ডঃ ডেথ – ১১

১১

“স্যার, ভেতরে এভাবে ঢোকা যাবে না।”

অর্ণব অধিরাজের দিকে অসহায়ভাবে তাকায়, “দরজা একদম চেপে বসে গেছে। সামান্য মেল্ট হলেও হতে পারে। মরচুয়ারির দরজাটা আবার মেটালের। তার ওপর ভেতর থেকে বন্ধ। উডেন ডোর হলে আগুন ধরত। কিন্তু অ্যাট লিস্ট লাথি মেরে খোলা বা ভাঙা যেত। মেটালের ডোর খুলবেন কী করে? আর বাইরে থেকেই অবস্থাটা দেখুন!”

এই মুহূর্তে ওরা সবাই দাঁড়িয়েছিল জ্বলন্ত মরচুয়ারির সামনে। অর্ণবের কথাই সঠিক! আগুনের তাপে ধাতব দরজা লালচে। সচরাচর এই দরজাগুলো স্টিল মিক্সড অ্যালয়ের হয়। মেন্টিং পয়েন্ট যথেষ্ট হাই। কিন্তু যেহেতু মরচুয়ারির বাইরে ওই মুহূর্তে যারা দাঁড়িয়ে ছিল তাদের বক্তব্য অনুযায়ী এটা শর্ট সার্কিটের আগুন ও তারা একাধিক এসি ব্লাস্ট হতে শুনেছে তাই ভেতরের তাপ মারাত্মক হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। হয়তো তাতে মেটাল ডোর গলে জল হয়ে যাবে না। কিন্তু সেটা সামান্য মেন্ট হয়ে গিয়ে পরিস্থিতিকে আরও মারাত্মক করে তুলতে পারে। সর্বোপরি যেটা সবচেয়ে বেশি ভয়ের তা হল ইলেক্ট্রোকিউটেড হওয়ার। ধাতব দরজা তড়িৎ পরিবহণ করতে পারে। এই আগুন স্বাভাবিক নয়, শর্ট সার্কিটের। তাই দরজাটাই তড়িৎবাহী হয়ে মৃত্যুফাঁদ হয়ে উঠতে বেশি সময় নেবে না। এই দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকা অসম্ভব। আর ভেতরের লোক যে দরজা খুলে বাইরে আসবে তাও কোনোক্রমেই সম্ভবপর নয়।

“বাঁ-চা-ও! আমি পুড়ে যাচ্ছি! হে—ল্প।”

রতন মরিয়া হয়ে ভেতর থেকে আর্তনাদ করছে। তার কণ্ঠে আতঙ্ক আর কান্না! ক্রমাগতই কাশছে। ধোঁয়ায় গলা অবরুদ্ধ হয়ে আসে। তবু আপ্রাণ চেঁচিয়ে যাচ্ছে, “হে-ল্প। বাঁ-চা-ও।” বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছে তার কণ্ঠস্বর। কিন্তু সম্ভবত সে-ও জানে যে এই মুহূর্তে দরজায় হাত দেওয়া মানে নিজের মরণকে নিজেই ডেকে আনা। তাছাড়া দরজা ক্রমশই রক্তাভ হচ্ছে। উত্তাপ বাড়ছে। হাত দেওয়া সম্ভবই নয়। তাই করাঘাতও করছে না।

নীচে তখন রীতিমতো বিশৃঙ্খলা। ডাক্তার-নার্সরা এর মধ্যেই আতঙ্কে ছুটোছুটি শুরু করেছে। মরচুয়ারির আগুন নিশ্চয়ই মরচুয়ারিতেই চুপচাপ বসে থাকবে না। ক্রমাগতই ছড়াবে। তাই রোগীদের দ্রুত নীচে নামিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। হসপিটালের ইলেক্ট্রিশিয়ানরা আপ্রাণ চেষ্টা করছে পাওয়ার সাপ্লাই বন্ধ করার। কিন্তু সেখানেও যথারীতি একই সমস্যা! মেইন ইলেকট্রিক রুমের হেভি মেটাল ডোর এখন সামনে পাহাড়প্রমাণ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্তৃপক্ষ যখন স্টাইল মেরে এই দরজাগুলো বসিয়েছিলেন তখন তাঁরা একবারও ভেবে দেখেননি যে বাই এনিচান্স শর্ট সার্কিট হলে কী হবে! ওই ধাতব দরজা ছুঁলেই এখন যে কেউ রোস্ট হয়ে যেতে পারে। তন্দুর বা ফ্রায়েড হওয়াও অসম্ভব নয়। তবু স্বস্তির কথা, তারা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ফায়ার ব্রিগেডকে ফোনও করা হয়েছে। তারা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এসেও পড়বে। কিন্তু রতন! রতনের কী হবে!

মরচুয়ারির ভেতরে যে আগুন একদম লেলিহান শিখায় দাউ দাউ করে জ্বলছে তা দরজার তলা আর ফাঁক দিয়ে যে কালোরঙের কটু ধূম্রকুন্ডলী বেরিয়ে আসছে তাতেই স্পষ্ট!

টুইঙ্কল অরোরা সাহসে ভর করে দরজার একদম কাছে এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কিছু করার আগেই তলা দিয়ে আগুন রাক্ষসীর মতো শত শত লোলজিহ্বা প্রসারিত করে একরাশ হা উগরে দিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যেই করিডরেও আগুন জ্বলে উঠল। অধিরাজ প্রায় বাজপাখির ক্ষিপ্রতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে সরিয়ে নিয়েছে টুইঙ্কলকে। নয়তো ওই আগুন তার পায়ের নাগাল পেয়ে গিয়েছিল। মৃদু ভর্তসনার সুরে বলল, “কী করছেন মিস অরোরা! এ কী আপনার চুরুটের আগুন পেয়েছেন যে ফুঁ দিলে নিভে যাবে?”

মিস অরোরা তখন দরদর করে ঘামছে। আগুনের বিধ্বংসী তাণ্ডব সে এইমাত্রই স্বচক্ষে দেখেছে। কোনোমতে বলল, “সরি স্যার।”

“ফায়ার ব্রিগেড না এসে পৌঁছলে কারওর বাপের সাধ্য নেই এই ইলেকট্রিক চুল্লীর মধ্যে ঢোকে!”

পবিত্র অস্ফুটে বলল। ‘ইলেকট্রিক চুল্লী’ শব্দটা সে মিথ্যে বলেনি। গলগলিয়ে ভেতরের যে ধোঁয়া বাইরে আসছে তাতে মাংসপোড়ার প্রবন্ধ গন্ধ নাকে এসে ঝাপটা মারছিল। অর্থাৎ ভেতরের লাশগুলোও পুড়ছে।

“অত সময় নেই পবিত্র।”

অধিরাজ অধৈর্য, “এটা মরচুয়ারি। একে শুনছ একাধিক এসি ব্লাস্ট হয়েছে। এসি ব্লাস্ট হওয়ার মানে জানো? আমি আগেই মরচুয়ারির এসিগুলোকে লক্ষ করেছি। ওগুলো সব জি ডাব্লিউ পি রেফ্রিজারেন্টসের। গুগুলো বার্স্ট হওয়া মানে লিক করা। আর এগুলোর টাইপ এ-থ্রি। তার মানে লিকেজের ফলে হয় প্রোপেন অথবা আইসোবুটেনের মতো হাইড্রোকার্বন বাইরে আসছে—হুইচ ইজ হাইলি ফ্রেমেবল।” সে উত্তেজিত শ্বাস টানে, “উপরন্তু যেহেতু এটা মরচুয়ারি (মর্গ) তাই প্লাস্টিক নির্ঘাত আছে। এমবামিং কেমিক্যাল থাকা তো অবধারিত! ফরমালডিহাইড নির্ঘাত আছে। ওটা থাকলে যে-কোনো ঘর জতুগৃহ হতে সময় লাগে না। তার সঙ্গে যদি কোনো এমবামড বডি থাকে তাহলে তো কথাই নেই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে বডিগুলো পোড়ার গন্ধ আমরা পাচ্ছি সেগুলো এমবামড বডিই। তার মানে রতন এই মুহূর্তে চরম বিপদে! যে-কোনো মুহূর্তে মরবে। সময় নেই।”

“তবে?”

অসহায়ের মতো প্রশ্ন করল অর্ণব। সে এখন চোখে অন্ধকার দেখছে। রতনের সামনে স্রেফ পুড়ে মরা ছাড়া আর কোনো এস্কেপ রুটই নেই।

অধিরাজের মুখ শক্ত হয়ে ওঠে, “ওকে মরতে দেওয়া যাবে না। ওকে আমার জ্যান্ত চাই। আর এই আগুন আর হিট ও বেশিক্ষণ নিতে পারবে না। ইলেকট্রিশিয়ানরা চেষ্টা চালাক। ফায়ার ব্রিগেডের এখনও কোনো পাত্তা নেই। আর আমি লেম ডাকের মতো টাইম পাস করতে পারব না।”

“কিন্তু ওকে বের করবেন কীভাবে?” আত্রেয়ী দত্তর কণ্ঠে অনিশ্চয়তা ও সংশয়, “এখান থেকে তো ঢোকাই যাবে না।”

“ইন দ্যাট কেস বাইরে থেকে বের করব। দরজা না খুলুক, জানলা তো খুলবে। ভাঙাও যাবে। ওটা কাচের!”

বলতে বলতেই সে বাইরে থেকেই চেঁচিয়ে ওঠে, “রতন, তুমি আমার গলা শুনতে পাচ্ছ?”

“আমায় বাঁচান স্যার… প্লিজ” রতনের উন্মত্ত কান্না ও আর্তনাদ ভেসে আসে, “আমি মরতে চাই না!”

“তুমি এই মুহূর্তে কোথায় আছ? ভেতরের অবস্থা কী?”

“ভেতরে সব জ্বলছে। এসিগুলো ব্লাস্ট করেছে… লাশগুলো জ্বলছে… পর্দা জ্বলছে… চতুর্দিকে আগুন আর স্পার্ক…! দরজায় হাত দিলেই ইলেকট্রিক শক মারছে…আমি বেরোতে পারব না…। আর একটু হলেই মরে যাচ্ছিলাম!” সে চিৎকার করে ওঠে, “আমায় বাঁচান… হে–ল্প।”

“তোমার কিচ্ছু হবে না” অধিরাজ নির্দেশ দিল, “তুমি চেষ্টা করো বাইরের দিকের জানলার দিকে যাওয়ার। কাচে হাত দেবে না। জাস্ট জানলার সামনে যাও। পারবে?”

কিছুক্ষণ নীরবতার পর উত্তর এল, “পারব…। ওদিকের এসি এখনও ব্লাস্ট করেনি…কিন্তু পর্দায় আগুন…!”

“তুমি জাস্ট কোনোমতে জানলার সামনে এসো। আমি আসছি।”

ওদিকে তখন জেনিথের সামনে বুম আর ক্যামেরা নিয়ে রিপোর্টাররা ভিড় জমিয়েছে। নার্স, ওয়ার্ডবয় এবং ডাক্তাররাও পেশেন্টদের নিয়ে নিরাপদে দ্রুত বাইরে বেরোতে পেরেছেন। ভিড়ের মধ্যে থেকে কোনো এক সাংবাদিক চিৎকার করছে,

“জেনিথ হসপিটাল এই মুহূর্তে জ্বলন্ত চিতা। আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে থার্ড ফ্লোর থেকে ক্রমাগতই ধোঁয়া বেরোচ্ছে! ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি এখনও এসে পৌঁছয়নি কারণ রাস্তায় দুই কার্নিভালের টক্করে গোটা রাস্তা জ্যাম! পেশেন্টরা সুরক্ষিত, কিন্তু বিশ্বস্তসূত্রে শোনা গেছে যে থার্ডফ্লোরের মরচুয়ারিতে একজন আটকা পড়েছেন।”

রিপোর্টাররা যে যার মতো পারছে জেনিথের অবস্থার বিবরণ দিচ্ছে। আর হয়তো লক্ষ লক্ষ দর্শক নিজেদের নিরাপদ আশ্রয়ে বসে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে এই দৃশ্য দেখছে আর ভাবছে—ভাগ্যিস আমি স্পটে নেই। সবার মনেই একটা প্রশ্ন। থার্ডফ্লোরের মরচুয়ারিতে আটকা পড়া লোকটার কী হবে। উপস্থিত যারা ছিল তারা মোবাইল বের করে ওই অগ্নিকাণ্ডের ছবির ভিডিও রেকর্ডিং করতে ব্যস্ত!

“লেটস গো!”

কথাটা ছুড়ে দিয়ে অধিরাজ প্রাণপণে ছুটল নীচের দিকে। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল কোনো প্ল্যানিং আছে। কিন্তু সেটা সে এখন বলবে না। তার পেছন পেছন অর্ণব, পবিত্র, আত্রেয়ী, টুইঙ্কল আর কৌশানীও বিনা প্রতিবাদে ছুটেছে।

চারতলার মরচুয়ারির জানলা দিয়ে তখন ধোঁয়া বেরোচ্ছে। আগুনের শিখার প্রতিফলন আকাশকে লাল করে তোলে। ভেতর থেকে রতনের কান্না স্পষ্ট, “মা গো… বাঁচাও।”

যত দ্রুত সম্ভব সি আই ডি হোমিসাইডের টিম নেমে এল হসপিটালের বাইরে। অধিরাজের দৃষ্টি সোজা থার্ডফ্লোরের দিকে গেল। এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে ভেতরের জ্বলন্ত পর্দা আর আগুনের লকলকে জিহ্বা। তার মধ্যেই অস্পষ্টভাবে চোখে পড়ল একটা ছায়া নিজেকে কুঁকড়ে কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে জানলার কাছাকাছিই। সে স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলে এক সিকিউরিটি গার্ডের দিকে তাকিয়েছে, “একটা লম্বা দড়ি পাওয়া যাবে?”

“অ্যাঁ।”

সবার চোখ বিস্ময়ে ছানাবড়া। অফিসার ব্যানার্জি দড়ি দিয়ে কী করবেন।

“হাতে সময় নেই” সে প্রায় গর্জন করে ওঠে, “ আছে কী নেই?”

“আছে স্যার।”

“ওটা এখনই আমার চাই। উইথ অ্যান আইভি পোল উঠশ স্ট্রং হুকস।” তার কণ্ঠে অস্থিরতা, “কু-ই-ক!”

গার্ডটি মাথামুণ্ডু কিছুই না বুঝে ভেতরের দিকে ছুটল। সম্ভবত স্টোররুমে বা অন্য কোথাও গেল। অর্ণব ব্যাপারটা আন্দাজ করে সশঙ্কিত স্বরে বলল, “আইভি পোল! স্যার, এটা অসম্ভব। আইভি পোন্সের হুক একটা মানুষের ওজন নেওয়ার জন্য আদৌ টেস্টেডই নয়। তার ওপর একবার ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখুন। ওদিকের অংশের দেওয়াল পুরো কাচে মোড়া। গরম হয়ে আছে। হাত ফসকালেই …!”

অধিরাজের ঠোঁট শক্ত, “আই ডোন্ট হ্যাভ এনি আদার অপশন অর্ণব। তাই রিস্ক নিতেই হবে।”

ভিড়ের মধ্যে মুহূর্তের মধ্যেই ফিসফাস ছড়িয়ে গেল। লম্বা—আর আই ভি স্ট্যান্ডের হুক বা অ্যাঙ্কর যে কোন কাজে লাগতে পারে তা অনেকেরই মাথায় ঢুকেছে। তারা বুঝে উঠতে পারছে না এই অসম্ভব পরিকল্পনাকে বাধা দেওয়া উচিত না ভয় পাওয়া উচিত। কিন্তু সবার চোখেই আতঙ্ক স্পষ্ট।

অধিরাজের সেদিকে তাকানোর সময় নেই। সে পরনের ব্লেজারটা খুলে ছুড়ে দিয়েছে অর্ণবের দিকে, “টেক ইট!”

সাংবাদিকদের ক্যামেরা মুহূর্তের মধ্যে ঘুরে গেল তার দিকে। কেউ লাইভ স্ট্রিম করছে। কেউ রেকর্ডিং। কেউ আবার আপনমনেই বকে চলেছে। অধিরাজের চোখ নিজের লক্ষে স্থির। থার্ডফ্লোরের লাস্ট ঘরের জানলা!

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দড়ি এসে গেল। সঙ্গে আই ভি স্ট্যান্ড আর হুকও। সে দ্রুত দড়িটার শেষপ্রান্তে লম্বা আই ভি স্ট্যান্ডটা হুকসমেত বাঁধছে। তার টিমমেটরা সভয়ে, বিহ্বলদৃষ্টিতে একে অপরের দিকে তাকায়। ওরা খুব ভালোভাবেই জানে যে এই লোকটার মাথায় যখন জেদ আর পাগলামি চাপে তখন ঈশ্বরও ওকে থামাতে পারেন না। এই মুহূর্তে সে কারওর কথা শুনবে না।

“রাজা। দিস ইজ সুইসাইড…” পবিত্র তবু একবার কথাটা বলতে যায়। তার দিকে উম্মত্ত রাগে তাকিয়ে গর্জে উঠল অধিরাজ, “শা-ট আ-প। ডোন্ট ওয়েস্ট মাই টাইম।”

বলতে বলতেই আর একপ্রাপ্ত সে নিজের কোমরে শক্ত করে বেঁধে নিয়েছে। তারপর আর এক সেকেন্ডও অপেক্ষা না করে অভ্যস্ত দৃষ্টিতে থার্ডফ্লোরের জানলাটার দূরত্ব এবং অন্যান্য খুঁটিনাটি বিষয়গুলো মেপে নিল।

জাস্ট কয়েক সেকেন্ডের বিরতি। পরিস্থিতি বুঝে নিয়ে ক্যালকুলেট করতে যেটুকু সময় লাগে। তারপরই রক ক্লাইম্বিতে এক্সপার্ট এক মাউন্টেনিয়ারের হাত সবলে ছুড়ে দিল আই ভি স্ট্যান্ড সমেত গোটা দড়িটাকে। আশ্চর্য নিখুঁত তার গণনা। মুহূর্তের মধ্যে ঠং করে একটা ধাতব শব্দ। স্ট্যান্ডের হুক একবারেই অব্যর্থ নিশানায় জড়িয়ে আটকে গিয়েছে জানলার তলার কার্নিশের গ্রিলে। যে-কোনো কারণেই হোক জেনিথের কার্নিশগুলো সুন্দর গ্রিল দিয়ে ঢাকা। হয়তো বা ডেকোরেশন। কিন্তু তখন কে জানত যে এইভাবে কাজে লেগে যাবে!

চতুর্দিকে তখন পিনপতনের নীরবতা। অসংখ্য চোখ তার দিকে স্থির। কারও ঠোঁটে প্রার্থনা, কারও চোখে অবিশ্বাস। এমনকি সাংবাদিকরাও চেঁচামেচি ছেড়ে ফুটেজ তুলতে ব্যস্ত।

অধিরাজ একটা গভীর শ্বাস টানল। একবার টেনে দেখে নিল গ্রিপটা। তারপরই দড়ি বেয়ে সাবধানে, অথচ দ্রুতবেগে উঠতে শুরু করেছে ওপরের দিকে। থার্ডফ্লোরের ধোঁয়া বাড়ছে। যদি জানলার দিকের এসি ব্লাস্ট করে তাহলে আর কোনো উপায় নেই। মরে গেলেও তার আগেই পৌঁছতে হবে ওকে। তার চোখের দৃষ্টি পাথরের মতো স্থির। চোয়াল দৃঢ়।

নীচে দাঁড়িয়ে থাকা সঙ্গীদের ভেতরে ভেতরে বুক কাঁপছে। যেন কেউ একটানা দামামা বাজিয়ে চলেছে। পবিত্র তাকিয়ে দেখল আকাশের রং দৈত্যের চোখের মতো রক্তিম আগুনে। সে মনে মনে প্রার্থনা কবে, “নো…নো…স্কিপি। দিস ইজ সুইসাইড। নেমে এস প্লিজ। জীবনে একবার তো কথা শোনো।”

নীচে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকশো মানুষ নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে আছে। কারও হাতে ফোন, কারও চোখ এক অবিশ্বাস্য ঘটনাকে দেখছে। কেউ প্রায় পাথর হয়ে গিয়েছে আতঙ্কে। কে কী বলবে, কী করবে বুঝতে পারছে না। নিষ্প্রাণ একরাশ পুতুল যেন!

অধিরাজ কোনোদিকেই তাকায় না। সে ক্লাইম্বিতে মন দিয়েছে। পেলব দেবশিশুর মতো মুখ এখন নির্লিপ্ত ও কঠিন। হাত আর কাঁধের পেশীগুলো ফুলে ফুলে উঠছে। সে জানে, তাকে সময়ের মধ্যে পৌঁছোতেই হবে। যতই বাধা আসুক, থামার উপায় নেই। এ ও জানে, আই ভি স্ট্যান্ডের হুক চাপ না নিতে পেরে যে-কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। তবু চেষ্টা করতেই হবে ওকে।

কৌশানী বোস হাঁ করে গোটা দৃশ্যটা দেখছিল। কোনোমতে বলল, “দ্যাট ইজ ম্যাডনেস!”

“হ্যাঁ।” অর্ণব অনিমেষে ওপরের দিকে তাকিয়েই বলল, “বাট দ্যাট ইজ অধিরাজ ব্যানার্জি অলসো।”

শুরুর দিকে কিন্তু ক্লাইম্বিং সহজ ছন্দেই এগোচ্ছিল। দুই হাতে শক্ত করে দড়িটা ধরে অধিরাজ নিজের দেহটাকে সন্তর্পণে ওপরের দিকে তুলছে। প্রতিটি পদক্ষেপ নিখুঁত ও আত্মবিশ্বাসী। ওর দেহের স্নায়ুপেশীগুলো বুঝি লোহার! একবারের জন্যও কাঁপছে না, টলছে না। যেন ব্যাপারটা কিছুই নয়। যদিও ঘাম গড়িয়ে পড়ছে কপাল, গ্রীবা আর ঘাড়ের রগ বেয়ে। তার ওপর ধোঁয়া ঢুকে গলা জ্বালা করছে। কিন্তু অধিরাজ শুধু জোরে জোরে শ্বাস টেনে নিয়ে ফুসফুসে অক্সিজেন ভরল। মনে মনে গুনছে—এক, দুই…!”

ফার্স্ট ফ্লোরটা সে অনায়াসেই ক্রস করে গেল। মাধ্যাকর্ষণ নীচের দিকে টানছে। মজবুত, শালপ্রাংশু চেহারার ভারও কম নয়। অথচ তাকে দেখলে মনে হয়, ওই ছ-ফুট চার ইঞ্চির শরীরটার কোনো ভরই নেই। যেন হাওয়ায় ভাসছে। শুধু অর্ণব বুঝতে পারছিল যে স্যারের ঠিক কতখানি কষ্ট হচ্ছে। দড়িটা ইজি ক্লাইম্বিঙের উপযুক্ত একেবারেই নয়। আর হুকের কথা না বলাই ভালো। সে চোখ বুজে শুধু ঈশ্বরকে স্মরণ করে! একটা খুনীকে বাঁচাতে গিয়ে স্যার নিজেই না…!

“আঃ!”

সেকেন্ড ফ্লোরের প্রথমেই ঘটল অঘটন! থার্ডফ্লোরের গরম ধোঁয়া নীচের দিকেও কিছুটা নেমেছে। একমুহূর্তের জন্য অধিরাজের মনে হল ওর মুখ, চোখ বুঝি পুড়ে গিয়েছে। আগুনের ভাগ অসহ্য। কাচের গায়ে জমে থাকা বাষ্পের আস্তরণে আচমকাই তার হাত পিছলে গেল। মুহূর্তের মধ্যে, কিছু বোঝার আগেই অধিরাজের শরীর একটা ঝাঁকুনি খেল। পরমুহূর্তেই দড়িটা সজোরে নড়ে উঠেছে।

“স্যা–র!”

নীচ থেকে পাগলের মতো চেঁচিয়ে ওঠে অর্ণব। কাতর গলায় বলল, “সাবধানে। প্লিজ।”

সেই মুহূর্তেই একঝলক বাতাস ছুঁয়ে গেল অধিরাজের দেহ। অর্ণবের গলা সে শুনতে পেয়েছে। একবার নীচের দিকে ওর দিকে তাকানোর ইচ্ছেও হল। তবু ইস্পাত কঠিন সংযমে সে ইচ্ছেকে দমন করল অধিরাজ। এখন দুর্বল হলে চলবে না। তার কানে এখন শুধুই নিজের হার্টবিট প্রকট—ধুক… পুক… ধুক… পুক…ধুক… পুক। এক সেকেন্ডের জন্যও যদি দড়ি ছিঁড়ে যায়, তবে সোজা মৃত্যু…।

কিন্তু সে দাঁতে দাঁত চেপে আবার চেষ্টা চালায়। সেকেন্ড ফ্লোরের একটা জানলার ফ্রেম এক হাতে ধরে বডিটাকে ফের লিফট করছে। তার বুকের ভেতরটা কাঁপছে, কিন্তু চোখে কোনো ভয়ের প্রকাশ নেই। সেখানে শুধু আগুনের ভেতর আটকে থাকা মানুষটিকে বাঁচানোর তীব্র সংকল্প।

“প্লিজ…প্লিজ… স্টে অ্যালাইভ।”

অর্ণব মনে মনে প্রার্থনা করে চলেছে। যার জন্য প্রার্থনা করে তার কানে তো পৌঁছোয় না। এইটুকুই আশা, যদি পরম করুণাময়ের কাছে পৌঁছে যায়। সেটা বরং সহজ!

সেকেন্ড আর থার্ডফ্লোরের মাঝামাঝি যেতে না যেতেই হাত যেন পুড়ে গেল অধিরাজের। আগুনের শিখা আর উষ্ণতা এত তীব্র হয়ে উঠেছে যে জানলার কাচের সহ্যক্ষমতাও পার করে ফেলেছে। গরম বাতাস মুখের ওপর হল্কা ছুড়ে দিচ্ছে! প্রতিটি শ্বাস যেন তরল আগুন গেলার মতো। সে দরদর করে ঘামছিল। তবু হাল ছাড়বে না…!

“ওঃ গ—ড!”

হঠাই তার জুতোর সোল কাচের ওপরে পিছলেছে। গরম ফ্রেমের ওপর চাপ পড়তেই জুতো পিছলে যাচ্ছে। ভারসাম্য রাখতে গিয়ে সে কেঁপে উঠল। কিন্তু তাকে সামলে ওঠার আর একমুহূর্তও সময় না দিয়ে ওপরের জানলাটা এবার সশব্দে ফেটে গেল! এটাই হওয়ার ছিল। মুহূর্তের মধ্যে টুকরো টুকরো ভাঙা কাচ সজোরে এসে পড়ে অধিরাজের ওপরে। একেবারে ধারালো তীরের মতো গেঁথে গিয়েছে চামড়ায়। তার শরীর ব্যথায় ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে। অথচ মুখে কোনো শব্দ নেই। শুধু আরও শক্ত করে দড়িটাকে আঁকড়ে ধরল সে। পবিত্র নীচে বিড়বিড় করে, “জাস্ট ডোন্ট ডাই রাজা!”

নীচে অপেক্ষমান জনতা দৃশ্যটা দেখে শিউরে ওঠে। কারওর মুখ থেকে অসাবধানে চিৎকারও বেরিয়ে যায়। তারা কাচের বিস্ফোরণ দেখতে পেয়েছে। আর সেই কাচ যে হুড়মুড় করে জলপ্রপাতের মতো অধিরাজের ঘাড়েই পড়েছে তা বুঝতে কষ্টও হয়নি। তবু বিস্ময় যায় না। মানুষটা আহত, ক্লান্ত–অথচ অনড়!

থার্ড ফ্লোরে পৌঁছতেই এবার অধিরাজের মনে হল সে এক লাফে কোনো উনুনে গিয়ে পড়েছে। থার্ড ফ্লোরের মরচুয়ারির জানলার এক বিশাল কাচের প্যান ফেটে গিয়েছে। তার ভেতর থেকে আগুন ফুঁসে বেরোচ্ছিল। পর্দাও আগুনে দাউদাউ করে জ্বলছে। সেই আগুন আর একটু হলেই তাকেই সাপ্টে ধরছিল, কিন্তু সে চেষ্টা করল পাশ কাটিয়ে যেতে। ডাকটা ঠিকই করেছিল কিন্তু কপালদোষে হঠাৎই দড়ি গিয়ে আটকে গিয়েছে জানলার লোহার ফ্রেমে। মনে মনে প্রমাদ গুনল অধিরাজ। একবার বেঁচে গিয়েছে কোনোমতে। কিন্তু আবার যদি আগুন উল্কা উগরে দেয় তাহলে আর উপায় নেই…!

“চল্‌… শুভ।”

সমস্ত শক্তি দিয়ে দড়িতে টান দেয় অধিরাজ। ওপরের আট ভি স্ট্যান্ড আর হুক যেন কড়কড় করে শব্দ করে ওঠে। কেন একটা ঝাঁকুনি। তার পুরো শরীর এবার একপাশে হেলে যায়। ফের স্কিড করেছে।

“সামবডি হে-ল্প—হি-ম।”

নীচ থেকে জনতার চেঁচামেচি ভেসে আসে, “ফায়ার ব্রিগেড কী করছে?… উনি তো…!”

“আমি এখনও মরিনি।”

প্রবল জেদে নিজেই নিজেকে বলল অধিরাজ। তার শরীর কাঁপছে, কিন্তু মাথা ঠান্ডা। সে এক ঝটকায় কার্নিশ চেপে ধরে নিজেকে সোজা করেছে। তারপর জোরে টেনে দড়িটাকে ছাড়ায়। হুক প্রতিবাদ করলেও ভাঙেনি।

কাঁধে প্রচণ্ড ব্যথা। কাচের টুকরো সারা শরীরে গেঁথে আছে। কিন্তু তার মুখে একটা শব্দও নেই। শুধু নিঃশ্বাস ফেলে আবার দেওয়ালের সঙ্গে শরীরকে মিলিয়ে নিয়েছে! আর বেশি দূর নয়! ওই তো থার্ড ফ্লোরের জানালা–মাত্র দু-হাত দূরে! আর একটুখানি…!

থার্ডে ফ্লোরের ভেতরে ঘন ধোঁয়া! বাইরে থেকে থেকে শুধু পতনের রক্তচক্ষু ঝলসাচ্ছে। ভাগ্যিস কাচটা ভেঙে গিয়েছিল। সেজন্যই বেরোনোর রাস্তাটা উন্মুক্ত। পর্দাগুলো খসে পড়ে স্পেস দিয়ে দিয়েছে।

“রতন?…র-ত-ন!”

এবার দড়িটাকে সামলে ওই ভাঙা কাচের ফ্রেমটাকে চেপে ধরেই মরচুয়ারির ভেতরে লাফ মেরে ঢুকল অধিরাজ! হাতে কাচ গেঁথে গেল। ভেতরে উত্তাপ এত প্রবল যে শ্বাস নেওয়া যাচ্ছে না। সে দেখল ট্রে-তে রাখা লাশগুলো হু হু করে পুড়ছে। কিন্তু সময় নেই।

“স্যার! হে–ল্প ।”

অর্ধমৃত রতন জানলা থেকে দু-হাত দূরত্বে শুয়ে পড়েছিল। তার দমবন্ধ হয়ে আসছে। প্রায় অচৈতন্য। দেহে জীবনীশক্তি আর অবশিষ্ট নেই। তবু স্খলিত স্বরে বলল, “হে-ল্প!”

“নিজের বেলায় সেভ মি–অ্যাঁ?”

তাকে সপাটে পেল্লায় দু-তিনটে থাপ্পড় মেরে বলল সে, “এখন বুঝেছিস শালা মরতে কেমন লাগে। তোকে তো পরে দেখছি। ওঠ! ওঠা”

ওই থাপ্পড়ের ঠ্যালাতেই রতনের হুঁশ ফিরল। অর্ধদক্ষ শরীর ব্যথায় কাঁপছে। মুখের একদিকটা পুড়ে ঝামা। শরীরও অক্ষত নয়। অধিরাজ দড়িটা এবার তুলে নিয়ে তার কোমরে বেঁধে দিয়েছে।

“আমার হাত শক্ত করে ধর। ফস্কালে তুই-ই মরবি।”

রতন প্রাণপণে তার হাত আঁকড়ে ধরল। অধিরাজ তার কোমরে দড়ি বেঁধে একদিকটা শক্ত করে ধরে জানালা দিয়ে ঠেলে ওকে বাইরে বের করে দিয়েছে। দড়িটার বাকি অংশ নীচের দিকে ছুড়ে চেঁচিয়ে নিজের টিমমেটদের বলল, “গাইজ… লিটল হেল্প প্লিজ।”

ওপরের দিকে দড়িটাকে ধরার কেউ ছিল না। কিন্তু নীচে আছে। এবার ক্লাইম্বিং অনেক সহজ। পবিত্র, অর্ণব আর লেডি অফিসাররা সবাই দৌড়ে গিয়ে ধরেছে দড়িটার আর একপ্রান্ত। টুইঙ্কল তাড়াতাড়ি সেটার শেষ প্রাস্ত একটা পেল্লায় গাড়ির গায়ে বেঁধে দেয়!

এরপর স্তম্ভিত জনতার চোখের সামনে আস্তে আস্তে ওই দড়িতেই ঝুলতে ঝুলতে প্রথমে নামল বেহুঁশ রতন। আহত, কিন্তু বেঁচে আছে। তারপর নেমে এল স্বয়ং অধিরাজ।

এতক্ষণ সাংবাদিকরা নিঃশ্বাস নিতেও বুঝি ভুলে গিয়েছিল। এবার সে নেমে আসতেই প্রায় চেঁচিয়ে বলে উঠল,

“ওঃ।…অ্যান্ড হি মে-ড ই-ট!”

চতুর্দিকে হাততালির আওয়াজ। অধিরাজ একটু বিরক্তিমাখা দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকায়। তার সারা দেহ রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত। জুতোর সোল পুড়ে গিয়েছে। পা দুটো জ্বালা করছে। তবু অর্ণবের হাত থেকে ব্লেজারটা নিয়ে পরতে পরতে বলল, “অ্যারেস্ট দিস ম্যান। হি ইজ আ মার্ডারার। ইমিডিয়েটলি হসপিটালাইজ করো। অনেকটা পুড়েছে। কিন্তু বাঁচবে। আই নিড হিজ স্টেটমেন্ট… ।”

কথাটা শেষ করার আগেই ফের বিস্ফোরণের ভয়াবহ আওয়াজ। এতক্ষণে জানলার ওপরের এসিটা বার্স্ট করল!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *