৯-১০. পুরানাকোট বেড়িয়ে এসে

পুরানাকোট বেড়িয়ে এসে যথাস্থানে অপেক্ষা করছিল বিভূতির জিপ। তারপর বাঘমুন্ডা ঘুরে ফিরতে ফিরতে দুপুর হয়ে গেল। তিন পাহাড়ে ঘেরা গহন জঙ্গল দেখে সকলেই খুশি। কিন্তু বেলা এতই গড়িয়েছে, খিদেয় সকলের পেট চুঁইচুঁই। ভাগ্যিস পার্থ বুদ্ধি করে একছড়া কলা নিয়েছিল সঙ্গে। তাই খেয়ে কোনওক্রমে পিত্তরক্ষা হয়েছিল। ফিরে বাংলোর হাতায় গাড়ি রেখে বিভূতি চললেন রান্না বসাতে। ঘি সহযোগে ডিমসেদ্ধ, আলুসেদ্ধ, ভাত আজ দুপুরের মেনু। 

গাড়ির আওয়াজ পেয়েই বিট অফিসার এসে উপস্থিত। সকালের শুকনো ভাবটা আর নেই। খুশি খুশি মুখে পূর্ণচন্দ্র জানালেন, আমাদের রেঞ্জ অফিসার এসেছিলেন ম্যাডাম। চাকরিটা আমার বেঁচে গেল। সব দেখেশুনে তিনি আমায় ক্লিনচিট দিয়েছেন।

টুপুরকে অবাক করে মিতিনও হাসল, বাহ বাহ, এ তো সত্যিই গুড নিউজ। ঘড়িয়াল দুটো তা হলে নদীতেই চলে গিয়েছে?

হ্যাঁ ম্যাডাম। স্যারেরও তাই মত। তবে খাঁচা খালি থাকবে না। কপিলাসেও আমাদের ঘড়িয়াল প্রকল্প আছে। ওখান থেকে দু-তিনটে ছানা ঘড়িয়াল আনাবেন কয়েকদিনের মধ্যেই।

খুব ভাল, খুব ভাল। এবার আপনাকে একটা সুসংবাদ দিই? বাঘমুন্ডার চৌকিদার চক্রধর বলল, ওর সঙ্গে নাকি কাল দেখা হয়েছিল রাজুর, আঙুলে। রাজু তো আঙুলের কাছেই কোনও একটা গ্রামে থাকে, তাই না?

হ্যাঁ, ডাঙ্গরিতে, পূর্ণচন্দ্রর কপালে পলকা ভাঁজ, চক্ৰধরের সঙ্গে কোনও কথা হয়েছে রাজুর? মানে কবে সে ফিরছে?

সেই খবরই তো দিচ্ছি। রাজুর নাকি বাড়ির কাজ মিটে গিয়েছে। আগামীকালই চলে আসবে, মিতিনের হাসি চওড়া হল, এটাও তো সুসমাচার, নয় কি? সুবাহু আর প্রোফেসরসাহেবের আর খাওয়াদাওয়ার অসুবিধে থাকবে না। আপনারও ঘড়িয়ালদের দেখভাল করার ঝক্কি থেকে মুক্তি।

নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই, ফের মুখে উচ্ছ্বাস ফিরেছে পূর্ণচন্দ্রর। মিতিনকে জিজ্ঞেস করলেন, তা আপনাদের আজ বিকেলে কী প্রোগ্রাম?

আজ আর কোথাও যাব না। ক’দিন জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে খুব টায়ার্ড। ভাবছি, পিছনের জঙ্গলটায় একটু ঘোরাফেরা করব।

পূর্ণচন্দ্র হাঁ হাঁ করে উঠেছেন, সাবধান, বেশি দূরে যাবেন না যেন।

কেন?

কাল রাত্তিরে বেলিং হচ্ছিল যে।

 পার্থ জিজ্ঞেস করল, সেটা আবার কী?

শম্বর হরিণের ডাক। অবিকল ঘণ্টাধ্বনির মতো শোনায় বলে ওই নাম। কোনও হিংস্র জন্তু কাছাকাছি এলে ওরা ওই ডাকটা ছাড়ে। জঙ্গলের অন্য প্রাণীদের সাবধান করার জন্য।

অর্থাৎ, বাঘটাঘ গোছের কিছু একটা এসেছিল?

হয়তো এখনও রয়েছে। তক্কে তক্কে ঘুরছে। খুব চালাক প্রাণী তো, শিকার না পেলে সহজে নড়তে চায় না। আপনাদের সঙ্গে বাচ্চাটাচ্চা আছে, তাই সতর্ক করে দিচ্ছি।

থ্যাঙ্কস, মিতিন বলে উঠল, আমাদেরও অ্যাডভেঞ্চারের শখ নেই। বন দেখা হল, নৌকোয় চড়লাম, এই তো যথেষ্ট। আজ রাত্তিরে চটপট শুয়ে পড়ব। লম্বা একটা ঘুম দিয়ে কাল সকালে প্রস্থান।

সেই ভাল। শরীর ফ্রেশ থাকবে। চাইলে ফেরার পথে একবার কপিলাসও ঘুরে যেতে পারেন। চমৎকার একটা লেক আছে, ছোটখাটো পাহাড়ও আপনাদের নিশ্চয়ই ভাল লাগবে।

দেখি কী করা যায়।

চলে গেলেন পূর্ণচন্দ্র। টুপুররা রুমে এল। মনটা খচখচ করছিল টুপুরের। ঘড়িয়াল দুটোর জলে চলে যাওয়ার তত্ত্বটাই মেনে নিল মিতিনমাসি? তা হলে জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে অত সব অনুসন্ধানের কী অর্থ? বাঘমুন্ডার বাংলোয় চৌকিদারের সঙ্গে মিতিনমাসি আলাদা কথা বলছিল বটে, কিন্তু রাজু যে কালই ফিরছে এ কথাটা তো তখন একবারও বলল না? জঙ্গলে ঢুকে মাসি বোনঝি কী করছিল তা জানতে কত খোঁচাল পার্থমেসো, কোনও উচ্চবাচ্যই করল না মিতিনমাসি দেখাদেখি টুপুরকেও চুপ মেরে থাকতে হল।

নাহ, সত্যিই মিতিনমাসির মনের তল পাওয়া ভার। খেয়েদেয়ে সেই যে বিছানায় চোখ বুজে শুল, আর ওঠেই না। ডেকে ডেকে হতাশ হয়ে বুমবুমকে নিয়ে পার্থমেসোর সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল টুপুর। হাঁটতে হাঁটতে নদীর ধারে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ! কর্মবীর, শক্তিধর তো বেপাত্তাই, তাঁদের তাঁবুটাও আর নেই। বাংলোয় ফিরে পূর্ণচন্দ্রর মুখে শুনল, তাঁরা নাকি সকালেই চেক আউট করে বেরিয়ে গিয়েছেন। সম্ভবত আঙুলগামী বাসে চড়ে। সংবাদটা মিতিনমাসিকে দেওয়ার পরও তার কোনও হেলদোল নেই। একবার প্রোফেসারসাহেবকে দেখতে যাওয়ার প্রস্তাব পাড়ল পার্থমেসো। মিতিনমাসি গা-ই করল না।

রাত্রে খাওয়াদাওয়ার পর মিতিন আমূল বদলে গিয়েছে। বুমবুম ঘুমোতেই আলস্য ঝেড়ে ফেলে থমথমে মুখে পায়চারি করছে ঘরে। টুপুর আর পার্থকে রুমে থাকতে বলে আচমকাই কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল। তারপর আর ফেরেই না, ফেরেই না। এগারোটা বাজল, সাড়ে এগারোটা বাজল, বারোটা বাজল। পার্থমেসো তো রীতিমতো চিন্তিত হয়ে পড়েছে। বলল, কী রে, এবার কী করা যায়?

টুপুর বলল, বিট অফিসারকে খবর দেবে? একা-একা যদি জঙ্গলে ঢুকে থাকে, যদি বিপদ-আপদ হয়!

নাকি বিভূতিবাবুকে ডাকব? উনি তো জঙ্গলটা চেনেন, ওঁকে সঙ্গে নিয়ে, সঙ্গে জোরালো টর্চটাও থাকবে…

কিন্তু মিতিনমাসি যে বেরোতে বারণ করে গিয়েছে?

তা বলে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকব? জঙ্গলে বাঘ-চিতা ঘোরাফেরা করছে জানার পরও? পার্থমেসো মাথা ঝাঁকাচ্ছে, উফ, তোর মাসিটা যে কী করে না!

ঠিক তখনই দরজায় টকটক। দৌড়ে গিয়ে পাল্লা খুলতেই মিতিনমাসি৷ ঠোঁটে আঙুল চেপে সুড়ুৎ করে ঢুকে এল অন্দরে। একদম নিচু গলায় বলল, যা বলছি, চুপচাপ শোন। তোরা দুজনে ঘড়িয়ালের খাঁচাটার ওখানে চলে যা। একসঙ্গে নয়। আগে তোর মেসো, তারপর তুই। খাঁচার ধার দিয়ে একটা রাস্তা উঠে গিয়েছে জঙ্গলে। ওই রাস্তা ধরে উপরে ওঠ। তারপর বাঁয়ে ঘুরে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে বাংলো দুটোর ঠিক পিছনটায় আয়।

আর তুমি?

আহ, এখন প্রশ্ন নয়। যা বলছি কর। আর হ্যাঁ, উপরে জঙ্গলেই থাকবি, নীচে নামবি না। সঙ্গে টর্চ নেওয়ার দরকার নেই। বরং আমার বায়নোকুলারটা রাখ। ওটা দিয়ে রাজুর কোয়ার্টারটাকে ওয়াচ করবি।

কেন?

ফের প্রশ্ন? শুধু খেয়াল রাখবি, গলা দিয়ে কোনও আওয়াজ যেন না বের হয়।

বলেই মিতিন বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে। একটুক্ষণ হতবুদ্ধির মতো দাঁড়িয়ে রইল টুপুর আর পার্থ। তারপর বাইরে এসে তাকাল এদিক ওদিক। না, মিতিন নেই। হুস করে কোথায় যে উবে গেল! কিন্তু তার নির্দেশ তো পালন করতেই হবে। পা টিপে টিপে লন পেরিয়ে খাঁচার কাছে গেল পার্থ। একটু অপেক্ষা করে টুপুরও। যেতে যেতে একবার দেখল বিট অফিসারের কোয়ার্টারটা। নিঝুম, অন্ধকার। পূর্ণচন্দ্র ঘুমিয়ে পড়েছেন বোধহয়।

আঁধার বড্ড গাঢ়। খাঁচার ধারের পায়ে চলা রাস্তাটা প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। আন্দাজে আন্দাজে সাবধানি পায়ে উঠছিল টুপুর। সামনে পার্থ। প্রায় পঞ্চাশ ষাট ফিট চড়াইয়ের পর অবশেষে সমতল। এবার শুকনো পাতা মাড়িয়ে এক পা, এক পা করে বাঁয়ে। পাতা ভাঙার খড়মড়ে আওয়াজে হৃৎপিণ্ড লাফাচ্ছে ধড়াস ধড়াস। মিতিনের বলে দেওয়া জায়গাটায় যখন পৌঁছোল, টুপুর হাঁপাচ্ছে রীতিমতো।

দু’খানা বাংলোই ঢেকে আছে আবছায়ায়। বিষাক্ত পোকামাকড় রুখতে জানলা সব বন্ধ, ভিতর থেকে একটুও আলো আসছে না। রাজুর কোয়ার্টার তো ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। রাতচরা পাখিদের নানারকম ডাক শোনা যায়। খলখল। খ্যাঁচখ্যাঁচ। ঠকঠক। কোথায় যেন একটা শিয়াল ডেকে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে আর একটা শিয়াল। আবার একটা। তারপর কোরাসে হুক্কাহুয়া ধ্বনি। একটু পরে থামল শিয়ালের পাল। ঘোর নিস্তব্ধতার মাঝে শব্দের রেশটা যেন রয়ে গেল কানে।

হঠাৎই এক সুরেলা আওয়াজ গিটারের। সুবাহুদের বাংলো থেকে। একটা ইংরিজি গানের সুর বাজাচ্ছে সুবাহু। অবাক হল টুপুর। রাত গভীর না হলে কি গিটার বাজায় না সুবাহু?

মিনিট পাঁচেকও কাটেনি, টুপুরের কানে পার্থর ফিসফিস, অ্যাই টুপুর, রাজুর কোয়ার্টারের সামনে কে যেন এসেছে!

চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে চমকাল টুপুর। ও মা, তাই তো! কোয়ার্টারের দোরগোড়ায় কেউ একজন দাঁড়িয়ে! কী কাণ্ড, আরও একজন এসে গেল যে!

টুপুরের ঠোঁট নড়ল, কর্মবীর আর শক্তিধর মনে হচ্ছে।

কই দেখি, দেখি, পার্থ প্রায় কেড়ে নিল বাইনোকুলারটা। চোখে লাগিয়ে বলল, হ্যাঁ, দু’জনই তো৷ নির্ঘাত ওই দুই মক্কেল।

টুপুর বলল, ওঁরা তো চলে গিয়েছেন? আবার ফিরে এসে ওখানে?

পার্থ উত্তেজিতভাবে বলল, দরজা খুলেছে! ভিতরে ঢুকে গেল।

আলো জ্বলে উঠল কোয়ার্টারের। মিনিট দুয়েক পরে নিভেও গেল। পার্থ চাপা স্বরে বলল, এবার দু’জন বেরিয়ে যাচ্ছে কাঁধে কী যেন নিয়ে। বড়সড় বস্তার মতো, বলতে বলতে বাইনোকুলার চোখ থেকে নামিয়েছে, ধুস, মিলিয়ে গেল অন্ধকারে।

টুপুর গালে আঙুল দিয়ে বলল, নিশ্চয়ই কোনও একটা গোলমেলে ব্যাপার। ইস, মিতিনমাসিটা যে এখন কোথায় গেল!

আমি তোদের সঙ্গেই আছি রে, টুপুরের কাঁধে হঠাৎ মিতিনের হাত। মৃদু স্বরে মিতিন বলল, চল, কাজ হয়ে গিয়েছে। এবার নামা যাক।

কী কাজ?

ঘড়িয়াল চোর ধরা।

কর্মবীর আর শক্তিধর? পার্থ চেঁচিয়ে উঠতে গিয়েও গলা নামাল, কিন্তু ওরা তো পালিয়ে গেল।

চোর-ডাকাতরা কি আমাকে ফাঁকি দিয়ে অত সহজে প্রস্থান করতে পারে? মিতিনের স্বর শীতল, এসো আমার সঙ্গে।

বলেই অন্ধকারে তরতরিয়ে নামতে শুরু করল মিতিন। পার হল রাজুর কোয়ার্টার। তারপর আচমকাই ঘুরে সুবাহুদের বাংলোয়।

টুপুর অবাক হয়ে বলল, এখানে কেন? কর্মবীর আর শক্তিধরকে কি এখানে পাবে?

আহ, প্রশ্ন করিস কেন? মজাটা দ্যাখ।

দরজায় করাঘাত করল মিতিন। অন্দরে গিটারের আওয়াজটা থামল। সুবাহুর স্বর উড়ে এল, কে?

আমি, মানে পাশের বাংলোর।

মিনিটখানেক কোনও সাড়াশব্দ নেই। তারপর দরজা খুলেছে সুবাহু। এত রাতে মিতিনদের দেখে বিস্মিত যেন। বলল, আপনারা? এখন?

কাল সক্কালবেলা বেরিয়ে যাব তো, ভাবলাম, একবার দেখা করে যাই। আপনি গিটার বাজাচ্ছিলেন, ভাবলাম জেগে আছেন, মিতিন হাসল, প্রোফেসরসাহেব এখন কেমন? জ্বর নেমেছে?

একটু আছে এখনও।

এবার পুরোপুরি ছেড়ে যাবে, মিতিন মুচকি হাসল, আমাদের ভিতরে আসতে বলবেন না?

হ্যাঁ, হ্যাঁ। আসুন, আসুন।

অন্দরে পা রেখে মিতিন তাকাল এদিক-ওদিক, আপনার গিটারটা দেখছি না যে? স্যারের রুমে রেখে এলেন বুঝি?

হ্যাঁ।

 নিয়ে আসুন না। একটু বাজান, শুনি।

না, না, সুবাহু যেন লজ্জা পেল, তার চেয়ে বরং আপনাদের সঙ্গে খানিক গল্পই করি।

গল্প করতে করতেই নয় শুনব। বাজানোর পরিশ্রমটুকুও আপনাকে করতে হবে না। শুধু একবার ও ঘরে গিয়ে সিডি প্লেয়ারটা আবার চালিয়ে দিন।

সুবাহুর মুখ পলকে ফ্যাকাশে। থতমতভাবে বলল, মানে?

আশ্চর্য! আমার সোজা কথাটার মানে বুঝলেন না? মিতিনের স্বর সামান্য রুক্ষ হল, এখনও কি বুঝতে পারছেন না, আপনার খেল খতম। থুড়ি, আপনাদের।

কী বলছেন আবোল তাবোল? সুবাহু কাঁধ ঝাঁকাল। বিস্মিত গলায় বলল, কী খেল? কীসের খেল?।

একটা নয়, অনেক, লম্বা লিস্টে যাচ্ছি না। শুধু বড় খেলাটাই বলি। মিতিনের গলা ক্রমশ কড়া হচ্ছে, দু’-দুখানা নিরীহ দুষ্প্রাপ্য ঘড়িয়ালকে মেরে তাদের চামড়া ছাড়িয়ে বাক্সবন্দি করে চম্পট দেওয়ার বন্দোবস্তটি পাকা। এটা কিন্তু ধরা পড়ে গিয়েছে। আর তো আপনাদের রেহাই নেই।

থামুন তো, সুবাহু তেড়ে উঠল, কী সব উলটোপালটা অভিযোগ আনছেন? জানেন আমরা কে?

খুব জানি। বেআইনি পশু-চামড়া চালানের যে আন্তর্জাতিক চক্রটি ভারতের জঙ্গলে জঙ্গলে শিকার করে বেড়াচ্ছে, আপনারা তাদেরই দুই পাণ্ডা। রিসেন্টলি সুন্দরবনে একটা সাকসেসফুল অপারেশন করে এসেছেন। এখানেও যেভাবে ঘুঁটি সাজিয়ে ধাপে ধাপে এগিয়েছিলেন, কাজ হাসিল করে নির্বিবাদে পালিয়ে যেতে পারতেন, মিতিনের ঠোঁটে ব্যঙ্গের হাসি ফুটে উঠল, কিন্তু আপনাদের কপাল খারাপ। এই সময়েই আমি বেড়াতে এলাম কিনা। আর আমার পাল্লায় পড়লে আপনাদের মতো ক্রিমিনালদের শ্রীঘর বাস তো অনিবার্য।

এই যে, আপনি বেরোন তো এখান থেকে। আউট। আউট, সুবাহু প্রায় গর্জন করে উঠল, যত্ত সব ফালতু লোকজন! মাঝরাত্তিরে অন্য টুরিস্টদের বাংলোয় এসে হল্লা জুড়েছেন, আপনার স্পর্ধা তো কম নয়। মানে মানে কেটে পড়ুন তো।

এখনও তেজ কমেনি, অ্যাঁ? মিতিনও পালটা গলা চড়াল, যাব নাকি পাশের ঘরে? এখনও নিশ্চয়ই ফলস গিটারের বাক্সটায় চামড়া ভরে উঠতে পারেননি? তা ছাড়া স্কেলিটন দুটোও তো এখনও রাজুর কোয়ার্টারে পড়ে!

কথা শেষ হয়েছে কী হয়নি, পাশের ঘর থেকে হঠাৎই ইন্দ্রজিৎ সেনের উদয়। না, কোনও অসুস্থ বয়স্ক প্রোফেসর নয়, দিব্যি এক তাগড়াই জোয়ান। নকল দাড়িগোঁফ উধাও, চোখে চশমাও নেই, হাতে উদ্যত রিভলভার।

চিবিয়ে চিবিয়ে ইন্দ্রজিৎ বলল, আপনি বড় বেশি জেনে ফেলেছেন। আপনাদের কাউকেই তো আর বাঁচিয়ে রাখা যায় না।

মেরেই ফেলুন তা হলে, মিতিনের কোনও তাপ উত্তাপ নেই। বাঁকা সুরে বলল, তারপর বেঁচে বেরোতে পারবেন তো? পেরোতে পারবেন পম্পাসার চেকপোস্ট?

এই না হলে মেয়ে টিকটিকির বুদ্ধি! আমরা ওই পথে যাবই না। রিভলভারের নলটা একবার টুপুরকে তাক করল। ইন্দ্রজিৎ পরক্ষণে নল ঘুরিয়েছে পার্থর দিকে। তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, ঘাটে নৌকো বাঁধা আছে ম্যাডাম। নদীপথে গিয়ে ওপারে চামুণ্ডিয়ায় নামব। তারপর ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট আমাদের টিকিও ছুঁতে পারবে না।

কিন্তু নৌকোটা যে আর নেই। মাঝিসুদ্ধ নৌকো আমি ভাগিয়ে দিয়ে এসেছি।

কী? কী বললেন? ইন্দ্রজিতের চোখে আগুন জ্বলে উঠল। রিভলভারের নল মিতিনের দিকে ঘুরিয়ে বলল, প্রথম গুলিটা তো তা হলে আপনার কপালেই নাচছে। তারপর ওই দুটোকে ফিনিশ করে লাশগুলোকে ভাসিয়ে দেব নদীতে। আর কোনও প্রমাণই থাকবে না।

খচ করে একটা শব্দ হল সেফটি ক্যাচ তোলার। পরক্ষণেই অত্যাশ্চর্য কাণ্ডটা ঘটাল মিতিন। বিদ্যুৎবেগে জিনসের পকেট থেকে বের করেছে রিভলভার। ইন্দ্রজিৎকে বিন্দুমাত্র প্রস্তুতির অবকাশ না দিয়ে সরাসরি গুলি করেছে তার হাতে। ছিটকে গেল ইন্দ্রজিতের অস্ত্র। কোঁকাচ্ছে যন্ত্রণায়।

মিতিন গম্ভীর গলায় বলল, আমার দিকে রিভলভার তোলাটা আমি একটুও পছন্দ করি না। আশা করি, এবার আপনারা সারেন্ডার করবেন।

বলার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকলেন কর্মবীর আর শক্তিধর। রিভলভার হাতে মিতিনকে দেখে বললেন, ও, আপনি একাই দুই বজ্জাতকে সামলে নিয়েছেন?

এবার তিন নম্বরটিকে আপনারা পাকড়াও করুন। সে বেচারা ও ঘরে বসে বসে ঘামছে।

বিট অফিসার পূর্ণচন্দ্র বেহেরাকে ঘেঁটি ধরে বের করে আনলেন কর্মবীর। নাইলনের দড়ি দিয়ে পিছমোড়া করে বাঁধা হল তিনজনকে।

গোটা দৃশ্যটাই কেমন স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছিল টুপুরের। শুধু বুঝতে পারছিল না, সে জেগে আছে, না ঘুমিয়ে।

.

১০.

ওফ, রাত একখানা গেল বটে! পুরানাকোট থেকে জিপ হাঁকিয়ে চলে এলেন রেঞ্জারসাহেব। আঙুল থেকে গাড়িভর্তি পুলিশও হাজির। চোরাই মালপত্র সমেত তিন অপরাধীকে হাতকড়া পরিয়ে পুলিশের গাড়ি যখন রওনা দিল, সাতকোশিয়ার জঙ্গলে তখন ভোরের আভাস। পাখিরা ডাকাডাকি শুরু করেছে। পুব আকাশে লাগছে রঙের ছোঁয়া।

এরকম একটা রোমহর্ষক রাতের পর আর কি বিছানায় যেতে মন চায়? ঘুম তো উবেই গিয়েছে টুপুরের চোখ থেকে। পার্থ আর মিতিনের সঙ্গে সে বসে আছে বাংলোর লনে। চেয়ার পেতে। ফুরফুরে প্রভাতী হাওয়া খাচ্ছে।

বিভূতি চা নিয়ে এলেন। মাঝরাতে হল্লাগুল্লার আওয়াজে বিছানা ছেড়ে উঠে এসেছিলেন তিনি। তারপর থেকে গোল গোল চোখে দেখছেন সবকিছু। শ্রদ্ধামিশ্রিত স্বরে মিতিনকে বললেন, ম্যাডাম, আপনি তো কামাল করে দিয়েছেন।

এবার আপনি কামাল করুন। জঙ্গলের শেষ ব্রেকফাস্টটা জমিয়ে বানান তো। বেশ মোটা মোটা আলুর পরোটা। যা এখন অনেকক্ষণ পেটে থাকবে। পারবেন?

ঢক করে ঘাড় নাড়লেন বিভূতি। হাসি হাসি মুখে বললেন, ওই দুই বাবুও কি আসবেন? ওঁদের জন্যও বানাব?

না, না। ওঁরা তো ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোক। রেঞ্জারসাহেবের সঙ্গে চলে গিয়েছেন। উনিই ওঁদের ফেরার ব্যবস্থা করবেন।

বিভূতি রান্নাঘরের দিকে চলে যেতেই টুপুর লজ্জা লজ্জা মুখে বলল, কর্মবীর আর শক্তিধরবাবুকে আমি ভুল বুঝেছিলাম। আন্দাজই করতে পারিনি ওঁরা বনবিভাগের বিশেষ সুরক্ষা বাহিনীর অফিসার। চোরাশিকারি ধরতে হানা দিয়েছিলেন সাতকোশিয়ায়।

পার্থ বলে উঠল, ওঁদের ফোটোটাই তো আরও গন্ডগোল পাকিয়ে দিল। জঙ্গলে রিভলভার নিয়ে ঘুরছেন, পোচার ছাড়া আর কী ভাবব?

মিতিন বলল, দৃষ্টিশক্তি ব্যবহার করতে জানলে ফোটোর রিভলভার থেকেই ওঁদের সঠিক পরিচয় পেয়ে যেতে।

কী বিশেষত্ব ছিল?

ওগুলো সার্ভিস রিভলবার মশাই। শুধু সরকারি বাহিনীই ওই রিভলভার ব্যবহার করে। তা ছাড়া জঙ্গল ভেদ করে পাঁচ ঘণ্টায় পঁচিশ কিলোমিটার যাওয়া মোটেই চোরাশিকারিদের কম্মো নয়। এর জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ লাগে।

অ। তুমি বুঝি তাই দিয়েই দুয়ে-দুয়ে চার করেছিলে?

উঁহু। পৌনে চার। বাকিটুকু নিশ্চিত হলাম কার্বন পেপারটা থেকে। ডে টু ডে রিপোর্ট লিখে রাখছিলেন ওঁরা সরকারি বয়ানে। কার্বন পেপারটা আলোয় ধরতেই স্পষ্ট পড়া গেল। ওই রিপোর্ট থেকেই জানলাম, জঙ্গলে চোরাশিকারি ঢুকেছে এমন একটা ইনফরমেশান পেয়েই ওঁরা হাজির হয়েছিলেন সাতকোশিয়ায়। তবে ওঁরা ভেবেছিলেন, বাঘ, হাতি, কিংবা হরিণটরিন কিছু মারা হবে। আসল টার্গেট যে ঘড়িয়াল, এটা ওঁদের হিসেবেই ছিল না।

তুমি আন্দাজটা করলে কী করে? ঘড়িয়াল দুটো নিখোঁজ হল তাই?

আজ্ঞে না স্যার। এখানে পা রাখার পরদিন থেকেই আমার ষষ্ঠেন্দ্রিয় বলছিল, কোথাও একটা কিছু গন্ডগোল চলছে। চৌকিদার উধাও, কথাটা পম্পাসার চেকপোস্ট পর্যন্ত রটে গিয়েছে, অথচ বিট অফিসারের মোটেও তেমন হেলদোল নেই। আবার ওদিকে লঙ্গির সুরজ মুন্ডা জানে, রাজু দু’ সপ্তাহ ছুটিতে গিয়েছে। এটা কেমন করে সম্ভব?

অর্থাৎ বিট অফিসারই ওকে ছুটিতে পাঠিয়ে দিয়েছিল, তাই তো?

ইয়েস মাই ডিয়ার ওয়াটসন, টুপুরকে ছোট্ট একটা তারিফ ছুড়ল মিতিন, বাসে যাওয়ার পথে কাউকে হয়তো বলেছিল রাজু। সেটাই পৌঁছে গিয়েছে সুরজ মুন্ডার কানে। তখনই মনে হল, ধোঁয়া ছাড়া তো আগুন হয় না। সুতরাং রাজুকে বাড়ি পাঠানোর পিছনে নিশ্চয়ই কোনও কারণ আছে। তার আগেই রাজুর কোয়ার্টারের সামনে ক্রোমিয়াম সালফেটের গুঁড়ো পেয়েছি। দুয়ে মিলে গাঢ় হল সংশয়টা।

হ্যাঁ, তুমি বলেছিলে বটে, টুপুর বলল, কিন্তু ক্রোমিয়াম সালফেটে কী হয়?

পার্থ বিজ্ঞের মতো বলল, মারাত্মক কোনও বিষটিস হবে। জন্তুজানোয়ার মারতে বোধহয় কাজে লাগে।

তোমার জিকের ফান্ডা দিন দিন কমে যাচ্ছে, মিতিন পলকা ঠাট্টার সুরে বলল, জন্তুজানোয়ারের কাঁচা চামড়া জলদি জলদি শুকোতে ওই রাসায়নিক দ্রব্যটি ব্যবহার হয় দুনিয়াভর। তখনই মনে হল, ওই কাজে কোয়ার্টারটিকে লাগানোর জন্যই সম্ভবত ভাগানো হয়েছে রাজুকে। সঙ্গে অবশ্য নুনও লাগে। তারও খালি বস্তা তো আমরা পেয়েছি।

বুঝলাম, টুপুর মাথা দোলাল, ওই মতলব থেকেই শেষরাতে গিয়ে ওরা মারল ঘড়িয়াল দুটোকে। তারপর তিনজনে মিলে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল জঙ্গলে। সুবাহুদের বাংলোর ভিতরের ঘরটায় যে ভোঁতা ভোঁতা ছুরিগুলো পাওয়া গিয়েছে, সেগুলো দিয়েই ছাল ছাড়িয়ে মাংস ফেলে দিল গর্তে। আর পাটাতনে চাপিয়ে চামড়া ও কঙ্কালটা নিয়ে এল রাজুর কোয়ার্টারে।

মিতিন ভুরু নাচাল, তা হলে পাটাতনটা জঙ্গলের গর্তে পাওয়া গেল কেন?

সুবাহুরা আবার ফেলে দিয়ে এসেছিল।

তোর মুন্ডু, ঘড়িয়ালের মাংসই বা গেল কোথায়? তোকে কালই বললাম, কোনও জন্তুর পক্ষে দু’ঘণ্টায় অতখানি মাংস খাওয়া সম্ভব নয়?

তা হলে ঘটেছিলটা কী?

ওরে বোকা, উলটো করে ভাব। ঘড়িয়াল দুটোকে মেরে প্রথমেই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল রাজুর কোয়ার্টারে। সেখানে হাড়, চামড়া ছাড়িয়ে পাটাতনে চাপিয়ে মাংসটা ফেলে দিয়ে আসা হয়েছিল ওই গর্তে।

তার মানে ঘড়িয়াল দুটোকে মেরে ওরা আমাদের বাংলোর সামনে দিয়েই টেনে নিয়ে গিয়েছিল। অথচ আমরা কিছু টের পেলাম না?

কী করে পাব? আমরা যে তখন সাতকোশিয়ায় আসিইনি।

মানে? পার্থ ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া মুখে তাকাল, কী হেঁয়ালি করছ, অ্যাঁ?

মোটেই হেঁয়ালি নয়, স্যার। ঘড়িয়াল দুটোকে মারা হয়েছে আমরা এখানে আসার আগেই। রাজু যেদিন থেকে নেই, সেই দিনই। নিরালা বাংলোয় নিশ্চিন্তে অপারেশানটা চালিয়েছে সুবাহু, ইন্দ্রজিৎ, আর পূর্ণচন্দ্র।

যাহ বাবা, কী গুলগাপ্পি ঝাড়ছ? দু’দিন ধরে খাঁচায় যে ঘড়িয়াল দুটোকে দেখলাম, সেগুলো তা হলে কী? মরা ঘড়িয়ালের ভূত?

প্রায় সেরকমই, মিতিন আলতো হাসল, ওটাই সুবাহুর কেরামতি।

কীরকম?

কিছুই ঠিকঠাক অবজার্ভ করো না। পাশের ঘরে সিডি প্লেয়ার দেখে তোমাদের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। রাজুর কোয়ার্টারে দু’খানা ঘড়িয়ালের কঙ্কাল দেখে চমকে উঠলে। অথচ ড্রেসিংটেবিলের উপর পড়ে থাকা পলিথিনের বস্তুটির দিকে তোমরা ফিরেও তাকালে না।

তুমি কীসের কথা বলছ গো মাসি?

 দু’খানা খেলনা ঘড়িয়ালের কথা বলছি। যাদের হাওয়া দিয়ে ফোলালে অবিকল আসল ঘড়িয়ালের মতোই দেখায়। সেগুলো এমনই নিখুঁত, বনবিভাগের কোনও কর্মীও চট করে আসল-নকলের ফারাকটা বুঝতে পারবে না এবং এমনভাবে তৈরি, যে রিমোটের সাহায্যে মুখ খোলা-বন্ধও করা যায়।

ও-ও-ও। সুবাহুই বুঝি রিমোটটা অপারেট করত!

ইয়েস মিস ওয়াটসন, মিতিন সায় দিল, থ্যাঙ্কস টু বুমবুম। ও আমাকে ক্লুটা দিয়েছিল। ওকে গিফট করব বলে পলিথিনের চোপসানো ঘড়িয়াল দুটো আমি রেঞ্জারসাহেবের কাছ থেকে চেয়ে রেখেছি। কেস মিটলে রিমোট সহ ওই দুটো খেলনা উনি আমাকে পাঠিয়েও দেবেন।

ওটাই তা হলে তোমার ঘরের খেয়ে বনের মোষ। অর্থাৎ কিনা খাঁচার ঘড়িয়াল দুটোর রহস্য ভেদের জন্য তোমার পারিশ্রমিক? পার্থ হেসে বলল, কিন্তু কর্মবীর আর শক্তিধরের সঙ্গে তুমি যোগাযোগ করলেটা কখন?

আমার প্রতিটি স্টেপ তোমাদের না জানলেও চলবে, মিতিন হাসছে মিটিমিটি, আমার সবচেয়ে মোক্ষম প্যাঁচটা ধরতে পেরেছ কি?

কোনটা? রাতদুপুরে আচমকা হানা দেওয়া?

 ঘেঁচু। ওই যে বিট অফিসারের কানে ভাসিয়ে দিলাম, রাজু কাল ফিরে আসছে। তাতেই তো রাতারাতি মাল সরানোর তাড়া পড়ে গেল। নয়তো ইন্দ্রজিৎ তো দিব্যি জ্বরো রোগীর ভান করে কাজটা ধীরেসুস্থে সারছিল।

রাজুর কোয়ার্টারে বসে?

নয়তো আর কোথায়! সাধে কি ওকে দেখা যাচ্ছিল না! মিতিন চোখ ঘোরাল, তবে বেচারার কাজটা আধখেঁচড়াই রয়ে গেল। চামড়াও গিটারের বাক্সে ভরে ফেলেছিল ঠিকই, কিন্তু কঙ্কাল দুটোকে গুঁড়ো গুঁড়ো করে উঠতে পারল না।

টুপুর জিজ্ঞেস করল, চামড়ার নয় অনেক দাম। হাড়ের গুঁড়ো দিয়ে কী হবে?

ঘড়িয়ালের হাড়ের গুঁড়োও বিদেশের বাজারে চড়া দামে বিকোয়, বিশেষত চিনে। ওই হাড়ের গুঁড়ো দিয়ে ওরা অনেক ওষুধবিষুধ বানায় কিনা।

ও।

টুপুর যেন আবার খানিক উদাস। পরশুই মিতিনমাসি বলছিল, আর পাঁচটা সরীসৃপের মতোই ঘড়িয়ালের রক্ত ঠান্ডা। মানুষের মতো যে-কোনও আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও নেই ঘড়িয়ালদের। তাই পরিবেশের সামান্য বদল হলেই বেচারারা মারা পড়ে দলে দলে। তার উপরে এভাবে যদি ক্রমাগত সুবাহু, ইন্দ্রজিৎদের মতো মানুষদের লোভের শিকার হয়, ধরাধাম থেকে প্রাণীটাই তো ধীরে ধীরে মুছে যাবে। মানুষ কি নিজেকে ছাড়া আর কাউকেই দুনিয়ায় টিকতে দেবে না?

পাহাড়ের ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে সকালের প্রথম সূর্য। লনের সবুজ ঘাস নরম হলুদ আলোয় মাখামাখি। তীক্ষ্ণ সুরে ডেকে উঠল একটা মাছরাঙা। মিশকালো ভীমরাজ নেচে বেড়াচ্ছে এদিক-ওদিক। কত যে রংবেরঙের পাখি বেরিয়ে পড়েছে সেজেগুজে। টুপুর আনমনে সকালটাকে দেখছিল।

হঠাৎই বাংলোর বারান্দা থেকে বুমবুমের ডাক, মা? ও মা!

রাতভর দিব্যি ঘুমিয়ে সদ্য জেগেছে বুমবুম। চোখ রগড়াচ্ছে।

 টুপুর চেঁচিয়ে বলল, কী রে, কিছু বলবি?

তোমরা ওখানে কী করছ?

প্রকৃতির শোভা দেখছি।

বুমবুম বারান্দা থেকে নেমে এল। কাছে এসে বলল, আমি কাল রাত্তিরে একটা স্বপ্ন দেখেছি।

কী রে?

ঘড়িয়াল দুটো তো জলে চলে গিয়েছিল, আবার ওরা জল থেকে উঠে এসেছে। আমি নদীর দিকে যাচ্ছি, ওরা আমার পাশে পাশে যাচ্ছিল। আমি তাকালেই হাঁ করছে, চোখ ঘোরালেই মুখ বুজে ফেলছে, বুমবুম চোখ পিটপিট করছে, ওরা খুব ভাল। তাই না মা?

মিতিন নীরব। পার্থ আর টুপুর চোখ চাওয়াচাওয়ি করল। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল পার্থ। চলে যাচ্ছে বুমবুমের সামনে থেকে।

টুপুর যে এখন কী করে! তার এত কান্না পাচ্ছে কেন!