৩
“ডঃ বসু নিজেই কনফেশন দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু লোকটাকে দেখে খুনী বলে মনে হয় না রাজা।”
পবিত্র আচার্য একটু দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে জানায়, “ভদ্রলোক অদ্ভুত শান্ত আর সৌম্য। রেকর্ডও দুর্দান্ত। ওঁর মধ্যে আমি অন্তত কোনো অ্যাগ্রেসিভনেস বা ভায়োলেন্সের ছিটেফোঁটাও দেখিনি। বরং যতটুকু বুঝেছি বেশ ইমোশনাল। তোমার মনে হয় উনি একজন সিরিয়াল কিলার হতে পারেন?”
‘ডঃ ডেথের’ কেস-ফাইলটা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছিল অধিরাজ। তার চোখ দুটো আত্মমগ্ন। হাতে ধরা ধূমায়িত ইন্ডিয়া কিংস। ঠোঁটের দৃঢ় গ্রিপে জ্বলন্ত স্টিকটাকে চেপে ধরে সেটাতে সুখটান মেরে অন্যমনস্ক উষ্ণ স্বরে বলল, “বাইরের রূপে ভুলো না খুড়ো। ইনি একে ডাক্তার। তার ওপর স্বাভাবিকভাবেই ঠান্ডা মাথার লোক। ভায়োলেন্ট কিলারের চেয়ে কোল্ড ব্লাডেড মার্ডারারকে বোঝা অনেক বেশি টাফ। তাই অসম্ভব কিছুই নয়।”
“কিন্তু ওঁর পেশেন্টরা অলমোস্ট ওঁকে পুজো করে স্যার।” অর্ণব বলে, “ইউটিউবে, টিভিতে ওঁর প্রাক্তন ও বর্তমান পেশেন্টদের বয়ান শুনছিলাম। তাদের বক্তব্য ডঃ বসু ওদের কাছে দেবতুল্য। তিনি খুন করতেই পারেন না। পেশেন্টরা ডঃ বসুর গ্রেফতারিতে খাপ্পা হয়ে আছে। এমন কী কিছু পেশেন্ট তো ডঃ সুজাতা রায়ের ওপরও খার খেয়ে বসে আছে। বলছে, ওই মহিলা ইন্টেনশনালি খামোখা বদনাম করছেন ডঃ বসুকে। এরকম একজন দেবতার বিরুদ্ধে বলার জন্য ডঃ রায়কেই ফাঁসি দেওয়া উচিত।”
অর্ণব ভুল কিছু বলেনি। পরিস্থিতি কিছুটা এমনই। এককথার অগ্নিগর্ভ। জনতা এখন দু-ভাগে বিভক্ত। একদিকে মৃতদের শোকার্ত পরিবার আর একদল মানুষ ডঃ বসুর ফাঁসির জন্য উঠে পড়ে লেগেছে, প্রতিবাদ মিছিল করছে। অন্যদিকে ডঃ বসুর লম্বা কেরিয়ারের এতদিনের সব পেশেন্টরাও পথে নেমেছে। তাদের মতে পুলিস ও প্রশাসন ভুল করছে এবং ডঃ সঞ্জয় বসুর মতো একজন শ্রদ্ধেয় মানুষকে অন্যার অপবাদে হ্যারাস করছে। সি আই ডি হোমিসাইডের অফিসের সামনে দুই পক্ষই ভিড় জমাচ্ছে। একদল চেঁচাচ্ছে, “ডঃ ডেথ—শুড বি হ্যাঙ্গড টিল ডেথ।” অন্যদল স্লোগান দিচ্ছে “জাস্টিস ফর দ্য ইনোসেন্ট—সেভ ডঃ সঞ্জয় বসু।” ব্যুরোর সামনেই দুই দলের প্রায় মারপিট লাগার উপক্রম। বেচারা অধিরাজ বাইরে বেরোনোর সুযোগই পাচ্ছে না। তাকে একঝলক দেখতে পেলেই ‘স্যার… স্যার’ করতে করতে ধেয়ে আসছে সবাই। কেউ বলছে, “ডঃ বসুর যেন ফাঁসি ছাড়া অন্য কোনো শাস্তি না হয়! একদম ছাড়বেন না স্যার।” অন্য দলের অনুনয়, “স্যার, ডঃ বসু আমাদের ভগবান। উনি এমন করতেই পারেন না। ওঁকে কেউ চক্রান্ত করে ফাঁসিয়েছে। প্লিজ ডাক্তারবাবুকে বাঁচান!”
এর ওপর আবার গোদের ওপর বিষফোঁড়া মিডিয়া! তারাও কনফিউজিং সব প্রশ্ন করে চলেছে—
“স্যার, আপনার কী মনে হয় যে ডঃ সঞ্জয় বসুই খুনী? …তাঁকে শুধুমাত্র কয়েকজনের বয়ানের ভিত্তিতে গ্রেফতার করা হল কেন? … তাঁর বিরুদ্ধে কী প্রমাণ পাওয়া গেছে? …তিনি কী কারওর ষড়যন্ত্রের শিকার? … না পুলিস ও প্রশাসনই তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে?… পুলিসই টাকার বিনিময়ে প্রমাণ লোপাট করবে না তো! …ডঃ বসুকে কোর্টে তুলতে এত দেরি হচ্ছে কেন?…” ইত্যাদি।
এই তিনদিকের ত্রিশুলের খোঁচায় অতিষ্ঠ হয়ে আপাতত সি আই ডি হোমিসাইড গোটা চত্বরে পুলিসবাহিনী নামাতে বাধ্য হয়েছে। তারা কাউকে ত্রিসীমানায় ঘেঁষতেই দিচ্ছে না। তাতে অধিরাজ ও অন্যান্য অফিসাররা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে ঠিকই, তবে শহর উত্তাল।
“ডঃ হ্যারল্ড ফ্রেডরিক শিপম্যানের নাম শুনেছ পবিত্র?”
পবিত্র একশো আশি ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে মাথা নেড়ে বলল, “নাঃ। আমি ডাক্তারদের থেকে দূরে থাকতেই ভালোবাসি। আমার বউ অবশ্য ডাক্তারদের বেজায় ভালোবাসে। তাই ও জানলেও জানতে পারে।”
“দুঃখের বিষয় রাজশ্রী বউদি হোমিসাইডের অফিসার নন।” সে আপনমনেই বিড়বিড় করে বলতে থাকে, “ডঃ হ্যারল্ড শিপম্যান অসম্ভব জনপ্রিয় একজন ডাক্তার ছিলেন। সবাই তাঁকে ধন্বন্তরি হিসেবেই মানত। রীতিমতো চ্যারিটিও করতেন। গরীবের দেবতা, অনেকটা ডঃ বসুর মতোই। অনেক পেশেন্টকে অবধারিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছিলেন। অক্লান্তভাবে রোগীদের শুশ্রূষা করতেন। যন্ত্রণাকাতর মানুষগুলোর রোগ তাঁর অ্যাপিয়ারেন্সে, সহানুভূতিশীল কথাবার্তাতেই অর্ধেক সেরে যেত। এককথায় সবাই তাঁকে ভগবানই বলত। এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে তাঁর বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললেই গণধোলাই খেয়ে মরার চান্স প্রবল!”
“ওঃ হোরেশিও।” পবিত্র কনফিউজড, “তিনি ধন্বন্তরি ছিলেন, জনপ্রিয় ছিলেন তাতে আমার কী! রাজশ্রীর ইন্টারেস্ট থাকলেও থাকতে পারে। ওর আবার রোগের বাতিক আছে। তা এই মহানুভব ডাক্তারবাবু কী আছেন না টপকেছেন? দেখা করা যায়?”
“না। দু-হাজার চার সালেই তিনি টপকেছেন।”
“তাহলে তাঁর ওপর বাতেল্লা দেওয়ার মানে কী খুড়ো?”
অধিরাজ একটা ধোঁয়ার রিং বানিয়ে হাসল, “আজকে যে এই ‘ডঃ ডেথ’ উপাধিটি বারবার শুনতে পাচ্ছ, এটা তাঁরই কৃপার ফল! এই তথাকথিত দেবদূতটি ত্রিশ বছর ধরে প্রায় আড়াইশো পেশেন্টকে যমালয়ে পাঠিয়ে পরবর্তীকালে শ্রেষ্ঠ যমদূতের উপাধিও অর্জন করেছিলেন। সংখ্যাটা আড়াইশোর বেশি হলেও আশ্চর্য হব না। গোটা তিন দশক ধরে কেউ বুঝতেই পারেনি যে একজন স্নেহময় ডাক্তারের মুখোশের পেছনে এক ঠান্ডা মাথার সিরিয়াল কিলার বসে আছে। তাও যা তা সিরিয়াল কিলার নয়। বিশ্বাস না হয়, গুগলকাকুকে জিজ্ঞেস করে দ্যাখো। কাকু বলে দেবেন যে তিনি শুধু ডাক্তার নন ‘মোস্ট প্রলিফিক সিরিয়াল কিলার ইন মডার্ন হিস্ট্রি’-ও বটে। হ্যারল্ড শিপম্যানই সারা বিশ্বে ‘ডঃ ডেথ’ নামে বিখ্যাত। অনেকে আবার তাঁকে ‘অ্যাঞ্জেল অফ ডেথ’-ও বলত। তাঁর বেশির ভাগ টার্গেটই ছিলেন অসুস্থ সিনিয়র সিটিজেনরা, বা টার্মিনাল রোগে ভোগা কোনো বয়স্ক পেশেন্ট। ডায়ামর্ফিন বা ওই জাতীয় ওষুধের ওভারডোজ দিয়ে তিনি আড়াইশোর ওপর বৃদ্ধ বৃদ্ধাকে স্বর্গে ট্রান্সপোর্ট করেছিলেন। এমন নয় যে কেউ তাঁকে সন্দেহ করেনি। ডঃ সুজাতা রায়ের মতোই আর একজন লেডি ডক্টর লিভা রেনল্ডস এই হাই ডেথ রেটের ব্যাপারটা নোটিস করেছিলেন। তিনি কারোনারের কাছে অবিকল ডঃ রায়ের মতোই রিপোর্ট করেন। ইভেন জন শ নামের একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার পর্যন্ত পুলিসকে বলেছিল যে আজ পর্যন্ত যত বয়স্ক পেশেন্টকে সে শিপম্যানের হসপিটালে নিয়ে গিয়েছিল তারা কেউ জ্যান্ত ফেরেনি। কিন্তু পুলিস কিছু করতে পারেনি। কারণ ডঃ শিপম্যানের ‘ভগবান’ মার্কা ইমেজ আর জনপ্রিয়তা। বোকার মতো একজন মৃত পেশেন্টের উইল ফর্জারি না করলে তিনি চিরদিনই ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যেতেন। ত্রিশ বছর যেমন একদম ক্লিন ছিলেন তেমনই ‘ভগবান-জোনড’ হয়েই থাকতেন। তাঁর ভেতরের শয়তানকে কেউ ধরতেই পারত না।”
বিস্ময়ে অর্ণবের মুখ হাঁ হয়ে যায়। সে কোনোমতে বলে, “মা-ই গ-ড!”
“শুধু ইনিই নন।” অধিরাজ মৃদু হাসল, “এনার আগেও একজন ছিলেন। ডঃ জন বড়কিন অ্যাডামস। নিপাট ভদ্রলোক, যদিও অত্যন্ত অর্থলোভী। কানাঘুষোয় শোনা যেত যে তিনি অবৈধ ড্রাগের সাপ্লাই দিতেন। প্রেসক্রিপশন ফর্জারিতেও সিদ্ধহস্ত। নার্কোটিক ড্রাগ, মর্ফিন, পেথিডিন, হেরোইন আর বার্বিচারেট তাঁর মেইন অস্ত্র ছিল। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫৬ অবধি নির্বিবাদে তিনি আনুমানিক ১৬৩ জন এল্ডারলি পেশেন্টকে ‘স্পেশাল ইঞ্জেকশন’ দিয়ে পটলক্ষেতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন! সংখ্যাটা ৩১০ হলেও অবাক হব না। দুঃখের বিষয় সেই সিক্রেট ইঞ্জেকশনের কম্পোজিশন তিনি কাউকেই জানিয়ে যাননি। কিন্তু ভেবে দ্যাখো, দশ বছর ধরে একটা লোক একাধিক বে-আইনি কাজ চালিয়ে গেলেন, অথচ কেউ তাঁকে ধরতেই পারল না! ট্রায়ালের সময় তাঁর ডায়লগ কী ছিল জানো? মিসেস মোরেল মার্ডার কেসের ব্যাপারে তিনি বলেছিলেন, ‘মার্ডার… মার্ডার… ক্যান ইউ প্রুভ ইট ওয়াজ মার্ডার?…আই ডিডন্ট থিঙ্ক ইউ কুড প্রুভ ইট ওয়াজ মার্ডার। শি ওয়াজ ডাইং ইন এনি ইভেন্ট।’ লে হালুয়া। আমি ওঁর ডায়লগগুলো পড়ে ভাবছিলাম যে লোকটা পাগল না অরবিন্দ কেজরিওয়াল! লোকটা হয়তো হ্যারল্ড শিপম্যানের মতো আরও কয়েক দশক বিজনেস চালাতে পারত। কিন্তু ওই ১৬৩ জনের কাছ থেকে সম্পত্তি লিখিয়ে নিয়েই কেসটা খেল। এবার বলো কী বলবে? ইনি সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাক্তন ‘ডঃ ডেথ’! আমি অবাক হব না যদি শিপম্যান এনার কাছ থেকেই সিরিয়াল কিলার হওয়ার কনসেপ্টটি কপি করে থাকেন।”
অর্ণব একের পর এক বিস্ময়ের আঘাতে যেন মুক হয়ে যায়। ডঃ ডেথের কিংবদন্তী নিতান্ত সাধারণ নয়। কালে কালে এই ‘ডঃ ডেথ’ নামক যমদূত দেখা দিয়েছে। অন্য রূপে, অন্যভাবে। কিন্তু সিরিয়াল কিলিঙের ধারা অব্যাহত।” সে একটু ভেবে নিয়ে বলে, “ভারতেও একজন ডঃ ডেথ ছিলেন না?”
“হ্যাঁ।” অধিরাজ ছোট্ট নড করে, “ডঃ দেবেন্দ্র শর্মা। তবে তিনি আবার সবাইকে টেক্কা দিয়েছেন। ছিলেন বেসিক্যালি আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞ। কিন্তু শেষমেশ হয়ে গেলেন ট্যাক্সি চোর ও সিরিয়াল কিলার। হোয়াট আ ট্রান্সফর্মেশন। ২০০২ থেকে ২০০৪ অবধি ইনি নিজের মেইন কর্মকাণ্ড চালিয়েছিলেন। তবে ওই দু-বছরেই যা করেছেন তাতে বাকি দু-জন লজ্জায় ধুতু ফেলে ডুবে মরবেন। ইনি ওই দু-বছরেই প্রায় একশো বা তারও বেশি মার্ডার করে ফেলেছেন। কী করেননি ভদ্রলোক। ১৯৯৪ থেকে ২০০৪ অবধি তিনি প্রায় ১২৫টি কিডনি বিক্রি করে বসে আছেন! একেকটা কিডনির দাম পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা। তারপর প্রায় একশোর কাছাকাছি ট্যাক্সিচালককে খুন করে ওই লজঝড়ে ট্যাক্সিগুলোকে কুড়ি-পঁচিশ হাজার টাকায় উত্তরপ্রদেশের ব্ল্যাকমার্কেটে বিক্রি করতেন। ভগা জানে ট্যাক্সির সঙ্গে সঙ্গে কিডনিও হাওয়া হত কী না। বলিহারি! লোকে এত কষ্ট করে কৌন বনেগা ক্রোড়পতি খেলতে যায় কেন?”
অর্ণবের দমবন্ধ হয়ে আসছিল। কোনোমতে বলল, “১৯৯৪ থেকে ২০০৪ অবধি কিডনির র্যাকেট চালিয়ে গেল লোকটা, দু-বছর ধরে এতগুলো ট্যাক্সি ড্রাইভারকে খুনও করে গেল—তবু এত দেরিতে ধরা পড়ল!”
“এইখানেই তো অবতারটি জিনিয়াস অর্ণব। তিনি কোনো প্রমাণই রাখতেন না যে! হতভাগ্য লোকগুলোকে মার্ডার করে কুমীরদের পার্টি দিতেন। লাশই যদি কুমীরের ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ বা ডিনার হয়ে যায় তবে তো কোনো এভিডেন্সই থাকে না। কী মাথাই না খেলিয়েছে।” সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, “আপাতত তিনি শ্রীঘরে। সেখানেই যদি মরে যান তবে নরকের পাঁচিলে বসে ঠ্যাং দোলাতে দোলাতে বাকি দু-জনের সঙ্গে না হয় ‘ব্রিজ’ বা অনলাইনে ‘ওঃ হেল’ খেলবেন। নরকের ভেতরেও তো কারওর ঠাঁই হবে না। তাই পাঁচিলই বুকড।”
পবিত্র মুখ গম্ভীর করেছে, “তিনজনে হবে না মামা। মিনিমাম চারজন লাগবে। ব্রিজে তো চারজন মাস্ট।”
“আর একজন আছেন না?” অধিরাজের মুখে দুষ্ট হাসি, “র্যাকে ফাঁসি দেওয়ার জন্য জনতা উঠে পড়ে লেগেছে। আমরা যাকে ডিপোর্ট করব।”
“ডঃ সঞ্জয় বসু?”
“হতেও পারে, নাও পারে। আপাতত ওঁর দিকেই পান্না ভারী।”
অর্ণব আপনমনেই কী যেন ভাবছিল, “কিন্তু স্যার, আপনি যতজন ডঃ ডেথের কথা শোনালেন তাদের সবার মোটিভ আছে। কেউ টাকার জন্য মেরেছে, কেউ অর্গান ট্র্যাফিকিং বা ট্যাক্সি চুরি করার জন্য। অন্তত মেটিরিয়াল কিছু মোটিভ আছে। অথচ এই কেসে কোনো মেটিরিয়াল মোটিভ তো দেখছি না। যে পেশেন্টরা মারা গিয়েছেন তাঁরা কেউ ডঃ বসুর নামে উইল করেননি, টাকা দেননি। ডঃ বসু যে লেভেলের ডাক্তার তাতে ট্যাক্সি চুরি করার মতো পাতি কাজ করবেন না। অলরেডি নিজেই কয়েক কোটি টাকার মালিক। ওপরন্তু ওঁর স্ত্রীও নামকরা গাইনোকোলজিস্ট। ছেলে বিলেত ফেরত মেডিসিনের ডাক্তার। টাকার তো সব জ্যান্ত গাছ! মৃতদের অর্গানও মিসিং নয়। সব ঠিকঠাক। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অপারেশনই হয়নি। তাঁদের লাশের গায়ে কোনো সন্দেহজনক কাট বা স্টিচও ছিল না। তবে ওঁর মোটিভ কী?”
“মোটিভ এক্ষেত্রে মেটিরিয়াল নাও হতে পারে।” সে সিগারেটের অবশেষ অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিয়ে বলল, “সাইকোলজিক্যাল মোটিভ আমরা প্রচুর দেখেছি। এক্ষেত্রেও সে সম্ভাবনা আছে। আবার মোটিভ না থাকাও আর একটা মোটিভ হতে পারে। সবচেয়ে বড়ো কথা, আজকাল মানুষ মারার জন্য আদৌ কোনো মোটিভ লাগে?”
“মানে?”
পবিত্র আর অর্ণব পরস্পরের দিকে তাকায়। শেষ কথাটার অর্থ তারা কেউ বোঝেনি। অধিরাজ ফাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতেই বলে, “মানেটা আমি নিজেও বুঝিনি। বুঝলে বুঝিয়ে দেব। তবে এইটুকু বুঝেছি যে সেনোরিটা ঠিক বলছিলেন। অস্বাভাবিক মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় তিরানব্বই। একবছরেই সেঞ্চুরি হয়ে যাচ্ছিল আর একটু হলেই।”
“হত, যদি সুজাতা রায়ের সঙ্গে অ্যাক্সিডেন্টালি তোমার দেখা না হত। আর তোমার পরামর্শে উনি পুলিসে না যেতেন।” পবিত্র একটু চিন্তিত স্বরে বলে, “তবে ডঃ রায়কে কারা যেন ফোনে হুমকি দিচ্ছে! কড়া হুমকি পাচ্ছেন, ‘মেরে ঝুলিয়ে দেব।’ উনি আজ সকালেই কমপ্লেন করেছেন যে ডঃ সঞ্জয় বসুর দলবলই নাকি এসব করছে। ভদ্রলোকের প্রচুর নেতা মন্ত্রী পেশেন্ট আছে। ওঁর হাত অনেক ওপরে। পলিটিক্যালি ইনফ্লুয়েনশিয়ালও বটে।”
“হুঁ। টিভিতেও তো দেখলাম ডক্টর বসুর সমর্থকরাই খোলাখুলি সেনোরিটাকে ফাঁসি দিতে চাইছে।” সে চিন্তিত দৃষ্টিতে অর্ণবের দিকে তাকায়, “ইন দ্যাট কেস আমরা একটু পরেই ওঁর সঙ্গে দেখা করে পুলিস প্রোটেকশনের ব্যবস্থা করে আসব। মিস অরোরা আর মিস বোসকে দরকার পড়লে ফিট করতে হবে। আমার মন বলছে, শি ইজ ইন ডেঞ্জার! আফটার অল ওঁর সন্দেহের ভিত্তিতেই এত বড়ো কাণ্ডটা ধরা পড়েছে। কিন্তু…”
“কিন্তু কী স্যার?”
“জেনিথই তার প্রথম বেস অব অপারেশন নয়। হওয়া সম্ভবই নয়। একবছরে তিরানব্বইটা প্রাণ এইরকম নিখুঁতভাবে নিয়ে নেওয়ার জন্য আরও লম্বা প্রস্তুতি লাগে। আমরা সবে কেঁচো খুঁড়ছি, কিন্তু আই অ্যাম ড্যাম শিওর কেউটেই বেরোবে।” বলতে বলতেই সে পবিত্রর দিকে তাকায়, “জেনিথের কেস তো দেখলাম। কিন্তু তুমি শিওর যে এই ডেথগুলো শুধু জেনিথেই হয়েছে? এর আগে কোথাও হয়নি? সঞ্জয় বসুর প্রিভিয়াস ট্র্যাক রেকর্ডের খোঁজ নিয়েছ?”
পবিত্র আচার্য আমতা আমতা করে, “না। আসলে আমি একটা ব্লান্ডার করে ফেলেছিলাম। বেলঘরিয়ার জেনিথ সুপারস্পেশালিষ্ট হসপিটালের সঙ্গে বাইপাসের জেনিথ মাল্টিস্পেশালিটি হসপিটালকে গুলিয়ে ফেলেছিলাম। তাই বেলঘরিয়ার জেনিথেই ঘুরে মরেছি। ওখানেই টাইম ওয়েস্ট বেশি করে ফেলেছি। কী করে জানব ওই একই নামে নতুন আর একটা হসপিটাল হয়েছে? তাছাড়া আগের রেকর্ড থাকবে তুমি এক্সপেক্ট করছ? নাও তো থাকতে পারে!”
“মানেটা কী?”
এবার হঠাৎই ধৈর্য হারিয়ে অধিরাজ রেগে গেছে, “চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছ একবছরে তিরানব্বইটা কেস। এর মানে বোঝ? খুনী একদম ফুল কনফিডেন্ট! সে ডাইনে বাঁয়ে দেখছেই না! ফুল থ্রটলে আছে। এতটা কনফিডেন্স, এতটা স্পিড, এতটা নির্ভীক বা বেপরোয়া কেউ একদিন বা একবছরে হয় না। একটু একটু করে হয়। তুমি ডঃ বসু যে সমস্ত হসপিটালের সঙ্গে কানেক্টেড ছিলেন বা আছেন, তাদের ফাইলের খোঁজটাও করনি। উলটে ডঃ বসুকে গ্রেফতার করে জেরা করেই সন্তুষ্ট হয়ে গেলে? উনি যদি সত্যিই মার্ডারার হন, তাহলেও চার্জশিটে একটা লুপহোলও ওঁকে বাঁচাতে পারে। হোয়াট দ্য…!”
পবিত্রর মাথা নীচু হয়ে গেছে। আসলে এই ‘ডঃ ডেথ’ ব্যাপারটাই তার কাছে এত গোলমেলে আর ভয়াবহ যে এর থেকেও ভয়াবহ আরও কিছু হতে পারে তা ভেবেই দেখেনি। এবার সম্ভাবনাটার কথা ভেবেই তার রক্ত হিম হয়ে যায়। যদি এটা ডঃ বসুর একবছরের কর্মকাণ্ড না হয়ে থাকে। যদি এই অপরাধের সময়কাল অন্যান্য ‘ডঃ ডেথ’ দের মতোই কয়েক দশক বা কমসে কম বছর দশেক হয় তবে ওঁর শিকারের সংখ্যা ঠিক কততে গিয়ে দাঁড়াবে।
অধিরাজের মুখ শক্ত হয়ে ওঠে, “তুমি এখনই মিস দত্তকে নিয়ে বেরিয়ে যাও। আজ সন্ধের মধ্যেই ডঃ বসুর সমস্ত হিসি আমার চাই। কোন হসপিটালে কোন কোন বছরে তাঁর আস্তার কতজন রোগী মারা গেছেন, সব রেকর্ড আজ সন্ধের মধ্যেই যেন আমার কাছে চলে আসে। আর মিস রায়ের দিকটা আবা দেখছি। অ্যাম আই আন্ডারস্টুড?”
পবিত্র মাথা ঝাঁকায়, “ইয়েস বস’!
সে তড়িঘড়ি সেখান থেকে চলে যেতেই অর্ণবের দিকে তাকায় অধিরাজ, “আমার দৃঢ় বিশ্বাস জেনিথ ছাড়াও অন্যান্য হসপিটালে একই কাণ্ডের কু পাব আমরা। যদিও প্রমাণ করার উপায় প্রায় নেই। কিন্তু দ্যাখো, পবিত্র যদি ঠিকঠাক খোঁজ নেয় তবে এমন আরও কেস ধরা পড়বে।”
“লোকটা এমন কিলোদরে খুন করেছে। কেন?”
“সেই প্রশ্নের উত্তরই তো খুঁজতে হবে অর্ণব।” অধিরাজের মুখে চিন্তার ছাপ, “আমার মাথায় এখনও জন বড়কিন অ্যাডামসের চ্যালেঞ্জটা ঘুরছে। ক্যান ইউ প্রুভ ইট ওয়াজ মার্ডার? …আই ডিডন্ট থিঙ্ক ইউ কুড…! ক্ষ্যামতা থাকলে প্রমাণ করো যে আমি খুনী।” তার আঙুলগুলো অস্থিরভাবে পেপারওয়েটটাকে ঘোরাচ্ছে, “মজার কথা, ডঃ বসুর কেসগুলো অবিকল হ্যারল্ড শিপম্যানের মতো। সেই এজেড পেসেন্টের মৃত্যু! সেই ভগবানজোনড হাবভাব। স্নেহময় স্বভাব। সেই জনপ্রিয়তা! যিনি নিজেই ডেথ সার্টিফিকেট লিখছেন তাঁর তো ধরা পড়ার ভয়ই নেই। ওই লেডি ডক্টর না থাকলে ওঁকে স্পর্শও করা যেত না। সর্বোপরি কী কনফিডেন্ট মোডাস অপারেন্ডি। এই কাজ যেন বহুবার করেছেন। ডঃ বসু বোকা নন। পবিত্রকে কনফেশন দিলেও জানেন যে কোর্টে পালটি খেলে কারওর কিছু করার থাকবে না। বাধা শুধু একজনই। লেডি ডক্টরটি।”
বলতে বলতেই উঠে দাঁড়াল সে, “দেরি করা ঠিক হবে না। মিস বোস আর মিস অরোরাকে ডাকো। এখনই আমাদের মেয়েটির কাছে পৌঁছতে হবে….।”
কথাটা সে শেষও করতে পারেনি। তার আগেই ফোন সশব্দে বেজে উঠেছে। অধিরাজ অবাক হয়ে দেখল যে পবিত্রর নাম ভেসে উঠেছে স্ক্রিনে। এই তো সবে বেরোল সে। এর মধ্যেই ফোন করার কী হল!
অর্ণবের বুকের ভেতরে ধ্বক করে ওঠে। কোনো দুঃসংবাদ নয়তো?
“হ্যালো।”
সে ফোনটা রিসিভ করতেই উলটোদিক থেকে ভেসে এল পবিত্রর উত্তেজিত কণ্ঠস্বর, “রাজা, ব্যাড নিউজ।”
সে রুদ্ধশ্বাসে বলে, “বলো।”
“এইমাত্র জেনিথ থেকে ফোন এসেছে। ডঃ বসুর টিমের একজন ওয়ার্ডবয় মিসিং!”
“হো-য়া-ট।” বিহ্বল স্বরে সে বলল, “কীভাবে মিসিং হল? তুমি ডক্টর বসুকে গ্রেফতার করার সময়ে ওদের সবাইকে বলোনি যে কোথাও যাওয়া চলবে না? পাহারার বন্দোবস্ত করোনি?”
“করেছিলাম। কিন্তু এই ওয়ার্ডবয়টি ওইদিন ছুটিতে ছিল। সে আর পরের দিন থেকে আসেইনি। এখন তার তলব পড়তে জানা গেল, বাড়িতেও সে নেই! ইনফ্যাক্ট কোথাও নেই। টোট্যালি গায়েব।”
“গ—ড!”
ফোনটা কেটে দিয়ে কিছুক্ষণ থ মেরে রইল অধিরাজ। আসল খেলা শুরু হয়ে গিয়েছে। আজ একজন মিসিং হয়েছে। কাল অন্য কেউ হবে। বাদ যাবে না সাক্ষীরাও। কেউ হয়তো বয়ান পালটাবে। আবার কেউ এই ওয়ার্ডবয়টির মতোই হারিয়ে যাবে।
তার মনে হল ডঃ সঞ্জয় বসুও হয়তো গরাদের ভেতরে অন্ধকারে বসে হাসছেন আর ভাবছেন, “পারবে প্রমাণ করতে যে এটা খুন? মনে হয় না তুমি পারবে…!”
একে একে নিভিছে দেউটি!
