২
“হে মা বিষাক্তকরণী, গত তিনঘণ্টা ধরে কী পরীক্বে করছ মাতে? এত লেট হলে মৃতুর আর রগুবীরও যে আমায় রকে করতে পারবেন না!”
i ডঃ চ্যাটার্জি আইভির প্রায় ঘাড়ের কাছে গিয়ে ফোঁস ফোঁস করতে করতে বললেন, “বলি, কিছু পাওয়া গেল? না গেল না?”
আইভি নার্ভাস হয়ে গিয়ে বলে, “না… মানে… ইয়ে… স্যার…।”
“মানে?… মানেটা কী!” ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তুমুল চটে ভ্রুকুটি করে বললেন, “এই কথাগুলো রিপোর্টে লিখবে তুমি? ‘না… মানে… ইয়ে?’ সে রিপোর্ট পড়ার পর এডিজি সেন আমার হাতে নাড়ু ধরিয়ে জিম করবেট ন্যাশনাল পার্কের টিকিট কেটে বলবেন, ‘যাও, তোমার বনবাসের সময় চলে এসেছে! বাণপ্রস্থ নাও গে’।”
আইভি এসির মধ্যেও দরদর করে ঘামছে। কোনোমতে বলল, “আর দশ মিনিট যার।”
“তোমার এই দশ মিনিটের চক্কর তো দশ বছরে গিয়ে থামবে দেখছি।” অসীম চ্যাটার্জি ভতাং ভতাং করে টেবিলে কয়েকটা ঘুষি মেরে নিজেই ‘উ হু হু’ করে উঠলেন। তারপর সামলে নিয়ে ফের গর্জন করে ওঠেন, “তোমায় কোন হতচ্ছাড়া টক্সিকোলজিস্টের সার্টিফিকেট দিয়েছিল বলো তো। সে হতভাগার খাবারে পুরো জোলাপের কন্টেনারটাই না মিশিয়েছি…।”
তিনি আরও কিছু বলতেই যাচ্ছিলেন। তার আগেই জোরালো বুটের শব্দ মুখের কথাগুলোকে আটকে দিয়েছে। মনে মনে বিড়বিড় করলেন, “ওই এলেন নবাবজাদারা। মুর্তিমান উৎপাত।”
মুহূর্তের মধ্যেই অধিরাজের সেই পরিচিত দীর্ঘ চেহারাটা দেখা গেল। তার চওড়া পিঠের কভার নিয়ে পেছন পেছন যথারীতি ভিজে বিড়ালটির মতো অর্ণব। অধিরাজ হেসে টিপ্পনি কাটে, “সকাল সকাল চণ্ডীস্তোত্র শুরু করে দিলেন কেন ডক? তামিল সিনেমার অঘোরীরাও এত চেঁচান না যত ডেসিবেলে আপনার বিশুদ্ধ মন্ত্রোচ্চারণ শোনা যাচ্ছে।”
ডঃ চ্যাটার্জি প্রায় ভাঁটার মতো চোখে তার দিকে তাকিয়েছেন, “নয়তো কী করব? তামিল সিনেমা ‘অরুন্ধতী’-র সোনু সুদের মতো আদর করে বলব? ‘অরুন্ধতী, মেরি মো-ম-বা-ত্তি! ‘ চাইলে ইন্দ্রনীলের বাংলা ভার্সানটাও বলতে পারি, ‘ওরে আমার বু-ল-বু-লি!’ কোন্টা তোমার পছন্দ?”
“যাঃ কলা! এর মধ্যে অরুন্ধতী আবার কোথা থেকে এসে টপকে পড়লেন।” অধিরাজ কৌতূহলী, “মিস কাটামুন্ডুর টাকরাত্রি পড়ে টাকটা কী একেবারেই গেছে?”
“প্রথমতঃ ওটার নাম মোটেই টাকরাত্রি নয়।” তিনি ফোঁস করে ওঠেন, “দ্বিতীয়তঃ চতুর্দিকে এত শালগ্রাম শিলা থাকলে মন্ত্র জপ করব না তো কী বেহালা বাজাব? ভাগ্য ভালো শঙ্খ-ঘণ্টা-কাঁসরও বাজাইনি। এরা নড়তে চড়তে যা সময় নেয়, তাতে কয়েকদিন বাদে পৈতেধারী বামুন হয়ে চাল-কলার ছাঁদাই বাঁধতে হবে। তাই আগেভাগেই সব স্তোত্র আওড়াচ্ছি। শক্তি দে মা-আ-আ কা-লী-ঈ-ঈ। হয়েছে? স্যাটিসফায়েড?”
অধিরাজ এবার অপরূপ গ্রীবাভঙ্গিতে অর্ণবের দিকে তাকিয়ে গুজগুজ করে, “তুমি আবার কয়েকমাস আগে আমায় অনন্ত আম্বানি হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছিলে। ভেবে দ্যাখো, মুকেশবাবুর কনিষ্ঠ পুত্রটি এই ফরেনসিক ল্যাবে থাকলে কী হত।”
ব্যাপারটা কল্পনা করেই অর্ণব সজোরে কেশে উঠেছে। তার দিকে দুর্বাসা মার্কা একটা ‘জ্বালিয়ে দেব’ দৃষ্টিপাত করে খ্যাঁকখ্যাক করে ওঠেন ভদ্রলোক, “এই এলেন, বেনাড্রিল আর হানিটাসের অঘোষিত ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর।”
“আরে ওকে ছাড়ুন।” অধিরাজ অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে, “আদতে হয়েছেটা কী?”
“যাও, তোমার পেয়ারের মোমবাত্তি আর বুলবুলিকেই জিজ্ঞেস করো।” তিনি হাত নাড়লেন, “হামি কুছু জানে না। হামি গরীব আদমি আছে। জানি না, যাও তো।”
সেরেছে। ইনি তো জলে পড়বেন না তেলে পড়ে ভেবেই পাচ্ছেন না। অধিরাজ অসহায়ের মতো এবার আইভির দিকে তাকায়, “সমস্যা কী হচ্ছে তা একটু খুলে বলবেন মিন.. মিস… মিস…।”
মিসের পরের অংশটা আবার সে মিস করেছে। অর্ণব তাড়াতাড়ি নামটা বলে দিতেই যাচ্ছিল। তার আগেই ফের ঘুরুত করে উঠলেন ডঃ চ্যাটার্জি, “কেন? মিস বুলবুলি পা হচ্ছে না? মিস ব্রকোলিও বলতে পারো। আলটিমেটলি সবসময়ই ছাগলের মতো ব্রকোলি চেবালে গ্রে ম্যাটারও ছাগলের মতোই হয়।”
এবার নিরীহ ‘ব্রকোলি’ সিনে চলে এল। অর্ণব কের আড়চোখে অধিরাজের দিকে তাকিয়েছে। ভেজিটেবল স্যালাডে সে-ও ব্রকোলি খেতে ভালোবাসে। আহেলি বেচারি এতক্ষণ উলটোদিকের টেবিলে দাঁড়িয়ে ‘অরুন্ধতী ও ব্রকোলির কান্না নামক যাত্রাপালা দেখছিল। তার চোখে অদ্ভূত ঔজ্জ্বল্য আর আনন্দ! বহুদিন বাদে প্রিয় মানুষের দেখা পেলে বোধহয় মনের উচ্ছ্বাস চেপে রাখা যায় না। তবু নিজের উত্তেজনা সামলে, এতক্ষণ পরে সে মাঠে নামার চেষ্টা করে, “অফিসার, আসলে ওই ডঃ ডেথ কেসটার স্যাম্পল পরীক্ষা করছে আইভি। একটু লেট হচ্ছে তাই…”
“ওই। চলে এলেন ব্রকোলির উকিল আর এক ফিস ‘লি’, বার অ্যাট ল। আহে ‘লি’।” তাঁর কপালে হাত, “দুই দিকে দুই ‘লি’ নিয়ে আমার যে খণ্ড-‘ত’ এর মতো খণ্ড খণ্ড অবস্থা হচ্ছে তা দেখে কে?”
অধিরাজ এবার ডঃ চ্যাটার্জির গা ঘেঁষে দাঁড়াল। ওঁর কানে ফিশফিশ করে বলে, “ঈশ্বরের কৃপা যে এই দুই ‘লি’ ব্রুস লি বা জেট লি এর মাসতুতো বোনের নাতনি নন। হলে এতক্ষণে খণ্ড-ত নয় ডক, আপনি চন্দ্রবিন্দু হয়ে যেতেন। ‘লি’-দের একদম আন্ডার এস্টিমেট করবেন না।”
তার কথা শুনে একটা ঢোঁক গিললেন ডক, “তার চেয়ে আমার শালগ্রাম শিলাই ভালো। আমি নয় ঘণ্টার বদলে বীকার বাজিয়েই নেব।” বলতে বলতেই হেঁকে উঠলেন, “এই যে পয়জন আইভি, কিছু খবর বের করতে পারলে?”
“হ্যাঁ মিস বুলবুলি…. ইররক।”
শব্দটা অরুন্ধতী এফেক্টে বেরিয়ে গিয়েছিল। অধিরাজ নিজেই নিজের মারাত্মক ভুলে আঁতকে উঠে জিভ কাটছে। পাশ থেকে অর্ণব ফিশফিশ করে, “মিস ভট্টাচার্য।”
“হ্যাঁ… ইয়ে… মিস ভট্টাচার্য…!” সে তাড়াতাড়ি ড্যামেজ কন্ট্রোল করল, “এনি নিউজ সেনোরিটা?”
‘বুলবুলি’ সম্বোধনটা শুনে প্রায় লজ্জায় টুকটুকে লাল হয়ে গিয়েছিল আইভি। দু-চোখে অপার অনুরাগ নিয়ে সে আগেই অনিমেষনেত্রে তাকিয়েছিল অধিরাজের দিকে। তার ওপর আবার ‘বুলবুলি’-র ঝটকা। হার্টটা প্রায় লাফিয়ে বাইরেই বেরিয়ে আসছিল তার। কোনোমতে সামলে নিয়ে বলল, “ইয়েস স্যার। কোনোরকম ভেনাম পাইনি। পয়জন গোছেরও কিছু নয়। তবে…!”
অধিরাজ ফের তার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে গভীর চোখে তাকিয়ে আছে দেখে ফের ঘাবড়ে গেল সে।
“হে মা, মাতাজি!” ডঃ চ্যাটার্জি ফের টাক চাপড়ালেন, “আবার পজ পড়ল! এত পজ তুমি পাও কোথায়? এত পাংচুয়েশন আসে কোথা থেকে বাপু? বিদ্যেসাগর মশাই উইল করে কপিরাইট দিয়ে গেছেন? বলি পেসমেকারটা থামল কী করে? ওখানে কোন্ শালা ফুলস্টপ লাগিয়েছে?”
আইভি ঢোঁক গিলল। এই লোকটার চাউনিই যে-কোনো পেসমেকারকে থামানোর জন্য যথেষ্ট। অন্য কিছু লাগে না। তবু ইনফর্মেশন দিতেই হবে। সে গলা খাঁকারি দিয়ে একটু ভীতু ভীতু কণ্ঠে জানায়, “স্যার, এই পেশেন্টের আদৌ এক্সপায়ার করার কথাই নয়। হি ওয়াজ ফাইন আফটার দ্য সার্জারি। কিন্তু ওঁর রক্তে আমি ক্লাস ওয়ান সি অ্যান্টিঅ্যারিদমিকের ট্রেস পেয়েছি। বিশেষ করে হাই ডোজের প্রোপাফেনন। এটা পেসমেকারকে হার্টকে স্টিমুলেট করতে বাধা দেয়। পেসমেকার ডিপেন্ডেন্ট পেশেন্টের জন্য ক্ষতিকর। বিশেষ করে যার সদ্যই পেসমেকার বসানো হয়েছে। এর সঙ্গে অ্যালডোস্টেরন অ্যান্টাগনিস্টের ডেডলি কম্বিনেশন আছে। এটা হাইপারক্যালেমিয়া, মানে পটাশিয়াম লেভেল বাড়িয়ে দেয়। সেক্ষেত্রে টি-ওয়েভ ওভারসেন্সিং-এর ফলে পেসমেকারের ফাংশন আর এবিলিটি অ্যাফেক্টেড হয়। এই দুটোর কম্বিনেশনই ভদ্রলোকের কোমা আর মৃত্যুর কারণ।”
আইভি-র কীর্তিকলাপ এতক্ষণ আহেলি লক্ষ্য করছিল। ‘বুলবুলি’ শব্দটা শুনে মুহূর্তের মধ্যেই তার নাকের পাটা ফুলে উঠেছিল। চোখেও উষ্মা প্রকট। আইভির বক্তব্য শেষ হতে না হতেই সে বলে ওঠে, “এই দুটোই গেছে আই ভি ড্রিপের মাধ্যমে। আই ভি ড্রিপের যেটুকু অংশ পেয়েছি তাতে এ দুটোরই ট্রেস আছে।”
অধিরাজ এবার আইভির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আহেলির দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়েছে, “তার মানে এটা সত্যিই স্বাভাবিক মৃত্যু নয়–মার্ডার।”
“নিঃসন্দেহে” আহেলি মাথা ঝাঁকায়, “শুধু তাই নয়, আমার ধারণা এর আগেও অন্তত কুড়িজন পেশেন্ট এভাবেই মারা গিয়েছেন। কারণ তাদেরও মৃত্যুর প্যাটার্ন সেম। পেসমেকার, অ্যান্ড দেন কোমা। তাদের ব্লাড, বডি ফ্লুইড বা সিরাম স্যাম্পল পাওয়ার উপায় নেই কারণ জেনিখের কার্ডিওলজি ডিপার্টমেন্টের হেড ডঃ সঞ্জয় বসু সবাইকেই ন্যাচারাল ডেথের সার্টিফিকেট দিয়ে বসে আছেন। ফলে বডির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হয়ে গেছে। সেখান থেকে কিছু জানার উপায় নেই। আমরা ক্রাইম সিন, আই ভি স্ট্যান্ড, বটল–সব কিছুই তন্নতন্ন করে দেখেছি। নো ফিঙ্গারপ্রিন্টস। তবে…”
সে কথা অসমাপ্ত রেখে ডঃ চ্যাটার্জির দিকে তাকার। সেটা লক্ষ্য করেই তিনি বললেন, “কপালগুণে চারজন পেশেন্টকে আমরা পেয়েছি যাঁরা হিন্দুধর্মের নন। তিনজন মুসলিম আর একজন ক্রিশ্চান। তাঁদের বডি আমরা এক্সহিউম করতে পেরেছি।”
“আ গুড নিউজ ইনডিড।” অধিরাজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, “তাতে কিছু পাওয়া গেল?”
“অফকোর্স। নয়তো কী আমি এখানে দাঁড়িয়ে পপকর্ণ বানাচ্ছি?” একটু রাগতস্বরেই জবাব দিলেন তিনি, “কিছু বলব বলেই তো ডেকেছি।”
“স্যরি… স্যরি… প্রসিড।”
অধিরাজের মুখ গম্ভীর। সে সিরিয়াসলি সব শুনছে দেখে ডঃ চ্যাটার্জি একটু টাক চুলকে নিয়ে বললেন, “এদের বডিতে বিউপিভিকেইন, লিডোকেইন হাইড্রোক্লোরাইড আর এপিনেফ্রিন এর হাই ডোসেজ পাওয়া গেছে। এগুলো এমনি দেওয়া হয়নি। বিউপিভিকেইন, লিডোকেইন বা এপিনেফ্রিন, এগুলো এমনিতে প্রাণঘাতী নয়। অপারেশন থিয়েটারে অ্যানাস্থেশিয়া হিসেবে ইউজ হয় কম মাত্রায়। কিন্তু যখনই এই তিনটেকে একসঙ্গে কাউকে ফ্যাটাল ডোসেজে দেওয়া হয়, ইন দ্যাট কেস ইটস আ বম্ব। আ ভেরি ডেডলি বম্ব ফর ইওর হার্ট। এই চারজন পেশেন্টই জেনিথে ডঃ সঞ্জয় বসুর আন্ডারে ভরতি ছিলেন। আমরা জেনিথ থেকে এদের মেডিক্যাল হিস্ট্রিও আনিয়েছি। প্রথম পেশেন্ট রিয়াজুদ্দিন রহমানের বুকে স্টেন্ট বসানোর কথা ছিল। কিন্তু স্টেন্ট বসানো তো দূর অস্ত, অপারেশন টেবিলে তোলার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তাঁর মারাত্মক কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়। দেন অ্যান্ড দেয়ার, সবার চোখের সামনেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। দ্বিতীয় পেশেন্ট ফারহান মালিকের কেসও তাই। ওঁকেও স্টেন্ট দেওয়ার ছিল। কিন্তু ওটির দরকার পড়েইনি। তার আগেই কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে তিনি কোমায় চলে যান। আর পাঁচদিন পরে আলোকের মৃত্যু হয়। তৃতীয় পেশেন্ট আতাউর হক আর চতুর্থ পেশেন্ট এডওয়ার্ড থমাসের কেস তো হুবহু জেরক্স কপি। ওঁরা কোনো সার্জারির জন্য ভরতিই হননি। এসেছিলেন নিজেদের হার্টের নিয়মিত চেক-আপ করতে। অসুবিধে খুব সামান্যই ছিল। দু-জনেই মাঝেমধ্যে দু-তিন দিনের জন্য হসপিটালে ভরতি হতেন এবং সমস্ত টেস্ট আর চেক-আপ করে বাড়ি ফিরতেন। যেটুকু বয়সোচিত নমিনাল প্রবলেম ছিল তা ডঃ বসু ওষুধ দিয়েই কন্ট্রোল করে রেখেছিলেন। সমস্ত ভাইটালস পারফেক্ট। কিন্তু আচমকাই ওঁরা অসুস্থ বোধ করেন। আর কিছু বোঝার আগেই ফের মারাত্মক কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট। দু-জনের কেউই সারভাইভ করেননি।”
“স্টে-ঞ্জ!” অধিরাজের স্খলিত ঠোঁট থেকে শব্দটা খসে পড়ে, “তার মানে ডঃ বসু এদের কাউকেই অপারেট করার সুযোগ পাননি!”
“অপারেট তো দূর, ছুরি কাঁচি লাগানোর সময়টুকুও ছিল না। পেশেন্ট কোলাপ্স করছে দেখে স্রেফ ডাক্তাররা সি.পি.আর দিতে পেরেছিল। বাট আনফরচুনেটলি কেউ বাঁচেনি।” তিনি মাথা ঝাঁকালেন, “আমি বুঝতে পারছি না ঘটনাটা কী ঘটছে। তোমরা সঞ্জয়কে গ্রেফতার করেছ। মিডিয়া তো ওকে ‘ডঃ ডেথ অব কলকাতা’ পদবীও দিয়ে দিয়েছে। শুনলাম পেশেন্ট পার্টি থেকে সাধারণ জনগণ অবধি সবাই ওর ফাঁসির দাবিও করছে। কিন্তু…।”
সে উৎসুক, “কিন্তু?”
ডঃ চ্যাটার্জির মুখে বিষণ্ণতা ছেয়ে যায়। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, “কেউ বিশ্বাস করুক বা না করুক, আমি জানি সঞ্জয় এ-কাজ করতেই পারে না। আমরা দু-জন একই স্কুলে পড়তাম। ইভেন একই মেডিক্যাল কলেজেও পড়েছি। পরে রাস্তা পালটে গেলেও বা ব্যস্ততার কারণে যোগাযোগ না থাকলেও হি ওয়াজ মাই বেস্ট ফ্রেন্ড। ও মানুষ তো দূর, একটা মশাও মারতে পারে না।”
অধিরাজ তাঁর দিকে অপলকে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল, “আপনাকে আগেও বলেছি, সব খুনীই কারওর না কারওর সন্তান, আত্মীয় বা বন্ধু হয়। তাঁরাও ওই একই কথা বলেন, ‘ও খুন করতে পারে না’।”
তিনি কোনো কথা না বলে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর আস্তে আস্তে বলেন, “সেকেন্ড ইয়ারে পড়ার সময়ে দেখেছি, সঞ্জয় কুকুর, বিড়াল নির্বিশেষে প্রচুর আহত প্রাণীর চিকিৎসা করত। তখনই একটা ছোট্ট চড়ুই পাখির ছানা মরে যাওয়ায় ওর কান্না জীবনেও ভুলব না আমি। নামকরা ডাক্তার হওয়ার পরেও ও ওর ‘ওথ’ ভোলেনি। প্রচুর দরিদ্র মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা দিয়েছে। প্রত্যন্ত গ্রামের ক্যাম্পে রেগুলার ভিজিট করেছে, এখনও করে। এত ব্যস্ত শিডিউলের মধ্যেও
ও বৃদ্ধাশ্রম, অনাথ আশ্রমের রোগীদের ভিজিট করে। রাত তিনটে বা ভোর চারটেতেও ওর কাছে মেডিক্যাল হেল্প চাইলে ও হাসিমুখে তোমার চিকিৎসা করবে। পেশেন্টদের জন্য গোটা জীবনই উৎসর্গ করেছে যে লোকটা সে কিনা ডঃ ডেথ! এটা কী করে হয় রাজা?”
“ডক…” সে শান্তস্বরে বলে, “প্রথমত ওঁকে আমি গ্রেফতার করিনি। করেছে পবিত্র আচার্য। ওই সময়ে আমি অফ ডিউটি ছিলাম। আপনি নিজেও জানেন যে আজই জয়েন করেছি। দ্বিতীয়ত, আপনাদের রিপোর্ট যা বলছে তাতে আমি হান্ড্রে পার্সেন্ট শিওর যে এটা কোনো অভিজ্ঞ এবং ব্রিলিয়ান্ট ডাক্তারেরই কাজ যে সমস্ত মেডিসিন গুলে খেয়েছে। ফরেনসিক রিপোর্ট আর এভিডেন্স আপনার বন্ধুর বিরুদ্ধেই যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, প্রাইম উইটনেস হিসেবে যে লেডি ডক্টর আছেন, এবং আরও যাঁদের বয়ানের ভিত্তিতে ওঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাঁরা প্রত্যেকেই বলেছেন যে ডঃ সঞ্জয় বসুর আন্ডারে পেশেন্টদের ডেথ রেট আকাশছোঁয়া। লাস্ট বাট নট দ্য লিস্ট, কফিনের শেষ পেরেক—আপনার বন্ধু নিজেই নিজের অপরাধ স্বীকার করে বসে আছেন। তিনি জানিয়েছেন যে সব মার্ডারগুলোর পেছনে তাঁরই হাত আছে। সো..” সে কাঁধ ঝাঁকায়, “ইটস অ্যান ওপেন অ্যান্ড শাট কেস।”
ডঃ চ্যাটার্জি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন, “কিন্তু মোটিভ কী? এখনও পর্যন্ত যত ডঃ ডেথের দেখা আমরা পেয়েছি তাদের সবার কিছু না-কিছু মোটিভ ছিল। সঞ্জয়ের কোনো মোটিভই নেই!”
“সিরিয়াল কিলিঙের জন্য কোনো মোটিভ লাগে না ডক।” অধিরাজ স্নান হাসল, “তবে এখনও গোটা ঘটনার গভীরে যাওয়ার সময় পাইনি। ডঃ বসুর সঙ্গে দেখাও হয়নি। পবিত্রর কাছ থেকে আপডেট নেওয়াও বাকি। শুধু সেই রাতের সেনোরিটা… কী যেন নাম…?”
এ লোকটার রেকর্ড ফের আটকেছে! অর্ণব পাশ থেকে তাল ঠুকে দেয়, “ডঃ সুজাতা রায়।”
“হ্যাঁ।” সে ইতিবাচক মাথা ঝাঁকিয়েছে, “শুধুমাত্র ডঃ রায়ের কথাই শুনেছি। বাকিদের বয়ান এখনও দেখিনি। তার ওপর ডঃ বসু ফাঁসির দড়ি ধরে নিজেই টানাটানি করছেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা, যে মৃত্যুগুলো হওয়ার কথাই নয়, পেশেন্টকে তিনি স্পর্শও করেননি, অথচ তারা পটপট করে এক্সপায়ার করছে এই জিনিসটা দেখেও কী ওঁর মনে কোনো সন্দেহ জাগেনি? উনি কোন আক্কেলে ডেথ সার্টিফিকেট দিয়ে বসে থাকলেন? ডঃ সুজাতা রায়ের মতো অনভিজ্ঞ জুনিয়র ডাক্তারের মনে যে সন্দেহটা এল, সেটা ওঁর মনে একবারের জন্যও এল না? উনি পোস্টমর্টেম করে দেখার প্রয়োজন তো বোধই করেননি বরং নিশ্চিন্তে স্বাভাবিক মৃত্যুর সার্টিফিকেট লিখে দিলেন। আপনার ব্যাপারটা ফিশি মনে হচ্ছে না?”
“আমার গোটা ব্যাপারটাই ফিশি মনে হচ্ছে।” ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “গো অ্যাজ ইউ উইশ। তবে একটা লিড দিয়ে রাখি। পারলে সঞ্জয়ের টিমের অ্যানাস্থেসিস্টকে একবার জেরা করে নিও।”
অধিরাজ কোনো কথা না বলে ভ্রু-ভঙ্গি করে ওঁর দিকে তাকায়। তিনি আস্তে আস্তে বললেন, “বিউপিভিকেইন, লিডোকেইন, এপিনেফ্রিনের মতো মেডিসিন যে লোকটা
হরদম হ্যান্ডল করে বা ডোসেজগুলো সবচেয়ে ভালো জানে সে কোনো কার্ডিওলজিস্ট নয়, অ্যানাস্থেসিস্ট।”
অধিরাজ শান্ত ভঙ্গিতে বলল, “আন্ডারস্টুড। থ্যাংকস ডক।”
