1 of 2

ফলতা থেকে পলাশি – ২৮

২৮

উত্তুরে হাওয়ার প্রতিকূলে ধীর গতিতে এগোচ্ছে ব্রিজওয়াটার। ঠিক যেন অতিকায় এক সরীসৃপ। গুটিগুটি এগিয়ে চলেছে শিকারের সন্ধানে। জাহাজের ধাক্কায় বিক্ষুব্ধ জলরাশি ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়ছে নদীর দুই পাড়ে।

হুগলি নদীতে এত বড় যুদ্ধজাহাজ আগে কেউ দেখেনি। ভয় পেয়ে মাঝিমাল্লারা দ্রুত দাঁড় বেয়ে নৌকো-শালতি-সুলুপ নিয়ে দূরে পালাচ্ছে। ঘর-গেরস্থালি ফেলে ছুটে এসে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে লোকজন হাঁ হয়ে দেখছে কোম্পানির মস্ত নওয়ারা। তাদের মধ্যে গুঞ্জন, ফিসফাস। তবে কি নবাবের সঙ্গে কোম্পানির ফের লড়াই বাঁধতে চলেছে?

ইংরেজদের যুদ্ধজাহাজ আসছে। চরের মুখে এই খবর পেয়ে সতর্ক হল চন্দননগরে ফরাসিদের দুর্গ—ফোর্ট অঁরলিও। গোলন্দাজদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিলেন গভর্নর পিয়েরে রেনল্ট। ফোর্ট অঁরলিওর কামানের নলগুলো সব নদীর দিকে ঘুরে গেল। দুর্গের প্রাকারের উপর ওঁত পেতে রইল হাতিয়ারবন্ধ ফরাসি পল্টন।

চন্দননগর পার হওয়ার সময় ফরাসিদের এই উৎকণ্ঠা লক্ষ করে মেজর কিলপ্যাট্রিক মুখ টিপে হাসলেন। মনে মনে বললেন, এখন নয়, তোমাদের সঙ্গে বোঝাপড়া পরে হবে। চন্দননগর ছাড়িয়ে চুঁচুড়ার দিকে এগিয়ে গেল ব্রিজওয়াটার। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন, মঁসিয়ে রেনল্ট।

তৎপরতা চুঁচুড়াতেও। ওলন্দাজদের দুর্গ ফোর্ট গুস্তাভাসেও কামান সাজিয়ে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। চিন্তিত ডাচ গভর্নর অ্যাড্রিয়ন বিসডাম। ফলতায় উদ্বাস্তু ইংরেজদের আবেদনে সাড়া দিয়ে তিনি তাদের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পরে নবাবের ধমক খেয়ে পিছিয়ে আসেন। এতে ক্ষুব্ধ হয় ইংরেজরা। তারা কি আজ জবাব দিতে আসছে? বুকজোড়া সংশয় নিয়ে কেল্লার অলিন্দে দাঁড়িয়ে সতর্ক দৃষ্টিতে নদীর দিকে চেয়ে রইলেন বিসডাম। গুস্তাভাসের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য সাদা পতাকা উড়িয়ে দিল ব্রিজওয়াটার। বলতে চাইল, ভয় নেই। চুঁচুড়া আমাদের লক্ষ্য নয়।

ধীর গতি। নির্লিপ্ত ভঙ্গি। চুঁচুড়া ছাড়িয়ে এগিয়ে চলল ব্রিজওয়াটার।

খানিকবাদে কিলপ্যাট্রিক দেখলেন দূরে দেখা যাচ্ছে বেশ কিছু জাহাজের মাস্তুল। আকাশের নীল ক্যানভাসে জেগে থাকা রংবেরঙের অজস্র পাল আকাশের নীলিমাকে যেন নানা রঙে ছুপিয়ে দিয়েছে। ওই তো হুগলি বন্দর। দূরবিনে চোখ রাখলেন কিলপ্যাট্রিক। স্পষ্ট হয়ে উঠল কেল্লার বুরুজ। হুগলির এই কেল্লা নিজামতের শাসনের প্রতীক, ফৌজদারের সদর কার্যালয়।

কিলপ্যাট্রিক শুনেছেন, একসময় হুগলির কেল্লার পাশেই ছিল ইংরেজদের কুঠি। শাহ সুজার ফরমানের জোরে ১৬৫০ সালে হুগলিতে কুঠি গড়ে বাংলায় পা রেখেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তারপরে একশো সাত বছর পার হয়ে গিয়েছে। ইংরেজরা এখনও বাংলার ব্যবসায় নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করতে পারেনি।

অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি এসে ওলন্দাজ ও ফরাসি বণিকেরা ইংরেজদের ব্যবসাকে কড়া প্রতিযোগিতার মুখে ফেলল। তারপরে কলকাতার যুদ্ধ। নবাবের হাতে বিপর্যস্ত ইংরেজরা আশ্রয় নিল ফলতায়। কলকাতা পুনরুদ্ধার হয়েছে ঠিকই কিন্তু গোটা বাংলা জুড়ে এখনও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসা বন্ধ। এই সুযোগে বেশি করে মুনাফা লুটছে ওলন্দাজ ও ফরাসিরা।

ইংরেজদের এই ভাগ্য বিপর্যয়ের কারণ নবাব সিরাজদ্দৌলা। এবারে কড়া জবাব দিতে হবে নবাবকে। মেজর কিলপ্যাট্রিক, ক্যাপ্টেন আয়ারকুট ও ক্যাপ্টেন কিং-এর চোয়াল শক্ত। চোখে প্রতিহিংসার আগুন। আয়ারকুটের আদেশে প্রস্তুত হতে লাগল গোরা গোলন্দাজের দল। জাহাজের খোলের গায়ের ঘুলঘুলি থেকে এক এক করে বেরিয়ে আসতে লাগল পিতলের তৈরি কামানের নলগুলো। যেন, আক্রমণের পূর্বে দাঁত-নখ বের করছে ব্রিজওয়াটার।

হুগলি বন্দরে হরেক কিসিমের মানুষের ভিড়। বেনিয়ান-মুৎসুদ্দি-দালাল-কুলিমজুরদের হইচইয়ে বন্দর চত্বর মুখরিত। মাল বোঝাই, মাল খালাস, দরাদরি, মুটেদের দৌড়োদৌড়ি, চিৎকার চেঁচামেচি সব মিলিয়ে ভীষণ তৎপরতা। কেউ কেউ কাজ ফেলে হাঁ করে দেখছে ইংরেজদের রণতরী। কারও আবার সে ফুরসত নেই। নিজের নিজের কাজে বুঁদ হয়ে রয়েছে।

হাতিয়ার হাতে ফৌজদারের যে বাহিনী কেল্লার সদর দরওয়াজায় মজুত রয়েছে তাদের চোখে-মুখে লড়াইয়ের প্রস্তুতির চেয়েও অতিকায় এক যুদ্ধজাহাজ দর্শনের কৌতূহলই বেশি।

বন্দর এলাকায় ঢুকল ব্রিজওয়াটার। জাহাজের গতিবেগ প্রায় স্তব্ধ হয়ে এল। হাতিয়ার ওঠানোর তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল গোরা পল্টন ও দিশি সিপাইদের মধ্যে।

ফৌজদারের কেল্লার পাশেই দাসবাজার। সেখানে উপচে পড়ছে ভিড়।

গঙ্গাসাগরগামী কয়েকখানা বজরা ডাকাতি করে একগাদা জেনানাকে হুগলির এই দাসবাজারে এনে হাজির করেছে একদল হার্মাদ। দস্যুবৃত্তি করে ধরে আনা আওরাতদের অনেকেই বেশ সুন্দরী। মলিন তাদের বেশবাস। ত্রস্ত দুই চোখ। গালের উপর শুকিয়ে আছে চোখের জল। কোমরে দড়ি বাঁধা। জীবনের সবকিছু হারিয়ে ভাগ্য বিড়ম্বিত, লাঞ্ছিত এই যুবতীরা দাঁড়িয়ে আছে জাহাজঘাটায়। নিলামের পর অচেনা কোনও মালিকের হাত ধরে হয়তো পাড়ি দেবে কোনও এক দূর দেশে।

আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলার সুন্দরীরা চড়া দামে বিকোয়। হুগলি বন্দর থেকে সওদা করে ফেরার পথে ভিনদেশি ব্যবসায়ীদের অনেকেই মেয়েমানুষ খরিদ করে নিয়ে যায়। মনে ধরলে কেউ উপপত্নী করে রেখে দেয় ঘরে, কেউবা বসরা, মোখা বা জেড্ডার বাজারে খরিদমূল্যের চেয়ে দুই তিন গুণ বেশি দামে বেচে দেয়।

জাহাজঘাটায় যে যুবতীরা পণ্য হিসেবে মজুত হয়েছে তাদের মধ্যে একজন অনেকেরই চোখ টানছে। একে পাওয়ার জন্য চলছে দরদস্তুর। মেয়েটি মাটির দিকে চোখ নামিয়ে শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। গায়ের রংটা ঈষৎ চাপা। কাটাকাটা মুখশ্রী।

নিলামে দর হাঁকার আগে ইরানের বয়স্ক ব্যবসায়ী ওমর খাঁ মেয়েটিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। ওমর খাঁর চোখেমুখে বেশ খুশি খুশি ভাব। স্বাস্থ্যবতী এই শ্যামাঙ্গীর রূপে বুড়ো মজেছে। এমন হুরি নবাব-বাদশাদের ভোগ্য হতে পারে, নিলামের খোলাবাজারে চট করে মেলে না।

মেয়েটির দাম উঠছে সমানে। নিলামের আসরে প্রতিযোগীরা শেষমেশ এসে ঠেকেছে দুইজনে।

ওমর খাঁর প্রতিযোগী হুগলিতে নুনের মস্ত কারবারি মাঝবয়সি মহাদেব পাল। এই মেয়েটিকে তিনি চেনেন। নাম হিরেমন। কলকাতা যুদ্ধের সময় সে সুতানুটি থেকে পালিয়ে এসে হুগলির পতিতাপল্লিতে আশ্রয় নিয়েছিল মহাদেব পালের বাঁধা মেয়েমানুষ সৌদামিনীর কাছে।

নুনের কারবার ছাড়াও হুগলির চকবাজারের পতিতাপল্লি চালিয়ে বহু টাকা আয় মহাদেব পালের। সৌদামিনীর মুখে অসহায় মেয়েটির কথা শুনে পতিতাপল্লিতে তার জন্য একখানা ঘর বরাদ্দ করে দিয়েছিলেন মহাদেব।

সৌদামিনী পুরোনো হয়ে এসেছে। তার রংঢং আর মহাদেব পালের মনে নেশা ধরায় না। হিরেমনের প্রতি আকৃষ্ট হলেন মহাদেব পাল। কিন্তু ও মেয়ে সহজে ধরা দিতে চায় না। কিন্তু মহাদেব পালও সহজে হতোদ্যম হওয়ার মানুষ নন।

এই তো মাসখানেক আগের কথা। সেদিন সন্ধেবেলা সৌদামিনীর ঘরে ফূর্তি করতে এসেছিলেন মহাদেব পাল। সৌদামিনী বলল, ‘তীর্থে যেতে মন চায় বাবু।’

মদের নেশায় ঢুলুঢুলু মহাদেব শুধোন, ‘কোথায় যাবে মিনি?’

মহাদেবের ঘনিষ্ঠ হয়ে সৌদামিনী বলে, ‘সাগরে যেতে ইচ্ছে করে।’

‘সে তো অনেক ঝকমারি। মেলা খরচের ব্যাপার।’

‘ঢং কোরো না তো। তোমার ঘরে মা লক্ষ্মীর স্থায়ী বসত। আর তুমি বলছ খরচের কথা?’

‘কারবারের অবস্থা এখন ভালো নয় মিনি। তাছাড়া কী দরকার ওসব ঝক্কিতে যাওয়ার? পথে হার্মাদের ভয়।’

‘বেশ তো শম্ভু লেঠেল ও তার দলবলকে সঙ্গে দিয়ে দাও। হিরেমনও সেদিন বলছিল দিদি সাগরে যেতে বড় সাধ হয়। চল না সব পাপ ধুয়ে আসি।’

হিরেমনের কথা উঠতেই সোজা হয়ে বসে মহাদেব পাল বলেন, ‘তা বেশ তো! ইচ্ছে যখন হয়েছে তখন ঘুরে এস।’

মহাদেবের গলা জড়িয়ে ধরে সৌদামিনী বলে, ‘সত্যি বলছ?’

‘বা রে! তুমি মুখ ফুটে বললে। আমি কি না করতে পারি? কথা হয়েছে হিরেমনের সঙ্গে?’

‘রোজই তো বোঝাচ্ছি। ও মেয়ে বড় ঠ্যাঁটা। কারও কাছে বাঁধা পড়তে চায় না।’

দেখো মিনি, মেয়েছেলের উপর জোর খাটানো আমি পছন্দ করি না। আমার আঁতে লাগে। তাছাড়া মেয়েছেলের মন না পেলে কি সুখ হয় বল? হিরেমনকে আমার চাই। তাকে যে ভাবেই হোক রাজি করাতে হবে তোমায়। আমার পছন্দের মেয়েমানুষের ঘরে অন্য হুলো ঢুকবে, এ আমার সহ্য হয় না।’

‘ও মেয়ে অন্য ধাতের। ঘরে বাবু ঢোকায় না।’

হাসেন মহাদেব পাল। ‘বল কী? বেশ্যাপাড়ায় সতী মাগ?’

‘সুতানুটিতে কোন এক সাহেবে মজেছিল, সেই খোয়াবে বুঁদ হয়ে আছে।’

‘বলছ কী মিনি? সে কি আমাকেও পায়ে ঠেলবে?’

‘অত খতেন জানি না। একটু ধৈর্য ধরো বাবু। আগে তীর্থ করে আসি। তুমি তীর্থের কড়ি জুগিয়েছ শুনলে হিরেমন খুশি হবে। আমার কাজটা সহজ হয়ে যাবে।’

 সুন্দর একখানা বজরা ও পাঁচ জন লেঠেল সহ তীর্থযাত্রার কড়ি জোগালেন মহাদেব পাল।

কুলপিতে হার্মাদদের পাল্লায় পড়ল বজরা। পাশবিক নির্যাতনের ভয়ে নদীতে ঝাঁপ দিল সৌদামিনী। মহাদেব পালের থেকে মাস মাইনে পাওয়া লেঠেলদের সর্দার শম্ভু লাঠির আঘাতে ছিটকে পড়ল নদীতে। প্রাণ হারাল বাকি লেঠেলরা। হার্মাদরা বজরাটা ধবংস করে দিল। তুলে নিয়ে গেল সৌদামিনীর সঙ্গী হিরেমন ও আরও কয়েকজন যুবতীকে।

পরের দিন জ্ঞান ফিরতে শম্ভু দেখল নদীর তীরে কাদার মধ্যে সে পড়ে আছে। নদীতে ভাঁটার টান। অদূরে কাত হয়ে আছে বিরাট বজরাটা।

হার্মাদের হাত থেকে কোনওরকমে বেঁচে ফেরা শম্ভুর মুখে এই কাহিনি শুনেছিলেন মহাদেব পাল। হিরেমনকে এভাবে হারানোর দুঃখটা তার মনে বড় বেজেছিল।

জাহাজঘাটায় নুনের নৌকো বোঝাই করানোর কাজ তদারক করতে এসে নিছক কৌতূহলের বশে দাসবাজারে একবার উঁকি মেরে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন মহাদেব পাল। বিক্রি হতে আসা একগাদা আওরাতের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে হিরেমন। মহাদেব পালের মাথা গরম হয়ে গেল। অন্যের কাছে বিক্রি হয়ে যাবে তার খোয়াবের কামিনী? অন্য পুরুষে ভোগ করবে তাকে?

জেদ চেপে গেল মহাদেব পালের। যে কোনও মূল্যে হিরেমনকে তার চাই।

মহাদেব পাল নিলামে যোগ দিলেন।

ওমর খাঁ। কার্পেটের কারবারি। পরনে মসলিনের জোব্বা। গলায় দামি পাথরের মালা। চোখে সুরমা। কানে আতর। সাদা হয়ে যাওয়া চুলদাড়ি মেহেন্দিতে ছোপানো। বুড়োর রংরস এতটুকু মরেনি। নিলাম ডাকার ফাঁকে সে কবুল করেছে, তার ন’টা বিবি আছে। কিন্তু কেউই হিরেমনের মতো খুবসুরৎ নয়। এই যুবতীকে সে খরিদ করবেই। বিবির ইজ্জত দিয়ে ঘরে নিয়ে যাবে।

মহাদেব পালও ছাড়ার পাত্র নয়। ওমর খাঁর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দর হেঁকে চলেছেন।

হার্মাদরা খুশি। তারা এই যুবতীর জন্য যে নূন্যতম দাম বেঁধে দিয়েছিল তা ছাড়িয়ে অনেক উপরে উঠেছে মেয়েটির দর। মোটা মুনাফা ঘরে আসবে।

দরাদরি চলতে চলতে মহাদেব পালের সঙ্গে ওমর খাঁর কাজিয়া বেঁধে গেল।

মহাদেব পালের বক্তব্য—তিনি শেষ যে দর হেকেছিলেন, তারপর নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে। অনেক পরে পাল্টা দর হেঁকেছেন ওমর খাঁ। নিলামের নিয়ম অনুযায়ী জিত হয়েছে মহাদেবের। ওমর খাঁ এ কথা কিছুতেই মানবেন না। কাজিয়া থেকে হাতাহাতি হওয়ার উপক্রম। চারপাশে জড়ো হওয়া লোকজন তামাশা দেখছে। বিনি পয়সায় চমৎকার এক নৌটঙ্কি।

বিকেল চারটে।

কিলপ্যাট্রিক দেখলেন কেল্লার জাহাজঘাটায় দাঁড়িয়ে রয়েছে তিনটি দিশি জাহাজ। সালামত, মুবারক মঞ্জিল, মদিনা বক্স। জাহাজগুলোকে ঘিরে জট পাকিয়ে রয়েছে অনেক নৌকা ও সুলুপ।

জাহাজ তিনটি হুগলির বণিক সম্রাট খোজা ওয়াজিদের। নৌকো ও সুলুপগুলোও তাঁর। মালপত্রে বোঝাই হচ্ছে খোজা ওয়াজিদের জাহাজ। মুর্শিদাবাদি তাফেতা, আবরোয়ান, তরন্দাম, নয়নসুখ মসলিনের গাঁট গাঁট কাপড়, সোরা, চিনি, নীলে বোঝাই হচ্ছে জাহাজের খোল। এ কাজের তদারক করছে মির আশরফ। খোজা ওয়াজিদের ভাগনে। দিন দুয়েকের মধ্যেই সে এই জাহাজ তিনটে নিয়ে সওদা করতে বেরোবে। প্রথমে হুগলি থেকে মুসলিপত্তনম। সেখান থেকে সুরাট হয়ে জেড্ডা, মোখা, বসরা।

ফ্লিন্টলক রাইফেল হাতে গোরা পল্টনদের সার দিয়ে দাঁড় করালেন ক্যাপটেন কিং।

থেমে গিয়েছে ব্রিজওয়াটার। নাবিক ধীরে ধীরে জাহাজটাকে পাড়ের দিকে ঠেলছে। উদ্ধত ভঙ্গিতে ব্রিজওয়াটারের মাথায় উড়ছে ইউনিয়ন জ্যাক।

মির আশরফের মনে কেমন যেন একটা খটকা লাগল। ইংরেজদের যুদ্ধজাহাজ হঠাৎ হুগলিতে কেন? এরা কি হামলা করতে চায়? মির আশরফ ব্যস্ত হয়ে ডেকে পাঠাল এক বিশ্বস্ত কর্মচারীকে। ইংরেজদের জাহাজের খবর এখনই জানানো দরকার তার মামাজিকে। দেওয়ান নন্দকুমারকেও দ্রুত খবরটা পৌঁছে দিতে হবে।

গলার শির ফুলিয়ে সহসা চেঁচিয়ে উঠলেন কিলপ্যাট্রিক—’ফায়ার!’

ব্রিজওয়াটারের দশটা কামান একসঙ্গে গর্জন করে উঠল। কেল্লার প্রাকারের উপর আছড়ে পড়ল গোলা। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ঝলকাল ফ্লিন্টলক রাইফেলের মুখ থেকে। একটা নৌকোর গলুইয়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকা মির আশরফ আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়ল। একই দশা হল অনেক নিরীহ কুলি, মজুর, মাঝিমাল্লার। বিকেলের শেষের আলোয় লালচে ছোপ ধরা নদীর জলে মিশল গাঢ় লাল রক্তের স্রোত।

হাহাকার পড়ে গেল জাহাজঘাটায়। চারিদিকে শুধু আহত মানুষের চিৎকার ও ছুটোছুটি। মরণ যন্ত্রণায় মানুষের মর্মান্তিক আর্তনাদ। নিমেষে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল দাসবাজারের জটলা।

বৃষ্টির মতো গুলি এসে পড়ছে জাহাজঘাটায়। ছুটে পালাতে গেলেন মহাদেব পাল। কয়েক পা যেতে না যেতেই বুলেটবিদ্ধ হয়ে মুখ থুবড়ে পড়লেন। গোলার ঘায়ে উড়ে গেল ওমর খাঁর মাথা। পণ্য-আওরাতদের ফেলে হার্মাদের দল যে যেদিকে পারল দৌড়ল।

একদিকে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদ, অন্যদিকে মুক্তির আনন্দ। কোমরের দড়ি খুলে ফেলে ছুটতে লাগল হিরেমন। চোখের নিমেষে সিঁড়ি বেয়ে কয়েক ধাপ উপরে উঠে বড় একটা হাভেলির আড়ালে সে অদৃশ্য হয়ে গেল। তার কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে কামানের একটা গোলা কোনও এক রইস আদমির হাভেলির একটা মিনারে গিয়ে ধাক্কা খেল। হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল মিনার।

 গোলার আঘাতে ডুবছে নৌকো, সুলুপ, বজরা। জাহাজঘাটায় ইতস্তত পড়ে রয়েছে মৃতদেহ। এ এক নারকীয় তাণ্ডব। আচমকা এই আক্রমণে হতচকিত হয়ে গিয়ে মূল ফটক বন্ধ করে কেল্লার ভিতরে আশ্রয় নিয়েছে ফৌজদারের অপ্রস্তুত বাহিনী।

দাউ দাউ করে জ্বলছে খোজা ওয়াজিদের বাণিজ্যতরী সালামত, মুবারক মঞ্জিল মদিনা বক্স। লাখ লাখ টাকার মসলিন পুড়ে ছাই। শব্দের তাণ্ডবে আঁতকে উঠে বন্দরের আশেপাশের হাভেলির কার্নিশ, ঘুলঘুলির নিশ্চিন্ত আবাস ছেড়ে আকাশে পাক খেতে লাগল হাজার হাজার শিহরিত কবুতর।

শুল্ক ছাড়ের বিষয়ে দেওয়ান নন্দকুমারের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলেন খোজা ওয়াজিদ। হঠাৎ এই গোলাগুলির শব্দ শুনে দুজনেই ছুটে এলেন কেল্লার অলিন্দে। দেখলেন, আকাশ জুড়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। চারিদিকে চোখে পড়ছে শুধু আগুনের লেলিহান শিখা।

খোজা ওয়াজিদের বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। মালপত্রে ঠাসা তাঁর তিন তিনটে জাহাজ জলের বুকে চিতার মতো জ্বলছে।

শুধু খোজা ওয়াজিদের জাহাজই নয়, বন্দর এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আরও অনেক জাহাজ পুড়ছে ইংরেজদের রোষে। প্রায়ান্ধকার হয়ে আসা নদীর বুকে বিভীষিকা জাগানো আগুনের বন্যা।

অবিরাম গর্জে চলেছে ব্রিজওয়াটার। গুড়ুম! গুড়ুম! গুড়ুম

কামান দেগে প্রত্যুত্তর দেওয়ার চেষ্টা করল ফৌজদারের কেল্লা। কিন্তু সে আক্রমণে না আছে জোশ, না আছে ঝাঁঝ। প্রবল আতঙ্ক গ্রাস করেছে নন্দকুমারের বাহিনীকে। লড়াই না করে পালাতে চাইছে সবাই। নন্দকুমার দেখলেন, তাঁর হাতে যা সেপাই-বরকন্দাজ রয়েছে তা দিয়ে ইংরেজদের ঠেকানো অসম্ভব। আতঙ্কিত নগরবাসী ছুটছে চুঁচুড়া ও চন্দননগরের দিকে। কেল্লার পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে গেলেন নন্দকুমার। পালালেন খোজা ওয়াজিদও।

কেল্লার দিক থেকে তেমন কোনও প্রতিরোধ নেই দেখে জাহাজ থেকে শালতি নামানোর নির্দেশ দিলেন কিলপ্যাট্রিক। ইংরেজ সৈন্যরা পাড়ে এসে উঠল। কেল্লার বন্ধ সদর দরজার উপর হামলা চালাতে লাগল। ইংরেজদের ঠেকানোর জন্য দুর্গের ভিতরে সামান্য যে কয়েকজন সৈন্য ছিল তারা সব জড়ো হল সদর দরজার সামনে।

ক্যাপ্টেন কিং-এর নেতৃত্বে একদল সৈন্য খানিকটা দক্ষিণে সরে গিয়ে মই বেয়ে উঠে কেল্লার প্রাকার টপকে ভিতরে ঢুকে পড়ল। ফতে হল হুগলির কেল্লা।

এর পরে নারকীয় উল্লাসে মেতে উঠল গোরা পল্টনরা। দুদিন ধরে হুগলি শহরের বুকে তাদের নিয়ে দাপিয়ে বেড়ালেন কিলপ্যাট্রিক, আয়ারকুট ও কিং। বাড়িঘরদোর ছেড়ে আগেই পালিয়েছে লোকজন। বিনা বাধায় গোটা শহরটাকে আগুনে পুড়িয়ে ছারখার করে দিল কোম্পানির ফৌজ। লুঠ হল বড় বড় কারবারিদের কোঠাবাড়ি, গদি, গুদামঘর।

হুগলি শহর তছনছ করে দিয়ে দেড়শো জনের এক বাহিনী নিয়ে ব্যান্ডেলের দিকে এগিয়ে গেলেন কিলপ্যাট্রিক। হঠাৎ তাঁর নজরে পড়ল একটা শস্যগোলা। বিরাট এলাকা নিয়ে তার বিস্তৃতি। চারিদিক বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা। মাথায় গোলপাতার ছাউনি। নবাবের সেপাই-লস্করদের জন্য রসদ মজুত আছে এখানে। ধানে বোঝাই। ফসল উঠেছে কিছুদিন আগে।

একদিন রসদের অভাবে ফলতায় মরতে বসেছিল ইংরেজরা। কড়া হুকুম জারি করেছিলেন নবাব—কেউ যেন ইংরেজদের রসদ না জোগায়। না খেয়ে মরুক এই লালটোপিওয়ালা বণিকের দল। খাদ্যের অভাবে ইংরেজদের হাহাকার ফলতায় এসে নিজের চোখে দেখেছেন মেজর কিলপ্যাট্রিক।

বদলা চাই। প্রতিহিংসার আগুন জ্বলে উঠল মেজর কিলপ্যাট্রিকের দুই চোখে। নবাবের ফৌজের জন্য মজুত ধান তিনি পুড়িয়ে ছারখার করে দেবেন। যুদ্ধ বাঁধলে রসদের অভাবে ভুগবে নবাবের বাহিনী।

কিলপ্যাট্রিক চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘আগ লাগাও।’

মেজরের হুকুম তামিল করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ল সেপাই ও পল্টনরা। সঞ্চিত সোনার ফসল নিমেষে পুড়ে ছাই হয়ে গেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *