২০
“শেষ হয়ে হইল না শেষ!… মলয়া মরিয়া প্রমাণ করিলেন যে তিনি মরেন নাই…”
আবার একটা রুদ্ধশ্বাস দৌড়। আবার সেই রাতের প্রেক্ষাপট ছিঁড়ে আপ্রাণ সময়কে মাত দেওয়ার অসম লড়াই। আবার দমবন্ধ করা মুহূর্তের পাষাণভার। যত সময় এগোচ্ছে, ততই উত্তেজনার পারদ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এবার ঠিক কোনদিকে মোড় নেবে ঘটনার স্রোত? এই শহরের রাস্তা, গলিখুঁজি, মোড়গুলো তো ওদের চেনা। কিন্তু যে অপরাধীর মনের অন্ধকার, অচেনা ও পিচ্ছিল পথে ওরা এগোচ্ছিল, সেখানে এরপর কী অপেক্ষা করছে কে জানে।
“আমি এখনও কনফিউজ রাজা।”
পবিত্র আচার্য এতক্ষণ বিড়বিড় করে রবিঠাকুরের কবিতা আর গল্পের বিখ্যাত লাইন কোট করছিল। সে এতটাই কনফিউজড হয়ে আছে যে ঠিক কী রি-অ্যাকশন দেবে বুঝতে পারছিল না। গম্ভীর মুখে বলল, “এতদিন শুনে এলাম ডঃ ডেথ। এখন আবার শুনছি সিস্টার ডেথ। কোটা সত্যি? তুমি আবার বলছ যে শেষ মার এখনও বাকি। মলয়াই যদি সিস্টার ডেথ হয়ে থাকেন, তবে শেষ মার দেওয়ার আগে তিনি নিজেই তো মারা পড়লেন!”
অধিরাজের চোয়াল কঠিন। গাড়িটাকে সে প্রায় রকেটের গতিবেগেই উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। দুটো সবল হাত শক্ত করে ধরে আছে স্টিয়ারিং। ডানহাতের আঙুলের ফাঁকে আবার একটা সিগারেট জ্বলছে। ড্রাইভ করতে করতেও একটানা স্মোক করে চলেছে। এতেই স্পষ্ট যে ঠিক কতখানি ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক চাপ তার নার্ভের ওপর পড়ছিল। রাস্তার দিক থেকে চোখ না সরিয়েই বলল, “এই মার্ডারারের খুন করার জন্য সশরীরে স্পটে উপস্থিত থাকার প্রয়োজনই পড়ে না পবিত্র। সে অনুপস্থিত থেকেও মানুষ মারতে পারে। তাই মলয়ার সুইসাইডেই গল্প শেষ এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। অন দ্য কন্ট্রারারি—এখনও একটু বাকি আছে। আমার চোখের সামনে যতটুকু ধোঁয়াশা ছিল তা কেটে গেছে। তাই এবার আর কোনো মৃত্যু হবে না।
তার প্রতিটি শব্দের মধ্যে কাঠিন্য আর উত্তেজনা। বাইরে তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছিল। বৃষ্টি ভেজা কালো পিচের পথ ডিপারের আলোয় চিকচিক করছে। ল্যাম্পপোস্টের পিঙ্গল আলোয় প্রতিটি জলের বিন্দু ঝিকিয়ে ওঠে ক্ষণিকের জন্য। তারপর আবার অদৃশ্য হয়ে যায় অন্ধকারে। ওদের গাড়ি একদম ফুলস্পিডে সেই অন্ধকারকেই ছিঁড়েখুঁড়ে তীরবেগে ছুটছে। ইঞ্জিনের গর্জন যেন শুধু যন্ত্রের নয়—আরোহীদের বুকের ভেতরে জমে থাকা উৎকণ্ঠা, চাপা আশঙ্কা আর দমবন্ধ উত্তেজনার বিস্ফোরণ। অর্ণবের মনে হয়, তার হৃৎস্পন্দনও বোধহয় ইঞ্জিনের মতোই শক্তিশালী কম্পনে পাঁজরকে ভেঙেচুরে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
“পবিত্র…।”
অধিরাজ তার দিকে মুখ না-ঘুরিয়েই বলল, “ডঃ সঞ্জয় বসু, শীলা বসাক, রঞ্জন নায়েক ও ডঃ রণজয় বসুকে ফোনে ধরার চেষ্টা করো। দ্যাখো তো ওঁরা এই মুহূর্তে ঠিক কোথায় আছেন? আর অর্ণব…।”
পবিত্র আচার্য নির্দেশ পাওয়া মাত্রই নিজের ফোন থেকে প্রত্যেকের ফোন নম্বর ডায়াল করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অর্ণব সচকিত হয়ে বলে, “ইয়েস স্যার?”
“ইমিডিয়েটলি ডঃ শেঠিকে ফোন করে খোঁজ নাও যে ডঃ চক্রবর্তীর শারীরিক অবস্থা এখন কীরকম। ওঁর অপারেশনটা কাল হওয়ার কথা ছিল না?”
“হ্যাঁ।”
অধিরাজ হাতের সিগারেটটা কামড়ে ধরেছে, “আমি যদি ভুল না করি তবে ওঁর অপারেশন কাল নয়, আজই হবে। সিস্টারটি সেইজন্যই ফর্মে ওঁর সই নিয়েছিল। দ্যাখো, সত্যিই তাই কী না।”
“ইয়েস স্যার।”
অর্ণব ডঃ শেঠির ফোন নম্বরে দ্রুত ফোন করে। তাঁকে লাগাতার ওভার ফোন ধরার চেষ্টা করছে। কিন্তু ফোন শুধু বেজেই গেল। কেউ ধরছে না! বরং বারবার চলে যাচ্ছে ভয়েসমেলে। অন্যদিক থেকে যান্ত্রিক স্বর ঠান্ডাসুরে জানাচ্ছে ডঃ শেঠি এইমুহূর্তে ফোন ধরতে সক্ষম নন। তাই প্রয়োজনীয় বক্তব্য যেন ভয়েসমেলেই কলার রেকর্ড করে রাখেন।
গাড়িটা তখন দমকা বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে। ভেজা ডামারে টায়ারের ঘূর্ণায়মান ঢাকা বিদ্যুৎবেগে ছড়িয়ে দিচ্ছে অসংখ্য জলবিন্দুর রুপোলি ঝিলিক। কিন্তু গাড়ির গতিবেগ তখন সময়ের সঙ্গে লড়ছে! টিক টিক করে সরে যাওয়া সেকেন্ড আর মিনিটের কাঁটাগুলোই তার সবচেয়ে বড়ো শত্রু। প্রতিটা মুহূর্ত খসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধটা আরও কঠিন হচ্ছে।
“রেড লাইটের অ্যায়সি কী ত্যায়সি।”
অধিরাজ দাঁতে দাঁত পিষল, “সবাই সামলে বসুন। আমি এখন কোনো সিগন্যালে গাড়ি থামাচ্ছি না।”
সবাই নির্দেশ পাওয়া মাত্রই ভেতরে নিজেদের সামলে বসেছে। আত্রেয়ী আর টুইঙ্কল তৎক্ষণাৎ সিটবেল্ট বেঁধে নেয়। এমন পরিস্থিতি ওদের কারওর কাছেই খুব নতুন নয়। আগেও অধিরাজের বেপরোয়া বন্য ড্রাইভিং বহুবার স্বচক্ষে দেখেছে ওরা সবাই। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে ভালোভাবেই জানে যে সাবধান না হলে হাড়গোড় ভাঙাও আশ্চর্য নয়। অস্থিতে অস্থিতে জানা আছে যে এবার কী হতে চলেছে। তাই প্রত্যেকেই সতর্কভাবে কিছু না কিছু আঁকড়ে ধরে।
“উঃ!”
অর্ণব ফোনটাকে কাঁধের সাহায্যে কানে চেপে ধরে সিটবেল্ট বাঁধার চেষ্টা করছিল। কিন্তু সফল হওয়ার আগেই একটা স্পিডব্রেকারে ধাক্কা খেয়ে গাড়ি এমন লাফিয়ে উঠল, যে সজোরে ছাতে মাথাটা ঠুকেই গিয়েছে। একমুহূর্তের জন্য অস্ফুট কাতরোক্তি বেরিয়ে গেল তার মুখ থেকে। অধিরাজ সামান্য বিব্রত হয়ে বলে, “সরি।”
অর্ণবের কান আর কাঁধের গ্রিপ ফস্কে ফোনটা পড়ে গিয়েছিল। সে দ্রুত সেটাকে তুলে নিয়ে বলল, “ইটস ওকে।”
বর্ষাভেজা রাস্তার ওপর দিয়ে প্রায় ঘণ্টায় একশো বাট কিলোমিটার বেগে ছুটছিল গাড়িটা। স্পিডোমিটারের কাঁটা আরও এগোচ্ছে। মাঝেমধ্যেই স্পিডব্রেকারে ধাক্কা খেয়ে এমন লাফিয়ে লাফিয়ে ওঠে যে ভয় হয় এখনই বুঝি উলটে যাবে। কিন্তু অধিরাজ স্পিড একচুলও কমায়নি। তার শক্তিশালী বাহু আরও জোরে চেপে ধরে স্টিয়ারিং। হাতের মাসলগুলো প্রচণ্ড রোষে ফুলে ফুলে উঠছে। হাবেভাবেই স্পষ্ট—কিছুতেই থামবে না সে। এখন থেমে যাওয়া মানেই হেরে যাওয়া। অধিরাজ কিছুতেই হারতে চায় না।
“রাজা!”
পবিত্র এতক্ষণ প্রত্যেকটা ফোন নম্বরে পাগলের মতো র্যান্ডম ফোন করে চলেছিল। এবার শোনা গেল তার অসহায় কণ্ঠ, “কেউ ফোন তুলছেই না! ডঃ সঞ্জয় বসুর ফোন সুইচড অফ। রঞ্জন আর শীলার ফোন অন থাকলেও কেউ কল রিসিভ করছে না। আর রণজয়ের নম্বরে বারবার বলছে যে ফোন নেটওয়ার্ক কভারেজের বাইরে! একজনকেও পাওয়া যাচ্ছে না!”
অধিরাজ কয়েকমুহূর্তের জন্য নীরব। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে! বুকের ভেতরে কয়েকগুণ বেগে ধপধপ করে চলছে হৃৎপিণ্ডের টারবাইন। আঙুলগুলো লোহার শক্তিতে আঁকড়ে ধরে আছে স্টিয়ারিং। বাইরের বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটার শব্দ যেন তার ভেতরের অস্থিরতাকে আরও বেশি বাড়িয়ে দিচ্ছে। সে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করতে করতেই ঠান্ডা স্বরে বলে, “মোবাইল নেটওয়ার্ক কভারেজের বাইরে থাকারই কথা। অপারেশন থিয়েটারের মধ্যে সিগন্যাল পাওয়া যায় না।”
এবার ভেসে এল অর্ণবের আর্তস্বর, “স্যার, ডঃ শেঠিও ফোন তুলছেন না। কলটা ডাইভার্টেড হয়ে ওঁর ভয়েসমেলে চলে যাচ্ছে।”
“শি–ট। শি–ট।”
প্রচণ্ড উত্তেজনায়, চরম হতাশায় স্টিয়ারিঙের ওপরই একটা জোরালো ঘুষি মারল অধিরাজ, “আমারই বোকামি। বোঝা উচিত ছিল যে কাল ভোর অবধি অপেক্ষা করা হবে না। আজ রাতেই যা করার করবেন ওঁরা।”
“কিন্তু রাজা।…’, পবিত্র সন্দিগ্ধ।
“অপারেশনটা তাড়াতাড়ি হয়ে গেলেই ভালো নয় কী? বুলেটটা যত ভেতরে থাকবে, ইনফেকশন ততই বাড়বে। আর স্পাইনাল কর্ডের অবস্থাও খারাপ হবে। তাই যদি ডঃ শেঠি এই ডিসিশন নিয়ে থাকেন, তবে এর মধ্যে তো অন্যায়ের কিছু দেখছি না।”
“প্রবলেমটা তো ওখানেই।”
অধিরাজ সজোরে বলে, “আরে, এই ডিসিশন আদৌ ডঃ শেঠির হতেই পারে না! তিনি ভারতের ওয়ান অব দ্য টপমোস্ট নিউরোসার্জেন হয়েও কৌশিককে ও টি-তে তুলতে ভয় পাচ্ছিলেন। ওঁর আগের কথা যদি ধরি, তবে ডঃ চক্রবর্তীর ফ্র্যাজাইল হেলথ এই অপারেশনের ধকল নিতেই পারবে না। বুলেটটা থোরাসিক স্পাইনে এমন অ্যাঙ্গেলে আটকে আছে যে বের করতে গেলে আরও বেশি ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা। উনি নিজেই হাত তুলে দিয়েছিলেন। যিনি কৌশিককে ছুঁতেও ভয় পাচ্ছিলেন, তিনি কয়েকঘণ্টার মধ্যেই ‘বীরবাহাদুর’ হয়ে গেলেন কী করে? অপারেশনের ক্ষেত্রে যে পেশেন্টের সার্ভাইভালো ফ্যাক্টর অলমোস্ট জিরো—উনি তাকে কোন্ সাহসে ও টি-তে নিয়ে যাবেন?”
বলতে বলতেই ফের তার মুখ ইস্পাতকঠিন হয়ে ওঠে, “এই রিস্কটা তো ওঁর পিতৃদেব নিয়েছেন!”
“হ্যাঁ। এটা ডঃ সুধাংশু চক্রবর্তীর ডিসিশন।
অর্ণব সম্মতি জানায়। সে স্বয়ং ডঃ শেঠির সঙ্গে সুধাংশুর কথোপকথন শুনেছে। ডঃ শেঠি সুধাংশুকে বারবার বোঝাচ্ছিলেন যে আপাতদৃষ্টিতে থোরাসিক স্পাইন সার্জারির রিস্ক লো হলেও কৌশিকের ক্ষেত্রে সেটা হাই রিস্ক ফ্যাক্টর ফর মর্টালিটি। ওঁর ফ্র্যাজাইল হেলথ কন্ডিশনটাই এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে অপারেশনের প্রসিডিওর, বুলেটটাকে বের করে আনার সময়ে সামান্যতম শক, ইভেন সাধারণ অ্যানাস্থেশিয়াও ওঁর ছেলের পক্ষে প্রাণঘাতী হতে পারে। বুলেটটা এমন অ্যাঙ্গেলে একগুঁয়েভাবে আটকেছে যে ওটাকে রিমুভ করতে গেলে অ্যান্টেরিয়র স্পাইনাল আর্টারির ওপর চাপ পড়বেই। সেক্ষেত্রে ‘এ এস এ’ সামান্য ড্যামেজ হলেও পেশেন্ট শকেই মরে যাবে। ওপরন্তু এক্সিস্টিং কোমবিডিটি, তথা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট ও দুর্বল হার্টের ইতিহাস অলরেডি রয়েছে। এখানে সার্ভাইভালের চান্স প্রায় নেই। কিন্তু সুধাংশু শুনবেন না। তাঁর বক্তব্য সেক্ষেত্রে তাঁরা পোস্টেরোল্যাটারাল সার্জিক্যাল অ্যাপ্রোচ নিতে পারেন। আরও বিশেষ কিছু সতর্কতা অবলম্বন করলে কৌশিককে বাঁচানো সম্ভব। ডঃ শেঠি আর ডঃ সুধাংশুর মধ্যে একরাশ মেডিক্যাল টার্মওয়ালা তর্ক-বিতর্ক হওয়ার পর ডঃ শেঠি সাগ সাফ জানিয়েছিলেন, “আমি একা এই রিস্ক নিতে রাজি নই। ইন দ্যাট কেস আপনি কলকাতায় আসুন। তারপর দেখা যাবে।”
কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল যে সুধাংশুর তাড়া আছে। তিনি বললেন, “এখনই আমার পক্ষে রাতারাতি কলকাতায় পৌঁছোনো অসম্ভব। আর যত দেরি হবে রিস্ক ফ্যাক্টরস ইনক্রিজ করবে। সো ডু ইট অ্যাসাপ। তবে আমি অনলাইনে থাকব।”
“আপনি না এলে অপারেশনের বন্ডে সাইন করবে কে!”
ডঃ শেঠি আকাশ থেকে পড়েন, “আর কোনো গার্জিয়ানকে তো খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না।”
“কেন? কৌশিক নিজেই সাইন করে দেবে।” সুধাংশু চক্রবর্তীর স্মার্ট জবাব, “ও নিজেই একজন ডাক্তার। সব কিছু জানে ও বোঝে। তাহলে পেশেন্ট নিজেই নিজের বন্ড সাইন করতে কেপেবল হলে আপনার আপত্তি কোথায় ডঃ শেঠি?”
অগত্যা ডঃ শেঠি রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। দু-জনে মিলে সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন যে কাল ভোর ভোরই অপারেশন-টা হবে।
“আমার ধারণা কাল ভোরে নয়, আজ রাতেই যা হওয়ার হবে।”
অধিরাজ এবার অর্ণবের দিকে তাকিয়েছে, “তুমি ডঃ শেঠিকে ছেড়ে একবার হসপিটালেই ডাইরেক্ট ফোন করো তো। ওখানে কেউ না কেউ আমাদের প্রশ্নের জবাব ঠিকই দেবে। শুধু জানতে চাও যে ডঃ চক্রবর্তীর কারেন্ট স্টেটাস কী!”
পবিত্র আচার্য বারবার ব্যর্থ হয়ে ফোনটার ওপরই বিরক্ত হয়ে গিয়েছে। সেটাকে সিটের ওপরই আছড়ে ফেলে বলল, “ড্যা—ম!”
“পবিত্র, ডু ইট ইন অ্যানাদার ওয়ে।”
অধিরাজের স্নায়ু যেন ইস্পাতকঠিন। সে বলে, “বিশ্ব এখনও অফিসে আছে। ওকে ফোন করে এদের প্রত্যেকের মোবাইলের লাস্ট লোকেশনটা দেখতে বলো। আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যেন আমাদের ইনফর্ম করে।”
বলতে বলতেই সে আপনমনেই মৃদু কণ্ঠে বলল, “আমার ধারণা যদি সঠিক হয় তবে সবাইকে ডঃ শেঠির হসপিটালেই পাওয়া যাবে।”
অর্ণব আর পবিত্র ফের ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আত্রেয়ী এতক্ষণ সব উৎকর্ণ হয়ে শুনছিল। এবার বলল, “স্যার, কৌশিক চক্রবর্তীর অপারেশন তো সাকসেসফুলও হতে পারে। আফটার অল ওঁর বাবা বিশ্ববিখ্যাত নিউরোসার্জেন। তিনি কোনো রাস্তা বের করলেও করতে পারেন। ইন দ্যাট কেস, ইটস আ গুড নিউজ।”
“হতে পারত মিস দত্ত’।….
সে মাথা নেড়ে বলল, “কিন্তু হবে না। ডঃ সুধাংশু চক্রবর্তী যত বড়ো সার্জেনই হোন না কেন, ডঃ শেঠিও কম দক্ষ ও অভিজ্ঞ নন। ওঁর কথাতেই আমি বুঝে গেছি যে কৌশিক কোনোমতেই অপারেশনের ধাক্কা থেকে সার্ভাইভ করবেন না। তাও যদি ধরে নিই যে সুধাংশুর মধ্যে মির্যাকল করার ক্ষমতা আছে, সেক্ষেত্রেও ডঃ বসু ও তাঁর টিমের সাইলেন্সটাই এইমুহূর্তের সবচেয়ে বড়ো ব্যাড নিউজ।”
“আপনার মনে হয় ডঃ বসু…”
আত্রেয়ীকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই সে বলল, “মনে হয় না মিস দত্ত। আমি নিশ্চিত জানি।”
টুইঙ্কল অরোরা এতক্ষণে শুধু বলল, “ওঃ ওয়াহেগুরু! এর পেছনে তবে ডঃ বসুই…”
অধিরাজ আর কোনো কথা না বলে ড্রাইভিঙে মন দেয়। তার কপাল আর ঘাড়ের রগ বেয়ে টপটপ করে শীতল ঘামের বিন্দু পড়েই চলেছে। মনে হচ্ছে, সে শুধু গাড়ি চালাচ্ছে না; নিজের মনের ভেতরের সব ভয়, সব অস্থিরতা, সব দুঃস্বপ্নকে ধ্বংস করার জন্য উল্কার বেগে আছড়ে পড়ার জন্য ছুটছে। হয়তো কোনো অদৃশ্য আকর্ষণী শক্তি তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে।
“হ্যালো…”
দু-তিনবার লাগাতার চেষ্টার পর অবশেষে হসপিটালের ফোনটা অন্যপ্রান্ত থেকে এক মহিলা রিসিভ করলেন। সুললিত কণ্ঠে বললেন, “কীভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?”
“নিউরো ডিপার্টমেন্টের পেশেন্ট, বেড নম্বর থ্রি ও টুর ডঃ কৌশিক চক্রবর্তীর লেটেস্ট আপডেট কিছু জানাতে পারেন?”
অর্ণব ব্যাকুলস্বরে জানতে চায়। ওদিক থেকে উত্তর এল, একটু হোল্ডে থাকুন স্যার। আমি কলটা নিউরোলজি ডিপার্টমেন্টে ট্রান্সফার করছি।”
অর্ণব ক্রমাগতই অধীর হয়ে পড়ছিল। এমন নয় যে সে ডঃ চক্রবর্তীকে খুব পছন্দ করে। শুধু কৌশিক কেন, ডঃ বসুর দাগী টিমের কাউকেই সে সহ্য করতে পারে না। তার মতে এদের প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু শাস্তি পাওয়া উচিত। কিন্তু তাই বলে সেই শাস্তি যদি মৃত্যু হয় তবে তা কখনওই কাম্য নয়। ওদের জেলে রাখা যেতে পারে, কিন্তু খুন হতে দেওয়া যায় না। আর কৌশিকের ক্ষেত্রে যেটা হতে চলেছে, সেটা ঠান্ডা মাথায় খুন। তার ফোনের ওপ্রান্তে এতক্ষণ জলতরঙ্গ বাজছিল। হয়তো নিয়েছে হসপিটাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সেই সুরও আরাম দিতে পারছে না অর্ণবকে। তার মনের মধ্যে প্রবল ঝড়ের তাণ্ডব। ওদিকে কী হচ্ছে…।
“হ্যালো, নিউরোলজি ডিপার্টমেন্ট….”
এতক্ষণে জলতরঙ্গের আওয়াজ থেমে গিয়ে একটা ভারী ও বয়স্ক গলা জাগ্রত হল, “হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ?”
অর্ণব বিন্দুমাত্রও দেরি না করে প্রয়োজনীয় প্রশ্নটা রিপিট করে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই লাউডস্পিকারও অন করে দিয়েছে। সবাই শুনতে পেল ও পাশের ভদ্রলোক তার বক্তব্য শুনে বলছেন, “সরি স্যার, কিন্তু আপনার পরিচয় কী জানতে পারি?”
“গো অ্যাহেড।”
অধিরাজ চাপা স্বরে অর্ণবকে নিজের পরিচয় দিতে বলে। ডঃ শেঠি অত্যন্ত বুদ্ধিমান মানুষ। তিনি জানেন এটা সি আই ডি, হোমিসাইডের কেস। তাই সবাইকে ইনফরমেশন দেওয়ার অর্ডার দেননি।
অর্ণব নিজের পরিচয় দিতেই জবাব আসে, “পেশেন্টকে জাস্ট একটু আগেই ও টির জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে স্যার। কোনো ওনার সার্জারি হওয়ার কথা।”
“কিন্তু সেটা তো কালকে হওয়ার কথা ছিল। অন্তত আমরা তাই জানি।”
“ইয়েস স্যার। কিন্তু ডঃ সঞ্জয় বসুর রিকোয়েস্টে আজ রাতেই সার্জারি হবে।”
অর্ণব ঠোঁট কামড়ায়। চমৎকার! ডঃ বসু এর মধ্যেও ঠিক নিজের প্রভাব খাটিয়ে ঢুকে গিয়েছেন। সেও এবার মর্মে মর্মে বুঝল, কৌশিক অপারেশন থিয়েটার থেকে কিছুতেই জ্যান্ত অবস্থায় বেরোবেন না। ওঁর নামটাও ‘সার্জারি চলাকালীন দুঃখজনক মৃত্যু’র ট্যাগলাইন নিয়ে কালই খবর হয়ে যাবে। এই ট্র্যাজেডির জন্য সবাই দু:খ করবে, কিন্তু কেউ জানবে না, এটা স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, মার্ডার। কোনোভাবেই প্রমাণ করা যাবে না। ডঃ বসুও থেকে যাবেন সবার নাগালের বাইরে।
“সার্জারি কী শুরু হয়ে গেছে?”
রুদ্ধশ্বাসে প্রশ্নটা করল অর্ণব। সার্জারি যদি শুরু হয়ে যায় তাহলে আর কিছু করার নেই। সব শেষ… সব শেষ …!
“এখনও স্টার্ট হয়নি স্যার।” ভদ্রলোক নম্রস্বরে জানান, “যেহেতু সার্জারিটা লাস্ট মোমেন্টে শিডিউলড হয়েছে তাই একদম শেষেই রাখা ছাড়া উপায় ছিল না। ও টি নম্বর থ্রি-টাতেই একমাত্র ভিডিও কনফারেন্সিং সিস্টেম আছে। যেহেতু ডঃ চক্রবর্তীর কেসে ডঃ সুধাংশু চক্রবর্তীর থাকার কথা তাই ও টি-থ্রি ছাড়া অন্য কোনো অপারেশন থিয়েটারে সার্জারি পারফর্ম করা সম্ভব ছিল না। ডঃ শেঠির আরও কিছু আজেন্ট সার্জারি থাকার ফলে ও টি-থ্রি প্রায় ফুল বুকড। সেজনাই লেট হয়ে গেছে।”
“তাহলে ডঃ চক্রবর্তী এখন কোথায়?”
“লাস্ট সার্জারিটা এইমাত্রই শেষ হল স্যার। ডঃ শেঠি ও টি থেকে বেরিয়ে এসেছেন। পেশেন্টকে বেড়ে দেওয়ার প্রসিডিওর চলছে। আপাতত তাই ডঃ চক্রবর্তী ওয়েটিং-এ আছেন।”
এবার আচমকাই মুখ খুলল অধিরাজ, “ওখানে কী ডঃ সঞ্জয় বসু এবং তাঁর টিম উপস্থিত রয়েছেন? এই সার্জারিতে কী ওরাও থাকবেন?”
“ইয়েস স্যার। তেমনই তো হওয়ার কথা।”
“থ্যাংকস।”
অর্ণবকে ইশারায় ফোন কেটে দিতে বলে নিজের ঘড়িটা একবার দেখে নেয় অধিরাজ। সময়মতো গিয়ে পৌঁছতে না পারলে সব প্রমাণ লোপাট হয়ে যাবে। হসপিটালটা আর বেশি দূরেও নয়। প্রায় চলেই এসেছে। আর মাত্র মিনিট দশেকের দূরত্ব। ওদিকে ডঃ চক্রবর্তী অপারেশন থিয়েটারের ওয়েটিং রুমে শুয়ে প্রহর গুণছেন…!
“ওয়াহেগুরু!”
টুইঙ্কল চোখ বুজে প্রার্থনা করছে তার ওয়াহেগুরুর কাছে, আত্রেয়ীর দু-হাতও প্রণামের ভঙ্গিতে জড়ো হল, মিস বোসের মৃদুস্বরের প্রার্থনা শুনতে পেল অর্ণব। সে শুধু বলছে, “ও: গড! সেভ হিম!”
অধিরাজ দরদর করে ঘামছে। অর্ণবের নিঃশ্বাস দ্রুত থেকে দ্রুততর লয়ে চলছিল। বুকটাই না এবার ফুসফুস, হৃৎপিণ্ড সমেত ফেটে যায়! এত টেনশন, এত চাপ আর নেওয়া যায় না। এই উৎকণ্ঠার চাবুকের প্রহার কাউকে বলাও যায় না, সওয়াও যায় না। গোটা টিমটাই যেন অনিশ্চয়তায় ভুগছে! সবার মনেই এক প্রার্থনা—ওদের পৌঁছোনোর আগেই যেন সার্জারি শুরু না হয়ে যায়…!
“রা-জা।”
পবিত্রর ফোনের হোয়াটসঅ্যাপে একটা মেসেজ সশব্দে এসে ঢুকল। বিশ্বজিৎ পাঠিয়েছে। সে মেসেজটায় চোখ বুলিয়েই বলল, “তোমার সন্দেহই ঠিক। ডঃ সঞ্জয় বসু, ডঃ রণজয় বসু, সিস্টার শীলা বসাক আর রঞ্জন নায়েক—সবারই সেলফোনের লাস্ট লোকেশন সেম।”
আর কিছু বলার প্রয়োজন ছিল না। অধিরাজ আর একটাও কথা না বাড়িয়ে শুধু ঘড়ির দিকে তাকায়। আর মাত্র কয়েক মিনিট…! জোরে…আরও জোরে…। অনেক ফাঁদ পাতা আছে। অনেক ভ্রমের জাল সে পেরিয়ে এসেছে। আর মাত্র একটু খানি বাকি… ।
সে নিজেই নিজেকে সালে, “কান অন…। স্পিড! … গিভ মি মোর স্পিড…।”
অন্যদিকে তখন কৌশিক চক্রবতীকে ঢোকানো হয়েছে অপারেশন থিয়েটারে। বাইরে থেকে ভেতরে ঢুকাতে না ঢুকতেই প্রথমেই ভেসে আসে নাক জ্বালানো তীব্র গন্ধ। অ্যান্টিসেপটিক আর স্টেরিলাইজার ভেপারের মিশ্রণ। কৌশিক এই গন্ধের সঙ্গে খুব ভালোভাবেই পরিচিত। গ্লুটারালডিহাইডের স্ট্রং বাষ্পের মধ্যে নিঃশ্বাস নিতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল ওঁর। চোখটাও ভীষণ জ্বালা করছে। তবু তিনি চতুর্দিকটা একঝলক দেখে নিলেন। তাঁর চারপাশে সবুজ গাউন, ক্যাপ, গ্লাভস আর মাস্কে ঢাকা ডাক্তার আর সিস্টারদের আজ এমন ভিনগ্রহী প্রাণীদের মতো লাগছে কেন! যদিও নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে জানেন যে অপারেশন থিয়েটারের মধ্যে আপাদমস্তক ঢাকা ডাক্তারদের দেখতে একইরকম লাগে। তিনি নিজেও কম সার্জারিতে উপস্থিত থাকেননি। কিন্তু সেখানে মাস্কের পেছনের মুখগুলো তবু চেনা ছিল। আজ সবই কেমন যেন অচেনা ঠেকছে। তাঁর চোখ আঁতিপাঁতি করে খুঁজতে থাকে। এর মধ্যে কোনটা ডঃ শেঠি? তিনি এখানে উপস্থিত আছেন তো?
“রিল্যাক্স স্যার। ডোন্ট ওরি!…”
চমকে উঠলেন কৌশিক। গলাটা চেনা চেনা ঠেকছে না! তিনি চোখে ঝাপসা দেখছিলেন। ও টির দমবন্ধ করা পরিবেশে ফুসফুস যেন অক্সিজেন টানতে পারছে না। তবু কোনোমতে দেখলেন আস্তে আস্তে অ্যানাস্থেসিস্ট এগিয়ে এসেছে ওঁর দিকে। নিখুঁত হাতে ইনট্রাভেনাস লাইন সেট করছে। অন্যদিকে স্ক্রাব নার্স স্যালাইনের ফ্লো ঠিক করতে ব্যস্ত। সে দক্ষ হাতে ওঁর দেহে বসিয়ে দিল ভাইটালস মাপার যন্ত্রগুলো। মনিটরের আলোয় ঝলসে উঠছে নানা রকম গ্রাফ। যন্ত্রগুলোর ‘বিপ বিপ শব্দ। সার্জারির যন্ত্রপাতি ইতিমধ্যেই ট্রে-তে সাজানো; তীক্ষ্ণ স্ক্যালপেল, ফোর্সেপ, সাকশন পাইপ, ড্রিল মেশিন–সব ঝকঝক করছে সার্জিক্যাল লাইটের তীব্র সাদা আলোয়। স্ক্রাব নার্স একটু অপেক্ষা করে অ্যানাস্থেসিস্টের দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাঁকাল। অর্থাৎ সব ভাইটালস ঠিক আছে। এবার পেশেন্টকে অ্যানাস্থেশিয়া দেওয়া যেতে পারে।
“হ্যালো মাই বয়… ।”
ডঃ শেঠির পরিচিত স্নেহময় কণ্ঠস্বর চিনতে পেরে যেন ভীষণ আরাম পেলেন কৌশিক। তাঁর পাশের মুখোশধারীও যেন বড়ো চেনা। তবু এইমুহূর্তে মস্তিষ্কে জোর দিতে চাইলেন না তিনি। ডঃ শেঠি ইতিমধ্যেই স্ক্রাব সেরে হাতে গ্লাভস পরছেন। চোখে সেই একাগ্রতা, যেখানে প্রত্যহ জীবন-মৃত্যুর মাঝের সূক্ষ্ম সুতোর ওপর দিয়ে হাঁটার অভিজ্ঞতা ফুটে উঠছে। নার্স হালকা কণ্ঠে কাউন্ট করছে, “স্পঞ্জ-চেক, কটন-চেক, স্ক্যালপেল…।”
“ইউ উইল বি অলরাইট সন।”
ডঃ শেঠির হাত ওঁর মাথা স্পর্শ করল। তিনি মৃদু হেসে চোখ বোজেন। মনে মনে গভীর বিশ্বাসে উচ্চারণ করলেন, “ইয়েস… ইয়েস। আই উইল বি অলরাইট। আই উইল বি…।”
আস্তে আস্তে তাঁর শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে আসে। একটা অবিচ্ছিন্ন শাস্তি ঘিরে ধরছে। ধীরে ধীরে সমস্ত যন্ত্রণার উর্ধ্বে শান্তিময় একটা আশ্রয়ে চলে যাচ্ছিলেন তিনি। কানে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ডঃ শেঠির আশ্বাস, “ইউ… উইল… বি… অলরাইট…!”
ঠিক সেইমুহূর্তেই একটা প্রচণ্ড শব্দে তাঁর সমস্ত প্রশান্তি ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। উপস্থিত ডাক্তাররা এবং কৌশিক সবিস্ময়ে দেখলেন ও টির দরজাটা হঠাৎই খুলে গেল এক ধাক্কায়। স্টেরাইল থিয়েটারের পরিবেশ এক মুহূর্তে কেঁপে উঠল। অপরাধীর মতো নয়, উলটে বজ্রপাতের মতো ভেতরে ঢুকে পড়ল হোমিসাইডের অফিসাররা।
“সরি ফর দ্য ইন্টারাপশন।”
তাদের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘদেহী অপূর্ব সুন্দর মানুষটা বলে উঠল, “আপনাদের কর্মীরা আমাদের কিছুতেই অ্যালাউ করছিল না। তাই আমাদের ভীম… সরি… সরি মিস অরোরাকেই একটু কষ্ট করতে হল। আশা করি, আপনারা ভয় পাননি।”
টুইঙ্কল তখন নির্বিকার মুখে তার আগ্নেয়াস্ত্রে ফুঁ দিচ্ছিল। এরকম ভয়াবহ এন্ট্রি নেওয়ার অভ্যাস তার আছে। ডঃ শেঠি মুখের মাস্ক খুলে বললেন, “এ কী। আপনারা।”
বাকী চিকিৎসকরা সম্পূর্ণ হতভম্ব। অ্যানাস্থেসিস্টের হাত কেঁপে উঠেছে। নার্স চমকে স্যালাইনের বোতল আঁকড়ে ধরে। নিউরোসার্জেন ডঃ শেঠি থমকে গেলেন। তাঁর চোখে তীব্র বিস্ময় আর ক্ষোভ।
“সরি স্যার” অধিরাজ বিনম্রভঙ্গিতে জানায, “এই সার্জারিটা আজ হবে না। পরে হবে কী না তা মহামান্য আদালত সিদ্ধান্ত নেবেন।”
“হোয়াট দ্য হেল।”
‘হেল-এ কাকে পাঠানো হবে তা আমরা পরে ঠিক করব। আপাতত সবাই মুখের মাস্ক আর ক্যাপগুলো খুলুন। দেখি সবার চাঁদবদনগুলো।”
অধিরাজের কন্ঠস্বরে স্পষ্ট ব্যঙ্গ। অপারেশন থিয়েটারের সবার চোখ তখন একসঙ্গে পুলিসের দিকে। যেখানে এক মুহূর্ত আগেও সময় গোনা হচ্ছিল রোগীর জীবন বাঁচানোর জন্য, সেখানে এখন বাতাসে ছড়িয়ে আছে অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক, আর সংঘর্ষের গন্ধ। একই জায়গায় বিজ্ঞান আর আইন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে।
চিকিৎসকরা জীবন বাঁচাতে তৈরি, আর পুলিস তৈরি সত্য উদঘাটনের জন্য।
“আনমাস্ক ইওরসেল্ফ!”
অধিরাজ গর্জন করে ওঠে, “ইটস অ্যান অর্ডার!”
সঙ্গে সঙ্গেই সবার মাথার ক্যাপ আর মুখের মাস্ক খুলে গেল। মুখোশের নীচে মুখগুলোর দিকে এক এক করে দৃষ্টি ঘোরাচ্ছে অধিরাজ। ডঃ শেঠির পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন ডঃ সঞ্জয় বসু। তাঁর উলটোদিকে ডঃ রণজয় বসু। অ্যানাস্থেসিস্টের পোষাকের তলায় রঞ্জন নায়েক, আর স্ক্রাব নার্সের মাস্কের নীচে শীলা বসাক!
সবাইকে একঝলক দেখে নিয়ে সে ডঃ বসুর দিকে তাকিয়েছে, “পুরো দাগী আসামীদের নিয়েই তৈরি হয়ে এসেছেন দেখছি। আপনার কারেন্ট অ্যানাস্থেসিস্ট আর স্ক্রাব নার্সের যা রেকর্ড, তাতে চক্রবর্তীর টিকিট টু হেল প্রায় কেটেই ফেলেছিলেন।”
ডঃ বসুর চোখে যথারীতি লৌহকঠিন নিস্পৃহ ভঙ্গি, “আমি তো শুরু থেকেই স্বীকার করছি যে আমিই খুনী। সমস্ত মৃত্যুর দায় আমার। আপনারা প্রমাণ করতে না পারলে কী করব?”
আবার সেই একই ডায়লগ—ক্যান ইউ প্রুভ ইট?…আই থিঙ্ক ইউ কুডন্ট…!
“ডঃ বড়কিনের দেখছি মরেও শান্তি নেই।”
সে ফিক করে হেসে ফেলল, “স্যার, এবার আপনার শাস্তি কেউ ঠেকাতে পারবে না। আপনি কথায় কথায় বড্ড প্রমাণ প্রমাণ করেন। এবার কিন্তু আপনার দুষ্কর্মের প্রমাণ আমাদের হাতেই আছে। আর একটু হলেই এই প্রমাণটাও লোপাট হচ্ছিল। কিন্তু কপালগুণে শেষপর্যন্ত থামাতে পেরেছি।”
অর্ণব আর পবিত্র ততক্ষণে ডঃ কৌশিক চক্রবর্তীকে সামলেছে। তিনি বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন। কোনোমতে বললেন, “এসব কী হচ্ছে অফিসার।”
“বিশেষ কিছুই না।”
অধিরাজের সহাস্য জবাব, “ওঁরা সবাই মিলে পুলিসকে টুপি পরাতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ভুলে গিয়েছিলেন, সি আই ডি হোমিসাইড টুপি পরে না!”
“মানে?”
কৌশিকের বিস্ময় তখনও যায় না। এবার তাঁর দিকে ফিরে তাকাল অধিরাজ, “ভেরি ব্যাড ডঃ চক্রবর্তী। এমনিতেই অলিম্পিকে সোনা আসছে না বলে মিস অরোরা কেঁদে ভাসাচ্ছেন। তার ওপর আপনি এরকমভাবে হতাশ করলে ওঁর ‘কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’ না হোক ‘হার্টব্রেক’ তো হবেই।”
“কীসব বলছেন যা তা।”
অধিরাজের কথা কৌশিকের বোধগম্য হয়নি। সে একটা শ্বাস টেনে, একটু থেমে মৃদুস্বরে যোগ করল, “সেই কোনকালে ডঃ হ্যারল্ড শিপম্যান ‘ডঃ ডেথ’-এর মুকুট পরে ‘মোস্ট প্রোলিফিক সিরিয়াল কিলার’ হিসাবে রেকর্ড করে বসে আছেন। ডঃ মুরাদ জ্যাক কেভর্কিয়ান, ডঃ ক্রিস্টোফার ডাঞ্চ, ডঃ জন বড়কিন অ্যাডামস এমনকি ডঃ দেবেন্দ্র শর্মা পর্যন্ত ওঁর রেকর্ড ব্রেক করতে পারেননি। অথচ আপনি চুপচাপ হ্যারল্ড শিপম্যানের রেকর্ডটি ভেঙে, ভারতকে একটি ‘মোস্ট প্রোলিফিক সিরিয়াল কিলারের’ মেডেল এনে না দিয়ে চুপিচুপি কেটে পড়ার তাল করছেন। এ দুঃখ কী প্রাণে সয় ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী? অর শুড আই কল ইউ অ্যাজ ডঃ ডেথ অব কলকাতা?”
উপস্থিত অফিসারদের মাথায় যেন পুরো ব্ল্যাকহোল ভেঙে পড়ে। ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী ডঃ ডেথ! কী বলছে অধিরাজ। এ তো অবিশ্বাস্য! এ কী করে হয়? তবে ডঃ সঞ্জয় বসু…? এবার যেন কৌশিক চক্রবর্তীর মুখ থেকে আসল প্রশান্তিময় মুখোশটা খুলে পড়ল। তিনি হিসহিস করে বললেন—
“এভাবে আপনি যা খুশি তাই বলতে পারেন না। প্রমাণ কী আছে?”
অধিরাজ স্নিগ্ধ হাসছে, “আপনি বোধহয় জানেন না যে আমি জাতে বাঙাল। ওই প্রবাদটা শুনেছেন? বাঙালকে হাইকোর্ট দেখাতে নেই। একই কথা পুলিসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য!”
সে একটা ২০২১ সালের ক্যালেন্ডারের পাতা বের করে আনে, “আপনি বলছিলেন না, ২০২১ সালের এগারো সেপ্টেম্বর কোর্ট কেস পড়েছিল। আপনি হাইকোর্টে ছিলেন। সেদিন জেনিথে হাঙ্গামা হয়েছিল। সত্যিই তাই। ইভেন আপনার ফোনের লোকেশনও হাইকোর্টই দেখাচ্ছে। অর্থাৎ সবকটা স্টেটমেন্টই সঠিক। এমনকি পঁচিশ তারিখের ক্ষেত্রেও একই কেস। সেদিনও অ্যাকর্ডিং টু ইওর ফোন লোকেশন, আপনি হাইকোর্টেই ছিলেন।”
“তাতে কী?” কৌশিকের চোখে সতর্কতা, “সত্যি বলা অন্যায়?”
“অন্যায় নয়।” অধিরাজ মাথা নাড়ে, “কিন্তু মেমোরি টেস্টে আমিও কিছু কম যাই না। আমারও হঠাৎ মনে পড়ে গেল যে ওই একুশ সালেরই সেপ্টেম্বরের চার তারিখে আমিও হাইকোর্টে একটা কেসের ব্যাপারে হাজিরা দিয়েছিলাম। আর দিনটা শনিবার ছিল।”
“সো?” ডঃ বসু এবার প্রতিবাদ করেন, “শনিবার কোর্ট খোলা থাকে না?”
“অফকোর্স থাকে। আমি তো বলছি যে ফোর্থ সেপ্টেম্বর নিজেই কোর্টে গিয়েছিলাম। সেটাও শনিবারই ছিল।”
সে আক্ষেপসূচক শব্দ করে বলে, “কিন্তু মুশকিল হল যে সেটা ফার্স্ট স্যাটার্ডে ছিল। সেক্ষেত্রে এগারো তারিখ সেকেন্ড স্যাটার্ডে আর পঁচিশ তারিখ ফোর্থ স্যাটার্ডে হয়। এইবার কাইন্ডলি আমায় একটু বোঝাবেন যে হাইকোর্ট কবে থেকে সেকেন্ড স্যাটার্ডে আর ফোর্থ স্যাটার্ভেতে শুনানি রাখছে? কই, আমরা তো চেষ্টা করেও ডেট পাই না। কারণ প্রত্যেক মাসের সেকেন্ড আর ফোর্থ শনিবার হাইকোর্ট বন্ধ থাকে! তবে ওইদিন আপনি হাইকোর্টে কী করতে গিয়েছিলেন ডঃ চক্রবর্তী?”
ডঃ কৌশিকের চোখ ঘোলাটে হয়ে যায়। তিনি আমতা আমতা করে বলেন, “হতে পারে… হতে পারে আমার ডেটটা প্রপারলি মনে নেই… আমার মনে থাকে না…!”
“রাইট ইউ আর।”
অধিরাজ আবার শ্বাস টানল, “আমিও ঠিক তাই ভেবেছিলাম। কিন্তু সেক্ষেত্রে ঘটনা পরম্পরা ওই তারিখেরই কী করে হয়? জেনিথের মৃত্যুদুটোর ডেট তো ঠিকই বলেছেন! আর ওই দু-দিন আপনার মোবাইলের লোকেশনই বা হাইকোর্ট শো করছে কেন? আপনার মোবাইল নিজেই ট্র্যাভেল করে চলে গিয়েছিল? না সুশান্তকে দিয়ে নিজের মোবাইলটাকে হাইকোর্টের কাছাকাছি রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন? নিজে তো যাননি। আপনি শিক্ষিত মানুষ, তার ওপর বুদ্ধিমান। গেলেই বুঝতে পারতেন যে কোর্ট বন্ধ। আপনার অ্যালিবাই টিকবে না। কিন্তু সুশান্ত অত বুদ্ধি রাখে না। সে আপনার কথামতোই হাইকোর্টের সামনে বোকার মতো আপনার মোবাইলটা নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর আপনি জেনিথে দুই পেশেন্টকে খুন করতে ব্যস্ত ছিলেন। তাই না? সুশান্তকে নিজের বডি ডাবল বানানোর মাস্টার প্ল্যানও এইজন্যই। যাতে দুই বিভিন্ন জায়গায় ডঃ চক্রবর্তী একই সঙ্গে, একই সময়ে উপস্থিত থাকেন।”
বলতে বলতেই সে আক্ষেপে মাথা নাড়ে, “এই একটা চরম ভুলই আপনাকে ধরিয়ে দিল ডঃ চক্রবর্তী। অ্যালিবাইটা নিখুঁত ছিল। কিন্তু ডেটটা যে ভুল হয়ে গেল!”
“এটা কোনো প্রমাণই নয়।”
তিনি প্রতিবাদ করেন, “এটা থেকে প্রমাণ হয় না যে আমিই ডঃ ডেথ।”
“হ্যাঁ, কিন্তু আমি প্রমাণ করে দেব যে সুজাতা আর সুশান্তর বডিতে যে হেয়ার স্যাম্পল পাওয়া গিয়েছিল সেটা আপনারই।”
পবিত্র হাঁ। অধিরাজ এসব কী বলছে। ওটা তো…।
“কিন্তু স্যার, ওটা তো রণজয় বসুর। ডঃ চ্যাটার্জি তো তাই বলেছিলেন।”
কৌশানী বোসের প্রশ্নের উত্তরে মাথা নাড়ল অধিরাজ, “ওখানেই তো আমাদের ভুল হয়েছে। ডঃ চ্যাটার্জি একবারও বলেননি যে স্যাম্পলটা রণজয় বসুর। উনি প্রত্যেকবার বলেছেন, “স্যাম্পলটা ডঃ বসুর বায়োলজিকাল সন-এর। আমরা রণজয় ছাড়া আর কোনো ‘সন’-এর সন্ধান পাইনি। তাই রণজয়কেই ধরেছিলাম। কিন্তু এই ভদ্রলোক, যাকে ডঃ সঞ্জয় বসু প্রতিমুহূর্তে গার্ড করছিলেন, বারবার রেফার করে প্রোমোট করছিলেন, নিজের বইয়ের কো-অথরও বানিয়েছিলেন, ওঁর অসুখের সব রহস্য সযত্নে লুকিয়ে রেখেছিলেন, এমনকী ওঁর অপরাধের কথা জানতে পেরেও পুলিসকে না বলে হয় নেগলিজেন্সের দোহাই দিয়ে থামাতে চেয়েছিলেন, নয়তো মরিয়া হয়ে থামানোর জন্য শেষ পর্যন্ত শান্তির মৃত্যু উপহার দিয়ে গোপনে আইনের হাত থেকে অনেক দূরে পাঠানোর ব্যবস্থা করছিলেন–যাতে ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী একজন ট্র্যাজিক ও জিনিয়াস নায়ক হিসাবেই সবার স্মৃতিতে থাকেন, ইনফেমাস ডঃ ডেথ হিসাবে নয়। আর ইনোসেন্ট মানুষগুলোর প্রাণও বাঁচে! ভেবে দেখুন কী অস্বাভাবিক ভালোবাসা! আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে ওই হেয়ার স্যাম্পল সেই ভালোবাসার মানুষের সঙ্গেও হুবহু মিলবে। ডঃ সঞ্জয় বসু আর ডঃ কৌশিক চক্রবর্তীর জটিল লাভ অ্যান্ড হেট সম্পর্ক শুধু গুরু বা শিষ্যর নয়–ওটা পিতা-পুত্রের কেমিস্ট্রি সেনোরিটা। হি ইজ অলসো বায়োলজিকাল সন অব ডঃ বসু। এই কারণেই ডঃ সুধাংশু চক্রবর্তী স্ত্রী-কে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন!”
“মিথ্যে…সব মিথ্যে…।”
কৌশিক ঘড়ঘড়ে কণ্ঠে বললেন, “বাজে কথা। আপনি স্রেফ গল্প বানাচ্ছেন।”
সে আবার হাসল, “আমি তবু গল্প তো বানাতে পেরেছি। আপনি কী করেছেন সেনর? না ঠিকমতো ডাক্তারি করতে পারলেন, না দ্য লাস্কার অ্যাওয়ার্ড আপনার কপালে জুটল, না প্রেমিকা আপনার সঙ্গে থাকল। ইভেন, নিজের দুরারোগ্য অসুখটাকে ঢাকার জন্য সুপারি কিলার দিয়ে নিজেকেই গুলি করালেন। যে মা-কে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন তাঁকেও ছাড়লেন না। সিস্টার মলয়া আপনাকে কভার করতে গিয়ে মারা গেলেন। ওপরন্তু একশো চুয়ান্নটা প্রাণ… একশো চুয়ান্নজন নির্দোষ মানুষকে এমনি এমনিই মেরে ফেললেন। বেসিক্যালি কিস্যু করতে পারেননি আপনি আপনার লাইফে। ইউ আর নাথিং বাট আ লুজার…। নির্লজ্জ টাইপের হেরে যাওয়া একটা মানুষ যার বাঁচার কোনো অধিকার নেই….!”
অধিরাজ কৌশিককে প্রায় ঠেলতে ঠেলতে খাদের কাছে নিয়েই গিয়েছিল। ওঁর মুখ দেখে মনে হচ্ছিল যে এখনই উনি অতল গহ্বরে পড়ে যাবেন… ওঁর আত্মা শেষ হয়ে যাচ্ছে বুঝি… কানের কাছে বাজছে, “লুজার… লুজার… নির্লজ্জ… বাঁচার অধিকার নেই…!”
মুহূর্তের মধ্যে গর্জে উঠলেন তিনি। ঘরের মধ্যে যেন বাজ পড়ল,
“আমি লুজার নই। নির্লজ্জও নই। ওই বুড়ো-বুড়িগুলোই আসল লুজার। ওরাই শেমলেস। ওদের তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে। একেকজনের বয়েস আশি-নব্বই-একশো ছাড়িয়েছে। না পরিবারকে কিছু দেওয়ার আছে, না দুনিয়াকে! ওদের ছেলে মেয়েদের দেখেছেন? কেউ ওদের চায় না। ওদের প্রয়োজনীয়তা কারওর নেই। তবু ওরা বাঁচবে? কেন বাঁচবে? এত বাঁচার লোভ কীসের? এত ভোগ করার ইচ্ছে কেন?”
তিনি রাগে, ক্ষোভে ফেটে পড়েন, “বাঁচার কথা তো আমার ছিল। পৃথিবীকে অনেক কিছু দেওয়ার কথা তো আমার। একজন দুর্দান্ত ডাক্তার, একজন ভারতশ্রেষ্ঠ এম ডি, দ্য লাস্কার অ্যাওয়ার্ডটাও আমিই পেতাম। সাফল্য আমার পায়ে লুটিয়ে পড়ছিল। আমার অপেক্ষায় আমার মা থাকত। ডঃ বসু নামের এই লোকটা আমার বিশ্বব্যাপী নাম ছড়িয়ে গেলেই পিতৃপরিচয় দিয়ে বুকে তুলে নিত। আমার প্রেমিকা ছিল, স্বপ্ন ছিল, ভালোবাসা ছিল। সংসার হত। শুধু দ্য লাস্কার অ্যাওয়ার্ডই নয়—আমার নোবেল আনারও যোগ্যতা ছিল। মেডিক্যাল সায়েন্সকে কয়েক কদম এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পতাকা আমার হাতে ছিল…। কিন্তু একটা রোগ–একটা রোগ সব ছিনিয়ে নিয়ে গেল! আমার আয়ু, আমার প্রতিষ্ঠা, পুরষ্কার, প্রেম, ভালোবাসা, সংসার, মায়ের মমতা, বাবার আশ্রয় ও মর্যাদা—গোটা বিশ্বকে অনেক কিছু দেওয়ার ক্ষমতা, সব মাত্র চারবছরেই শেষ! আর ওই বুড়ো-বুড়িরা ফালতু বেঁচে স্রেফ সময়, স্পেস আর অন্যের এনার্জি নষ্ট করছিল। ওদের দিয়ে কারওর কোনো উপকার হতো না। আমায় দিয়ে হত। অথচ ওরা আশি, নব্বই একশো বছর বাঁচবে, আর আমার কপালে মাত্র আটত্রিশটা বছর? এটা ক্রাইম নয়? অন্যায় নয়? অবিচার নয়? কেন ওরা বাঁচবে? আর কেনই বা আমি মরব? বেঁচে থাকার কথা তো আমার! তার বদলে একগাদা খিটকেলে বুড়োবুড়ি কার কোন কম্মে লাগত?”
কৌশিক চক্রবর্তী অসম্ভব উত্তেজনায় হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন, “আমি লুজার নই, ওরা লুজার। যদি আমি বেঁচে থাকা ডিজার্ভ না করি, তবে ওই অকর্মার ধাড়িগুলোও লাইফ ডিজার্ভ করে না। ঘাটে যাওয়ার সময় হয়েছে তবু এত লোভ। এত খাওয়ার শখ। বাঁচার শখ? হুকুম চালানো আর রাজত্ব করার লালসা! ক্ষমতা আর আয়ুর লিপ্সা! আর আমি? আমি কী পেয়েছি? আটত্রিশ বছরের লাইফস্প্যান? আমায় দেখিয়ে দেখিয়ে ওরা বেঁচে থাকবে? অসম্ভব! অ-স-ম্ভ-ব। বেশ করেছি মেরেছি। ওরা সেটাই পেয়েছে যেটা ওদের পাওয়া উচিত… বেশ করেছি… বেশ করেছি… আমি লুজার নই… ওরা লুজার…ওরা… নির্লজ্জ… ওরাই আমার ভাগের জীবন খেয়ে নিয়েছে…আমি ওদের ছেড়ে দেব?”
বলতে বলতেই বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়লেন কৌশিক। অসহ্য রাগ, ক্ষোভ, অবিচারের যন্ত্রণা তাঁর চোখ বেয়ে দরদর করে নেমে এল। দু-হাতে মুখ ঢেকে বুকফাটা হাহাকারে ভেঙে পড়লেন তথাকথিত যমদূত—ডঃ ডেথ!
অন্যদিকে পরিশ্রান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছিল অধিরাজ। স্নায়ুযুদ্ধটা সহজ ছিল না। সে-ও যথেষ্ট ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। রুমালে মাথার ঘাম মুছে ফ্যাকাশে হাসল সে, “থ্যাংকস ফর দ্য কনফেশন। থ্যাংকস ডঃ ডেথ! অন্তত একটা ইতিহাস আপনি লিখতে পেরে অমর হয়েছেন। দুঃখের বিষয়, সেটা ক্রিমিনোলজির পাতায়!”
ডঃ ডেথ তখনও কেঁদে চলেছেন।
