২২
“কৌশিক এমন ছিল না অফিসার। হি ওয়াজ আ ব্রিলিয়ান্ট ডক্টর। ওঁর মতো প্রতিভা খুব কম ডাক্তারের মধ্যেই দেখেছি আমি। আজকালকার ডাক্তাররা রোগ ডায়াগনোসিস করার জন্য হাজারটা টেস্ট করায়। ও তা করাত না। শুধু সিম্পটম শুনে আর পেশেন্টকে চেক করেই বলে দিতে পারত যে তার কী হয়েছে। শুধু শিওর হয়ে নেওয়ার জন্য খুব সামান্যই টেস্ট লিখত। তবে টেস্ট রেজাল্ট দেখার আগেই প্রত্যেকবারই একদম সঠিক ওষুধ প্রেসক্রাইব করেছে। এখনকার প্রজন্মের মধ্যে এরকম প্রতিভা দেখা যায় না।”
বলতে বলতেই চুপ করে গেলেন ডঃ সঞ্জয় বসু। ফোনের ও-প্রান্তে নিস্তব্ধতা। অধিরাজ কানের ব্লু-টুথ ইয়ারপিসটাকে সামান্য চেপে দিয়ে বলল, “এই প্রতিভা বোধহয় উনি উত্তরাধিকার সূত্রেই পেয়েছিলেন। আপনার প্রেসক্রিপশনেও আমি অন্তত গাদা গাদা টেস্ট দেখতে পাইনি।”
ডঃ বসু তখনও নীরব। অধিরাজ তাঁকে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয় সময়টুকু দেয়। তার গাড়ি এখন বাড়ির ঠিকানায় ছুটছে। রেস্টোর্যান্টে ডিনার করার পর সবার ঘরে ফেরার ঠিকঠাক ব্যবস্থা করে এখন সে নিজের বাড়িতে ফিরছে। ডঃ চ্যাটার্জি এই ডিনারে আসতে পারেননি। হোমিসাইডের অন্যান্য কেসের চাপে ল্যাবেই আটকে গিয়েছেন। আইভি-র বাড়িতে আজ আবার কী যেন অনুষ্ঠান আছে। তাই পবিত্র আর অর্ণব দু-জনেরই খাবার প্যাকেট করে পৌঁছে দিতে গিয়েছে। ডঃ চ্যাটার্জির খাবার পার্সেল করাতে করাতে অর্ণব বলছিল, “স্যার, এটা যদি আজ ফরেনসিক ল্যাবে না পৌঁছোয় তবে দুর্বাসার ব্রহ্মশাপে আমাদের সবার পেট খারাপ হবে।”
অধিরাজ আলতো চোখ টেপে, “রিস্ক নিয়ে কাজ নেই ডার্লিং। বড়ো খতরনাক দেবতা। ওঁকে ভোগ না দিলে তুমি-আমি সবাই মায়ের ভোগে যাব। তাই দিয়েই এস।”
“ওকে স্যার।”
অর্ণব আর পবিত্র কথা না বাড়িয়ে ডঃ চ্যাটার্জি আর আইভিকে ডিনারের প্যাকেট দিতে চলে যায়। মিস বোসও টুইঙ্কলকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির দিকে ফিরল। আর আত্রেয়ী এবং আহেলি চাউমিনের দুষ্টুমি আর ফাজলামি উপভোগ করতে করতে রওনা হল। তবে আজ মেয়েদের একা ছাড়েনি সে। দুটো গাড়িতেই হোমিসাইডের বিশ্বস্ত ড্রাইভারদের মোতায়েন করেছে অধিরাজ। আত্রেয়ী আর কৌশানী প্রথমে আপত্তি করেছিল,
“স্যার এসবের কী দরকার ছিল? উই আর কপস। আমরা নিজেদের প্রোটেক্ট করতে খুব ভালোভাবেই জানি। আমাদের সেফটি নিয়ে আপনাকে একটুও ভাবতে হবে না।”
“অফকোর্স সেনোরিটাজ।”
দীর্ঘদেহটাকে নম্রভঙ্গিতে ঝুঁকিয়ে ‘বাও’ করে বলল সে, “অলরেডি রাত হয়ে গেছে। আপনারা কপ তো বটেই। আর নিজেদের রক্ষা করতেও ডেফিনিটলি জানেন। আপনাদের ক্ষমতার ওপর আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে। বিলিভ মি, আপনাদের নিয়ে চিন্তা নেই। কিন্তু ওই যে…ওই বেচারাদের কথা একবার ভাবুন। আপনাদের সেফটি নিয়ে একটুও ভাবছি না। বাট, ওদের সেফটি নিয়ে তো ভাবতেই হবে। তাই না?”
বলতে বলতেই সে হোমিসাইডের গাঁট্টাগোট্টা মুষকো ড্রাইভারদের দিকে ইশারা করেছে, “এখন বেশ রাত হয়েছে। আর ও বেচারিরাও খুব হ্যান্ডসাম। রাস্তায় যদি মাতাল মেয়েরা টিজ করে? মলেস্ট করতে চায়? কিংবা কোনো চোর ডাকাতের দল আক্রমণ করে তবে ওদের কী হবে? আপনারা পুলিস। ওদের প্রোটেক্ট করা তো আপনাদেরও ডিউটি।”
এবার সে একটু নীচুস্বরে জানায়, “একজনের তো আবার ভূতের ভয়ও আছে। আপনারা ওকে প্রোটেকশন না দিলে বেচারা এত রাতে শুনশান রাস্তা দিয়ে ফিরবে কী করে বলুন তো!”
বলতে বলতেই অধিরাজ গলা চড়িয়ে দুই ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে বলল, “ডোন্ট ওরি সেনরস। ওঁরা একদম আপনাদের পাহারা দিয়ে নিয়ে যাবেন। কোনো ভূত, টিজার, মাতাল, রেপিস্ট বা চোর ডাকাত তাড়া করলে তাকে কীভাবে হ্যান্ডল করতে হয় তা সেনোরিটারা প্রত্যেকেই জানেন। একদম ভয় পাবেন না। ইউ আর ইন সেফ হ্যান্ডস।”
ড্রাইভার দু-জন প্রথমে একটু ঘাবড়ে গিয়ে পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করে। ওরা দু-জনেই রাতে গাড়ি চালিয়ে অভ্যস্ত। এমনকি মিড নাইট রেইড বা এনকাউন্টারেও নিয়মিত যায়। তাই কথাগুলো বুঝতে একটু সময় লাগল। তারপর ইঙ্গিতটা ধরতে পেরে একজন বলল, “হ্যাঁ স্যার। ভাবছিলাম এত রাতে বাড়ি কী করে ফিরব! এখন যখন ম্যাডামরা সঙ্গে যাবেন তখন নিশ্চিন্তেই ফিরতে পারব। বউ বাচ্চা অপেক্ষা করছে নির্ঘাৎ। ওরাও চিন্তায় আছে।”
অধিরাজ মৃদু হেসে এবার গাড়ির দরজা খুলে দেয়, “প্লিজ অ্যাবোর্ড।”
আত্রেয়ী, কৌশানী আর আহেলির বুঝতে বাকি রইল না যে আসলে ব্যাপারটা কী ঘটল। চাউমিন আর টুইঙ্কল অত মাথাই ঘামায়নি। তারা পেটপুজো করে বেজায় সন্তুষ্ট। এখন বিছানায় বডি ফেলতে পারলেই বাঁচে।
কৌশানী মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল অধিরাজের দিকে। এইজন্যই এই মানুষটাই তার স্বপ্নের পুরুষ হয়ে বসে আছে। তার দোষ, গুণ সবটাই বড়ো লোভনীয়। আত্রেয়ী কোনোমতে হাসি চেপে বলল, “ইয়েস স্যার। আমরা আমাদের ডিউটি নিশ্চয়ই করব। আপনি আপনার সেনরদের সেফটি নিয়ে একদম চিন্তা করবেন না। ওদের কেউ ছুঁতেও পারবে না।”
“ফ্যান্টাস্টিক মিস দত্ত। সো কাইভ অব ইউ।”
সবাইকে নিজের দায়িত্বে বাড়ির দিকে পাঠিয়ে অবশেষে নিজেও বাড়িমুখো হল অধিরাজ। অনেকদিন পর আজ তার মেজাজ আবার ফুরফুরে। একটু আগেই একপশলা বৃষ্টি হয়ে পরিবেশ একদম ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে লং ড্রাইভে যেতে খুব ভালো লাগে। কিন্তু সে সুযোগ আপাতত কপালে নেই। আবার কাল থেকে নতুন কেস ফাইল, নতুন রহস্য, নতুন দৌড় শুরু হয়ে যাবে।
গাড়ির জানলা দিয়ে বৃষ্টিমাখা ঠান্ডা হাওয়া হু হু করে ছুঁয়ে যাচ্ছিল তাকে। অধিরাজের চোখ ক্লান্তিতে বারবার ভারী হয়ে আসছিল। এই ডঃ ডেথ কেসটা কম ভোগায়নি। এখন মোটামুটি সব ঠিকঠাক হয়ে যাওয়ায় অনেকটাই নিশ্চিন্ত হয়েছে। ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার এদিকে সুশান্তর মার্ডারের চার্জে আটকা পড়লেও অন্যদিকে ইললিগ্যাল মেডিক্যাল ড্রাগ টেস্টিং, আর ড্রাগ র্যাকেটের সঙ্গে জড়িত থাকার দরুণ প্রণবেশ লাহিড়ীর তত্ত্বাবধানে আছেন। কার্লোসের সম্পর্কে বেশ কিছু অজানা তথ্যও জানা গিয়েছে। এখন ভালোয় ভালোয় এই ড্রাগমাফিয়াকে অফিসার লাহিড়ী ধরতে পারলেই পুলিস ও প্রশাসন গঙ্গাস্নান করবে।
সে ক্লান্তি আর ঘুম দূর করার জন্য গাড়ির মিউজিক সিস্টেমে গান চালাবে কী না ভাবছিল। ঠিক তখনই এই ফোনটা এল। নম্বরটা থানার। তবে ও-প্রান্ত থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার জানালেন যে ডঃ সঞ্জয় বসু ওর সঙ্গে কথা বলতে চান।
বলাই বাহুল্য, আপত্তি করেনি অধিরাজ। শুধু একটাই ভয় ছিল মনে। সঞ্জয় আবার দাবি না করে বসেন, “আমিই খুনী।” কিন্তু বাস্তবে তা ঘটল না। ডঃ বসু শুধু বললেন, “কৌশিক এমন ছিল না….!”
বেশ কিছুক্ষণ নীরবতা। অধিরাজের কথা শুনে এবার হাসলেন তিনি, “আপনার চোখে কিছুই এড়ায় না। হ্যাঁ, আমাদের দু-জনের মধ্যে প্রচুর মিল। কৌশিক আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো ব্লান্ডার ছিল। কিন্তু সবচেয়ে সুন্দর ভুলও। উর্মিলা এত ভালো মেয়ে ওকে যে ভালোবাসবে না, সে মানুষই নয়। ভালোবাসা যদি ভুল হয়, তবে আমিও ভুল করেছি। সেই ভুলের জন্য সুধা সরে গেল। উর্মিলার জীবনটা বরবাদ হয়ে গেল। আমি তো সারাজীবনে সুখীই হতে পারলাম না অফিসার। শুধু কৌশিক…। কিন্তু সে-ও যে এমন কাণ্ড করবে…।”
এইটুকু বলেই থেমে গেলেন তিনি। আস্তে আস্তে বললেন, “আমি তো আর বেরোতে পারব না। ডঃ শেঠিকে বলবেন যেন কৌশিককে যতটা সম্ভব আরামে রাখেন। ও বড়ো দুর্বল, বড়ো ভালনারেবল। আর বেশিদিন বিরক্ত করবে না কাউকে। একটু রিকোয়েস্ট করবেন, যাতে শেষ সময়ে বেশি যন্ত্রণা না পায়।”
ডঃ বসুর গলায় এই প্রথম একটা বাষ্পের আর্দ্রতা ধরা পড়ল, “কী জানি, যদি শেষমুহূর্তে আমাকে খোঁজে… আর তো ওর কেউ নেই।”
অধিরাজ শান্তস্বরেই বলল, “এটা আমি নিজেই দায়িত্ব নিয়ে দেখব ডঃ বসু। ওঁর অবস্থা যে মুহূর্তে ডিটোরিয়েট করবে, আমি ব্যবস্থা করব যাতে শেষমুহূর্তে উনি আপনাকে দেখে যেতে পারেন, আপনার স্নেহস্পর্শ নিয়েই শেষযাত্রা করতে পারেন।”
“থ্যাংকস।”
আবার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে কিছু শব্দ বুঝি হাতড়াচ্ছিলেন তিনি। আস্তে আস্তে বললেন, “যখন রোগটা ও নিজে বুঝতে পারল তখন ওর কান্না আমি কোনোদিন ভুলব না। এটাই হয়তো আমার পাপের শাস্তি ছিল…!”
“ডঃ চক্রবর্তী পুরোটা বোঝার পরও আপনার নামের কেসটা উইদড্র করলেন না কেন?”
অধিরাজের প্রশ্নের উত্তরে ক্লান্তভঙ্গিতে জানান তিনি, “কারণ আচমকা কেসটা তুলে নিলে সবাই সন্দেহ করত। ও নিজের কভার কিছুতেই সরাতে চায়নি। শুধু বলেছিল, ‘কেসটা আমার সঙ্গে এমনিই শেষ হয়ে যাবে বাবা। ততদিন আমার সঙ্গে যেভাবেই হোক, থাকো। আমায় লড়াই করতে করতেই মরতে দাও।’ কিন্তু সে লড়াই যে এদিকে টার্ন নেবে তা তখন বুঝিনি। যখন বুঝলাম, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। থামানোর চেষ্টাও করেছি… কিন্তু…..”
ফের থেমে গেলেন তিনি। বোধহয় আরও কিছু বক্তব্য আছে।
“আপনি যা করার করেছেন,” সে বলে, “অন্যায় করেছেন। ক্রাইমও করেছেন। কিন্তু একজন বাবার দিক থেকে দেখলে হয়তো এছাড়া আর রাস্তাও কিছু ছিল না। তবে ভুলে যাবেন না, আপনি আরও একজন মানুষের বাবা। তিনিও আপনাকে অত্যন্ত ভালোবাসেন।”
“আপনি রণজয়ের কথা বলছেন?” এবার সঞ্জয়ের গলায় অদ্ভুত শান্তি, “আপনি বোধহয় জানেন না, রণজয় ডঃ বিধান চন্দ্র রায় ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ডের জন্য নমিনেশন পেয়েছে। কৌশিকের জীবন শেষ হল, ওর শুরু হল, দ্যাটস লাইফ।” একটু থেমে যোগ করলেন, “ওর সঙ্গে দেখা হলে বলবেন, আই অ্যাম ভেরি প্রাউড অব হিম…!”
যাক, শেষপর্যন্ত রণজয়ের মিশন সাকসেসফুল। অধিরাজ তো ডায়াট ছিল যে নিজেকে প্রমাণ করার জন্য আবার দ্বিতীয় ডঃ ডেথ না এসে পড়ে। শেষ পর্যন্ত বিধান চন্দ্র রায়ের ওপর দিয়ে ফাঁড়াটা গিয়েছে।
“আপনি নিজের মুখে জানালে উনি বোধহয় বেশি খুশি হবেন।”
ডঃ বসু মৃদু হাসলেন। তারপর লাইনটা কেটে দিলেন। এই মানুষটাও বড়ো অদ্ভূত। বহুদিনের প্রাচীন নীরব বটগাছের মতো। আশ্রয়, ছায়া সবই আছে, কিন্তু মোটা মোটা ঝুরির জ্বালায় কিছু বোঝাই দায়!
অধিরাজের মন একটু ভারাক্রান্ত হয়েছিল। সে ততক্ষণে বাড়ির একদম কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে। তার অতি আপন আশ্রয়। বন্ধ গেটের সামনে এক-দুবার হর্ন বাজাতেই এক সিকিউরিটি গার্ড এসে দরজা খুলে দিল।
“থ্যাংকস মানব।”
সিকিউরিটি গার্ড, তথা মানব মৃদু হেসে মাথা ঝাঁকার। সে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে অধিরাজের কাছ থেকে গাড়ির চাবি নিয়ে নির্বিবাদে গাড়িটাকে গ্যারাজে ঢুকিয়ে দিতে গেল।
বাড়ির দরজা ভেতর থেকে লকড থাকলেও ডুপ্লিকেট চাবি অধিরাজের কাছেই থাকে। আজ সে আগেই ঘোষণা করেছিল যে বাইরে ডিনার করবে, তাই প্রিন্সেস আর পপসি যেন জেগে না বসে থাকেন। প্রিন্সেস, তথা তার মা আর পপসি, বা বাবা তাই আর অপেক্ষা করেননি। হিস্টোও শুয়ে পড়েছে। নয়তো যত রাতই হোক, দু-জনে ঠিক ভুতের মতো জেগে বসে থাকবেন ছেলের অপেক্ষায়। আর বাড়িতে এমন অবিচ্ছেদ্য নীরবতাও থাকে না। অধিরাজ উপস্থিত না থাকলেই দু-জনে মিলে টাইমপাসের জন্য ঠিক কিছু না কিছু ইস্যু নিয়ে ঝগড়া লাগিয়ে দেবেনই। সে ইস্যু প্রিন্সেসের কুমড়োপ্রীতিও হতে পারে, কিংবা পপসির বেসুরো গান। আজ তার প্রয়োজন পড়েনি। তাই চতুর্দিক শান্ত এবং চুপচাপ।
যাতে ওঁদের কারওর ঘুম ভেঙে না যায় তাই যথাসম্ভব নিঃশব্দেই সিঁড়ি বেয়ে নিজের ঘরে চলে এল অধিরাজ। সে যতই ঘরটাকে এলোমেলো করুক না কেন, প্রিন্সেস এসে ঠিক গুছিয়ে দিয়ে যাবেনই। সমস্যা একটাই। তারপর আর কিছুই খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবু মায়ের হাতের এই যত্নটা কিছুতেই মিস করতে নারাজ সে।
মনটা ডঃ বসুর ফোন পেয়ে সামান্য খারাপ হয়ে গিয়েছিল ঠিকই। কিন্তু বেডরুমের দেওয়ালে মা-বাবার ঝলমলে হাসিমুখের ছবি নিমেষেই ফের মন ভালো করে দিল। দু—জনেই অভিযোগ করছেন যে আজকাল আর আগের মতো তাঁদের সময় দেয় না সুপুত্রটি। সে পায়ের জুতো খুলে, একটা সিগারেট ধরিয়ে ভাবল, কাল না-হয় স্পেশাল ব্রেকফাস্ট বানিয়ে দু-জনকেই চমকে দেওয়া যাবে। জীবনের আজকাল কোনো ভরসা নেই। এই আছে, এই নেই। শুরু কখন আর শেষ কোথায় কেউ জানে না। তার মধ্যে যতটুকু স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা কুড়িয়ে নেওয়া যায়, ততই ভালো। নয়তো কখন একটা বিরাট ঢেউ এসে সব ভাসিয়ে নিয়ে যায় কে জানে। যেমন জানতেন না ডঃ বসু… যেমন জানতেন না ডঃ কৌশিক… ।
এইসব চিন্তা করতে করতেই যে কতটা সময় কেটে গিয়েছে তার হুঁশ ছিল না। সে শুধু ডঃ কৌশিক চক্রবর্তীর কথাই ভাবছিল না। মাঝেমধ্যে স্মৃতিতে বার্নিং শিখও উঁকি মেরে যাচ্ছিল। ওর ডায়েরিটা সম্প্রতি বই হিসাবে প্রকাশিত হয়েছে। আর প্রকাশ পাওয়া মাত্রই হটকেক। সবাই বার্নিং শিখকে জানতে চায়, বুঝতে চায়। ওই আর একটা আপাদমস্তক ট্র্যাজেডির উদাহরণ। জীবন কখন কোনদিকে মোড় নেবে কেউ জানে না…!
“আউচ!”
সিগারেটটা প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। অধিরাজ অন্যমনস্ক হয়ে সেদিকে লক্ষ্যই করেনি। এখন আলতো ছ্যাঁকা খেয়ে সম্বিত ফিরল। প্রায় সমাপ্ত সিগারেটে শেষ সুখটানটা মেরে অবশিষ্টাংশটাকে অ্যাশট্রেতে গুঁজে দেয় সে। বড্ড পরিশ্রম গিয়েছে এ কদিন। ক্লান্তিতে দেহ ভেঙে আসছে। এখন একটা শাওয়ার নেওয়া দরকার। কেস চলাকালীন এই নিভৃত আরামের অবসরটুকুও পাওয়া যায় না। শরীরটাও অতিরিক্ত পরিশ্রমে, উত্তেজনায় গরম হয়ে আছে। এখন ঘুমের আগে জলের আরামদায়ক স্পর্শ প্রয়োজন। ঠান্ডা জলই একমাত্র ধুয়ে ফেলতে পারে ভারাক্রান্ত মন আর দেহের সব ক্লান্তি।
তার বিছানার পাশেই স্টাডিটেবিলের ওপর একটা বড়ো থার্মোফ্লাস্কে বরফ ঠান্ডা জল আর তার পাশে কাচের গ্লাস রাখাই থাকে। হিস্টো জানে যে দাদাবাবুর আবার চিলড ওয়াটার ছাড়া পোষায় না। তাই সে থার্মোফ্লাস্কে জলে বরফ দিয়ে রেখে দেয়। অধিরাজের গলা তখন শুকিয়ে কাঠ। কোনো কথা না বাড়িয়ে সে নির্বিবাদে দ্রুত হাতে গ্লাস ভরে ঢকঢক করে পুরো জলটাই পান করে ফেলল। তারপর ধীরে সুস্থে ব্লেজারটা খুলে বিছানার ওপর আলতো করে ছুড়ে ফেলেছে। এই মুহূর্তে সে আর সি আই ডি হোমিসাইডের আই জি সাহেব নয়। তাই এটার প্রয়োজনীয়তা আপাতত নেই। প্রয়োজন নেই অফিসের ঘর্মাক্ত ধরাচূড়োরও। তাই শেষপর্যন্ত টাওয়েল আর বাথরোব নিয়েই ঢুকে গেল ওয়াশরুমে। দিনের শেষে সমস্ত ক্লান্তি-শ্রান্তি মুছে ফেলে নতুন এনার্জি ভরে নেওয়া জরুরি। নয়তো পরের দিনের লড়াইয়ের ইন্ধন পাবে কোথায়।
“আঃ!”
গায়ে উচ্ছ্বসিত শীতল জলবিন্দু ঝরে পড়তেই আরামে চোখ বুজল অধিরাজ। কী শাস্তি। জলের অবিরাম ধারাস্নানের প্রথম মুহূর্তগুলোতে এক অদ্ভূত আরামের ঢেউ। শিরায় ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে কুয়াশার মতো শীতল প্রশান্তি। তার পেশিগুলো শিথিল হয়ে এল, বুকের ভেতর শ্বাস যেন স্বাভাবিকের চেয়ে দীর্ঘ হয়ে ওঠে। সে অনুভব করল তার শরীর ভেসে যাচ্ছে এক আরামদায়ক উপলব্ধিতে। যেন হাল্কা মেঘ ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। মাথার ভেতরটা একদম হালকা। অনেকদিন পর বুঝি বুক ভরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে সে। চোখ আধখোলা, তন্দ্রার মতো এক নরম ঝাপসা আলো চারপাশে।
আজ চোখ ভেঙে ঘুম নামছে। তার টান-টান দেহের পেশিগুলো যেন আস্তে আস্তে শিথিল হচ্ছে শীতলতার স্পর্শে। এতক্ষণের উত্তেজনাও প্রশমিত হচ্ছিল আস্তে আস্তে….!
কিন্তু শাওয়ারের তলায় দাঁড়িয়েই আবার অদ্ভুত একটা অনুভূতি ঘিরে ধরল তাকে। আচমকা মাথাটা কেমন যেন টাল খেয়ে উঠল না। এ কী! সারা দেহ এমন ঝিমঝিম করছে কেন? হাত পা শিথিল হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ! কী হচ্ছে….কেনই বা…!
অধিরাজ সচকিত হয়ে ওঠে। আলো… এ কী আলোটার কী হল! একটু আগেও এখানে নরম আলো ছিল। এখন কেমন যেন তীব্র হয়ে উঠছে। বাথরুমের ঝলমলে সোনালি সাদা লাইটগুলো যেন ঝাঁকুনি দিয়ে উঠছে। প্রথমে লাইটটা কিছুক্ষণ ফ্লিক করল, তারপর সেটার চারপাশে রঙিন বলয়ের মতো আভা তৈরি হয়ে গিয়েছে নিমেষেই; সবুজ, নীল, লাল। আলোগুলো মিলে মিশে পাক খেতে খেতে তার দিকেই এগিয়ে আসছিল।
“ওঃ গ-ড! হোয়াটস গোয়িং অন।”
অধিরাজ চোখ ফিরিয়ে নেয়। এসব কী দেখছে! এমন তো হওয়ার কথাই নয়। অতিরিক্ত পরিশ্রমে কী চোখ, মাথা–সব গেল? সে সরাসরি এবার দেওয়ালের দিকে তাকায়। কিন্তু এ কী! দেওয়ালের রং কখন এমন বদলে গেল!… সাদা দেওয়াল ধীরে ধীরে লাল হয়ে উঠছে… যেন কারও রক্তে ভিজে আছে…। চোখে পড়ল দেওয়ালের গায়ে এগারোটা বুলেটের দাগ। হ্যাঁ, ভুল নয়। স্পষ্ট এগারোটা গর্ত। না…না। এসব সত্যি নয়…।
তার শ্বাস দ্রুত হয়ে ওঠে। কানে ভেসে এল এক অদ্ভুত ফিশফিশানি,
“তুমি আমার হাত থেকে বাঁচতে পারবে না… একবার পেছনে তাকাও… দ্যাখো, আমি ফিরে এসেছি… শুধু তোমার জন্য…!”
অধিরাজ কানে হাত চাপা দেয়। কিন্তু শব্দ থামল না। বরং আরও জোরে… আরও কাছে… ক্রমাগতই বাড়ছে…। মনে হচ্ছিল সে আওয়াজ তার মাথার ভেতর থেকে আসছে…মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষে ছড়িয়ে যাচ্ছে…।
“না… তুমি নও… তুমি নেই… আমি জানি…।”
ভয়ে বিড়বিড় করে বলল সে। সন্দেহে, আতঙ্কে তার ভুরু কুঁচকে যায়। এ তো স্বাভাবিক শৈথিল্য নয়।…মনে হচ্ছে তার গোটা দেহের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই।…যেন এ দেহটাই ওর নয়। মাথা ভারী হয়ে আসছে… পৃথিবী ঘুরছে… লাটুর মতো চরকিপাক দিচ্ছে…! সে প্রাণপণে ভাবার চেষ্টা করে… কোনোরকম ওষুধ খেয়েছে কী যাতে অ্যালার্জি আছে… অথবা এমন কিছু যা…!
তার মস্তিষ্কের ভেতরে যেন হঠাৎই বিদ্যুৎ চমকে ওঠে–জলটা।… জলের মধ্যে কিছু ছিল কি?… কিন্তু …।
“ওঃ।”
অধিরাজ টলেই পড়ে যাচ্ছিল। অতিকষ্টে বাথরুমের গ্র্যানাইট খচিত দেওয়ালে ভর দিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে। চোখের সামনে সব আবছা। তার মধ্যেও টের পেল, তার হাতদুটোও ঠিকঠাক কাজ করছে না… অসম্ভব ভারী… অবশ… ক্রমাগতই অসাড় হয়ে আসছে। মাসলগুলো যেন বিদ্রোহ করেছে…! তারা ভারী পাথরের মতো অনড় … ।
“প্যাংকরোনিয়াম।”
এত কিছু থাকতে এই নামটাই শেষে মনে পড়তে হল। অধিরাজের চোখের সামনে ঘন অন্ধকারের পর্দা নেমে আসছে। তবুও সে প্রাণপণে পারিপার্শ্বিকটা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করে। কোথাও কোনো ধারালো ধাতব বস্তু শান দেওয়ার শব্দ ভেসে আসছে কী?…কোনো … কোনো… সার্জিক্যাল স! কেউ নেই তো আশেপাশে…। সে সভয়ে বলে, “কে!”
বাথরুমের দেওয়ালগুলো ভেজা, যেন স্যাঁতস্যাঁতে কবর। হাত স্লিপ করছে। সে শুনতে পেল তার চারপাশে একটা হাড়সর্বস্ব পায়ের শব্দ প্রতিধ্বনি তুলছে—
“টক… টক… টক।
অধিরাজ আপ্রাণ নিজের সঙ্গেই যুদ্ধ করছে… এখান থেকে তাকে বেরোতেই হবে… নয়তো নিষ্কৃতি নেই।…এক শিকারী তখনও চক্কর লাগাচ্ছে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, বিধ্বস্ত শিকারের চারদিকে…। যেন খেলিয়ে খেলিয়ে মজা নিচ্ছে…।
“টক।…টক।…টক।”
আবার… আবার সেই পদধ্বনি। আচমকাই সব নৈঃশব্দ ছিঁড়ে খানখান করে দিয়ে তার কানের কাছে পৈশাচিক ভঙ্গিতে খলখল হেসে উঠেছে কোনো অদৃশ্য ছায়া।
“এইবার পেয়েছি।… কী ভেবেছিলে…? এত সহজে আমার হাত থেকে ছাড়া পাবে।…এত সহজে ছেড়ে দেব তোমাকে?”
অধিরাজ উম্মাদের মতো এদিক ওদিক তাকাল। যেন পরিত্রাণ পাওয়ার রাস্তা খুঁজছে। তার দৃষ্টিশক্তি ক্রমাগতই ক্ষীণ হয়ে আসে। … দরজাটা কই?…চতুর্দিকে শুধুই দেওয়াল… আলো কোথায়?… এত অন্ধকার কেন।… কত ছায়া এর মধ্যে নড়াচড়া করে চলেছে…এর মধ্যে কোথায় ওঁত পেতে আছে সেই যমদূত।…এগারোটা গুলি…এগারোটা বুলেটও তাকে থামাতে পারেনি।… আজও সেই দৈত্য রয়ে গিয়েছে অন্ধকারে…।…
“লি–ভ মি! আই সে-ই-ড লিভ মি অ্যা–লো–ন।” সে উন্মত্তের মতো চেঁচিয়ে ওঠে। বাথরোবটাও গায়ে জড়ানোর মতো অবস্থা বা পরিস্থিতি ছিল না। সময়ও নয়। আর একটু দেরি হলেই সে ওখানেই পড়ে যাবে! গায়ের জল মুছে নেওয়ার শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই। কোনোমতে টাওয়েলটাকে কোমরে জড়িয়ে পাগলের মতো অতিকষ্টে হাতড়ে হাতড়ে ওয়াশরুমের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে অধিরাজ। বিকৃত কণ্ঠস্বরটা তখনও হাসছে,
“পালাবে।…পালাও…দেখি কত শক্তি আছে…।”
সত্যিই পালাচ্ছিল সে। কিন্তু পালিয়ে যাওয়ার মতো বলও নেই। ক্রমাগত একটা ঘোরের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে… যেন কালো চোরাবালি একটু একটু করে গ্রাস করে নিচ্ছে। পা দুটো টলমল করছে… পড়ে যাবে… এখনই পড়ে যাবে… আর সেই ভয়াল আতঙ্ক তাকে ধরে ফেলবে…। সে কোনোমতে হাতড়ে বেড়াচ্ছিল একটা ঠিকানা….! একটা নিরাপদ আশ্রয় …!
যে গোটা শহরের ক্রিমিনালদের ভয় দেখায়, তারও ভয় আছে। যার নিরাপদ আশ্রয়ে, সতর্ক প্রহরায় শহর শান্তিতে ঘুমোয়, তারও আশ্রয়ের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু কোথায় সেই নিরাপত্তা… কোথায়?… কোথায়?
আচমকাই তার বেডরুমের একপাশের পর্দাটা নড়ে উঠল। বিদ্যুৎবেগে কে যেন বেরিয়ে আসে সেই পর্দার পেছন থেকে…।
ভয়ে হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল অধিরাজ। কোনোমতে ভারী, বেসামাল দেহটাকে টেনে হিচড়ে, কিছুটা এগিয়ে নিয়েই আর সামলাতে পারল না! অবশ, অসাড় দীর্ঘদেহটা সমস্ত শক্তি হারিয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়েই যাচ্ছিল। কোনোমতে সামনের ছায়াটার দিকে তাকিয়ে বলল, “কে!… কে তুমি?…অ্যাঁ।…ক্বেঃ। …”
বলতে বলতেই সে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। ঠিক তখনই দুটো নরম বাহুর বেষ্টনী চেপে ধরে তাকে। একটা পরিচিত সুগন্ধ এসে ঝাপ্টা মারল তার নাকে। অধিরাজ কিচ্ছু ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছিল না। তবু তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা অস্পষ্ট মুখ। সেই মুখ। বুঝি ঘ্যা বৃষ্টিস্নাত কাচের ওপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। সেই অস্তিত্ব। সেই অসম্ভব মমতাময় স্পর্শ। সেই গন্ধ! সেই নিরাপত্তায় ঘেরা বাছবেষ্টনী। এসেছে… সে এসেছে…।
অবিকল একটা ভয়ার্ত, অসহায় শিশুর মতোই সে অগ্রপশ্চাৎ চিন্তা না করেই দু-হাতে সবলে জড়িয়ে ধরেছে তার একমাত্র নিরাপত্তাময় আশ্রয়টিকে। তার বুকের ওপর আছড়ে পড়ে স্খলিত, নেশাজড়িত স্বরে ব্যাকুল কণ্ঠে বলল, “ও…আসছে। …তুমি…তুমি কোথায় চলে গিয়েছিলে? …বলেছিলে, ছেড়ে যাবে না…। ও…ও আসছে…! ও….!”
সময় তাকে অজান্তেই দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল অতীতের সেই বিপজ্জনক মোড়ে। নারীটি অপলকে তাকিয়ে থাকে অধিরাজের দিকে। এ কী আদৌ সি আই ডি হোমিসাইডের ব্রিলিয়ান্ট আই জি, অফিসার অধিরাজ ব্যানার্জি! এই মানুষটার মধ্যে আদৌ এত আবেগ, এত ব্যাকুলতাও ছিল। তার দু-চোখ নেশাগ্রস্ত, অর্ধনিমীলিত। অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে অন্ধের মতো কী যেন খুঁজছে। সারা দেহ জলে সিক্ত। দেহের প্রতিটা খাঁজে খাঁজে, ভাঁজে ভাঁজে অভ্রের মতো চিকচিক করছে বিন্দু বিন্দু জল! মাথার চুল, মুখ, নাক, ঠোঁট, চিবুক থেকে টপটপ করে চুঁইয়ে পড়ছে তাজা শীকরবিন্দু। যেন শিশিরে সদ্যস্নাত বন্য অর্কিড। দু-চোখের দৃষ্টি নেশাজড়িত, তবু দেবশিশুর মতো নিষ্পাপ, ভয়ার্ত!
সেই নারীকে চিনে নেওয়ার মতো অবস্থা ছিল না ওর। তবু তার কাঁধে মুখ রেখে জড়ানো কণ্ঠে বলল সে, “প্লিজ… স…সে—ভ মি… আমায়… ছেড়ে…. যেও…না।”
নারীটির চোখে বাষ্প জমেছে। সে তাকে সস্নেহে শক্ত বাহুপাশে কাছে টেনে নিয়ে বলে, “আমি তোমায় ছেড়ে কোথাও যাব না। কেউ তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। রিল্যাক্স।”
মমতা, ভালোবাসা আর নিখাদ প্রেমের শব্দগুলো বুঝি একইরকম হয়। অবিকল সেই একই শব্দ, একই বাক্য। তার রক্ষাকর্ত্রী এবার পূর্ণদৃষ্টিতে অধিরাজের দিকে তাকায়। হতচেতন পুরুষের নিঃশ্বাসের সুগন্ধ ঝামরে পড়ছে তার চুলে। উষ্ণ বলশালী হাত দুটো বন্যায় ভেসে যাওয়া মানুষের শেষ আশ্রয়, খড়কুটোর মতো আঁকড়ে ধরেছে তাকে। চোখ দুটো ঘোরগ্রস্ত আর বিপন্ন। জলে ভেজা স্খলিত ওষ্ঠাধর ঈসৎ প্রধাবিভক। থরথর করে কাঁপছে। বোধহয় কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারছে না। সবমিলিয়ে তার সৌন্দর্য অপ্রতিরোধ্য, চরম লোভনীয়।
নারীটির আর সহ্য হল না। এত কাছে তার চির-ইঙ্গিত মানুষ। তার দুই বাছতে স্বেচ্ছায় বন্দি হয়ে আছে, যা কল্পনাতীত। এমনভাবে তার দেহে জড়িয়েছে যেন মিশে যেতে চায়। একে কী প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব। কতবার স্বপ্নে বারবার নিজের করে নিতে চেয়েছে এই পুরুষকে। কিন্তু সে স্বপ্ন নিজে থেকেই ভেঙে গিয়েছে। মানুষটা আজ পর্যন্ত ধরা দেয়নি। অথচ তার এই অপার্থিব অলৌকিক নিষ্পাপ রূপ যে বড়োই অসহ্য। মানুষের সহ্যেরও সীমা আছে।
সে তাড়াহুড়ো করে না। আস্তে আস্তে তার নরম ঠোঁটজোড়া অধিরাজের ঠোঁটের ওপর ছুঁইয়েছে। অধিরাজ বাধা দিল না, আপত্তিও করল না। হয়তো বা কিছুই বুঝল না। সে স্থির। এবার নারীমূর্তি দ্বিধাহীনভাবে তার কোমল ওষ্ঠাধর আস্তে আস্তে ডুবিয়ে দেয় অধিরাজের সবল ঠোঁটে। দস্যুর মতো শুষে নিচ্ছে তার ওম। শুষে নিচ্ছে ঠোঁটের, চিবুকের, গ্রীবার জলবিন্দু। দুটো লতার মতো হাত আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে নিচ্ছিল তাকে। চুম্বন গভীর থেকে গভীরতর… আরও গভীরতর!…এর যেন কোনো আদি-অন্ত নেই। যেন বহুদিনের বুকফাটা তৃষ্ণা নিয়ে এক তৃষ্ণার্ত শেষপর্যন্ত ধুঁকে ধুঁকে মরার আগে খুঁজে পেয়েছে নির্মল জলের স্রোত!
নারীটি একমুহূর্তের জন্য থামল। তার উষ্ণ আঙুলের স্পর্শে অধিরাজের দেহে সামান্য কম্পন জাগছে। সে কিছু বলার চেষ্টা চালাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই নারীটি ফের ঠোঁট চেপে ধরল তার ঠোঁটে। একেবারে আগ্রাসী চুম্বন। নরম নয়, বরং দমবন্ধ করা। বহুদিনের আবেগ আর আকাঙ্ক্ষায় ভরপুর। সামনের ছায়ামূর্তি যেন বহু শতাব্দীর জমে থাকা সব অনুভূতি এক মুহূর্তে উজাড় করে দেয়। দীর্ঘ চুম্বনের পর নারী তার নরম ঠোঁট নামিয়ে আনল ওর লম্বা গ্রীবায়, তারপর পেশল, সুগঠিত, পরম ইন্সিত বুকে। দু-হাতে ভীষণ আদরে স্পর্শ করে তার মুখ। আঙুলের নরম স্পর্শে যেন এক অদৃশ্য আগুন জ্বলে উঠল।
অধিরাজ কিছুই বুঝতে পারছিল না। সে তখন চেতনার শেষ বিন্দুতে গিয়ে পৌঁছেছে। এই শক্তিশালী চুম্বনকে অনুভব করার বোধও ছিল না। সম্পূর্ণ অসাড় আর অবশ একটা পুতুলের মতো স্রেফ দাঁড়িয়ে আছে। শুধু তার অবচেতন মন এইটুকু আশ্বাস দিল—সে ফিরে এসেছে। আর কোথাও একটা উষ্ণতা তাকে বলছে, “ভয় পেও না। আমি আছি!”
সে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করার মতোই এলিয়ে পড়ে মেয়েটির বাহুবন্ধনেই। আর দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতাও নেই। চোখ বুজে আসছে। ও ক্রমাগতই অদ্ভুত এক নেশায় তলিয়ে যাচ্ছে।
মেয়েটি সযত্নে তাকে এবার শুইয়ে দেয় শয্যার ওপরে। বেডসাইড টেবিলের মৃদু সোনালি আলো সেই সিক্ত অর্ধনগ্ন মর্মরমূর্তিকে ঘিরে অদ্ভুত মায়াবী প্রভা ছড়াচ্ছে। মেয়েটি আপ্রাণ নিজেকেই আটকানোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল। কিন্তু আর বেঁধে রাখতে পারে না।
“ওঃ। ইউ আর কিলিং মি…।”
পাগলের মতো এলপাথাড়ি উষ্ণ চুম্বনে সে আপাদমস্তক ভরিয়ে দিল পুরুষটিকে। একেকটা চুমু যেন একেকটা বিস্ফোরণ। গভীর, আকুল, আবেগে উথলে ওঠা। অধিরাজের চোখ যেন আঠা দিয়ে আটকানো। সে কিছুই অনুভব করেনি, উষ্ণতা ছাড়া! ওইটুকুই বুঝি যথেষ্ট ছিল। চেতনা, বোধশক্তি তাকে ছেড়ে গিয়েছিল অনেক আগেই, এবার শেষ আলোর বিন্দুটুকুও কোন ঘোরের অতলে হারিয়ে গেল কে জানে!
নারীটি তার অচেতন দেহটাকে তখনও উন্মত্ত আদর করে চলেছে। প্রতিটি চুম্বনে রিরংসা নয়, আশ্লেষ নয়, অশ্রুসিক্ত নিবেদন আর সম্পূর্ণ সমর্পণ ছাপ ফেলে যায়…! কামনা পুতুল নয়, আশ্লেষের প্রতিমূর্তি নয়, বুভুক্ষু প্রেমময়ী এক রক্তমাংসের নারী নীরবে ভালোবাসছিল তার প্রিয়তমকে। আস্তে আস্তে বলল, “আমি আছি… আমি থাকব… আর দূরে যেও না!”
তার গালে, গলায়, বুকে পাগলের মতো মুখ ঘষতে ঘষতে আচমকাই থমকে গেল নারী। পুরুষটি যে সম্পূর্ণ নির্জীব, নিঃস্পন্দ! সবটাই তবে একতরফা? সে নিঃসাড়, সম্পূর্ণ অচেতন মানুষটির হাত শক্ত করে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে,
“আমি সে নই টাইগার… আমি সে নই…! তুমি চিনতে ভুল করেছ! বড়ো সুন্দর ভূল…! কিন্তু আমি হতে পারতাম… বিশ্বাস করো, আমি হতে চাই। কোন নির্বোধ তোমায় ছেড়ে গেছে জানি না। কিন্তু আমি তোমায় ছাড়ব না… কখনও না….!”
বলতে বলতেই তার চোখে যেন ধ্বক করে আগুন জ্বলে ওঠে, “দরকার পড়লে যার স্মৃতি তোমার বুকের মধ্যে আছে, তাকে তুলে বাইরে ফেলে দেব। এইটুকু বুঝেছি তুমি এখনও তাকে চেনো না। তোমার অন্তরে আমায় অনুভব করো টাইগার। আজ থেকে আমিই সে! আর কেউ নয়…! আর কেউ নেই… তোমার বন্ধু ছেড়ে যেতে পারে… কিন্তু এই শত্রু কোনোদিন যাবে না…!”
আরও হয়তো অনেক কিছু বলার ছিল। কিন্তু কথা বলতে বলতেই থেমে যায় মেয়েটি। উৎকর্ণ হয়ে কী যেন শুনল। একটা চাপা জুতোর শব্দ এদিকেই আসছে। সে অচেতন অধিরাজকে ছেড়ে দিয়ে দ্রুত ফের মিলিয়ে যায় পর্দার পেছনে। কিন্তু কৌতূহলী চোখদুটো পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখছে সব দৃশ্য। কেউ আসছে… এদিকের ঘরেই আসছে। আর এ বাইরের লোক নয়…।
আচমকাই দরজাটা সজোরে হাট করে খুলে গেল। ইউনিফর্ম পরা এক ব্যক্তি চুপিসাড়ে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করেছে। সিকিউরিটি গার্ড মানব। তার মুখে সেই নরম আনুগত্যের ছাপ আর নেই। বরং প্রচণ্ড নিষ্ঠুরতা মুখের ভাঁজে ভাঁজে প্রকট। মেয়েটি সবিস্ময়ে দেখল, মানব অধিরাজের অবশ দেহটাকে ভালো করে পরীক্ষা করে দেখছে। যখন বুঝল মানুষটা সম্পূর্ণ অচেতন, বাধা দেওয়ার ন্যূনতম সুযোগও নেই, ঠিক তখনই তার হাতে ফণা তুলল একটা আগ্নেয়াস্ত্র। মুখে সাইলেন্সার। দাঁতে দাঁত পিষল মেয়েটি। খবরটা তবে সত্যি ছিল!
“সরি স্যার।”
দুটো শব্দ ছুড়ে দিয়েই সে আগ্নেয়াস্ত্রটাকে নিস্তেজ অধিরাজের বুকের দিকে তাক করে ট্রিগারে আঙুল রাখে। কিন্তু আর কিছু করার আগেই পেছন থেকে নিয়তির মতো অমোঘ, চাপা অথচ ইস্পাতের মতো স্বর ভেসে এল, “নো!”
মানব এরকম কিছু আশাই করেনি। সে বিস্মিত হয়ে বিদ্যুৎবেগে পেছন ফেরে। সেখানে তখন দাঁড়িয়ে আছে সেই নারী। পর্দার আড়াল থেকে সম্পূর্ণ প্রকাশ্যে বেরিয়ে এসেছে সে। মুখে কুটিল হাসি খেলা করছে। আবার দৃঢ় স্বরে বলল, “নো!”
“সরি ম্যাডাম। কিন্তু স্যারের অর্ডার আছে,” মানবের চোয়াল শক্ত, “শত্রুর শেষ রাখতে নেই।”
মেয়েটির মুখে ব্যঙ্গের শানিত হাসি, “কে শত্রু মাই ডিয়ার? এ লোকটা শুধু নিজের ডিউটি করছে। তাও একদম টু হান্ড্রেড পার্সেন্ট অনেস্টির সঙ্গে। তুই তো রক্ষকের মুখোশে ভক্ষক। এই পুরুষের সঙ্গে লড়তে হলে সামনা-সামনি লড়ার কলজে চাই। জলে ড্রাগ মিশিয়ে, সেন্সলেস করে, পেছন থেকে তো সা-লা, একমাত্র তোর মতো বেইমান কাওয়ার্ডরাই অ্যাটাক করে।”
“আপনার যা বলার কার্লোস স্যারকে বলবেন। আমার কাছে ওঁর অর্ডার আছে।”
মানবের হাতে ফের উদ্যত হল আগ্নেয়াস্ত্র। মেয়েটি এবার প্রচণ্ড রাগে বলল, “আই সেইড নো! ওদিকে একদম নজর দিবি না!”
“সরি!”
মানব ট্রিগারে চাপ দিতেই যাচ্ছিল। তার আগেই বিদ্যুৎবেগে একটা তীক্ষ্ণ কিছু ওর গলায় সাঁৎ করে এসে বিঁধে গিয়েছে। সে কাতরে উঠে জিনিসটাকে গলা থেকে বের করে। একটা নিডল। সামনের নারী এত দ্রুতবেগে, এত দক্ষতার সাঙ্গে অব্যর্থ লক্ষে ছুড়ে দিয়েছিল যে সে বুঝতেই পারেনি, কখন ইঞ্জেকশনটা এসে গলায় বিধল, আর কখনোই বা তার ভেতরের সম্পূর্ণ তরল তার দেহের মধ্যে প্রবেশ করে গেল। শুধু টের পেল, তার দেহ অসীম জ্বালায় জ্বলছে। শিরা দিয়ে যেন নামছে লাভার স্রোত! জ্বলে গেল… উঃ।
“আই অ্যাম সরি অলসো।”
নারীটি এবার নিষ্পাপ শিশুর মতো ঘাড় কাত করে মোহিনী দৃষ্টিতে তাকায় তার দিকে, “হোয়াট টু ডু? তুই এখনও শিখিসনি, কিং-কে ছুঁতে গেলে কুইনকে আগে মাত দিতে হয়। কার্লোসের বেইমানির টাকা ভোগ করার জন্য মাত্র দশ মিনিট সময় তোর হাতে আছে।”
বলতে বলতেই সে নিজের ফোনটার দিকে তাকায়, “নিয়ারেস্ট হসপিটাল এখান থেকে আট মিনিট ওয়াকিং ডিসট্যান্সে। এইটুকু বলে দিই, সিরিঞ্জের মধ্যে পয়জন ছিল। আর সেই পয়জনের নাম তুই কেন, ডাক্তারদের চোদ্দপুরুষও এত সহজে বের করতে পারবে না। যা, পালা। যদি কপালগুণে হসপিটাল অবধি পৌঁছতে পারিস, আর ডাক্তাররা তোকে বাঁচাতে পারে, তবেই কার্লোসের টাকা এনজয় করতে পারবি। নয়তো…”
সে নিষ্ঠুরভাবে মাথা নাড়ল, “ও টাকা তোর শ্রাদ্ধেই লাগবে। নাও… রান! রান ফর ইওর লাইফ। ইওর টাইম স্টার্টস নাও…!”
মানব তখন অসহ্য যন্ত্রণায় কাঁপছিল। তবু প্রাণ বাঁচানোর তাড়নায় পড়িমরি করে নীচের দিকে দৌড়োল। ছুটতে গিয়ে তীব্র বিষের প্রভাবে আছাড়ও খেল। তবু প্রাণের দায় বড়ো দায়…!
মেয়েটি আপনমনেই হাসে। সে জানে, মানবের আয়ু আর একঘণ্টাও নয়। তবু ওকে এখান থেকে সরাতেই হত। নয়তো ওর লাশ পাওয়া গেলে ঘুমে তলিয়ে থাকা মানুষটা বিপদে পড়বে। সেটা কী সে হতে দিতে পারে? আর কার্লোস…!
তার মুখ শক্ত হয়ে ওঠে। কার্লোস আবার চেষ্টা করবে এই লোকটাকে মারার। এই মানুষটা তাকে প্রায় পথে নামিয়েই ছেড়েছে। কার্লোস জানে, অধিরাজ ব্যানার্জি আরও একটু এগোলে সে আর থাকবে না। আর মুখোমুখি লড়াই করার ক্ষমতা কার্লোসের নেই।
মেয়েটি আলতো করে ছোট্ট একটা চুমু এঁকে দিল বেহুঁশ অধিরাজের কপালে। তারপর পায়ের কাছের চাদরটা দিয়ে সযত্নে ঢেকে দিয়েছে তার দেহটাকে।
“হ্যাভ আ সুইট ড্রিম মাই ম্যান। দিন দিন বড়ো বেশি অসহ্য সুন্দর হচ্ছ। কিন্তু তোমায় দু-চোখ ভরে দেখার উপায়ও নেই। তোমাদের মাথামোটা লাহিড়ী পেছনে পড়েছে যে! তবে আবার যদি সুযোগ হয়, তবে কোমরে দড়ি বেঁধে, হাতে হাতকড়া পরিয়ে ফের আপন করে নিও আমাকে। আপত্তি করব না। কিন্তু তার জন্য যুদ্ধ করতে হবে যে। যতই ভালোবাসি, যুদ্ধে একচুল মাটিও ছাড়ব না মাই কিং।”
সে ঘুমন্ত পুরুষের কানে ফিশফিশ করে বলল, “আই লাভ ইওর পেইন, আই লাভ ইওর অ্যাঙ্গার, আই লাভ ইওর কার্স, আই লাভ ইওর স্মাইল, অ্যান্ড টিয়ার্স টু…। সবাই তোমায় জয় করতে চায়, আর আমি পরাজিত হতে চাই। …আর কেউ না থাকুক, দুঃস্বপ্ন দেখলে আমায় ডেকো। আমি আসব…! আর ভালোবাসতে না পারলে আরও ঘৃণা করো। বিকজ আই স্টিল লাভ ইওর হেট্রেড!”
কথাগুলো বলেই সে দ্রুতবেগে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। উত্তেজনায় তার হাত কাঁপছিল। কিন্তু কাঁপা হাতেই ওপেন করল ফেসবুক। সেখানে এক অপূর্ব সুন্দরী কৃষ্ণাঙ্গীর ছবি অপেক্ষা করছে। এটা নতুন…!
আপনমনেই গাড়িতে বসে হিসহিস করে বলল সে, “শত্রুর শেষ রাখতে নেই…।”
সমস্ত শহর যখন ঘুমে মগ্ন তখন সেই কৃষ্ণসুন্দরীর প্রোফাইলে নিশ্চুপে পড়ল প্রথম পোস্টটা! টাইমলাইনে বড়ো বড়ো লাল অক্ষরে নিঃশব্দে জ্বলে উঠল একটাই বাক্য।
“আর আই পি কার্লোস!”
***
