ডঃ ডেথ – ১০

১০

এই মুহূর্তে জেনিথ হসপিটালের পরিবেশ একদম থমথমে। গোটা বিল্ডিঙে হঠাৎ করেই যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। সাধারণত যেখানে নার্সদের দ্রুত পায়ে ছুটোছুটি, স্ট্রেচারের কর্কশ শব্দ, ওয়ার্ডবয়দের ব্যস্ততা কিংবা ডাক্তারদের নাম ধরে এমার্জেন্সির অ্যানাউন্সমেন্ট শোনা যায় সেখানে এখন শুধুই চাপা গুঞ্জন আর শ্বাসরোধী নীরবতা।

আই সি ইউর দরজার সামনে মৃত পেশেন্টদের আত্মীয়রা দাঁড়িয়ে আছে। কারও মুখে আতঙ্ক, কারও চোখে অবিশ্বাস। তবে আশ্চর্যভাবে তেমন শোকপ্রকাশ নেই। একটা মানুষ আজীবনের জন্য কালের গর্ভে হারিয়ে গেল, আর কখনও ফিরে আসবে না। অথচ আত্মীয় পরিজনরা যেন একটু বেশিই সংযত! এতখানি সংযম সত্যিই একজন মৃত ব্যক্তির কাছের মানুষদের কাছ থেকে আশা করা যায় না। তাদের মধ্যে কেউ ফোনেই ব্যস্ত। কেউ শান্ত অথচ কৌতুহলী ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে। শুধু এক নারীর চোখেই অশ্রুর বাষ্প দেখতে পেল অধিরাজ। এছাড়া দুরন্ত শোকের প্রকাশ আর কোথাও নেই। সবাই যেন ব্যাপারটা মেনেই নিয়েছে।

তার চোখ অন্যদিকটা জরিপ করে। নার্সরা কাগজপত্র হাতে নিয়ে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে, কিন্তু চোখের ভাষায় স্পষ্ট সন্দেহ। তাদের নীরব অস্থিরতা, কপালের চিন্তার ভাঁজ, অপ্রস্তুতভাবে অফিসারদের সামনে থেকে সরে যাওয়া; সবকিছুই প্রমাণ দেয় যে মৃত্যুগুলো আদৌ স্বাভাবিক নয়। হওয়ার কথাই ছিল না। কিন্তু হয়েছে!

আই সি ইউর দরজা ঠেলে ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকার বাইরে বেরিয়ে এলেন। মুখে অস্বাভাবিক গাম্ভীর্য। তিনি পেশেন্ট পার্টিকে কিছু বলতেই যাচ্ছিলেন, কিন্তু অধিরাজকে দেখেই হঠাৎ থেমে গেছেন। ইন্টারোগেশনে বাকিদের ডাকা হলেও একমাত্র ইন্দ্ৰজিৎই ব্যতিক্রম যাঁকে ব্যুরোয় তলব করা হয়নি। কারণ ওঁর কাছ থেকে নতুন কিছু শোনার ছিল না অধিরাজের। বাকি ডাক্তাররা খুন করার জন্য হসপিটালে উপস্থিত ছিলেন না। শুধু ইন্দ্রজিৎ ছিলেন।

এই মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর শোনামাত্রই ইন্টারোগেশন স্থগিত রেখে গোটা হোমিসাইড টিমই ছুটে এসেছে এখানে। অফিসারদের সঙ্গে ফরেনসিক টিমও উপস্থিত। এই পরিস্থিতিতে হসপিটালের ডাক্তারদের আটকে রাখাও উচিত নয়। তাই অধিরাজ তাঁদেরও সঙ্গে নিয়ে চলে এসেছে। তবে ডঃ রণজয় বসু যেহেতু জেনিখের পার্ট নন, তাই তিনি এখনও ব্যুরোতেই আছেন। বাকিরা ফিরে এসেছে। দরকার পড়লে অসমাপ্ত ইন্টারোগেশন এখানেই সেরে নেবে। কিন্তু এর থেকেও বড়ো উদ্দেশ্য ওঁদের প্রতিক্রিয়া দেখা।

ডঃ চ্যাটার্জি নিজের বন্ধু, তথা ডঃ সঞ্জয় বসুকে দেখে প্রথমে সৌজন্যমূলক কথা বলতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ডঃ বসু ওঁর দিকে এমন অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন যে ফরেনসিক বিশারদ নীরবতাই অবলম্বন করেন। ভদ্রলোক নিজের বন্ধুকে দেখে শুধু একটা বাক্যই বললেন—

“অসীম, এখানে পার্সোনাল সম্পর্কের কোনো জায়গা নেই। এখন তুমিই আমার প্রতিদ্বন্দ্বী, আর তোমার কাজ আমায় প্রমাণসমেত কাঠগড়ায় তোলা। পারলে করে দেখাও।”

ডঃ চ্যাটার্জি বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন সঞ্জয়ের দিকে। ওঁর মধ্যে এত বছরের পরিচিত মানুষটার কোনো ছাপই নেই। এত পরিবর্তন কী করে সম্ভব? বয়েসের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চেহারা পালটায়। কিন্তু ব্যক্তিত্ব আর স্বভাব এতখানি পালটে যায় কী করে। অথচ এই সঞ্জয় বসুর স্বপক্ষেই তিনি অধিরাজকে বলেছিলেন যে এত নরম, মায়াময় আর সংবেদনশীল মনের মানুষ, সে কখনওই এমন কাজ করতে পারে না। অথচ কোথায় সেই মায়া-মমতা বা সংবেদনশীলতা? এই ডঃ বসুর সঙ্গে নিজের পরিচিত সঞ্জয়কে কিছুতেই মেলাতে পারছিলেন না ডঃ চ্যাটার্জি। ওঁর রীতিমতো সন্দেহ হচ্ছিল–এটা কী সত্যিই ডঃ সঞ্জয় বসু? না ওঁর মতো দেখতে মন্য কেউ!

প্রাথমিকভাবে শকড হলেও ডঃ চ্যাটার্জি নিজেও অত্যন্ত তে-এঁটে লোক। তিনি ডঃ বসুর কথার উত্তরে এবার গম্ভীর প্রাফেশনাল টোনে বললেন, “আই অ্যাম সরি ডঃ বসু। ইন দ্যাট কেস প্রোফেশনাল নিয়মগুলোও মানুন। হু ইজ ‘অসীম’ ইয়ার? আমাকে ‘তুমি’ করে বলার রাইটই বা আপনাকে কে দল? আই অ্যাম ডঃ চ্যাটার্জি, ফরেনসিক এক্সপার্ট। আর মামাকে ‘আপনি’ বলেই অ্যাড্রেস করবেন।”

ইটের বদলে পাটকেল নয়–আস্ত একখানা চীনের প্রাচীরই ছুড়ে মারলেন তিনি। তারপর থেকে আর একটি কথাও বলেননি সঞ্জয়ের সঙ্গে। বরং মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলেন নিষ্ঠুরভাবে। এখন এমন এড়িয়ে চলছেন, যেন ভদ্ৰলোক এক্সিস্টই করেন না।

ডঃ ইন্দ্রজিৎ সরকারকে দেখে এগিয়ে গেল অধিরাজ। ধীর ধরে বলল, “ডঃ সরকার! আপনি আই সি ইউ-তে কী করছেন? এখানে তো আপনার ডিউটি থাকার কথা নয়!”

ইন্দ্রজিৎ সরকার এই প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পেলেন না। বরং একটু ফ্যাকাশে হেসে একটিও কথা না বলে গটগটিয়ে চলে গেলেন। অর্থাৎ এই প্রশ্নের উত্তর তিনি দেবেন না।

“ইনি কে?”

পেছন থেকে ডঃ চ্যাটার্জির প্রশ্ন উড়ে আসে। সে বুঝিয়ে হলে, “উনি ডঃ বসুর অ্যানাস্থেসিস্ট। ডঃ বসুর ছায়াসঙ্গীও বলতে পারেন।”

“অ্যানাস্থেসিস্ট এখানে কী করছে?” তাঁর ভুরু কুঁচকে গয়েছে, “ওঁর কাজ তো ও.টি তে।”

অধিরাজের মনেও এই একই প্রশ্ন ঘাই মারছিল। সে বলে, ‘হয়তো এমনিই এসেছিলেন। ডঃ বসুর টিমের কেউ ছিলেন না বলে…।”

“এটা কী ময়দানের মাঠ যে এমনিই চিনেবাদামের ঠোঙা নয়ে বেড়াতে আসবে?” ডঃ চ্যাটার্জি এবার যেন একটু চটেই ললেন, “আমি যদি এখন তোমার অনুপস্থিতিতে তোমার কবিনের টেবিলে চড়ে বসে ঠ্যাং দোলাই, ভালো লাগবে সেটা?”

অধিরাজ ঘাড় কাত করে অপরূপ হেসে বলল, “প্রভু, আপনি নিজের কাজটাই বরং করুন, সেটাই বরং ভালো লাগবে। অলরেডি মিস অরোরার কৃতিত্বে একজন নেড়িমুক্তি সামা আমার টেবিলে দোলনায় চড়ে ঠ্যাং দোলাচ্ছেন। দ্বিতীয়টা না হলেও চলবে।”

নেড়িমুক্তি লামা বিশেষণটা বোধহয় পছন্দ হয়নি। যথারীতি রাগত স্বরে গরগর ঘঁচ টাইপের একটা শব্দ করে ডঃ চ্যাটার্জি আই সি ইউতে ঢুকে যান। নীরবে তাঁর পশ্চাদ্ধাবন করেছে দুই মিস ‘লি।’ হসপিটাল কর্তৃপক্ষ অবশ্য ডেডবডিদুটোকে মরচুয়ারিতে শিফট করতে চেয়েছিল। কিন্তু অধিরাজই বারণ করেছে। যেহেতু দুই পেশেন্টই আই সি ইউ-তে অস্বাভাবিকভাবে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন, সুতরাং ওটাই এখন ক্রাইমসিন। আর ডঃ চ্যাটার্জি একদমই পছন্দ করেন না যে ক্রাইমসিন থেকে কেউ বড়ি সরাক, বা তার গায়ে হাত দিক। ওতে এভিডেন্স ট্যাম্পার করার সুযোগ থাকে। আর এই কেসে তো তিনি বিন্দুমাত্রও সুযোগ নেবেন না।

“আপনারা আপাতত নিজেদের কেবিনে যেতে পারেন। কেসটাকে এখান থেকে আমাদের ফরেনসিক টিমই টেকওভার করবে। আমরা বডির পোস্টমর্টেম করাতে চাই। অবশ্য যদি আপনাদের আপত্তি না থাকে তবেই।”

ডঃ বসু সমেত গোটা টিমটাকেই উদ্দেশ্য করে বলল সে, “আমরা পরে যাদের সঙ্গে কথা হয়নি, তাদের একটু বিরক্ত করব।”

“যা খুশি করুন।”

প্রবল বিরক্তি প্রকাশ করে সঞ্জয় নিজের চেম্বারে চলে গেলেন। আই সি ইউতে ডিউটিতে থাকা একজন নাসই আত্রেয়ীকে এই দুই পেশেন্টের অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর প্রথমে দিয়েছিল। পরে সেটা অন্য একজন ডাক্তার কনফার্ম করেছিলেন। ওঁরা দু-জনেই আই সি ইউ-র বাইরে দাঁড়িয়ে পেশেন্টদের পরিজনদের সঙ্গে কথা বলছেন দেখে মিস দত্ত অধিরাজকে সে কথা জানায়।

“গ্রেট মিস দত্ত। লেটস গো।”

গোটা টিমই ওই দুই ব্যক্তির দিকে এগিয়ে গেল। সাদা কোটধারী ডাক্তারটি তখন পরিজনদের বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন যে ওঁদের স্বজনদের দেহ এখনই দেওয়া যাবে না। কারণ সম্ভবত এটা আনন্যাচারাল ডেথ। পুরো কেসটাই এখন সি আই ডি হোমিসাইড টেকওভার করেছে এবং তারা বড়ির পোস্টমর্টেম করাবে। কিন্তু পেশেন্টপার্টি সে কথা মানতেই রাজি নয়। তাদের পোস্টমর্টেমে প্রবল আপত্তি। একজন পুরুষ প্রায় গলার স্বর ফুলিয়ে চেঁচাচ্ছেন, “বললেই হল? আমার মা-কে আপনারা শাস্তিতে যেতেও দেবেন না? বয়েস প্রায় নাইন্টিসিক্স। হার্টের প্রবলেম ছিল। মারা যাওয়াটাই স্বাভাবিক। একটা মানুষ আর কতদিন বাঁচবে? আর আপনারা সেটাকেই আনন্যাচারাল ডেথের তকমা লাগিয়ে মায়ের শরীরটাকে কেটেকুটে একসা করতে চান?”

“দেখুন, ব্যাপারটা এখন আর আমাদের হাতে নেই, “ ডাক্তারবাবু ওঁদের শান্ত করার চেষ্টা করেন, “অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে পোস্টমর্টেম করাতেই হবে। এটাই নিয়ম।”

এবার পাশ থেকে এক মহিলা হেঁকে ওঠেন, “কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট কবে থেকে ‘অস্বাভাবিক’ হল? ছিয়ানব্বই বছরের বুড়ির হার্টফেল হতেই পারে। বয়েস তো কম নয়। আর আমার হাজব্যান্ড এইমাত্র বললেনও যে ওনার কার্ডিয়াক প্রবলেম আগে থেকেই ছিল। তাহলে এক্সপায়ার করাই তো নর্মাল। বেশ কিছুদিন ধরেই যথেষ্ট কষ্ট পাচ্ছিলেন। আপনারা ওনার সারা গায়ে নল ঢুকিয়ে আর ছুঁচ ফুটিয়ে তো যন্ত্রণার কিছু বাকি রাখেননি। এখনও তাকে পিসফুলি থাকতে দেবেন না। বড়ির ওপরও টর্চার চালাবেন!”

নিজের শাশুড়িকে ‘ছিয়ানব্বই বছরের বুড়ি’ বলে যে পুত্রবধূ তাঁর মৃত্যুকে জাস্টিফাই করতে চায়, সে আর যা-ই হোক শোকার্ত নয়! ছেলের চোখমুখ দেখেও মনে হল না যে বেজায় দুঃখ পেয়েছেন। বরং একটু আগেই এই দুই অবতারকে দেখেছে অধিরাজ। এই সুপুত্রটিই ফোনে এতক্ষণ ব্যস্ত ছিলেন। আর ওঁর জীবনসঙ্গিনীর চোখে রীতিমতো অবিশ্বাস দেখেছিল অধিরাজ। মৃত্যুসংবাদের প্রতি অবিশ্বাস নয়! মহিলা যেন ভাবছিলেন–বুড়ি এতদিনে গেল। ঠিক শুনছি তো!

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। গত তিনবছরে এম এম এন আই কার্ডিয়াক কেয়ারে, আর জেনিখে যে সব পেশেন্টদের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে তাদের সবারই হিস্ট্রি প্রায় এক। অনেকেই তাদের মধ্যে ‘ছেলে খেদানো মেয়ে তাড়ানো’ বৃদ্ধাশ্রমের প্রপার্টি ছিলেন। আবার অনেকেই এমন ছিলেন যারা স্রেফ নিজে…. টাকার জোরে মর্যাদা টিকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু বাইরের দত্ত বজায় থাকলেও অন্তরে শূন্যতা! সন্তানেরা তাঁদের খবর নেওয়ার প্রয়োজন বোধই করত না। অসুস্থ হয়ে পড়লে বড়োজোর একটা অ্যাম্বুলেন্সে চড়িয়ে নামীদামি নার্সিংহোম বা হসপিটালে পাঠিয়ে দিয়ে কর্তব্য সেরেছে। অথচ ভিজিটিং আওয়ারে বৃদ্ধ বৃদ্ধাকে দেখতে আসার কথা কারওর মনে পড়েনি। শুনতে খারাপ লাগলেও এই মর্মান্তিক কাহিনি গত কয়েকদিন ধরেই খবরি নেটওয়ার্ক বের করে এনেছে। ডাক্তাররা এসব কথা আলোচনা না করলেও সিস্টার বা ওয়ার্ডবয়রা এসব খবর খুব ভালোই রাখে। প্রকাশ্যে আলোচনাও করে। টাকা ফেললে খবরিদের সব ইতিহাস বলে ফ্রি-তে আফসোসও করে, “এসব হচ্ছে বেশি বয়েস অবধি বেঁচে থাকার জ্বালা। বুড়ো ভামদের এ-দুনিয়ায় কেউ সহ্য করতে পারে না।”

অথচ পোস্টমর্টেমের নাম শুনতেই এত দরদ উথলে পড়ার কারণটা কী? অধিরাজ তার দীর্ঘদেহটাকে টান-টান করে দুই মক্কেলের সামনে দাঁড়ায়, “আপনাদের প্রিয় মায়ের মৃত্যুটা যদি এতটাই ন্যাচারাল প্রসেস বলে মনে হয়, আর তাঁকে শান্তিতে যেতে দেওয়ার যদি এতই ইচ্ছে, তখন নিজের বাড়ির উষ্ণ বিছানায়, সমস্ত পরিজনদের মধ্যে, সবাইকে শেষবার ভালো করে দেখে নিয়ে শাস্তিতেই যেতে দিতেন। অন্তত তিনি তাঁর

কাছের মানুষগুলো চোখের জল দেখে যেতে পারতেন। ছেলের বা মেয়ের হাতের সেবা, অন্তিম জলটুকু পেতেন। আফটার অল, মরার আগেই তো দেখছি আপনারা ওঁর মৃত্যুটাকে মেনেই নিয়েছিলেন। তাহলে হসপিটালের আই সি ইউতে একা ফেলে যাওয়ার মানে কী? আপনারা জানেন না যে ডাক্তাররা পেশেন্টকে বাঁচানোর জন্য শেষ অবধি লড়েন, আর সেই প্রক্রিয়া যথেষ্ট আসুরিক? তবে এই অশান্তি দেওয়ার অর্থ কী? আর যদি মৃত্যুর আগে এতখানি অশান্তি সহ্য করতে পারেন তবে মৃত্যুর পরও পারবেন।” এবার তার কন্ঠস্বর কঠিন, “কিন্তু পোস্টমর্টেম ছাড়া বড়ি কিছুতেই পাবেন না। যদি বাধা দেন, তবে আমি বুঝে নেব যে ডেথটা যে ন্যাচারাল নয় তা আপনারা আমার থেকে বেটার জানেন।”

অধিরাজকে দেখামাত্রই পুত্র ও পুত্রবধূর মুখ মুহূর্তে ভয়ে বিবর্ণ হয়ে ওঠে। সেটাই স্বাভাবিক। মিডিয়ার দৌলতে এই লোকটি ওঁদের অচেনা নয়। এবং সে কী করতে পারে সেটাও জানা। তার বজ্রগম্ভীর শব্দ যে কথাগুলো উগরে দিল তারপর আর বলার কিছু থাকে না। তাই দুই মক্কেলেরই যেন জোঁকের মুখে নুন পড়ল।

যে ভদ্রমহিলার চোখ ছলছল করছিল তিনি শুধু বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, “আমার বাবার শরীরে কোনোদিন ছুরি কাঁচিটুকুও লাগেনি স্যার। এতটাই ফিট ছিলেন যে তিরাশি বছরেও কোনোরকম অপারেশন হয়নি। এইবার সামান্য হার্টের প্রবলেম হয়েছিল। ডঃ বসু বলেছিলেন যে ওষুধেই ঠিক হয়ে যাবে। শুধু রেগুলার মনিটরিং করার জন্য ওঁকে আই সি ইউতে শিফট করা হয়েছিল। আমরা ভাবতেও পারিনি যে…।”

এই প্রথম ওঁর চোখ বেয়ে অবাধ্য অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল। তিনি দৃঢ়স্বরে বলেন, “করুন স্যার। পোস্টমর্টেম করুন আপনারা। আমারও দৃঢ় বিশ্বাস, বাবা এভাবে যেতেই পারেন না। জেনিথের মিস্টিরিয়াস ডেথের খবর আমিও শুনেছি। যদি সত্যিই তাই হয় তবে আমি আমার বাবার জন্য সুবিচার চাই… করুন আপনারা পোস্টমর্টেম।”

ভদ্রমহিলার দিকে অপলকে তাকিয়েছিল অধিরাজ। এই কেসটা আপাতদৃষ্টিতে অন্যান্য কেসের মতো মনে হলেও একটা ক্রাইটেরিয়া তো মিলছে না। বাকিরা অবহেলিত ছিলেন। তাদের আত্মীয় পরিজনরা রেয়াত করেনি। কিন্তু এই ভদ্রমহিলাকে দেখে একটুও তা মনে হচ্ছে না। নিজের বাবার প্রতি যে ভালোবাসা আর যত্ন তাঁর ওইটুকু কথা আর কয়েক ফোঁটা চোখের জলেই প্রকাশ পেল তা তো বাকিদের প্রোফাইলের সঙ্গে বসছে না। তাছাড়া তারা এম এম এন আই আর জেনিখের প্রত্যেকটা কেস একেবারে খুঁটিয়ে দেখেছে। ডেখের ফ্রিকোয়েন্সি বাড়লেও প্রত্যেকবার একজনের বেশি কেউ মারা যাননি। তবে আজ একসঙ্গে দু-জন মারা গেলেন কী করে? ডঃ ডেথ তো তার প্যাটার্ন এতদিনের জন্য একবারও চে করেনি। একবারে একজনকেই সে মেরেছে। সিরিয়াল কিলাররা কখনওই নিজেদের প্যাটার্ন ভাঙে না। ওটা তাদের স্বভাবই নয়। তাহলে এবার একসঙ্গে দু-জন কেন?

সন্দেহে তার ভুরু কুঁচকে যায়। খটকা লাগছে। একটু বেশিই খটকা লাগছে। এমন তো হওয়ার কথা নয়।

পবিত্র আড়চোখে দেখল হসপিটালের নার্স আর লেডি ডাক্তাররা নিজেদের কাজে ব্যস্ত থাকলেও চোরাগোপ্তা দৃষ্টি মেরে মাঝেমধ্যে অধিরাজকে দেখে নিচ্ছে। এমনকি রিসেপশনিস্টও এখন ঠোঁটে আরও একটু এক্সট্রা লিপস্টিক চাপাতে ব্যস্ত। সে অর্ণবকে চাপাস্বরে বলল, “এই গ্রীকগডটা মাটি করবে দেখছি। ওকে গ্রীনভ্যালি কেসের অবতারে রাখলে অনেক মেয়ের দীর্ঘশ্বাস বেঁচে যেত। এরা সবাই অন ডিউটি। ওদিকে ছেলে দেখতেও ছাড়বে না।”

অর্ণবও ব্যাপারটা আগেই লক্ষ্য করেছে। সে মৃদু হাসল, “আপনার সামনে মেরিলিন মনরোর মতো অপূর্ব সুন্দরী কেউ এসে দাঁড়ালে কী আপনি একবারও তাকাতেন না? না যদি তাকে ইন্টারোগেট করতে হত তবে স্রেফ পায়ের দিকেই তাকাতেন?”

বাঘুটা খেয়ে পবিত্র চেপে গেল। শুধু বিড়বিড় করে বলল, “দাঁড়াও, তোমাকে দিয়ে তুমব্বাদের হস্তরকে খুব শীগগিরই ইন্টারোগেট করাচ্ছি। তখন আমিও দেখব যে তুমি কোনদিকে তাকাও।”

অর্ণব কথাই বাড়ায় না। হস্তরের থেকে সে হাজার হস্ত দূরে থাকাই পছন্দ করবে। অধিরাজ তখন ক্রন্দনরতা মহিলার দিকে তাকিয়ে খুব নরম স্বরে বলে, “আচ্ছা সেনোরা, আপনি বলছিলেন যে নেহাৎই রেগুলার মনিটরিঙের জন্য ডঃ বসু আপনার বাবাকে আই সি ইউ-তে ট্রান্সফার করেন। তার মানে কী ওঁর আদৌ আই সি ইউ-তে থাকার কথাই নয়?”

“না।”

তিনি হাত দিয়ে চোখ মুছছেন দেখে অধিরাজ নিশ্চুপে নিজের রুমাল এগিয়ে দিয়েছে। তিনি একটু ইতস্ততঃ করলেও শেষ পর্যন্ত রুমালটা নিয়ে উত্তর দেন, “বাবা তো এতদিন কেবিনেই ছিলেন। আই সি ইউতে দেওয়ার প্রশ্নই ছিল না। পরত হঠাৎই ডঃ বসু বলেন যে মনিটরিং-এর জন্য আই সি ইউতে রাখা প্রয়োজন। কারণ লাগাতার মনিটরিং, ইসিজি বা হস্টার করার মতো পরিষেবা সাধারণ কেবিন বা ওয়ার্ডে থাকে না। ওটা একমাত্র আই সি ইউ-তেই সম্ভব। তাই পরশুই ওঁকে তাড়াহুড়ো করে আই সি ইউ-তে শিফট করা হয়। ইনফ্যাক্ট ওখানেও বেড খালি ছিল না। নেহাৎই একজনকে জেনারেল বেড়ে সরিয়ে দেওয়ার ফলে বাবাকে বেড প্রোভাইড করতে পেরেছিলেন ওঁরা।”

“স্ট্রে-ঞ্জ!”

লজটা আকস্মিকভাবেই তার ঠোঁট থেকে খসে পড়ল। সে এবার মিস দত্তের দিকে তাকিয়েছে, “মিস দত্ত, আসুন তো। ওই ডাক্তারবাবু আর সিস্টারের সঙ্গে একটু কথা বলে নেওয়া যাক।”

“ইয়েস স্যার।”

ডাক্তারবাবু ও সিস্টারটি এতক্ষণ পেশেন্ট পার্টিকে বোঝাতে গিয়ে নাকানি চোবানি খাচ্ছিলেন। অধিরাজের হস্তক্ষেপে বেচারিদের ধড়ে প্রাণ এসেছিল। নয়তো পেশেন্ট পার্টির হাতে হসপিটালকর্মী বা ডাক্তারদের ধোলাই খাওয়ার ঘটনা আজকাল বিরল নয়। তাঁরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে একপাশে চুপ করে দাঁড়িয়েছিলেন। অধিরাজ তার টিম নিয়ে ওঁদের দিকেই এগোল। তাঁর চোখে অদ্ভুত একটা ঘোর। সে আস্তে আস্তে ডাক্তারবাবুকে প্রশ্ন করে, “আপনাদের সান্দহ হল কী করে যে এ দুটোই আনন্যাচারাল ডেথ?”

ডাক্তারবাবু উত্তর দেওয়ার আগেই ____ স্টারসাহিবা প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়েন, “স্যার, আমরা এতদিন ধরে কাজ করছি। আমার তো আই সি ইউ-তেই ডিউটি থাকে। ওখানে অবশ্য ডঃ বসুর পেশেন্টদের জন্য স্পেশালি মলয়াদি থাকেন। উনিই আমাদের লিড করেন। রাতদিন ধরে গাদা গাদা সিরিয়াস পেশেন্ট নিয়ে ঘর করছি। কে এক্সপায়ার করতে পারে, কে পারে না–মোটামুটি ধারণাও আছে। যে ছিয়ানব্বই বছরের পেশেন্টটি মারা গিয়েছেন, তিনি সিরিয়াস ছিলেন। কিন্তু অত বয়সেও ওঁর ইমিউনিটি সিস্টেম এত সলিড যে ভীষণ দ্রুত রিকভারি করছিলেন। ইনফ্যাক্ট ডঃ বসুও ওঁকে সুপারওম্যান বলে ডাকতেন। ভাবতে পারেন, ওই নব্বইয়ের ওপর বয়েস নিয়ে উনি দু দু-বার করোনার ফ্যাটাল অ্যাটাক সার্ভাইভ করেছিলেন। যেখানে ইয়াং ইয়াং পেশেন্টদের আমরা কিলোদরে এক্সপায়ার করতে দেখেছি সেখানে উনি দু-বার করোনার গুষ্টির তুষ্টি করে আস্ত বেরিয়ে গিয়েছিলেন। এবারও প্রথম দিকে সিরিয়াস অবস্থা হলেও লাস্ট চারদিনে তো রীতিমতো উঠে গাঁটি হয়ে বসেছিলেন। ডঃ বসু পর্যন্ত পেছনে একবার বলেছিলেন, ওঁকে নাকি স্বয়ং যমরাজও ভয় পান। তাই ধারে কাছেও ঘেঁষতে চাইছেন না।”

“যমরাজ ভয় পান কী না সেটা পরের বিষয়। কিন্তু আপনারা ভয় পেতেন কী?”

এবার কর্তব্যরত ডাক্তারবাবু মুখ খুললেন, “স্যার, ওঁকে তো কঠিন কঠিন রোগও ভয় পেত। আমরা তো তুচ্ছ মানুষ। যতদিন ভেন্টিলেটরে ছিলেন, ততদিন শান্তি ছিল। যেই সব ঠিক হয়ে এল, নল খুলে গেল, লাইফ সাপোর্টিং সিস্টেম সব সরে গেল অমনি তাঁর ধমক আর মেজাজের ঠ্যালায় ডাক্তার, সিস্টার আর ওয়ার্ডবয়রা কে কোন্ দিকে পালাবে বুঝতে পারছিল না। রাইস টিউবের বদলে যেই নর্মালি খাবার খেতে শুরু করলেন অমনি হসপিটালের আই সি ইউ-র মেনুর ওপর চটে লাল! কেন এখানে ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে পুঁইশাক বা মৌরলা মাছের ঝালচচ্চড়ি পাওয়া যায় না তা নিয়ে ভয়াবহ অসন্তোষ। শি ওয়াজ নট আ পেশেন্ট-অ্যান ওল্ড পাইরেট ইনডিড। আমরা আজকেই ওঁকে জেনারেল ওয়ার্ডে শিফট করে দিতাম। কিন্তু লাস্ট ফাইভ মিনিটস যে কী হল–কিছুই বুঝলাম না! তার আগেও উনি লাফঝাঁপ দিয়ে শেষে একটু বিশ্রাম করছিলেন। তাই ওদিকে অত খেয়াল করিনি। আচমকাই ইসিজি মেশিন আওয়াজ না করলে কিছু টেরই পেতাম না। তখন গিয়ে দেখি মনিটরে একদম ফ্ল্যাট লাইন দেখাচ্ছে। পেশেন্ট কোলাপ্স্ করছে। আমরা সি পি আর, অক্সিজেন সাপোর্ট, ডি-ফিব্রিলেশন–সব অ্যাপ্লাই করে দেখেছি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। যখন উনি কোলান্স করছিলেন তখন সেভেন্টিন বি এর ভদ্রলোকেরও সেম সিচুয়েশন। জাস্ট দু-তিন মিনিটের ডিফারেন্স। সেভেন্টিন ডি এর ভদ্রমহিলার যেটুকু সমস্যা ছিল, সেভেন্টিন বি এর জেন্টলম্যানটির তো তাও ছিল না। ওঁর এখানে থাকারই কথা নয়। জাস্ট আটচল্লিশ ঘণ্টার একটা থরো মনিটরিং আর অবজার্ভেশন দরকার ছিল, তাই এসেছিলেন। একঘণ্টা আগেও সিস্টারদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন। তারপর হঠাৎ কী হল কে জানে। উনিও আচমকাই কোলাদ করলেন। দুটো ইনসিডেন্টের মধ্যে টাইম ডিফারেন্স ম্যাক্সিমাম তিন মিনিট। আমরা কোনদিকে দৌড়োব বুঝতে পারছিলাম না। তবু যতরকমভাবে সম্ভব রিভাইভ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না।”

চোখের চশমাটা খুলে নিয়ে আফসোসে মাথা নাড়লেন তিনি, “এ দুটো কোনোমতেই নর্মাল ডেথ নয় স্যার। হতেই পারে না।”

“ভদ্রমহিলা ছিলেন সেভেন্টিন ডি-তে। আর ভদ্রলোক সেভেন্টিন বি-তে। তাই তো?”

“হ্যাঁ, তবে…”

সিস্টার কিছু একটা বলতে গিয়েও ইতস্তত করছেন। অধিরাজ জানতে চায়, “তবে?”

“আসলে দু-জনের বেড নম্বর উলটো ছিল। ওই দজ্জাল মহিলার জন্যই প্রথমে সেভেন্টিন বি অ্যালট করা হয়েছিল।” তিনি জানালেন, “যতদিন আনকনশাস ছিলেন, ততদিন সেভেন্টিন বি-তেই ছিলেন। কিন্তু যেই একটু জ্ঞান এল, অমনি হাঁউমাউ শুরু করলেন যে মাথার ওপর চিলড এসি ডাক্ট থেকে ওঁর গায়ে ভয়ংকর ঠান্ডা হাওয়া লাগছে। তারপর হু হু করে এমন কাঁপতে শুরু করলেন যেন এখনই কার্গিলের মাইনাস ডিগ্রি টেম্পারেচারে জমে যাবেন। আই সি ইউ-তে এসি থাকবে না তো কী ফার্নেস থাকবে স্যার? সেভেন্টিন ডি-এর ওপরে ডাইরেক্ট কোনো ডাক্ট ছিল না। তাই ওখানে যে দাদু রিসেন্ট এসেছিলেন, তিনি বিপদ দেখে নিজেই বেড পালটে নেওয়ার কথা বলেন। উনি নিজেই চলে এলেন সেভেন্টিন বি-তে। আর মহিলাকে আমরাই সেভেন্টিন ডি-তে পাঠালাম। নয়তো উনি ইলিশের বদলে আমাদেরই মাথার চচ্চড়ি বানিয়ে দিচ্ছিলেন।”

“বেড পালটে গিয়েছিল।”

অধিরাজের মুখে স্পষ্ট সন্দেহের রেখা, “কী বললেন যেন? সেভেন্টিন ডি এর দাদু? আপনি ওঁকে দাদু বলে ডাকতেন?”

“আমি একা নই।” তিনি জানালেন, “যত সিস্টার ওঁকে দেখত, সবাই দাদু বলেই ডাকত। এমনকি মলয়াদিও দাদুই বলতেন। উনি আমাদের সবার সঙ্গে গল্প করতেন। এমনকী ইয়ার্কি, ফাজলামিও চলত। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘ও দাদু, হার্টে জোর এলে এরপর কী করবে?’ দাদু বললেন, ‘নাতনি, ভাবছি এরপর নাচ প্র্যাকটিস করব।’ হেবি মজার মানুষ ছিলেন।”

অধিরাজের ওষ্ঠাধর বেয়ে এবার অদ্ভুত অথচ আশ্চর্য সংশয়পূর্ণ কিছু বাক্য আত্মমগ্ন স্বরে বেরিয়ে এল, “ বেড নম্বর পালটে গিয়েছিল… সবাই ভদ্রলোককে দাদু বলত… মজার মানুষ… মেয়ের প্রিয়…! … মিলছে না … মিলছে না….!”

বলতে বলতেই সে স্খলিত স্বরে বলে, “মা-ই গ-ড। মিসটেকেন আইডেন্টিটি নয়তো!”

মিসটেকেন আইডেন্টিটি। সেটা এর মধ্যে এল কোথা থেকে। অর্ণব সে বিষয়ে প্রশ্ন করতেই যাচ্ছিল, তার আগেই : আই সি ইউ থেকে বেরিয়ে এলেন ডঃ চ্যাটার্জি। পেছন পেছন যথারীতি দুই অ্যাসিস্ট্যান্ট। তিনি হেঁড়ে গলায় বললেন, “এখানেও যা তা শুরু করেছ? আই সি ইউ-তে পর্যন্ত তোমার ফ্যানগার্লরা তোমার নম্বর চাইছে। স্পয়েল করারও একটা লিমিট থাকে রাজা!”

“হে ঈশ্বর।” অধিরাজ আকাশ থেকে পড়ল, “আমি আবার কী করলাম।”

“কী করতে বাকি রেখেছ একটু বলবে?”

ডঃ চ্যাটার্জি খেপে বোম, “একেই তোমার এই হলিউডকে টেক্কা দেওয়া বদন নিয়ে সবাইকে কমপ্লেক্স দিয়ে বেড়াচ্ছ। তার ওপর গোটা হসপিটাল সুজাতা রায়ের কাছ থেকে তোমার সে রাতের শিভ্যালরির গল্প শুনেছে। তুমি বরং এখন থেকে নাইট পেট্রোলিং শুরু করে দাও। কারণ আমার ধারণা এখন এরা সবাই তোমার ফোন নম্বর জোগাড় করে নাইট ডিউটি দিতে আসার সময় শহরের সমস্ত মাতাল ক্যাব ড্রাইভারদেরই বেছে বেছে ‘আয় আয়’করে ডাকবে আর তারপর তোমাকেই রেস্কিউ করতে বলবে।” বলতে বলতেই তিনি ভয়াবহ ভ্রূকুটি করেছেন, “তারযন্ত্র তো বাজাতে পারো। এবার বাঁশিটাও কিনে ফেলো। কয়েকদিন বাদে কাজে লাগবে। যত্তসব।”

অর্ণব একবার আহেলির মুখের দিকে তাকিয়েই কোন দিকে পালাবে ভেবে পাচ্ছিল না। এখন মিস মুখার্জিকে অবিকল ‘হস্তরের’ মতোই দেখাচ্ছে। আই সি ইউ-র ভেতরে কী ঘটেছে কে জানে। কিন্তু বাইরের সিস্টারটি কথা বলার সময় উত্তেজনায় অধিরাজের একটু বেশিই কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল। এই নৈকট্য দেখেই ‘দাদি’র ঘুম ভেঙে গিয়েছে। গরগর করতে করতে চাপা স্বরে বলল, “কোলে নিয়ে ইন-টারোগেশন করলে চলত না সেনোরিটাকে?”

“নিশ্চয়ই চলত।” উত্তরে আরও চাপা এবং ঝাঁঝালো বাক্য উড়ে গিয়েছে, “কারণ ওঁর পারফিউমটা আপনারটার থেকে অনেক বেটার। অন্তত নাক জ্বালা করে না, অ্যালার্জিও দেয় না। থ্যাংকস ফর দ্য অ্যাডভাইস। নেক্সট টাইম ট্রাই করব।” আহেলি নাকের পাটা ফুলিয়ে অন্যদিকে তাকায়। অধিরাজ তাকে একটুও পাত্তা না দিয়ে ডঃ চ্যাটার্জিকে জিজ্ঞেস করে, “বডিদুটোয় কিছু পাওয়া গেল?”

“নো ফিঙ্গারপ্রিন্টস অফকোর্স। কারণ আই সি ইউ-তে সবাই মাস্ক, গ্লাভস পরেই ঘোরে। তবে হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর, মৃত্যু কার্ডিয়াক অ্যারেস্টেই হয়েছে। এবং সেটা ন্যাচারাল নয়।” তিনি থেমে বললেন, “থ্যাংকস টু গড যে এবার আমরা একদম তাজা আই ভি ড্রিপের স্যাম্পলই পেয়েছি। আর মৃতদের হাতের চ্যানেল থেকে এখনও বিউপিভিকেইনের হালকা কিন্তু সুইট স্মেল আর লিডোকেইন হাইড্রোক্লোরাইডের মারাত্মক অডরটা আসছে। আর কিছু বলার দরকার আছে?”

অধিরাজ মাথা নাড়ে, “না। বাকিটা ল্যাবে গিয়েই না হয় শুনব।”

“বেটার—কারণ আরও কিছু তথ্য হয়তো দিতে পারব।” বলতে বলতেই গটগট করে চলে গেলেন তিনি ও তাঁর টিম। ব্যস্তসমস্ত হয়ে ওয়ার্ডবয়রাও দুটি নিথর দেহ নিয়ে ওঁদের পেছনেই ছুটল। দুটো বড়িকেই ল্যাবে নিয়ে যাওয়া হবে।

“অফিসার…।”

অর্ণব ফের আগের প্রশ্নটাই করতে যাচ্ছিল অধিরাজকে। তার আগেই একটা উত্তেজিত কন্ঠস্বর পেছন থেকে ভেসে আসে। অফিসাররা ফিরে তাকাতেই দেখল প্রৌঢ়া সিস্টার মলয়া চৌধুরী প্রায় দৌড়তে দৌড়তেই এদিকে আসছেন। তার সঙ্গে আর একজন তরুণী নার্স! উত্তেজিত কন্ঠস্বরে বললেন, “অফিসার ব্যানার্জি।”

“তুমি তো এখনও বাঁশি কেনোনি মামা!” পবিত্ৰ হতবাক, “তাহলে বিরহিনী রাধা দৌড়চ্ছেন কেন?”

অধিরাজ হাত তুলে তাকে থামিয়ে দেয়। মলয়া চৌধুরীর ছুটে আসা এবং তার উত্তেজনা মোটেই সুবিধার ঠেকছে না। ওর বুকের ভেতর ধ্বক করে ওঠে, হল কী!

“আপনাকে কিছু দেখানোর ছিল স্যার।”

মলয়া এই বয়েসে যে স্পিডে দৌড়ে এলেন তা অবিশ্বাস্য। উত্তেজনায় এখনও তিনি কাঁপছেন! সারা দেহ ঘর্মাক্ত। শরীর ও মুখের পেশিগুলোও কম্পমান। চোখমুখ টকটকে লাল। একটা কাগজ এগিয়ে দিয়ে কোনোমতে বললেন, “পড়ুন।”

অধিরাজ হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিয়ে নেয়। এই হসপিটালেরই নামাঙ্কিত কাগজ। যেগুলোতে প্রেসক্রিপশন লেখা হয়। তেমনই একটা কাগজে শুদ্ধ বাংলা অক্ষরের টাইপে লেখা আছে একটা চিঠি!

প্রিয় বন্ধু,

একটা বাস্তব কিন্তু অপ্রিয় কথা বলি। এ অপ্রিয় সত্য তুমি নিজেও নিজের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছ। তবু আবার একবার মনে করিয়ে দিই।

একটা বয়স পেরিয়ে গেলে মানুষ আর সত্যিই বাঁচে না; সে শুধু বেঁচে থাকার দায়ভার টেনে নিয়ে চলে। দেহ তখন খাঁচা হয়ে যায়, শ্বাস নিতে নিতে মনে হয় যন্ত্রণা গিলে খাচ্ছে প্রতিদিন। ওষুধ, ইঞ্জেকশন, অক্সিজেন—এসব হয়ে ওঠে আসুরিক শিকল, যা মানুষকে মুক্তি দেয় না, বরং তার বাঁচাকে কষ্টকর করে তোলে। তখন সেই মানুষটি শুধু কাঁদে না, কান্নার সুর ছড়িয়ে পড়ে তার পরিবারেও। প্রতিটি দিন, প্রতিটি রাত, একেকটা বিল, একেকটা টেস্ট রিপোর্ট, একেকটা মেডিসিনের খরচ; সেই পরিবারের আনন্দকে শেষ করে দেয়, হাসিকে নিভিয়ে দেয়। একটা মরণাপন্ন শরীরকে ধরে রাখতে গিয়ে গোটা সংসার ভেঙে পড়ে ধুলোয়। অজান্তেই খুন হয়ে যায় আরও অনেক মানুষ।

তাহলে মৃত্যুই কী সবচেয়ে বড়ো মুক্তির উপায় নয়? যে মানুষ আর আলো খুঁজে পায় না, তাকে মুক্তি দেওয়া মানে তাকে যন্ত্রণার হাত থেকে সরিয়ে আনা। যে পরিবার ক্লান্ত, নিঃস্ব, হতাশ, তাদের মুক্তি দেওয়া মানে তাদের জীবনকে আবার শ্বাস নেওয়ার জায়গা দেওয়া। মৃত্যু তখন অন্ধকার নয়, মৃত্যু তখন আলো; যে আলোতে মানুষ আবার শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ে, পরিবার আবার নিঃশ্বাস নিতে পারে। এমন মৃত্যু-ই তখন আশীর্বাদ, এমন মুক্তিই তখন সবচেয়ে বড়ো মানবিকতা।

তাই আমার মনে হয়, এই কাজটা তোমার করা উচিত। কারণ এই সত্য তোমার থেকে ভালো আর কে জানে। তুমিও তো সর্বস্ব হারিয়েছিলে। এই জ্বলন্ত চিতায় তুমিও পুড়ে ছাই হয়েছ। তাই না?

তাই আমার সঙ্গে যদি একমত হও, তবে হসপিটালের বাইরের ডাস্টবিন থেকে একটা কালো ব্যাগ তুলে নিও। সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ সম্ভব নয়। কিন্তু তোমার টাকার দরকার। আর ক্যাশে পাঁচ লাখ টাকা কম নয়। ওর সঙ্গে একটা ভায়ালও পাবে। বিশেষ কিছু করতে হবে না। শুধু ওই ভায়াল থেকে কিছুটা মেডিসিন আই সি ইউ-র সেভেন্টিন বি-এর পেশেন্টের আই ভিতে মিলিয়ে দিও। বিশ্বাস করো, ওঁর এবং ওঁর পরিবারের জন্য ওটাই সঠিক ওষুধ।

আর চিঠিটা পড়ার পরে ছিঁড়ে ফেলে দিও।

—সবার শুভাকাঙ্ক্ষী।

.

“ এর মানে কী!”

অধিরাজের মাথায় বিনা মেঘে বজ্রপাত হয়। সে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে মলয়ার কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে উত্তেজিত স্বরে বলে, “এটা কোথায় পেলেন? কে দিয়েছে?”

মলয়ার মাথা নত হয়ে যায়। আস্তে আস্তে বললেন, “পরশু সকালে আমিও এটা পেয়েছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি কিছু করিনি। ইনফ্যাক্ট ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে দিয়েছিলাম ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে। ভেবেছিলাম যে আমি ছাড়া এ-চিঠি কেউ পায়নি। কিন্তু…।”

তিনি পেছনের ভয়ে কাঁপতে থাকা নার্সটিকে দেখিয়ে বললেন, “ও আমাকে এইমাত্র বলল যে এই চিঠিটার আর একটা কপি ও-ও একইদিনে পেয়েছিল…।”

“আপনি….!”

নার্সটি ভয়ে প্রায় কেঁদেই ফেলল, “আমিও কিছু করিনি স্যার। আমি কিচ্ছু জানি না। চিঠিটা নিয়ে কী করব বুঝতে পারিনি। তাছাড়া আই সি ইউ-তে আমার এ ক-দিন ডিউটিও ছিল না….।”

মলয়া তাকে করোবরেট করেন, “ও সত্যি কথাই বলছে অফিসার। ওর নিজেরই ভাইরাল হয়েছিল ক-দিন আগে। তাই আমিই ওকে আই সি ইউ-তে ঢুকতে বারণ করি। আর যদি ও কিছু করত তবে এই চিঠিটা আমায় দিত না। নিজের কাছেও রাখত না। ও কালকেই আমায় বলতে চেয়েছিল। কিন্তু তার আগেই আমাদের সবাইকে আপনারা ব্যুরোতে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাই সুযোগ পায়নি। আর আমিও কাল আপনাদের সঙ্গেই ছিলাম। সো…!”

“আন্ডারস্টুড।”

সে মাথা নাড়ে, “আপনিও কিছু করতে পারেন না কারণ স্পটে উপস্থিত ছিলেন না। গোটা ব্যুরো তার সাক্ষী। কিন্তু তবে করল কে? এই চিঠি যদি আপনাদের দু-জনের কাছে এসে পৌঁছোতে পারে, তবে তো গোটা হসপিটালের কর্মীদের কাছেও পৌঁছতে পারে।”

“না স্যার” মলয়া বিষণ্ণভাবে মাথা নাড়েন, “সবার কাছে যাবে না। কারণ সবাই আমাদের মতো কপালপোড়া নয়।”

“মানে?”

কথাটা বলেই অধিরাজের চোখ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে। তার মস্তিষ্কে বিদ্যুৎ ঝলসে ওঠে। মানেটা সে বুঝেছে। বুঝেছে এই চিঠির অন্তর্নিহিত অর্থও। ‘তুমিও তো সর্বস্ব হারিয়েছিলে। এই জ্বলন্ত চিতায় তুমিও পুড়ে ছাই হয়েছ।’ অদ্ভূত বাক্য। কিন্তু একটা মানুষের মনস্তত্ত্বকে প্রভাবিত করার মোক্ষম দাওয়াই। খুনী পুরোপুরি একটা মেন্টাল ও ইমোশনাল গেম খেলেছে যেটা অব্যর্থ।

“আপনাদের দু-জনের কোনো পাস্ট হিস্ট্রি আছে? যা আমার জানা উচিত?”

অধিরাজের কন্ঠ শাণিত। জলভরা চোখে মাথা নাড়লেন মলয়া,

“হ্যাঁ। আমার বাবা ক্যান্সার পেশেন্ট ছিলেন। তাঁর ট্রিটমেন্ট করাতে গিয়ে আমরা সর্বস্বান্ত হই।” তাঁর গলা কাঁপছে, “বাবা পিওনের চাকরি করতেন। নুন আনতেই পান্তা ফুরোত। তবু দেশের জমি, বাড়ি, মায়ের গয়না সব বিক্রি করে, এদিক ওদিক থেকে, প্রতিবেশি আর আত্মীয়দের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে চেষ্টা করেছিলাম ওঁকে বাচানোর। কিন্তু তিন বছরের বেশি বাঁচাতে পারিনি….”

বলতে বলতেই ফের মাথা হেঁট করেছেন তিনি, “আমরা রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছিলাম। তখনও চাকরিতে ঢুকিনি। না খাওয়ার সংস্থান ছিল, না মাথার ওপর ছাত। তার ওপর রোজ পাওনাদারদের তাগাদা। মা সহ্য করতে না-পেরে একদিন ট্রেনলাইনে…”

কথাটা আর শেষ করতে পারলেন না মলয়া। এত বছর পরেও সেই ব্যথার উপশম হয়নি। উচ্ছ্বসিত কান্নাকে চেপে রাখার চেষ্টা করার ফলে ওঁর দেহটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। তবু ভাঙা গলায় বললেন, “এই পোড়াকপালির ইতিহাসও তাই। ওর স্বামীর লাংস ক্যান্সারের ট্রিটমেন্ট করতে গিয়ে পথের ভিখিরি হয়ে গিয়েছিল। এই চাকরিটা যদি না পেত তবে ও না খেতে পেয়েই মরে যেত…!”

অধিরাজের চোখে সমবেদনা। কিন্তু কপালে চিন্তার ভাঁজ। সে অপরাধীর টার্গেটদের প্যাটার্ন বুঝেছে।

“আর কেউ আছে যে এই চিঠি পেতে পারে? যার অতীত আপনাদের মতনই?”

মলয়ার চোখ যেন জ্বলে ওঠে, “হ্যাঁ। আর একজন আছে। ওয়ার্ডবয় রতন। ওর বাচ্চা মেয়েটার দুটো কিডনিই ফেইল করেছিল। বারবার ডায়ালিসিস করার পরও মেয়েটা ক্রমাগতই মৃত্যুর দিকে যাচ্ছিল। আল্টিমেট রাস্তা ছিল কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেশন। রতন সর্বস্বান্ত হয়ে সেটাও করায়। কিন্তু মেয়েটার ক্লান্ত শরীর নতুন কিডনিকে অ্যাক্সেপ্ট করেনি। অপারেশনের ধকলও নিতে পারেনি। মেয়ে মারা যাওয়ার দু-দিন পর ওর বউও বিষ খেয়ে সব জ্বালা জুড়িয়েছিল।”

এতক্ষণ উপস্থিত আই সি ইউ-র সিস্টার ও ডাক্তার রুদ্ধশ্বাসে সব শুনছিলেন। এবার ডাক্তারবাবু বললেন, “রতনকে কিন্তু আজ সকাল থেকেই বেশ কয়েকবার আমি আই সি ইউ-তে দেখেছি…!”

“এই রতন এখন কোথায়? হসপিটালেই আছে? না…”

বুলেটের গতিতে প্রশ্ন এল। তার পেছনের আশঙ্কা ও উত্তেজনা প্রকট।

“হসপিটালেই আছে স্যার।” এবার মলয়ার সঙ্গী নার্সটি জানায়, “ও জাস্ট দু-মিনিট আগেই মরচুয়ারির দিকেই গেল…..”

আর কিছু বলার আগেই একটা প্রবল বিস্ফোরণের আওয়াজে উপস্থিত সবার কানের পর্দা যেন ফেটে যায়। পায়ের তলার মার্বেলের মেঝে কেঁপে ওঠে! যেন এইমাত্র কোথাও কোনো বাজ পড়েছে। অথবা বম্ব!

ওরা নিজেদের সামলে নেওয়ার আগেই ফায়ার অ্যালার্মের পরিত্রাহি চিৎকার গোটা হসপিটালের নীরবতাকে ফালা ফালা করে দিল। তার সঙ্গে আতঙ্কিত মানুষের কোলাহল, “আগুন। আ—গু—ন!”

“তিনতলায় আগুন লেগেছে স্যার….!”

সিসিটিভি রুম থেকে একজন সিকিউরিটি কর্মী প্রায় দৌড়তে দৌড়তে এসেই ভয়াবহ দুঃসংবাদটা দেয়। হাঁফাতে হাফাতে বলল, “মরচুয়ারির দরজা দিয়ে কালো ধোঁয়া বেরোচ্ছে। আগুন বোধহয় ওখানেই…”

আর রতনও এই মুহূর্তে হয়তো মরচুয়ারিতেই। অধিরাজের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। সে শুধু বলল, “বা-স্টা-ৰ্ড!”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *