ডঃ ডেথ – ৫

কিছু কিছু মুহূর্ত মাঝেমধ্যেই বড়ো শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে ওঠে। কোথাও হয়তো অস্বাভাবিক কিছু নেই, তবু মনে হয় কোনো কিছুই বুঝি স্বাভাবিক নয়! অথবা এই আপাত স্বাভাবিকতাই সবচেয়ে বেশি অস্বাভাবিক! যেমন এই মুহূর্তেই অর্ণবের মনে হচ্ছে, চতুর্দিকে এত শান্তি কেন? আদৌ কী সবকিছু এত প্রশান্ত হওয়া উচিত!

ওদের গাড়ি এখন ডঃ সুজাতা রায়ের অ্যাপার্টমেন্টের দিকে ছুটছে। সে রাতেই অধিরাজ সুজাতার অ্যাড্রেস নিয়ে নিয়েছিল। এছাড়া জেনিথের রেকর্ডেও ওর ঠিকানা নথিবদ্ধ। তাই কোনোরকম অসুবিধে হয়নি।

গাড়ি ড্রাইভ করতে করতেই জানলার বাইরে তাকায় অর্ণব। আজন্ম পরিচিত কলকাতার ব্যস্ত রাস্তার ভিড়টাও আজ অচেনা ঠেকছে। দোকানের সাইনবোর্ডে ঝিকমিকে রঙিন আলো জ্বলছে বটে, কিন্তু রংগুলো কেমন যেন নিস্তেজ। লালটা : টকটকে না হয়ে কেমন যেন কালচে। শুকনো রক্তের মতো। নীলটা যেন বরফের মতো ঠান্ডা আর ফ্যাকাশে। সবুজ রঙের আলোয় বোধহয় শ্যাওলার স্তর জমেছে। রাস্তায় আজও হকাররা সাবুর পাঁপড়, পুতুল, গোলাপ, ফুলঝাড়ু বা স্ট্রবেরি [ বেচতে ব্যস্ত। কিন্তু তারা যেন ছায়া ছায়া হয়ে ক্রমাগতই সরে সরে যাচ্ছে। ওদের হাঁকডাকও বুঝি আজ কম শোনা যায়। চতুর্দিকে সবাই এত নির্জীব কেন। নাকি গোটাটাই অর্ণবের ভ্রম?

ফুটপাতের ভিড়েও এক আশ্চর্য ছন্দপতন। জনস্রোত একটু ছন্নছাড়া। সবাই হাঁটছে নিজের গন্তব্যের দিকে। কিন্তু চোখে চোখ পড়ছে না কারও সঙ্গে। যেন প্রত্যেকেই নিজের আশ্রয়ের দিকেই যাচ্ছে, তবু একইসঙ্গে কিছু থেকে নিজের অজান্তেই পালাচ্ছে। বাস আর গাড়ির হর্ন বাজছে ঠিকই, তবু শব্দের ভেতর একটা চাপা ভার। যেন শহরটা চিৎকার না করে নিঃশ্বাস আটকে রেখেছে। কোনো অজানা আশঙ্কায় দমবন্ধ করে রেখেছে কল্লোলিনী!

এই রাস্তার দিকে তাকিয়ে অর্ণবের মনে হচ্ছিল, কিছু একটা ঘটার আগে শহরও বুঝি আগাম সঙ্কেত পায়। তাকে চোখে দেখা যায় না, কিন্তু বাতাসে তার ভার ঠিকই টের পাওয়া যায়। কিন্তু ঠিক কী হতে চলেছে? জেনিথের অভ্যন্তরে ঠিক কী ষড়যন্ত্র চলছে? আবার কারওর শিয়রে শমন ঘনাচ্ছে কী? নাকি অন্য কিছু! সব চেয়ে আশঙ্কার কথা, ডঃ সঞ্জয় বসু এখন মুক্ত। ডঃ ডেথকে আটকে রাখা যায়নি।

একটু আগেই একডজন শশা খাওয়ার পরও মিস টুইঙ্কল অরোরার বেজায় খিদে পেয়েছিল। তার লটকানো বদনখানি দেখে অগত্যা অধিরাজ রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে একগাদা বার্গার, কয়েক প্যাকেট ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর স্যান্ডউইচের র‍্যাশন তুলে নিয়েছে। একটু আগেও সে বিরাট হাঁ করে সেগুলোর সদ্ব্যবহার করতে ব্যস্ত ছিল। এখন কড়া সিগারের গন্ধ পেয়ে অর্ণব বুঝল যে যথারীতি সে ধূমপানে মন দিয়েছে। অধিরাজের ঠোঁটেও ঝুলছে ইন্ডিয়া কিংস। কিন্তু এখনও সেটা জ্বলে ওঠেনি। সিগারেটটা ঠোঁটে আঁকড়ে সে যেন কিছু একটা ভেবেই চলেছে।

অবশেষে এতক্ষণের নীরবতা ভঙ্গ করে কথা বলে উঠল অর্ণবই, “স্যার, আমার তো মনে হয় জেনিথের কোনো ডাক্তারকেই সন্দেহের বাইরে রাখা যায় না। ওঁরা সবাই সমান মিথ্যেবাদী।”

অধিরাজের ডান ভুরুটা কৌতূহলে একটু উঠে যায়, “এমন মনে হওয়ার কারণ?”

অর্ণব বলল, “একজন তো সুন্দরী ড্যাম লায়ার, অথচ প্লাস্টিক হাসি ঝুলিয়ে ঘুরছেন। অন্যজন নিজেরই শুভাকাঙ্ক্ষীকে ব্যাকস্ট্যাব করছেন। তার ওপর ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার। তিনি তো সব কিছুর উর্দ্ধে। যে ওয়ার্ডবয় ওঁর ইললিগ্যাল বিজনেস চালাচ্ছে, তিনি তাকেই লয়াল বলেন। অথচ সে ব্যাটা গেল কোথায় তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। ওঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট

তো আরও ভালো। রঞ্জন নায়েককে দেখলে আপনার হরর ফিল্মের হিরো মনে হয় না? সবসময়ই কীসের ভয়ে থাকেকে জানে। আমরা কিছুই বলিনি, অথচ ঘেমে গলে জল হয়ে গেল। প্রত্যেকেই একেকটা নমুনা।”

অধিরাজ মৃদু হাসল, “ওঁদের সবাইকে মিউজিয়ামে রাখা উচিত বলছ?”

“না। সবাইকে জেলে রাখা উচিত। প্রত্যেকেই ক্রিমিনাল!” অধিরাজ হাত বাড়িয়ে অর্ণবের কাঁধ চাপড়ে দিল, “ব্রিলিয়ান্ট ডিডাকশন অর্ণব। বেসিক্যালি প্রত্যেকেই চমৎকার খুনী হতে পারেন। ডঃ বসুর মোটিভ নেই। কিন্তু বাকিদের আছে।”

“বোলে তো?”

একমুখ তামাকের কড়া ধোঁয়া ছেড়ে বলে টুইঙ্কল, “সবাই কিলার। আগে বলেননি কেন স্যার? সবকটার দাঁতকে বেতাল বত্তিসির কহানি শুনিয়ে দিতাম।”

অর্ণবের কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ে। এ মেয়েটা পারলে গোটা শহরকেই ধরে ফোকলা করে দেয়। কে জানে শুর কোনো আত্মীয় ডেন্টিস্ট কী না। মিস অরোরার দৌলতে তার ব্যবসা ক্রমাগতই বাড়বে।

“এই মুহূর্তে আমি জেনিথের এমপ্লয়িদের সামনে আপনাদের আনতে চাইছি না সেনোরিটা।” সে বলল, “তবে বেতাল বত্তিসির গল্প শোনানোর চান্স আপনি নিশ্চয়ই পাবেন।”

বলতে বলতেই অধিরাজ লাইটার দিয়ে সিগারেটে : অগ্নিসংযোগ করল, “আপাতত আমি তোমার কথা শুনতে। চাইছি অর্ণব। তোমার কী মনে হয়?”

“আমার ওই সুহাসিনী মিত্রকেই প্রাইম সাসপেক্ট মনে হয় স্যার।” অর্ণব এক্সপ্লেইন কবে, “একে তো অ্যাকটিং-এ ওঁর নোবেল পাওয়া উচিত। তার ওপর জাতে ডাক্তার এবং হিস্ট্রিশিটার হওয়ার ফুল চান্স আছে। অভিজ্ঞতাও যথেষ্ট। তাছাড়া মৃতদের প্যাটার্ন লক্ষ্য করুন। সবাই বৃদ্ধ। ওপরন্তু খিটখিটে মেজাজের। উনি নিজের মুখেই স্বীকার করেছেন যে বুড়ো পেশেন্টরা ওঁকে যা তা বলে, ইনসাল্ট করে। একজন ডাক্তারের পক্ষে এতখানি অপমান অসহ্যও হতে পারে। যতই। অপমানিত হন, একজন পেশেন্টকে উলটোপালটা ডায়েট দেওয়াটা কী আদৌ উচিত? এমন নয়তো, উনি এভাবেই ওঁর; প্রতি দুর্ব্যবহারের রিভেঞ্জ নিচ্ছেন?”

“ব্রিলিয়ান্ট ডার্লিং।”

অধিরাজ সস্নেহে তার দিকে তাকায, “তোমার সন্দেহ। অমূলক নয়। বরং যথেষ্ট স্ট্রং থিওরি। যদিও সুন্দরী মহিলা : দেখে প্রথমে একটু গলে গিয়েছিলে। কিন্তু এখন একদম ঠিক বলছ!”

অর্ণব অপ্রস্তুত হয়ে একটু কান চুলকে নেয়, “তবে স্যার, উনি যা মিথ্যে বলেন তাতে কী ওঁর বয়ানের কোনো মূল্য আছে? আই মিন উনি ডঃ কৌশিক আর ডঃ ইন্দ্রজিৎ সম্পর্কে যা পি এন পি সি করলেন সেগুলো গুলতাপ্পিও হতে পারে। হয়তো একটা ডাইভার্সান তৈরি করছেন।”

“অসম্ভব নয়।” সে মাথা ঝাকায়, “কিন্তু আমিও তলে তলে কিছুটা খবর নিয়েছি। ভদ্রমহিলা নিজের সম্পর্কে যতই মিথ্যে বলুন, বাকিদের ক্ষেত্রে একদমই বাজে কথা বলেননি। ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকারের সম্পর্কে মেডিক্যাল ড্রাগ এদিক ওদিক করার একটা গুজব সত্যিই আছে। আর ডঃ সঞ্জয় বসুর সঙ্গে সত্যিই ওঁর ফ্যামিলির সম্পর্ক নেই। ডঃ রণজয় বসু আলাদা ফ্ল্যাটে থাকেন। পিতা-পুত্রের মধ্যে কোনো টকিং টার্মস নেই। এর পেছনে ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী থাকলেও থাকতে পারেন। অন্তত সম্ভাবনাটা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।” সে একটু থেমে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, “তুমি বোধহয় নিউজ চ্যানেলের বা ইউটিউবের ডঃ বসুর বিরোধী পক্ষের বাইট শোননি। ওখানেও কিন্তু ওঁরই কিছু এক্স-পেশেন্ট বলেছেন যে সঞ্জয় চিকিৎসক হিসাবে একেবারেই মহান নন। প্রশ্ন হল, উইদাউট এনি কজ, ওঁরই কিছু পেশেন্ট এভাবে নিজের ফিজিশিয়ানকে ডিফেম করতে নেমেছেন কেন?”

কৌশানী বোস এতক্ষণ চুপ করে সব শুনছিল। এবার বলল, “স্যার, সেক্ষেত্রে যদি ডঃ সঞ্জয় বসু ইনোসেন্ট হন আর তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় তবে সবচেয়ে বেশি লাভবান তিনজন হবেন।”

অধিরাজ প্রগাঢ় দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকায়, “ইয়েস সেনোরিটা। প্লিজ, এক্সপ্লেইন।”

ওই চাউনির সামনে এমনিতেই কৌশানীর হার্টবিট মিস করছিল। কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “রাইট অর রং জানি না। তবে যা মনে হচ্ছে…।”

“প্রসিড।”

“সুহাসিনীর মোটিভ সরকার স্যার আগেই বলেছেন।” সে একটু নিজেকে গুছিয়ে নেয়, “কিন্তু ডঃ কৌশিকের কন্সপিরেসি

সক্ষেত্রে সফল হবে। উনি ডঃ বসুর কাছেও লয়াল থাকলেন। অন্যদিকে ওঁর সবচেয়ে বড়ো কম্পিটিটর কাম রাইভ্যাল ডঃ কৃশানু রায়ের টিমে জয়েন করার রাস্তাও পরিষ্কার হয়ে যাবে। নিশ্চয়ই সেই অফারটা আরও বেশি লুক্রেটিভ। টাকার জন্য মানুষ সব পারে।”

“গ্রেট থিঙ্কিং মিস বোস।” অধিরাজ মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনছে, “বাকি দু-জন?”

“ডঃ কৃশানু রায়।” এবার কৌশানী কনফিডেন্ট, “যতই যা করুন না কেন, এখনও ডঃ সঞ্জয় বসু নম্বর ওয়ান পজিশনে আছেন। সব হসপিটাল বা নার্সিংহোমই ওঁকে যেভাবেই হোক চাইবে বা ফার্স্ট প্রায়রিটি দেবে। ইনফ্যাক্ট আমি গুগলে সার্চ করে দেখলাম ডঃ বসুর রেটিং আর কোয়ালিফিকেশনের ধারে কাছেও কৃশানু আসেন না। ভদ্রলোকের অ্যাচিভমেন্টও প্রচুর। সেখানে কৃশানু জাস্ট হামাগুড়ি দেওয়া ফোলানো বেলুন। ডঃ বসুকে রাস্তা থেকে সরাতে পারলে ওঁর কেরিয়ার দুর্দান্তভাবে টেক অফ করত। কিন্তু যতক্ষণ না সঞ্জয়ের কেরিয়ার ক্র্যাশ করছে ততক্ষণ কোনো চান্সই নেই!”

টুইঙ্কল একটা হাই তুলল, “এর জন্য এত মগজনারির দরকার কী? গ্রাম করে গুলি মেরে উড়িয়ে দিলেই তো হয়!”

অধিরাজ হেসে ফেলল। এই মেয়েটা অ্যাকশন ছাড়া কিছু বোঝেই না! সত্যিই সাক্ষাৎ হনুমান। একটা গাছ খুঁজতে বললে গোটা গন্ধমাদন পাহাড়টাই তুলে আনে। রাবণের ডেরার চুপি চুপি মিটিং করতে গেলে পুরো লঙ্কাই জ্বালাবে। সে হাসতে হাসতেই বলে, “কৃশানুর জায়গায় আপনি থাকলে নির্ঘাত এটাই করতেন মাদমোয়াজেল। তবে এত বুদ্ধি বোধহয় ডাক্তারদের মাথায় থাকে না!”

অর্ণব মুখ ঘুরিয়ে ফিচেল হাসে। বেশ হয়েছে! কথায় কথায় খালি খাওয়া, মুগুর ভাঁজা আর ভায়োলেন্স! কিঞ্চিৎ গ্রে ম্যাটারের চাষও তো করতে পারে। বাবা কালীসাধক বলে সবসময়ই রণরঙ্গিণী মূর্তিতে থাকতে হবে!

টুইঙ্কল হতাশ হয়ে ফের কোঁতকা চুরুটে মন দেয়। অধিরাজের দৃষ্টি ফিরল কৌশানীর দিকে, “প্লিজ, কন্টিনিউ।”

কৌশানী টুইঙ্কলের এই পন্ডিতিতে বিরক্ত হলেও চেপে গেল। সে সপ্রতিভ স্বরে জানায়, “থার্ড ওয়ান খোদ ডঃ বসুরই ওন ব্লাড। ওঁর ছেলে রণজয় বসু!”

অধিরাজের চোখ ঝিকিয়ে ওঠে, “মোটিভ?”

“সিম্পল স্যার।” কৌশানীর স্পষ্ট জবাব, “বাবা থাকতে ওঁর কেরিয়ারের গ্রোথ ইম্পসিবল। নিজে অনেক বেশি যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তেমন পাত্তা পান না। উলটে পিতৃদেব অন্য একজন ডাক্তারকে প্রোমোট করে চলেছেন। হয়তো টাকা এক্ষেত্রে ম্যাটার করে না। কিন্তু প্রেস্টিজ, ইগো ডেফিনিটলি হার্ট হয়। সম্মানটা টাকার চেয়েও বড়ো। আর ছেলে বাবার মুখ দেখছে না মানে মনের মধ্যে গ্রাজ, রিভেঞ্জ নেওয়ার ইচ্ছা থাকতেই পারে। জেলাসি আর রিভেঞ্জ কিন্তু আজকাল ক্রাইমের ক্ষেত্রে ট্রেন্ডিং চলছে।”

মিস বোসের কথা সমর্থন করে মাথা ঝাঁকায় অধিরাজ, “ব্রিলিয়ান্ট। আই অ্যাম এন্টায়ারলি ইমপ্রেসড মিস বোস।

দুর্দান্ত বলেছেন। কিন্তু একটাই লুপহোল।”

কী স্যার?”

“জেনিথে রণজয় নিজে উপস্থিত নেই।”

অধিরাজের কথা শুনে মৃদু হাসে কৌশানী, “কিন্তু তাঁর কোনো সমব্যথী তো থাকতে পারে। লাইক সুহাসিনী মিত্র। তিনি কৌশিকের ওপর চটে আছেন। ছেলের প্রতি সিমপ্যাথেটিক। সিমপ্যাথি তো ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকারেরও আছে। নয়তো কৌশিককে প্রকাশ্যেই বেইমান বলতেন না।”

“ইউ নো, মিস বোস…” সে সপ্রশংস চোখে তাকায় মেয়েটির দিকে, “ইউ আর সুপার ব্রিলিয়ান্ট। ইওর পয়েন্ট ইজ ওয়েল টেকেন। ইউ আর রিয়েলি আ ব্রিলিয়ান্ট কপ!” প্রশংসা বাক্য শুনে কৌশানী লজ্জাবনত দৃষ্টিতে একঝলক তাকায়। তারপর মুখ নীচু করে বলে, “থ্যাংকস স্যার।”

“ইউ আর ওয়েলকাম।”

কৌশানী বোস এবার লজ্জাজড়িত ভঙ্গিতে আঙুল জড়াচ্ছিল। হয়তো বা কিছু বলতও। কিন্তু তার আগেই তার মোবাইল ফোন সশব্দে বেজে উঠেছে। মুহূর্তের মধ্যেই মেয়েটির অপূর্ব সুন্দর মুখ শক্ত হয়ে ওঠে। হাসিটাও মিলিয়ে গিয়েছে। অর্ণব আড়চোখে তাকিয়ে দেখল ওর ফোনের ডিসপ্লেতে ইংরেজি হরফে ভেসে উঠেছে কলারের নাম, “ পাষণ্ড!”

“আপনার বয়ফ্রেন্ডের নাম পাষণ্ড সেনোরিটা? না আমি তুল দেখছি!”

অধিরাজের বিস্মিত শব্দগুলো শুনে অর্ণব বুঝতে পারে যে কৌশানীর বিরক্তি ও ফোনের ডিসপ্লেতে কলারের ওই উদ্ভট নাম তারও চোখে পড়েছে। কৌশানী বিরক্তিতিক্ত কণ্ঠে বলল, “বাদ দিন স্যার। এ নম্বরটা আমি পরে ব্লক করে দেব।”

“হোয়াট হ্যাপেন্ড মিস বোস?”

অধিরাজ সংযত অথচ একটু সিরিয়াসভাবেই জানতে চায়, “ইনি কে? আপনার এক্স? স্টক বা টিজ করছে নাকি? আপনি চাইলে অ্যান্টিরোমিও লাইফটাইম পাওয়ারের ক্যাপসুলের ডোজ দিয়ে দিতে পারি। ব্লকিং ইজ নট আ পার্মানেন্ট সলিউশন। সেনর অন্য নম্বর থেকেও বিরক্ত করতে পারেন।”

“ক্যাপসুলে হবে না স্যার। ওর জন্য বোফর্স লাগবে।” এতক্ষণে ফের টুইঙ্কল মুখ খুলেছে, “ইনি শুধু মিস বোসের নন, আমারও বয়ফ্রেন্ড। কমন রোমিও বলতে পারেন। তবে আমার ফোনে এখন ওঁর নামটা গব্বর সিং নামে সেভ করা আছে। এর আগে ‘মহিষাসুর’ ছিল।”

“অ্যাঁঃ!”

বেচারা অধিরাজ একটা ভয়াবহ হেঁচকি তুলতে গিয়েও সামলে নেয়। কোনোমতে ঢোঁক গিলে বলে, “বলেন কী।”

“শুধু তাই নয়।” মিস অরোরা আরও জানায়, “আত্রেয়ী দিদি আর আহেলি দিদিভাইয়েরও ইনি মজনু। নামটাই যা আলাদা। আত্রেয়ীদি ওঁকে ‘পেয়ার সে’ বকরাক্ষস নাম দিয়েছেন। আর আহেলি দিদিভাই ‘মাইগ্রেন’।”

অধিরাজ পুরো ঘেঁটে ঘ। সে ঘাবড়ে গিয়ে ‘অর্ণবের দিকে তাকায়। বেচারা বুঝতেই পারছে না যে কী বলা উচিত। স্বয় প্রভু শ্রীকৃষ্ণও অনেকেরই কমন বয়ফ্রেন্ড ছিলেন। তারও অষ্টোত্তর শতনাম ছিল। কিন্তু এ কী জাতীয় ভয়াবহ আদারের নিকনেম।

অর্ণব গাড়ি চালাতে চালাতেই নিস্পৃহস্থরে বলল, “স্যার, ইনি তো আপনারও শাহজাহান। শুধু আপনাকে কবরে চালান করে তাজমহল বানানোটাই বাকি রেখেছেন। সুযোগ পেলে সেটাও করবেন। আপনার ফোনে ওঁর নাম অবশ্য ‘যমদূত’ নামে সেভড আছে। আপনি ওঁর মেইল পাননি? গত চারদিन ধরে উনি তো আমাকে আর আপনাকে র‍্যান্ডম প্রেমপত্র লিখেই চলেছেন।”

এতক্ষণে আসল ব্যাপারটা বুঝতে পারল অধিরাজ। সে কপাল চাপড়ায়, “হে ভগবান! এতক্ষণ ধরে প্রণবেশদার কথা বলছো তোমরা। আমার পাশে দুই সেনোরিটা তো ব্ল্যাক লেভেল আর হোয়াইট লেভেল হয়ে বসে আছেন। কনফিউজড হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু তুমি কবে থেকে শ্যামাচুন্নু, মানে ‘ছেমাউল্লু’ কেস হলে? স্প্রাইটের মতো সোজা বলতে পারতে না যে প্রণবেশদা মিস বোসকে ফোন করছেন?”

সত্যিই আজ কৌশানী কালো আর টুইঙ্কল সাদা শার্ট পরেছিল। অর্ণব এতক্ষণে খেয়াল করল যে ওর শার্টটাও হালকা পীতাভ। পেল ইয়েলো বলা চলে। চুন্নুর বিশেষণটা একদম খাপে খাপ বসেছে। সে একটু অপ্রস্তুত হয়েই বলে, “আমি কী করে বুঝব যে আপনি ওঁর মেইল পাননি বা পড়েননি।”

অধিরাজের মুখ গম্ভীর হয়ে যায়। সে প্রণবেশ লাহিড়ীর ই-মেইল খুব ভালোভাবেই পড়েছে ও তাঁর বক্তব্যও স্পষ্টভাবে বুঝেছে। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবেই তার কোনো উত্তর দেয়নি। একেই সে এতদিন ছুটিতে ছিল। ছুটিতে থাকলে ও অফিশিয়াল মেইলের উত্তর দেয় না। দ্বিতীয়ত, তার মনে হয়নি যে ওই চিঠির উত্তর দেওয়ার কোনো প্রয়োজন আছে। আশা ছিল, এই নীরবতার অর্থ নিশ্চয়ই প্রণবেশ লাহিড়ী বুঝবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে যে তিনি কিছুই বোঝেননি। উলটে মিস বোসকে বিব্রত করছেন।

তার চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। সে অর্ণবের দিকে তাকায়, “আমাদের পৌঁছোতে আর কত সময় লাগবে অর্ণব?

“আর প্রায় মিনিট দশেক।”

“ওকে।”

অধিরাজ এবার কৌশানীর দিকে ফেরে, “আপনি প্রণবেশদাকে রিংব্যাক করুন তো। আফটার অল সিনিয়র মানুষ। ওঁর বক্তব্যটাও শুনেই নিই।”

“ওকে স্যার।”

কৌশানী প্রণবেশের নম্বর ডায়াল করছে। অধিরাজ একটা হাল্কা শ্বাস টানল। যদিও প্রণবেশ কী বলবেন তা সে জানে। বার্নিং শিখ কেস ও গ্রীন ভ্যালি পার্কের কেসটার পর আপাতত সি আই ডি হোমিসাইড ড্রাগ মাফিয়া কার্লোসের পেছনে পড়েছে। তাকে যেন তেন প্রকারেণ গ্রেফতার করাই এখন ডিপার্টমেন্টের ধ্যান-জ্ঞান-চিন্তামণি। আর সেই কেসটাই আপাতত অফিসার প্রণবেশ লাহিড়ীর আন্ডারে আছে। প্রণবেশ তাকে রীতিমতো গুরুগম্ভীর অফিশিয়াল মেইল করে জানিয়েছেন যে ওঁর কাছে খবর আছে যে সম্প্রতি কার্লোসকে কলকাতার কিছু এলিট নাইটক্লাবে দেখা গিয়েছে। তাই তিনি অধিরাজকে ব্যাক-আপ দেওয়ার হুকুম করেছেন। সচরাচর এসব ক্ষেত্রে একটা টিম আর একটা টিমকে ব্যাক আপ দিয়েই থাকে। প্রণবেশও অনেকবার দিয়েছেন। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

কিন্তু সমস্যা হল যে এবারের ব্যাক আপের ধরণটা কিঞ্চিৎ আলাদা। ড্রাগ মাফিয়া কার্লোস যতই ধুরন্ধর আর শয়তান হোক না কেন, সে একনম্বরের ক্যাসানোভা! তার চরিত্রে একটাই দুর্বলতা, নারী! প্রণবেশ লাহিড়ী এই পাঁকাল মাছটিকে সরাসরি ধরতে না পেরে এখন হানি ট্র্যাপের ডিমান্ড করছেন। এবং সেজন্যই ই-মেইলে সরাসরি লিখেছেন যে অধিরাজের টিমের ফিমেল অফিসারদের সাহায্য তাঁর চাই। অফিসার ব্যানার্জি যেন তাঁকে এ বিষয়ে সহায়তা করেন।

অর্ণব আড়চোখে একবার অধিরাজকে দেখল। তার মুখ সম্পূর্ণ নিস্পৃহ ও নিরাসক্ত। ওর বুকের মধ্যে টিপটিপ করে। স্যার জানেন না যে অফিসার লাহিড়ী এখন এডিজি সেনের দ্বারস্থ হয়েছেন, এবং কিন্ডারগার্টেনের বাচ্চাদের মতো লঙ্কা আর মরিচ মাখিয়ে নালিশ করেছেন যে, “ব্যানার্জি আমায় হেল্প করছে না।” কার্লোসের কেসটা অসম্ভব হাই প্রোফাইল। আর সে এখন কলকাতায় আছে, এই খবরটুকুই এডিজি সেনের মাথা গরম করার জন্য যথেষ্ট। না জানি, তিনি কী মূর্তি ধরবেন! হয়তো একেবারে নরসিংহ মূর্তি ধরেই বসে আছেন। সুযোগ পেলেই কামড়ে দেবেন।

ওপ্রান্তে প্রণবেশের ফোনটা বেশ কিছুক্ষণ রিং হল। তারপরই অর্ণবের আশঙ্কাকে সত্যি করে দিয়ে প্রণবেশের বদলে জাগ্রত হল এডিজি সেনের ক্রুদ্ধ কন্ঠস্বর। অর্থাৎ অফিসার লাহিড়ী এডিজি সেনের চেম্বারে বসেই ফোন করছিলেন এবং কানে ঝাঁঝালো সর্ষে-মিটিওয়ালা তেল ঢেলে জানাচ্ছিলেন যে অফিসার ব্যানার্জি ঠিক কতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন ও উদ্ধত যে খোদ লাহিড়ীসাহেবের মেইলের উত্তর তো দিচ্ছেনই না, ওপরন্তু তাঁর লেডি অফিসাররাও ফোন তুলছে না। এতখানি উদ্ধত ও বেপরোয়া তারা!

কৌশানী কিছু বলার আগেই ভেসে এল এডিজি সেনের গর্জন, “ফোনটা ব্যানার্জিকে দাও। কথা আছে।”

লেডি অফিসার ভয়ের চোটে শশব্যস্তে ফোনটা হস্তান্তরিত করেছে। ও বেচারিরও দোষ নেই। ও-প্রান্তে খোদ টপ বস। অপরদিকে অধিরাজ কিন্তু একদম নবরত্ব পাউড়ার। ঠান্ডা ঠান্ডা কুল কুল। প্রণবেশের কাঠি কিংবা এডিজি সেনের বাঁশ, কোনোটাই তার ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলেনি। সে ঠান্ডা স্বরে বলে, “ইয়েস স্যার…।”

শুধু এই উত্তরটুকুরই প্রতীক্ষা ছিল। এডিজি সেন একেবারে ড্রাগনের মতো লাফিয়ে পড়লেন, “কী ব্যাপার? তোমাদের কী কোনো সিরিয়াসনেস নেই? এখানে আমরা কার্লোসকে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করছি, আর তুমি লাহিড়ীর ই-মেইলের কোনো জবাব দিচ্ছ না? এরকম নন-কোঅপারেশনের কারণ?”

অধিরাজ যেন একটু বিস্মিত “অফিসার লাহিড়ী কী আমার উত্তর এক্সপেক্ট করছিলেন? আদৌ কী ওই মেইলের জবাব আমার দেওয়া উচিত ছিল স্যার?”

এবার তার শান্ত, নির্বিকার কণ্ঠস্বরে স্বয়ং এডিজি সেনও ঘাবড়ে গিয়েছেন। কোনোমতে বললেন, “মানে? কী বলতে চাও তুমি? কার্লোস এখন এখানে আছে। সে এতটাই ফ্ৰন্ড অ্যান্ড ক্লেভার যে আগের বার একটা এনকাউন্টারে কিছু পুলিসকর্মীর ওপর গুলিও চালিয়েছে। দু-জন কনস্টেবল শহীদ হলেও তাকে ধরা যায়নি। আজ পর্যন্ত ওর পনিটেল তো দূর, মাথার একগাছি চুলও আমাদের হাতে আসেনি। এখন ইনফর্মাররা জানিয়েছে যে তাকে কলকাতার বেশ কিছু নামি দামি নাইটক্লাবে রিসেন্টলি দেখা গেছে। ইটস আ গোল্ডেন চাল। আমরা আমাদের ডিপার্টমেন্টের লেডি অফিসারদের ‘হানি ট্র্যাপ’-এর জন্য ইউজ করার মাস্টারপ্ল্যান করছি, আর তুমি কোনোরকম হেরও করছ না। উলটে অ্যাভয়েড করছ? হাউ ডেয়ার ইউ? তুমি জানো, আমি শুধু এইজন্যই তোমাকে শো-কজ করতে পারি?”

সে যথারীতি অসম্ভব স্থির, “নিশ্চয়ই পারেন স্যার। আপনি আমার টপ বস! সে ক্ষমতা আপনার আছে। আই অ্যাম রিয়েলি সরি যে অফিসার লাহিড়ীর মেইলের উত্তর আমি দিইনি। মাই ফস্ট। বাট, এখন আপ•পর সামনেই দিয়ে দিচ্ছি। আপনি আমায় শো-কজ করুন স্যার, ইনক্ট ট্রান্সফার বা সাসপেন্ডও করতে পারেন। কিন্তু আমি আমার টিমের একজন লেডি অফিসারকেও এই হানি ট্র্যাপের পার্ট হতে দেব না। রাদার অ্যালাউ করব না। দ্যাটস মাই ফাইনাল ডিসিশন।”

“কীঃ।”

এবার যেন এডিজি সেনের মাথায় বিস্ময়ের এভারেস্ট

ভেঙে পড়ে। পাশ থেকে ভেসে এল প্রণবেশের ফোড়ন, “দেখেছেন স্যার? আমি আগেই বলেছিলাম। এখন তো আপনার অর্ডারও মানছে না। ট্যানট্রামের চূড়ান্ত!”

রাগে, অপমানে গরগর করতে করতে এডিজি বললেন, “আর ইউ ইনসান্টিং মি. ব্যানার্জি? তোমার কাজ আমার কমান্ড ফলো করা। আমার ডিসিশনকে ওবে করা। আর তুমি ইগনোর করছ?”

“করছি স্যার” বরফশীতল উত্তর এল, “তার জন্য আপনি আমায় পানিশ করতেই পারেন।”

এরকম উত্তরের জন্য শিশির সেন প্রস্তুতই ছিলেন না। তিনি গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “কেন সেটা কী জানতে পারি? না অফিশিয়ালি শো-কজ করব? তখনই উত্তরটা দেবে?”

“আই অ্যাপোলোজাইজ। কিন্তু…”

সে দৃঢ় স্বরে বলে, “আপনি উত্তরটা এখনই শুনে নিতে পারেন। শো-কজ করলেও এই একই উত্তর রিটনে আপনার কাছে যাবে। তখন না হয় ভালো করে পড়ে নেবেন।”

“শুনি।”

“আমি যদি রেসপেক্টেবল অফিসার লাহিড়ীর চিঠি ও আপনার বক্তব্য সঠিক বুঝে থাকি তবে আপনারা চাইছেন যে আমার অফিসাররা সেক্সি ড্রেস পরে, নাইটক্লাবে ঘুরে ঘুরে, কার্লোসকে স্পট করে, তাকে নানারকম ছলাকলায় সিডিউস করে, দরকার পড়লে ‘ডন’ সিনেমার হেলেনের মতো নেচে-কুঁদে, তার কোলে বসে, গলা জড়িয়ে ধরে, মদ খাইয়ে, সম্পর্ক তৈরি করে, লোভ দেখিয়ে আপনাদের হাতে তুলে দেবেন। অ্যাম আই রাইট?”

“অ্যাবসোলিউটলি!” এবার প্রণবেশের গলা ভেসে আসে, “দরকার পড়লে তাই করতে হবে। কারণ মেয়েছেলে ছাড়া কার্লোসের আর কোনো উইক পয়েন্ট নেই। সে এক নারীতে কখনও সন্তুষ্ট হয় না। একাধিক মেয়েছেলের সঙ্গে রিলেশন বানায়। আর এটাই আমাদের তুরুপের তাস। অ্যান্ড ইটস আ পার্ট অব দেয়ার ডিউটি অলসো।”

এবার তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন শিশির সেন, “অ্যান্ড ফর ইওর কাইন্ড ইনফরমেশন, সর্বনাশিনী তথা প্রিয়া এস্থার বাজাজের এস্কেপের পেছনেও তার হাত আছে। আশ্চর্য হব না যদি প্রিয়াও কার্লোসের অন্যতম গার্লফ্রেন্ড হয়। বার্নিং শিখ কেসে আর গ্রীন ভ্যালি মার্ডার কেসে তুমি কার্লোসের ব্যবসার প্রায় সর্বনাশ করেছ। তার ওপর তুমিই প্রিয়াকে অ্যারেস্ট করেছিলে। এই দু-জনেই তোমার ওপর রিভেঞ্জ নেবে। তারপরও তুমি হেল্প করবে না?”

“হ্যাং দ্যাট প্রিয়া বাজাজ। আই ডোন্ট কেয়ার!”

কথাটা বলেই অধিরাজ সজোরে শ্বাস টানল। যেন নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে, “আই বেগ ইওর পার্ডন স্যার। কিন্তু প্রথমে অফিসার লাহিড়ীকে বলুন যে শব্দটা মেয়ে হতে পারে, নারী হতে পারে, মহিলা, লেডি, সেনোরিটা, মাদমোয়াজেল বা ম্যাডামও হতে পারে, কিন্তু কোনোমতেই ‘মেয়েছেলে’ নয়।”

ও প্রান্তে পিন ড্রপ সাইলেন্স। বোধহয় দু-জনেই ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না। অধিরাজ তাঁদের নীরবতার সুযোগ নিয়ে ফের বলে, “তাছাড়া স্যার, আপনার বাড়িতে যদি ইঁদুর ঢোকে, তবে কী আপনি সার্ভিস গান দিয়ে ইঁদুর মারবেন?”

এডিজি সেন চরম ধাক্কাটা সামলে নিয়ে ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, “আর ইউ মকিং মি. ব্যানার্জি? সার্ভিস গান দিয়ে কেউ ইঁদুর মারে?”

“কেন মারবে না?” অকাট্য যুক্তি, “ইঁদুরের বিষ, চিজমাউসটাপ, বিষাক্ত আলুর চপ কিংবা র‍্যাট কিলের চেয়ে আপনার আগ্নেয়াস্ত্রটি অনেক বেশি ডেডলি ওয়েপন! অব্যর্থও! এক গুলিতেই আপনার শত্রু শেষ। বিশ্বাস না হলে ইউজ করে দেখতে পারেন।”

“আর ইউ ইনসেন!” এডিজি নিজেই এবার উম্মত্ত রাগে, অপমানে পাগলের মতো চেঁচাচ্ছেন, “তুমি আমার সঙ্গে ফাজলামি করছ? সার্ভিস রিভলবার দিয়ে আমি ইঁদুর মারব? ওটার কী কোনো মানসম্মান নেই! সার্ভিস রিভলবার আমাদের অস্ত্র আর সম্মান…”

“লেডি কপরাও আমাদের অস্ত্র আর সম্মান স্যার।”

বজ্রপাতের মতো বাক্যটা উচ্চারিত হল, “ওঁরা চূড়ান্ত পরিশ্রম করে এখানে ল অ্যান্ড জাস্টিস বজায় রাখতে এসেছেন। কোনো আর্চ ক্রিমিনালের কোলে বসে, গলা জড়িয়ে ধরে ইউজড হতে আসেননি। ওটা ওঁদের কাজ নয়। মিস বোস বা মিস দত্ত কার্লোসকে গুলি মেরে পেলভিক বোন গুঁড়ো করে দিতে পারেন। গলায় ফাঁসির দড়িও পরাতে পারেন। ওটাই ওঁদের মিশন, ওটাই ডিউটি। যেমন সার্ভিস রিভলবারের সম্মান রক্ষার্থে ইঁদুর মারা যায় না, ইন মাই ওপিনিয়ন–কোনো লেডি অফিসারকেও আপনি একজন কমোডিটি হিসেবে ইউজ করতে পারেন না। আপনি শুরুতেই আমাকে সম্মান অসম্মানের কথা বোঝাচ্ছিলেন না? আমিও এগজ্যাক্টলি সেটাই বোঝাচ্ছি। প্রত্যেকের সম্মানই গুরুত্বপূর্ণ।”

এডিজি সেন সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ। অর্ণবের মনে হল, উনি বোধহয় অজ্ঞানই হয়ে গিয়েছেন। আর যা-ই হোক, বি পি লেভেল নির্ঘাত চূড়ান্ত সীমায়। শেষে ওঁকেই না জেনিথে ভরতি করতে হয়!

এবার প্রণবেশ বললেন, “কেন? তোমার কেসে লেডি অফিসাররা ডিসগাইজ নেয়নি। তখন জাত যায়নি?”

“না যায়নি।”

অধিরাজের কণ্ঠ ইস্পাতকঠিন, “কারণ ওদের ডিসগাইজগুলো যথেষ্ট রেসপেক্টফুল ছিল। কেউ হাতা খুন্তি ধরেছেন, কেউ নার্সের কাজ করেছেন। কিন্তু বস্তু হিসাবে ইউজড হননি, যেটা আপনারা চাইছেন। আপনি কার্লোসকে এনকাউন্টারে মারুন। আমার গোটা টিম ব্যাক আপ দিতে পৌঁছে যাবে। কিন্তু অ্যাজ আ হানি ট্যাপ আমি ওঁদের কাউকে ছাড়ব না। আই অ্যাম সরি ফর দ্যাট এগেইন।”

সে এবার প্রণবেশকে ছেড়ে এডিজি সেনের উদ্দেশ্যে বলে, “স্যার, আমাদের ইনফর্মারদের কাছে এমন অনেক রূপসী উর্বশী, মেনকা, জওয়ান শীলা, বদনাম মুন্নি কিংবা বাবলি বদমায়েশদের নম্বর আছে যারা রতিক্রিয়া আর সিডিউসিং-এ এক্সপার্ট। ওঁরা আমাদের হয়ে কাজও করেন। অফিসার লাহিড়ী যদি চান, তবে সেই ডার্লিং-হানিদের নম্বর আমি দিয়ে দিতে পারি। হয়তো তাঁরা আপনাদের বুঝিয়েও দেবেন যে রসালো আলুর চপ আর সার্ভিস রিভলবারের মধ্যে পার্থক্য কী! এইটুকু হেল্প করতে পারি। কিন্তু এই মিশনে আমার কোনো অফিসারকে দেব না।”

শিশির সেন অনেকক্ষণ চুপ থেকে এবার অপেক্ষাকৃত শান্ত স্বরে বললেন, “এটাই তোমার ফাইনাল ডিসিশন?”

“ইয়েস স্যার।”

লাইনটা কেটে গেল। কৌশানী আর টুইঙ্কল অপলকে অধিরাজের দিকে তাকিয়েছিল। যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। অফিসার ব্যানার্জি এডিজি সেনের নির্দেশ অমান্য করলেন। এর ফল কী হবে? আর যাই হোক, ভালো কিছু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবু এই রিস্ক নেওয়ার মানে কী?

“প্রণবেশদা শুধরোবেন না।”

সে স্তম্ভিত কৌশানীর হাতে মোবাইলটা ধরিয়ে দিল, “আমরা ডেস্টিনেশন থেকে আর কতদূরে অর্ণব?”

অর্ণবও ততক্ষণে প্রচণ্ড টেনশনে ড্রাইভ করতে করতেই আঙুলের নখ খাচ্ছিল। এটা তার অন্যতম বদভ্যাস। অধিরাজের নির্লিপ্ত কন্ঠ শুনে শুকনো গলায় বলল, “পৌঁছে গিয়েছি স্যার। ওই তো সামনে বৈষ্ণবী অ্যাপার্টমেন্ট।”

অধিরাজ উদ্ভাসিত দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকায়। সত্যিই ওরা পৌঁছে গিয়েছে ডঃ সুজাতা রায়ের বাসস্থানে। সামনেই দাঁড়িয়ে বৈষ্ণবী অ্যাপার্টমেন্ট। বাইরের দিক থেকে এই মধ্যবিত্তদের বাসস্থানটি প্রথম দর্শনে চট করে চোখে পড়ে না। তার জন্য এর অবস্থান দায়ী। এমন নয় যে পুরোনো লজঝড়ে বিল্ডিং। বরং উলটোটাই। এর নির্মাণ সদ্যই হয়েছে। স্নিগ্ধতা আছে, কিন্তু বিলাসবহুল চোখ ধাঁধানো উগ্রতা নেই।

“থার্ড ফ্লোর।”

অধিরাজ কম্পাউন্ডে ঢুকতে ঢুকতেই অর্ণবকে বলে, “ফ্ল্যাট নম্বর সি।”

মিস বোস খুব মন দিয়ে অ্যাপার্টমেন্টটাকে দেখছিল। ছ-তলা উঁচু বিল্ডিং। নতুন রঙের মিষ্টি গন্ধ এখনও দেওয়ালে লেগে আছে। বাইরের দেওয়াল অফ-হোয়াইট রঙের হলেও কোণাগুলোতে হালকা কফি রঙের বর্ডারের বৈপরীত্য, যা বিল্ডিংটাকে সাদামাটা অথচ মার্জিত চেহারা দিয়েছে। রং একেবারে নতুন, কোনো দাগ বা ছোপ নেই; বর্ষার প্রথম জলও বোধহয় এই দেওয়ালে দাগ কাটেনি।

“ডঃ সুজাতা রায় কী এখানে একাই থাকেন স্যার?”

অধিরাজ এগোতে এগোতেই মাথা নাড়ে, “সবসময় নয়। এটা ওঁর পার্সোনাল স্পেস বলতে পারেন মিস বোস। ডিউটির প্রয়োজনেও আসেন। আবার ছুটিতে একাকীত্ব উপভোগ করার জন্যও পারফেক্ট।”

অ্যাপার্টমেন্টের প্রবেশপথে স্টেইনলেস স্টিলের চকচকে গেট আছে। তবে সেফটির তেমন সাঙ্ঘাতিক ব্যবস্থা নেই। একজন সিকিউরিটি গার্ডই আছে মাত্র। সে ওদের পরিচয় লিখে নেয় রেজিস্টারে। সি আই ডি হোমিসাইড শুনে ভয় না পেলেও তার চোখে অনাবিল বিস্ময় এক মুহূর্তের জন্য ছায়া ফেলে সরে যায়।

“আপনার মনে হয় সুজাতা এখানেই থাকবেন? ওঁর পার্মানেন্ট অ্যাড্রেসেও তো থাকতে পারেন।

অর্ণবের প্রশ্নের উত্তরে সে বলে, “সেনোরিটার উপায় নেই অর্ণব। ওঁর পৈতৃক বাড়ির ঠিকানা সর্বজনবিদিত। তার ওপর লোকে হুমকি দিচ্ছে। উনি আগে থেকেই ভয় পেয়েছিলেন, নয়তো এই ঠিকানাটা আমাকে দিতেন না। আর হসপিটালের লোকও নিশ্চয়ই ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে এই অ্যাড্রেসটা সবাইকে দেবে না। মিডিয়ার ঝামেলা আর হুমকি থেকে বাঁচতে হলে এখানেই আসতে হবে।”

“বুঝলাম।”

বৈষ্ণবী অ্যাপার্টমেন্টের মেইন প্রবেশপথের পাশে আধুনিক স্টাইলে বিল্ডিংয়ের নাম লেখা। সোনালি অ্যাক্রিলিক লেটারের ডিজাইন। নীচে ছোটো ফন্টে ঠিকানা। এগুলো এখন নরম এল ই ডি লাইটে ঝলমল করছে।

বিল্ডিংয়ের ভেতরে ঢুকলেই ছোট্ট কিন্তু সুন্দর ইন্টেরিয়র ডিজাইন। ইটের বর্ডার দিয়ে ঘেরা নরম সবুজ ঘাস, দু-পাশে মানিপ্ল্যান্ট, আর এক কোণে ফুলের টবের সারি; গাঁদা, পিটুনিয়া, জবার গায়ে যত্নের ছাপ স্পষ্ট।

পেভার ব্লকের সরু পথ সোজা চলে গেছে লিফট ও সিঁড়ির প্রবেশদ্বার পর্যন্ত। সিঁড়িঘরের দেওয়াল ক্রিম রঙের, ফ্লোরে নতুন গ্র্যানাইট টাইলস। অধিরাজ সম্ভবত সিঁড়ি দিয়ে ওঠার তালেই ছিল। কিন্তু অর্ণবের বিষণ্ণ মুখ দেখে হেসে বলল, “আচ্ছা, লিফটেই চলো।”

সুজাতা রায়ের ফ্ল্যাট খুঁজে পেতে খুব একটা অসুবিধে হল না। লিফটের ঠিক উলটোদিকের ফ্ল্যাটের দরজাতেই চকচক করছে ওঁর নামাঙ্কিত নেমপ্লেট। মেয়েটির স্বভাব সত্যিই অদ্ভুত। লোকে বাইরে কতরকমের বিদেশি ফুলগাছ লাগায়। কিন্তু ইনি আবার তুলসী গাছ লাগিয়েছেন! আশ্চর্য শখ।

“সেনোরিটা হেলথ কনশাস দেখছি।” অধিরাজ একটু সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে দরজাটা দেখছে, “তুলসীর উপকারিতা তো বুঝলাম। কিন্তু দরজা খুলে রাখার অপকারিতা কী উনি জানেন না? দরজাটা খোলা কেন!”

বাকি তিনজন প্রাথমিকভাবে ব্যাপারটা লক্ষ করেনি। কিন্তু এইবার অধিরাজের কথায় সচকিত হয়ে আবিষ্কার করল, দরজাটা সত্যিই খোলা। আপাতদৃষ্টিতে বন্ধ মনে হলেও কোণ বরাবর একচিলতে ফাঁক দেখা যাচ্ছে। আর সেই ফাঁক দিয়ে কোনো আলোর আভাস আসছে না। শুধু জমাট অন্ধকার।

“ভেতরে অন্ধকার কেন?”

অর্ণব ফিশফিশ করে বলে, “বাইরে তো আলো আছে। উনি কী ঘুমোচ্ছেন?”

অধিরাজ তার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকায়, “কেউ ঘরের দরজা খুলে ঘুমোয় না অর্ণব… যদি না…।”

ইঙ্গিত স্পষ্ট। মুহূর্তের মধ্যেই ওদের চারজনেরই হাতে উঠে এল আগ্নেয়াস্ত্র। অত্যন্ত সন্তর্পণে পা টিপে টিপে একে একে প্রবেশ করল অন্ধকার ফ্ল্যাটের ভেতরে। লিডে অধিরাজ। পেছনে অর্ণব। তার পেছনে লেডি অফিসাররা।

“সামথিং ইজ ফিশি স্যার।”

মিস অরোরা চাপা গলায় বলল। অধিরাজ তাকে নীরব থাকার নির্দেশ দিয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে যায়। সতর্ক, সন্ত্রস্ত ওর প্রতিটি পদক্ষেপ।

অর্ণব তার পেছনে ছায়ার মতো চলতে চলতে ভাবছিল, এমন ফ্ল্যাটে পুলিস কমই আসে। নতুন বিল্ডিং, মধ্যবিত্ত সাদামাটা লোকজন, সুরক্ষিত গেট—এটা কী আদৌ কোনো ক্রাইম সিন হতে পারে। কিন্তু পরিবেশটা বড়োই সন্দেহজনক। আশঙ্কায়, আতঙ্কে তার বুক ঢিবঢিব করছে। তবু মুখে কিছু প্রকাশ করল না।

দুই লেডি অফিসারের হাতে ঝলসে উঠেছে মোবাইলের টর্চ। তাতে সামনের অন্ধকার করিডর দৃশ্যমান। করিডরে নতুন টাইলস বোধহয় সদ্য মুছেছে কেউ। এখনও ভিজে ভিজে ভাব যায়নি।

“স্ট্রে–ঞ্জ!”

সে পরিচিত লজটা বলেই একটু উঁচু স্বরে ডাকে, “সেনোরিটা, আর ইউ দেয়ার? ডঃ রায়…?”

করিডরের ডানদিকে একদম সামনেই লিভিং রুম। সেগুন কাঠের দরজাটা একদম নতুন। অথচ অদ্ভূত ঠান্ডা! একদম নিষ্প্রাণ, নির্জীব! উষ্ণতার লেশমাত্র নেই।

“একটু আগেও বোধহয় ভেতরে এসি চলছিল…” মিস অরোরা বলে, “দরজাটা খুলে একবার দেখব?”

অধিরাজ কোনো কথা না বলে মাথা ঝাঁকায়। যেহেতু এটি এক নারীর নিভৃত বাসস্থান তাই মেয়ে দু-জনই সাবধানে এগিয়ে গেল। মিস বোস হালকা স্বরে ডাকে, “ডঃ রায়? …সুজাতা?”

কিন্তু নীরবতা ছাড়া সেখানে আর কিছু নেই। একটা টিকটিকি শুধু কোথা থেকে যেন টিকটিক করে উঠল। এছাড়া আর কোনো আওয়াজই নেই। উপস্থিত চারজন অফিসারই নিজেদের নি:শ্বাসের শব্দ পাচ্ছে। মাঝেমধ্যে হোম প্ল্যান্টের সরসরানি। কিন্তু যার খোঁজে এখানে আসা, তিনি কোথায়!

লিভিং রুমে পা রাখতেই বোঝা গেল, সবকিছুই যথাস্থানে আছে। কিন্তু যেন সময় থেমে গেছে। আর গৃহস্বামিনী নেই। সোফার কভার ধুলো মুক্ত। যেন এখনই কেউ ডাস্টিং করে গিয়েছে। কুশনগুলো একদম জায়গামতো গোছানো। অথচ এক অপ্রাকৃতিক নিস্তব্ধতা সবকিছুকে ঢেকে রেখেছে। একটা গোটা মানুষের অস্তিত্ব ঢাকা পড়ে গিয়েছে সেই অন্ধকারে। বুঝি আর ফিরে আসবে না।

“লক্ষণ ভালো নয় সেনোরিটাজ!”

অধিরাজের গলা সামান্য কাঁপল। তবু সে সবাইকে সতর্ক করে, “টেক পজিশনস। ভেতরে সব কিছুই থাকতে পারে।”

“ইয়েস স্যার…।”

কৌশানীর বুকের ভেতরে ধুপধাপ করে বিরাট ইঞ্জিন চলছিল। তার প্রতিঘাতে পাঁজরগুলোও বুঝি কাঁপছে। সে দেওয়ালে টাঙানো একটা ছবির দিকে আলো ফেলে। এক মিষ্টি চেহারার যুবতীর ছবি। নীল শাড়ি, গলায় ছোট্ট সোনার চেইন। কোনো বাহুল্য নেই। সে ছবিটার দিকে তাকিয়ে টুইঙ্কলকে

ফিলফিশ করে বলে,

“ইনিই সুজাতা। ওঁকে টিভিতে দেখেছি। একেই খোঁজো।”

লিভিং রুমের সংলগ্ন রান্নাঘরও আশ্চর্য গোছানো। সিঙ্গে কোনো বাসন নেই, উনুন পরিষ্কার। ফ্রিজের ওপরে শুধু একটা ফলের বাটি। যেন এইমাত্রই কেউ রেখে উঠে গিয়েছে। ডিশে এখনও একটা আপেল কেটে রাখা আছে। একদম তাজা। খাওয়ার প্রতীক্ষায় আছে। কিন্তু কেউ খায়নি।

“ডঃ রায় এত সংসারী আর ঘরদোর সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতে এক্সপার্ট তা আমার জানা ছিল না। ওঁর ভিডিও দেখে আমার কিন্তু যথেষ্ট অগোছালোই মনে হয়েছে স্যার।”

অধিরাজ মনে মনে অর্ণবকে সমর্থন করে। যে মহিলা ঠিকমতো ওড়না আর ব্যাগ ক্যারি করতে পারে না, তার ঘর এত টিপটপ হওয়া সম্ভব নয়।

টুইঙ্কল শ্বাস টেনে অদ্ভুত বিস্ময়ে জানায়, “ও জি। এ তো গজব হ্যায়!”

অর্ণবের বুক ধ্বক করে ওঠে। সে জানতে চায়, “কী?”

“এখানে এত অন্ধকার। বাইরে আলো, এখানে পাওয়ার কাট!” সে জানায়, “বাট ব্রাদার, এখানে কিছুক্ষণ আগেই ডাস্টিং হয়েছে। তাও বাই ভ্যাকুয়াম ক্লিনার। ধুলো আমার নাকে তো লাগছেই না, উলটে রুম ফ্রেশনারের গন্ধ!”

বলার প্রয়োজন ছিল না। গন্ধটা সবারই নাকে এসে লাগছে। চার অফিসারের মনের ভেতরে তখন দামামা বাজছে। দেরি হয়ে গেল না তো। তারা নিশ্চুপে এগোচ্ছিল, আর তাদের ছায়াগুলো দীর্ঘ হয়ে দেওয়ালে পড়ছে। যেন অন্য কেউ নিঃশব্দে ছায়া হয়ে সঙ্গে সঙ্গে চলেছে। এমন এক খুনি অস্তিত্ব যে গোপনে সব দেখছে, সব শুনছে!

কৌশানীর পা যেন ধীরে ধীরে টেনে নিচ্ছে মেঝেটা। গ্রাস করতে চায় তাকে। পা-দুটো কিছুতেই এগোতে চাইছে না। তবু জোর করে এগিয়ে গেল। হাল্কা উইন্ডচাইমের টুংটাং সুরেলা শব্দ পাচ্ছিল সে। বেডরুম থেকে আসছে!

তাকে বেডরুমটা যত আকর্ষণ করছিল, ঠিক ততটাই বিকর্ষণ করছে। শয়নঘরের দরজাটা আধখোলা। সেখান থেকে এখন পারফিউম আর ক্রিমের প্রবল গন্ধ আসছে। কী এক অমোঘ আকর্ষণে ভেতরে প্রথমেই এন্টি নিল কৌশানী। তার টর্চের আলো ঘরের মাঝামাঝি এসে স্তম্ভিত হয়ে একটা ঝাঁকুনি খেয়ে থমকে যায়। সামনে… সামনে….. এ কে। এ কী।

“ওঃ গ—ড।”

বেডরুমের জানালাটা খোলা। জোরালো হাওয়ায় পর্দা দুলছে। উইন্ডচাইম দুলছে। ফ্লাওয়ার ভাসে রাখা তাজা ফুলগুলোর পাপড়িও দুলছে। ঘরের এককোণে রাখা মানিপ্ল্যান্টের পাতাও দুলছে। ফ্যান বন্ধ, কিন্তু দেওয়ালে একটা ছায়াও দুলছে।

আর দুলতে ছায়ার মালকিন। ফ্যানের সঙ্গে বাঁধা সাদা ওড়না। সেখান থেকে ঝুলছে একজোড়া পা। অবিন্যস্ত চুঙ্গে মুখ ঢাকা পড়েছে। হাত দুটো নিস্তেজ হয়ে ঝুলে আছে। নড়ির পেন্ডুলামের মতো দুলতে দুলতে শুধু তার নিষ্প্রাণ চোখ যেন বলল—

“বড্ড দেরি করে ফেললেন অফিসার। আর কোনো জবাব নেই যে!”

অধিরাজের স্খলিত মুখ থেকে শুধু খসে পড়ল একটাই বাক্য!

“সত্যিই মেরে ঝুলিয়ে দিল!”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *