1 of 2

ফলতা থেকে পলাশি – ৩৩

৩৩

বর্গি আসছে! পালাও! পালাও!

আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল কাটোয়া সংলগ্ন দাঁইহাটে। পালানোর জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। ভিটেমাটি ফেলে রেখে দিশেহারা হয়ে ছুটছে সকলে। সহসা দিগন্তে দেখা গেল ধুলোর ঝড়। শোনা গেল অসংখ্য ঘোড়ার খুরের ঐকতান। ভয়ানক এক ঝড় হয়ে দাঁইহাটের উপর আছড়ে পড়ল মারাঠা দস্যুরা।

দাউদাউ করে জ্বলে উঠল মহল্লার পর মহল্লা। আগুন, লুঠ, নারীধর্ষণ, নৃশংস হত্যালীলা। রক্তের স্রোতে ভিজে উঠল মাটি। মানুষের কান্নায় ভারী হল বাতাস।

প্রসবকাল আসন্ন, তাই গর্ভের সন্তানের কথা ভেবে ছুটে পালাতে পারেনি খুশি। তাকে ফেলে রেখে বর্গির ভয়ে ভিটে ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছে তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন। অসহায় খুশি আশ্রয় নিল তার শ্বশুরের ভিটের পিছনে স্তূপীকৃত খড়ের গাদার মধ্যে।

বর্গিরা আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে একের পর এক বাড়িতে। আড়াল থেকে সন্ত্রস্ত চোখে দেখছে খুশি। ঘরপোড়া ধোঁয়ায় গন্ধে দম আটকে আসছে তার। জ্বালা করছে দুই চোখ। এমন সময় তার প্রসববেদনা উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে পড়ে রইল খুশি। আশেপাশেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মারাঠাদস্যুরা। মুখ থেকে টুঁ শব্দটি বেরোলেই সে ধরা পড়ে যাবে।

শেষরক্ষা হল না। সহসা কেঁদে উঠল নতুন প্রাণ। কন্যাসন্তান প্রসব করল খুশি। ছোট্ট একরত্তি মেয়েটার গলার তেজ কম নয়। খুশি ধরা পড়ে গেল। বর্গিরা তাকে টেনে বের করল খড়ের গাদা থেকে। ক্লান্ত বিধ্বস্ত খুশির গলায় তখন চিৎকার করার মতো শক্তি নেই। খুশির মেয়ে, সদ্যজাত একতাল মাংসের পুঁটুলি ধুলোমাখা হয়ে পড়ে রইল ভূমিতে। বর্গিরা খড়ের গাদায় আগুন ধরিয়ে দিল।

খুশি চিৎকার করে উঠল, ‘মেরো না আমার মেয়েকে—’

হাহা করে হেসে উঠল মারাঠা দস্যুরা। তারপর তারা ঝাঁপিয়ে পড়ল খুশির ক্লান্ত শরীরটার উপর। পাশবিক অত্যাচারে চেতনা হারাল খুশি।

জ্ঞান ফিরতে সে অনুভব করল সারা অঙ্গে তীব্র যন্ত্রণা। নাকে আসছে পোড়া গন্ধ। তাকে ঘিরে বিচিত্র নকশায় নেচে বেড়াচ্ছে জোনাকি। কাছেই কোথাও শেয়াল ডাকছে। রাত গভীর।

কোনওরকমে দেহটাকে মাটি থেকে তুলে টলতে টলতে ঘরে এসে ঢোকে খুশি। গোটা বাড়ি সুনসান। কেউ কোথাও নেই। দরজা-জানলা হাট করে খোলা। আশেপাশের সব বাড়িগুলো পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও কোনও এক আশ্চর্য জাদুতে খুশির শ্বশুরের ভিটেটা অক্ষত আছে। তবে তোলপাড় হয়ে আছে ঘরদোর। রীতিমতো তাণ্ডব চালিয়ে গিয়েছে মারাঠাদস্যুরা।

অর্ধচেতন অবস্থায় অন্ধকার হাতড়ে চকমকি পাথর খুঁজে বের করে প্রদীপ জ্বালাল খুশি। তার সারা দেহে জায়গায় জায়গায় শুকিয়ে আছে রক্ত। নরপশুদের আচড় কামড়ের দাগ। কোনওরকমে একখানা কাপড় গায়ে জড়িয়ে লজ্জা ঢাকে খুশি।

সহসা তার মনে পড়ে যায় সদ্যোজাত সন্তানের কথা। দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা খড়ের গাদার ছবিটা। খুশির মনটা হু হু করে ওঠে। সে চিৎকার করে, বুক চাপড়ে কাঁদতে চায়। শব্দ বেরোয় না গলা দিয়ে। ক্লান্ত অবসন্ন শরীরে এক বিন্দু শক্তি নেই। খুশি টলে পড়ে যায় মাটির দাওয়ার উপরে।

না-খুশি মরেনি। এরপর কেটে গেল বেশ কিছুদিন।

বর্গিদের তাড়িয়ে ওড়িশা পার করিয়ে দিলেন নবাব আলিবর্দি খাঁ। স্বাভাবিক হয়ে এল দাঁইহাটের দিনরাত্রি। বর্গির ভয়ে যারা পালিয়ে গিয়েছিল, তারা অনেকে ফিরে এল গ্রামে। ফিরে এল খুশির স্বামী, শ্বশুর, শ্বাশুড়ি। পোড়া ছাই সরিয়ে ফের ঘরবাড়ি তুলতে লাগল মানুষজন। বর্ষায় ফের ধান রুইল চাষিরা। আগের মতোই পাকা ধানের গায়ে সোনার রং লাগল। সব কিছুই আবার আগের মতোই রইল। শুধু খুশির জীবনটা বেরং হয়ে গেল।

প্রকাশ্য দিবালোকে ধর্ষিতা কুলবধূকে ঘরে ফিরিয়ে নিতে চায় না খুশির শ্বশুরবাড়ির লোকেরা। মুখ ফিরিয়ে নিল স্বামীও—খুশি অশুচি। শ্বশুরবাড়ির এক কোনায় অবাঞ্ছিতের মতো পড়ে রইল খুশি। যে রাতে তার প্রৌঢ় স্বামী ফের ছাদনাতলায় গিয়ে দাঁড়াল, সে রাতে মনের দুঃখে ঘর ছাড়ল সে।

আপদ বিদায় হয়েছে আপনিই। শ্বশুরবাড়ির লোকেরা কেউ আর খুশির খোঁজ করল না।

ভাস্কর পণ্ডিতকে হত্যা করলেন আলিবর্দি খাঁ। তবুও বর্গির অত্যাচার বন্ধ হল না। ফসল ওঠার পর প্রতিবছর অঘ্রাণ মাসে তারা হানা দেয় বাংলায়। চৌথ চায়। তাদের পিছনে ছুটোছুটি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন নবাব আলিবর্দি খাঁ।

হেমন্তের মাঠ ধূসর। ধানকাটা হয়ে গিয়েছে। ফের বর্গিদের হানা দেওয়ার সময় হয়ে এল। আগে থেকেই রাঢ় বাংলা খালি করে ভিটে মাটির মায়া ত্যাগ করে নৌকোযোগে দলে দলে লোকে পালাচ্ছে কলকাতায়। ইংরেজদের শহর কলকাতা। ওদের কামান আছে। কেল্লা আছে। বর্গিরা এখানে সহজে হানা দিতে পারবে না। সকলেরই এই বিশ্বাস।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে একদল মানুষের সঙ্গে খুশি পাড়ি দিল কলকাতায়। অনেকে বলল, কলকাতায় কাজের অভাব নেই। একবার ওখানে গিয়ে পড়তে পারলেই হিল্লে হয়ে যাবে।

খুশির হিল্লে একটা হল ঠিকই। আঠেরো বছর বয়সি গ্রামের মেয়ে। কলকাতা শহরের হালহকিকত বোঝে না। রতন সরকারের আড়কাঠিদের পাল্লায় পড়ে খুশি গিয়ে উঠল গরাণহাটার পতিতাপল্লির একটা ঘরে।

কাশিমবাজারের ব্রাহ্মণ ঘরের কন্যা, দাঁইহাটের ব্রাহ্মণ ঘরের কুলবধূ খুশি হারিয়ে গেল কলকাতা শহরের বুকে। বেঁচে রইল হিরেমন—এই নাম রতন সরকারের দেওয়া।

ফোর্ট উইলিয়ামের সাহেবদের কামিনী জুগিয়ে রসেবশে রাখে রতন সরকার। এই কারবার করেই সে অঢেল টাকার মালিক। বর্গির আক্রমণে রতন সরকারের পোয়াবারো। গ্রাম থেকে লোকজন পালিয়ে আসছে কলকাতায়। এর মধ্যে সুন্দরী যুবতীর জোগান নেহাত কম নয়। নতুন শহরের আদবকায়দা, চালবাজি ভাষা এরা বোঝে না। টোপ ফেলে তাদের ছিপে গাঁথছে রতন সরকারের আড়কাঠিরা। চালান করছে গরাণহাটার গণিকাপল্লিতে।

রতন সরকারের মাধ্যমেই একদিন হিরেমনের নাগর হয়ে এল ছোকরা রাইটার টিম লরেন্স। শ্যামাঙ্গিনী হিরেমনের রূপে মজল লরেন্স। প্রথম প্রথম এই সাহেবকে দেখে হিরেমনের বেশ অবাক লাগত। বাঁধা সময়ের মধ্যে নারীদেহের সবটুকু উসুল করে নেওয়ায় হুড়োতাড়া নেই এই সাহেবের। চোখের দৃষ্টি আশিকের মতো। হিরেমনকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে অনর্গল বকে যায়।

লরেন্স সাহেবের সব কথা বোঝে না হিরেমন। থেকে থেকেই সাহেব বলে ‘হিরেমন মাই সুইটি’। হিরেমনের আকর্ষণে মাতাল হয়ে ওঠে লরেন্স। রোজ সন্ধেবেলা সে ছুটে আসে গরাণহাটায়। দস্তুরিতে রতন সরকারের তবিল উপচে পড়ে। রতন সরকার খুশি। হিরেমন লক্ষ্মীমন্ত।

লরেন্স বলে, ‘দেখো সরকারবাবু, আর কোনও মরদ যেন হিরেমনের ঘরে না ঢোকে।’

হাত পেতে দস্তুরি নিয়ে রতন সরকার বলে, ‘আপনি যেমনটি চাইবেন, তেমনটিই হবে হুজুর।’

হিরেমনের মনটাও লরেন্স সাহেবের প্রতি নরম হয়ে ওঠে। কোনও সন্ধেবেলা লরেন্স সাহেব না এলে হিরেমনের মনটা কেমন যেন ছটফট করতে থাকে। জানলায় দাঁড়িয়ে সে পথের দিকে চেয়ে থাকে।

সৌদামিনী বলে, ‘তুই মরবি হিরে। বেবুশ্যে মাগিকে আশনাইয়ের ছলে ভুলতে নেই।’

একদিন হিরেমনকে ঘরের স্বপ্ন দেখায় লরেন্স। বলে, ‘আমি তোমায় শাদি করব বিবি।’

হিরেমন হেসে বলে, ‘ঠাট্টা করছ সাহেব?’

হিরেমনের হাতটা ধরে বুকের উপর রেখে লরেন্স বলে, ‘ইয়ে সচ বাত। বিলিভ মি হিরেমন। মাই সুইটি।’

হিরেমন সুখস্বপ্নে বিভোর হয়ে ওঠে।

ফের বিপর্যয়। নবাব সিরাজদ্দৌলা সৈন্য সামন্ত নিয়ে ধেয়ে এলেন কলকাতায়। হিরেমনের সুখস্বপ্ন ভেঙ্গে খানখান হয়ে গেল। নবাবের সেনাবাহিনীর হাবসি দৈত্যগুলো জেনানা লুঠ করার মতলবে হানা দিল পতিতাপল্লিতে। রাতের অন্ধকারে ডিঙি নৌকোয় চেপে সৌদামিনীর সঙ্গে হুগলিতে পালিয়ে গেল হিরেমন।

হুগলিতে নুনের মস্ত কারবারি মহাদেব পাল। ব্যবসার কাজে কলকাতায় এসে উঠতেন গরাণহাটায়, সৌদামিনীর ঘরে। হিরেমনকে সঙ্গে নিয়ে হুগলি পালিয়ে গিয়ে মহাদেব পালের কাছে আশ্রয় চাইল সৌদামিনী। আশ্রয় মিলল। সৌদামিনী ও হিরেমনের জন্য হুগলির চকবাজারের গণিকাপট্টিতে একটা ছোট কোঠাবাড়ি ঠিক করে দিলেন মহাদেব পাল।

হিরেমন শুধোয়, ‘দিদি—জামাইবাবু বুঝি মস্ত বড়লোক!’

সৌদামিনী বলে, ‘আঃ! কথার ছিরি দেখো মাগির। জামাইবাবু! আদিখ্যেতা করিস নে হিরে। যতদিন গতর আছে ততদিন খাতির। তুইও সমঝে চল। ওই ছোকরা সাহেবের জন্য হেদিয়ে মরিস নে। পরে পস্তাবিখন।’

কিছুদিন পর হিরেমনের উপর মহাদেব পালের নজর পড়ল। একদিন মত্ত অবস্থায় সৌদামিনীর গলা জড়িয়ে ধরে মহাদেব পাল বললেন, ‘ওই মেয়েটিকে আমার চাই মিনি। তোমায় ব্যবস্থা করে দিতে হবে।’

রাগে গা চিড়বিড় করে ওঠে সৌদামিনীর। সে ঝাঁঝের সঙ্গে বললে, ‘ও মেয়ের নাগাল পাওয়া সহজ নয় বাবু।’

‘রাগ কোরো না মিনি। ও মেয়েকে চাই বলে তোমাকে তো আর ফেলে দিচ্ছি নে।’

‘রাগের কথা নয় বাবু। ও মেয়ের নজর বড় উঁচু। এক ছোকরা সাহেবে মজে আছে। আর কাউকে তার মনে ধরে না।’

‘বেবুশ্যের আবার আশনাই। মরদ নিয়ে বাছাবাছি? অ্যাঁ? কলিকালে কত কী যে দেখব? তা ও মেয়ে সাহেবনাগর আর পাচ্ছে কোথায়? সব তো ফলতায় বাঘের পেটে গেছে।’

সৌদামিনী বলে, ‘অতশত জানিনে বাপু। তবে ও মেয়ে জাহাবাঁজ। গরাণহাটায় মুখোমুখি থাকত। কবে থেকে দেখছি—সেই ছোকরা সাহেব ছাড়া অন্য কাউকে ঘরের চৌকাঠ ডিঙোতে দিত না। জোরখাটাতে যেওনি বাবু। বিষ খেয়ে মরলে খুনের দায়ে পড়বে।’

হিরেমনের মন পেতে সাগরে তীর্থযাত্রার আয়োজন করে দেয় মহাদেব পাল। মাঝপথে হার্মাদের হাতে পড়ে বজরা। হিরেমন চালান হয়ে আসে হুগলির দাসবাজারে।

হুগলি আক্রমণ করলেন মেজর কিলপ্যাট্রিক। ব্রিজওয়াটার থেকে বর্ষার মতো গোলাগুলি এসে আছড়ে পড়ে হুগলির জাহাজঘাটায়। ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় দাসবাজারের নিলামের আসর। সেই সুযোগে পালিয়ে গিয়ে ত্রিবেণীর ঘাটে একদল ভিখিরির মধ্যে আশ্রয় নেয় হিরেমন।

জীবনে একের পর এক বিপর্যয়। তবু হতাশ হয় না হিরেমন। চোখ বুজলে এখনও তার মনের মধ্যে ভেসে ওঠে লরেন্স সাহেবের মুখ। কানে ভেসে আসে লরেন্সের কথা। ‘তোমায় আমি শাদি করব বিবি।’ আপনমনেই শরমে লাল হয়ে ওঠে হিরেমন। হিরেমন নতুন করে বাঁচতে চায়। জীবন অনেক সুন্দর।

‘আপনারা কলকাতায় যাচ্ছেন?’ হিরেমন শুধোয়।

খুবই সহজসরল কথার ভঙ্গি। নবাব-বেগমকে একজন ভিখারিনী এই ভঙ্গিতে প্রশ্ন করতে পারে, ভাবাই যায় না। মেয়েটির সারল্যে খুশি হয় লুৎফা। সেও তো একদিন নবাব আলিবর্দি খাঁকে নিষ্পাপ মুখে শুধিয়েছিল একদিন, ‘তুমি কি বাংলার নবাব?’

জারিয়ার মুখে এই বেসহবত প্রশ্ন শুনে আঁতকে উঠেছিল আশেপাশের সকলে। আলিবর্দি খাঁ হা হা করে হেসে উঠেছিলেন।

হিরেমনের প্রশ্নের উত্তরে স্মিত হেসে লুৎফা বলে, ‘হ্যাঁ।’

‘কোম্পানির সঙ্গে ফের লড়াই বাঁধবে বুঝি?’

‘হ্যাঁ। যাবে আমার সঙ্গে? ভয় নেই। আমার বাঁদিমহলে থাকবে।’

হিরেমনের বুক কেঁপে ওঠে। ফের কলকাতায় যাওয়ার সুযোগ। লুৎফাবেগমের বাঁদি হয়ে থাকা মানে নিরাপদ আশ্রয়। বেসাহারার মতো পথে পথে ঘুরে আর আড়কাঠিদের খপ্পরে পড়া নয়। ইংরেজরা ফিরে এসেছে কলকাতায়। লরেন্স সাহেবকে যে এখনও ভুলতে পারছে না হিরেমন। কলকাতায় গেলে দেখা হতে পারে তার সঙ্গে। মনে মনে হিরেমন বলে, সাহেব আমি তোমায় ভালোবাসি।

‘কী ভাবছ? যাবে আমার সঙ্গে?’

চিন্তার সূত্র ছিড়ে যায়। ঘাড় কাত করে সম্মতি জানায় হিরেমন।

বাঁশবেড়িয়ার নৌকোঘাটে তুমুল ব্যস্ততা। সারি সারি নৌকো পাশাপাশি জোড়া লাগিয়ে সেতু বাঁধা হয়েছে নদীর উপর। নৌকোগুলোর পাটাতনের উপর মাঝখান দিয়ে চেরা বাঁশ পরপর সাজিয়ে তৈরি করা হয়েছে চওড়া পথ। এর উপর দিয়ে সন্তর্পণে নদী পার হচ্ছে নবাবের ফৌজ। হাতি, ঘোড়া, উট, তোপের গাড়ি, রসদের গাড়ি, পায়দল সেপাই সব একে একে পার হচ্ছে। মেলা হাঙ্গামা। নদীর উপর এই নৌকোর সেতুর খুব কাছ দিয়েই ওপারের উদ্দেশে ভেসে চলেছে কয়েকখানা বজরা। নিজের গোলাম-বাঁদি সহ নদী পেরোচ্ছে লুৎফুন্নেসা বেগম। বেগমের বজরায় রয়েছে তার খাস বাঁদিদের দল। হিরেমনের ঠাঁই হয়েছে এই দলে।

গেলবার কলকাতা যাওয়ার সময় এই বাঁশবেড়িয়ার ঘাট থেকেই গঙ্গা পেরিয়েছিলেন সিরাজদ্দৌলা। তারপর গঙ্গার পাড় বরাবর কুচ করে বাঁকিপুর হয়ে চিৎপুরের রাস্তা ধরেছিলেন। এবারেও সেপথেই যাওয়ার কথা ছিল।

গতকাল চরের মারফত নবাবের হাতে এসে পৌঁছেছে উমিচাঁদের চিঠি।

‘সেলাম হুজুর! ইয়াদ করি খুশ তবিয়তে আছেন। কর্নেল ক্লাইভের ফৌজ বেশ তাগদবাজ। সুতানুটি থেকে অনেকটা এগিয়ে বরানগরে ঘাঁটি গেড়েছেন কর্নেল। হুগলিতে যে বেসহবত কাণ্ড ঘটিয়েছে কোম্পানি, তার বদলা নিতে আশা করি আপনি অবশ্যই কলকাতায় আসবেন। এবারে বাঁকিপুর থেকে সরাসরি চিৎপুরের পথ ধরবেন না। নীলগঞ্জের পথ ধরে বারাসত হয়ে আসবেন। আপনার দাসানুদাস—উমিচাঁদ।’

এই চিঠির ভিত্তিতে বদলে গেল নবাবের যাত্রাপথ। ঠিক হল বারাসত থেকে দমদমের রাস্তা ধরে কলকাতায় পৌঁছবেন নবাব। উঠবেন উমিচাঁদের হাভেলিতে।

সকালের মিঠে রোদ্দুর গায়ে মেখে নিজের তাঁবুর সামনে কুরসিতে বসে আয়েস করছিলেন কর্নেল ক্লাইভ। সামনে নীচু টেবিলের উপর রাখা আছে কফির পিরিচ।

তিরবেগে ঘোড়া হাঁকিয়ে এসে ক্লাইভের তাবুর সামনে থামলেন পেত্রস আরাটুন। দ্রুত ঘোড়া থেকে নেমে এসে কর্নেলকে সেলাম জানালেন।

‘গুড মর্নিং মিঃ আরাটুন। প্লিজ সিট।’

কর্নেলের উলটোদিকের কুরসিতে বসে আরাটুন বললেন, ‘আজকের মর্নিংকে কি গুড বলা যায় হুজুর?’

আরাটুনের কথার ভঙ্গিতে ক্লাইভের কপালে ভাঁজ পড়ল।

আরাটুন বলেন, ‘নবাব কলকাতা আসছেন। সঙ্গে বিরাট ফৌজ।’

‘হাউ বিগ?’

‘চল্লিশ হাজার ঘোড়সওয়ার। ষাট হাজার পায়দল সেপাই। পঞ্চাশটা হাতি। তিরিশটা কামান।’

ভিতরে ভিতরে কেঁপে উঠলেন ক্লাইভ। এই বাহিনী কলকাতার উপর আছড়ে পড়লে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না ইংরেজদের। এটা কর্নেল ক্লাইভের চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। নিজের ভাবনাটা মনের মধ্যে লুকিয়ে রেখে ক্লাইভ বললেন, ‘ওকে। উই আর রেডি টু ফাইট।’

কর্নেলের গলায় অটল আত্মবিশ্বাসের সুর থাকলেও ভরসা পেলেন না পেত্রস আরাটুন। বলছেন কী কর্নেল? সাকুল্যে আড়াই-তিন হাজার সেনা আছে তাঁর সঙ্গে। এই শক্তি নিয়ে চল্লিশ হাজার ঘোড়সওয়ার ও ষাট হাজার পায়দল সেপাইয়ের মোকাবিলা করা সম্ভব? বিপক্ষের সেনাপতি স্বয়ং নবাব সিরাজদ্দৌলা। নবাব জঙ্গবাজির ময়দানে থাকলে সেনাবাহিনীর জোশ বহুগুণ বেড়ে যায়। কী করে এই দুর্ধর্ষ বাহিনীর মোকাবিলা করবে ইংরেজরা?

কর্নেল প্রশ্ন করলেন, ‘নবাব এখন কোথায়?’

‘ত্রিবেণীতে। দিন দুই তিনের মধ্যে কলকাতায় এসে পড়বেন।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ মিঃ আরাটুন। আই ওয়ান্ট ডিটেল ইনফরমেশন অ্যাবাউট নবাবস মুভমেন্ট টাইম টু টাইম।’

‘সব তাজা খবর আপনাকে আমি পৌঁছে দেব স্যার। তাহলে এখন আসি?’

‘এত ব্যস্ততা কীসের? কফি খেয়ে যান।’ খুব সহজ নিরুদবেগ গলায় কথাটা বললেন ক্লাইভ। নিজের মনের দুশ্চিন্তার ছবিটা কিছুতেই পেত্রস আরাটুনের সামনে প্রকট করতে চান না তিনি।

পেত্রস আরাটুন বিদায় নেওয়ার পর মেজর কিলপ্যাট্রিক ও অন্যান্য ক্যাপ্টেনদের ডেকে পাঠালেন কর্নেল ক্লাইভ। মুনশি নবকৃষ্ণকেও ডাকলেন। আরাটুনের নিয়ে আসা খবরটা সকলকে শোনালেন ক্লাইভ।

সব শুনে প্রথম রিঅ্যাক্ট করলেন কিলপ্যাট্রিক—’সামনাসামনি লড়াই অসম্ভব।’

ক্লাইভ বললেন, ‘ইয়েস আই থিঙ্ক সো। ফমিডেবল ফোর্স নিয়ে আসছেন নবাব। ডাইরেক্ট ফাইট হলে উই উইল বি রুইনড।’

‘তাহলে উপায়?’ চিন্তিত গলায় প্রশ্ন করলেন আয়ারকুট।

‘যে করেই হোক নবাবের কলকাতা আসাটা ঠেকাতে হবে।’

চোখ গোল্লা করে কিলপ্যাট্রিক বললেন, ‘হাউ ইস ইট পসিবল? ত্রিবেণীতে চলে এসেছেন নবাব। উইদইন থ্রি টু ফোর ডেজ কলকাতায় পৌঁছে যাবেন।’

ক্লাইভ বললেন, ‘এখনই নবাবের কাছে আমাদের ডেলিগেশন পাঠাতে হবে।’

‘ডেলিগেশন?’ প্রশ্ন করলেন কিলপ্যাট্রিক।

ক্লাইভ বললেন, ‘ইয়েস। নবাবকে মেসেজ দিতে হবে যে আমরা যুদ্ধ করতে চাই না। উই আর ইন ফেভার অফ পিস। সন্ধি করতে চাই আমরা। উই হ্যাভ টু সাইন অ্যা ট্রিটি উইথ নবাব। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্যবসা করতে এসেছে এদেশে। তারা যুদ্ধবাজ নয়। কোম্পানি ফিরে পেতে চায় ব্যবসার অধিকার আর চায় কলকাতা যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ। নবাবের সঙ্গে তাদের কোনও এনমিটি নেই। এই বলে কনভিন্স করতে হবে নবাবকে।’

মেজর কিলপ্যাট্রিক ও অন্যান্য ক্যাপ্টেনরা পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন। হুগলি তছনছ করে দিয়ে জল যেভাবে গরম করে তুলেছেন কর্নেল, তা কি অত সহজে জুড়োবে? মেজর কিলপ্যাট্রিক ও অন্যরা গম্ভীর মুখে বসে রইলেন। কারও মুখে কোনও কথা নেই।

নীরবতা ভেঙে ক্লাইভ বললেন, ‘আই ওয়ান্ট টু সেন্ড ডেলিগেশন অফ থ্রি পারসনস।’

সকলে উৎকন্ঠার সঙ্গে ক্লাইভের মুখের দিকে তাকালেন।

ক্লাইভ বললেন, ‘মিঃ লিউক স্ক্র্যাফটন অ্যান্ড ক্যাপ্টেন ওয়ালশ। মুনশি নবকিসেন উইল অ্যাসিস্ট দেম।’

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘তাহলে যে এখনই বেরিয়ে পড়তে হয় হুজুর। ত্রিবেণী অনেকটা পথ।’

‘রাইট।’ আর কোনও কথা না বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন ক্লাইভ। মিটিং শেষ হয়ে গেল।

ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই বরানগরের ঘাট থেকে দ্রুতগামী ছিপ নৌকো নিয়ে ত্রিবেণীর উদ্দেশে ভেসে পড়লেন স্ক্র্যাফটন, ওয়ালশ ও নবকৃষ্ণ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *