৮
অবশেষে মরচুয়ারিতেই দেখা মিলল তার। একটু আগেও সে বেঁচে ছিল। লিফটের সিসিটিভি ক্যামেরায় তাকে নড়াচড়া করতেও দেখা গিয়েছে। কাউকে ভীষণ ভয় পাচ্ছিল। অথবা কারওর করাল কবল থেকে মুক্তির আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল মানুষটা! সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট ওর অস্থিরতা, ভয় আর অন্তিম যুদ্ধ।
কিন্তু এখন সেসব কিছুই নেই। জীবন সমাপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুছে গিয়েছে সব আতঙ্ক, সব ভয়, সমস্ত অস্থিরতাও। শুধু কিছু শীতল অধরা রহস্য নিয়ে নীরব অন্ধকুপের মতো টান-টান হয়ে শুয়েছিল ওয়ার্ডবয় সুশান্ত।
“মৃত্যু সদ্য সদ্যই হয়েছে।”
মরচুয়ারির ভেতরে উপস্থিত ছিলেন ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার। তিনি তাঁর স্বভাবগত রুক্ষ স্বরে বলেন, “ব্যাটা মরার আগে একবার দেখা করেও গেল না। ওর কাছে আমি অনেকগুলো টাকা পাই। কমসে কম লাখ দুয়েক তো হবেই। এরা ধার করতে জানে। কিন্তু সেটা শোধ করে মরে না কেন।”
“ও আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসেনি!” অধিরাজের চোখে দুশ্চিন্তা, “তবে এতদিন মিসিং থাকার পরে ও এসেছিল কেন? কে ডেকেছে?”
“আই ডোন্ট হ্যাভ এনি আইডিয়া।’
ওখানে তখন পবিত্র আচার্য, অধিরাজ আর অর্ণব উপস্থিত ছিল। মরচুয়ারি নিয়ে অর্ণবের আলাদা কোনো ভয় বা অস্বস্তি নেই। বহু মৃতদেহ, পোস্টমর্টেমের কাটাছেঁড়া লাশ দেখে সে অভ্যস্ত। কিন্তু এই মুহূর্তে জেনিথের মরচুয়ারিতে দাঁড়িয়ে তার ভীষণ আনক্যানি ফিলিং হচ্ছিল।
জেনিথ হসপিটাল বাইরে থেকে যতটা বিলাসবহুল, তার ভেতরের মরচুয়ারিটা ঠিক ততটাই ঠান্ডা আর অস্বস্তিকর। বাইরেটাও এসির শীতলতায় মোড়া ঠিকই। কিন্তু তিনতলার করিডরের একেবারে শেষপ্রান্তে থাকা মরচুয়ারির ভারী ধাতব দরজাটা খুলতেই এক ধাক্কায় বহুদিনের ভারাক্রান্ত ঠান্ডা হাওয়া এসে শিহরণ জাগিয়ে তোলে। বাইরের জীবন্ত শীতল হাওয়ার সঙ্গে এই মৃত শৈত্যপ্রবাহের তফাত এতটাই যাতে সমস্ত শরীর একমুহূর্তের জন্য হলেও কেঁপে ওঠে। স্নায়ুও বিচলিত হয়ে পড়ে।
ঘরটা যথেষ্ট আলোকিত, কিন্তু আলোটা স্বস্তিদায়ক নয়। মাথার ওপরের লাইটগুলো হঠাৎ হঠাৎই গ্লিঙ্ক করছে। কখনও জোরালো প্রভায় দপ করে ওঠে, কখনও আবার ধুক করে নিভেও যায়! যেন কোনো মানুষ একবার চোখ মেলে তাকাচ্ছে, পরক্ষণেই আবার চোখ বুজে ফেলছে। অথবা আলোগুলোই অবিকল মানুষের মতো চোখ পিটপিট করছে।
অধিরাজ নির্বিকার মুখে ইন্দ্রজিতের দিকে একবার তাকাল। এখানে সবার সামনে একটা মার্ডার হয়ে গেল, আর ভদ্রলোকের টাকার শোক উথলেছে। কয়েকদিন আগেও যাকে ‘লয়াল’ বলছিলেন, রীতিমতো কভার করছিলেন, আজ সেই অতি বিশ্বস্ত কর্মীর মৃত্যুতে বিন্দুমাত্র শোকের ছায়াও নেই ওঁর মুখে। বরং যেন অনেকটাই স্বস্তি পেয়েছেন। হয়তো মানুষটাকে আর কভার করার দরকার নেই বলেই এতখানি নিশ্চিত্ত। অধিরাজ আস্তে আস্তে বলে, “আপনাদের এখানে পাওয়ার প্রায়ই দেখি প্লিফ করে। লাইটগুলোও ফ্রিকার করতে থাকে। লাস্ট পেশেন্টটির মৃত্যুর দিন তো করিডরের আলো এতটাই ফ্লিকার করছিল যে সব ফুটেজই ঝাপসা এসেছে। আর আজকেও লিফট ছাড়া বাকি ক্যামেরাগুলো প্রায় তেমন ফুটেজ ক্যাপচারই করতে পারেনি! এই স্নিঞ্চ বা ফ্রিকারগুলো কী শুরু থেকেই হত, না ইদানিং শুরু হয়েছে?”
“এটা আমি এখানে আসা ইস্তক দেখছি অফিসার।” তিনি বঙ্কিম মুখভঙ্গি করেন, “ডঃ সঞ্জয় বসু কীসব নতুন নতুন প্রোজেক্ট যেন মাঝেমধ্যেই চালিয়ে থাকেন। অত্যাধুনিক ও শক্তিশালী মেশিনের টেস্টিং-ও করান। ভোল্টেজের আপ-ডাউন হওয়াই স্বাভাবিক। তখনই এসব শুরু হয়।” বলতে বলতেই তাঁর মুখে বিরক্তির ছাপ ফুটে ওঠে, “আর আমার ইডিয়ট অ্যাসিস্ট্যান্ট রঞ্জন ভাবে সবটাই বুঝি ভূতে করছে! ওর ধারণা সব হসপিটালেই ভূত থাকে! ওয়ার্থলেস।”
অর্ণব রঞ্জনের মতো ভীতুর ডিম না হলেও কখনও কখনও ভয় পেয়ে যায়। এই মুহূর্তে আলোগুলো যেমন হরর এফেক্ট দিচ্ছিল তাতে একঝলকের জন্য ওর মনে হল ট্রলির ওপর শোয়া দেহগুলো বুঝি অস্বাভাবিকভাবে নড়ছে। কিন্তু পরমুহূর্তেই সে নিজেকে বোঝায়, বাস্তবে সেটা অসম্ভব। শুধুই চোখের ভ্রম মাত্র।
ও তবু সভয়ে চারদিকটা দেখে নেয়। সারি সারি স্টিলের ট্রলিতে সাদা চাদরের নীচে শুয়ে আছে নিথর কতগুলো শরীর। রিগর মর্টিসের কারণে তাদের দেহগুলো মৃত্যুকঠিন। কেউ হাত মুঠো করে আছে, কারও পা অস্বাভাবিক কোণে বেঁকে আছে। সেই কঠিন হয়ে ওঠা আঙুলগুলো চাদরটাকে এমনভাবে টেনে ধরে রেখেছে, যেন মরার আগে শেষবার কিছু আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল।
“রঞ্জনবাবুর আর কীসে কীসে ভয় আছে ডঃ সরকার? আগে শুনেছিলাম উনি অপরিচিত মানুষকে ভয় পান। এখন শুনছি ভূতকেও ভয় পান।” সে স্মিত হাসে, “পুলিসকেও যে ভয় পান তা তো স্বচক্ষেই দেখেছি। এই ভয় পাওয়ার লিস্টে আর কী কী আছে?”
“কী নেই সেটা আগে জিজ্ঞাসা করুন,” ইন্দ্রজিতের মুখ কঠিন, “একজন ডাক্তার হয়ে পোকামাকড়, আরশোলা, মাকড়সা, টিকটিকিকে পর্যন্ত ভয় পায়। আপনি কিছুতেই ওকে বাইরের খাবার খাওয়াতে পারবেন না। সেখানেও ফুড পয়জনিং-এর ভয়। এমনকি রাতে নিজের ছায়া দেখে নিজেই আঁতকে ওঠে। ওর ধারণা পৃথিবীসুদ্দু ক্রিমিনাল ওকে টক করছে।”
“ভয়গুলো কী সত্যিই অমূলক?” অধিরাজ তীব্র দৃষ্টিতে তাকায় ইন্দ্রজিতের দিকে, “নাকি এই ভয়ের পেছনে কোনো কারণও আছে?”
“মানে?”
এর ফাঁকেই সুশান্তর ডেডবডির চাদরটা একটু সরে গেল। ফ্যাকাশে মুখে মোমের প্রলেপ! ঠোঁট নীলাভ। চোখ এখনও আধখোলা। আর সেই চোখের সাদা অংশটা আলো ি করলে হঠাৎ হঠাৎই ঝিকিয়ে ওঠে। যেন সে তাকিয়ে কিছু বলতে চায়। নাকের কাছের রক্তবিন্দু এখনও তাজা লাল। শুকিয়ে বাদামি রং ধরেনি।
“মানে এতগুলো অস্বাভাবিক মৃত্যু, বা বলা ভালো মার্ডারের পরও ওঁর ভয় পাওয়া কী স্বাভাবিক নয়?”
“এগুলো যে মার্ডার তার কোনো কংক্রিট প্রমাণ আপনার কাছে নেই অফিসার।” ভদ্রলোকের কন্ঠে বরফের শীতলতা, “দু-তিনবার ফুড পয়জনিং হলেই যদি কেউ ভাবে তাকে কেউ বিষ খাওয়াচ্ছে, তবে হয় সে ছাগল, নয়তো পাগল। অ্যান্ড বিলিভ মি. রঞ্জন দুটোই।”
“সুশান্তর মৃত্যুটা তবে আপনার স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে?”
“হতেই পারে,” তিনি ঠোঁট বাঁকালেন, “যে পরিমাণে মদ গিলত আর উচ্চস্তরের জিনিস ফোঁকাটুকি করত তাতে এর হার্ট, লিভার, কিডনি, ফুসফুস–সবই ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়ার কথা! খারাপ পাড়াতেও তো রেগুলার যেত। আপনি জানেন, ওর সিফিলিস ছিল?” তিনি গজগজ করেন, “এইচ আই ভিও ছিল কী না কে জানে।”
হসপিটালের মৃত ওয়ার্ডবয় সম্পর্কে ডাক্তারের কী দারুণ উক্তি। সত্যিই এখানে যারা সার্ভিস দেয় তারা নিজেরাই বোধহয় সবচেয়ে বড়ো পেশেন্ট। জেনিথ কোন্ আক্কেলে ওঁদের এখানে রেখেছে!
“আর লিফটের মধ্যে ওর ওই অদ্ভূত ব্যবহারের কী যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দেবেন স্যার?”
অধিরাজের প্রত্যেকটা প্রশ্ন যেন অব্যর্থ বাণ। ডঃ সরকার মাথা নাড়লেন, “অনেক ক্ষেত্রে কার্ডিয়াক ফেইলিওরে মানুষ কনফিউশনে ভোগে। হ্যালুসিনেট করে। অকারণে ভয় পায়। উলটোপালটা কাজও করতে পারে। সুশান্তর ক্ষেত্রে সবকটা সিম্পটমই দেখা যাচ্ছে।”
তিনি থেমে যোগ করলেন, “আমার ধারণা ওর কার্ডিয়াক অ্যারেস্টই হয়েছিল। ও জানত যে ওকে ইমিডিয়েটলি কার্ডিওলজি ডিপার্টমেন্টে যেতে হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে যা হয় 1 রোগী কনফিউজড হয়। সম্ভবত ও মনেই করতে পারছিল না যে কার্ডিওলজি ডিপার্টমেন্টটা কোন ফ্লোরে। তাই প্রত্যেকটা ফ্লোরে থেমে থেমে উঁকি মেরে দেখছিল যে চিনতে পারছে কী না! হয়তো ঠিকমতো কিছু দেখতে বা বুঝতেও পারছিল না। ফলস্বরূপ প্রচণ্ড ভয়ও পেয়েছিল সে।”
যথেষ্ট যৌক্তিক উত্তর। যেন আগে থেকেই প্রত্যেকটা শব্দ সাজানো ছিল। অধিরাজ অবশ্য একটুও উত্তেজনা প্ৰকাশ না করে ঠান্ডা স্বরে বলল, “তার মানে আপনার মতে এটা নর্মাল ডেথ?”
“এই দুনিয়ায় মৃত্যুই সবচেয়ে নর্মাল অফিসার।” ওঁর নিরাসক্ত উত্তর, “বরং আমরা যে বেঁচে আছি এটাই অ্যাবনর্মাল ও আশ্চর্যের। উই অল আর ডেস্টিনড টু ডাই।”
“কিন্তু এত কম বয়েসে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট?” তার দৃষ্টি শাণিত, “একবারও কী মনে হয় না যে এর মধ্যে কোনো ফাউল প্লে থাকতে পারে? কিংবা এক বছরে এতগুলো কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে মৃত্যু আদৌ স্বাভাবিক নয়।”
এবার ফিক করে হাসলেন ডঃ ইন্দ্রজিৎ, “আপনি বয়েসের কথা বলছেন? কয়েক বছর আগে একজন ইনফ্যান্ট মারা গিয়েছিল কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে। তা নিয়ে বিস্তর জলঘোলাও হয়েছিল। শিশুটির মা কোর্টের দ্বারস্থও হয়েছিলেন। বাট… তিনি মৃদু হাসেন, “কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের যে-কোনো বয়েস হয় না তা কোর্টও জানে। ইট ওয়াজ আ ন্যাচারাল ডেথ…।”
“অফকোর্স ন্যাচারাল যদি না শিশুটির ডাক্তার তাকে ভিটামিন বি ওয়ান বা থায়ামিন প্রেসক্রাইব করে থাকেন।” অধিরাজ ডঃ সরকারকে নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ না দিয়েই আক্রমণ শানায়, “বাই দ্য ওয়ে, আপনি ডঃ সুহাসী বিশ্বাসের নাম শুনেছেন?”
“কে? সুহাসিনী মিত্র?”
প্রশ্নটা এমন অতর্কিতে এসেছিল যে সতর্কতা অবলম্বন করতে পারেননি ভদ্রলোক। মুখ ফস্কে কথাটা বেরিয়েই আসে। এই প্রথম ওই চিলড এসির মধ্যেও ওঁর কপালের রগ বেয়ে ঘামের বিন্দু গড়িয়ে পড়ে। বুঝতে পেরেছেন অসাবধানেই পাতা ফাঁদে ভুলবশত পা দিয়ে ফেলেছেন। ভুল হয়ে গিয়েছে… মারাত্মক ভুল…!
অধিরাজ সকৌতুকে তাঁকে দেখছে। ডঃ সুহাসী বিশ্বাস বা সুহাসিনী মিত্রর ঠিকুজি কুলুজি যে ইন্দ্রজিৎ জানেন, এমন সন্দেহ তার আগেই হয়েছিল। তিনি সুহাসিনীর আসল পরিচয় খুব ভালোভাবেই জানেন। আর সেজন্যই হয়তো সুহাসিনী ইচ্ছাকৃতভাবে ওঁর ড্রাগ র্যাকেটের উল্লেখ করেছিলেন। ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার ওঁর কাছে প্লেট। তাই পুলিসকে ইন্দ্রজিতের প্রতি সন্দিগ্ধ করে তোলার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলেন। তখনই সে বুঝতে পেরেছিল যে সুহাসিনী আর ইন্দ্রজিতের সম্পর্ক মোটেই ভালো নয়। আজ চাউমিনের খবরের দৌলতে আর ইন্দ্রজিতের করা ‘ইনফ্যান্টের কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের’ বেফাঁস উল্লেখে সে দুইয়ে দুইয়ে চার মেরে অন্ধকারেই ঢিলটা ছুড়েছিল। কিন্তু ঢিল একেবারে যথাস্থানেই লেগেছে।
ডঃ সরকার রুমালে মুখ মুছে এবার একটু বিব্রত স্বরে বলেন, “সরি ফর দ্য মিসটেকেন আইডেন্টিটি। আমি সুহাসিনী মিত্রর সঙ্গে অন্য একজনকে গুলিয়ে ফেলেছি। আই উইদড্ মাই স্টেটমেন্ট, আমি ডঃ সুহাসী বিশ্বাস নামের কাউকে চিনি না।”
সেই দেবশিশু মার্কা ক্যানাইন টিথের দুষ্টু হাসিটা ঝিলিক দিয়ে ওঠে, “আর ইউ শিওর যে নামটা ‘সুহাসী বিশ্বাস? ঘোষ, বোস, গুহ, মিত্র বা অন্য কিছু নয়? আমি কিন্তু মাত্র একবারই বলেছি। অথচ একজন অচেনা মহিলার নাম আপনি একবার শুনেই পারফেক্টলি মনে রেখেছেন। আপনার স্মৃতিশক্তি অসামান্য বলতে হবে।”
“হ্যাঁ। আমার স্মৃতিশক্তি ভালো। মেমোরি গেমে ছোটোবেলায় ফার্স্ট হতাম। সো হোয়াট?”
লোকটা ভাঙবে কিন্তু মচকাবে না। কথার টোনেই অপরিসীম ঔদ্ধত্য স্পষ্ট। অধিরাজ একটু থেমে কেটে কেটে বলল, “ইন দ্যাট কেস আই মাস্ট অ্যাডমিট, ডঃ সুহাসী বিশ্বাসের মেমোরি আপনার থেকেও শার্প। উনি কিন্তু আপনাকে খুব ভালোভাবেই চেনেন। এমনকি আপনার নাম যে অ্যানাস্থেটিক ড্রাগের ইললিগ্যাল বিজনেসের জন্য পুলিসের খাতায় আছে, আপনার বাড়িতে রীতিমতো রেইডও হয়েছিল, আপনার অ্যাসিস্ট্যান্ট রঞ্জন নায়েক যাতে আপনার কুকীর্তি ফাঁস না করে দেয় সেজন্য নাকি ওকে থ্রেট দিয়ে ভয় দেখিয়ে রাখেন, আর আপনারই অ্যানাস্থেশিয়ার ওভারডোজের প্রভাবে একজন রোগী মারাও গিয়েছিলেন এসবও উনি ঠিকুজি কুলুজি সমেত মনে রেখেছেন! এনি হাউ, ভদ্রমহিলা আপনার ছোটোবেলার মেমোরি গেমের পার্টনার ছিলেন না তো?”
অর্ণব মনে মনে অধিরাজের মাইন্ড গেমের প্রশংসা না করে পারল না। সে রীতিমতো শকুনির স্টাইলেই পাণ্ডব কৌরবের যুদ্ধ লাগাচ্ছে! ইন্দ্রজিৎ ষড়যন্ত্রটা বুঝতে পারলেন না। তবে ক্ষেম রামবাণে কাজ হল। পুরো হাউ হাউ দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে বললেন, “সুহাসিনী মিত্র এসব আপনাকে বলেছে? দাটি ব্লাডি বিচ! … আই উইল কিল দ্যাট…”
রাগে অন্ধ হয়ে হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন ডঃ সরকার। অধিরাজ সরু চোখে এক কুঁচি সন্দেহ নিয়ে তাঁকে দেখছে, “আর ইউ শিওর সুহাসিনী মিত্র বলেছেন? ডঃ সুহাসী বিশ্বাস নন?”
“আরে ওই একই হল।” ইন্দ্রজিৎ রাগে জ্বলছেন, যার একজন। এক নম্বরের দুধ কলা খাওয়া কালসাপ! ওর কপাল ভালো যে শুধু লাইসেন্সই গেছে। আমি যদি না থাকতাম তবে ও শালি আজ জেলে থাকত! তখন এমন পিরিত করে গলায় ঝুলে পড়ল যে আমিও গলে জল হয়ে ইনফ্লুয়েন্স খাটিয়ে সেটা থেকে ওকে টেনেটুনে বের করেছিলাম। আমিই ওই মহিলাকে সঞ্জয়ের টিমে জয়েন করিয়েছিলাম—নয়তো আজ স্রেফ অন্যের বাড়িতে ঝি-গিরি করত। কিন্তু যতই করো, জাতসাপের বিষ যায় না।”
তিনি উম্মত্ত রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলেন, “জানেন ও কী করেছে? আমি ওর ক্রাইমকে ধামা চাপা দিয়েছিলাম বলে আমাকেই ব্ল্যাকমেইল করে চলেছে! ওর দামি ফ্ল্যাট, গাড়ি, মোটা ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স, শাড়ি, জুয়েলারি, সব আমারই দেওয়া। বছরের পর বছর ওকে পুষছি আমি…!”
“আই সি!”
তার মুখে তৃপ্তির হাসি। মির্চি ভালোই লেগে গেছে। ডঃ সরকার তখনও থামার নাম নিচ্ছেন না। ওঁর মুখ ঘর্মাক্ত। চোখ রক্তাভ!
“অ্যান্ড ফর ইওর কাইন্ড ইনফরমেশন…।” তিনি বললেন, “আমার অপদার্থ অ্যাসিস্ট্যান্টটার ভয়ের কারণ আমি নই, ওই ডাইনিটাই। রঞ্জন একবার আমাদের টেলিফোনিক কনভার্সেশন ওভার হিয়ার করে ফেলেছিল। সুহাসিনীর রহস্য ও-ও জানে। তিনি আবার আর এক ধর্মপুত্তুর। সুজাতা এই হাই ডেথ-রেটের ব্যাপারে প্রথমে রঞ্জনের কাছেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিল। এ-ও বলেছিল যে যত বুড়ো বুড়িদের সঙ্গে ও বেটির ঠোকাঠুকি হয়, তারাই বেছে বেছে মারা যাচ্ছে কেন। আর একটু হলেই মহান যুধিষ্ঠির কথাটা সঞ্জয়ের কানে তুলতেই যাচ্ছিলেন। কিন্তু তার আগেই সুহাসিনী ওকে ভজিয়ে ভাজিয়ে এমন বার্থডে কেক খাওয়াল যে আর একটু হলেই ফুড পয়জনিঙে টপকে যাচ্ছিল ব্যাটা।”
“কেকে বিষ ছিল?”
তিনি মাথা নাড়েন, “না। বিষের ওর দরকারই পড়ে না। শি ইজ আ মাস্টার অফ কিপিং বাই ফুড। রঞ্জনের আমন্ড অ্যালার্জি আছে। বাদাম ওর জন্য বিষ। সুতাসিনী বার্থডে লোকে এমন আমস্ত পেস্ট দিয়েয়ছিল যে রঞ্জন মরেই যেত। সময়মতো কৌশিক ওর স্টমাক ওয়াশ করে ট্রিটমেন্ট দেওয়ায় বরাতজোরে বেঁচে গিয়েছিল সেবার। এরপরও সুহাসিনী হাল ছাড়েনি। রঞ্জন মাশরুমের ভয়াবহ ফ্যান জেনে ওকে নিজের লাঞ্চবক্স থেকেই লাঞ্চ শেয়ার করার নামে ‘চিলি মাশরুম’ খাইয়েছিল ছাগলটা সন্দেহও করেনি কারণ নিজের টিফিনবক্স থেকেই সুহাসিনী ওর প্লেটে সার্ভ করেছিল। মাশরুম দেখেই নোলা সকসকিয়ে ওঠে ওর। পুরো একপ্লেট চিলি মাশরুম খেয়ে ফের মারাত্মক ফুড পয়জনিং বাঁধাল। নেহাৎ ও বোধহয় যমেরও অরুচি। তাই এবারও কৌশিকের দৌলতে বেঁচেছে। আর তারপর থেকেই ওর এই অবস্থা। ওসব সোশ্যাল অ্যাংজাইটি—হ্যান ত্যান—কিস্যু ওর নেই। ও শুধু ভয় পায় যে ওই ডাইনিবুড়ি ওকে যেন তেন প্রকারেণ খুন করবে। দেখলেন না, যখন আপনি রঞ্জনকে জেরা করতে গেলেন, তখনই কেমন ওর সামনে থেকে আপনাদের সরিয়ে নিয়ে গেল।” তিনি বলেন, “ওর ভয় ছিল রঞ্জন আপনাকে সব বলে দিতে পারে। এমনকি লাস্ট দিন অবধি সুজাতা ওকে যা যা বলেছিল সব কথা ফাঁস করতে পারে। ওইজন্যই আপনাকে ইন্টারোগেশন করতেই দিল না।”
“কিন্তু তা কী করে সম্ভব?” অধিরাজ কৌতূহলী, “কেকের ব্যাপারটা যদি বা বুঝলাম, কিন্তু মাশরুমে নিশ্চয়ই মি. নায়েকের অ্যালার্জি নেই। থাকলে ওটা ওর ফেভারিট ডিশ হত না। আর ওই একই চিলি মাশরুম তো স্বয়ং সুহাসিনীও খেয়েছিলেন। একই লাঞ্চবক্স থেকে শেয়ার করা একই প্রিপারেশন। সেক্ষেত্রে যদি বিষ থাকত তবে সুহাসিনীও কী অ্যাফেক্টেড হতেন না?”
“আমি আবার বলছি অফিসার…।” তিনি দৃঢ় বিশ্বাসে বলেন, “ও মহিলার আলাদা বিষের দরকারই নেই। ও মাল সব পারে। অ্যাকচুয়ালি একই বক্সের দুটো সাইডে ওই মাশরুমটার প্রিপারেশন ছিল। একটা পোর্শন ও নিজেই র্যান্ডমলি নিয়ে অন্যটা রঞ্জনকে দিয়েছে। দুটো প্রিপারেশনের স্মেল, লুক, এমনকি টেস্টেও কোনো পার্থক্য ছিল না। শুধু পার্থক্য ছিল স্পেশিজে।”
“কীরকম?”
তিনি বুঝিয়ে বলেন, “সচরাচর যে মাশরুমটা আমরা সবচেয়ে বেশি খেয়ে থাকি বা যেটা মোস্ট এডিবল আর টেস্টি, সেটা আমানিটা সিজারিয়া বা সিজারস মাশরুম। রেস্টোর্যান্টে, যে-কোনো ইউরোপিয়ান-ইটালিয়ান বা চাইনিজ ডিশে আপনি সিজারস মাশরুমই খেয়ে থাকেন। কিন্তু অবিকল সিজারস মাশরুমের মতোই দেখতে, সেম টেস্ট, সেম প্যাটার্নের আরও একটা মাশরুমের প্রজাতি আছে যেটা অবিকল অ্যামানিটা সিজারিয়ার জুড়ুয়া ভাই। দুটোকে পাশাপাশি রান্না করলে আপনি পার্থক্য বুঝতেই পারবেন না। টেস্টেও কোনো ডিফারেন্স নেই। কিন্তু ওটা সিজারস মাশরুমই নয়, বরং ওয়ান অব দ্য ফলস সিজারস মাশরুম, যার নাম অ্যামানিটা ফ্যালয়েডস! এটা হাইলি টক্সিক বলে ওকে ডেথ ক্যাপও বলে। আপনি, আমি পার্থক্য বুঝব না। কিন্তু একজন এক্সপার্ট ঠিক বুঝবে। ও জেনে বুঝেই নিজে বিশুদ্ধ সিজারস মাশরুমের পোর্শনটা তুলে নিয়ে রঞ্জনকে কনফিউজ করে সিজারস মাশরুম সার ‘ডেথ ক্যাপের’ কম্বাইন্ড চচ্চড়ি খাইয়ে দিয়েছিল। ওর নিজের দিকের প্রিপারেশনে ডেথ ক্যাপ ছিল না। তাই কিছু হয়নি। সেবারও কৌশিক যদি সন্দেহ না করে সিলিবিনিন না দিত তবে আর একটা মার্ডার অবধারিত ছিল!”
“আর একটা মার্ডার?”
অধিরাজের ভুরু সন্দেহে বেঁকে যায়।
“এখন তো মনে হচ্ছে সুশান্তের ডেথটাও মার্ডার হওয়া অসম্ভব নয়। বরং সেটাই হওয়া স্বাভাবিক।”
এতক্ষণ এই ইন্দ্ৰজিৎই সুশান্তের মৃত্যুটাকে নর্মাল ডেথ প্রমাণ করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলেন। এখন আবার তিনিই এটাকে মার্ডার বলছেন। অর্ণব বুঝতে পারছিল এবার আস্তে আস্তে সব মুখোশ খুলে পড়ছে। আপাতদৃষ্টিতে একটা শান্ত ঠান্ডা হসপিটালের ভেতরের নোংরা পলিটিক্স ভেতরের ডার্করুম থেকে নখ দাঁত বের করে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। অত্যন্ত ইনোসেন্সের সঙ্গে দাবার চালটা দিয়েছিলেন সুহাসিনী। কিন্তু অধিরাজ পুরো ছকটাই উলটে দিয়েছে। এখন ইন্দ্রজিতের পেটের কথাও বেরিয়ে পড়েছে। দেখা যাক, এই দাবাখেলা আরও কতদূর যায়!
মরচুয়ারির আলোগুলো আবার দপদপিয়ে ওঠে। এক ঝলকের জন্য অর্ণবের মনে হল সুশান্তর মৃতদেহ বুঝি কিছু বলতে চাইছে। তার গায়ে তখনও ওয়ার্ডবয়ের পোশাক। সাদা চাদরটা তখনও সামান্য উড়ছে। অর্ণব অনুভব করল, তার মৃত্যুশীতল আঙুলগুলো স্পর্শ করেছে তার শার্ট। যেন বলতে চাইছে, ‘শোনো, শুনে যাও! জীবনের কোনো ঠিক নেই। ওরা আমায় চুপ করিয়ে দিয়েছে। সুজাতাকে থামিয়েছে। তোমাদেরও হয়তো…।”
অর্ণবের মনের মধ্যে জমাট ভয়। এসব কী ভাবছে সে। মাথা ঝাঁকিয়ে নিজের দুশ্চিন্তা দূর করতে চাইল সে। এসব উলটোপালটা চিন্তা এখন মাথায় না এলেই নয়?
“আপনার মনে যখন সন্দেহ আছে, তখন নিশ্চয়ই সুশাস্তর পোস্টমর্টেম আমাদের এক্সপার্টরা করলে আপনারা আপত্তি করবেন না।”
“অফকোর্স। আমার আপত্তি নেই।” তিনি এবার বাঁকা হাসেন, “কিন্তু সুহাসিনী আর সঞ্জয় আপনাকে অ্যালাউ করবে কিনা সন্দেহ আছে।”
“সুহাসিনীর কেসটা না হয় বুঝলাম। কিন্তু ডঃ সঞ্জয় বসু আপত্তি করবেন কেন?”
ফের রহস্যময় হাসলেন তিনি, “আপনার কী মনে হয় অফিসার ব্যানার্জি? এরা সবাই ধোয়া তুলসীপাতা? কৌশিক তিনবছর আগে অসুস্থ হয়েছিল। কিন্তু তার আগে ওর হেলথের কোনো প্রবলেমই ছিল না! হি ওয়াজ অ্যাজ ফিট অ্যাজ আ স্ট্রং হর্স। কিন্তু যে মুহূর্তে ও কৃশানুর সঙ্গে সাঁট করল ঠিক তখনই ওর কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে যায় যায় দশা। নয়তো ও তিনবছর আগেই কৃশানু রায়ের টিমে অনেক বেশি টাকায় জয়েন করত। এই রোগটার জন্যই সব পিছিয়ে গেল! অফকোর্স কৌশিক ইজ আ ব্যাকস্ট্যাবার। ওর মতো ঠান্ডা মাথার শয়তানও কম। কিন্তু বয়েসের কথা বলছিলেন না? আপনিই ভাবুন, কৌশিকেরই বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বা ফেইলিওরের বয়েস হয়েছিল কী?”
কথাটা ছুড়ে দিয়েই তিনি গটগটিয়ে উদ্ধতভঙ্গিতে সেখান থেকে চলে যান। অধিরাজের ভুরুতে চিন্তার ভাঁজ। এই গোটা টিমটাই গোলমেলে। কে যে কোথায় কী করে বেড়াচ্ছে তার ঠিক নেই। এরা একসঙ্গে কাজ করে ঠিকই, কিন্তু সবাই সবার বিরুদ্ধে কন্সপিরেসি করছে। এখানে চিকিৎসা কম, ইন্টারনাল পলিটিক্সই বেশি।
পবিত্র অতিকষ্টে এতক্ষণ চুপ করে ল্যাম্পপোস্ট হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এবার বলল, “মামা, এসব কী! এটা হসপিটাল না আই এস আই-এর ট্রেনিং ক্যাম্প। ডঃ কৌশিক চক্রবর্তী ডঃ বসুর বিরুদ্ধে কন্সপিরেসি করছেন। হাই পসিবিলিটি আছে যে ডঃ চক্রবর্তীর এই মারাত্মক রোগের পেছনে খোদ সঞ্জয় বসুরই হাত আছে, রিভেঞ্জ আর গিনিপিগ দুটো পসিবিলিটিই হতে পারে। সুহাসিনী অ্যানাস্থেসিস্টকে ব্ল্যাকমেইল করছেন, তার অ্যাসিস্ট্যান্টের ওপর একাধিকবার মার্ডার অ্যাটেম্পটও করেছেন। উপরন্তু সম্ভবত মার্ডারার, কিন্তু প্রমাণ নেই। অ্যানাস্থেসিস্টের মাথার ঠিক নেই। একবার সব কভার করেন, পরক্ষণেই সবার ভান্ডা ফোঁড় করছেন। টোট্যালি শেমলেস অ্যান্ড টপ টু বটম কোরাপ্টেড! ইচ্ছাকৃত হোক কী অনিচ্ছাকৃত, খুনী হওয়াও অসম্ভব নয়। সুশান্তও কিছু মুনি ঋঋষি নয়। কোন আক্কেলে ওকে ডঃ ইন্দ্রজিৎ দু-লাখ টাকা ধার দিয়েছেন? না এখানেও কন্সপিরেসি বা ব্ল্যাকমেইলিং? এমনি এমনি তো আম্বানিও কাউকে টাকা ধার দেবে না। ওদিকে বাবা-ছেলের ইগো ফাইট…। মাঝখান দিয়ে বেচারি সুজাতা রায় বেমক্কা মরে গেলেন! এখানে আমি কোরাপশন আর কন্সপিরেসি ছাড়া আর তো কিছুই দেখছি না রাজা!”
“যখন আর কিছুই দেখছ না, তখন আর একবার সুশান্তর অস্তিম পাঁচ মিনিটের ফুটেজটাই বরং দেখে নিই। আর হসপিটালের এন্ট্রির ফুটেজও দেখা যাক। সুশান্ত ইনভিজিবলম্যান কী করে হয়ে গেল সেটাও বোঝা দরকার।”
“ওকে।”
পবিত্র মাথা ঝাঁকিয়ে ওদের সিকিউরিটি জোনে নিয়ে যায়। সেখানে এখনও সিসিটিভি ক্যামেরা লাইভ রেকর্ড করছে। এই মুহূর্তে ফুটেজ একদম ক্লিন। কোনো ঝাঁকুনি বা অস্পষ্টতা নেই। অথচ মাঝেমধ্যেই ক্যামেরাগুলো এমন পাগলের মতো ব্যবহার করে কেন কে জানে!
“প্রথমে এন্ট্রান্সের রেকর্ডিংটা দেখাও পবিত্র।” অধিরাজ চিন্তিত্ত “সুশান্ত স্পাইডারম্যান নয় যে সোজা লিফটে টপকাবে। তাই লিফটের ফুটেজের আগে এন্ট্রান্সের ফুটেজ দেখা বেশি দরকার।”
“ওকে বস।”
হসপিটালের এন্ট্রান্সের সবকটা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে ফের রিপিট করে দেখা শুরু হল। ফুটেজ মাঝেমধ্যেই ঘোলাটে হয়ে গেলেও যত লোক ঢুকছে বা বেরোচ্ছে সবই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু ওদের সন্ধানী দৃষ্টি আঁতিপাঁতি করে যা খুঁজছে সেটাই নেই।
অধিরাজ রিপিট করে করে রেকর্ডিং দেখতে থাকে। একেবারে স্বাভাবিক ও সাধারণ হসপিটালের দৃশ্য। অথচ যেন সম্পূর্ণ নয়। সবই তো হল, কিন্তু আসল বামুনটি কই?
হাসপাতালের প্রবেশদ্বারে যথারীতি একটানা মানুষের যাতায়াত চলছে। মাঝে মাঝে ভেতর থেকে ডাক্তার ও নার্সরা বেরিয়ে আসছেন। কেউ তাড়াহুড়ো করে, কেউ-বা ধীরে সুস্থে। কারও হাতে ফাইল, কারও হাতে রিপোর্ট বা মেডিক্যাল সরঞ্জাম।
এর মধ্যেই একাধিকবার হুইলচেয়ারে রোগীকে আনা-নেওয়া করছে ওয়ার্ডবয়রা। পেছনে কয়েকজন আত্মীয় উৎকণ্ঠিত মুখে অনুসরণ করছেন। কখনও এমার্জেন্সির সামনে ভিড় করছে চিন্তিত মুখ। আবার কেউ বা কাঁপা হাতে ফর্ম ফিল আপ করছে।
এরমধ্যেই নিয়মিত অ্যাম্বুলেন্সের আনাগোনা। আলোর ঝলকানি দিয়ে গাড়িটা থামা মাত্রই দরজা খুলে রোগীকে স্ট্রেচারে নামানো হচ্ছে। কয়েকজন মেডিকেল স্টাফ দ্রুত রোগীকে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে। পেছন পেছন পেশেন্টপার্টি।
কাচের গেটের বাইরে রোগীর আত্মীয়রা দাঁড়িয়ে ফোন করতে ব্যস্ত। আবার এক মহিলা বাইরে দাঁড়িয়েই ফোনে অঝোরে কেঁদে চলেছেন। ওঁর কণ্ঠ শোনা যায় না, কিন্তু হাতের ছটফটানি আর কাঁপা ঠোঁট সব বলে দিচ্ছে। কখনও মুখ ঢাকছেন, কখনও আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছু ফিশফিশ করছেন। তাঁর পাশেই কয়েকজন কাঁধে ব্যাগ বা কম্বল নিয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেটে সুখটান মারছে! এই দুনিয়ায় কে এল, কে গেল—তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই!
সিকিউরিটি গার্ডদের কয়েকবার দরজার কাছে টহল দিতে দেখা যায়। কখনও ভেতরে ঢুকছে, কখনও বাইরে এসে নজর রাখছে। সব মিলিয়ে হাসপাতালের গেটের সামনে সারাক্ষণই একটা চলাফেরার স্রোত আছে। ডাক্তার, নার্স, রোগী, আত্মীয় আর অ্যাম্বুলেন্স মিলিয়ে একটানা ব্যস্ততা!
“কিন্তু এর মধ্যে সুশান্ত কোথায়?”
আপনমনেই বিড়বিড় করে বলে অধিরাজ, “লিফটের ফুটেজটা আবার চালাও তো।”
“ইয়েস বস।”
এবার লিফটের ভেতরের দৃশ্য মনিটরে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। কালো-সাদা ছবিতে ফুটে উঠছে সংকীর্ণ লিফটের অভ্যন্তরীণ দৃশ্য। আলো স্নান, মাঝে মাঝে ফ্লিকও করছে। কিন্তু সুশান্তকে চিনতে অসুবিধে হয় না। তার দেহভঙ্গি প্রথম থেকেই অস্বাভাবিক! কাঁধ হেলে পড়েছে একদিকে, বুক ওঠানামা করছে দ্রুত, আর চোখ দুটো বারবার সজাগভাবে ক্যামেরার লেন্সের দিকে তাকাচ্ছে! যেন সে জানে, কেউ তাকে দেখছে। তার চোখে মুখের অপরিসীম আতঙ্কও নজর এড়াল না ওদের।
হঠাৎই সে এক ঝাঁকুনিতে এগিয়ে গিয়ে একসঙ্গে সব বোতাম টিপে দেয়। ফ্লোরবাটনের আলোগুলো সব একসঙ্গে জ্বলে উঠেছে। চোখ ধাঁধানো আলোর ভিড়ে তার ঘেমে ওঠা কপাল চকচক করে। আঙুলগুলো বোতামে লেগে থাকা অবস্থায় অদ্ভুতভাবে কাঁপছে।
লোকটা কিছুতেই বুঝি স্থির হয়ে দাঁড়াতে রাজি নয়। কখনও পিঠে ঠেস দিয়ে দাঁড়াচ্ছে। কখনও সোজা হয়ে। তার বুকের ওঠা-নামার তাল দ্রুত। হাসপাতালের ইউনিফর্ম ভিজে গিয়েছে ঘামে।
সবচেয়ে অদ্ভূত ব্যাপার, যে প্রতিটি ফ্লোরে দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে সে হালকা ঝুঁকে উঁকি দেয় বাইরের দিকে। অর্ধেক
বাঁকানো দেহ, কাঁপতে থাকা ঘাড়, আর শিরায় টান খাওয়া হাতগুলো পর্দায় বিকৃত ছায়া তৈরি করছে। বারবারই সে ঢাকায় লিফটের পেছনের দিকে। আতঙ্কে কুঁকড়ে ওঠে, আবার হঠাৎ এমনভাবে দাঁড়িয়ে যায় যেন অজানা কোনো ভয় তাড়া করছে।
শেষদিকে তার আচরণ আরও অস্থির। একবার সে হঠাৎ মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকায়। যেন সত্যিই কেউ লিফটে ঢুকে পড়েছে। লিফটের এককোণে নিজের দেহটাকে কুঁকড়ে বুঝি লুকোতে চাইছে। কিন্তু কোথাও কেউ নেই। একা একটা মানুষ, তার ভেজা শরীর, আতঙ্কিত চোখ, আর ফুটেজে কাঁপতে থাকা আবছা আলো। আর কিছু নেই!
“স্ট্রেঞ্জ।”
অধিরাজ এর কোনো মাথামুণ্ডু বুঝল না। হতাশায় কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, “কিচ্ছু বুঝতে পারছি না পবিত্র। সামথিং ইজ মিসিং! তুমি বরং বডিটাকে হসপিটালের অনুমতি নিয়ে ল্যাবে পাঠাও। আর মিস দত্তকে তলব করো।”
অর্ণব অবাক, “মিস দত্ত কেন?”
“সুহাসিনীকে এবার অনেক জবাব দিতে হবে,” সে আশঙ্কা ভরা স্বরে বলে, “রঞ্জন নায়েককেও তোলো। ও অনেক কিছু জানে। আর এরপর ওর খুন হওয়ার চান্স বেশি। রিস্ক নেওয়া ঠিক হবে না! টিমের সবাইকে ব্যুরোয় ডাকো। এক এক করে সাঁড়াশি জেরা করা দরকার। আমার মন বলছে প্রত্যেকে এরা ছুপা রুস্তম…!”
কথাটা শেষ করতে না-করতেই ওর ফোনের ডিসপ্লেতে ডঃ চ্যাটার্জির নম্বর ভেসে ওঠে। সঙ্গে সেতারের ঝঙ্কার। এই ফোনটার জন্য প্রায় তীর্থের কাকের মতো বসেছিল অধিরাজ। উত্তেজিত হয়ে বিদ্যুৎবেগে রিসিভ করল, “ইয়েস ডক!”
অন্যদিক দিয়ে ডঃ চ্যাটার্জির কন্ঠস্বর ভেসে আসে, “রাজা, সুজাতার ডেথটা মার্ডারই। যেমন বলেছিলাম তেমনই। বিশেষ পার্থক্য নেই। তবে মেয়েটার নখের ভেতরে কিছু চামড়া আর টিস্যু পেয়েছি। ওগুলোর এখনও কোনো ম্যাচ পাওয়া যায়নি। ফিঙ্গারপ্রিন্টের মালিকও অজানা। বাট, সুজাতার পোশাকে যে চুলটা ছিল, তার ডি এন এ ম্যাচ করেছে।”
“অ্যাট লাস্ট!” সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, “থ্যাংকস ফর দ্য গুড নিউজ। তিনি কে?”
ডঃ চ্যাটার্জি কয়েক সেকেন্ডের জন্য চুপ করে থাকলেন। বোধহয় একটু ইতস্তত করলেন। তারপর জানান, “আংশিক ডঃ সঞ্জয় বসুর সঙ্গে ম্যাচ করেছে ঠিকই, তবে স্যাম্পলটা সঞ্জয়ের নয়।”
“তবে কার?”
“ওর বায়োলজিকাল সন-এর। ওর ছেলেই এই চালের মালিক।”
“হো-য়া-ট।”
অধিরাজ এমন সম্ভাবনা আশাই করেনি। তার মাথার সজোরে বাজ পড়েছে। কোনোমতে বলল,
“ডঃ রণজয় বসু। বলেন কী!”
