৮
পূর্ণিয়ার কেল্লার সদর দরওয়াজায় এসে ঘোড়া থেকে নামলেন হাবিব বেগ। মুর্শিদাবাদ দরবারের এক দাপুটে ওমরাহকে দেখে পথ ছেড়ে দাঁড়াল রক্ষীরা। তোরণদ্বার পেরিয়ে হাবিব বেগ দ্রুত ঢুকে গেলেন দুর্গের ভিতরে। তাঁর সঙ্গে রয়েছে জরুরি চিঠি। এ চিঠি ছোটে নবাব ছাড়া অন্য কারও হাতে দেওয়া যাবে না। বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ছোটে নবাবের সঙ্গে এখনই তাঁর দেখা করা দরকার।
কিন্তু আলিবর্দির মেজো নাতি, পূর্ণিয়ার নবাব, শওকত জঙ্গের দেখা পাওয়া এখন অমাত্য, ওমরাহ কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। জেনানামহলের ভিতরে খোলা আকাশের নীচে, কৃষ্ণচূড়া গাছের ছায়ায়, শ্বেতপাথরের দিবানের উপর নরম গদিতে বসে শরাবের পাত্র হাতে বাঁদি ও নর্তকীদের স্নান দেখছেন ছোটে নবাব।
স্বল্পবসনা সুন্দরী বাঁদির দল আভের পাখা নেড়ে বাতাস করছে তাঁকে। চারিদিকে ভুরভুর করছে গুলাব জল ও আতরের খুশবু। পাথরে বাঁধানো কৃত্রিম সরোবরে জলকেলিরত একদল বাঁদি ও নর্তকীর অনাবৃত বক্ষদেশ জেগে আছে জলের উপরে। এই সুদর্শনাদের ভিড়ে, ভাঙের নেশায় বেসামাল নবাবের ঢুলুঢুলু দুই চোখ খুঁজে চলেছে শুধু একজনকে। তার নাম খুশবু বাই। শওকত জঙ্গের হারেমের নয়া তাজ। খুশবু বাইয়ের সুর ও শরীর দুটোতেই আজকাল অহোরাত্র বুঁদ হয়ে থাকেন নবাব। অমাত্যরা রাজ্য চালনার জন্য দুটো জরুরি কথা সেরে নেওয়ার অবকাশ পান না।
কয়েক মাস আগে রাজমহলে চিতাবাঘ শিকারে গিয়েছিলেন পূর্ণিয়ার ছোটে নবাব শওকত জঙ্গ। চিতাবাঘ দেখা দিয়েছিল ঠিকই কিন্তু শরাবের নেশায় বেসামাল নবাবের কম্পমান দুই হাত বন্দুককে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলি মর্মর শব্দে শুধু একটা পলাশ গাছের ডাল ভাঙে। চকিতে অদৃশ্য হয়ে যায় চিতা। শত চেষ্টাতেও সে যাত্রায় আর বাঘের দেখা পেলেন না শওকত জঙ্গ। বিফল মনোরথে ফিরছিলেন পূর্ণিয়ায়। মণিহারির কাছে এসে ফের শিকারের সন্ধান পেলেন। তবে এবারে বাঘ নয়, হরিণী।
গঙ্গার পাড়ে এক নিরিবিলি জায়গায় নোঙর করেছে বজরা। মুজরোর সন্ধানে, আশরফির আশায় খুশবু বাই চলেছে মুর্শিদাবাদে। সামনেই বেরা উৎসব। এ সময়ে রংদার হয়ে ওঠে মুর্শিদাবাদ নগরী। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বাইজিরা এসে জড়ো হয়। মুজরোতে কোনও মনসবদারের নজরে পড়ে গেলে সারা জীবনের সুখ খরিদ করা যায় এক মওকায়। মামুলি এক তওয়ায়েফ কোনও এক জাদুকাঠির ছোঁয়ায় রাতারাতি বেগমও বনে যেতে পারে। এসব কহানি অনেক শুনেছে খুশবু, আরব্যরজনীর কহানির মতো শোনায়, ঠিক বিশ্বাস হতে চায় না।
তখন সন্ধে নামছে। কিচিরমিচির শব্দে ঘরে ফিরছে পাখির দল। গঙ্গার উপর ঝুঁকে পড়া এক ঝাঁকড়া অশ্বত্থ গাছের শাখায় নিজের পেশোয়াজ ও কুর্তি ঝুলিয়ে রেখে পল্লবগুচ্ছের আড়ালে নিজের শরীরকে উন্মুক্ত করে নাইতে নেমেছিল খুশবু। উত্তর ভারতের পাহাড়ে ঘেরা এক গণ্ডগ্রামে ফেলে আসা নিজের ঘরের কথা, শৈশবের কথা ভাবতে ভাবতে সে আনমনা হয়ে পড়েছিল।
জল ছেড়ে ডাঙায় উঠতে গিয়ে পুরুষের কণ্ঠ শুনে তার সম্বিত ফেরে।
‘বহুত সুন্দর। তুম কৌন হো পিয়ারি?’
চমকে ওঠে খুশবু। পাড়ে দাঁড়িয়ে তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে এক যুবক। পরনে ঝলমলে পোশাক। মাথায় উষ্ণীষ। কোমরে তলোয়ার।
লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে খুশবু বাই। যুবকটি একদৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে তার নগ্ন শরীরের দিকে। যেভাবে সে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তাতে তাঁকে এড়িয়ে পাড়ে ওঠার কোনও উপায় নেই। বুকের সামনে দুহাত জড়ো করে সুরভিত যৌবনের সম্পদকে আড়াল করার বৃথা চেষ্টা করে খুশবু। মাথা নীচু করে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপতে থাকে।
শওকত জঙ্গ বললেন, ‘ডরো মাত। আও মেরে সাথ।’
পথ ছেড়ে দাঁড়ালেন শওকত জঙ্গ। গাছের শাখা থেকে পেশোয়াজ ও কুর্তি নিয়ে ত্রস্ত হরিণীর মতো ঝোপের আড়ালে অদৃশ্য হল খুশবু।
নসিবের খোঁজে খুশবু বাইকে আর মুর্শিদাবাদে যেতে হয়নি। মণিহারিতেই নসিব ফিরে গেল। আরব্যরজনীর কহানি সত্যি হল। এক আজনবি তওয়ায়েফ হয়ে উঠল পূর্ণিয়ার নায়েব-নাজিম শওকত জঙ্গের পিয়ারি।
দরবার কক্ষের বাইরে পায়চারি করছিলেন গোলাম হোসেন। তলব হয়েছে সাতসকালে। ছোটে নবাব শওকত জঙ্গকে লেখাপড়া শেখাতে হবে। দরবারে এসে তিনি দেখলেন অনেকেই ছোটে নবাবের জন্য অপেক্ষারত। বিরক্ত বোধ করলেন গোলাম হোসেন। সদ্য একটা কিতাব লেখার কাজে হাত দিয়েছেন। সেই কাজ ছেড়ে উঠে আসতে হল। এখন কতক্ষণ যে অপেক্ষা করতে হবে তার ঠিক নেই।
শওকত জঙ্গকে লেখাপড়া শেখানো গোলাম হোসেনের কাছে দুঃস্বপ্নের মতো। শিক্ষকের হাঁফ ধরে যায়, পড়া এগোয় না। নবাব এই শেখেন তো এই ভোলেন। মাথাটি একেবারে সরেস। অনেকদিনের চেষ্টায় কোনও রকমে নিজের নামটা দস্তখত করতে শিখেছেন। কিতাব নিয়ে স্থির হয়ে বসার ধৈর্য নেই, শুধু ছটফট করেন। মাঝেমাঝে ছাত্রই শিক্ষকের কান মুলে দিয়ে বলেন, ‘কিছুই তো শেখাতে পারছেন না দেখছি। শুধু শুধু তনখা গুনছি আমি।’
নীরবে অপমান সহ্য করেন গোলাম হোসেন।
হন্তদন্ত হয়ে হাবিব বেগকে দরবারের দিকে আসতে দেখে অবাক হলেন গোলাম হোসেন। হাবিব বেগ মুর্শিদাবাদের এক দাপুটে ওমরাহ। হঠাৎ পূর্ণিয়ায় তার আগমনের হেতু?
গোলাম হোসেন শুধোলেন, ‘কী সমাচার? সব খুশ তো?’
জবাবে হাবিব বেগ বললেন, ‘জরুরি চিঠি আছে।’
গোলাম হোসেন শুধোলেন, ‘কী চিঠি, কার চিঠি? কে পাঠালেন আপনাকে?’
‘ইয়ে মাত পুছিয়ে। চিঠিটা স্রেফ নবাবের হাতে দেওয়ার হুকুম আছে।’
‘কার হুকুম?’
‘জনাব জাফর আলি খাঁর।’
গলা খাটো করে গোলাম হোসেন প্রশ্ন করলেন, ‘কোই সাজিস কি বাত?’
চমকে গেলেন হাবিব বেগ। ‘আপনি জানলেন কেমন করে?’
মৃদু হেসে দাড়িতে হাত বুলিয়ে নিজের মনেই গোলাম হোসেন বললেন, ‘আন্দাজ সাহি হ্যায়।’
‘কথাটা গোপন রাখবেন গোলামজি।’
‘কোথায় আপনার চিঠি? দেখি।’
ইতস্তত করতে করতে হাবিব বেগ বললেন, ‘লেকিন…’
‘আপনি তো আশ্চর্য বেওকুফ। আমার কাছে চিঠির কথা গোপন করে কিছু ফয়দা হবে? এই চিঠি তো আমাকেই পড়ে দিতে হবে। ছোটে নবাব কি নিজে পড়তে পারেন?
হাবিব বেগ জানেন কথাটা মিথ্যে নয়। চিঠি পড়ার মতো ভাষাজ্ঞান শওকত জঙ্গের নেই। গোলাম হোসেনই ছোটে নবাবের মুনশিগিরির কাজটা করে থাকেন। চিঠিটা গোলাম হোসেনের হাতে তুলে দিলেন হাবিব বেগ।
চিঠিতে চোখ বুলিয়ে গোলাম হোসেন বুঝলেন, যা অনুমান করেছিলেন ঠিক তাই। এমনটা যে ঘটতে চলেছে তার আভাস তিনি আগেই পেয়েছিলেন। মুর্শিদাবাদ দরবারের প্রবীণ ওমরাহরা সিরাজের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসছেন। এতদিন খবরটা উড়ছিল বাতাসে। এবার সত্যতা যাচাই করা গেল।
পূর্ণিয়ার ছোটে নবাবকে জাফর আলি খাঁ লিখেছেন, ‘…জনাব আপনিই আমাদের ভরসা। আমাদের বাঁচান। নবাব সিরাজদ্দৌলার জমানায় প্রবীণ আমীর, ওমরাহ, জমিদারদের দরবারে কোনও ইজ্জত নেই। ইনকিলাবের জমিন তৈরি হয়েছে। আপনি মুর্শিদাবাদে হামলা করলে অনেকেই আপনাকে মদত দেবে। আমরা তৈয়ার হয়েই আছি। তাছাড়া আর একটা কথা, বাংলার মসনদের উপর আপনার দাবিও খুব একটা কম নয়। আপনিও আলিবর্দি খাঁর দৌহিত্র, সিরাজদ্দৌলার চেয়ে অনেক যোগ্যতম ব্যক্তি।
পড়ার পর চিঠিটা নিজের জোব্বার অভ্যন্তরে চালান করে দিলেন গোলাম হোসেন।
হাবিব বেগ বললেন, ‘ছোটে নবাবের জবাব চাই গোলামজি। জবাব নিয়ে তুরন্ত ফিরতে হবে মুর্শিদাবাদে।’
‘জবাব পাবেন। তবে তুরন্ত পাবেন কি না বলতে পারি না।’
‘দরবারে আজ আসবেন না নবাব?’
‘তা বলা মুশকিল। আসতেও পারেন আবার নাও আসতে পারেন।’
‘ছোটে নবাবের তবিয়ত ঠিক নেই বুঝি?’
‘তবিয়ত, মেজাজ সবই শরিফ আছে।’
‘তাহলে? তকলিফ কীসের?’
‘নবাবের নতুন পিয়ারি। অন্দরমহলেই নবাব আজকাল বেশি সময় থাকেন।’
হাবিব বেগকে অবশ্য নবাবের দেখা পাওয়ার জন্য বেশিক্ষণ বেগ পেতে হল না। খানিকবাদেই খবর হল, দরবারে আসছেন ছোটে নবাব।
শওকত জঙ্গ দরবারে এসে বসতেই উৎসাহের আতিশয্যে এগিয়ে গিয়ে কুর্নিশ করে হাবিব বেগ বললেন, ‘সেলাম হুজুর। সাহি সালামত।’
হঠাৎ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে শওকত জঙ্গ বললেন, ‘ইয়ে বেতমিজ কৌন হ্যায়?’
বেতমিজির কী হল বুঝে উঠতে পারলেন না হাবিব বেগ। তবে গোলমালটা কোথায়, বুঝলেন গোলাম হোসেন। তিনি ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন, ‘আলমপনা, ইনি হাবিব বেগ। মুর্শিদাবাদ দরবারের ওমরাহ। জাফর আলি খাঁর কাছ থেকে জরুরি চিঠি নিয়ে এসেছেন।’
গর্জন করে উঠে শওকত জঙ্গ বললেন, ‘কীসের ওমরাহ? দরবারি সবক জানে না? নিকাল দো ইয়ে গর্ধব কো।’ ছোটে নবাবের এই মারমুখী মেজাজ দেখে ঘাবড়ে গেলেন হাবিব বেগ। নিজের কসুর কোথায় হল কিছুই বুঝতে পারছেন না।
শওকত জঙ্গের এমন আচরণের কারণ কী? ছোটে নবাব কি উন্মাদ হয়ে গিয়েছেন?
মনে মনে হাবিব বেগ ভাবলেন, এ কাকে মসনদে বসানোর ফন্দি এঁটেছেন জাফর আলি খাঁ, জগৎশেঠসহ তামাম ওমরাহের দল…এ যে সিরাজদ্দৌলার চেয়েও ভয়ংকর!
হতভম্বের মতো হাবিব বেগকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বেজায় চটে গিয়ে শওকত জঙ্গ বললেন, ‘জুতে মারো ইয়ে বেওকুফকো।’
গোলাম হোসেন অনেক করে ছোটে নবাবের রাগ প্রশমনের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন।
কয়েকজন রক্ষী এসে হাবিব বেগকে ধাক্কা মেরে বের করে দিল দরবার থেকে।
রেগেমেগে কুরসি ছেড়ে উঠে পড়লেন শওকত জঙ্গ। দরবার ভেঙে গেল। মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলেন গোলাম হোসেন।
আসলে বিষয় হল, ‘হুজুর’ বলে সম্বোধনে চটেছেন ছোটে নবাব। খুশবু বাই একদিন ‘আলমপনা’ বলে সম্বোধন করেন নবাবকে। সেই থেকে ফরমায়েশ হয়েছে, সবাই ছোটে নবাবকে ‘আলমপনা’ বলে সম্বোধন করবেন। ‘আলমপনা’ বলা হয় দিল্লির বাদশাকে। আলমপনা সম্বোধন পূর্ণিয়ার ছোটে নবাবের জন্য নয়, এমনকী বাংলার নবাবকেও এই অভিধায় ভূষিত করা যায় না। এ কথা মূর্খ শওকত জঙ্গকে বোঝাবে কে?
মনে মনে হাসলেন গোলাম হোসেন। একদিক থেকে ভালোই হল, সিরাজের বিকল্প হিসেবে কাকে মসনদে বসাতে চাইছেন মুর্শিদাবাদের প্রবীণ ওমরাহের দল সেটা হাবিব বেগ নিজের চোখে দেখে গেলেন। পূর্ণিয়ার অন্দরের সব খবর তো আর মুর্শিদাবাদে পৌঁছয় না।
সপ্তাহ দুয়েক পর শওকত জঙ্গের জবাবি চিঠি এল মুর্শিদাবাদে। চিঠিটা পড়ে রাগে উন্মত্ত হয়ে গেলেন সিরাজদ্দৌলা। সিরাজের মুখচোখের অভিব্যক্তি দেখে মোহনলাল ছাড়া আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ওমরাহের দল ছিটকে সরে গেলেন।
শওকত জঙ্গ লিখেছেন, ‘…শাহি ফরমান আমার হাতে। বর্তমানে আমিই সুবে বাংলার নবাব। তুমি আমার রিস্তেদার। তোমার খুন ঝরানোর ইচ্ছে আমার নেই। নবাবি ছেড়ে কোনও নিরিবিলি জায়গায় পালিয়ে যেতে পারো, আমি বাধা দেব না। বরং তোমার যাতে কোনও তকলিফ না হয়, সে বিষয়ে আমি নজর রাখব। এই চিঠি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তুমি তুরন্ত রাজ্য ছেড়ে পালাও। তোষাখানায় সঞ্চিত মোহর, আশরফি এসব সরানোর চেষ্টা কোরো না যেন। এর ফল ভালো হবে না। চিঠির জবাব দিও। তোমার জবাব পেলেই আমি মুর্শিদাবাদের দিকে রওনা হব।…’
চিঠিটা পড়ামাত্রই রাগে উন্মত্ত হয়ে সেটা ছিঁড়ে ফেললেন সিরাজদ্দৌলা। হিরাঝিল প্রাসাদের দরবার কক্ষে খাঁচায় বন্দি ক্ষুধার্ত বাঘের মতো অস্থিরভাবে পায়চারি করতে করতে মোহনলালের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, ‘শওকতের এত সাহস হল কী করে মোহনলাল?’
‘আপনি তো জানেন শওকতের মুরুব্বি কারা।’
‘জঙ্গবাজির ময়দানে ফেলে এদের একবার পরখ করতে চাই।’ নবাব প্রশ্ন করলেন, ‘শাহি ফরমানের কথাটা সত্যি?’
‘খোঁজ নিয়ে দেখেছি। সত্যি।’ বললেন মোহনলাল।
‘কী করে আদায় হল ফরমান?’
‘ও ফরমান কড়ির বিনিময়ে কেনা।’
‘কড়ি জোগাল কে?’
‘বরাবর যিনি জুগিয়ে এসেছেন।’
‘জগৎশেঠজিকে তলব করো মোহনলাল। ফৌজ তৈয়ার করো। পূর্ণিয়ায় হামলা করতে হবে।’
জগৎশেঠকে অবশ্য ডেকে পাঠাতে হল না। তিনি নিজেই এসে হাজির হলেন দরবারে।
সিরাজকে কুর্নিশ করে জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ বললেন, ‘হুজুর, কথাটা শুনেছেন?’
সিরাজ গম্ভীর গলায় বললেন, ‘কী কথা?’
নবাবের মেজাজটাকে একবার জরিপ করে নিয়ে জগৎশেঠ বললেন, ‘শওকত জঙ্গের নামে শাহি ফরমান জারি হয়েছে। হুজুর যেখানে মসনদে বসে রয়েছেন, সেখানে শওকতের নামে ফরমান জারি হয় কী করে?’
‘ফরমানের তোয়াক্কা আমি করি না জগৎশেঠজি। ফৌজ তৈয়ার হচ্ছে। লড়াই হবে।’
‘শওকত জঙ্গের বেয়াদপির জবাব দিতে এটাই সঠিক পদক্ষেপ হুজুর।’
‘আগের নবাবদের ক্ষেত্রে আপনি দিল্লি থেকে ফরমান আনিয়ে দিয়েছেন। আমার ব্যাপারে আপনি কোশিস করেননি কেন?’
‘কে বললে করিনি হুজুর? দিল্লির উজির ঘাজীউদ্দিনকে কি আমি কম মোহর দিয়েছি?’
‘তাহলে শওকতের নামে ফরমান জারি হয় কী করে?’
‘সে আমি কী করে বলব হুজুর, দিল্লি দরবারের নোটঙ্কি তো আপনি ভালোই জানেন।’
‘নোটঙ্কি দিল্লির না আপনার? অনেকে বলছে শওকত জঙ্গের হয়ে দিল্লিতে বেশি কড়ি ঢেলেছেন আপনি।’
চোখ বিস্ফারিত করে জগৎশেঠ বলেন, ‘কে জহর ঢালছে আপনার কানে? এত কাল ধরে বাংলার নবাবের নুন খেয়েছি আমরা। আমরা কি মসনদের সঙ্গে গদ্দারি করতে পারি?’
তির্যক দৃষ্টিতে একবার জগৎশেঠের দিকে চেয়ে সিরাজ বললেন, ‘বেশ। এক কাম করুন। লড়াইয়ের খরচ তুলতে জমিদারদের থেকে তুরন্ত তিন কোটি তনখা আদায় করুন।’
আঁতকে উঠে জগৎশেঠ বললেন, ‘তিন কোটি? এ অসম্ভব হুজুর!’
গর্জন করে উঠলেন সিরাজ, ‘কেন? অসম্ভব কেন?’
‘জমিদারদের অবস্থাটা একবার ভেবে দেখুন। বর্গির হাঙ্গামায় তাদের কত ক্ষতি হয়েছে ভাবুন। কত লোক গাঁ ছাড়া হয়েছে। এখনও ফিরে আসেনি সবাই। জমি চাষ করার লোক পাওয়া যাচ্ছে না। জুলুম করলেও জমিদারেরা এই বাড়তি তনখা জোগাতে পারবে না।’
‘বেশ, তাহলে আপনার গদি থেকে তনখা দিন।’
‘অত রুপেয়া আমার হাতে এখন নেই হুজুর।’
রক্তচক্ষুতে জগৎশেঠের দিকে চেয়ে সিরাজ বললেন, ‘আপনি তাহলে আমার জন্য কিছুই করতে পারবেন না?’
‘আপনাকে তো খুলে বললাম সবই।’
‘জানি আপনি একটাই কাম করতে পারেন আমার জন্য। সেটা হল গদ্দারি।’
এই বলে সকলকে স্তম্ভিত করে দিয়ে ঠাস করে জগৎশেঠকে একটা চড় মেরে বসলেন সিরাজ। চড় খেয়ে মাথা ঘুরে মাটিতে পড়ে গেলেন জগৎশেঠ।
নবাব যে তাকে থাপ্পড় মেরে বসবেন, এটা জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ কল্পনাও করতে পারেননি। হতভম্ব হয়ে গালে হাত বোলাতে বোলাতে উঠে দাঁড়ালেন জগৎশেঠ। মোহনলাল হতবাক।
নিস্তব্ধতা ভাঙলেন সিরাজ। চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘এই গদ্দারকে বন্দি করো মোহনলাল!’
‘বেশ তাহলে আমাদেরও বন্দি করুন নবাব। আপনি মনে করেন, আমরা সবাই বেইমান।’
ঘুরে তাকিয়ে সিরাজ দেখলেন মিরজাফর ও দোস্ত মহম্মদ খান দাঁড়িয়ে আছেন। সহসা দুই আগন্তুককে দেখে ও মিরজাফরের কথার ভঙ্গিতে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন সিরাজ। নির্বাক হয়ে তাঁদের দিকে চেয়ে রইলেন।
মিরজাফর বললেন, ‘জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ একজন মহামান্য ব্যক্তি। মুর্শিদকুলি খাঁর সময় থেকে নবাব-পরিবারের সঙ্গে এদের রিস্তেদারি। আপনি তাঁকে এভাবে অপমান করতে পারেন না। আপনাকে মাফ চাইতে হবে এখনই, না হলে আমরা কেউই আপনার হয়ে জঙ্গবাজির ময়দানে লড়াই করতে যাব না।’
সিরাজে মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। এবারে অনেক কষ্টে সংযত করলেন নিজেকে। বুঝতে পারছেন জগৎশেঠকে আঘাত করে বসাটা মস্ত আহাম্মকির কাজ হয়ে গিয়েছে।
রাজনীতির অঙ্গনে ব্যক্তিগত আবেগকে বশে রাখতে হয়। অনিয়ন্ত্রিত আবেগ অনেক অবাঞ্ছিত বিপদ ডেকে আনে। আপাতত সেই ঝঞ্ঝাটে পড়েছেন সিরাজ। যুদ্ধযাত্রার প্রাক্কালে নিজের ঘরে তিনি নিজেই বিদ্রোহের পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলেছেন। সিরাজের মনে পড়ে গেল নানাজির কথা। মাথা ঠান্ডা রেখে তিনি কত কঠিন লড়াই উতরে গিয়েছেন। আবার যারা বেতমিজি করেছে, তাদের কেমন সুকৌশলে শায়েস্তা করেছেন।
রোগশয্যায় শুয়ে আলিবর্দি নাতিকে বলেছিলেন, ‘নবাবি চালাতে হলে মগজ সবসময় শরবতের মতো ঠান্ডা রেখো বেটা।’ সিরাজ তাঁর আশু কর্তব্য স্থির করে ফেললেন। নরম গলায় জগৎশেঠকে বললেন, ‘আমার গোস্তাকি মাফ করবেন জগৎশেঠজি। আমার তবিয়ত ঠিক নেই।’
নবাবের এই কথাতেই বরফ গলল। বাংলার নবাব তাঁর কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাইছেন। আর কী চাই? সন্তুষ্ট হলেন জগৎশেঠ, সন্তুষ্ট হলেন দোস্ত মহম্মদ, খুশি হলেন মিরজাফর।
নবাবের সঙ্গে স্নায়ুর লড়াইয়ে একপ্রকার জয় হয়েছে তাঁদের। খুশি মনে তাঁরা দরবার ছেড়ে চলে গেলেন যুদ্ধের প্রস্তুতি সারতে।
দাঁতে দাঁত চেপে সিরাজদ্দৌলা মনে মনে বললেন, ‘বুড্ডা শয়তানের দল, পূর্ণিয়ার লড়াইটা সামলে আসি, তারপরে তোমাদের শায়েস্তা করছি।’
