৬
“আ…আপনি ঠি… ঠিক ধ… ধরেছিলেন ব…বস! সুহাসিনী মিত্র আদতে মি…মিত্রই নন!”
এক নামকরা ঝাঁ চকচকে শপিং মলের ফুডকোর্টে বসে অ্যাটম বম্বটা ফাটাল দৃষ্টি দত্ত, ওরফে মিস চাউমিন বন্ড! গত তিনদিন ধরে ওরা সবেগে রুটিন তদন্ত চালিয়েছে। পবিত্ৰ আচার্য ও আত্রেয়ী দত্ত ডঃ বসুর আগের হসপিটালের সমস্ত রেকর্ড জোগাড় করেছে। সেখানেও যথেষ্ট অস্বাভাবিক মৃত্যুর রেকর্ড বিদ্যমান। বেশ কিছু ছোটোখাটো বিস্ফোরণও হয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনো স্টেপ নিতে পারেনি ওরা। গোটাটাই এখনও সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে আছে।
অর্ণব লক্ষ করেছে অন্যান্য ইনফর্মারদের তুলনায় চাউমিনের প্রতি একটু বেশিই সদয় অধিরাজ। গুরু বা যাদবের সঙ্গে দেখা করার বা কথা বলার জন্য সাধারণ চায়ের গুমটি, রোডসাইড ধাবা কিংবা ব্যুরোর কেবিনই সে বেছে নেয়। কিন্তু দৃষ্টি যেন ওর কাছে একটু বেশিই স্নেহের পাত্রী। হয়তো তার বয়েস কম বলে, কিংবা লেডি ইনফর্মার হওয়ার দরুণ, সর্বোপরি শিক্ষিতা হওয়ার জন্যই বোধহয় এই খাতির। মিস চাউমিনের সঙ্গে মিটিংগুলো রীতিমতো বড়ো বড়ো হোটেলের লাউঞ্জে,। শপিং মলের ফুডকোর্টেই বেশি হয়ে থাকে। অন্যদের বেলায় ক্যাশে পেমেন্ট হয়, কিন্তু চাউমিনের কপালে সবসময়ই দামি গিফট নাচছে।
অধিরাজের এই স্নেহময় ব্যবহারের প্রভাব এখন আস্তে আস্তে অর্ণবের ওপরও পড়ছে। সে মেয়েটির সবকিছু পছন্দ করে না ঠিকই, কিন্তু মনের গভীর থেকে পুরোপুরি অপছন্দও করতে পারে না। বরং সে যখন একগাল দুষ্টুমিষ্টি হেসে চেঁচিয়ে বলে, “হেই ব্রো, ক্রিসমাস গিফট পাইয়া ফোন দাও নাই ক্যান? তোমারে দিমু একখান মাইর, তয় বোঝবা চাউমিন কী জিনিস!”
চাউমিন মাঝেমধ্যে অবিকল কাঠবাঙাল বুড়ি ঠাকুমার ডায়লগ ঝেড়ে থাকে। আর এটা শুধু মাত্র অর্ণবের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অধিরাজের সামনে সে দস্তুরমতো আধুনিকা ও স্মার্ট। সম্ভবত ঠাকুমার কাছ থেকেই এই ভাষাটা শিখেছে সে। সমস্যাটা তা নয়। আসল প্রবলেম ওর ক্রিসমাসের গিফট। হতচ্ছাড়া মেয়েটা গিফট হিসাবে একগাদা ভ্যাম্পায়ারের মতো লম্বা লম্বা, শেপ করা, নানারঙের আর্টিফিশিয়াল নখ অর্ণবকে পাঠিয়েছিল। নীচে চিরকুট, “এইগুলো কাজে লাগিও।”
একগাদা নানা কালারের আর্টিফিশিয়াল নখ পেয়ে অর্ণব কী করবে বুঝে পায়নি। সে খেপচুরিয়াস হয়ে চাউমিনকে ঝেড়ে উদ্ধার করে, “এই নখগুলো নিয়ে আমি কী করব? হাতে পরে বাহার দেখিয়ে বেড়াব? আমি কী মেয়ে?”
“না!” চাউমিনের সপ্রতিভ উত্তর, “মাইয়া তো নও। কিন্তু আজকাল টেনশনে যেরকম নখ চাবাইতে আছো তাতে মাত্র দশখান নখে চলবো না। একশোখান পাঠাইসি। আরামসে চাবাইও। শুধু বসের নখের দিকে নজর দেবা না!”
“মানেটা কী!” অর্ণব পারলে চাউমিনকে সোজা নরকের জ্বলন্ত তেলের ফ্যাক্টরিতেই পাঠিয়ে দেয়, “এর মধ্যে বসের নখ কোথা থেকে এল।”
“তোমারে বিশ্বাস নাই।” সে বলল, “ওনার হাতের খানা খাইয়া যা স্বাদ পাইস, কে কইতে পারে যে নখ চাবাইয়াও পাবা না? তুমি নিজের নখ চাবাও, আত্তুর নখও চাকাও –কিন্তু বসের আঙুল আর নখ যেন সলামত থাকে।”
‘আত্তু’ তথা আত্রেয়ী দত্ত। বার্নিং শিখ কেসে আলাপ না হলেও পরে আত্রেয়ীর সঙ্গে চাউমিনের মোলাকাত করিয়ে দিয়েছে স্বয়ং অধিরাজ। বলাই বাহুল্য মিস দত্তের প্রাণপ্রিয় সখী হয়ে উঠতে একটুও সময় লাগেনি ওর। এখন ও আত্রেয়ীর নিজস্ব কেসগুলোতেও কাজ করে। মিস দত্ত ওর প্রশংসায় পঞ্চমুখ, আর আহ্লাদ দিয়ে দিয়ে মাথায়ও তুলেছে। তার দেওয়া মজাদার আদুরে ‘আত্ত্ব’ ডাকটাও নির্বিবাদে মেনে নিয়েছে আত্রেয়ী। দু-জনেই রীতিমতো জমিয়ে নিয়েছে।
“বসের নখ তো বুঝলাম।” অর্ণব বম্বাস্টিক আইসাইড দেয়, “কিন্তু মিস দত্ত এর মধ্যে আসছেন কোথা থেকে হাবুলের পিসিমা?”
“কারণ আত্তুর স্পেশাল চায়ের হাতও দারুণ কী না।” চাউমিন সিন্সিং এর দিকে তাকিয়ে চোখ পিটপিটায়, “কোনো দিন নখও স্পেশাল হইব কে জানে।”
বেজায় রাগতে গিয়েও শেষপর্যন্ত ঝরঝরিয়ে হেসেই ফেলল অর্ণব। ওর মাথার চুল সস্নেহে ঘেঁটে দিয়ে বলল, “আচ্ছা, গিফটের বদলে আশীর্বাদ করলাম যাতে তুই আরও কয়েকগুণ হারে আছাড় খেতে পারিস।”
“তার লগে আটু জুইড়া দাও” সে স্বপ্নালু ভঙ্গিতে বলে, “আছাড় যেখানেই খাই, ল্যান্ড য্যান বসের কোলেই করি।”
অর্ণবের এবার ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে। এখন ক্রিমিনাল, ফরেনসিক এক্সপার্ট, অফিসারের পর ইনফর্মারও স্যারের ওপর ক্রাশ খেতে শুরু করেছে। লোকটার বাধানো কপাল বটে! ওঁর জন্য একটা এভিল আইস ব্রেসলেট কিনতেই হচ্ছে!
তবু সে একটুও কিপটেমি না করে ফিচেল হেসে বলে, “তথাস্তু।”
হাই ক্লাস মলের ফুডকোর্টে পা রাখতেই যেন মনে হয় অন্য একটা উজ্জ্বল জগতের দ্বার খুলে গেল। পুরো জায়গাটা এতটাই খোলামেলা আর আলোয় ভরা যে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। সাদা-কালো জ্যামিতিক প্যাটার্নের মসৃণ মার্বেলের ফ্লোরে প্রতিফলিত হচ্ছে সিলিং-এর নানারকম আলো। কোনোটা গাঢ় সোনালি, কোনোটা আবার নীলাভ সাদা। মাথার ওপরে উঁচু ছাত থেকে লম্বা লম্বা ধাতব চেইনে ঝুলছে আধুনিক পেন্ডেন্ট লাইট। কোথাও স্ফটিকের মতো ঝিলমিল করছে, কোথাও যেন মেঘের আকারে নরম আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে।
অর্ণব সুগন্ধে ফুসফুস ভরে নেয়। চতুর্দিকে সারি সারি খাবারের কাউন্টার। তবে প্রতিটা আলাদা থিমে সাজানো। প্রতিটি কাউন্টারের ওপরে বড়ো ডিজিটাল স্ক্রিনে খাবারের ছবি একের পর এক বদলাচ্ছে। গরম ধোঁয়া ওঠা চিকেন স্যুপ বোল, সোনালি তেলে ভাজা চিকেন উইংস, ক্রিমে ঢাকা স্ট্রবেরি কেক, চিজে ভরা বার্গার থেকে শুরু করে ছোলে-বাটোরা, বড়া পাও, দোসা সবই রয়েছে।
“খাবারের গন্ধে পেটে উইপোকা দৌড়চ্ছে ব…ব…স!” চাউমিন হ্যাংলার মতো সুখাদ্যের ঘ্রাণ নেয়, “আগে পেটপুজো করে নিই?”
“শিওর সেনোরিটা।”
অধিরাজ তার সম্মানে একটা চেয়ার টেনে দিয়েছে, “প্লিজ, বি কমফোর্টেবল। কী খাবেন বলবেন কাইন্ডলি? কারণ এখানে সেল্ফ সার্ভিস।”
চাউমিন অসন্তোষ প্রকাশ করে, “তাহলে আজাইরা বদমাশগুলো সার্ভিস ট্যাক্স নেয় কোন্ মুখে?”
সে পেলব হাসল, “ওদের অজস্র মুখে রুটির টুকরো ফেলতে হয় যে। আপনি বসুন সেনোরিটা, আমরাই বরং খাবার নিয়ে আসছি।”
“ন…না। চলুন, আমিও যা… যা… যাচ্ছি।”
অর্ণব মনে মনে প্রমাদ গোণে। চাউমিনের খাওয়ার বহর সে স্বচক্ষে দেখেছে। অত খাবার টেনে আনা তার কৰ্ম্ম নয়। সঙ্গে হারকিউলিসকেও লাগবে। তবে অধিরাজ বাধা দিল না। সে মুচকি হাসছে, “অ্যাজ ইউ উইশ। আসুন…।”
চাউমিন তার পেছন পেছন যাচ্ছিল। অধিরাজ তাকে এগিয়ে দিয়ে বলে, “আফটার ইউ…।”
ফুডকোর্টের বাতাসে ভেসে আসছে ভিন্ন ভিন্ন লোভনীয় সুবাস। কোথাও চাইনিজের গন্ধ, কোথাও মশলাদার বিরিয়ানির ঘ্রাণ, কোথাও বা কষা মাংসের সৌরভ। একে অপরের সঙ্গে মিশে এই গন্ধগুলো এমন এক তীব্র লোভ তৈরি করে, যা মানুষের পাকস্থলীকে উত্তেজিত করবেই।
ফুডকোর্টের মাঝামাঝি অংশে একটি ছোট্ট ডেকোরেটিভ ওয়াটারফল কলকলিয়ে বয়ে যাচ্ছিল। কালো পাথরের দেওয়াল বেয়ে নরম স্রোতে জল নেমে আসছে। আর পাদদেশের বেসিনে ফোয়ারার জল আলোয় ঝিলমিল করছে। জলের শব্দে একধরনের প্রশান্তি আছে, যা আশপাশের কোলাহলকেও স্বপ্নালু করে তোলে। ফোয়ারার মিঠে শব্দের সঙ্গে বাচ্চাদের হাসি, কাঁটাচামচের টুংটাং শব্দ, আর হালকা জ্যাজ মিউজিকের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে গ্রিলের সিজল, ব্রেন্ডারের গর্জন, এক্সপ্রেসো মেশিনের ফোঁসফোঁস। সব মিলিয়ে খাদ্যপ্রেমিকদের স্বর্গ।
কাউন্টারে পৌঁছে অর্ণবের আশঙ্কাকে সত্যি করে দিয়ে চাউমিন একেবারে চাইনিজ থেকে বাঙালির রাধাবল্লভী অবধি সব গড়গড়িয়ে অর্ডার করে গেল। কাউন্টারের লোকগুলো বোধহয় অবাক হয়ে ভাবছিল যে প্রায় পঞ্চাশ-ষাট জন লোকের এই ক্ষুদ্র ভিড়টি ঠিক কোথায়। আর অর্ণব ভাবছিল, ওই ব্ল্যাকহোলের মতো পেটে এত কিছু আঁটলে হয়। যদি বা পেটে আঁটে, প্লেটে আঁটবে কী না সন্দেহ।
বলাই বাহুল্য বেশিরভাগ প্লেটই অধিরাজের ঘাড়ে চাপল। কিছু অর্ণবেরও হাত ভরিয়েছে। বাকিগুলো নিয়ে চাউমিন কয়েক পা হেঁটেই ফের নড়বড় করতে করতে স্লিপ কেটে সাইড ডিশ হিসেবে মোক্ষম একটা আছাড় খেতেই যাচ্ছিল। আর একটু হলেই হাতের খাবার মাটিতেই আছড়ে পড়ত। সবাই ভয়ের চোটে ‘গেল গেল’ করলেও শেষপর্যন্ত অবশ্য গেল না। অধিরাজের সবল বাহু ফের তাকে সামলে নিয়েছে। সে কোনোমতে বলল, “থ্যাঙ্কস বস….।”
অর্ণব আপনমনে বিড়বিড় করে, “হাঁটার সময়ে যদি বসের দিকেই তাকিয়ে থাকে তবে আমার আশীর্বাদ প্রত্যেকবারই ফলবে দেখছি।”
খাওয়া শুরু করেই খাবারের সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য খবরও দিতে শুরু করে লেডি ইনফর্মার। সে জানায়, “ব… বস, ডঃ সুহাসিনী মিত্রর রেকর্ড মোটেই সুবিধার নয়। ভদ্রমহিলাকে বাইরে থেকে যতটা সুইট দেখতে লাগে, ভেতর থেকে ঠিক ত…ত… ততটাই রি…রি…।”
“মাদমোয়াজেল।” অধিরাজ আস্তে আস্তে বলে, “প্লিজ লোক্যাল ট্রেনের টিকিট ছেড়ে এক্সপ্রেসের সিট কনফার্ম করুন। ‘দুরন্ত’ হলে চলবে। কিন্তু সর্বত্র ব্রেক দেবেন না।”
চাউমিন একটু হেসে এবার বুঝিয়ে বলে, “ইয়েস স্যার, আপনার সুহাসিনী মিত্র আসলে ডঃ সুহাসী বিশ্বাস। কয়েক বছর আগে এফিডেবিট করে নাম পালটেছেন। ইনি দেখতে সুন্দর হলেও ভয়াবহ রাগী। এর আগে দিল্লির একটা নামজাদা হসপিটালে বড়োসড়ো কাণ্ড করে কেস খেয়েছিলেন। কলকাতায় আর একটু হলেই শ্রীঘরেও যাচ্ছিলেন। কিন্তু প্রমাণের অভাবে ফাঁড়াটা ওঁর লাইসেন্সের ওপর দিয়েই গেছে।”
“কিউরিঅসার অ্যান্ড কিউরিঅ সার।” অধিরাজ বাটার নানের টুকরো ডাল মাখানিতে চুবিয়ে মুখে ফেলল, “কেসটা কী ছিল?”
‘এইজন্যই বলছিলাম যে মহিলা অসম্ভব রিভেঞ্জফুল। দেখলে বোঝা যায় না। কিন্তু আসলে ব্ল্যাক মাম…..মা … মাম…!”
“ব্ল্যাক মাম্বা।”
তার কথাটা সম্পূর্ণ করে দেয় অধিরাজ। সে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ায়, “পুরো এক ছোবলেই ছবি কেস। দিল্লিতে এক বয়স্ক প্যানক্রিয়াটাইটিসের মহিলা পেশেন্ট হাসপাতালের তেল ঝাল ছাড়া খাবার খেয়ে বোর হয়ে গিয়ে বেজায় ঝামেলা করছিলেন। ডঃ বিশ্বাস তাঁর ওপর খেপে গিয়ে ডিনারে তাঁকে ডাবল এগ ইয়ক আর রোস্টেড রেড মিট প্রেসক্রাইব করে দিয়েছিলেন।” দৃষ্টির মুখ ব্যাজায়, “খাবার পড়ল এখানে, আর খবর হল শ্মশানে। কী… কী… কী…..।”
“কিন্তু?”
“কিন্তু তখনও উনি জেলে যাননি। সুন্দরী হওয়ার দরুণ খোদ ভিসিকেই এইসান ম্যানিপুলেট করেছিলেন যে ভদ্ৰলোক পুরোটাই ধামাচাপা দিয়ে দেন। দিল্লিতে ছাড় পেলেও অবশ্য কলকাতায় শেষরক্ষা হয়নি।”
অধিরাজ সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সে একটা কেসের আশা করেছিল। কিন্তু এখানে তো কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরোচ্ছে!
“এরপর তিনি কলকাতার একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে ঢোকেন। সেখানে তাঁর আন্ডারে চারটে কেস ঠুকেছিল পেশেন্ট পাটি। তার মধ্যে একটা সল্ট পয়জনিং কেস এখনও চলছে। আর একটা ট্র্যাজিক কেসের জন্যই ওঁর লাইসেন্স গেছে।”
“ট্র্যাজিক?”
“হ্যাঁ ব… ব…।”
পাশ থেকে অর্ণব বলে দেয়, “বস।”
“হ্যাঁ বস। সত্যিই ট্র্যাজিক।” চাউমিন বুঝিয়ে বলে, “একজন ইনফ্যান্টের হাই ওবেসিটির প্রবলেম ছিল। আপনার ডঃ মিত্র, ওরফে ডঃ বিশ্বাস তার মা-কে বাচ্চার ফুড ইনটেক একদম কমিয়ে দিতে বলেছিলেন। বাচ্চাটার মায়ের সেটা পছন্দ হয়নি। উনি সোজা হসপিটাল অথরিটির কাছে কমপ্লেইন করেন যে ডঃ বিশ্বাসের প্রেসক্রিপশন ফলো করলে ওঁর বাচ্চার স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে। হসপিটাল অথরিটিও তেমন। ওঁরা ডঃ বিশ্বাসকেই ব্যাপারটা মিটমাট করে নিতে বলেন। ভদ্রমহিলা কোনো কথা না বাড়িয়ে সাপ্লিমেন্ট হিসাবে ভিটামিন বিও প্রেসক্রাইব করেন।”
“তাতে কী?”
অধিরাজ অবাক, “ভিটামিন বি তো বিষ নয় সেনোরিটা!”
“ভিটামিন বি বিষ নয়, বরং হেলদি মেটাবলিজমের জন্য ওটা দেওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু ডঃ বিশ্বাস ভিটামিন বি তো দিয়েছিলেন, কিন্তু সাধারণ ভিটামিন বি নয়। উনি ভিটামিন বি এর পাশে খুব সতর্কভাবে ডাক্তারদের পেটেন্ট আঁকাবাঁকা অক্ষরে একটা ওয়ানও বসিয়েছিলেন। সাধারণ লোক সেটা বুঝবে না। কিন্তু কেমিস্টরা বুঝেছিল যে ওটা ভিটামিন বি ওয়ান বা থায়ামিন। ওরা ওটাই দিয়েছিল। আর ছোট্ট বাচ্চার মাও ভিটামিন বি ভেবে ডঃ বিশ্বাসকে বিশ্বাস করেই খাইয়েছিলেন। ফলস্বরূপ ওই ছোট বাচ্চাটা অকালেই মরল!”
অধিরাজ বেকড স্যামন চিবোতে চিবোতে আফসোসে মাথা নাড়ে। ব্যাপারটা সে বুঝতে পেরেছে। যদিও বিষয়টি এতটাই সূক্ষ্ম যে ধরা মুশকিল। জেনারেল ভিটামিন বি নিঃসন্দেহে হেলদি মেটাবলিজম দেয়। কিন্তু যখনই সেটা ভিটামিন বি ওয়ান বা থায়ামিন হয় –তখনই সেটা ওবেসিটিকে কয়েকগুণ প্রোমোট করতে শুরু করে দেয়। সন্তানের জননী সমস্ত শুভাকাঙ্খা নিয়ে যে ওষুধটি খাওয়াচ্ছিলেন, সেটি ওবেসিটি কন্ট্রোল করে না, উলটে পেশেন্টের খিদে বা খাওয়ার ইচ্ছে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। একটি শিশু যদি সর্বক্ষণ খিদের তাড়নায় কাঁদে তবে মা কী করে তাকে প্রাণে ধরে অভুক্ত রাখতে পারেন। আর থায়ামিন সেই ইনফ্যান্টকে এতটাই আগ্রাসী ক্ষুধার শিকার করেছিল যে ওবেসিটি কমার বদলে বাড়তে বাড়তে হয় শিশুর হৃৎস্পন্দন চিরদিনের জন্য স্তব্ধ করে দিয়েছিল অথবা কিডনিকেই…।
অধিরাজের ঠোঁটে হালকা একটা ব্যঙ্গনাপা হাসি ফুটল, বিষয়টা তার কাছে ভায়ের। আবার কৌতূহলেরও বাট।
“খাবার! মেটাবলিজম! ফুড।”
সে ধীরে ধীরে আঙুলে ধরা কফির কাপটা বোরাতে ঘোরাতে বলল, “ইউ নো, অর্ণব, এটা মানুষের সবচেয়ে সহজ বিশ্বাসের জায়গা। কেউ খাবার দিলে, আমরা প্রথমেই ভাবি; এটা আমাদের জন্য ভালো, পেট ভরবে, স্বাদে মনও ভরাবে। কিন্তু ঠিক এই বিশ্বাসটাই অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। আর ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারলে, দিস ইজ আ ফ্যান্টাস্টিক মার্ডার ওয়েপন!”
অর্ণবের গা শিরশির করে ওঠে। সে চাউমিনের প্লেটটা যেন সভয়ে একটু সরিয়ে রাখল। অধিরাজের চোখে তখন একধরনের শিকারির ধৈর্য।
“তুমি যদি জানো কোন্ খাবারে কার অ্যালার্জি আছে, বা কোন্ উপাদান ধীরে ধীরে শরীরে বিষক্রিয়া ঘটায়, তবে সেটা এতটাই নিখুঁতভাবে ইউজ করা যায় যে কেউ ধরতেই পারবে না। আর সবচেয়ে মারাত্মক ব্যাপার, খাওয়ার আনন্দের মাঝেই মৃত্যু এসে যাবে। মানুষ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বুঝতেও পারবে না; আসলে খুন হয়ে যাচ্ছে সে। হোয়াট আ মাস্টারপ্ল্যান!”
“স্যার!”
সে কফির এক চুমুক খেল, “বন্দুক, ছুরি, এগুলো তো চিৎকার করে বলে দেয়, ‘আমি মারতে এসেছি।’ কিন্তু খাবার? এটা তো আমন্ত্রণ জানায়। তাই খাবারই সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে নীরব মার্ডার ওয়েপন। প্রব্যাবলি মোস্ট ডেঞ্জারাস!”
অর্ণব অর্ধভুক্ত প্লেটের দিকে তাকায় না। সে জানে, এটা খুনই। কিন্তু এত সূক্ষ্ম খুন যে সহজে ধরা পড়ে না! অর্ণব অস্ফুটে বলে, “শি ইজ অলসো আ ডক্টর ডেথ।”
“ভীষণ ক্রুয়েন্স ডঃ ডেথ ব্রো!” চাউমিন বলল, “আমি গত তিনদিন ওঁকে স্টক করছিলাম। তার মধ্যে লাস্ট দিন উনি দেখি চোরের মতো মুখ ঢেকে কোর্টে যাচ্ছেন। আমিও ম্যানেজ করে পেছন পেছন গেলাম। অল্পবিস্তর খসিয়ে গোটা শুনানিও শুনে এলাম। এটা অবশ্য অন্য কেস ছিল। কিন্তু পাবলিক প্রসিকিউটরই ইনফ্যান্ট কিলিং-এর কেসটার রেফারেন্স দেন আর ফাইল সাবমিট করেন।”
“কেসের রেফারেন্সগুলো আপনার কাছে আছে?” অধিরাজ চিন্তিতভাবে মাথা নাড়ে, “বাকিটা আমরা বের করে নেব। রেফারেন্সও হয়তো বের করা যাবে। কিন্তু ডঃ বিশ্বাস বিশ্বাসযোগ্য নন, ডঃ মিত্রও মিত্রপক্ষে নেই। তাই চুপচাপ ফুলে ছাপ দেওয়াই ভালো। নয়তো এ-পাখি উড়বে। যে নিজের ডিগ্রি, পরিচয় সব পালটে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারে, খুনের প্রমাণই রাখে না, সে আমাদের স্ট্যাটেজিকে মাতও দিতে পারে।”
চাউমিন ফিশ ওরলি চিবোতে চিবোতে একটা চিরকুট অধিরাজের সামনে রাখে, “সমস্ত কেস নম্বর, ফাইল নম্বর আর রেফারেন্স এখানে আছে। কোর্টচত্ত্বরে শিঙাড়া আর হাজারখানেক টাকায় সব পাওয়া যায় ব… ব… ব-স।”
অধিরাজ মৃদু হাসল। সে নির্বিবাদে চিরকুটটা পকেটে গুঁজেছে, “বাই দ্য ওয়ে, শপিং করতে হলে আমাদের জন্য থার্ড ফ্লোর বেস্ট। ওখানে শুনেছি প্রচুর ট্রেন্ডিং ড্রেস আর দারুণ জুয়েলারি পাওয়া যায়। আর বওয়ার জন্য তো আমি আছিই।”
চাউমিন একগাল হেসে বলল, “থ্যা… থ্যা….থ্যা… থ্যা….।”
“থ্যাংক ইউ বস।”
অর্ণব নুডলসের প্লেট ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। খাদ্যে আর তার রুচি নেই। সে ভ্রুভঙ্গি করে চাউমিনের দিকে তাকায়, “আমিই বলে দিলাম। নয়তো তোর কাঠগুদাম ওখানেই আটকে থাকবে।”
চাউমিন হাসে। কিন্তু অধিরাজের কপালে চিন্তার গভীর ভাঁজ। একজন ডঃ ডেথকে ওরা এক্সপেক্ট করেছিল। তার বদলে তো দু-জন আমদানি হলেন।
কে জানে আর কতজন দাবিদার আসবেন!
