ডঃ ডেথ – ১৩

১৩

“ইতিহাসটা আমরা জানতে পেরেছি রাজা…।”

তখন রাতের অন্ধকার সদ্য নেমেছে। আকাশে অর্ধচন্দ্রের স্নিগ্ধ আলো স্থির। তবে তার চারপাশে নীলচে আঁধার ধীরে ধীরে গাঢ় হচ্ছে। শহরের বাতিগুলো একে একে জ্বলে উঠেছে, তবু মাঝেমধ্যে আলো আর অন্ধকারের লুকোচুরিতে রাস্তা যেন আরও রহস্যময় হয়ে যায়।

সেই অন্ধকার চিরেই ছুটে চলেছিল ওদের গাড়িটা। গন্তব্য ডঃ কৌশিক চক্রবর্তীর ঠিকানা। ড্রাইভিং সিটে অর্ণব থাকলেও আজ সে একটু স্পিডেই গাড়ি চালাচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব পৌঁছে যাওয়া দরকার ওঁর বাড়িতে। কেউ ভাবতে পেরেছিল ওই আধমরা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের রোগীর পেটে পেটে এত শয়তানিও থাকতে পারে। এ তো পারফেক্ট ক্রিমিনাল।

অবশ্য পারফেক্ট ক্রিমিনাল এখানে কে নয়। ডঃ সঞ্জয় বসুও কিছু কম যান না। উনি তো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বসেই আছেন! ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার আর এক অবতার! সব অপরাধই করেছেন,

অথচ প্রমাণ নেই। সুশান্তর প্রতি ওঁর অত কৃপাই বা কেন? দু-লক্ষ টাকা উনি তাকে দিয়েছিলেন। কীসের বিনিময়ে? রঞ্জনকেই বা কথায় কথায় গার্ড করছিলেন কেন?

এ বিষয়ে অধিরাজের উত্তর, “বলি কা বকরা বা স্কেপগোট শব্দটা শুনেছ? ডঃ সরকার রঞ্জনকে এই কারণেই বাটার মাখিয়ে কাঁঠালপাতা খাওয়াচ্ছিলেন। শীলার অভিযোগের উইটনেস স্বয়ং ডঃ সঞ্জয় বসু। তিনি তো রঞ্জনকে পুলিসেই দিতে চেয়েছিলেন। আবার ডঃ সরকারের গাফিলতি বলে সবাই যেটা জানে, সেটা যে আসলে রঞ্জনের গাফিলতি, তার প্রমাণ ওঁর কাছে নির্ঘাত আছে। উনি রঞ্জনকে এইজন্যই

সেফসাইডে রাখছিলেন যাতে নিজের ঘাড়ে যদি কখনও খুব সিরিয়াস কোনো দায় পড়ে যায় তবে যেন রাঙামুলো হিসেবে রঞ্জনকেই পুলিসের নাকের সামনে ঝুলিয়ে দিতে পারেন। সাপোজ, এই কেসেই যদি ইন্দ্ৰজিৎ কোনোভাবে মাস্টারমাইন্ড হন, তবুও পুলিস ওঁকে ছুঁতেই পারবে না। প্রমাণ কই? সুশান্ত যদি সত্যিই ওঁর ইললিগ্যাল মেডিক্যাল ড্রাগ র‍্যাকেটের পার্টনার হয়ে থাকে তবে সে অলরেডি চিত্রগুপ্তকে ইন্টারভিউ দিচ্ছে। সুহাসিনী যদি বয়ানও দেন যে ওঁর মেডিক্যাল নেগলিজেন্সের ফলে পেশেন্ট আগেও মারা গিয়েছে, তখন দেখবে উনিই রঞ্জনকে সামনে টেনে এনে বলবেন, ‘ওটা আমি করিনি, ওটা আমার অ্যাসিস্ট্যান্টের কাজ।’ শীলাও এই রহস্যটা জানে। সে-ও বয়ান দিত। উনি রঞ্জনের চাকরি বাঁচালেও নিশ্চয়ই তার গাফিলতির প্রমাণ রেখেছেন, সেটা পেশ

করতেন। ডঃ বসু রেগেমেগে বয়ান দিতেন যে হ্যাঁ, রঞ্জনের এরকম কীর্তি এই প্রথম নয়। আগেও এমন কাজ সে করেছে। তখন এই ইন্দ্রজিৎ সরকারই তাকে কভার করেছেন। এই বক্তব্যগুলোকে করোবরেট করার লোক বিশেষ কম নেই। তার ওপর এখন তো আমরাও আছি। তিনজন ‘ল’ অফিসারের সামনে রঞ্জন নিজেই বয়ান দিয়ে বসে আছে যে তার দোষ প্রত্যেকবারই মহানুভব ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার ঢাকা দিয়ে এসেছেন। এবার ভেবে দ্যাখো, হাতকড়াটা কার হাতে পড়বে। মহানুভব ইন্দ্রজিৎ সরকারের না পুরোনো পাপী রঞ্জন নায়েকের? স্লটার হাউজের ভেড়ার মতো ওকে গার্ড করছিলেন ডঃ সরকার যাতে সময়মতো হাঁড়িকাঠে চড়ানো যায়। ভেরি সিম্পল!”

“এরা সবাই একেকটি ঠান্ডা মাথার যমদূত!” অর্ণব বলল, “রঞ্জনের অবশ্য মরাই উচিত! ওকে আমরা শুরুতে কী ভীতু ভীতু বা নার্ভাস ভেবেছিলাম। সুহাসিনী আবার সোশ্যাল অ্যাংজাইটি ডিজ-অর্ডার না কীসের একটা দোহাই দিচ্ছিলেন। এখন দেখছি পুরোটাই ওর ক্যামোফ্লেজ! যে পাবলিক একটা প্রতিশোধের জন্য এরকম ভয়াবহ প্ল্যানিং করে, সে তো পুরো সাইকো!”

অধিরাজ একটু হাসল, “পুরোটা ক্যামোফ্লেজ নয়। সোশ্যাল অ্যাংজাইটি ডিজ-অর্ডারের প্রবলেম রঞ্জনের সত্যিই আছে। আছে বলেই ও শীলার প্রত্যাখ্যান করা ও ওকে অযোগ্য ভাবাটা কিছুতেই মানতে পারছিল না। এই ধরনের পেশেন্টরা নিজেদের ক্ষেত্রে অন্যের জাজমেন্টাল মনোভাবের প্রতি এতটাই সংবেদনশীল যে তাতে ঘা লাগলে বা অপমানিত হলে মরতেও পারে, মারতেও পারে। পুরোপুরি অবসেসড! রঞ্জনও তাই করেছে। ওর কীর্তিটা আর যাই হোক স্বাভাবিক মানুষের নয়। আর নিশ্চয়ই শীলার তরফ থেকেও কিছু পালটা হুমকি খেয়েছে। সেই জন্যই ও অত ভয়ে ভয়ে থাকত। তুমি রঞ্জন নায়েকের কাণ্ডটা দেখেই এই বলছ? যিনি আসল বুদ্ধিটা দিয়েছিলেন তাকে কী বলবে?”

“নাথিং বাট দ্য ডেভিল। পোটেনশিয়াল কোল্ড ব্লাডেড মার্ডারার!”

ডঃ কৌশিক চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে অর্ণবের মন বিষিয়ে গিয়েছিল। রঞ্জন সাইকো হলে কৌশিক সাইকোদের মহাগুরু। কী অবলীলায় এরকম একটি ভয়াবহ ফুলপ্রুফ প্ল্যান বানিয়েছিলেন। ভাবা যায়!

অর্ণব অ্যাক্সিলেটরে চাপ দিল। হেডলাইটের তীক্ষ্ণ সাদা আলো সামনের পথকে আলোকিত করে এগিয়ে চলছিল। যেন যাত্রীদের আলো দেখিয়ে সঠিক দিশার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তীব্র আলো এক মুহূর্তের জন্য ফুটপাত, খালি বিলবোর্ড আর গুঁড়ো গুঁড়ো ধুলিকণাকে স্পষ্ট করে তোলে। আবার পরক্ষণেই অন্ধকারে গ্রাস করে নেয়।

ডঃ চক্রবর্তীর বাড়ি ওরা তখনই চলে যেত। অর্ণবের ইচ্ছে ছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডঃ কৌশিকের কলার চেপে ধরার। কিন্তু সমস্যা বাধল লেডি অফিসারদের অনুপস্থিতিতে। পবিত্ৰ ও লেডি অফিসাররা তখন বাইরে যতভাবে তদন্ত করা সম্ভব, করছিল। জেনিথ হসপিটালকে আপাতত সিল করে দেওয়া হয়েছে। ডঃ ডেথকে নিয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে। এই উত্তেজক মুহূর্তেই অনেক সময় অনেক প্রয়োজনীয় খবর পাওয়া যায়। উত্তেজিত হয়ে অনেকেই মুখ ফস্কে অনেক অজানা ও গোপন তথ্য দিয়ে দেয়। তাই সকাল সকালই ওরা বেরিয়ে পড়েছে। কৌশিকের বাড়িতে আবার বয়স্কা ও অসুস্থ মা আছেন। তাই লেডি অফিসার ছাড়া ওখানে যাওয়া উচিতও নয়। তাই ওরা অন্তত একজন লেডি অফিসারের আসার অপেক্ষা করছিল।

ভাগ্যক্রমে কিছুক্ষণ পরেই সবাই ব্যুরোয় ফিরে এসেছিল। পবিত্র ইনফর্মার র‍্যাকেটের থেকে কিছু লিড পেয়েছে। সে মিস দত্তকে নিয়ে সেখানেই গিয়েছিল। এছাড়া স্টেট ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরি বা এস এফ এস এলের বিশারদরাও জেনিথের অগ্নিকান্ডের ফরেনসিক ইনভেস্টিগেশন করছিলেন। ওঁদের সঙ্গে দেখা করা আর কথা বলাও প্রয়োজন ছিল। অন্যদিকে মিস অরোরা আর মিস বোস গিয়েছিল সুশান্তর বাড়ি। ওর শোকাহত পরিবারের সঙ্গে কথা বলে কিছু তথ্য বের করা আর ঘরটা সার্চ করে দেখাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

কিন্তু সবাই ফিরে এলেও তৎক্ষণাৎই ডঃ চক্রবর্তীর কাছে পৌঁছোতে পারেনি ওরা। দু-দুটো বাধা পড়েছে। প্রথমত, যে হসপিটালে রতন সিরিয়াস অবস্থায় ভরতি ছিল সেই হসপিটাল থেকেই হঠাৎ ফোন এল,

“তাড়াতাড়ি চলে আসুন। আপনাদের পেশেন্টের সেন্স ফিরেছে। সে এখন স্টেটমেন্ট দিতে পারবে। কিন্তু অবস্থা বিশেষ ভালো নয়। বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও ইন্টারনাল অর্গান যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওই আগুনের মধ্যে আর কয়েক মিনিট থাকলে এটুকু সম্ভাবনাও থাকত না। ওর বয়ান নেওয়ার এটাই সুযোগ।”

অধিরাজ যতই রতনের প্রতি কঠোর মনোভাব দেখিয়ে থাকুক, মনের মধ্যে তার অসহায় চিৎকার, বাঁচার আর্তি বারবার প্রতিধ্বনিত, অনুরণিত হচ্ছিল। সে সভয়ে জানতে চায়, “ডক্টর, ছেলেটা বাঁচবে তো? ও বাঁচতে চাইছিল…!”

“খুনীরাও বাঁচতে চায় অফিসার।” ডাক্তারবাবু কিন্তু নিস্পৃহ, “কিন্তু অন্য মানুষগুলোও যে বাঁচতে চায়–শুধু সেটাই তারা ভুলে যায়। বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা তো করবই। কিন্তু যা অবস্থা তাতে এরপর হয়তো স্টেটমেন্ট নেওয়ার সুযোগও পাবেন না। না মরলেও কথা বলার পরিস্থিতি বহুদিন থাকবে না। প্লিজ, কাম ‘অ্যাসাপ।”

ডঃ ডঃ কৌশিকের সঙ্গে পাঞ্জা কষার চেয়ে এটা অনেক বেশি দরকারি ছিল। তাই ওরা সকলে মিলে একরকম হুড়মুড় করেই গিয়ে উপস্থিত হল উক্ত হসপিটালে। সঙ্গে অডিও ভিডিও রেকর্ডার। মোবাইল ফোনেও কাজ হত। কিন্তু অধিরাজ একদম ক্লিয়ার ফুটেজ ও সাউন্ড চায়। তাই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ভিডিও ও অডিও রেকর্ডিং করতে সক্ষম এমন ক্যামেরাই বেছে নিয়েছে।

ওদের টিমের সঙ্গে উপস্থিত আছেন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দেবাংশু জানা। আন্ডার সেকশন ওয়ান সিক্সটি ফোর, ওঁর থাকাটাও জরুরি। ওঁকে বেরোনোর মুহূর্তেই ফোন করে ইনফর্ম করেছিল অধিরাজ। তাই তিনিও তৈরিই ছিলেন।

অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় রতনকে যখন হাসপাতালে আনা হয়েছিল, তখন তার চেহারাটাই যেন আর চেনার মতো পরিস্থিতিতে ছিল না। এখন তো অবস্থা আরও খারাপ। বার্ন ইউনিটের বাইরে ওর অসহায় ও দরিদ্র পরিবার দাঁড়িয়ে ছিল। বৃদ্ধ মা-বাবা আগেই ছেলেকে দেখেছেন। মায়ের বুকফাটা হাহাকার সহ্য হয় না! বাবা থেকে থেকে কপালে করাঘাত করছেন। পুত্রবধূ ও নাতনিকে আগেই হারিয়েছেন। এখন ছেলের অবস্থা দেখে চোখের জল আর বাঁধ মানছে না। বাবা-মায়েরা পৃথিবীর সব শোক সহ্য করতে পারেন। কিন্তু সন্তানের মৃত্যুর ভার ওই জরাজীর্ণ কাঁধে পাষাণভারের চেয়েও বেশি অসহনীয়। অধিরাজ একটু সমবেদনা মিশ্রিত দৃষ্টিতে ওঁদের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে যায় সামনের দিকে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা অভিজ্ঞ ও বয়স্ক সিস্টার নির্দেশ দিলেন,

“ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের সঙ্গে আর মাত্র একজন আসুন স্যার। পেশেন্টের অবস্থা ক্রিটিকাল। ইনফেকশন বাড়ছে। আপনারা সবাই একসঙ্গে গিয়ে হাজির হলে প্রবলেম হবে।”

“আমি যাচ্ছি।”

অধিরাজই এগিয়ে যায়। তার হাতে রেকর্ডিং করার সরঞ্জাম। সিস্টারটি তাকে ও ম্যাজিস্ট্রেট জানাকে গ্লাভস, মাস্ক, ফেস শিল্ড ও প্রয়োজনীয় ধড়াচুড়ো এগিয়ে দেয়।

বার্ন ইউনিটের বেডে রতন প্রায় আচ্ছন্নের মতো পড়েছিল। মুখ থেকে যন্ত্রণাকাতর গোঙানির আওয়াজ আসছে। তার সঙ্গে মিশছে নানারকমের শব্দ। মনিটরের বিপ বিপ্, অক্সিজেন সিলিন্ডারের হুশহুশ আওয়াজ, ইনফিউশন পাম্পের টিক টিক। একদিকের মুখ পুড়ে গিয়ে বীভৎসরূপ ধারণ করেছে। তার শরীরের বেশ কয়েকটা জায়গায়–বিশেষ করে বুক, কাঁধ আর হাতে কালচে পোড়া দাগ। ত্বক পুড়ে গলে গিয়ে ফোস্কা উঠেছে। কোথাও আবার লালচে কাঁচা মাংস বেরিয়েও পড়েছে। ডান হাতের আঙুলগুলো অর্ধেকটা কালো হয়ে শক্ত হয়ে গিয়েছে। হাত নয়, চিতার পোড়া কাঠ যেন!

“আঙুলগুলো বাঁচানো যাবে না বোধহয়।” ডিউটিরত ফিজিশিয়ান হতাশায় মাথা নাড়লেন, “ওগুলো গ্যাংগ্রিনের দিকেই যাচ্ছে। সার্জারি ডিপার্টমেন্টকে ইনফর্ম করো।”

“আঃ। মা–গো!”

শ্বাসকষ্টে রতন হাঁপাচ্ছিল। ফুসফুসে গরম ধোঁয়া ঢুকে যাওয়ায় তার কণ্ঠস্বর ভাঙা আর কর্কশ। অক্সিজেন মাস্ক লাগানো ঠিকই। কিন্তু শ্বাস নিতে গেলে বুকটা অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছে। যেন প্রতিটি শ্বাস নেওয়ার জন্য ভয়াবহ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। নাকে সাদা তুলো। ঘন ঘন কাশির সঙ্গে রক্তমিশ্রিত কফের উঠে আসা আদৌ ভালো লক্ষণ নয়।

তার বিছানার একপাশে ঝুলছে ফ্লুইডের বোতল; রিঙ্গার ল্যাকটেট, নরমাল স্যালাইন আর পেইনকিলারের সংমিশ্রণ। হাতের ক্যানুলা দিয়ে ওষুধ ধীরে ধীরে ওর শিরায় ঢুকছে ঠিকই, কিন্তু প্রশান্তি দিতে সক্ষম হচ্ছে না। অন্যদিকে স্ফিগমোম্যানোমিটার তার হাতে বাঁধা। সেটা প্রতি ক-মিনিট পর পর ফুঁসে উঠে কনস্ট্যান্ট বি পি রিডিং দেখাতেই ব্যস্ত।

পাশেই ট্রলিতে সাজানো স্টেইনলেস স্টিলের ট্রে—সেখানে কাঁচি, ফর্সেপ, স্যালাইন ফ্লাশের সিরিঞ্জ, গজ, তুলো, ব্যান্ডেজের রোল আর অ্যান্টিসেপ্টিকের বোতল। পোড়া অংশে নিয়মিত ড্রেসিং করার জন্য সবকিছু প্রস্তুত। তবু পেশেন্টের অধীরতা ও ব্যাকুলতা ক্রমাগতই বাড়ছে। সে অতিকষ্টে বিড়বিড় করে, “আমি বাঁচতে চাই…!”

সেই অকৃত্রিম ও অসহায় বাক্য। চোখের চারপাশটা পোড়া চামড়ার কারণে ফুলে গিয়েছে। চোখ আধখোলা। অধিরাজ দেখল ওর চোখের ভেতরে অস্বস্তিকর লালচে শিরা ফুলে প্রকট হয়ে উঠেছে। সে বোধহয় ঠিকমতো দেখতেও পাচ্ছিল না। অধিরাজ ও ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের দিকে তাকিয়ে শুধু বলল, “কে!”

ছেলেটার হাত-পা ব্যান্ডেজে মোড়া। ওকে এখন প্রায় জীবন্ত ‘মমি’ বলেই মনে হয়। ব্যান্ডেজের ভেতর দিয়ে মাঝে মাঝে পোড়া চামড়ার গন্ধ নাকে এসে লাগছিল। তার শরীর কাঁপছে, কিন্তু প্রচণ্ড ব্যথার মাঝেও আপ্রাণ জেগে থাকার লড়াই। মনে বুঝি ভয়, একবার ঘুমিয়ে পড়লে সে ঘুম আর ভাঙবে না…

“হার্ট রেট ১৩২, অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৭৮%!”

ডাক্তারবাবু ভ্রূ কুঁচকে বললেন, “স্যাচুরেশন ক্রমাগতই ফল করছে। নেবুলাইজার বাড়াও। স্যালাইনে ডেক্সামেথাসন মেশাও, ফুসফুসের ইনফ্লেমেশন কমাতে হবে।”

নার্স তৎক্ষণাৎ নোট নিল। অন্যজন তৎক্ষণাৎ অক্সিজেন মাস্ক সামলে নেবুলাইজার চালু করে।

ডাক্তারের মুখ গম্ভীর। তিনি আবারও বলেন, “অ্যান্টিবায়োটিক চালিয়ে যাও। সেফোপিরাজোন—সালব্যাকটামের ডোজ বাড়াও। মরফিনের ইনফিউশন চালু রাখো। ফ্লুইড ব্যালান্স মনিটর করবে আর ইউরিনের আউটপুট রেকর্ড করতে থাকো। নেক্সট টুয়েলভ আওয়ারস আর ভেরি ক্রিটিক্যাল। কিডনি আর লিভার ফাংশন টেস্ট করাও। ব্লাড কালচারও জরুরি। ইনফেকশন বাড়ছে। ফ্যামিলিকে ইনফর্ম করেছ?”

“হ্যাঁ স্যার।” একজন সিস্টার বললেন, “ওঁরা বাইরে আছেন। আর ওনারা…!”

এতক্ষণে ডাক্তারবাবু অধিরাজ আর তাঁর সঙ্গের ভদ্রলোককে নোটিস করলেন। তিনি সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলেন, “অবস্থা শোচনীয় অফিসার। আপনি টেনে বের করেছিলেন বলে তবু ফাইট করা পসিবল হচ্ছে। উই আর ট্রাইং আওয়ার বেস্ট। এই ফাঁকে বয়ান নিয়ে নিন। নয়তো পরে সুযোগ নাও পেতে পারেন।”

কথাগুলো বলেই তিনি গটগটিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। ইঙ্গিত স্পষ্ট। হয় রতনের হাতে আর বিশেষ সময় নেই, নয়তো এই যুদ্ধ আরও বেশি যন্ত্রণাদায়ক ও দীর্ঘতর হতে চলেছে। তখন পেশেন্ট তার কথা বলার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলতে পারে, অথবা কোমাটোস স্টেজেও যেতে পারে। রতনের অবস্থাটা দেখে ওর মনে হয় সে ‘অর্ধেক জীবিত, অর্ধেক ভস্মীভূত’—কোনোমতে চিকিৎসার আশ্রয়ে বেঁচে আছে।

“কে?”

জীবন্ত মমি আর একবার একটু নড়ার চেষ্টা করে। সামনের দুটো ছায়াকে সে দেখতে পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু দৃষ্টিশক্তি বিশ্বাসঘাতকতা করছে।

“অফিসার ব্যানার্জি, সি আই ডি, হোমিসাইড। আর উনি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, দেবাংশু জানা।”

অধিরাজ তার ক্ষণিক দুর্বলতাকে সরিয়ে রেখে নিস্পৃহ ঠান্ডা স্বরে বলল, “তুমি কী এখন কথা বলতে পারবে?”

রতনের আধখোলা চোখ বেয়ে জল পড়ল। সে অতিকষ্টে ফিশফিশ করে বলল, “পারব। মহাপাপ করেছি। তার হিসেব দিতে হবে না?…আপনি আমার বয়ান নিতে পারেন।”

ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব ইঙ্গিত করেন। অধিরাজ ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে অডিও ভিডিও রেকর্ডিং শুরু করে দিল।

“তুমি বোধহয় একটা চিঠি পেয়েছিলে। চিঠিটা তোমায় কে দিয়েছিল?”

“কেউ না…।” তার স্বর নিস্তেজ, “ওটা রেস্টরুমে আমার লকারের মধ্যে ছিল।…কী করে এল জানি না… কিন্তু… কিন্তু…

“লকারের চাবি কার কাছে থাকে?”

“কারওর কাছে না… ওগুলো সব রেস্টরুমের দেওয়ালেই… ঝোলে।…যে কেউ…নিতে পারে…।”

ভাঙা ভাঙা স্বরে, থেমে থেমে, টুকরো টুকরো শব্দ ও বাক্যে সে জানাল যে প্রতিদিন সকালেই প্রত্যেক ওয়ার্ডবয় বা সিস্টার নিজেদের পোশাক বদল করার জন্য রেস্টরুমে ঢোকে। সেখানে তাদের নির্দিষ্ট লকারও থাকে। ওই লকারেই তাদের আর একসেট পোশাক, খাবার দাবার বা অন্যান্য জরুরি জিনিসপত্র রাখা থাকে। এমন কিছু দামি জিনিস থাকে না যার জন্য চাবি সামলে রাখতে হবে। তাই সেগুলো প্রকাশ্যেই ঝোলানো থাকে। সেদিন রেস্টরুমের লকারে হাত দিতেই সে চিঠিটা পেয়েছিল। কে রেখেছে তা জানা নেই। জানার উপায়ও নেই কারণ ওই রুমটা সিসিটিভির আওতার বাইরে। কিন্তু চিঠিটা পড়ার পর তার মনের মধ্যে আগুন জ্বলে উঠেছিল। সে পত্রলেখকের লেখা প্রতিটি শব্দের সঙ্গে আশ্চর্যভাবে সহমত হয়েছিল। নিজস্ব ট্র্যাজিক অভিজ্ঞতা থেকে জানে, হসপিটালের চিকিৎসা একজন মরণাপন্ন রোগীকে তো শেষ করেই, সঙ্গে তার পরিবারকেও শেষ করে। অদ্ভুত এক সম্মোহনী শক্তি ছিল সেই চিঠিতে যাকে সে অগ্রাহ্য করতে পারেনি। তার ওপর টাকার দরকারও ছিল।

তবু মনে সন্দেহ ছিল যে হয়তো কেউ ঠাট্টা করেছে। তাই একবার হসপিটালের বাইরের ডাস্টবিনটা চেক করতেও গিয়েছিল। কিন্তু যখন দেখল যে সত্যিই তার মধ্যে কড়কড়ে পাঁচ লাখ টাকা রয়েছে তখন আর লোভ সামলাতে পারেনি।

“কিন্তু আই সি ইউর সেভেন্টিন বি-এর পেশেন্টের ও পেশেন্টপার্টির যথেষ্ট টাকাপয়সা ছিল। তারা না খেয়ে মরতেন না। তাছাড়া ভদ্রমহিলা সুস্থও হয়ে উঠেছিলেন। সেটা জানতে না তুমি? সব কেসই একরকম হয় না, এই চিন্তাটা একবারও মাথায় আসেনি?”

“আসেনি… স্যার…আমি বুঝিনি…।” রতন অবসন্নভাবে জানায়, “ওই ভদ্রমহিলাকে দেখতে কেউ আসত না সেভাবে… ভেবেছিলাম বাড়ির লোকেরই পরোয়া… নেই…! আমি তো… কেউ না।”

সে একটু থেমে ঠোঁট চেটে নেয়, “কয়েকদিন… আই সি ইউ-তে যাইনি…. তাই… জানতাম না, উনি সুস্থ… হয়েছেন…।”

“কিন্তু মরার কথা তো একজনের। দু-জন মরল কী করে? f এই ভদ্রলোক কী দোষ করেছিলেন? তার ফ্যামিলি যথেষ্ট ( কেয়ার করে। তিনি নিজেও ওয়েল এস্টাব্লিশড ও ভালোমানুষ f ছিলেন। তাঁকে মারলে কেন?”

“আমি ওঁকে মারতে চাইনি…. ওটা ভুল… বিরাট ভুল…!”

রতন ফের থেমে থেমে যা বলল তাতে বোঝা গেল যে অধিরাজের মিসটেকেন আইডেন্টিটির থিওরি একদম হান্ড্রেড পার্সেন্ট সঠিক ছিল। রতনের ডিউটি কয়েকদিন আই সি ইউ-তে না থাকায় সে জানতেই পারেনি যে বেড বদলে গিয়েছে। ওষুধটা পত্রপ্রেরকের কথামতো সেভেন্টিন বি-এর পেশেন্টকেই দিয়েছিল। তখন পেশেন্টের মুখ ফেরানো আর চাদরে ঢাকা ছিল বলে বোঝেনি। কিন্তু ওষুধটা পুশ করার ( পরমুহূর্তেই যখন তিনি পাশ ফিরলেন তখন আবিষ্কার করল যে ইনি অন্য লোক! সে প্রথমে ভয়ে আঁতকে ওঠে। ভেবেছিল, যে পেশেন্ট বুঝি এমনিই মারা গিয়েছে। তার জায়গায় নতুন কেউ এসেছে। কিন্তু আর একজন ডিউটিতে থাকা ওয়ার্ডবয়কে জিজ্ঞেস করতেই সে জানায় যে পেশেন্ট এখনও বেঁচে আছে। স্রেফ বেড বদল হয়েছে। সে আর অপেক্ষা না করে সেভেন্টিন ডি-এর মহিলাকেও ওষুধটা পুশ করে দেয়। যেহেতু তার প্রায়ই ডিউটি থাকে আই সি ইউতে তাই কেউ সন্দেহ করেনি। অছাড়া তার জানা আছে যে ঠিক কোন সময়ে নার্স ওয়ার্ডবয়দের শিফট পালটায়। সে সেই সুযোগটারই সদ্ব্যবহার করেছে।

‘একজনকে মারতে গিয়ে দু-জনকে মেরে ফেললে তুমি। । চাইলে তো বাঁচাতেও পারতে। যদি একজনকেও বলতে যে ভুল ইঞ্জেকশন দিয়ে ফেলেছ, তাহলেই সঙ্গে সঙ্গে তারা লিকুইডটাকে স্টপ করে দিত! অথবা নিজেই চ্যানেলের সঙ্গে ব্লুইডের কানেকশন বন্ধ করতে পারতে। পেশেন্টের রক্তে ওটা যেতই না। তুমি কাউকে ইনফর্ম করনি কেন!”

“আমি… আমি ভয় পেয়েছিলাম… স্যার… ভীষণ ভয়….! …কখনও এর আগে…মানুষ খুন… করিনি….।”

অস্ফুটে তার কণ্ঠ বেয়ে কান্নার শব্দ ভেসে এল, “আমি কখনও ভাবিনি যে … মানুষ খুন করব…!”

“ঠিক তার কিছুক্ষণ পরেই মরচুয়ারিতে গিয়েছিলে কেন? দরজাই বা ভেতর থেকে বন্ধ করেছিলে কেন?”

“তেমনই… নির্দেশ ছিল… স্যার।”

রতন ফের সমস্ত শক্তি জড়ো করে থেমে থেমে বলে, যখন সে ব্যাগটা নিয়েছিল তখন তার ভেতরে টাকা আর ভায়াল ছাড়া আরও একটা চিঠি পায়। সেখানে বলা ছিল—কাজ শেষ হওয়ার পর যেন মরচুয়ারিতে গিয়ে সে একটি বিশেষ মরচুয়ারির কোল্ড স্টোরেজ লকার বা ক্যাবিনেটে ভায়াল আর চিঠির ছেঁড়া টুকরোগুলো রেখে দিয়ে আসে। ওই ক্যাবিনেটটায় কোনো বড়ি ছিল না। জেনিথ বডি ক্যাবিনেট, বা এমবামিং লিকুইড রেখেছে ঠিকই, তবে ওগুলোর ব্যবহার খুব কমই হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পেশেন্টপার্টি ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বডি নিয়ে চলে যায়। শুধু যাদের আত্মীয়রা বিদেশ থেকে আসে তাদের বড়ি, অথবা যেগুলোর পোস্টমর্টেম হওয়ার কথা, কিংবা কিছু আনক্লেইমড বডি বা যেগুলো পেশেন্টপার্টি ছাড়াতে পারে না, দিনের পর দিন পড়ে থাকতে পারে, সেগুলোকে রাখার জন্য এই ব্যবস্থা। তবে এই হসপিটালে আজ পর্যন্ত কোনো বডিই আনক্লেইমড থাকেনি। তেমন পোস্টমর্টেমও হয় কই? অ্যাক্সিডেন্ট বা রেপ-মার্ডারের মতো সেন্সিটিভ কেসেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুলিসকেই বডি হ্যান্ডওভার করে হসপিটাল। নিজেরা দায় নেয় না। বাকি সবই প্রায় ন্যাচারাল ডেথ। তাই বেশিরভাগ ক্যাবিনেটই খালি। বড়োজোর দু-তিনটেতে বডি থাকে।

অধিরাজ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। কেমন ন্যাচারাল ডেথ তা তো দেখাই যাচ্ছে!

“তারপর?”

“যে মুহূর্তে… মরচুয়ারি ক্যাবিনেটটা খুলল… তখনই প্রথম ব্লাস্ট… তারপর তো একের পর এক ব্লাস্ট…! ব্লাস্ট…ব্লা-স্ট….ব্লা…!”

বলতে বলতেই আচমকা থেমে গেল রতন। না, মরেনি! নিঃশ্বাস পড়ছে, হার্টবিটও মনিটরে ধরা পড়ছে। সম্ভবত জ্ঞান হারিয়েছে সে।

ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব এতক্ষণ সব নীরবে শুনছিলেন। তিনি কম কথার মানুষ। তবু পুরো ঘটনাবলী শুনে ওঁর মুখ থেকেও বেরিয়ে গেল, “মা-ই গড!”

হসপিটাল থেকে সমস্ত ফর্মালিটি সেরে, ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবকে বিদায় দিয়ে যখন ওরা ক্যাম্পাস থেকে বেরোচ্ছে, ঠিক তখনই আবার ফোন। এবার ওপ্রান্তে ডঃ চ্যাটার্জি। অধিরাজ জানত যে, গোটা ফরেনসিক টিম দিন রাত এক করে পোস্টমর্টেম ও অন্যান্য ইনভেস্টিগেশন চালাচ্ছে। তাই ফোনটা দ্রুত রিসিভ করল, “ইয়েস ডক।”

“বেশ কিছু ইনফরমেশন তোমাদের দেওয়ার আছে। গোটা ল্যাজামুড়ো নিয়েই চলে এস।” ডঃ চ্যাটার্জি অস্বাভাবিক গম্ভীর, “তবে তোমার পেয়ারের হনুমান যদি হুমহাম করে আমার ল্যাবের কিছু ভাঙে, তবে দায়িত্ব নিয়ে ওর ল্যাজে আমিই আগুন লাগিয়ে দেব। একেই আমার মাথায় আগুন জ্বলছে।”

“সেরেছে। কেন?”

“ওই বাঁধাকপির বেটি সুশান্তর গোটা বাড়ি সার্চ করে একজোড়া জুতো ছাড়া আর কিছু পায়নি?” তিনি প্রায় তিনশো ডেসিবেল ক্রস করলেন, “ওই জুতো নিয়ে আমি কী করব? চিবোধ না নিজেই নিজেকে জুতোব? ওর বুদ্ধিটা কী! ল্যাজে আগুন সত্যি সত্যিই না লাগিয়ে দিয়েছি…।”

“ইয়ে… মানে…!”

অধিরাজ মাথা চুলকায়, “ওটা করবেন না স্যার।”

“কেন? ওর ল্যাজ নেই বলে?”

“ওটা অবশ্যই একটা কারণ। কিন্তু যদি অদৃশ্য কিছু থেকেও থাকে তবু রিস্ক ফ্যাক্টর আপনারই বেশি,” সে বুঝিয়ে বলে, “রাবণের নির্দেশে হনুমানের ল্যাজ জ্বলেছিল ঠিকই। কিন্তু শেষপর্যন্ত বেচারি রাবণের পেয়ারের লঙ্কাই জ্বলে পুড়ে ছাই হয়েছিল। নিজের কথা না ভাবুন, অন্তত ল্যাবের কথা তো ভাবুন!”

কথাটা বোধহয় প্রভুর মনে ধরল। তিনি বললেন, “ঠিক আছে, ওটাকে চাল-কলা-মুলো সব দিয়ে ল্যাবের বাইরেই রেখে আসবে। এমনিতেও অর্ধেক কথা ওর মাথাতে ঢুকবেও না।”

“ওকে স্যার।”

ফরেনসিক ল্যাবের ভেতরেও তখন ব্যস্তসমস্ত পরিস্থিতি। ডঃ চ্যাটার্জি মাঝেমধ্যেই বিনা কারণেই দুই অ্যাসিস্ট্যান্টের ওপর খ্যাঁক খ্যাঁক করছেন। আহেলি এখন নিজের চামড়া মোটা করে নিয়েছে। কিন্তু আইভির প্রায় কাঁদো কাঁদো মুখ।

টুইঙ্কলকে তার র‍্যাশন আর চুরুটের ফুল যোগান দিয়ে যখন সদলবলে ভেতরে ঢুকল অধিরাজ, তখনই তাকে দেখে গরগর করে ওঠেন ডঃ চ্যাটার্জি, “এসব শুরু হয়েছেটা কী! এ তো বার্নিং শিখকেও হার মানাল! বডির পর বডি ঢুকেই যাচ্ছে। একটার রিপোর্ট তৈরি করতে না-করতেই আরও কতগুলো এসে ঢুকল। এরপর ল্যাবে আর জায়গা থাকবে না। ডেডবডিগুলো আমার মাথাতেই রেখ।”

পবিত্র আচার্য এবার কেশে ওঠে। ডঃ চ্যাটার্জি তাকে একঝলকে পুরো ছাই করে দিয়ে বলেন, “বেনাড্রিলের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর পালটেছে? না অর্ণবের ছোঁয়াচে রোগ এনাকেও ধরল?”

পবিত্র ভয়ের চোটে হেঁচকি তুলে থেমে যায়। অর্ণব আর তার মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় হল। সে দেখে অর্ণব ইশারায় বলছে, “কাম ডাউন!”

মিস বোসকে দেখে আহেলি ঈষৎ উষ্ণ হলেও কোনোরকম প্রতিক্রিয়া দেখায় না। বরং এমন ভাব করল যেন উক্ত লেডি অফিসার এখানে উপস্থিতই নেই। বরং অধিরাজের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল, “আমরা ডঃ সুজাতা রায়ের

খুনীকে স্পট করতে পেরেছি। ওঁর গলার ওপরের আঙুলগুলোর ছাপ পারফেক্ট ম্যাচ করেছে।”

এই সংবাদটা শোনামাত্রই উত্তেজনার পারদ আকাশ ছুঁয়েছে। প্রত্যেক অফিসারের মুখ থমথমে। তারা নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছে খুনীর নাম শোনার জন্য।

“কে?”

অধিরাজের সংক্ষিপ্ত অথচ উত্তেজিত প্রশ্নের উত্তরে এবার ডঃ চ্যাটার্জি মুখ খুললেন, “খুনী ধরা পড়েছে ঠিকই, কিন্তু তাকে তোমরা ধরতে পারবে না।”

“লে হিচকক!”

অধিরাজ কিছু বলার আগেই পবিত্র অধৈর্য হয়ে বলে ওঠে, “ওদিকে লাশের পর লাশ পড়ছে আর এদিকে আপনার রামগোপাল ভার্মা হওয়ার শখ হল স্যার? ডরানা জরুরি হ্যায়?”

অন্য সময় হলে নির্ঘাত একটা বীকার বা টেস্টটিউব বডিলাইন বোলিঙের স্পিডে ছুটে আসত পবিত্রর মাথা লক্ষ্য করে। কিন্তু এবার তেমন বিপজ্জনক কিছু হল না। ডঃ চ্যাটার্জির মুখ অস্বাভাবিক গম্ভীর।

“ডরনা জরুরি হ্যায় কারণ ওই হল সুজাতা রায়ের খুনী।” তাঁর অঙ্গুলিনির্দেশ লক্ষ্য করে সবাই সবিস্ময়ে দেখল যে তিনি ওয়ার্ডবয় সুশান্তর ডেডবডির দিকে নির্দেশ করছেন।

“সুশান্ত!”

অধিরাজ অবাক, “কিন্তু হেয়ারস্যাম্পলটা তো ডঃ রণজয় বসুর!”

“হতে পারে। হয়তো সুশান্ত তারই নির্দেশে কাজটা করেছে। এবং মে বি স্পটে তিনি উপস্থিতও ছিলেন। মেয়েটাকে ঝোলাতে হেল্পও করে থাকতে পারেন। সেটা তোমরা বুঝে নিও। কিন্তু এটা ঘটনা, যে শক্তিশালী হাত দুটোর চাপে সুজাতা শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছিল—সে দুটো সুশান্তর-ই। ফিঙ্গারপ্রিন্ট একদম পারফেক্টলি ম্যাচড। শুধু তাই নয়, মেয়েটা যখন স্ট্রাগল করছিল তখন ওর নখে যে স্কিন স্যাম্পল পাওয়া গেছে সেটাও সুশান্তর ডি এন এর সঙ্গে সম্পূর্ণ ম্যাচ করেছে। ওর ডেডবডিতে আমরা আঁচড়ের দাগও পেয়েছি। তাই প্রশ্ন বা সন্দেহের অবকাশই নেই।”

“তবে সুশান্ত মারা গেল কী করে? ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার সাসপেক্ট করছিলেন যে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হতে পারে যার জন্য সে হ্যালুসিনেট করছিল, প্যানিক করছিল এবং টোট্যালি কনফিউশনে ভুগছিল। চোখেও হয়তো ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছিল না, যার জন্য বুঝতেই পারছিল না যে কোন্ ফ্লোরে যাচ্ছে…।”

“ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার হয় ভগবান, নয় ভণ্ড অমানুষ!” তিনি বলেন, “আমরা সচরাচর টেস্টিং আর প্রবাবিলিটির ওপর ততখানি ডিটেইলসই বলতে পারি যেটা নাইন্টি ফাইভ পার্সেন্ট অবধি কারেক্ট। বাট হি ইজ হান্ড্রেড পার্সেন্ট রাইট। সুশান্তর মৃত্যুর অন্যতম কারণ কার্ডিয়াক অ্যারেস্টই। এবং তিনি ওর অন্তিম মুহূর্তের একদম ঠিক বর্ণনাই দিয়েছেন। তার বুকে ব্যথা হচ্ছিল, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছিল, সে চোখেও ঠিকমতো দেখছিল না, অডিটারি ও ভিস্যুয়াল হ্যালুসিনেশন হচ্ছিল। সঙ্গে ভয়াবহ প্যারানইয়া আর কনফিউশন, যার জন্য সে লিফটের মধ্যে অমন পাগলের মতো আচরণ করছিল। কিন্তু এগুলো একটাও নর্মাল প্রসেসে হয়নি।”

“তবে?”

“এর পেছনে মেথামফেটামিন বা মেথামফেটামাইনের ভয়াবহ ওভারডোসেজ দায়ি। একে ক্রিস্টাল মেথ বা শুধু মেথও বলে। সুশাস্তর শরীরে রীতিমতো বিষের কাজ করেছে ড্রাগটা! এর জন্যই সে হ্যালুসিনেট করছিল, প্যারানয়েড হচ্ছিল, ভয়ে বারবার এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল যা আগের দুটো কন্ডিশনে সবচেয়ে বেশি স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা হল, আমরা এটা বুঝতে পেরেছি কারণ পোস্টমর্টেমে ড্রাগটা ধরা পড়েছে। এর একটাও নর্মাল কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে হওয়ার কথাই নয়। কিন্তু কোনোরকম পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়া ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার ওর অন্তিম পাঁচ মিনিটের সিম্পটমগুলোকে এতখানি পারফেক্টভাবে বিশ্লেষণ করলেন কী করে? ত্রৈলঙ্গস্বামীর কাছে ট্রেনিং নিয়েছিলেন নাকি!”

অধিরাজের কপালেও চিন্তার ভাঁজ। মোক্ষম প্রশ্ন যার উত্তর তারও জানা নেই!

“মজার ব্যাপার এটা সুশাস্ত ইনহেল করেনি, স্মোক করেনি বা ইঞ্জেক্টেডও হয়নি। পুরোটাই গুরালি গিয়েছে। তাও আবার অ্যালকোহলের সঙ্গে। মোস্ট ডেঞ্জারাস কম্বিনেশন।”

“এনি লিড?”

“হ্যাঁ। সুশান্তর জামা থেকেও আমাদের মিস মুখার্জি আর একটি চুল আবিষ্কার করেছেন। আমরা আবার হাঁউমাউ করে সেটাকে এত কম সময়ে টেস্টও করিয়েছি। রেজাল্ট বলছে যে সেটাও ডঃ সঞ্জয় বসুর বায়োলজিকাল সনের—তথা রণজয় বসুর। তোমরা কী ওকে ইন্টারোগেট করেছ?”

অধিরাজ মাথা নাড়ল। সে এখনও ভদ্রলোককে ধরেইনি। তাকে নিঃসঙ্গ, একাকীত্ব, আতঙ্ক দিয়ে আরও একটু ভাঙার তালে আছে। বাকীরা তবু ঠিক ছিল। কিন্তু ইনি আবার সঞ্জয় বসুর সুপুত্র। বাবার মতোই স্ট্রং নার্ভের অধিকারী হওয়ার চান্স বেশি। তাই তাঁর স্নায়ুকে আরও একটু অবসন্ন করতে চাইছে অধিরাজ।

“এই এভিডেন্সটাও ওঁর বিরুদ্ধেই যাবে কারণ সুশান্তর মৃত্যুর আগে উনি তোমাদের কাস্টডিতে ছিলেন না।”

“রাইট ডক।” সে চিন্তামগ্ন স্বরে বলে, “আর কোনো লিড আছে?”

“আরে!” এবার ফরেনসিক এক্সপার্ট খেপে লাল হয়েছেন, “আমায় কী নটরাজ পেন্সিল পেয়েছ না ম্যাগি যে গাদা গাদা ‘লিড’ সাপ্লাই করব? সুশান্তর বডি থেকে আর বিশেষ কিছু পাইনি। মার্ডারার কে আমি জানি না। কিন্তু সে প্রায় নিখুঁত ক্রাইমই করছে। ওই একটি হেয়ার স্যাম্পল ছাড়া আর কিছু নেই। নো ফিঙ্গারপ্রিন্টস, নো স্ট্রাগলস ‘অর’ স্কিন স্যাম্পল, নো আদার এভিডেন্সেস! নাথিং!” তিনি ভুরু কুঁচকে ভীমরুলের মতো মুখভঙ্গি করে বললেন, “স্রেফ একটু ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভুগছি!”

“সে কী!” এবার মুখ খুলল পবিত্র, “কেন?”

“যা আমাদের রীতিমতো টোয়েন্টি ফোর সেভেন জান লড়িয়ে বের করতে হচ্ছে, তা ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার এমনিই কী করে জেনে যাচ্ছেন!”

“ভ্যালিড পয়েন্ট ডক।” অধিরাজ মৃদু হাসে, “নয়তো আমি তো ভেবেই বসেছিলাম যে লাশের গায়ে কিলোদরে চুলের বিতরণ ও সৌন্দর্য দেখেই আপনি কমপ্লেক্স খাচ্ছেন!”

“এইসব বাঁদুরে বুদ্ধি তোমার মাথায় আসে কী করে একটু বলবে? হতচ্ছাড়া হন্ডুরাস, নাগাসাকির নাগা সাধু, বিষবৃক্ষের বিষফল, কাগামাছি বগাহাঁচি, ঠ্যাং দোলানো লামা কোথাকার!”

ডঃ চ্যাটার্জি খেপে লাল হয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠেই সঙ্গে সঙ্গে একহাতে নাক টিপে ধরে জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছেন। অধিরাজ এবার কপাল চাপড়ায়, “নাও, ভীমরুল থেকে একেবারে ভ্রমরে ট্রান্সফার। ডক, এখনই আপনাকে ভ্রামরী প্রাণায়ামে পেল। শিল্পা শেঠিকে আর কিছুক্ষণ ওয়েট করতে বলতে পারলেন না?”

‘পাবে না তো কী।” তিনি প্রাণায়াম করতে করতেই বলেন, “একে খুনী কোনো ব্লু, কোনো এভিডেন্স ছাড়ছে না! তন্নতন্ন করে এখনও সলিড কিছু পাচ্ছি না। তার ওপর ফাউ হিসেবে তুমি স্ট্রেস দিচ্ছ। মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করে তোমাকেই উড়িয়ে দিই। পারফেক্ট স্ট্রেসবাস্টার।”

“অফকোর্স। ইউ আর ওয়েলকাম।” সে বিনম্র ‘বাও’ করে, “কিন্তু তার আগে এই দুই পেশেন্টের মৃত্যুর কারণ বলবেন কী? ওড়ার আগে সেটাও শুনে যাই।”

“সেম লিথাল ইঞ্জেকশন।” ডঃ চ্যাটার্জি এবার চিন্তিত, “ডিটেইলসে বলা মুশকিল। কিন্তু প্রাথমিকভাবে বিউপিভিকেইন,

লিডোকেইন হাইড্রোক্লোরাইড আর এপিনেফ্রিনের বিস্ফোরক ট্রেস পাওয়া গিয়েছে যা মরার জন্য যথেষ্ট। আরও যদি কিছু পাই তবে জানাব! তবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব খুনীকে ধরো। নয়তো আমিই সাইকো হয়ে ডঃ ফরেনসিক ডেথ হয়ে যাব।”

বলতে বলতেই তিনি হাত বাড়ালেন আহেলির দিকে, “আইসব্যাগ প্লিজ।”

ওঁর অবস্থা দেখে ভয়ের চোটে অধিরাজ আর জুতোর কথা তুললই না। বরং মানে মানে সবাই মিলে পাতলা হয়ে গেল সেখান থেকে। প্রাণ আর কান বাঁচানোর ওটাই শ্রেষ্ঠ উপায়।

সমস্ত কাজ সেরে এখন ওদের গাড়ি ডঃ কৌশিক চক্রবর্তীর বাড়ির দিকেই ছুটছিল। এতক্ষণে পবিত্র সুযোগ পেয়ে বলল,

“মামা, তুমি যে ইতিহাসের কথা বলছিলে না, সে ইতিহাসটা আমরা কিন্তু জেনেছি।”

বলতে বলতেই সে মিস আত্রেয়ী দত্তর দিকে তাকায়, “অবশ্য এটা মিস দত্তর-ই ক্রেডিট। পেঙ্গুইন বুকসের কলকাতা ব্রাঞ্চের লোকজনের সঙ্গে ওর কানেকশন না থাকলে খবরটা পাওয়া চাপের হত।”

অধিরাজ আপনমনেই একটা সিগারেট ধরিয়েছে। ফের মিস বোস সেটার দিকে নজর দিচ্ছে দেখে সে ইন্ডিয়া কিংসের প্যাকেটটাই এগিয়ে দেয় ওর দিকে, “প্লিজ সেনোরিটা…।”

মিস বোস একটু ইতস্তত করে, “স্যার, এটা আমার ব্র্যান্ড নয়। খুব কড়া। তাই আস্ত খেতে পারব না। আপনি যেটা ধরিয়েছেন যদি সেটাই একটু কাউন্টার হিসেবে পাওয়া যেত…!”

সে অবাক দৃষ্টিতে কৌশানীর দিকে তাকায়। এ আবার কী কথা! তাহলে উনি নিজের ব্র্যান্ডটাই স্মোক করেন না কেন?

কৌশানী তার বিস্ময় দেখে মাথা চুলকে বলল, “মানে… আমার প্যাকেটটা শেষ হয়ে গেছে স্যার…।”

অর্ণব আর আত্রেয়ী অর্থপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় করে। প্যাকেট শেষ হয়েছে, না ওই ঠোঁটের স্পর্শ পাওয়া সিগারেটটাই চাই? মেয়েটার মতলব কী! মাঝেমধ্যে এমন অদ্ভুত আচরণ করেই বা কেন!

অধিরাজ কোনোদিনই অত ভাবে না। এখন তো ভাবার সময়ও নেই। সে স্টিকটাকে ঠোঁট থেকে নামিয়ে এগিয়ে দেয় মিস বোসের দিকে, “ওকে সেনোরিটা। হ্যাপি সুখটান।”

কথাটা বলেই সে ফিরল পবিত্রর দিকে, “পেঙ্গুইন বুকসের সঙ্গে এই কেসের সম্পর্ক কী?”

“বিরাট সম্পর্ক রাজা।”

পবিত্র আড়চোখে একবার কৌশানীকে দেখে নেয়। সে ধূমায়িত সিগারেটটা টানছে না ওটাকে চুমু খাচ্ছে তা বোঝা দায়। তবু একটা হেঁচকিকে সম্বরণ করে সে কন্টিনিউ করে, “প্রথমে আমার কথা বলি। তারপর মিস দত্ত বাকিটা বুঝিয়ে বলবেন।”

“বেশ। প্রসিড।”

পবিত্র বলতে শুরু করে, “আমার ইনফর্মার খবর দিয়েছিল যে ডঃ কৌশিক চক্রবর্তীর একটা নয়, দুটো কেস চলছে কোর্টে। আমি ভেবেছিলাম দুটোই বুঝি ওঁর এগেনস্টে ক্রিমিনাল কেস। তাই খবরটা পাওয়া মাত্রই ছুটেছিলাম। কিন্তু ইনফর্মার বলল যে না, দুটো কেস আলাদা। একটা ডঃ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে হিট অ্যান্ড রান কেস যেটা থেকে উনি সম্প্রতি বেকসুর খালাস পেয়েছেন। কিন্তু আর একটা কেস স্বয়ং উনিই ২০১৬ সালে ঠুকেছেন এগেইনস্ট ডঃ সঞ্জয় বসু। প্ল্যাগিয়ারিজমের চার্জ। সেটা এখনও চলছে। আর এর মাঝখানেই কপিরাইট অ্যাক্টে ফেঁসে গেছে পেঙ্গুইন বুকস!”

“কিউরিঅ সার অ্যান্ড কিউরিঅ সার!”

অধিরাজ এবার সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে আত্রেয়ীর দিকে দেখছে। আত্রেয়ী সপ্রতিভভাবে জানাল, “অ্যাকচুয়ালি আমরা পেঙ্গুইন বুকস থেকে যা তথ্য পেয়েছি সেই অনুযায়ী ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী ও ডঃ বসু, দু-জনে মিলেই একটা বই লিখছিলেন। যখন বইয়ের পাণ্ডুলিপি রেডি হচ্ছিল তখন ডঃ কৌশিক একদমই জুনিয়র। কিন্তু অত্যন্ত প্রতিভাবান বলে ডঃ সঞ্জয় বসু ওঁকেই বেছে নেন অ্যাজ আ কো-অথর। বইটার নাম ‘বিয়ন্ড ইওর হার্ট’। রোম্যান্টিক শুনতে লাগলেও বেসিক্যালি এটা মেডিক্যাল বুক স্যার। ডঃ কৌশিক দাবি করেছেন, কো-অথর বললেও আসলে প্রায় নাইন্টি পার্সেন্ট কাজই ওঁর করা। ডঃ বসুর অবদান দশ শতাংশের বেশি কোনোমতেই নয়। উনি নেহাৎই জ্ঞান দিয়ে আর গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বক্তৃতা দিয়ে বেরিয়েছেন।”

“রিয়েলি? দেন?”

“মজার কথা, পেঙ্গুইন বুকস যখন বইটা পাবলিশ করে তখন ডঃ সঞ্জয় বসু নিজেই ডঃ কৌশিকের নামটা বই থেকে সরিয়ে দেন। আই মিন, উইদড্র করেন,” সে বলল, “ডঃ সঞ্জয় বসুর দাবি কৌশিকের নামটা উনি এমনিই দিয়েছিলেন। কৌশিক শুধু গণেশের মতো টাইপ করেছেন। আসল বেদব্যাসের ব্রেন স্টর্মিং আর রিসার্চ, সবই ওঁর নিজের। কৌশিকের কৃতিত্ব নেই। হি ইজ ওনলি আ স্টেনোগ্রাফার। পেঙ্গুইন বুকস অতবড়ো ফিগারের কথা বাধ্য হয়েই মেনে নেয়, আর কৌশিককে সরিয়ে ডঃ বসুকেই অ্যাজ অথর প্রোমোট করে।”

“এটা তো রীতিমতো ব্যাকস্ট্যাবিং।” অধিরাজ উত্তেজিত “তারপর? বইটা প্রকাশ পেয়েছিল?”

“হ্যাঁ।” আত্রেয়ী মাথা ঝাঁকায, “আর শুধু প্রকাশই পায়নি, উইদিন সিক্স মান্থস ওটা আমেরিকার বেস্ট সেলার চার্টে উঠে আসে। শুধু তাই নয়—সবাই একবাক্যে স্বীকার করে নেয় যে বইটা কার্ডিওলজির ক্ষেত্রে যুগান্তকারী। সেখানে রীতিমতো প্রমাণ ও রিসার্চ সহ প্রুভ করা হয়েছিল যে কিছু মেডিসিন ও প্রসিডিওরের মাধ্যমে ‘লেজার অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি’-কে আরও বেশি স্মুদ করা যায়। পেশেন্টের লাইফ টাইম আরও বেশি বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। লেজার এনার্জির সঙ্গে আরও কিছু টেকনিকের কম্বিনেশন প্লাক ভেপোরাইজেশনকে আরও নিখুঁত করে এবং মাইক্রোবাবলসের পরিমাণ আরও বাড়াতে পারে যা প্লাককে অনেক সহজে সরাবে। ইট ওয়াজ আ রেভোলিউশনারি রিসার্চ ওয়ার্ক। আর এর জন্য ডঃ সঞ্জয় বসু ‘দ্য লাস্কার অ্যাওয়ার্ড’ও পেতে চলেছিলেন। লাস্কার অ্যাওয়ার্ড ডাক্তারদের কাছে মারাত্মক প্রেস্টিজিয়াস। এটাকে অনেকে আমেরিকার নোবেলও বলে!” আত্রেয়ী একটা শ্বাস টেনে নিয়ে বলল, “ইনফ্যাক্ট দ্য লাস্কার অ্যাওয়ার্ড উইনাররা খুব সহজেই নোবেল প্রাইজের জন্যও নমিনেটেড হন। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নোবেল লরিয়েটও হয়ে যান। সো ইট ওয়াজ আ বিগ ডিল ফর ডঃ বসু।”

“কিন্তু তাই বলে তিনি ডঃ চক্রবর্তীকে সিন থেকে সরিয়ে দিতে পারেন না!”

“সেটাই তো সবচেয়ে বড়ো ব্যাকস্টাবিং!” মিস দত্ত বলতে থাকে, “ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী কো-অথর থাকলে ওই প্রাইজের ওপর ওঁরও অধিকার থাকে। কিন্তু উনি ডঃ চক্রবর্তীকে কোনোরকম ক্রেডিটই দেবেন না, পুরষ্কারের ভাগ তো দূর। যখন এই ফ্যাক্টটা ডঃ কৌশিক জানতে পারেন, উনি পেঙ্গুইন বুকস ও ডঃ সঞ্জয় বসুর নামে কেস ঠোকেন। যদি সেটা না হত তবে দ্য লাস্কার অ্যাওয়ার্ডটা অন্তত এতদিনে ডঃ বসু পেয়ে যেতেন। কিন্তু কৌশিক ওঁকে বাঁশ দিয়ে সব ভেস্তে দ্যান। উপরন্তু এটা একটা ইন্টারন্যাশনাল স্ক্যান্ডালও হয়ে যায়। ডঃ কৌশিক এতদিনে ডঃ সঞ্জয় বসুকে চোর প্রমাণ করেই দিতেন এবং বিরাট খেসারত আদায় করতেন যদি না সঠিক সময়ে ওঁর ওই মারাত্মক কার্ডিয়াক অ্যারেস্টটা হত!”

“হো-য়া-ট!”

অধিরাজের বিস্ময়ের অন্ত নেই। ডাক্তাররা এমন কুকীর্তিও করতে পারে তা জেনিথের কেসটা ওপেন না হলে জানাই যেত না। এরা কারা। তার চোখে সংশয়ের মেঘ। ডঃ কৌশিকের অসুস্থতাটা মোটেই স্বাভাবিক নয়। যত কেস গভীরে যাচ্ছে, তত যেন কেচ্ছা কেলেঙ্কারির প্যান্ডোরার বাক্স খুলছে। রহস্যের পর রহস্য! সাসপেক্টের পর সাসপেক্ট…

“ডঃ বসুর কপালে এখনও অ্যাওয়ার্ডটা জোটেনি কারণ কৌশিক সুস্থ হওয়ার পরও কেসটা চালিয়ে যাচ্ছেন। যতক্ষণ না এর ফয়সালা হবে দ্য লাস্কার অ্যাওয়ার্ড ডঃ সঞ্জয় বসুর কপালে নেই! মাঝখান দিয়ে পেঙ্গুইন ফেঁসে গেছে!”

“এবার বুঝলাম কোন বেইমানির কথা ডঃ চক্রবর্তী রঞ্জনকে বলছিলেন। কিন্তু এরপরও ডঃ বসু কৌশিককে বাঁচান। কৌশিক এখনও ওঁর টিমে আছেন! হচ্ছেটা কী!” অধিরাজ বিড়বিড় করে, “এই প্যারাডক্সের শেষ কোথায়!”

আত্রেয়ী এর উত্তরে কিছু বলতেই যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই ওদের গাড়ি এসে পৌঁছেছে কৌশিক চক্রবর্তীর বাড়ির গেটে। কিন্তু…!

সামনে যে দৃশ্য দেখল ওরা তাতে যেন কয়েকমুহূর্তের জন্য প্রস্তরীভূতই হয়ে গেল সবাই! এ কী দেখছে! বাস্তব? না দুঃস্বপ্ন!

সামনের দিকে গেটের দুপাশের জোরালো আলো অন্ধকারের চাদর সরিয়ে দিয়েছে। তাতেই স্পষ্ট দেখা গেল যে গেটের সামনেই পড়ে রয়েছে দু-দুটো রক্তাক্ত দেহ! কৌশিকের মা টান-টান হয়ে পড়ে রয়েছেন। নিথর, নিস্পন্দ! তার কণ্ঠনালী থেকে নির্গত জমাট রক্তের ধারা গেটের সামনে লাল গালিচা বিছিয়ে দিয়েছে।

ঠিক তার পাশেই পড়ে আছেন স্বয়ং ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী! তাঁর পিঠ ভেসে যাচ্ছে তাজা রক্তে। শরীরে জীবনের কোনো স্পন্দন নেই…! নিথর… নির্জীব!

আচমকাই অধিরাজের মনে পড়ল কয়েকটা শান্ত বাক্য, “আপনার মনে হয় কৌশিক বেঁচে গেছে? …এখন বেঁচে আছে ঠিকই। তবে বেশিদিনের জন্য নয়। …কাল সুশান্ত যেখানে শুয়েছিল, ক-দিন পরে কৌশিকও সেখানেই শোবে! সবাইকেই ওখানেই শুতে হয় অফিসার…!”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *