত্রেয়ী ও টুইঙ্কল যখন শূন্য হাতে, ব্যর্থ-পরাজিত সৈনিকের মতো ব্যুরোয় এসে পৌঁছল ততক্ষণে খবরটা অধিরাজের কানে পৌঁছে গিয়েছে। সে বজ্রাহতের মতো শুধু বলল, “ইম্পসিবল।” পরক্ষণেই ঘুচে গিয়েছে তার সমস্ত জড়তা। ধ্যানতন্ময়তার বন্ধন কাটিয়ে সে একটাও কথা না বাড়িয়ে প্রায় দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটল লিফটের দিকে।

“স্যা-র!”

পাগলের মতো দৌড়োতে দৌড়োতেই সে অর্ণব সহ গোটা টিমের দিকে একমুহূর্তের জন্য ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে বলে, “সময় নেই… সময় নেই… ক-ই-ক!”

সময় নেই। কীসের সময় নেই? অর্ণব আর পবিত্র একবার শুধু দৃষ্টি বিনিময় করে। পরক্ষণেই ওরাও ছুটেছে অধিরাজের পেছন পেছন। প্রত্যেকেই নিঃসন্দেহে বুঝেছে—এই মুহূর্তে উত্তর দেওয়ার মতো সময়ও নেই। তাই কোনোরকম প্রশ্ন না করেই ওরাও দৌড়ল নীচের দিকে।

ওদিকে এই মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর চলে এসেছে মিডিয়ার কানেও। ব্যুরোর সাদা আলোয় ঢাকা প্রবেশপথ হঠাৎই কালো দুঃস্বপ্নে ডুবে গেল। এই ঘটনা প্রকাশ পাওয়া মাত্রই যেন বিস্ফোরণ ঘটল সংবাদমাধ্যমে। ব্যুরোর সামনে নিউজ চ্যানেলের ভ্যান, ক্যামেরা, রিপোর্টার আর অনলাইনের লাইভ স্ট্রিমিং টিমের উত্তেজিত ভিড়। সাংবাদিকরা প্রত্যেকেই চাইছে ঘটনাটাকে ‘এক্সক্লুসিভ’ আকারে ধরতে।

টিভি স্ক্রিনে লাল ব্রেকিং ব্যানারে জ্বলজ্বল করছে একটাই বাক্য। ঘুরে ঘুরে স্ক্রল করছে উদ্যত প্রশ্নেরা।

“সিস্টার মলয়ার সায়ানাইড সেলফ ডেথ!”

“মৃত্যুর আগে নিজেকে ‘সিস্টার ডেথ’ বলে দাবি সিস্টার মলয়ার—ডেথ সিন্ডিকেট কী সত্যিই আছে?”

এই কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিউজ স্টুডিওতে আগুন লেগেছে। রীতিমতো প্যানেল বসে গিয়েছে সেখানে। এক চ্যানেলে একজন প্রাক্তন পুলিস অধিকারী গলা চড়িয়ে বলছিলেন, “এমন ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। পুলিসের চোখের সামনেই একজন প্রধান সন্দেহভাজন নার্স আত্মহত্যা করলেন। এটা কী প্রমাণ লোপাট করার চেষ্টা? সর্ষের মধ্যেই ভূত নেই তো? অবিলম্বে ওই দুই লেডি অফিসারকে সাসপেন্ড করা উচিত।” অন্য চ্যানেলে জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক ক্ষোভে ফেটে পড়লেন, “এটা শুধু একজন নার্সের মৃত্যু নয়। এটা গোটা হেলথ সিস্টেমের মৃত্যু। যারা রোগীদের জীবন বাঁচানোর শপথ নিয়েছিল, তারাই এখন মৃত্যুদূত!”

সোশ্যাল মিডিয়ায় মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল ভিডিও ক্লিপ! হ্যাশট্যাগ সিস্টার ডেথ সারা শহর জুড়ে ট্রেন্ডিং। কেউ লিখছে, “ডক্টর ডেথ না সিস্টার ডেথ? তাহলে এরা কী একটি বড়ো চক্র?” আবার কেউ সন্দেহ ছুড়ে দিচ্ছে, “সায়ানাইড কে দিল? পুলিসের সামনে, তাদের হেফাজতে থাকাকালীন একজন সাসপেক্ট বিষ খেলেন কীভাবে?”

মানবাধিকার কমিশনের কর্মীর বক্তব্য, “যাদের হাতে আমাদের জীবন নিরাপদ থাকার কথা, তাঁরাই যদি মৃত্যুর কারিগর হন, তবে আমরা কাকে বিশ্বাস করব?”

ওই মুহূর্তে গোটা শহরই কেঁপে উঠেছিল এক নার্সের শেষ ঘোষণা আর এক অ্যাম্পুল বিষে। সিস্টার মলয়া তো সায়ানাইডের তীব্র বিষাক্ত বাহুপাশে ঢলে পড়লেন। কিন্তু গোটা শহরটায় যে অবিশ্বাসের বিষ ছড়িয়ে গেলেন, তাকে আটকাবে কে?

“স্যার… স্যার… ওয়ান বাইট…..”

“নো কমেন্টস।”

অধিরাজ কোনোদিকে না তাকিয়ে প্রায় লাফ মেরেই গাড়িতে উঠে বসেছে। সাংবাদিকদের নাকের সামনে অসভ্যের মতো গাড়ির কাচ তুলে দেয় সে। তার পেছন পেছন বাকিরাও। মিস অরোরার মুখে কোনো কথা নেই। সে ‘থ’ মেরে গিয়েছে। এখনও বুঝি বিশ্বাস করতে পারছে না। বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে আত্রেয়ী শুধু বলল, “বিশ্বাস করুন স্যার… আমরা বুঝতেই পারিনি যে মেডিসিনের জায়গায় উনি সায়ানাইডের অ্যাম্পুল খেয়ে নেবেন….! আমাদের সাসপেন্ডই করা উচিত… খুনী আমাদের নাকের সামনে দিয়ে পালিয়ে গেল…।”

“ডোন্ট ওরি মিস দত্ত।”

অধিরাজ ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট করেছে, “কেউ আপনাদের সাসপেন্ড করবে না। সিস্টার ডেথ মারা গিয়েছেন ঠিকই কিন্তু তার ‘মার’ এখনও বাকি আছে। ‘ওস্তাদের মার শেষ রাতে’ কথাটা শুনেছেন?”

“তার মানে…!”

আত্রেয়ীর চোখ বিস্ফারিত। অধিরাজ গাড়ির স্পিড চরমের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বলল,

“শেষ খেলাটা এখনও বাকি আছে সেনোরিটা। দ্য গেম ইজ স্টিল গোয়িং অন!”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *