ডঃ ডেথ – ১৬

১৬

“আই কান্ট ফিল মাই লেগস… আই কান্ট ফিল এনিথিং…।”

ডঃ কৌশিক চক্রবর্তীর দু-চোখ বেয়ে দু-ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। শোকে, ব্যথায় না আফসোসে তা বোঝা মুশকিল। কিন্তু মুখে, চোখে যন্ত্রণা আর হতাশার মেলবন্ধন প্রমাণ করে দের যে মানুষটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। বারবার স্থলিত, জড়ানো গলায় জানতে চাইছেন, “মা!…আমার মা কোথায়? …মাকে কোথায় রেখেছেন?…”

শব্দগুলো আলস্যজড়িত ভঙ্গিতে এলিয়ে পড়ছে। খুব উৎকর্ণ হয়ে না শুনলে কী বলছেন তা বোঝা যাবে না। কিন্তু ডাক্তারদের অভ্যস্ত কান বুঝে নিচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই ওঁকে তারা মাতৃবিয়োগের খবরটা দেননি। অধিরাজ আর অর্ণব কী করবে বুঝতে পারছিল না। ডঃ শেঠি আগেই ওদের চেতিয়ে দিয়েছেন যে কৌশিকের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। এই মুহূর্তে একটা সরু সুতোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে তাঁর জীবন। আর কোনোরকম ট্রমা সহ্য করতে পারবেন না। তাই খুব বেশি প্রেশার যেন ওঁকে না দেওয়া হয়, এবং জেন্টলি ইন্টারোগেট করা হয়।

স্বাভাবিকভাবেই অধিরাজ প্রথমে নম্রসুরে জানতে চেয়েছিল যে কৌশিক এখন কেমন আছেন। উত্তরে তিনি শুধু জানালেন যে নিজের পা-দুটোর অস্তিত্বই এখন আর অনুভব করতে পারছেন না। এবং তারপরই সেই মারাত্মক প্রশ্ন, “মা কোথায়?…আমার মা…?”

এই মর্মান্তিক প্রশ্নের উত্তর কী দেবে তা ওরা দু-জনেই বুঝতে পারছিল না। কিন্তু শেষপর্যন্ত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দেবাংশু জানাই বাঁচালেন,

“আপনার মা ক্রিটিক্যালি উন্ডেড। উনি আপাতত আই সি ইউ তে আছেন। তবে চিন্তার কিছু নেই। কয়েকদিন পরে আপনি ওঁর সঙ্গে দেখা করতে পারবেন।

“মা ঠিক আছে…। থ্যাংকস স্যার… থ্যাংকস আ লট…! ও গড!”

অনাবিল প্রশাস্তি মানুষটার মুখে নেমে আসে। মা আহত হলেও যে বেঁচে আছেন, এইটুকুই বোধহয় ওঁকে অনেকখানি শক্তি জোগায়। যন্ত্রণায় ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে বিবর্ণ মুখে একটু হাসি ভেসে ওঠে, “হ্যালো, অফিসার নার্সিসাস। নাইস টু সি ইউ…।”

নার্সিসাস। অ্যাঁ। নার্সিসাস এর মধ্যে টপকে পড়লেন কোথা থেকে। অর্ণব এরকম সম্বোধনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। উনি কী ভুল বকছেন? তাঁর যন্ত্রণাকাতর পিঙ্গল সামান্য বেঁকে যাওয়া মুখ, শূন্য ও অস্বাভাবিক দৃষ্টি দেখলে তো তেমনই মনে হয়। সে কী বলবে, কী করবে বোঝার আগেই ফের দেবাংশু বললেন, “উনি অফিসার ব্যানার্জিকে বলছেন।”

অধিরাজ শেষে নার্সিসাস। অর্ণব খুশি হবে না দেওয়ালে কপাল ঠুকবে বুঝে পায় না। তার আগেই অবশ্য ব্যাপারটা পরিষ্কার করে দেন কৌশিক। জড়ানো, ঘড়ঘড়ে কন্ঠে বলেন, “আমি সাইকোলজিক্যালি নার্সিসাস বলছি না…। নার্সিসিজম আপনার মধ্যে একটুও নেই… দুঃখের বিষয় নার্সিসাস বললে লোকে সবার আগে ওটাই বোঝে…! নার্সিসিজমটা জানে… নার্সিসাসকে নয়…।”

অধিরাজ নিশ্চুপে ওঁর কথা শুনছে। ‘নার্সিসাস’ উপাধি পেয়ে সে কতটা আনন্দিত হয়েছে তা বোঝা মুশকিল। নিস্পৃহ মুখে কৌশিকের বক্তব্য শেষ হওয়ার অপেক্ষা করছে। ইস্পাতকঠিন মুখে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না।

“নার্সিসাস রিভার গড সেফিসাস আর অপ্সরা বা জলদেবী লাইরোপির ছেলে ছিলেন… অভিশপ্ত সৌন্দর্যের মালিক… দেব-দেবী-জলপরী-অপ্সরা, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এমন কেউ নেই যে তার জন্য পাগল, ইনফ্যাচুয়েটেড বা অবসেসড হয়নি! আর শেষে প্রত্যাখ্যাত হয়ে অভিশাপ দেয়নি।… নার্সিসাস আমার কাছে আল্টিমেট বিউটি… সেই সৌন্দর্য যাকে কখনও পাওয়া যায় না…!”

বলতে বলতেই বুঝি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন ভদ্রলোক। তবু বেঁকে যাওয়া মুখে হাসার চেষ্টা করে ফিশফিশ করে বললেন, “আয়নায় নিজেকে কখনও দেখেছেন? …দেখবেন না অফিসার… নিজেই নার্সিসাসের মতো চোখ আর ফেরাতে পারবেন না। আফসোস… আমিও যদি আপনার মতো দেখতে হতাম…।”

উপস্থিত তিনজনের মুখেই বিস্ময়ের ছাপ পড়ল। এসব কী অর্থহীন কথাবার্তা বলে চলেছেন ডঃ চক্রবর্তী। অধিরাজ সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে ডঃ শেঠির দিকে তাকায়। যেন বুঝতে চাইছে, কৌশিক আদৌ স্বাভাবিক অবস্থায় আছেন কী না! না ওষুধের ঘোরে ভুল বকছেন! ডঃ শেঠি প্রত্যুত্তরে হাত তুলে ইশারায় অপেক্ষা করতে বললেন। তাঁর মুখভঙ্গি জানিয়ে দিল যে সব ঠিক আছে। পেশেন্ট সম্পূর্ণ চেতনায় আছেন।

তিনজনই নীরবতা অবলম্বন করে ধৈর্য সহকারে অপেক্ষা করতে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে, হাঁফ ধরা গলায় শেষপর্যন্ত আবার কৌশিকই বললেন, “এরা সবাই আমাকে প্রশ্ন করছে ফ্যামিলির কোনো সদস্যকে খবর দিতে হবে কী না! …কেউ আছেন কিনা যিনি গার্জিয়ানের জায়গা নিতে পারেন… কিন্তু… ওদের কী বলব? …আমার আর কেউ নেই… যারা ছিল… সবাই ছেড়ে চলে গেছে… কারণ আমি পঙ্গু, কুৎসিত হয়ে গেছি…আপনার মতো সুন্দর হলে… কেউ ছেড়ে যেত না… সবাই ভালোবাসত… কিন্তু আমার আর কেউ নেই… মা ছাড়া…।”

বলতে বলতেই তাঁর উদভ্রান্ত দৃষ্টি আর একবার যেন এক অদ্ভুত আর্তি নিয়ে চতুর্দিকটা দেখল। বোধহয় কোনো পরিচিত স্নেহময় মুখ কিছুক্ষণ খুঁজে বেড়াল। অর্ণব দেখল সেই দৃষ্টি আবার হতাশায় ভরে গিয়েছে। কোনোমতে আবার বিহ্বলভাবে বললেন, “মা কোথায়? … মা ঠিক হয়ে যাবে তো?…অ্যাঁ!”

আবার সেই ভয়াবহ কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে হল। অধিরাজ মৃদুস্বরে বলল, “আপনার বাবা…?”

“তিনি বহুবছর আগেই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন…!” ক্লান্ত উত্তর। অধিরাজ বিব্রত হয়ে বলে, “ও:! আই অ্যাম সরি…আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি…!

“সরি হওয়ার কিছু নেই…!” তাঁর মুখ যেন আরও একটু বেঁকে যায়। হাসিতে না ব্যঙ্গে বোঝা কঠিন। একটু দম নিয়ে বললেন, “উনি ধরাধাম ছেড়ে যাননি….দিব্যি বেঁচেবর্তে আছেন…তবে এদেশে নয়… আমেরিকায় … ওখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর… রি… রিসার্চ করছেন… নোবেল পাওয়ার ইচ্ছে আছে বোধহয়…”

“এটা আপনি এখন আমাদের বলছেন?”

এবার ডঃ শেঠি মুখ খুললেন, “কতবার জিজ্ঞেস করেছি যে খবর দেওয়ার মতো কেউ আছেন কী না! আর আপনি এই ইনফর্মেশনটা এখন দিচ্ছেন?”

“কারণ দিয়েও কোনো লাভ নেই…” কৌশিক ক্লান্ত ভঙ্গিতে বললেন, “তিনি তাঁর রিসার্চের স্বার্থে ও আমেরিকান গভর্নমেন্টের কৃপা পাওয়ার জন্য… বহুবছর আগেই দু-জন আমেরিকান লেডিকে… বিয়ে করে ফেলেছেন…প্রথমজনের সঙ্গে স্রেফ সমঝোতার বিয়ে ছিল…ফর গ্রীনকার্ড অ্যান্ড আমেরিকার জামাই হওয়ার ফেসিলিটিজ পাওয়ার জন্য…তাই টেকেনি….পরে অবশ্য আর একজনকে নিয়ে সুখে ঘর-সংসার করছেন…আমার জন্য তাদের ফেলে দৌড়ে আসবেন বলে মনে হয় না…”

অধিরাজ শান্তভাবেই বলে, “আপনার কী মনে হয় সেটা এই মুহূর্তে ইম্পর্ট্যান্ট নয় ডঃ চক্রবর্তী। যখন আপনার বাবা জীবিত আছেন, তা যেখানেই থাকুন না কেন, আমাদের এই ইনসিডেন্টটা ওঁকে জানাতেই হবে। তারপর উনি আসবেন কী আসবেন না সেটা ওঁর ব্যাপার। আপনার বাবার কন্ট্যাক্ট নম্বর বা বিদেশের ঠিকানা, উনি যে ল্যাবে কাজ করেন তার নম্বর, কিছু কী আছে?”

একটু চুপ করে থেকে তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন তিনি। অর্থাৎ আছে।

“বাবার নাম?”

“ডঃ… সু…সুধাংশু চক্রবর্তী” কাঁপা অথচ অভিমানী স্বরে উত্তর এল, “দেখুন… আমার ফোনেই সেভড… আছে…। ওঁর আমেরিকার ডাইরেক্ট নম্বর… ।”

“কী। সুধা… মানে ডঃ সুধাংশু চক্রবর্তী আপনার বাবা। এই কথাটা আগে জানাতে কী হয়েছিল?”

ডঃ শেঠি আফসোসে মাথা নাড়েন, “সুধাকে আমি পার্সোনালি খুব ভালোভাবেই চিনি। হি ইজ আ ব্রিলিয়ান্ট নিউরোসার্জেন। ইউ এস এ যতবার গেছি ওঁর বাড়িতে ভিজিটও করেছি। সুধাংশুর স্ত্রী বার্বারা বা বার্ব, ছেলে এরিককে খুব ভালোভাবেই চিনি। আপনি নিজের পিতৃপরিচয় দিলে আগেই ওঁকে জানাতে পারতাম। ইনফ্যাক্ট আমার কাছেই ওঁর নম্বর আছে।”

বলতে বলতেই গজগজ করতে করতে বাইরের দিকে চলে গেলেন তিনি। হয়তো কৌশিকের পিতৃদেবকেই ফোন করতে গেলেন। অধিরাজ অর্ণবের দিকে তাকিয়ে তাকে ডঃ শেঠির পেছন পেছন যেতে বলতেই যাচ্ছিল। কিন্তু বলার প্রয়োজনই পড়ল না। সে তাকানো মাত্রই অর্ণব বিনাবাক্যব্যয়ে ডঃ শেঠিকে ফলো করে।

অধিরাজ আর সময় নষ্ট না-করে আসল প্রসঙ্গে আসে, “কে বা কারা আপনাদের ওপর অ্যাটাক করেছিল তা বলতে পারবেন? চিনতে পেরেছিলেন কাউকে?”

তিনি অবসন্নভাবে মাথা নাড়েন, “না… ওদের মুখে মাস্ক ছিল… কিচ্ছু দেখতে পাইনি…।”

“আন্দাজ কটার সময়ে ব্যাপারটা ঘটেছিল?”

এবার চোখে অন্ধকার জমল কৌশিকের। বিহ্বলভাবে কিছু যেন ভাবার চেষ্টা করেন। তারপর বললেন, “এগজ্যাক্ট টাইমিং বলতে পারব না অফিসার। মনে হয় বিফোর ডিনার। আই মিন….আমরা তখনও ডিনারে বসিনি হয়তো…!”

“ওকে।” সে পরের প্রশ্নে যায়, “ডঃ বসু আপনাকে দেখতে আসেননি? ওঁর তো জানার কথা। আপনার ওপর অ্যাটাকের কথা গোটা শহর জেনে বসে আছে। জেনিথের কোনো কর্মী আসেনি? কিংবা আপনার কোনো টিমমেট?”

“জানি না। এসেছিলেন হয়তো…।” তিনি কোনোমতে টেনে টেনে বলেন, “তখন হয়তো আমার সেন্স… ছিল না…।” বেডের পাশে একজন লেডি ডক্টরও ছিলেন। ভদ্রমহিলা ডঃ শেঠিকে অ্যাসিস্ট করেন। তিনি নিজেই জানালেন, “ওঁদের মধ্যে অনেকেই এসেছিলেন। আপনি ডঃ সঞ্জয় বসুর কথা বলছেন তো? উনি তো সবার প্রথমেই এসেছিলেন। তারপর ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার আর একজন লেডিও এসেছিলেন। ভদ্রমহিলাকে চিনি না, তবে বেশ সুন্দরী আর স্টাইলিশ।”

অধিরাজের আইডেন্টিফাই করতে একটুও অসুবিধে হল না। উনি নি:সন্দেহে সুহাসিনী মিত্র। সে ডঃ কৌশিকের মুখের দিকে তাকায়। ওঁর বাঁকা মুখটা আরও বেঁকে গিয়েছে। হাসছেন না অন্য কিছু বোঝা মুশকিল। আস্তে আস্তে বললেন, “অফিসার, আপনাকে ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছি না… আর একটু কাছে আসবেন?”

অধিরাজ এবার ওঁর বেড ঘেঁষে দাঁড়ায়। তিনি দুর্বল হাতটা তুলে তার হাত চেপে ধরেছেন। কোনোমতে ফিশফিশ করে বললেন, “সত্যি করে বলুন তো… আমি বাঁচব না, তাই না?”

আবার একটা ভয়াবহ প্রশ্ন। সে কিছু বলার আগেই লেডি ডক্টর ধমকে উঠলেন, “এসব আবার কী কথা। আপনি একদন সুস্থ হয়ে যাবেন।”

“ডোন্ট গিভ মি হল রি-অ্যাশিওরেন্স।”

ওঁর কণ্ঠে ত্রাস। অধিরাজ টের পেল ভদ্রলোকের হাত থরথর করে কাঁপছে। কোনোমতে বললেন, “আই অ্যাম আ ডক্টর অসা। তাই সব বুঝতে পারি। আমি আমার কোমর, পা–কিছু ফিল করতে পারছি না। তার মানে আবার প্যারালাইজড…। আর আমার শত্রুরা সবাই ভিজিট করছে। ওরা দেখতে চায় আমি মরেছি কী না। … প্রথমবার মরিনি তাই…।”

“এরকম কেন ভাবছেন?” অধিরাজ মনে মনে উত্তেজিত হলেও বাইরের শান্ত, সংযত ভাব বজায় রাখে, “ওরা আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী। আপনার টিমমেটরা আসবেন সেটাই তো স্বাভাবিক।”

“ইয়েস… টিমমেট…!” তিনি ক্রমাগতই অশান্ত হয়ে উঠছেন, “কিন্তু শুভাকাঙ্ক্ষী কোনোমতেই নয়। ওঁরা আমাকে মারতে চায়।…ফাঁসানোর চেষ্টাও করেছিল। সুজাতা এই ডঃ ডেথের ব্যাপারটা বলার আগেই… জেনিথে… জেনিথে…!”

“হ্যাঁ।”

সে জানতে চায়, “কী হয়েছিল জেনিথে?”

“একুশ সালের এগারোই সেপ্টেম্বর জেনিখে… একজন এজেড পেশেন্ট… কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে মারা যান…!”

কৌশিকের কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল। ক্রমাগতই যেন ওঁর উত্তেজনা বাড়ছে। হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন, “আমি সকালে পেশেন্টকে চেক করেছিলাম।…ওঁর ব্লাডপ্রেশার একদম নর্মাল। ছিল… ওয়ান ফটি বাই এইটি এম এম এইচ জি, অক্সিজেন। স্যাচুরেশন লেভেল নাইন্টি সেভেন পার্সেন্ট, হার্টরেট এইট্টি বিটস পার আওয়ার, ফাস্টিং ব্লাড সুগার সেভেন্টি ফাইভ, বরং তিনদিন ধরে পি পি বি এস সেভেন্টির নীচে দেখাচ্ছিল, নো ট্রেস অব হাই ক্রিয়েটিনাইন, পারফেক্ট এল এফ টি…। আমার মনে হয়েছিল ওষুধের ডোসেজ এবার কমানো দরকার…আর পিপিবিএসের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল… যে পেশেন্টের… হাইপোগ্লাইসেমিয়া না হয়ে যায়… ইউ নো, সুগার ফল…হুইচ ইজ অলসো নট গুড… তাই আমি ইনসুলিন আর সুগারের মেডিসিন সাময়িক অফ রাখতে বলি…।”

“রিল্যাক্স ডঃ চক্রবর্তী।”

ভদ্রলোক কথা বলার জন্য রীতিমতো যুদ্ধ করছেন দেখে অধিরাজ তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করে, “আমি শুনছি… । আপনি ধীরে সুস্থে বলুন।”

কৌশিক এবার অপেক্ষাকৃত শান্ত হয়ে থেমে থেমে সেদিনকার ঘটনাটা খুলে বলেন। পেশেন্টের পোস্টগ্র্যান্ডিয়াল ব্লাড সুগার ক্রমাগতই নামছে দেখে তিনি ইনসুলিন আর ডায়াবেটিসের মেডিসিন সাময়িক অফ রাখতে বলেন। নয়তো সুগার ফল করার ফলে সুস্থ হয়ে ওঠা পেশেন্টটি আবার অসুস্থ হয়ে পড়তে পারতেন। ভদ্রলোকের থাইরয়েড একদম সুনিয়ন্ত্রিত ছিল তাই থাইরয়েডের মেডিসিন আগেই বন্ধ করে দিয়েছিলেন। মেডিসিন চার্টে এসবই হেরফের করে তিনি কিছুক্ষণের জন্য হাইকোর্টে চলে গিয়েছিলেন। কারণ কোর্টে ওঁর দু-দুটো কেস তখন একসঙ্গে চলছিল। একটা ডঃ বসুর বিরুদ্ধে। অন্যটা হিট অ্যান্ড রান কেসের। সেদিন ডঃ বসুর কেসের শুনানিই ছিল, কিন্তু সঞ্জয় নিজের উকিলের মাধ্যমে শেষপর্যন্ত এমার্জেন্সি কেসের দোহাই দিয়ে অ্যাপিয়ার করেননি বলে অনেকক্ষণ বসে থেকে তিনি শেষপর্যন্ত ফের জেনিথে ফিরে যান।

কিন্তু ফেরামাত্রই মারমার করে কিছু লোক তাঁর দিকে ছুটে আসে। তিনি কিছু বোঝার আগেই ওঁকে ধরে টানাটানি শুরু হয়ে যায়। বিস্মিত কৌশিক কিছু বোঝার আগেই ক্রুদ্ধ ভিড়ের ধাক্কায় মাটিতে পড়ে যান। সিকিউরিটি গার্ডরা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ওঁকে উদ্ধার করে হসপিটালের ভেতরে নিয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু এরপর যা জানা গেল তাতে রীতিমতো মাথায় বজ্রাঘাত হয় তাঁর। যে বয়স্ক পেশেন্টটিকে সকালেই একদম ফিট অ্যান্ড ফাইন দেখে গিয়েছিলেন, তিনি নাকি মারাত্মক কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে মারা গিয়েছেন। এবং গুজব ছড়িয়েছে যে ভদ্রলোকের মেডিসিন স্টপ করে দেওয়ার জন্যই এই বিপত্তি। স্বয়ং ডঃ সঞ্জয় বসুই নাকি এ কথা বলেছেন। বাইরে যারা ওঁর ওপরে চড়াও হয়েছিল তারা বিক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ পেশেন্টপার্টি। সর্বোপরি তিনি যে সময়ে কোর্টে উপস্থিত ছিলেন, সেই সময়েই নাকি হসপিটালের সিসিটিভি ফুটেজে ওঁকে পেশেন্টের আই ভি ড্রিপে কিছু ইঞ্জেক্ট করাতেও দেখা গিয়েছিল। ডঃ বসু সেইসব ফুটেজ জেনিথ কর্তৃপক্ষের কাছে জমাও দেন। ডঃ কৌশিক চক্রবতীর ওপরে মেডিক্যাল নেগলিজেন্সের দায়ও পড়ে। হসপিটালের মেডিক্যাল বোর্ড এর জন্য রীতিমতো ইনভেস্টিগেটিং কমিটিও গঠন করে যার মধ্যে স্বয়ং ডঃ বসুও ছিলেন। আর উইটনেসদের মধ্যে সুহাসিনী, ইন্দ্রজিৎ, রঞ্জন, শীলা সবাই উপস্থিত। ওঁরা প্রত্যেকেই কৌশিকের বিরুদ্ধে বয়ান দিয়েছিলেন। তাঁর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছিল। শুধুমাত্র সিসিটিভি ফুটেজ আর ওঁদের বয়ানেই কৌশিক ফেঁসে যেতেন, যদি না ফুটেজ অস্পষ্ট হত। ফুটেজে স্রেফ তাঁর পেছনটা দেখা গিয়েছিল। মুখ কখনোই দেখা যায়নি। তাছাড়া অন্যান্য দিক দিয়ে তদন্ত করে কমিটি এই সিদ্ধান্তে আসে যে ডঃ চক্রবর্তীর মেডিকেশন পালটে দেওয়াটা আদৌ ভুল সিদ্ধান্ত ছিল না। বরং ওটাই সঠিক। তাই সেবার মেডিক্যাল নেগলিজেন্সের কোপ থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন তিনি।

“ওরা… কেউ… আমার… ওয়েল উইশার… নয়…!”

অতিকষ্টে বলছিলেন ভদ্রলোক, “এর দু-সপ্তাহ পরে পঁচিশ তারিখ… হিট অ্যান্ড রান… কেসটার জন্য…কোর্টের ডেট ছিল। সেদিন যখন জেনিথ থেকে বেরোচ্ছিলাম… দেখি, ডঃ বসু একজন পেশেন্টের দিকে অদ্ভূত পাথরের মতো দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন….। ওঁর মুখে হাসি… কিন্তু চাউনিটা অদ্ভুত!”

তিনি সজোরে কেশে ওঠেন। সিস্টার ও লেডি ডক্টরটি সঙ্গে সঙ্গেই ওঁকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। হাঁটুর নীচের বালিশটা সরে গিয়েছিল। সেটাকে ঠিকঠাক করে দিয়ে, ওঁর পজিশন নিখুঁত করে, রোগীর শুকনো ঠোঁট সামান্য ভিজিয়ে বললেন, “একটু কম কথা বলুন। আর এত উত্তেজিত হবেন না। আস্তে।…আস্তে…।”

তিনি সাগ্রহে ঠোঁট চেটে ডিস্টিলড ওয়াটারের স্বাদ নিলেন। তারপর একটু শান্ত হয়ে বললেন, “থ্যাংকস।”

তাঁকে একটু ধাতস্থ হওয়ার সময় দিয়ে অধিরাজ জানতে চাইল, “তারপর?”

“তারপর সেদিন রাতেই জানতে পারলাম… সেই পেশেন্টের কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছে… তিনি কোমায় …।”

“বেড নম্বর মনে আছে?”

“বি ওয়ার্ডের ওয়ান থ্রি জিরো টু নাম্বার বেড।”

“আর এগারো তারিখ যিনি মারা গিয়েছিলেন?”

“ই ওয়ার্ডের টু ফাইভ নাইন ফোর এ। ওটা ডাবল কেবিন ছিল।”

“আচ্ছা…।”

সে কৌতূহলী হয়ে জানতে চায়, “আপনার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট কী করে হল বা তার আগে বা পরে কী হয়েছিল বলতে পারেন?”

কৌশিক বিষন্নভাবে মাথা নাড়েন, “নাঃ, একদম ডিটেলসে বলতে পারব না। কারণ কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের পর বেশ কিছুদিন সেন্সলেস অবস্থায় ছিলাম। তবে আমি তার আগে কয়েকদিন ধরে একটু আনওয়েল ফিল করছিলাম। ডিহাইড্রেশন হচ্ছিল সামান্য। ডঃ বসু কিছু মেডিসিন আর হসপিটাল থেকে একটা আই ডি সলিউশনের ব্যাগ দিয়েছিলেন। তার দু-দিন পরেই…।”

“কী মেডিসিন?”

অধিরাজের দৃষ্টি প্রখর হয়ে ওঠে। কৌশিক কিছুক্ষণ ভাবার চেষ্টা করলেন। তারপর ব্যর্থ হয়ে বললেন, “মেডিসিনের নাম মনে পড়ছে না। ডঃ বসু দিয়েছিলেন, আমিও খেয়ে নিয়েছিলাম। অত দেখিনি। আই ভি ড্রিপটাও নিয়েছিলাম।”

“ওকে।”

অধিরাজ এবার উঠে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রোগীকে জ্বালানোর কোনো মানে হয় না। সে দেবাংশু জানার দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায়

“ইয়েস। উই শুড গো নাও।”

ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবও উঠে দাঁড়িয়েছেন। ওরা বেরিয়ে আসতেই যাচ্ছিল, তার আগেই একজন সিস্টার গটগটিয়ে এসে কয়েকটা পেপার আর একটা পেন এনে কৌশিকের হাতে যত্ন করে ধরিয়ে দেয়। নরম সুরে বলল নার্সটি, “স্যার, এটা সাইন করে দিন।”

অধিরাজ ভুরু কুঁচকে দরজার সামনেই থমকে দাঁড়ায়। পেশেন্টকে দিয়ে ঠিক কী সাইন করানো হচ্ছে!

“এটা… কী?”

“এটা একটা নর্মাল প্রসিডিওর স্যার।” মেয়েটি একটু দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে জানাল, “আপনার স্পাইনাল কর্ড থেকে বুলেটটাকে বের করে আনার একটা চেষ্টা করতে চান ডঃ শেঠি। কাল ভোরে ও টিতে নিয়ে যাওয়া হবে। সেজন্যই আপনার ফ্যামিলির অন্য কেউ বা গার্জিয়ানকে খুঁজছিলাম আমরা। কিন্তু সেরকম কেউ যখন এই মুহূর্তে এখানে উপস্থিত নেই, তখন আপনাকেই সাইন করতে হবে স্যার। আপনি বরং টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনসগুলো একবার পড়ে নিন।”

অধিরাজ লক্ষ্য করল কৌশিক একটু কষ্ট করে হলেও পেনটা ধরতে পেরেছেন। হাত কাঁপছে। কিন্তু সেই টিপিক্যাল মুদ্রাদোষটা যায়নি। এখনও টুকটুক করে পেনের বাটনটা টিপে যাচ্ছেন। তাঁর চোখ অতিকষ্টে পেপারে লেখা শব্দগুলো পড়ছে। আর ডান হাতটা পেনের পুশ বাটন বা থ্রাস্ট ডিভাইসটাকে টিপেই চলেছে। প্রায় তিনমিনিট ধরে পেনটার প্রায় প্রাণ বের করে দিয়ো শেষে হাসলেন তিনি, “এত কথা লেখার… দরকার কী ছিল?…শুধু লিখে দিলেই হত যে আমি সজ্ঞানে নিজের ডেথ কনসেন্টে সাইন করছি। অপারেশনের সময় আমার মৃত্যু হলে কর্তৃপক্ষ বা ডাক্তার কেউ দায়ী থাকবে না। দিন, সই করে দিই।”

অধিরাজ হালকা মাথা নাড়ে। এগুলো রীতিমতো নিষ্ঠুরতা হলেও আইনের দিক থেকে আবশ্যিক। সচরাচর আত্মীয় বা পরিবারের কেউই এই কাগজগুলোয় দুরুদুরু বুকে সাইন করে। লোকটার কপাল এতটাই খারাপ যে নিজের পেপার নিজেকেই সাইন করতে হচ্ছে!

সইটা কোনোমতে করে দিয়ে কৌশিক আস্তে আস্তে আবার এলিয়ে পড়ছিলেন। তাঁর হাত থেকে পেন খসে পড়ল। একটা ক্লান্তির ঘোর আবার গ্রাস করছে মানুষটাকে। এতক্ষণ যেটুকু কথা বলার শক্তি ছিল, তাও নিঃশেষ। শুধু বিড়বিড় করে বললেন, “আমি বাঁচতে চাই…! বাঁচতে চাই….. “

অধিরাজ সেখানে আর না দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে আসে। তার পেছন পেছন ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবও। বাইরে ডঃ শেঠি দাঁড়িয়ে কয়েকজন জুনিয়র ডাক্তারদের কিছু বুঝিয়ে বলছিলেন। তার পেছনেই চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল অর্ণব। অধিরাজকে দেখামাত্রই ডঃ শেঠি জানালেন, “আমরা ডঃ সুধাংশু চক্রবর্তীকে কন্ট্যাক্ট করতে পেরেছি। প্রথমে উনি সব শুনে বেশ ভেঙে পড়েছিলেন। স্ত্রীয়ের মৃত্যুর খবরে শকড। কিন্তু জানিয়েছেন যে ছেলের জন্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তিনি এখানে আসছেন। যদিও সেটা খুব দ্রুত সম্ভবপর হবে না। কিন্তু উনি বুলেটটাকে বের করার একটা চেষ্টা করার অ্যাডভাইস দিয়েছেন। এবং সশরীরে না থাকলেও অনলাইনে, ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নিজেও ও টিতে আমাদের সঙ্গে উপস্থিত থাকবেন। আমাদের ও টিতে সেই সুবিধা আছে। তাই একটা চান্স নিয়েই দেখি।”

“শিশুর স্যার। চান্স তো নেওয়াই উচিত।” বলতে বলতেই সে অর্ণবের দিকে তাকায়। অর্ণব মাথা ঝাঁকিয়ে জানাল যে ডঃ শেঠি সঠিক কথাই বলছেন।

“আচ্ছা ডক্টর…” অধিরাজ সকৌতূহলে প্রশ্ন করে, “উনি আগেও একবার প্যারালাইজড হয়েছিলেন। সেবার ডঃ বসু ওঁর ট্রিটমেন্ট করেছিলেন। সেই প্রিভিয়াস রেকর্ডস বা মেডিক্যাল হিস্ট্রি, রিপোর্টস কিছু পেয়েছেন আপনারা? শুনেছি এগুলো অত্যন্ত জরুরি।”

“হ্যাঁ” তিনি হতাশ, “আশ্চর্যের বিষয় যে আমরা তেমন কিচ্ছু পাইনি। যে লোকটা তিন বছর আগে এরকম একটা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট থেকে উঠেছে তার রিপোর্ট তো দূর, কোনোরকম মেডিকেশনের ডিটেইলসই নেই। অন্য ওষুধ তো ছাড়ুন। সচরাচর হার্টের যারা পেশেন্ট, বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের হিস্ট্রি যার আছে,তার কাছে আর কিছু না থাক, সর্বিট্রেট তো থাকবেই। অথচ ডঃ চক্রবর্তী জানিয়েছেন যে তিনি বর্তমানে কোনোরকম মেডিসিনই নেন না। আমি এর থেকে আশ্চর্যের কথা গোটা কেরিয়ারে আর শুনিনি।”

“স্ট্রে-ঞ্জ।”

অধিরাজের চোখে চিন্তার ঘোর লাগা দৃষ্টি। সে বলে, “ডঃ সঞ্জয় বসুও তো এখানে এসেছিলেন। ওঁর সঙ্গে কথা হয়নি আপনার? উনি কিছু বলেননি এ ব্যাপারে? ডঃ চক্রবর্তীর চিকিৎসা তো তিনিই করেছিলেন।”

“বিলিভ মি, আমি ওঁকেও জিজ্ঞাসা করেছিলাম।” ডঃ শেঠি অসহায়ভাবে দু-হাত ছড়ালেন, “কিন্তু ওঁর জবাব তস্য পিকিউলিয়ার। উনি স্পষ্ট বললেন ডঃ চক্রবর্তীর আপাতত মেডিসিনের কোনো দরকার নেই। উনি কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের সমস্যা সম্পূর্ণ কাটিয়ে উঠেছিলেন। আর ওঁর কোনো ওষুধের প্রয়োজন ছিল না।”

“আপনারা কোনোরকম ইনভেস্টিগেশন করেননি?”

“অফকোর্স করেছি।” তিনি সপ্রতিভভাবে জানান, “আমরা সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড টেস্ট, এম আর আই স্ক্যান, ইকোকার্ডিওগ্রাম, যতরকম ব্লাড টেস্ট সম্ভব, এক্স-রে সবই করিয়েছি। যদি ইনফেকশনের ছড়িয়ে পড়াকে বাদ দেন, তবে ব্লাড টেস্ট একদমই নর্মাল। সি এস এফ টেস্টে স্পাইনাল কর্ডে ইনফেকশন আর ইনফ্লেমেশন পেয়েছি যেটা পাওয়াই স্বাভাবিক। বুলেট উন্ডের ফলে এদুটোই হবে। এম আর আই রিপোর্ট বলছে ইনফ্লেমেশন আর ল্যাক অব ব্লাড সাপ্লাই আছে। এটাও নর্মাল যেহেতু ওঁর কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের হিস্ট্রি আছে ওপরন্তু স্পাইনাল কর্ডে ইন্টারনাল ব্রিডিং হওয়ার দরুণ ল্যাক অব ব্লাড সামাই থাকারই কথা। ওটাকে থামানো যাবে। কিন্তু ইনফেকশন আর ইনফ্লেমেশন না পেলেই বরং অবাক হতাম। এক্স রে-তে স্পাইনাল কর্ডের করুণ অবস্থাও দেখেছি। স্প্যাজম তো থাকবেই। বুলেট ইমপ্যাক্টের ফলাফল আপনি আর কী আশা করেন। এছাড়া আর কোনো অস্বাভাবিকতা নেই।”

“তার মানে যদি এই মার্ডার অ্যাটেম্পটটা না হত তবে ডঃ চক্রবর্তী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠতেন?”

“অফকোর্স অফিসার।” ডঃ শেঠির মুখে আত্মবিশ্বাসের পাশাপাশি একটু সংশয়ও দেখা দেয়, “উনি নিশ্চয়ই সুস্থ হতেন যদি না ফের আর একটা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বা স্টোক এসে পড়ত। টু বি ভেরি অনেস্ট, ডঃ বসু কোন আক্কেলে মেডিকেশন বন্ধ করে দিলেন তা আমার বুদ্ধির বাইরে। হতেও পারে ওষুধের প্রয়োজন ছিল না। ডঃ নসু একটু প্রাচীনপন্থী আত্র কথায় কথায় ওষুধ গিলিয়ে দেন না। তাছাড়া ডঃ চক্রতীর হার্টে কোনোরকম অস্বাভাবিকতাও ধরা পড়েনি। সে আস জিনিয়াস ডক্টরস। যা ভালো বুঝেছেন তাই করেছেন… কী আর বলি।”

অধিরাজ একটু কী যেন ভেবে জানতে চায়, “বাই এনি চান্স ডঃ সুধাংশু চক্রবর্তী আর ডঃ সঞ্জয় বসু’র মধ্যে কোনো কানেকশন আছে বা ছিল?”

এবার ভদ্রলোকের মাথায় একটু চিন্তার ভাঁজ পড়ল। তিনি আমতা আমতা করে বললেন, “দেখুন, আমি জানি না আমার বলা ঠিক হবে কী না… আই মিন, পুরোটাই রিউমার হতে পারে…।”

“আপনি যা শুনেছেন তা বলুন, বাকীটা আমরা বুঝে নেব।”

“যতদূর জানি যে সুধা আর ডঃ বসুর মধ্যে একসময় দারুণ সম্পর্ক ছিল। সুধার প্রথম বিয়ের পরও ডঃ বসু প্রায়ই ওঁদের সঙ্গে সঙ্গে থাকতেন, একসঙ্গে ডিনার পার্টিতে, ইভেন ঘুরতেও যেতেন। ডঃ বসুর বিয়ের পরও সে বন্ধুত্ব অক্ষুণ্ণ থেকেছে। কিন্তু যেই সুধাংশু বিদেশে গেলেন, ঠিক তখন থেকেই দু-জনের সম্পর্কে চিড় ধরেছিল। ইভেন, আপনারা শুনেছেন কী না জানি না, দ্য লাস্কার অ্যাওয়ার্ডও পাওয়ার কথা ছিল ডঃ বসুর। কিন্তু সুধাংশু সাম হাউ সেখানেও বাগড়া দিয়ে বসে আছেন।” তিনি করুণ হাসলেন, “সো বলা ভালো, যে দে আর এনিমিজ নাও। এগুলো কিন্তু সবই আমি সুধাংশু আর ওঁর অ্যাসোসিয়েটসদের কাছ থেকে শুনেছি। খুব ডিটেইলসে জানি না। ইনফ্যাক্ট ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী যে সুধার ছেলে, আর উর্মিলা ওঁর প্রথম স্ত্রী-সেটাই জানতাম না! আমি ওঁর থার্ড ওয়াইফ আর আমেরিকান ছেলেটাকেই চিনি। এদিককার খবর তেমন জানি না। তাই যতটুকু জানালাম তাও কতটা বিশ্বাসযোগ্য তা বলতে পারব না।”

“থ্যাংকস ফর দ্য অ্যাডভাইস।”

অধিরাজ আর একটা কথাও না বাড়িয়ে বেরিয়ে এল। তার মুখে ঘন চিন্তার মেঘ। সে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবকে সসম্মানে বিদায় দিয়ে অনেকক্ষণ নীরবতা বজায় রাখল। তারপর অর্ণবের দিকে অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে বলে, “এ তো আর এক সেট নতুন হেঁয়ালি! ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী কোর্টে থাকলে ওই একই সময়ে তাঁর ফুটেজ জেনিথের সিসিটিভি ক্যাপচার করল কী করে? ডঃ বসুর রোল তো এখানে আরও বেশি রহস্যময় লাগছে। যাকে ব্যাকস্ট্যাবার বলেন, তাকেই বাচান, আবার তাকেই ফাসান। রণজয় দেখছি ঠিকই বলেছিলেন। ওঁর পিতৃদেবের ভালোবাসা বড়োই খতরনাক।”

“ওঁর নিজের পিতৃদেবের প্রতি ভালোবাসাও কিছু কম খতরনাক নয় স্যার।”

অর্ণব মনে করিয়ে দেয়, “আমি এখনও ভেবে যাচ্ছি যে ঠিক কোন পদ্ধতিতে উনি ওঁর বাবার ‘বোলতি বন্ধ করবেন।”

“সেটা আমারও চিন্তার কারণ, “ অধিরাজ আত্মমগ্নস্বরে বলল, “তার থেকেও বড়ো চিন্তার বিষয় যে একটা লোক একসঙ্গে দু-জায়গায় কী করে উপস্থিত থাকে। এরিক কৌশিকের বায়োলজিকাল ব্রাদার হতে পারে, কিন্তু সে আমেরিকান ভার্সান নিশ্চয়ই কৌশিকের মতো দেখতে নয়। তাহলে কৌশিক যদি এগারোই সেপ্টেম্বর কোর্টে থাকেন, তবে জেনিথের ফুটেজে কে ছিল?”

“ফুটেজ তো এডিটও করা যায় স্যার।”

“তা যায়…!” অধিরাজ ফের একটা স্টিক ঠোঁটে গুঁজে বলে, “মিস দত্তকে ফোন লাগাও তো।”

আত্রেয়ী দত্ত আর টুইঙ্কল অরোরা তখন ফরেনসিক ল্যাবে ঢুকছিল। উর্মিলাদেবীর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট নেওয়ার উদ্দেশ্যেই গিয়েছিল ওরা। অর্ণবের ফোন পেয়ে উত্তেজিত হয়ে জানতে চাইল এদিকে কোনো লিড আছে কী না।

“সেটা সাক্ষাতে বলব মিস দত্ত। কিন্তু একবার ফোনটা মিস অরোরাকে দিন তো।”

কথাটা অবশ্য বলার প্রয়োজন ছিল না। ফোনটা আত্রেয়ী আগেই লাউডস্পিকারে দিয়ে রেখেছে। পাশ থেকেই টুইঙ্কলের জোরালো আওয়াজ ভেসে আসে, “বলুন স্যার।”

অধিরাজ কোনোরকম ভূমিকা ছাড়াই তাকে ধড়াম করে প্রশ্ন করে বসে, “মিস অরোরা, আপনি শীলা বসাকের বাড়ি থেকে মাশরুম লিফট করলে তবু বুঝতে পারি। কিন্তু ওয়ার্ডবয় সুশান্তর ঘর থেকে একজোড়া জুতো তুলে এনে ল্যাবে দিয়ে এলেন কেন?”

“ওজি…!” টুইঙ্কলের সপ্রতিভ উত্তর, “কিউ কী সমস্ত ঘরে ওই একটা জিনিসই ছিল যেটা গড়বড়ি থিং!”

অর্ণব ঢোঁক গেলে। গড়বড়ি থিং শেষে জুতো। সে আবার কী!

“এরকম কেন মনে হল আপনাদের?” সে কৌতূহলী, “জাস্ট ওয়ান্না নো।”

“স্যার, ওই একজোড়া জুতো ফার্স্টলি ডক্টরস শ্যু। সুশান্ত তো চাঙ্গা হাট্টাকাট্টা আদমি। তার আমার দাদির মতো বাতও নেই যে ডক্টরস শ্যু পরে ঘুরবে। তার ওপর ওটার মধ্যে একটার সোল আবার কেটে স্টিচ করা। মানে একপাটি জুতোর সার্জারি হয়েছে। আমার আর কৌশানী দিদির গোটা ব্যাপারটাই ঝোল মনে হয়েছিল।” টুইঙ্কল বুঝিয়ে বলে, “কেউ খামখা একটা ডক্টরস শ্যু কিনে সেটাকে কেটে ফের সিলাই কেন করবে। তাই ওটাকেই তুলে এনেছিলাম। ভাবলাম চ্যাটার্জি স্যার যদি কিছু মালুম করতে পারেন। কিন্তু উনি তো হালুম করছেন!”

“উনি সবসময়ই হালুম করে থাকেন” সে সপ্রশংস ভঙ্গিতে বলল, “বাট আই মাস্ট অ্যাডমিট, সুপার্ব ওয়ার্ক সেনোরিটাজ। কিন্তু জুতোটা ল্যাবে না রেখে ব্যুরোয় নিয়ে আসুন। মিস মুখার্জি বা মিস… ইয়ে যদি উপস্থিত থাকেন তবে জাস্ট একবার পরীক্ষা করে নিতে বলবেন, ওই জুতোর ভেতরে সুশান্তর ফুটপ্রিন্ট আছে কী না।”

“ওকে স্যার।”

টুইঙ্কলের দ্রুত উত্তর ভেসে এল।

“আর মিস দত্ত…?”

এবার ও-প্রান্তে আত্রেয়ী দত্তর কণ্ঠ জাগ্রত হয়েছে, “ইয়েস স্যার?”

“আপনি একবার খোঁজ নিন যে ২০২১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জেনিথে কোনো বয়স্ক পেশেন্টের অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে পেশেন্টপার্টি হল্লা করেছিল কী না! যদি করে থাকে তবে ওইদিনের ভিডিও ফুটেজ তুলে আনুন, আর খবর নিন ওই মাসেরই ২৫ তারিখ আরও একটা আনন্যাচারাল ডেথ হয়েছে কী না। প্রবাবল বেড নাম্বার ই ওয়ার্ডের টু ফাইভ নাইন ফোর এ আর বি ওয়ার্ডের ওয়ান থ্রি জিরো টু। এই দুটো ফাইল আমার টেবিলে ইমিডিয়েটলি চাই!”

সে কথা শেষ করতে না করতেই তার ফোনে দেশ রাগ ঝঙ্কার দিয়ে উঠেছে। অধিরাজ দেখল, বিশ্বজিৎ ফোন করছে। “বেগ ইওর পার্ডন সেনোরিটাজ। জাস্ট হোল্ড ফর আ সেক…”

“ওকে স্যার।”

আত্রেয়ীদের অর্ণবের ফোনে হোল্ড করতে বলে ও বিশ্বজিতের ফোন রিসিভ করে, “ইয়েস বিশ্ব, এনি ব্রেকিং নিউজ?”

বিশ্বজিৎ বলল, “স্যার, আপনার কথা অনুযায়ী আমি প্রত্যেকের গত একমাসের মোবাইল লোকেশন চেক করছিলাম। প্রথমদিকে প্রায় সবারই লোকেশন ক্লিন ছিল। কিন্তু…”

“কিন্তু রিসেন্টলি কোনো আনক্লিন রেকর্ড ধরা পড়েছে। অ্যাম আই রাইট?”

“অ্যাবসোলিউটলি” বিশ্ব উত্তেজিত “ডঃ সুজাতা রায়ের মার্ডারের দিন, মার্ডারের ঠিক একঘণ্টা আগে থেকে, ডেথ টাইমিং এর আধঘণ্টা পর অবধি ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার আর সুহাসিনী মিত্র ম্যাডামের সেলফোন ওখানেই অ্যাকটিভ ছিল।

মানে দু-জনেই ক্রাইম স্পটে, অথবা কাছাকাছি ছিলেন।”

“গ্রে–ট।”

অধিরাজ উত্তেজনায় সিটের ওপরই চাপড় মারে, “আর একটা লাস্ট কাজ করে দাও বিশ্ব।”

“বলুন স্যার।”

“২০২১ এর ১১ সেপ্টেম্বর আর ২৫ সেপ্টেম্বর ডঃ কৌশিক চক্রবর্তীর ফোনের লোকেশন ঠিক কোথায় কোথায় ছিল একটু জানাও। সঙ্গে ডঃ সঞ্জয় বসুর লোকেশনের ডিটেইলস দিতেও ভুলো না।”

“হো যায়েগা স্যার।”

বিশ্বজিৎ আত্মবিশ্বাসী। অধিরাজ লাইন কেটে দিয়ে এবার আত্রেয়ীকে ধরে,

“মিস দত্ত, আপনাদের জন্য আরও একটা কাজ আছে।”

“ইয়েস স্যার?”

“ফরেনসিক ল্যাব থেকে বেরিয়েই সুহাসিনী মিত্রর বাড়িতে আপনি আর মিস অরোরা চলে যান আর মহিলাকে তুলে আনুন। ইন্টারোগেশনের জন্য নয়। একদম অ্যারেস্ট। চার্জ আমি বুঝে নেব। মিস অরোরাকে বলবেন বেশি চালাকি করলে তিনি যেন কুচুকুচুও করে দ্যান। নো জেন্টলনেস নিডেড দিস টাইম।”

“ওকে। হয়ে যাবে।”

মিস দত্তকে ছেড়ে দিয়েই অর্ণবের দিকে তাকাল অধিরাজ। অর্ণব ব্যুরোর দিকেই যাচ্ছিল। তাকে শাণিত স্বরে অর্ডার করল, “গাড়ি ঘোরাও ডার্লিং। ব্যুরোয় পরে যাব। তার আগে ইন্দ্রজিৎ সরকারকে ধরা জরুরি।”

“ওঁকেও অ্যারেস্ট করবেন স্যার?”

“অবভিয়াসলি।”

অধিরাজ দাঁতে দাঁত পিষল, “সবাই অনেক মাইও গেম খেলেছে। এবার আমরা ওদের মেমোরি টেস্ট দিয়ে দেখব কে কত জলে দাঁড়িয়ে আছে!”

“তবে কী ওরাই!”

অর্ণবের প্রশ্নটাকে থামিয়ে দিয়ে সে রুক্ষস্বরে বলে, “অনেক মিথ্যে বলেছেন এঁরা। কিন্তু ভুলে গেছেন ক্রাইম নেভার পেজ। জট অনেক পাকানোর চেষ্টা হয়েছে। বাট…”

তার অনুচ্চারিত বাক্যটা বুঝতে পেরে হার্টবিট বেড়ে গেল অর্ণবের। এই কনফিডেন্ট কণ্ঠ সে হাড়ে হাড়ে চেনে….।

দ্য পাজল ইজ অলমোস্ট সলভড।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *