৪
“ওয়ার্ডবয়টি যে মিসিং এটা প্রথম কে নোটিস করেছিলেন?” অধিরাজের প্রশ্নের উত্তরে একটা হাত উঠল। সামান্য জড়ানো আর ঘড়ঘড়ে কণ্ঠস্বরে শোনা গেল, “আমি।”
অধিরাজের দৃষ্টি বক্তাকে একঝলক দেখে নেয়। সে প্রথম দর্শনেই তাকে পেশেন্ট ভেবেছিল! ভাবার কারণও আছে। বক্তা একজন বছর পঁয়ত্রিশ কী আটত্রিশের যুবক। প্রিয়দর্শন, অথচ একটু যেন অস্বাভাবিকতা আছে। ছেলেটির মুখ সামান্য বাঁকা। কথা বলতেও বেশ কষ্ট হচ্ছে। টোনের মধ্যে কফের ঘড়ঘড়ানি টের পাওয়া যায়। উপরন্তু তার ডানহাতে একটা ওয়াকিং স্টিক ধরা। কিন্তু সাদা মেডিক্যাল কোট ও গলার স্টেথোস্কোপ সাক্ষ্য দেয় যে সে পেশেন্ট নয়, ডাক্তার।
অর্ণব একটু অবাক হয়েই তার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে পাশ থেকে আর একজন ডাক্তার বলে ওঠেন, “স্যার, উনি পেশেন্ট নন। আমাদের টিমেরই ফিজিশিয়ান। ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী, এম ডি।”
ডঃ কৌশিকের মুখে মৃদু হাসি খেলে যায, “আমাকে পেশেন্ট ভাবলেও ক্ষতি নেই। কিছুদিন আগেও পেশেন্টই ছিলাম। জোরদার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছিল। স্যারের চিকিৎসার জন্যই বেঁচে আছি। তখন একদমই প্যারালাইজড হায়ে গিয়েছিলাম। এখন অনেকটাই বেটার।”
“ডাক্তারদেরও তবে রোগ হয়।”
অর্ণব চাপা গলায় গুজগুজ করে। অধিরাজ তার দিকে না তাকিয়েই নীচু স্বরে বলল, “ডাক্তারদের আরও বেশি হয়। কারণ ওঁরা সবসময়ই ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে ঘর করে চলেছেন। আর এম ডি মানে যত রাজ্যের ছোঁয়াচে রোগ, সে কোভিড হোক কী ইনফ্লুয়েঞ্জা, ফাঙ্গাল ইনফেকশন বা অন্য যত মারাত্মক রোগ, সব ভাইরাসের সঙ্গে MOU চুক্তি করা। ভাইরাসদের অলমোস্ট ‘হুজুর মা-বাপ’ বানিয়ে ফেলেছেন। ওঁরাও অসুস্থ হন। শুধু আমরা জানতে পারি না।”
কথাটা শেষ করেই সে ডঃ চক্রবর্তীর প্রতি মনোনিবেশ করে, “আপনি কখন জানতে পারেন যে ভদ্রলোক নিখোঁজ?”
“আজ সকালে স্যার” কৌশিক একটু থেমে থেমে উত্তর দেন, “যেদিন স্যারকে আপনারা অ্যারেস্ট করেন সেদিন ও ছুটিতে ছিল। তারপরও জয়েন করেনি। গতকাল রাতে ওকে ফোনে ধরেছিলাম। বলল, যে আজকে জয়েন করবে। কিন্তু আজও অ্যাবসেন্ট দেখে আমি নিজেই ওর বাড়ি গিয়েছিলাম। বাট সেখানে কেউ নেই। আর ওর ফোনও বন্ধ!” কৌশিক একটু দম নিয়ে বললেন, “এরকম কখনও হয় না। সুশান্ত আজ পর্যন্ত না জানিয়ে কখনও অ্যাবসেন্ট হয়নি। তাই ভাবলাম যে অ্যাজ আর্লি অ্যাজ পসিবল আপনাদের জানিয়ে দিই।”
“পুলিসের কাছে ফোন-টা তবে আপনিই করেছিলেন?”
“ইয়েস স্যার।” তিনি চিন্তিতস্বরে বলেন, “এখনও আমি ফুলি রিকভার করিনি। তাই সুশান্ত সবসময়ই আমাকে অ্যাসিস্ট করে। বিশেষ করে ওপিডির কাজকর্মে। আমার কথামতো প্রেসক্রিপশন লিখে দেওয়া বা টাইপ করে দেওয়া, ওষুধ কখন, কী ডোসেজে খেতে হবে আলাদা করে পেশেন্টকে বুঝিয়ে দেওয়া, প্রয়োজনীয় ইঞ্জেকশন পুশ করে দেওয়া—এসব কাজই ও করে। গত একবছর ধরেই আমার ছায়া হয়ে আছে।
“বুঝলাম!”
অধিরাজের চোখ বাকিদের দিকে ফিরল, “ডঃ চক্ৰবৰ্তী ছাড়া আপনাদের কারওর চোখে পড়েনি যে সুশান্ত ডিউটিতে আসছে না?”
এবার অন্য একজন বয়স্ক ডাক্তার মুখ খুললেন, “অ্যাকচুয়ালি স্যারের গ্রেফতারির পর আমরা সকলেই খুব আপসেট হয়ে ছিলাম। সত্যি বলতে কী সুশান্ত যে আসছে না তা সবার আগে আমিই নোটিস করেছিলাম। কিন্তু সিরিয়াসলি নিইনি।”
“এই ঘটনাটা সবার আগে আপনিই জেনেছিলেন। অথচ পুলিসকে একবারও এই ইনফর্মেশনটা জানানোর প্রয়োজন বোধ করেননি।” এবার অধিরাজের কণ্ঠে পুলিসি টোন, “মে আই নো ইওর…”
“ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার।” অধিরাজ কথাটা শেষ করার আগেই তিনি বলে উঠলেন, “ডঃ বসুর অ্যানাস্থেসিস্ট। তিরিশ বছর ধরে ওঁর সঙ্গে প্রতিটা সার্জারিতে কাজ করছি।”
“তার মানে আজ পর্যন্ত যত হসপিটাল বা নার্সিংহোমের সঙ্গে ডঃ সঞ্জয় বসু যুক্ত ছিলেন বা আছেন, সেই সবগুলোতেই আপনিও উপস্থিত ছিলেন।”
“অফকোর্স।” তাঁর সুদৃঢ় জবাব, “বললাম তো, সঞ্জয় বসু আজ পর্যন্ত আমাকে ছাড়া একটা সার্জারিও করেননি।”
তাঁর সুদর্শন ফর্সা মুখ শান্ত হলেও গম্ভীর কন্ঠে একটা প্রচ্ছন্ন দম্ভের ইঙ্গিত।
অধিরাজ তাঁর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। আপাতদৃষ্টিতে ইন্দ্রজিৎ সরকার অত্যন্ত শান্ত ও সৌম্য চেহারার মানুষ হলেও ওঁর ব্যক্তিত্বের মধ্যে কোথাও যেন একটা গোলমাল আছে। ভদ্রলোকের কথা বলার ভঙ্গিতে একটা অনাবশ্যক জোর আছে। ভাবটা এমন, যা করেছি বেশ করেছি। সে আবার খোঁচা মারল, “এত বছরের লয়াল সঙ্গী আপনি ডক্টর সঞ্জয় বসুর। তাঁর গ্রেফতারির পর একটা মানুষ উধাও হয়ে গেল, আপনি তা জানতেও পারলেন। কিন্তু সেটা ইমিডিয়েটলি না জানিয়ে
স্রেফ চেপে গেলেন ডঃ সরকার। আপনার মতো একজন দায়িত্বপূর্ণ মানুষকে কী এটা মানায়?”
“নিশ্চয়ই মানায়।” ভাবলেশহীন মুখে বললেন ইন্দ্রজিৎ, “কারণ আমি লয়াল।” কথাটা বলেই অগ্নিদৃষ্টিতে একবার চোখের কোণে মেপে নিলেন ডঃ কৌশিককে, “বেইমান নই।”
“সুশান্ত কী কারণে উধাও হতে পারে বলে মনে হয় আপনার? তার কোনোরকম বিপদ আপদও তো হতে পারে।”
“কিস্যু হয়নি।” তিনি মাছি তাড়ানোর মতো হাত নাড়িয়ে সম্ভাবনাটাকে খারিজ করলেন, “কাল রাত বারোটা নাগাদ তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল আমার। কৌশিকের ফোন পাওয়ার পর সে এসেছিল আমার সঙ্গে মিট করতে।”
“স্ট্রেঞ্জ। কেন?”
“তার কিছু টাকার দরকার ছিল। আমার কাছে ধার চাইছিল।”
“আপনি দিয়েছেন?”
“শিওর।” ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার সপাটে জানালেন, “হি ওয়াজ আ ভেরি ডিউটিফুল অ্যান্ড লয়াল পার্সন। ওর মতো দক্ষ কর্মী খুব কমই আছে। দেব না কেন?”
“তাই সি।”
অধিরাজের বিস্ময় তার কথাতেই উপচে পড়ে, “তার মানে আপনিই শেষ ব্যক্তি যিনি সুশান্তকে দেখেছিলেন।”
“ইয়েস, মে বি আই অ্যাম দ্য লাস্ট পার্সন।” তিনি একটু দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে বললেন, “যদি না সে কাল রাতে মদের ঠেকে গিয়ে থাকে।”
“এ-কথাটাও আপনি পুলিসকে জানাননি।”
“তখন জানাইনি।” নিস্পৃহভাবে বললেন ভদ্রলোক, “তখন কিছু মনে হয়নি। কিন্তু এখন জানাচ্ছি।”
“জানাচ্ছেন, কিন্তু ডঃ কৌশিক চক্রবর্তীর ফোনটা না গেলে জানাতেন না। রাইট?”
“অ্যাবসোলিউটলি রাইট। আমি হসপিটালের প্রাইভেসি বজায় রাখতেই বেশি পছন্দ করি।”
“ওর অন্তর্ধানের পেছনে কী কারণ থাকতে পারে বলে আপনার মনে হয়?”
“একটাই কারণ—হি ইজ লয়াল।”
মিনিটখানেক অধিরাজ তাকিয়ে থাকল এই অভি অ্যানাস্থেসিস্টের দিকে। তিনিও একদম সরাসরি ওর দিকেই তাকিয়েছিলেন। দু-জনের চোখেই যেন একটা প্রচ্ছন্ন চ্যালেঞ্জ! অর্ণব বুঝল, এই ‘লোহার কড়াই’ মার্কা হার্ড নাট সহজে ‘ক্র্যাক’ হওয়ার নয়। ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার আর মুখ খুলবেনই না। তাঁর কথাবার্তাও রহস্যময়। কী বলছেন বা বলতে চাইছেন বোঝা দায়। একটা আস্ত লোক রাতারাতি হাপিশ হয়ে গেল, তার কারণ সে লয়াল। লয়াল টু হুম?
অধিরাজ হাল ছেড়ে দিয়ে এবার বাকিদের দিকে তাকায়। ডঃ বসুর
টিমে মোট সাতজন কাজ করে। ডঃ চক্রবর্তী আর ডঃ সরকার তো আছেনই। ওয়ার্ডবয় সুশান্তও ছিল। কিন্তু আপাতত তার দেখা নেই। এই তিনজনের কাছ থেকে বিশেষ কিছু সাহায্য পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। পবিত্রর রিপোর্ট অনুযায়ী কৌশিক অত্যন্ত মেধাবী ডাক্তার এবং ডঃ বসু চোখ বুজে ওঁর মেডিকেশনের ওপর বিশ্বাস করতেন। কিন্তু তিনি নিজেই এখনও খুব একটা সুস্থ নন। নিজের কাজের বাইরে অর্ধেক খবরই রাখেন না। সুশান্ত সিনেই নেই। আর ডঃ সরকার যে পরিমাণ লয়াল তাতে মরে গেলেও ভেতরের খবর দেবেন না। বাকি চারজনের মধ্যে একজন মধ্যবয়স্কা নারী আছেন। পবিত্র ফাইলেই ভদ্রমহিলার নাম ও বিবরণ লিখে রেখেছে, তাই চিনতে খুব অসুবিধে হল না। তিনিই সম্ভবত সুহাসিনী মিত্র। নামকরা ডায়েটিশিয়ান। সুহাসিনী গত পাঁচ বছর ধরে ডঃ সঞ্জয় বসুর সঙ্গে কাজ করছেন। ওঁর পেশেন্টদের ডায়েট চার্টের দায়িত্ব তাঁর ওপরেই। আন্দাজ চল্লিশ বছর বয়েস। তবে এই বয়সেও রীতিমতো সুন্দরী। মুখের মধ্যে একটা সস্নেহ ভাব তাঁকে আরও লাবণ্যময়ী করে তুলেছে। পবিত্রর রিপোর্ট অনুসারে তিনি নামেও ‘মিত্র’ কাজেও ‘মিত্র।’ পুলিসের সঙ্গে যথেষ্ট কো-অপারেট করেছেন। বাকি তিনজনের মধ্যে একজন প্রৌঢ়া সিস্টার মলয়া চৌধুরী। ইনিও প্রায় দু-দশক ধরেই এই টিমে আছেন। ও.টিতে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পাশের রোগা চেহারার নার্সটি ওঁর হেল্পিং হ্যান্ড। নাম শীলা বসাক। আর সবার পেছনে যে কৃশকায় যুবকটি মুখ নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে সে ডঃ সরকারের অ্যাসিস্ট্যান্ট। অর্থাৎ অ্যানাস্থেসিওলজিস্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট। নাম রঞ্জন নায়েক।
অধিরাজের দৃষ্টি সবার ওপর ঘুরতে ঘুরতেই আচমকা রঞ্জনের ওপর স্থির হয়ে গেল। এই চিলড এসির মধ্যেও এত ঘামছে কেন ছেলেটা। যেখানে বাকিরা সবাই ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে, সেখানে এই যুবক এমনভাবে নিজের জুতোজোড়া পর্যবেক্ষণ করতে ব্যস্ত যেন এই মুহূর্তে ওই জুতো ছাড়া আর কোথাও কিছুই নেই। নিজেকে এমনভাবে দুই সিস্টারের পেছনে লুকিয়ে রেখেছে যাতে তার ওপর কারওর নজরই না পড়ে! আশ্চর্য তো!
সে সটান গিয়ে দাঁড়ায় রঞ্জনের সামনে। অর্ণবের মনে হল যেন গ্যালিভার লিলিপুটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কাকতালীয়ভাবে অধিরাজ আর রঞ্জন, দু-জনেই কালো রঙের শার্ট আর ট্রাউজার পরে আছে। কিন্তু তাও রঞ্জনকে অধিরাজের এক্স-রে ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না।
“আপনি এত ঘামছেন কেন সেনর?”
সদয় ভঙ্গিতে বলল অধিরাজ, “আর ইউ ফিলিং আনওয়েল?”
“না… মানে… আমি…!”
রঞ্জন কী বলবে ভেবে পায় না। সে বুঝি এখনই পাতালপ্রবেশ করতে পারলে বাঁচে। অর্ণবের মনে হল, অধিরাজ তাকে আর একটা প্রশ্ন করলেই হয় সে অজ্ঞান হয়ে যাবে, নয় পালিয়ে যাবে।
“অফিসার…!”
বিপদ দেখে এবার এগিয়ে এলেন সুহাসিনী মিত্র। একটা সুন্দর হাসি দিয়ে বললেন, “এদিকে একটু আসবেন স্যার? কথা আছে।”
যাক, শেষ পর্যন্ত ডঃ মিত্রই মিত্রপক্ষে এলেন! অধিরাজ কথা না বাড়িয়ে গটগট করে তাঁর দিকেই এগিয়ে যায়। সুহাসিনী আবার সেই মোহিনী হাসিটি দিয়ে বললেন, “আপনারা আমার চেম্বারে আসুন।”
অর্ণব আর অধিরাজ, দু-জনেই এবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। তবু তো একজন কথা বলার লোক পাওয়া গেল! ওরা দু-জনেই নির্বিবাদে সুহাসিনীর পেছন পেছন গেল।
সুহাসিনীর চেম্বার খুব বড়ো নয়। তবে ভারী সুন্দর করে সাজানো এবং পরিপাটি। তিনি ইশারায় দুই অফিসারকে বসতে বলে, নিজেও চেয়ারে বসলেন, “রঞ্জনকে জেরা করবেন না স্যার। ও একেই সোশ্যাল অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডারের পেশেন্ট। অপরিচিত কেউ ওর সঙ্গে ইন্টার অ্যাকশন করাতে গেলেই ওর ভয় হয় যে সেই ব্যক্তি ওকে স্ক্রুটিনি করে নেগেটিভ জাজমেন্ট করবে। হি ইজ অলওয়েজ অ্যাফ্রেইড অফ বিইং হিউমিলিয়েটেড। তার ওপর আপনার মতো মারাত্মক হ্যান্ডসাম মানুষের মুখোমুখি দাঁড়ালে তো ও নিজেই নিজেকে ছোটো আর তুচ্ছ ভাববে। একেই সবসময় মুখ শুকিয়ে চোরের মতো ঘুরছে। তার ওপর এরকম গর্জিয়াস আর ম্যাগনিফিসেন্ট পার্সোনালিটি ওর পক্ষে হ্যান্ডল করা অসম্ভব।”
অর্ণব আর থাকতে না পেরে প্রশ্ন করেই বসল, “প্লিজ, ডোন্ট মাইন্ড ম্যাম, কিন্তু ডঃ বসুর টিমের সবাই কী পেশেন্ট? ডঃ কৌশিক ফিজিক্যালি আনফিট, ডঃ ইন্দ্রজিৎকেও আমার মেন্টাল পেশেন্ট বলেই মনে হচ্ছিল। এখন শুনছি রঞ্জনবাবুও সোশ্যাল অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডারের পেশেন্ট।”
অধিরাজের মনের কথাটা অর্ণব অকপটে বলে দিয়েছে দেখে সে মৃদু গলায় বলল, “ওয়েল সেইড ডার্লিং!”
এবার ঝরঝর করে হেসে ফেললেন সুহাসিনী। হাসতে হাসতেই বললেন, “আমিও তো ওঁদের সঙ্গেই কাজ করি। আমাকে কী পেশেন্ট বলে মনে হচ্ছে আপনার?”
গুগলি খেয়ে অর্ণব চুপ করে যায়। সুন্দরী হলে কী হবে, অতি জাঁহাবাজ মহিলা। অধিরাজ তার বিরক্তি দেখে নিজেই এবার বলল, “ইন দ্যাট কেস আপনিই বলুন, এদের সবার হিস্ট্রি কী? ডঃ বসুর সঙ্গে সঙ্গে কী এরাই সর্বক্ষণ থাকেন?” তিনি শান্তস্বরেই বললেন, “হ্যাঁ। ডঃ বসু যে হসপিটালেই কাজ করুন না কেন, প্রথম শর্তই থাকে যে ওঁর পার্সোনাল টিমকেও সেখানে নিতে হবে। উনি যেখানে যেখানে যান, গোটা টিমটাই ওঁর পেছন পেছন যায়। প্রত্যেকটা পেশেন্টকে মেইনলি আমরাই হ্যান্ডল করি। তাদের সার্জারিতে গোটা টিমটাই উপস্থিত থাকে। সেখানে বাইরের কাউকে স্যার অ্যালাউই করেন না। রাদার বলা ভালো, বিশ্বাসই করেন না। সার্জারির পরে অবশ্য হসপিটালের সিস্টার বা ওয়ার্ডবয়রা তাদের কেয়ার করে। বুঝতেই পারছেন, এতগুলো পেশেন্টকে একসঙ্গে সার্ভিস দেওয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব। তবু যা হয় আমাদের নির্দেশেই হয়। পেশেন্টের যদি অন্য কোনো সমস্যা থাকে লাইক বিপি, ব্লাড সুগার বা থাইরয়েড, তবে সেটা কৌশিকের আন্ডারে পড়ে। পেইনকিলার বা অ্যানাস্থেশিয়ার দিকটা ডঃ সরকার আর রঞ্জন বুঝে নেয়। সুশান্ত বাকিদের মেডিসিন বুঝিয়ে দেয়। অনেক সময় নিজেও গিয়ে পেশেন্টকে ইঞ্জেকশন বা মেডিসিন দিয়ে আসে। মলয়াদির অর্ডার মতোই এখানকার সিস্টাররা কাজ করে। শীলা একবার করে রেগুলার আপডেট নেয়। আর পেশেন্টদের ডায়েট আমিই দেখি।”
অধিরাজের অন্যমনস্ক দৃষ্টি সুহাসিনী মিত্রর ঘরটা সরেজমিনে পরীক্ষা করছিল।
ঘরের সাদা দেওয়াল একদম দাগবিহীন ও তার গায়ে নানারকম ডায়েট চার্ট ও প্রোটিন সাপ্লিমেন্টের অ্যাড রয়েছে। 1 জানলার কাচে ধুলোর ছিটেফোঁটা নেই। চেম্বারটা দেখলেই বোঝা যায় যে এটা সাধারণ কোনো ফিজিশিয়ানের ঘর নয়, বরং একজন নিবেদিতপ্রাণ ডায়েটিশিয়ানের সযত্নে গড়ে তোলা এক শাস্তি ও যত্নের ঠিকানা। ওঁর টেবিল চেয়ারের উলটোদিকে একটি আরামদায়ক গোলাপি রঙের সোফা। সোফার সামনের ছোট্ট কাচের টেবিলের ওপর বেশ কিছু স্বাস্থ্যবিষয়ক ম্যাগাজিন সুন্দরভাবে গুছিয়ে রাখা। বেশ কিছু বইও রয়েছে। সে আড়চোখে বইয়ের নামগুলো দেখে নেয়। সোফার ঠিক পেছনের দেওয়ালে টাঙানো বি.এম.আই চার্ট। তার নীচে ডিজিটাল ওয়েট মেজারিং মেশিন ও স্ট্যাডিওমিটারও উপস্থিত। বডি কম্পোজিশন অ্যানালাইজারের অত্যাধুনিক প্রযুক্তিও আছে।
ঘরের এক কোণে রাখা রয়েছে ছোটো একটা ইনডোর প্ল্যান্ট। হালকা লেবু আর পুদিনার গন্ধে ঘরটা স্নিগ্ধ। এক পাশে রাখা একটি হ্যান্ড স্যানিটাইজার ডিসপেনসার আর মিনারেল ওয়াটারের বোতল। সবকিছুই খুব যত্নে সাজানো। একটুও এদিক থেকে ওদিক নেই।
সুহাসিনীর ডেস্কটি জানালার পাশেই। টেবিলের ওপর রাখা একটি ল্যাপটপ, ডায়েরি, প্রচুর ফাইল। আর এক কোণে একটি কাঠের র্যাক, যেখানে নম্বর অনুযায়ী পরপর সাজানো রোগীদের জন্য প্রস্তুত প্রিন্টেড ডায়েট চার্ট। তার সঙ্গে হিপোক্রেটিসের একটি আবক্ষ ধাতব মূর্তি যার নীচে খোদাই করা আছে, “লেট ফুড বি দাই মেডিসিন।”
অধিরাজ সতর্ক দৃষ্টিতে চতুর্দিকটা মেপে নিচ্ছিল। সুহাসিনী অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ ডায়েটিশিয়ান সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এটাও ঘটনা, যে ওঁর এই নিখুঁত ও আধুনিক প্রযুক্তিওয়ালা ডেকোরেশনই বলে দেয় উনি একজন পোটেনশিয়াল খুনী হতে পারেন। কারণ যেভাবে মহিলা পেশেন্টদের রেকর্ড সাজিয়ে রেখেছেন, তাতে সামান্য এদিক ওদিক, বেশি মাত্রায় সোডিয়াম বা অন্যান্য বিপজ্জনক খাবার সাজেস্ট করা তার পক্ষে অসম্ভব নয়।
সে একটু গভীর স্বরেই বলে, “হসপিটালের প্যান্ট্রিতে কী আপনাকে রেগুলার যাতায়াত করতে হয়? আই মিন, রোগীদের পথ্য কী আপনি পার্সোনালি দেখেন?”
“না না।” ডঃ মিত্র ফের জলতরঙ্গের মতো হেসে অঠন, “তার জন্য ই-মেইল বা হোয়াটসঅ্যাপ তো আছেই। এছাড়া ওয়েবক্যামেও আমি নির্দেশ দিয়ে থাকি।”
“ওকে।” সে একটু থেমে বলে, “লাস্ট যে তিরানব্বইটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর ক্ষেত্রেও আপনিই দায়িত্বে ছিলেন। বিশেষ করে যে কুড়িটি কেস প্রায় সেম টু সেম প্যাটার্নের বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, আর যাঁদের বডি এক্সহিউম করা হয়েছে তাঁদেরও ডায়েট আপনার কন্ট্রোলেই ছিল। রাইট?”
“ইয়েস!”
“আমি কী লেটেস্ট কেসগুলোর ফাইলগুলো পেতে পারি? ডায়েট চার্ট সমেত?”
সুহাসিনী নিজের নামের সার্থকতা প্রমাণ করে ফের মধুর হাসেন, “শিশুর অফিসার। আপনাদের লাগতে পারে ভেবে আমি আগে থেকেই সব বন্দোবস্ত করে রেখেছি।”
অধিরাজের চোখ সরু হয়ে যায়। এই ভদ্রমহিলা তাকে রীতিমতো কনফিউজ করছেন! পবিত্র আচার্য ওঁর সহযোগিতার প্রশংসা করলেও তার পাপী মন অন্য কিছু বলছে। সুহাসিনী সব কিছুই আগে থেকে আন্দাজ করার ও সমস্তটা গুছিয়ে রাখার ক্ষমতা রাখেন। সমস্ত কাজই এত ওয়েল-প্ল্যানড যে সেটা ভালো হলে চূড়ান্ত ভালো, কিন্তু খারাপের দিকে গেলে চূড়ান্ত খারাপও হতে পারে!
মাত্র পাঁচমিনিটের মধ্যেই একগাদা ফাইল এসে গেল। অধিরাজ লেটেস্ট কয়েকটা কেসের ডায়েট চার্টের ওপর চোখ বোলাতে বোলাতে বলে, “বাই দ্য ওয়ে, আপনাদের টিমের সবাইকেই তো আপনি খুব ভালোভাবে চেনেন। কিছু বলতে পারেন ওঁদের বিষয়ে?”
ডঃ মিত্রর মুখের হাসিটা একমুহূর্তের জন্য ফ্যাকাশে হয়ে যায়। পরক্ষণেই একটু ইতস্তত করে বললেন, “আমার বোধহয় এ বিষয়ে কোনোরকম মন্তব্য না করাই উচিত।”
তার দৃষ্টি তরোয়ালের মতো প্রখর, “কেন?
“ মে বি আই অ্যাম বায়াসড… অর রং” তিনি আমতা আমতা করে জানান, “কিন্তু ডঃ কৌশিক আর ডঃ ইন্দ্রজিৎকে আমার কোনোমতেই ভালো মানুষ মনে হয় না। হ্যাঁ, অ্যাজ আ ডক্টর দে আর ব্রিলিয়ান্ট। কিন্তু মানুষ হিসেবে একেবারেই নন। ডঃ বসুর মতো দেবতুল্য মানুষ যে কী করে ওদের সঙ্গে কাজ করেন কে জানে!”
অধিরাজ হাতের ফাইলটা সরিয়ে রেখে ধীরে সুস্থে বলল, “প্লিজ এক্সপ্লেইন।”
“ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকারকে তো দেখেছেনই।” তিনি চিন্তিত স্বরে জবাব দেন, “উনি যেমন অহঙ্কারী, তেমন অসভ্য, ইনফ্যাক্ট ডঃ বসুর সঙ্গেও মাঝেমধ্যে এমন অপমানজনক ব্যবহার করেন যে মনে হয় স্যারই বুঝি ওঁর চাকর। অ্যান্ড হি ইজ ড্যাম কোরাপ্টেড। এখানে যতরকম অ্যানাস্থেটিক ড্রাগস আছে তা উনি রীতিমতো বাইরে চালান দেন। অনেক লোকের এসবের নেশা আছে। আর এ-কাজে সুশান্ত ওঁর সঙ্গী। তাই উনি সুশান্তকে শেল্টার দেবেন, কভারও করবেন। রঞ্জন সব জানে। কিন্তু ভয়ে মুখ খোলে না।”
অধিরাজের ডঃ চ্যাটার্জির সাবধানবাণী মনে পড়ে যায়। এখানে অ্যানাস্থেসিস্টের যা চরিত্র দেখা যাচ্ছে তা আর বলার নয়। সে কৌতূহলী হয়ে জানতে চায়, “কিন্তু ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী? ওঁকে তো রীতিমতো ভালোমানুষই মনে হল? ডঃ বসুর প্রতি যথেষ্ট কৃতজ্ঞ। তার ওপর উনি সুস্থও নন…”
“উনি অসুস্থও নন অফিসার।” তিনি ওর কথাটা শুধরে দিলেন, “অসুস্থ ছিলেন। কিন্তু এখন যেই একটু সুস্থ হয়েছেন অমনি মিটমিটে ডানগিরি শুরু হয়ে গেছে। দেখেননি, ডঃ সরকার প্রকাশ্যেই ইনডাইরেক্টলি বেইমান বললেন!”
“অ্যাকচুয়ালি এই প্রশ্নটা আমিও করতে যাচ্ছিলাম” সে জানতে চায, “ডঃ সরকার সুশান্তকে লয়াল বললেন। অথচ ডঃ কৌশিককে বেইমান বললেন কেন?”
“যথেষ্ট কারণ আছে।”
সুহাসিনী পুরো ব্যাপারটাই খুলে বলেন। ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী নিঃসন্দেহে একজন প্রতিভাবান মেডিসিনের ডাক্তার। কিন্তু ডঃ সঞ্জয় বসুর নিজের ছেলে ডঃ রণজয় বসুও কিছু কম যান না। তিনি রীতিমতো বিদেশের ডিগ্রি পাওয়া ডাক্তার। স্বাভাবিকভাবেই বাবাকে অ্যাসিস্ট করার সুযোগ ও তাঁর টিমে থাকার সম্পূর্ণ অধিকার ওঁর ছিল। কিন্তু ডঃ সঞ্জয় বসু কিছুতেই নিজেরই পুত্রসন্তানকে কোনোরকম সুযোগ দিতে নারাজ। তিনি সমস্ত কেসে কৌশিককেই রেফার করেন। একবারের জন্যও নিজের ছেলের পসার বা খ্যাতি বাড়ানোর চেষ্টা করেন না। তা নিয়ে ডঃ বসুর পরিবার ও খোদ রণজয় এতটাই অসন্তুষ্ট যে কয়েক বছর ওঁদের মধ্যে কোনোরকম বার্তালাপও নেই। রণজয় রাগে, ক্ষোভে বাবার থেকে আলাদাই থাকেন। ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী সঞ্জয়কে বোঝানো তো দূর, ছেলের বিরুদ্ধে আরও উস্কে থাকেন। এমনকি তাঁর যোগ্যতা ও মেডিকেশন নিয়েও প্রশ্ন তুলতে ছাড়েন না।
এই অবধি যদি বা ব্যাপারটা পেশাগত রেসারেসির মধ্যেই আবদ্ধ ছিল, কিন্তু মড়ার ওপর খাড়ার ঘায়ের মতো ডঃ চক্রবর্তী বাইরে থেকে যতটাই মিষ্টভাষী, ভেতরে ভেতরে ততটাই গোলমেলে। তিনবছর আগে যখন ওঁর মারাত্মক কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়, তখন সঞ্জয়ই ওঁকে বুক দিয়ে আগলেছিলেন। এতটাই যত্নবান ছিলেন যে তিনি অন্য কাউকে ওঁর ধারে কাছে ঘেঁষতেও দেননি। এমনকী টিমের সদস্যদেরও দূরে রেখেছিলেন। আজ কৌশিক অনেকটাই সুস্থ। মুখে যথেষ্ট কৃতজ্ঞতাও জ্ঞাপন করেন। অথচ তলে তলে উনি ডঃ বসুর সবচেয়ে বড়ো প্রতিদ্বন্দ্বী ডঃ কৃশানু রায়ের টিমে জয়েন করার প্ল্যান করছেন। সঞ্জয়ের সমস্ত চিকিৎসাপদ্ধতি, তাঁর কেসফাইলও তিনি গোপনে কৃশানুকে দিয়ে থাকেন। ডঃ বসুর বহু পুরোনো পেশেন্টদেরও ডঃ রায়ের কাছে রেফার করেন, কারণ ওঁর মতে সঞ্জয়ের বয়েস হয়েছে এবং তিনি প্রাচীনপন্থী। আধুনিক মেডিক্যাল সায়েন্সের অগ্রগতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না। এসব অবশ্য রীতিমতো কাঞ্চনমূল্যে করে থাকেন। আশা করা যায় এ-বছরই তিনি ডঃ বসুর টিম ছেড়ে আরও অনেক বেশি টাকায় ডঃ কৃশানু রায়ের টিমে জয়েন করবেন!
“বুঝলাম।” অধিরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে, “উপকারীকে চিরদিনই বাঘে খায়। তবে আরও একটা সম্ভাবনা থাকতে পারে।”
“কী?”
সুহাসিনী পরম আগ্রহের সঙ্গে জানতে চান।
“ডঃ কৌশিক জানেন যে ডঃ সঞ্জয় বসু আদতে একজন খুনী। কৃতজ্ঞতাবশত কাউকে বলতেও পারছেন না। তাই নিজেই সরে যাচ্ছেন এবং পেশেন্টদেরও সরাচ্ছেন।”
সুহাসিনী স্তম্ভিত। এই সম্ভাবনার কথা ওঁর মাথাতেই আসেনি। তিনি স্খলিত স্বরে বললেন, “কিন্তু… কিন্তু… এ অসম্ভব…!”
“এ দুনিয়ায় কোনো কিছুই অসম্ভব নয় মাই লেডি!” অধিরাজ মৃদু হেসে ফের তাঁর ডায়েট চার্টে মন দিয়েছে। সুহাসিনী বজ্রাহতের মতো বসে আছেন। তিনি কোনো কথা বলতেই পারছেন না। গোটা ঘরময় এখন শুধু নিস্তব্ধতা! শুধু এসির সামান্য আওয়াজ ছাড়া পিনপতনের নীরবতা ছেয়ে আছে গোটা ঘরে। অর্ণবও চুপচাপ এদিক ওদিক তাকানো ছাড়া আর কোনো কাজ খুঁজে পায়নি। আপাতত সে টিউবের সৌন্দর্য দেখতেই ব্যস্ত।
ডায়েট চার্ট দেখতে দেখতেই অধিরাজের কপালে ভাঁজ পড়েছে, “ডঃ… ইয়ে…।”
এই আবার ‘ইয়ে’-তে এসে ঠেকেছে। অর্ণব চাপা স্বরে বলে, “ডঃ মিত্র।”
“ইয়েস… ইয়েস… ডঃ মিত্র।” অধিরাজ সামলে নিয়েছে, “আপনি লাস্ট পেশেন্টটিকে ডায়েট চার্টে স্যাচুরেটেড ফ্যাট, সোডিয়াম আর অ্যাডেড সুগার কেন দিয়েছেন? ইনফ্যাক্ট অপারেশনের পরদিন ওঁকে রাতে তিনশো এম এল কোকাকোলা অবধি প্রোভাইড করা হয়েছিল। আপনি কী এ বিষয়ে কনসার্নড? শুধু তাই নয়, আমি তো দেখছি, আপনি হোল গ্রেইন ফুডের বদলে রিফাইন্ড গ্রেইনের কার্বসও দিয়েছেন। এই উদ্ভট ডায়েটের ফলে তো ওঁর কার্ডিও ভাস্কুলার সিস্টেমের সর্বনাশ হতে পারত। ইভেন ডিসলিপিডেমিয়ার শিকারও হতে পারতেন। আর এটা প্রথমবার নয়, বেশ কয়েকটা কেসেই দেখছি! এটা আপনার নজর কী করে এড়িয়ে গেল?”
“আমি জানি সোডা ঠিক কতটা মারাত্মক। রিফাইন্ড গ্রেইন কার্বসও।” তাঁর ঠোঁটে বিরক্তির রেখা, “কিন্তু অফিসার, আপনি এই খিটখিটে বুড়ো পেশেন্টদের চেনেন না। লাস্টের পেশেন্টটি তো রীতিমতো নন-কোঅপারেশন আর হাঙ্গার স্ট্রাইকে পর্যন্ত নেমে পড়েছিলেন। তিনি নুন, মিষ্টি ছাড়া বিস্বাদ খাবার মুখেই তুলবেন না! এমনকী এমনও হুমকি দিয়েছিলেন যে রাতে কোকাকোলা না দিলে উনি কিচ্ছু খাবেন না। আমি ডায়েট কোকের কথা বলায় মা-বাপ তুলে যা তা গালাগালি ও দিয়েছিলেন।”
“ওঃ!” অধিরাজ সহানুভূতিমাখা স্বরে বলে, “আপনি ওঁকে বোঝাননি যে এগুলো ক্ষতিকর?”
“উনি বুঝলে তবে তো বোঝাব।” তিনি অপমানিত, ক্ষুব্ধ ভঙ্গিতে বললেন, “ডায়েটিশিয়ানদের কেউ সম্মান দেয় না অফিসার। আমাদের মানুষ বলেই গণ্য করে না। তার কারণ প্রথমত আমরা ডিগ্রিধারী ডাক্তার নই। দ্বিতীয়ত, ওঁদের ভালোমন্দ খেতে বাধা দিই। তাই যে যা খুশি বলে যায়। আমিও একরকম বিরক্ত হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছি।”
অধিরাজ সমবেদনায় মাথা ঝাঁকাল, “এটাই প্রবলেম ম্যাডাম। আমরা বিরাট কোহলিকে ব্যাটিং শেখাই, সঞ্জীব কপুরকে রান্না আর অমিতাভ বচ্চনকে অভিনয়। যে যেটা ভালো বোঝে তাকে সেটাই করতে দিই না। আমি আপাতত ফাইলগুলো নিয়ে যাচ্ছি। থ্যাংকস ফর ইওর কো-অপারেশন।”
সে বিনম্র একটা ‘বাও’ করে আর একটি কথাও না বাড়িয়ে ঘর থেকে দ্রুতছন্দে বেরিয়ে আসে। তার পেছন পেছন এক ওয়ার্ডবয় গুচ্ছ ফাইল নিয়ে গাড়িতে তুলে দিল। অধিরাজ ওয়ার্ডবয়টির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসছে, “থ্যাঙ্কস সেনর!”
তথাকথিত ‘সেনর’ কতদূর কী বুঝলেন তা অর্ণব __ বোঝেনি। ওয়ার্ডবয়টি একটি অপ্রস্তুত হাসি দিয়ে চুপচাপ চলে গেল। এমন সন্ত্রস্ত ভঙ্গি যেন ওকে কেউ গানপয়েন্টে রেখেছে।
ওরা গাড়িতে বসতে না বসতেই কৌশানী বোস একটু উত্তেজিত স্বরেই ব্রেকিং নিউজ পেশ করল—
“স্যার, একটু আগেই আচার্য স্যার ফোন করেছিলেন। সঞ্জয় বসু একঘণ্টা আগেই ছাড়া পেয়ে গেছেন। কোর্ট এক ‘বেইল’ দিয়ে দিয়েছে। আপাতত উনি যুক্ত। সেই নিয়ে বিভিন্ন ফের পুলিসকে ডিফেম করছে।”
অধিরাজের দৃষ্টি কোনো এক অজানা গভীরতার অতলে ডুবছে। হাত তুলে কৌশানীকে থামিয়ে দেয়। তারপর আত্মমগ্নভাবে সে একটা সিগারেট ধরিয়ে চুপচাপ কিছুক্ষণ ধোঁয়া ছাড়ল। আস্তে আস্তে বলল, “এটা আশ্চর্যের ব্যাপার নয় মিস বোস। ওঁর স্বীকারোক্তি যথেষ্ট নয়। প্রমাণ কোথার? ইভেন জোরদার সার্কামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্সও নেই। কেউ ওঁকে খুন করতে দেখেনি। একমাত্র ওই সেনোরিটার সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে কোর্ট তো ওঁকে ফাঁসিকাঠে ঝোলাবে না! আর স্বীকারোক্তি পালটাতে টাইম লাগে না। আমি জানতাম উনি বেইল পাবেন। চিন্তার বিষয় সেটা নয়। অন্যকিছু…!”
“অন্যকিছু?”
মিস অরোরা হাতের কাছে আর কিছু না পেয়ে একগাদা শশা কচরচর করে চিবোচ্ছিল। এবার সজোরে ঘাউত করে এক ঢেঁকুর তুলে বলল, “ঔর ক্যায়া হ্যায় স্যারজি?”
অধিরাজ ঠোঁট কামড়াল, “আমি ভাবছি, সবচেয়ে বড়ো মিত্রপক্ষ এমন বডো মিথ্যে ইনফরমেশন কেন দিলেন?”
এবার অর্ণব আকাশ থেকে প্রায় স্পেসশিপ সুদ্ধ মাটিতে আছড়ে পড়েছে, “সুহাসিনী মিত্র মিথ্যে বলেছেন? কখন?”
তার কণ্ঠে স্পষ্ট অবিশ্বাস। সেটাই স্বাভাবিক। অমন সুন্দরী, ব্যক্তিত্বশালী মহিলা মিথ্যে বলবেন তা প্রায় অবিশ্বাস্য। অধিরাজ চিন্তান্বিত স্বরে বলে, “উনি বলছিলেন যে উনি একজন ডায়েটিশিয়ান। ডাক্তার নন। অথচ ওঁর সাবোর্ডিনেটরা মাঝেমধ্যেই ওঁকে ডঃ মিত্র বলে। কেন? ওপরন্ত টেবিলে রাখা বইগুলো দেখেছ? হোয়াই উই গেট সিক বাই বেঞ্জামিন বিকম্যান দ্য ওবেসিটি কোড বাই জেসন ফাং, গ্লুকোজ রেভোলিউশন বাই জেসি ইনচম্পে। এগুলো ডায়েটিশিয়ানদের মাস্ট রিড বুক নয়, বরং একজন মেটাবলিক ডক্টরের রামায়ণ-মহাভারত। উনি সাধারণ ডায়েটিশিয়ানই নন। বরং একজন রীতিমতো ডিগ্রিধারী মেটাবলিক ডক্টর। যিনি শুধু পথ্যই বসে বসে লেখেন না, বরং মেটাবলিজম, মেটাবলিক হেলথ, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্ট, হরমোনাল ইমব্যালেন্স থেকে শুরু করে মেটাবলিজমের সঙ্গে ক্রনিক ডিসিজগুলোর গভীর সম্পর্ক খুব ভালোভাবেই জানেন! যার জন্য ডক্টর শব্দটা মাঝেমধ্যেই স্লিপ অব টাং হয়ে বেরিয়ে আসে। তাহলে লক্ষ লক্ষ টাকার চাকরি ছেড়ে এখানে উনি সাধারণ এক বেচারি ডায়েটিশিয়ানের দুর্বল, বিতাড়িত সুগ্রীব মার্কা রোল প্লে করছেন কেন? সেক্ষেত্রে ওঁকে কিন্তু গর্দভচর্মাবৃত সিংহ ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না!”
“সে কী!”
অর্ণব কী বলবে বুঝে পায় না। কোনোমতে বলল, “তবে এমন ডাইনে বাঁয়ে মিথ্যে বলার কারণ?”
“একটাই সম্ভাব্য কারণ হতে পারে।”
অধিরাজ মিস বোসের মেছো বিড়াল মার্কা দৃষ্টি দেখে নিজের আধখাওয়া সিগারেটটাই ওঁর দিকে কাণ্ডজ্ঞানহীনের মতো এগিয়ে দেয়। কৌশানীকে দেখে মনে হল, ওকে কেউ বুর্জ খলিফা গিফট করেছে। সে সেদিকে না তাকিয়ে আপনমনেই বিড়বিড় কবে, “যদি না ওঁর ডাক্তারি লাইসেন্স বাজেয়াপ্ত হয়ে থাকে! উনি কী করে জানলেন যে পুলিস প্রসিডিওরে কী চাওয়া হয়? ওঁকে দেখে মনে হয়নি তোমার যে পুলিসি তদন্তের অভিজ্ঞতা আগে থেকেই আছে? শি ওয়াজ ড্যাম রেডি ফর ইট!”
“ইউ মিন…!” অর্ণব তখনও হাঁ, “শি ইজ আ হিস্ট্রিশিটার! পুলিসের খাতায় ওঁর নাম আছে?”
“হান্ড্রেড পার্সেন্ট চান্স আছে অর্ণব!” সে আস্তে আস্তে বলে, “মিস চাউমিন বন্ডকে মাঠে নামাও। দেখবে টাইটানিককে গোঁত্তা মারার আইসবার্গের একদম সঠিক ডেপথ পেয়ে যাবে!”
“ওকে স্যার…।” সে জিজ্ঞেস করে, “এখন আমরা তবে কোথায় যাব? এগেইন জেনিথ? অর ডঃ বসুর বাড়িতে? ফর ইন্টারোগেশন?”
“না!”
অধিরাজ মাথা নাড়ল, “গল্প যেখান থেকে শুরু হয়েছিল, আমরা সেখানেই আবার যাব। সেনোরিটা ডক্টরের বাড়িতে। কারণ গল্পটা যখন বোঝা যাচ্ছে না, তখন বারবার পড়াই উচিত। ততক্ষণ পড়ো যতক্ষণ না বুঝতে পারছ।”
অর্ণবের বুকের ভেতরটা গুড়গুড় করে ওঠে। বাইরে তখন সন্ধে সবে নামছে। দিনের শেষ আলোটা ধীরে ধীরে ফিকে হতে থাকে। আকাশের নীল ছায়ায় লালচে-কমলা রঙের তুলোর মতো মেঘেরা ভেসে বেড়ায়। যেন সূর্য তাদের রঙে রঙে শেষ স্বাক্ষর লিখে দিচ্ছে। গাছের পাতায় হালকা হাওয়া লেগে একটি নরম সুর সৃষ্টি করে—মৃদু শিসের মতো।
সন্ধ্যা যখন শহরে নামে, তা আর নিঃশব্দ থাকে না। এখানে অন্ধকার নামে না, বরং মায়াবী আলো জ্বলে ওঠে। চাঁদ আর তারা করেই ইলেক্ট্রিকের তারে আটকে গিয়েছে। এখন আকাশ ধীরে ধীরে রং পালটায়, কিন্তু তার চেয়েও দ্রুত পালটায় ট্র্যাফিক সিগন্যালের লাল, সবুজ আলো। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পালটায় মানবচরিত্র।
দূরের বিল্ডিংগুলোর কাচের জানালায় প্রতিফলিত হয় শেষ সূর্যের আলো, যেন শহর নিজেই এক বিশাল ছায়াগ্রহ। রাস্তায় উদ্ভাসিত নিওন সাইন, বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং, আর গাড়ির হেডলাইটের আলো।
অধিরাজের মনে হল এত আলোর মধ্যেও সেই শহরের আয়নায় একটুকরো অন্ধকার বসে এখনও হাসছে। তার দু-চোখ হিংস্র প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বারবার বলছে,
“ক্যান ইউ প্রুভ ইট? ….আই থিঙ্ক ইউ কান্ট!”
