২০. ঐতিহাসিক মারি-প্যাকট

ঐতিহাসিক মারি-প্যাকট
বিশা অধ্যায়

১. নয়া গণ-পরিষদ

মন্ত্রিত্ব আদায়ে এবং পরিণামে নয়া গণ-পরিষদের নির্বাচনে কৃষক-শ্রমিক পার্টি মুসলিম লীগের ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলীর সাথে খুব ঘনিষ্ঠ হইয়া পড়িয়াছিল। এতে আমাদের মধ্যে অনেকেই যুক্তফ্রন্টের ১৬ জন মুসলিম গণ-পরিষদ মেম্বরকে কার্যতঃ মোহাম্মদ আলীর দলের লোক বলিয়াই মনে করিতে লাগিলেন। আমি কিন্তু অতটা নিরাশ হইলাম না। আমার মনে হইল, হক সাহেব শহীদ সাহেবের সহিত ব্যক্তিগত বিরোধের দরুন এবং নিজের দলকে ক্ষমতায় বসাইবার উদ্দেশ্যে, প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলীর সাথে ঐ সুবিধার বিবাহ’ ম্যারেজ-অব-কনভিনিয়েন্স করিয়াছেন। সে আবশ্যকতা এখন ফুরাইয়াছে। তিনি পূর্ব-বাংলার গদিতে নিজের পার্টিকে বসাইয়াছেন। তাঁর দওলতে গণ-পরিষদের নির্বাচনেও তাঁর দল মেজরিটি হইয়াছে। এইবার আওয়ামী লীগের সহিত একযোগে কাজ করায় তাঁর কোনও আপত্তি হইবে না। কারণ তিনটি : প্রথমতঃ একুশ দফা নির্বাচনী ওয়াদা পূরণে প্রাদেশিক সরকার হিসাবে তাঁর পার্টির দায়িত্বই বেশি। দ্বিতীয়ত: একুশ দফার ও আঞ্চলিক পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের সমর্থক মেম্বাররাই তাঁর দলে বেশি প্রভাবশালী। তৃতীয়তঃ তিন-তিনটা সম্মুখযুদ্ধে আওয়ামী লীগকে পরাজিত করিয়া হক সাহেব নিশ্চয় এখন বিজয়ীর উদার মনোভাব অবলম্বন করিবেন। এইসব কারণে এবং সর্বোপরি কেন্দ্রীয় শাসক গোষ্ঠীর মোকাবেলায় পূর্ব-বাংলার ঐক্যের অপরিহার্য প্রয়োজনে কে, এস, পি আওয়ামী লীগের একযোগে কাজ করার আশায় বুক বাঁধিয়া আমি পশ্চিমের তীর্থক্ষেত্রে রওয়ানা হইলাম।

গণ-পরিষদের পয়লা বৈঠক ৭ই জুলাই মারিতে ডাকা হইয়াছিল। ৫ই জুলাই আমরা পূর্ব-বাংলার অনেক মেম্বর ঢাকা বিমান বন্দর হইতে পশ্চিম-মুখী রওয়ানা হইলাম। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক আগে হইতেই লাহোরে ডাকা হইযাছিল। আতাউর রহমান, মুজিবুর রহমান ও আমি সে সভায় যোগ দিবার জন্য একত্রে লাহোর উপস্থিত হইলাম। পশ্চিম পাঞ্জাব আইন-পরিষদের সদস্য ভবন পিপল হাউসে আমাদের থাকার ও ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকের স্থান করা হইয়াছিল। সদস্য ভবনের কমনরুমে ঐ বৈঠক হইল। গণ-পরিষদের মেম্বর ছাড়া আরও অনেক নেতা ঐ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে নবাবদা নসরু খাঁ ও মানকি শরিফের পীর সাহেবের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ভবিষ্যত শাসনতন্ত্রের কাঠাম ও মোহাম্মদ আলী-মন্ত্রিসভায় শহীদ সাহেবের অবস্থিতি এই দুইটাই সভার প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল। এ বিষয়ে কতিপয় প্রস্তাব গ্রহণ করিয়া প্রথম দিনের বৈঠক সমাপ্ত হইল। মারিতে গণ-পরিষদের বৈঠক শুরু হইবার আগেই গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ-সতার সম্ভাবনার কথা বলিয়া শহীদ সাহেব আমাদের তিনজন ও মানকি শরিফের পীর সাহেবকে লইয়া মোটর যোগে মারি রওয়ানা হইলেন। নবাবদা নসরুল্লার সভাপতিত্বে ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক চলিতে থাকিল। অন্যান্য মেম্বারদেরে সভাশেষে ট্রেনে আসিতে উপদেশ দেওয়া হইল। লাহোর হইতে পিণ্ডি ট্রেনের রাস্তা। পিণ্ডি হইতে মারি পর্যন্ত বাস সার্ভিস। সীমান্ত গান্ধী খান আব্দুল গাফফার খাঁর ঐ সময় আলোচনার জন্য মারিতে আসিবার কথা ছিল বলিয়া মানকির পীর সাহেবকে সংগে নেওয়া খুবই আবশ্যক ছিল। দীর্ঘক্ষণের মোটর-পথেও আমরা দেশের এবং সীমান্তের বিভিন্ন সমস্যা ও ভবিষ্যত লইয়া অনেক অনেক শিক্ষাপ্রদ আলোচনা করিলাম। বস্তুতঃ মানকির পীর সাহেবের সহিত ঘনিষ্ঠ হইবার এটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় সুযোগ। পীর সাহেব মাত্র ত্রিশ বছরের তরুণ যুবক হইলেও দাড়ি-মোচে আরও বেশি বয়সের মনে হইত। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা পাণ্ডিত্য, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও দূরদর্শিতায় তিনি অনেক প্রৌঢ় বৃদ্ধের চেয়েও জ্ঞানী ছিলেন। তাঁর দেশপ্রেম ও রাজনীতি-জ্ঞান আমাকে অল্পক্ষণের মধ্যেই তাঁর অনুরক্ত করিয়া তুলিয়াছিল।

মারিতে পৌঁছিয়া আমরা হোটেল সিসিল ও ব্রাইটল্যাও হোটেলে ছড়াইয়া পড়িলাম। আতাউর রহমান ও আমি হোটেল সিসিলে একতলার একই কামরায় থাকিলাম। মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য আওয়ামী লীগ মেম্বররা হোটেল সিসিলের দুতলা দখল করিলেন। হক সাহেবের দল ব্রাইটল্যাণ্ড দখল করিলেন। শহীদ সাহেব আমাদের খুব কাছেই মন্ত্রী হিসাবে তিন-চার কামরার একটা সুইট দখল করিলেন। ৭ই জুলাই হইতে ১৪ই জুলাই পর্যন্ত গণ-পরিষদের বৈঠক চলিল। আমরা দিন-দশেক মারিতে ছিলাম। এই দশদিনে আমরা মারির দর্শনীয় সকল স্থান দেখিয়া ফেলিলাম। লোয়ার টুপান্থ ক্যাডেট স্কুলের বাংগালী ছাত্ররা আমাদেরে দাওয়াত করিয়াছিল। সেখানেও গেলাম। মন্ত্রীদের অভ্যর্থনা-অভিনন্দনের সব পার্টিতেও গেলাম। প্রতি সন্ধ্যায় ‘মলে’ বেড়াইতাম। এছাড়া সুযোগ পাইলেই আমি পায়ে হাঁটিয়া বেড়াইতাম। এটা আমার চিরকালের অভ্যাস। পাহাড়ের খাড়া ঢালু জায়গায় রাস্তা হাঁটা সহজ নয়। তবু আমি নিরুৎসাহ হই নাই। কারণ পথ-ঘাটের মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য আমাকে খেচিয়া লইয়া যাইত। নয় হাজার ফুট উচা পর্বতের মাথায় এই সুন্দর শহরটি। সবার উপরে পানির বিশাল রিযার্ভয়ার। পার্শ্ববর্তী পর্বত হইতে বড়-বড় পাইপের সাহায্যে এখানে পানি আনা ও পরিশোধিত করিয়া সর্বত্র সরবরাহ করা হয়। আমার কাছে হোটেল সিসিলটাই সবচেয়ে ভাল লাগিয়াছিল। এটি একটি অত্যুচ্চ খাড়া ঠেসের উপর অবস্থিত। রেলিং-ঘেরা বাগ-বাগিচাওয়ালা সুসজ্জিত আংগিনায় বসিয়া আমরা গভীর খাদ দেখিতাম। আমাদের অনেক নিচে দিয়া মেঘ ও বৃষ্টি হইতে থাকিত। মেঘের উপরে বসিয়া উপরে সূর্যকিরণ ও নিচে মেঘের চলাচল ও বৃষ্টিপাত দেখা সে কি অপূর্ব।

যাহোক, গণ-পরিষদ শুরু হইবার আগের দিন আমরা মারি পৌঁছিবার সাথে সাথেই শহীদ সাহেব আমাকে জানাইলেন যে রাত্রে গবর্নমেন্ট হাউসে ডিনারের দাওয়াত আছে। নবাব মুশতাক আহমদ গুরমানী তখন নব-গঠিত পশ্চিম পাকিস্তান প্রদেশের গবর্নর। তাঁরই মারিস্থ বাসভবনে এই দাওয়াত। তিনি গণ-পরিষদের একজন মেম্বর। গবর্নর-জেনারেল কর্তৃক মনোনীত গণ-পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যানও বটে তিনি। সুতরাং এটা শুধু ভদ্রতার ডিনার নয় বুঝিলাম। শহীদ সাহেব ঈশারায় বলিলেনও যে এতে রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা হইতে পারে।

২. পূর্ব-পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা

যথাসময়ের বেশ খানিক্ষণ আগেই শহীদ সাহেব তাঁর গাড়িতে করিয়া আতাউর রহমান ও আমাকে লইয়া গবর্নমেন্ট হাউসে গেলেন। গবর্নমেন্ট হাউসের লাউঞ্জে সর্বপ্রথমেই কাল মোচওয়ালা ছয় ফুটের বেশি লম্বা বিশাল আকারের এক ভদ্রলোকের সাথে দেখা। শহীদ সাহেব পরিচয় করাইয়া দিলেন : ইনিই আমাদের প্রধান সেনাপতি ও বর্তমানে একই সংগে দেশরক্ষা মন্ত্রী জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খাঁ। সজোরে করমর্দন করিলাম। সংগে-সংগেই সদ্য-ঘটিত একটা ঘটনা মনে পড়িয়া গেল। গবর্নর-জেনারেল গোলাম মোহাম্মদের ‘মিনিস্ট্রি অব ট্যালেন্টসের’ উনি যেদিন দেশরক্ষা মন্ত্রী হন, তাঁর কয় দিন পরে লাহোর কর্পোরেশন তাঁকে একটি মানপত্র দিয়াছিল। এই মানপত্রের জবাবে অন্যান্য ভাল কথার মধ্যে তিনি বলিয়াছিলেন : “ইস্ট পাকিস্তান ইয় ইনডিফেনসিবল। ডিফেনস অব ইস্ট পাকিস্তান লাইফ ইন ওয়েস্ট পাকিস্তান।” সরকারী দায়িত্বশীল লোকের মুখে ঐ ধরনের কথা শুনিয়া আমি যারপর নাই চটিয়া গিয়াছিলাম। এই ধরনের বিপজ্জনক কথা দায়িত্বশীল নেতার মুখের উপযোগী নয়। কলিকাতার তাঁতি বাগান রোডে থাকাকালে প্রতিবেশী বস্তিওয়ালা মুসলমান ভাইদের মুখে এই ধরনের কথা শুনিতাম। পরে পাকিস্তানে আসিয়া মোহাজের-ভাইদের অনেকের মুখেও শুনিয়াছি। তারা বলিত : হিন্দুস্থান পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণ করিলে আমাদের সেনাবাহিনী হিন্দুস্থান আক্রমণ করিয়া কয়েক ঘন্টার মধ্যে দিল্লি দখল করিবে। হিন্দুস্থান বাহিনী পূর্ব-পাকিস্তান হইতে লেজ গুটাইয়া চলিয়া যাইবে। এই ধরনের গাল-গল্পকে আমি চা-স্টল কাফিখানা বা ভাড়ির আড়ার ব্যাপার মনে করিতাম। এ-কথার তাৎপর্য ছিল এই যে, বাংগালী অসামরিক কাপুরুষের জাত। যুদ্ধ তারা জানে না। পূর্ব-বাংলা তারা রক্ষা করিতে পারিবেনা। পশ্চিম পাকস্তানীরাই এদেশ রক্ষা করিবে। এই তাৎপর্যের জন্যই বোধ হয় আমার মেজ গরম হইত। আজ আমাদের প্রধান সেনাপতি-দেশরক্ষা মন্ত্রীর মুখে একথা শুনিয়া স্বভাবতঃই আমি তাঁর উপরও রাগ করিয়াছিলাম। অতএব, প্রাথমিক আলাপ-পরিচয় শেষ হওয়ামাত্র আমি ঐ কথাটা তুলিলাম এবং খুব সম্ভব অভদ্রভাবেই তুলিলাম। কারণ আগেই বলিয়াছি ঐ ধরনের কথা শুনিলে আমার মেজ ঠিক থাকিত না। কাজেই বলিলাম : ‘আপনি ঐ ধরনের কথা কিরূপে বলিলেন : দেশের প্রধান সেনাপতি দেশরক্ষা মন্ত্রী হিসাবে ঐ কথা বলিয়া আপনি সম্পূর্ণ দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়াছেন। নিজের দেশের বেশির ভাগই অরক্ষণীয়, একথা কোনও দেশের প্রধান সেনাপতি ঘরের চালে দাঁড়াইয়া চিৎকার করিয়া ঘোষণা করিতে পারেন না।

প্রথম পরিচয়ের বিশ্রম্ভালাপের মধ্যে আমি নাহক সিরিয়াস আলোচনার আমদানি করিয়াছি। রসালাপ আর জমিবেনা। শহীদ সাহেব এই ধরনের মন্তব্য করিয়া আমার হাত ধরিয়া টানিয়া ভিতরের দিকে নিতে চাইলেন। কিন্তু জেনারেল আইয়ুব আমাকে ছাড়িলেন না। তিনি আমার অপর হাত টানিয়া ধরিয়া বলিলেন : ‘আপনি খুব যরুরী কথাই তুলিয়াছেন। আমি আপনাকে আমার কথার তাৎপর্য না বুঝাইয়া ছাড়িব না।’ তিনি আমাকে টানিয়া নিয়া একটি দেওয়ানে বসাইলেন। নিজেও পাশে বসিলেন। অগত্যা শহীদ সাহেব আতাউর রহমান সাহেবকে লইয়া ভিতরে চলিয়া গেলেন। প্রধান সেনাপতি-দেশরক্ষা মন্ত্রী নিজের ঐ উক্তির সমর্থনে যা-যা বলিলেন তা শুনিয়া আমার চক্ষু চড়কগাছ! আমাদের প্রধান সেনাপতির মুখেও অবিকল কলিকাতার মুসলিম বস্তিওয়ালার কথাই শুনিলাম। তারত যদি পূর্ব-বাংলা আক্রমণ করে, তবে পাকিস্তান বাহিনী দিল্লির লালকেল্লা ও লোকসভার শিখরে পাকিস্তানী পতাকা উড্ডীন করিবে। হিন্দুস্থান অতঃপর পূর্ব-পাকিস্তান ফিরাইয়া দিয়া আপোস করিবে।

খুব গরম তর্ক বাধিয়া গেল। অতিকষ্টে আমি মনের রাগ সামলাইয়া বলিলাম : ‘তবে কি যতদিন পশ্চিম পাকিস্তানী ভাইরা হিন্দুস্থানের রাজধানী দখল করিয়া আমাদিগকে উদ্ধার না করিবেন, ততদিন আমাদিগকে হিন্দুস্থানের মিলিটারি অকুপেশনে থাকিতে হইবে? আমাদের সহায়-সম্পত্তি, ধর্ম-কৃষ্টি ও মা-বোনের ই যৎ-অমতের ততদিন কি হাল হইবে?’

আমাদের প্রধান সেনাপতি-দেশরক্ষা মন্ত্রী নিরুদ্বেগে জবাব দিলেন, সামরিক বিশেষজ্ঞ হিসাবে তিনি সত্য কথাই বলিয়াছেন। সত্য গোপন করিয়া তিনি নিজের কর্তব্যে ক্রটি করিতে পারেন না।

আমি তখন বলিলাম : আপনার কথা সত্য ধরিয়া নিলেও ওটা কেবল সম্ভব হিন্দুস্থান পূর্ব-পাকিস্তান আক্রমণ করিলে। কিন্তু পূর্ব দক্ষিণ বা উত্তর দিক হইতে কেউ পূর্ব-পাকিস্তান আক্রমণ করিলে আপনারা আমাদেরে কিভাবে রক্ষা করিবেন? নিরপেক্ষ হিন্দুস্থান তার উপর দিয়া সৈন্য চালনা করিতে দিবে কেন?

আমাদের প্রধান সেনাপতি এ কথার জবাবে শুধু বলিলেন : হিন্দুস্থান ছাড়া আর কোনও দেশ পূর্ব-পাকিস্তান আক্রমণ করিবে না।

এমন এক-পা-ওয়ালা থিওরির উপর তর্ক চলে না। আমি তখন তকের মোড় ঘুরাইয়া আক্রমণাত্মক তর্ক শুরু করিলাম। তিনি যখন একবার আমাকে বলিলেন, এসব সামরিক ব্যাপার আমার মত উম্মি লোকের (লেম্যানের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়, তখন আমি জবাবে বলিলাম। আমি উম্মি বটে, কিন্তু একাধিক সামরিক বিশেষ আমাকে বলিয়াছেন ওয়েস্ট পাকিস্তান ইয ইনডিফেনসিবুল। ডিফেন্স-অব-ওয়েস্ট পাকিস্তান লাইফ ইন ইস্ট পাকিস্তান। পশ্চিম পাকিস্তান অরক্ষণীয়; পূর্ব-পাকিস্তানে দাঁড়াইয়াই পশ্চিম পাকিস্তান রক্ষা করিতে হইবে।

জেনারেল হাসিয়া আমার কথা উড়াইয়া দিতে গেলেন। কিন্তু আমি তাঁর বাধা ঠেলিয়া আমার কথিত সামরিক বিশেষজ্ঞদের যুক্তিটাও জেনারেলকে শুনাইলাম। আমি বলিলাম : ঐসব সামরিক বিশেষজ্ঞের অভিমত এই ছুরি যেমন সহজে কেক ভেদ করিয়া যায়, হিন্দুস্থানের সাজোয়া ট্যাংক বাহিনী তেমনি সহজে পশ্চিম পাকিস্তান ভেদ করিবে। পক্ষান্তরে নদী-নালা–জংগল-বহুল পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দুস্থান বাহিনীকে পূর্ব-পাকিস্তানের গেরিলা বাহিনীর হাতে নাজেহাল হইতে হইবে। অধিকন্তু হিন্দুস্থানের অধিকাংশ সামরিক টার্গেট পূর্ব-পাকিস্তানের বমিং রেঞ্জের মধ্যে হওয়ায় দুর্লংঘ্য পূর্ব-পাকিস্তান ভাসমান এয়ারক্র্যাফট-ক্যারিয়ারের কাজ করিবে।

জেনারেল আমার এই সব যুক্তির কোনও জবাব দিলেন না। শুধু মৃদু হাসিলেন। আমার অজ্ঞতার জন্যই বোধ হয় এই হাসি। কিন্তু আমি শেষে বলিলাম : সত্য কথা যেটাই থোক পাকিস্তানের মেজরিটি বাসিন্দার রক্ষার জন্য অন্ততঃ অর্ধেক সৈন্যবাহিনী ও অর্ধেক অস্ত্র তৈরির কারখানা পূর্ব-পাকিস্তানে মোতায়েন ও কায়েম করা দরকার। এবার জেনারেল হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিলেন : এটা সামরিক ব্যাপারে আপনার অজ্ঞতার আরেকটা প্রমাণ। আমাদের সৈন্যবাহিনী দুইভাগে বিভক্ত হইলে আমাদের যুদ্ধ-ক্ষমতা (স্ট্রাইকিং পাওয়ার) অর্ধেক হইয়া যাইবে।

ভিতর হইতে খানার তাকিদ পুনঃ পুনঃ আসিতে থাকায় আমরা শেষ পর্যন্ত উঠিলাম। কিন্তু পূর্ব-পাকিস্তান রক্ষার জন্য আমাদের দেশরক্ষা কর্তৃপক্ষ এর চেয়ে কোনও ভাল রাস্তার চিন্তা করেন না দেখিয়া আমার মনটা আরও বেশি খারাপ হইয়া গেল।

. দুই অঞ্চলের আপোসচেষ্টা

ডিনার টেবিলে প্রথমে খোশ-আলাপের আকারে এবং ডিনারের পরে গবর্নর শুরমানীর চেম্বারে বসিয়া উভয় পাকিস্তানের সমঝোতার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনার কথা সিরিয়াসলি আলোচিত হইল। এই আলোচনা চলিল ধারাবাহিক দুই-তিন দিন ধরিয়া অনেকগুলি বৈঠকে। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা স্পষ্ট ও দৃঢ়তার সাথে আমাদিগকে বুঝাইয়া দিলেন যে পূর্ব পাকিস্তানের এত্ত্ব ও সংখ্যা-গুরুত্বকে তাঁরা ভয় পান। মেজরিটির জোরে পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারে প্রাধান্য করিবে। সেজন্য দরকার দুই পাকিস্তানে প্রতিনিধিত্বের সংখ্যা-সাম্য। শুধু সংখ্যা-সাম্য হইলেও চলিবে না। পূর্ব পাকিস্তান একদম জোট বাঁধা এক-রংগা একটি ভূখণ্ডের একটি প্রদেশ। আর পশ্চিম পাকিস্তান পাঁচ ভাগে বিভক্ত পাঁচ-রংগা পাঁচটি প্রদেশ। পূর্ব পাকিস্তানীরা পশ্চিম পাকিস্তানীদের এই অনৈক্যের সুযোগ লইয়া তাদের মধ্যে অনবরত ভেদাভেদ সৃষ্টি করিবে এবং ‘ডিভাইড এন্ড রুল’-নীতি অবলম্বন করিয়া সারা পাকিস্তানে সর্দারি করিবে। অতএব, প্রথমতঃ পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যা গুরুত্ব মাইয়া সংখ্যা-সাম্য প্যারিটি আনিতে হইবে; দ্বিতীয়তঃ পশ্চিম পাকিস্তানের সবগুলি প্রদেশ ও দেশীয় রাজ্য একত্রিত করিয়া একটি মাত্র প্রদেশ করা মানিতে হইবে। এই দুইটা কাজই ইতিপূর্বেই গবর্নর-জেনারেলের অর্ডিন্যান্স বলে সমাধা হইয়াই গিয়াছিল। নয়া গণ-পরিষদে গবর্নর-জেনারেলের আদেশ-বলে ৮০ জন মেম্বর করা হইয়াছিল ৪০ ৪০ করিয়া। পূর্ব-বাংলার কৃষক-শ্রমিক পার্টি বিশেষতঃ তার নেতা হক সাহেব এই ব্যবস্থার প্রতিবাদ করিয়াছিলেন। আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানীও এই প্যারিটি-ব্যবস্থা মানিয়া লইতে অসম্মত হন। এই লইয়া আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটি ও আওয়ামী লীগ-ভুক্ত এম. এল. এ-দের যুক্ত সভার ঐতিহাসিক মারি-প্যান্ট একাধিক বৈঠক বসিয়াছিল। খুব জোরদার আলোচনা হইয়াছিল। শহীদ সাহেবের কথায় শেষ পর্যন্ত এটা জানা গিয়াছিল যে পূর্ব-বাংলার প্রতিনিধিত্বের প্যারিটি-ব্যবস্থা মানিয়া না নিলে নয়া পরিষদ গঠনে গবর্নর-জেনারেল ও পশ্চিম পাকিস্তানী নেতারা রাযী হইবেন না। অগত্যা আওয়ামী লীগ এই প্রতিনিধিত্বের প্যারিটি মানিয়া লইয়াছিল। কিন্তু এটা পরিষ্কার বোঝান হইয়াছিল যে শুধু নয়া গণ-পরিষদের বেলাই এই সংখ্যা-সাম্য মানিয়া লওয়া হইল। এটা অস্থায়ী ব্যবস্থা হইবে। বরাবরের জন্য এটা হইবে না। এসবই নয়া গণ-পরিষদ গঠনের আগের কথা।

কিন্তু মারিতে গবর্নরের ডিনার টেবিলে বসিয়াই আমরা বুঝিলাম, এই সংখ্যা সাম্যের দাবি পশ্চিম পাকিস্তানীদের স্থায়ী দাবি। পশ্চিম পাকিস্তানী নেতারা পাকে প্রকারে মোলায়েম ভাষায় আমাদেরে বুঝাইয়া দিলেন, কেন্দ্রীয় আইন-পরিষদে বরাবরের জন্য এই সংখ্যা-সাম্যের ব্যবস্থা না হইলে পশ্চিম পাকিস্তানবাসী কোনও শাসনত্ম গ্রহণ করিবে না। এক ইউনিট ব্যাপারেও তাঁরা এই অ্যাটিচুড গ্রহণ করিলেন। কথাবার্তায় আমাদের সমঝাইয়া দিলেন, ওটা পশ্চিম পাকিস্তানীদের নিজস্ব ঘরোয়া ব্যাপার। আমরা পূর্ব-পাকিস্তানীদের ও-ব্যাপারে কথা না বলাই ভাল। আমরা অবশেষে নিম্নলিখিত শর্তে পশ্চিম পাকিস্তানী নেতাদের এই দুইটি দাবি মানিয়া লইতে রাযী হইলাম। (১) শুধু প্রতিনিধিত্বে নয়, চাকরি-বাকরি, শিল্প-বাণিজ্য, অর্থ বন্টন সেনাবাহিনী ইত্যাদি সব-তাতেই সংখ্যা-সাম্য হইবে; (২) পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্ত শাসন দিতে হইবে; (৩) যুক্ত-নির্বাচন প্রথা প্রবর্তন করিতে হইবে; (৪) বাংলা ও উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করিতে হইবে।

৪. মারি-চুক্তি

আলোচনা দুই দিন ব্যাপী চার-পাঁচটি বৈঠকে সমাপ্ত হইল। নব গঠিত পশ্চিম পাকিস্তান প্রদেশের গবর্নর ও গণ-পরিষদের অস্থায়ী চেয়ারম্যান জনাব গুরমানীর চেম্বারেই এই আলোচনা সভার বৈঠক চলিতে থাকিল। প্রতিদিন দুই-এক-ঘন্টা করিয়া গণ-পরিষদের বৈঠক চলিত। বৈঠক শেষে নেতারা চেয়ারম্যানের চেম্বারে সমবেত হইতেন। অনেকক্ষণ ধরিয়াই এই আলোচনা চলিত। নবাব গুরমানী সাহেব ঠাণ্ডা মেজ ও মিঠা যবানের রাশভারী, ভদ্র ও পণ্ডিত লোক বুদ্ধি তাঁর চানক্যের মত তীক্ষ্ণ। তাঁর তর্কের ধারা ও আলোচনার এপ্রোচ হৃদয়গ্রাহী। প্রধানতঃ তাঁরই মধ্যস্থতায় অবশেষে পাঁচ দফার একটি চুক্তিপত্রের মুসাবিদা চূড়ান্ত হইল। এই পাঁচটি দফা এই

(১) পশ্চিম পাকিস্তানে এক ইউনিট

(২) পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন

(৩) সকল ব্যাপারে দুই অঞ্চলের মধ্যে সংখ্যা-সাম্য

(৪) যুক্তনির্বাচন

(৫) বাংলা-উর্দু রাষ্ট্রভাষা।

প্রথমে স্থির হইয়াছিল প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী ও নবাব গুরমানী মুসলিম লীগের, প্রকারান্তরে পশ্চিম পাকিস্তানের, পক্ষ হইতে এবং জনাব হক সাহেব ও জনাব সুহরাওয়ার্দী সাহেব অবিভক্ত যুক্তফ্রন্টের, প্রকারান্তরে পূর্ব পাকিস্তানের, পক্ষ হইতে উক্ত চুক্তিনামার স্বাক্ষর করিবেন। উক্ত নেতাদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী, নবাব গুরমানী ও জনাব শহীদ সুহরাওয়ার্দীর দস্তখত হওয়ার পর নবাব গুরমানী আমাদের জানান যে হক সাহেব দস্তখত করিতে অস্বীকার করিয়াছেন। আমরা বিস্মিত দুঃখিত ও চিন্তাযুক্ত হইলাম। আঞ্চলিক পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের ও যুক্ত নির্বাচনের ভিত্তিতে পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে এই আপোস হওয়ায় সকলেই খুশী হইয়াছিলেন। সারা দেশে একটা নূতন উৎসাহ-উদ্দীপনার স্পন্দন ও আশার আলো দেখা দিয়াছিল। হক সাহেবের মত প্রবীণ ও দূরদর্শী নেতা এমন একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করিলেন না কেন তা আমরা প্রথমে বুঝিতে পারি নাই। গুরমানী সাহেব তাঁর স্বাভাবিক রসিকতাপূর্ণ ভাষায় আমাদেরে হক সাহেবের আপত্তির কারণ বুঝাইয়া দিলেন। সে কারণ এই যে হক সাহেব শহীদ সাহেবকে পূর্ববাংলার প্রতিনিধি মনে করেন না। কাজেই তাঁর সাথে তিনি পূর্ব-বাংলার পক্ষে দস্তখত করিতে রাযী নন। পূর্ব-বাংলার প্রতিনিধিরূপে জনাব আতাউর রহমান ও আবুল মনসুর দস্তখত দিলে হক সাহেব দস্তখত দিতে রাযী আছেন। হক সাহেব শহীদ সাহেবকে অপদস্থ করিবার মতলবেই এ কথা বলিয়াছেন এতে আমাদের কোনও সন্দেহ রহিল না। ফলে আতাউর রহমান ও আমি দস্তখত দিতে অস্বীকার করিলাম এবং হক সাহেব ও শহীদ সাহেবের দস্তখতেই চুক্তিপত্র সম্পাদনের জন্য যিদ করিলাম। কিন্তু শহীদ সাহেব আমাদের এই মনোভাবের প্রতিবাদ করিলেন এবং দস্তখত দিতে আমাদেরে রাযী করিলেন। কাজেই দুই অঞ্চলের পক্ষ হইতে দুইজন করিয়া চারজনের বদলে চারজন করিয়া আট জনের দস্তখতের ব্যবস্থা হইল। পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষ হইতে আতাউর রহমান ও আমার দস্তখত হওয়ায় পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষে চৌধুরী মোহাম্মদ আলী ও ডাঃ খান সাহেবের দস্তখত লওয়া হইল। ৮ই জুলাই তারিখে নবাব গুরমাণী সংবাদপত্রে এক বিবৃতিতে এক সুসংবাদ রূপে এই চুক্তিনামার কথা ঘোষণা করিলেন। এই বিবৃতিতে তিনি বলিলেন যে উভয় অঞ্চলের সন্তোষজনক রূপে এই চুক্তিনামা সম্পাদিত হইয়াছে।

৫. প্রধানমন্ত্রিত্বের সমঝোতা

এই চুক্তি সম্পাদন দেশের সর্বত্র একটা নূতন আশার সঞ্চার করিল বলিয়া আমি অনুভব করিলাম। যাঁদের সাথেই আমার আলাপ হইল তাঁদের সকলেই ঐ মতের বলিয়া মনে হইল। ব্যক্তিগতভাবে আমার বিশ্বাস হইল যে বাস্তবিকপক্ষে এই দিন হইতেই পাকিস্তানের ভিত্তি স্থাপিত হইল। এই বিশ্বাসের আরেকটি কারণ ছিল এই যে, পাঁচ দফার বাস্তবায়নের একটা গ্যারান্টিও আমরা পাইয়াছিলাম। সে গ্যারান্টি ছিল এই যে পাঁচ দফার অতিরিক্ত একটি অলিখিত শর্ত ছিল শহীদ সাহেবের প্রধানমন্ত্রিত্ব। শহীদ সাহেবের প্রধানমন্ত্রিত কোনও ব্যক্তিগত দাবি ছিল না। পাঁচ দফার রূপায়ণের জন্যই ছিল উহা অপরিহার্য। ঐ পাঁচ দফা ছিল পাকিস্তানী জাতীয়তার বুনিয়াদী মসলা। একটু গভীরভাবে চিন্তা করিলেই বোঝা যাইবে যে ঐ পাঁচটি দফাই পরস্পরের সহিত অংগাংগিভাবে জড়িত। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা দুই অঞ্চলের মধ্যে প্রতিনিধিত্বের প্যারিটি দাবি করিলেন পূর্ব-পাকিস্তান সংখ্যা গুরুত্ত্বকে তাঁরা তয় করেন বলিয়া। পশ্চিম পাকিস্তানী ভাইদের মন হইতে ভয় দূর করিবার উদ্দেশ্যে যদি প্যারিটি মানিতে হয়, তবে পূর্ব পাকিস্তানীরা পৃথক নির্বাচনের মাধ্যমে মাইনরিটি না হইয়া যায় সে ভয়টা দূর করিবার ব্যবস্থা হওয়া দরকার। বস্তুতঃ পৃথক নির্বাচনে হিন্দুদের আসন (পূর্ব-পাকিস্তানের কোটার এক-চতুর্থাংশ) পূর্ব-পাকিস্তানের কোটা হইতেই যাইবে। পৃথক-নির্বাচনে মুসলিম ভোটারদের কাছে হিন্দু প্রতিনিধিদের কোনও দায়িত্ব থাকিবে লো। তারা পৃথক দল করিবে। সে অবস্থায় মুসলিম লীগ যদি আবার দেশ শাসনের ভার পায়, তবে সে পার্টিতে পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলিম মেম্বারদের মোকাবিলায় পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম মেম্বররা সংখ্যালঘু হইয়া পড়িবেন। সুতরাং পূর্ব পাকিস্তানী প্রতিনিধিরা যাতে সাম্প্রদায়িক দলে বিভক্ত না হইয়া ঐক্যবদ্ধ থাকিতে পারে সেজন্য যুক্ত নির্বাচন অত্যাবশ্যক। দুইটি অঞ্চলের মধ্যে সাধারণ গণতন্ত্রের ব্যতিক্রমে যদি প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য আনিতে হয়, তবে সেটা করা যুক্তিসঙ্গত হইবে কেবলমাত্র দুইটি অঞ্চলকে লাহোর-প্রস্তাব ভিত্তিক দুইটি ‘অটমাস ও সরেন স্বন্ত্র রাষ্ট্রীয় সত্ত্বা কল্পনা করিয়া। সেই অবস্থায় পাকিস্তান হইবে সত্যিকার ফেডারেল রাষ্ট্র। তা যদি হয় তবে ফেডারেশনের সকল ক্ষেত্রে : চাকরি-বাকরিতে, শিল্প-বাণিজে, কেন্দ্রীয় ও বিদেশী সাহায্য বন্টনে, এবং দুই অঞ্চলে ভৌগোলিক দূরত্ব বিবেচনা করিয়া সৈন্যবাহিনীতেও, ভারসাম্য আনিতে হইবে। পূর্ব-পাকিস্তানীরা যাতে পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে ভেদ-নীতি চালানোর সুযোগ না পায় সে জন্য ঐ সব প্রদেশ ভাংগিয়া পশ্চিম পাকিস্তানকে পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায় এক প্রদেশ করিতে হইবে। এটা যদি উচিৎ বিবেচিত হয়, তবে পশ্চিম পাকিস্তানীরা যাতে পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে ভেদ-নীতি চালানোর সুযোগ না পায় যুক্ত নির্বাচনের মাধ্যমে সেটাও সুনিশ্চিত করিতে হইবে। তাছাড়া আরেক কারণে পশ্চিম পাকিস্তানকে এক রাষ্ট্রীয় সত্ত্বা হইতে হইবে। পূর্ব-পাকিস্তানের পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্ত শাসনের দাবি-মোতাবেক রেলওয়ে, ডাক ও তার, টেলিফোন, ব্রডকাস্টিং, সেচ এবং গ্যাস ও পানি বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রভৃতি বড় বড় বিষয় আঞ্চলিক সরকারের হাতে দিতে হইবে। সে কারণেও পশ্চিম পাকিস্তানকে একটিমাত্র প্রদেশে রূপান্তরিত করা দরকার। বস্তুতঃ প্রধানতঃ এই যুক্তিতেই পশ্চিম-পাকিস্তানী নেতারা পূর্ব-পাকিস্তানী নেতাদেরে এক ইউনিটের নীতি গ্রহণ করাইতে পারিয়াছিলেন। বাংলা ও উর্দুকে দুইটি সমমর্যাদায় রাষ্ট্রভাষা করার দাবিকে পশ্চিম পাকিস্তানী নেতারা নিজেরা প্যারিটি দাবি করার পরে আর ঠেকাইয়া রাখিতে পারিলেন না।

বস্তুতঃ পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি পূর্ব পাকিস্তানের ছিল এটা নয়া এপ্রোচ। শহীদ নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পার্টি নীতি-হিসাবেই এটা গ্রহণ করিয়াছিল। ফলে গণ পরিষদের প্রথম বৈঠকেই এই নয়া-নীতি ঘোষণা করা হয়। শহীদ সাহেব তখন মন্ত্রিসভার মেম্বর ছিলেন বলিয়া নিজের মুখে এই নীতি ঘোষণা না করিয়া আমার মুখ দিয়া কওয়াইয়াছিলেন। আমার বক্তৃতায় আমি বলিয়াছিলাম পূর্ব-বাংলায় মুসলিম লীগ নেতৃত্ব মনে করিতেন পশ্চিম পাকিস্তান চারটি প্রদেশে বিভক্ত থাকাই পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থের অনুকূল। তাঁরা বিশ্বাস করিতেন, এই বিভেদের সুযোগ লইয়া পূর্ব পাকিস্তানীরা করাচি বসিয়াই গোটা পাকিস্তান শাসন করিবে। ঢাকায় স্বায়ত্তশাসন নিবার দরকার নাই। আমরা আওয়ামী লীগাররা এই নীতিতে বিশ্বাসী নই। আমরা চাই পশ্চিম পাকিস্তানের সবগুলি প্রদেশ ঐক্যবদ্ধ হইয়া পূর্ব-বাংলার সমান স্বায়ত্ত শাসিত হউক। সমান ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী স্বায়ত্তশাসিত দুইটি অঞ্চলের বুঝা-পড়া ও আদান-প্রদানের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী পাকিস্তান গড়িয়া উঠুক, এটাই আওয়ামী লীগের নীতি ও আদর্শ। সমবেত পশ্চিম পাকিস্তানী মেম্বাররা তুমূল হর্ষ ধ্বনি ও করতালিতে এই নীতিকে অভিনন্দিত করিয়াছিলেন। কিন্তু পরে আদান প্রদানের বেলা তাঁরাই ‘বাংগালকে হাইকোট’ দেখাইয়াছিলেন।

৬. কৃষক-শ্রমিক পার্টির দলীয় সংকীর্ণতা

কিন্তু শহীদ সাহেকে প্রধানমন্ত্রিত্বের দাবিটা পূর্ব-পাকিস্তানের সকলের দাবি ছিল না। বরঞ্চ যুক্তফ্রন্টের অন্যতম প্রধান অংশ কৃষক-শ্রমিক পার্টি ও তার নেতা হক সাহেব শহীদ সাহেবের প্রধানমন্ত্রিত্বের বিরোধীই ছিলেন। এর কোনও নীতিগত কারণ ছিল না। ব্যক্তিগতই ছিল বেশি। মাত্র পাঁচ-ছয় মাস আগে ১৯৫৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আওয়ামী লীগ পার্টি যুক্তফ্রন্ট নেতা হক সাহেবের বিরুদ্ধে যখন অনাস্থা-প্রস্তাব দেয় এবং যার ফলে যুক্তফ্রন্ট ভাংগিয়া যায়, সেই সময় আমি উভয় দলের কাছে একটি আপোস প্রস্তাব দিয়াছিলাম। সেটি ছিল এই : যুক্তফ্রন্টের প্রাদেশিক নেতা হক সাহেব এবং কেন্দ্রীয় নেতা শহীদ সাহেব, এটা যুক্তফ্রন্ট পার্টি ফর্মাল প্রস্তাবাকারে মানিয়া নিতে হইবে। কৃষক-শ্রমিক পার্টির অনেকে এবং আওয়ামী লীগ পার্টির কেহ কেহ এই ফর্মুলা মানিয়া লইতে রাযী ছিলেন। কিন্তু শহীদ সাহেব স্বয়ং এই অপোসে ব্যক্তিগতভাবে সক্রিয় সাপোর্ট না দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত এই ফর্মুলা গৃহীত হয় নাই। ফলে যুক্তফ্রন্ট ভাংগিয়া যায়। হক সাহেবের দল প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলীর সাথে মিশিয়া তয়-তদবির করিয়া পূর্ববাংলার মন্ত্রিত্ব দখল করেন।

এই পরিবেশে কেন্দ্রের প্রধানমন্ত্রিত্বের জন্য শহীদ সাহেবকে কৃষক-শ্রমিক পার্টি সমর্থন করিবে, এটা আশা করা বাতুলতা। পশ্চিম পাকিস্তানী নেতারা এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলীও এটা জানিতেন। তবু মোহাম্মদ আলীর, সম্ভবত, আড়ালে পশ্চিম পাকিস্তানী নেতারা আমাদের সাথে এই অলিখিত চুক্তি করিয়াছিলেন এবং আমরা তাঁদের ওয়াদায় বিশ্বাস করিয়াছিলাম। পূর্ব-পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার সাহেব গণ-পরিষদের মেম্বর না হইয়াও মারিতে হাযির হইলেন এবং মোহাম্মদ আলীর প্রধানমন্ত্রিত্ব বহাল রাখিবার চেষ্টা-তদবির করিলেন। আবু হোসেন সরকার আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। রাজনৈতিক বর্তমান মতভেদ আমাদের সে বন্ধুত্ব নষ্ট করিতে পারে নাই। তাঁর সাথে দেখা করিলাম। অনেক তর্ক-বিতর্ক করিলাম। বোঝা গেল, তিনি হক সাহেবের নির্দেশেই মোহাম্মদ আলীর সমর্থন তথা শহীদ সাহেবের বিরোধিতা করিতেছেন। পূর্ব-বাংলার গণপ্রতিনিধি ঐতিহাসিক নির্বাচন বিজয়ী যুক্তফ্রন্টের দুই অংশ আজ ক্ষমতা দখলের আশায় পরাজিত কেন্দ্রীয় সরকারেই দুইটি মুরুব্বি ধরিয়াছি : তাঁরা ধরিয়াছেন মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলীকে; আমরা ধরিয়াছি সরকারী কর্মচারি বড়লাট গোলাম মোহাম্মদকে। অদৃষ্টের কি পরিহাস। উভয় বন্ধুই দুঃখের হাসি হাসিলাম। কিন্তু তখন বুঝি নাই, পরে বুঝিয়াছিলাম, বন্ধুবর ঐ দুঃখের হাসির নিচে একটি মিচকি হাসি হাসিয়াছিলেন। তার কারণ ছিল। প্রাদেশিক মন্ত্রিত্ব দখলের বেলা আমাদের মুরুব্বি ফাঁকি দিয়াছিলেন। তাঁদের মুরুব্বির কথা ঠিক রাখিয়াছিলেন। কেন্দ্রের প্রধান মন্ত্রিত্বের বেলাও আমাদের মুরুব্বি আবার ফাঁকি দিতে পারেন, বন্ধুবরের মিচকি হাসির ভাই ছিল তাৎপর্য।

আমার নিজের এবং আমাদের দলের আরও দুই-একজনেয় সে আশংকা ছিল। কিন্তু শহীদ সাহেব আমাদের সন্দেহকে তুড়ি মারিয়া উড়াইয়া দিতেন। প্রচলিত কনভেনশন অনুসারে এবার প্রধানমন্ত্রীকে পূর্ব-পাকিস্তানী হইতেই হইবে। কারণ বড়লাট গোলাম মোহাম্মদ পশ্চিম পাকিস্তানী। সে হিসাবে ভূতপূর্ব যুক্তফ্রন্ট অর্থাৎ আওয়ামী লীগ বা কে. এস. পি-র একজনকে প্রধানমন্ত্রী করিতেই হবে। পূর্ব সমঝোতা মতে এবং হক সাহেব প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রাথ না থাকায় সকলেই ধরিয়া লইলেন শহীদ সাহেবই একমাত্র প্রার্থী এবং যোগ্যতায় তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এ অবস্থায় কে, এস, পি-র কেউ-কেউ বিশেষতঃ বন্ধুবর আবু হোসেন তলে-তলে বগুড়ার প্রধানমন্ত্রিত্ব বহাল রাখিবার চেষ্টা করিতেছেন, এ গুজবে আমাদের অনেকেই বিশেষ আমল দিলেন না। কারণ কৃষক-শ্রমিক সদস্যরা মুসলিম লীগারকে প্রধানমন্ত্রী করিবেন, এটা অবিশ্বাস্য। কিন্তু পর-পর দুইটা আকস্মিক ঘটনায় বা ঘোষণায় আমরা আওয়ামীরা নিরাশ হইলাম; কোনও কোনও কে. এস. পি. নেতা দাঁত বাহির করিলেন; মুসলিম লীগ-নেতারা আস্তিনের নিচে মুচকি হাসিলেন। ঘটনা বা ঘোষণা দুইটি এই : জনাব গুরমানী আমাদের জানাইলেন, ঘোরতর অসুস্থতা হেতু গবর্নর জেনারেল করাচি হইতে নড়িতে পারেন না। কাজেই তাঁর মারি আসা ও মন্ত্রিসভার পুনর্গঠন উভয়টাই স্থগিত। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইস্কান্দর মির্যা আমাদেরে একটা টেলিগ্রাম দেখাইয়া বলিলেন, আফগানিস্তান আমাদের সীমান্তে বিপুল সৈন্যবাহিনী সমাবেশ করিয়াছে। সম্ভবতঃ আমাদের সীমান্তে প্রবেশ করিয়াছে। কাজেই এটা মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের জন্য মোনাসের সময় নয়।

রুটিন কাজ শেষ করিয়া গণ-পরিষদ ১২ই জুলাই মূলতুবি হইয়া গেল। ৮ই আগস্ট করাচিতে পরবর্তী অধিবেশন হওয়া স্থির হইল। আমরা কতিপয় বন্ধু মারি হইতে আযাদ কাশির সরকারের রাজধানী মোযাফফরাবাদ গেলাম। যুদ্ধ-বিরতি সীমারেখা পর্যন্ত ভ্রমণ করিলাম। পাকিস্তান সরকারের কাশির দফতরের সেক্রেটারি মিঃ আযফার সি, এস, পি, ও আযাদ কাশ্মির সরকারের চিফ সেক্রেটারি মিঃ আযিযুল্লা হাসান সি. এস. পি. আমাদের সংগে-সংগে থাকিয়া সকল প্রকার সুখ সুবিধার ব্যবস্থা করিলেন। আযাদ কাশ্মির হইতে ফিরিবার পথে আমি ও বন্ধুবর আতাউর রহমান এবোটাবাদে কাশ্মিরী নেতা জনাব চৌধুরী গোলাম আবাসের সংগে সাক্ষাৎ ও অনেকক্ষণ আলাপ-আলোচনা করিলাম। তথা হইতে রাওলপিণ্ডি ও লাহোর ঘুরিয়া আমরা ১৭ জুলাই তারিখে ঢাকা ফিরিয়া আসিলাম।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *