1 of 2

ফলতা থেকে পলাশি – ৪০

৪০

কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদ—দূরত্ব কম নয়। কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতা সেরে এখনও রাজধানীর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেননি সিরাজদ্দৌলা। তাঁবু গুটিয়ে নেওয়ার তোড়জোড় চলছে। তবে এরই মধ্যে কলকাতার খবর পৌঁছে গিয়েছে মুর্শিদাবাদে। চেহেল সেতুন, হিরাঝিল প্রাসাদের দিবার টপকে সে খবর ছড়িয়ে পড়েছে চকবাজারে। আতর-মিঠাই-গুলাবের কারবারি থেকে সামান্য গুলবরদার সকলেই জেনে গিয়েছে একথা—কোম্পানিকে শায়েস্তা করতে গিয়ে জোর ঝটকা খেয়েছেন নবাব।

রাজধানীর জায়গায় জায়গায় জটলা। আলোচনা-কৌতূহল-ফিসফাস। কারও মুখে বিস্ময়ের ছাপ। কারও চোখে লুকিয়ে আছে খুশি। তবে সকলেই চাপা গলায় হিসেব কষে কথা কইছে। আলপটকা মন্তব্যে বিপদ হতে পারে। নিজামতের কাসিদ জালসাজিসে ঘুরে বেড়ায় চকবাজারে। প্রজাদের মনের যাচ ইমতেহানি করে বেড়ায়। কেউ নবাবের বিরুদ্ধে কিছু বললেই তার নামে গদ্দারির ইলজাম আনে। তখন মেলা হাঙ্গামা।

গেলবার কলকাতা গিয়ে ইংরেজদের দুরমুশ করে দিয়ে এসেছিলেন সিরাজদ্দৌলা। মুর্শিদাবাদে ফিরে এসে আসমান সমান উঁচু দেমাকের সঙ্গে বলেছিলেন, ওই টোপিওয়ালাদের শায়েস্তা করতে আমার একপাটি পয়জারই কাফি। সত্যিই তো। গত বছরে কোনও প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারেনি ইংরেজরা। কলকাতা ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল ফলতা নামে এক অখ্যাত জায়গায়—এসব রাজধানীর আমআতরফ আদমি পর্যন্ত জানে।

বেশিরভাগ লোকই ভেবেছিল, এবারে নবাবের ফৌজ একেবারে দরিয়া পার করিয়ে দেবে ইংরেজদের। কিন্তু কী হল? উলটো খবর নিয়ে এসেছে ওয়াকেনবিশের দল। কার্যত মান খুইয়ে মুর্শিদাবাদে ফিরে আসছেন নবাব। তিনি সমঝোতা করেছেন কোম্পানির সঙ্গে। যে বিষয়গুলো নিয়ে নবাবের সঙ্গে কোম্পানির বিরোধ ছিল, তার সবই নাকি মেনে নিয়েছেন তিনি। কার্যত মাথা ঝুঁকিয়েছেন ইংরেজ কোম্পানির কাছে। এরপর কী হবে?

কেউ বলছেন, দরবারের বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী এবারে ইংরেজদের সাহায্য নিয়ে উৎখাত করবে নবাবকে। কেউ বা আবার বলছেন, ইংরেজ কোম্পানি এসব ঝুটঝামেলায় মধ্যে যাবে না। আলিনগরের সমঝোতার পর তো তারা বিনা বাধায় কারবার চালাতে পারবে। এই টোপিওয়ালারা মুনাফা ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে মাথা ঘামায় না।

কলকাতা থেকে সিরাজদ্দৌলা জঙ্গ ফতে করে ফিরলে ফের রঙ্গিলা হবে রাজধানী, যেমন হয়েছিল পূর্ণিয়া জয়ের পর। ফের তনখা উড়বে চকবাজারে। এই আশায় প্রচুর আতর, গুলাবজল, মিঠাই, শরাব, আতশবাজি, হাউই, ফানুস, বাতিদান মজুত করেছিল কারবারিরা। এবারে বাজার মন্দা। কলকাতার খবর এসেছে আজ সকালে। তারপর থেকেই বাজারের তেজ নেই। গতকাল তবুও কিছু বিকিকিনি হচ্ছিল। আজ চকবাজার একেবারে ঝিমিয়ে পড়েছে।

দোকান খুলে মাছি তাড়াচ্ছে আতরের কারবারি নিজামুদ্দিন। তার দোকানে কাঠের তাকের উপর সাজানো আছে সারি সারি আতরের শিশি। ইস্পাহানি, ফ্রানসিসি, দিশি সব রকমের আতরই মজুত আছে। সেই সঙ্গে বড় বড় রেকাবিতে সাজান রয়েছে রুপোর তবকে মোড়া রকমারি মিঠাই। কিন্তু খদ্দেরের দেখা নেই।

বড় বড় নীল ডুমো মাছি উড়ে এসে বসছে মিঠাইয়ের উপর। নিজামুদ্দিন হাক ছাড়ে, ‘ও রে করিম কাপড় দিয়ে মিঠাইয়ের পাত্রগুলো ঢেকে দে।’ করিম ব্যস্ত হয়ে হুকুম তামিল করে।

করিমের সঙ্গে নিজামুদ্দিনের আলাপ খুব অল্পদিনের।

মাসখানেক আগের কথা—নিজামুদ্দিনের দোকানের উলটোদিকে পথের ধারে ফুলের ডালি নিয়ে বসতে শুরু করে করিম। একদিন আক্রমের দলবল এসে আচমকাই করিমকে বেদম মারতে থাকে। ঘটনাটা ঘটে দিনের আলোয় সকলের চোখের সামনে। কেউ প্রতিবাদ করতে এগোয় না। কারণটা খুব স্বাভাবিক। চকবাজারে সওদা করতে গেলে আক্রমের অনুমতি লাগে। দিতে হয় মোটা টাকা মাসোহারা। এই টাকার একটা অংশ ফৌজদার, কোতোয়ালের হাত ঘুরে যায় মোহনলালের কাছে।

নিরীহ ছেলেটাকে বেদম মার খেতে দেখে নিজামুদ্দিনের গায়ের রক্ত গরম হয়ে ওঠে। আক্রম ও তার দলবলকে অনেক’দিন ধরেই চেনে নিজামুদ্দিন। চকবাজারে কারবার করতে করতে তার দাড়িতে পাক ধরেছে।

ছুটে গিয়ে নিজামুদ্দিন বলে, ‘এ আক্রম ছোড় দে—ছোড় দে ইয়ে লেড়কাকো।’

মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছে করিম। তাকে গালিগালাজ করতে করতে চলে যায় আক্রমের দলবল।

মাথা ফেটে রক্ত ঝরছে। গায়ে, হাতেপায়ে দারুণ আঘাতের চিহ্ন। চোখ থেকে দরদর করে ঝরছে জল। সৌম্যদর্শন ছেলেটার হালত দেখে নিজামুদ্দিনের বুকটা দুঃখে মুচড়ে ওঠে। এই নিজামত—এই নবাবি সর্বনাশা। আম-আতরফ মানুষের হাল এখানে জানোয়ারের চেয়েও অধম। কী কসুর এই ছোকরার? পেটের ধান্দায় দুটো ফুল নিয়ে পথের ধারে বসেছিল। আহা রে! কী মার মেরেছে ছেলেটাকে।

করিমকে এক হেকিমের কাছে নিয়ে গিয়ে ইলাজ করায় নিজামুদ্দিন। খানিকবাদে করিমের খোঁজে গ্রেফতারির পরোয়ানা নিয়ে কোতোয়ালির সেপাই আসে নিজামুদ্দিনের দোকানে। সেপাইয়ের হাতে মোটা টাকা গুঁজে দেয় নিজামুদ্দিন। সেপাই খুশি হয়ে সেলাম ঠুকে চলে যায়।

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে করিম বলে, ‘বহুত সুক্রিয়া হুজুর।’

‘আমি তোমার হুজুর-টুজুর নই। আমাকে চাচা বলতে পার। ঘর কোথায়?’

‘পেটের ধান্দায় এখানে এসেছি চাচা। ঘর রাজমহল।’

‘নাম কী?’

‘করিম খাঁ।’

নিজামুদ্দিন বলে, ‘এখানকার হকিকত তো সব বুঝলে। এক কাজ করো, কাল থেকে আমার দোকানের সামনে ফুল নিয়ে বসো। কেউ কিছু বলবে না।’

সেই থেকে নিজামুদ্দিনের দোকানের এক পাশে ঝুড়িতে ফুল নিয়ে বসে করিম।

আজ সকাল থেকে ফুলের ঝুড়িগুলোতে জল ছিটিয়ে যাচ্ছে করিম। সওদার আশায় পাইকেড়ের কাছ থেকে কেনা রকমারি ফুলের মধ্য গুলাবই বেশি। লাল-হলদে-শাদা-নীল। ফুলগুলোকে তাজা রাখার আপ্রাণ কোশিস করে চলেছে সে।

নিজামুদ্দিন হতাশ গলায় বলে, ‘খদ্দের আর আজ আসবে না রে করিম।’

‘বহুত লোকসান হবে যে চাচা। এত মিঠাই—তোমার বহুত রুপেয়া গচ্চা যাবে চাচা।’

‘যাক গচ্চা। নবাব জব্দ হয়ে ফিরছে। আমি খুব খুশি। তোর লোকসান হবে না। সব ফুল কিনে নিয়ে কোঠা সাজাব আমি। ফূর্তি করব।’

করিম দ্রুত উঠে গিয়ে নিজামুদ্দিনের কাছে গিয়ে বলে, ‘সমঝে কথা বলো চাচা, কে শুনে ফেলবে, পরেশান হবে তোমার।’

‘হোক গে। মাঝে মাঝে আমার খুন চাপে মগজে। মনে হয় নিজামত কেল্লাটাকেই গুঁড়িয়ে দিই।’

‘এত নফরতি কেন চাচা?’

‘কেন? তুই যে সেদিন খামোখা মার খেলি, তার জন্যে ওই নিজামত কেল্লার বদশাসনই দায়ী।’

‘ও নিয়ে ভেবে কী করবে চাচা—আমআদমি হয়ে পয়দা হওয়াই এদেশে বদ কিসমতি।’

হঠাৎ নিজামুদ্দিনের চোখদুটো জ্বালা করে ওঠে। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। সে বলে, ‘জানিস করিম, কিছু মানুষের বদখেয়ালে আমার জিন্দেগি বরবাদ হয়েছে। সেই শয়তানগুলো সব এখন নিজামতের মাথায়।’

অবাক চোখে নিজামুদ্দিনের দিকে তাকায় করিম।

নিজামুদ্দিন বলে, ‘ বিবিকে নিয়ে শ্বশুরালে যাচ্ছিলাম পানসিতে চড়ে। লোকে ঠাসা পানসি। নদীতে বজরায় চড়ে ইয়ার-দোস্ত নিয়ে ফূর্তি করছিল আলিবর্দির নাতি। তখন নবাব সিরাজদ্দৌলা হয়নি, লোকে মির্জা নামে চেনে। তাঁর ইয়ারদোস্তদের মধ্যে সঙ্গে ছিল মোহনলাল ও মেহেদি নেসার খাঁ। নবাবের মস্ত বজরা দ্রুত এগিয়ে এসে ধাক্কা মারে পানসিতে। পানসি উলটে যায়। আমি সাঁতরে বাচলাম। তলিয়ে গেল আমার বিবি। বড় পেয়ার করত আমাকে।’ পাঞ্জাবির আস্তিন দিয়ে চোখের জল মোছে নিজামুদ্দিন।

‘তারপর চাচা?’

নিজামুদ্দিনের গলায় ঝরে পড়ে আক্রোশ। সে বলে, ‘এত মানুষকে হাবুডুবু খেতে দেখে ফূর্তিতে ফেটে পড়ছিল মির্জা ও তার ইয়ারদোস্তরা। এটা ছিল তাঁদের কাছে একরকমের খেলা। উৎকট খুশির খেয়ালে এমন অনেক মানুষকে গঙ্গায় ডুবিয়ে মেরেছে মির্জা ও তার ইয়ারদোস্তরা। অন্ধ হয়ে ছিলেন আলিবর্দি খাঁ। এসবের কোনও প্রতিকার করেননি। পাপ! গুনাহ! কত মানুষের চোখের পানি। এর কিম্মত মেটাতেই হবে নিজামতকে। আল্লা মাথার উপরে আছেন।’

নিজামুদ্দিনের দোকানের দিকে আক্রমকে এগিয়ে আসতে দেখে উঠে ভিতরের মালমজুত করার ঘরে চলে যায় করিম। আক্রমের চোখদুটো দেখলেই তার বড় ভয় করে।

আক্রম এসে ভুরু নাচিয়ে বলে, ‘এক শিশি আতর দাও তো চাচা।’

আক্রমের কথার ইঙ্গিত বুঝল নিজামুদ্দিন। বলল, ‘দাঁড়া আসছি।’

নিজামুদ্দিন দোকান লাগোয়া গুদাম ঘরে চলে যায়। ঠাসা মালপত্রের মাঝে এক জায়গায় বসে সারেঙ্গির ছড় টানছে করিম। বেশ মনখারাপ করা সুর। চোখে জল এসে যায়। ছোকরার গুণ আছে। বেশ ভালো হাত।

আতরের শিশি হাতে বাইরে আসে নিজামুদ্দিন।

‘সারেঙ্গি বাজাচ্ছে কে?’ আক্রম শুধোয়।

‘সেই পাগলাটা। ফুল বেচে।’

‘বেড়ে হাত তো! সচ বলছ? ওই চুঁহাটা বাজাচ্ছে?’

‘বিশ্বাস না হয় তো গিয়ে দেখে আয়।’

‘তাজ্জব কি বাত। একেবারে ওস্তাদ কলাকারের মতো হাত ছোকরার।’

‘ছোকরার বদ কিসমতি। না হলে এমন কলাকার হয়ে ফুল বেচে চকবাজারে?’

আক্রম এবারে কোমরে গোঁজা তবিলটা বের করে চৌপাইয়ের উপর উলটে দেয়। ঝনঝন করে চৌপাইয়ের উপর পড়ে বেশ কয়েকটা রুপোর টাকা। সে বলে, ‘গুনে নিও চাচা। আর হ্যাঁ, ভালো কথা—মাল মজুত রেখ। দেওয়ানজি ফিরলে মেহফিল বসবে। কড়া নেশা চাই।’

আক্রম চলে যাওয়ার পর নিজামুদ্দিন বলে ওঠে, ‘শালা হারামি। যা বাড়ি গিয়ে আতর খা। জীবনটা তোর বরবাদ হবে শিগগিরই।’

‘আতর খাবে মানে? আতর আবার কেউ খায় নাকি? কী বলছ চাচা?’ অন্দর থেকে বাইরে এসে শুধোয় করিম।

‘আতর নয় রে করিম। আতরের শিশিতে জহর।’

‘অ্যাঁ? বলছ কি?’

‘সাপের বিষ। আক্রমের দলবল চরম নেশাখোর। সাপের বিষ ছাড়া এদের নেশা জমে না।’

করিম চোখ কপালে তুলে বলে, ‘আড়ালে তুমি এই কারবার চালাও চাচা?’

‘চালাই। আমআদমির কাছে এ জিনিস আমি বেচি না রে করিম। নিজামতের দালালদের বরবাদ করে দেওয়ার জন্য এই আমার হাতিয়ার। একসঙ্গে অনেকটা খেলে মরে যাবে মানুষ। অল্পতে নেশা হবে মস্ত। তবে ধীরে ধীরে বরবাদ হয়ে যাবে জিন্দেগি।’

করিম হাঁ করে চেয়ে থাকে নিজামুদ্দিনের দিকে।

শরফ উন্নেসার বজরা এসে ভিড়ল খোশবাগের ঘাটে।

বাঁদি, আবদার, দাখিলা, কোতোয়ালের সেপাইরা সব ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কাঠের পাটাতন বেয়ে নেমে এলেন নানি বেগম। প্রতি জুম্মাবারেই তিনি আসেন।

জয়নালকে দেখে স্মিত হাসির রেশ মুখে এনে জিগ্যেস করেন, ‘কেমন আছিস বেটা?’

তসলিম জানিয়ে জয়নাল বলে, ‘সেলাম বেগম সাহেবা। আপনার রহেমে খুশ তবিয়ত আছি। সহি সালামত আছি।’

একসময় আলিবর্দির পরিবারের খাস ভৃত্য ছিল জয়নাল। আলিবর্দির এন্তেকালের পর সে খোশবাগের সমাধিস্থল দেখভালের কাজে বহাল হয়।

খোশবাগে আলিবর্দির সমাধিকে ঘিরে বিরাট এলাকা নিয়ে গোলাপ ফোটায় জয়নাল। তার অধীনে কাজ করে জনা পঞ্চাশেক মালি। সারাবছর লাল গোলাপে ভরে থাকে আলিবর্দির সমাধি চত্বর। জুম্মাবারে ফুল তুলে রুপোর বড় রেকাবিতে জয়নাল সাজিয়ে রাখে বেগম সাহেবার জন্য। লাল গোলাপ খুব পছন্দ করতেন নবাব আলিবর্দি খাঁ।

নানি বেগমকে বজরা থেকে নেমে আসতে দেখে আজও যথারীতি তসলিম করল জয়নাল।

শরফ উন্নেসা আজ আর হেসে জয়নালকে কিছু শুধোলেন না। মুখটা আজ তাঁর ভয়ানক রকম গম্ভীর। কুর্নিশ করতে করতে পিছিয়ে এল জয়নাল।

জুম্মাবারে খোশবাগের মসজিদে প্রথমে আসরের নামাজ আদায় করেন শরফ উন্নেসা। তারপরে আলিবর্দির সমাধিতে মসলিনের মাহেঙ্গা চাদর চড়ান। চাদরের উপর ঢেলে দেন এক ঘড়া ইস্পাহানি আতর। বহু দূর পর্যন্ত সুগন্ধে ম ম করে ওঠে।

এরপর শরফ উন্নেসা ধূপ জ্বালেন। সমাধির উপর লাল গুলাবের রাশি রাশি পাপড়ি ছড়িয়ে দেন। তারপর শায়িত আলিবর্দির পায়ের দিকে হাঁটু মুড়ে বসে নিজামতের খুশনসিবি কামনা করে দোয়া মাঙেন পয়গম্বরের কাছে। সাঁঝবেলায় আলিবর্দির সমাধির উপর চিরাগ জ্বেলে দিয়ে ফিরে যান।

আজও শরফ উন্নেসা নিয়মমাফিক সব কিছু করলেন। কিন্তু প্রার্থনায় বসে বুঝলেন, মনটা তাঁর আজ ভয়ানক বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। অন্যান্য দিন নিবিষ্ট মনে পয়গম্বরকে স্মরণ করেন শরফ উন্নেসা। বাহ্যিক জগৎ সম্বন্ধে কোনও হুশ থাকে না। আজ মনটাকে কিছুতেই সংহত করতে পারছেন না তিনি। নানা এলোমেলো চিন্তা মেঘের মতো ভিড় জমিয়ে তাঁর মনটাকে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ করে তুলেছে।

আলিনগরের আখবরাত শোনার পর থেকে শরফ উন্নেসার মন ভালো নেই। ইংরেজদের দরিয়া পার করে দেওয়ার কসম খেয়ে তাঁর আদরের মির্জা আলিনগরে গিয়েছিল। ফিরে আসছে সমঝোতা করে। মান খুইয়ে। সমঝোতা হয়েছে ইংরেজদের শর্তে, নবাবের শর্তে নয়।

শরফ উন্নেসার রাজনীতিজ্ঞান কম নয়। বেশ বুঝতে পারছেন কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছে মুর্শিদাবাদের আকাশে। রোগশয্যায় শুয়েও আলিবর্দি বারবার নিষেধ করেছিলেন তাঁর আদরের নাতিকে—’ওই টোপিওয়ালাদের সঙ্গে বিরোধ বাঁধাতে যেও না যেন কখনও।’ শুনল না মির্জা সে কথা।

কর্নেল ক্লাইভ ও ওয়াটসনের নাম শরফ উন্নেসা শুনেছিলেন আলিবর্দির মুখে। এই দুই বাহাদুর জঙ্গবাজ নাকি দক্ষিণে কামাল করেছে। এই দুজন বহুত খতরনক এবং কৌশলী। গেলবার সিরাজ অনায়াসে কলকাতা জয় করে ফিরেছিল, সেবার ছিলেন না ক্লাইভ ও ওয়াটসন। এবারে এই দুই জাঁহাবাজ ইংরেজ সেনাপতির সঙ্গে সিরাজের লড়তে যাওয়াটা একেবারেই পছন্দ ছিল না নানি বেগমের। অনেক নিষেধ করেছিলেন। পাল্টা কৌশলে ইংরেজ কোম্পানিকে চাপে ফেলার কায়দাও বাতলে দিয়েছিলেন। কিন্তু সিরাজ কোনও কথাই যে শুনল না।

দীর্ঘশ্বাস ফেলেন শরফ উন্নেসা। তিনি বেশ বুঝতে পারছেন, কিছুদিনের মধ্যেই সন্ধির সব শর্ত ছুড়ে ফেলে দিয়ে স্বমূর্তি ধরবে ইংরেজরা। তাদের মদত দেবে দরবারের বিরুদ্ধগোষ্ঠী।

 সরফরাজ জননী জিনেতুন্নেসার করুণ আর্তনাদ সহসা যেন শুনতে পেলেন নানি বেগম। তাঁর চোখের পর্দায় উঠল সেই দৃশ্য—হাতির পিঠে শায়িত নবাব সরফরাজ খাঁর নিথর দেহ। গিরিয়ার যুদ্ধে আলিবর্দি হত্যা করেছেন তাঁর মনিবপুত্রকে। মসনদ মানেই লালচ-রক্ত-খুন-গুণাহ! বড় পাপ! সেই পাপের কিম্মত কি আজ চোকাতে হবে তাঁর আদরের মির্জাকে?

আঁধার নেমেছে। আলিবর্দির সমাধির পাশে স্থানুবৎ বসে আছেন শরফ উন্নেসা। দুচোখে জলের ধারা। হুশ ফেরে জয়নালের গলা শুনে—’চিরাগ জ্বালাবেন না বেগম সাহেবা?’

উড়নি দিয়ে চোখের জল মুছে শরফ উন্নেসা বলেন, ‘হুঁ।’

একদিকে হিরাঝিল। আরেকদিকে মোরাদবাগ প্যালেস। এর মাঝামাঝি জায়গায় হাট বসে প্রতি শুক্রবারে। আতরের পসরা নিয়ে আজ হাটে এসেছে নিজামুদ্দিন। তার কাছাকাছি ফুলের ডালি সাজিয়ে বসেছে করিম। সকালের ফুল বাসি হয়ে এসেছে। একেবারেই ঝিমিয়ে পড়েছে গুলাবগুলো। কে নেবে এই ফুল? তবু করিমের মনে সওদার আশা।

হাটে এলে খদ্দেরের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সারেঙ্গির ছড় টানে করিম। গুণী কলাকারের মতো হাত। বাজনা শোনার জন্য কিছু লোক ভিড় করে তার পাশে। ফুলের খরিদ্দার এদের মধ্যে কমই। তবে কেউ কেউ বাজনা শুনে সামান্য কিছু কড়ি ছড়িয়ে যায়। আজও গাছতলায় বসে সারেঙ্গির ছড় টানছিল করিম।

 হঠাৎ হুড়োহুড়ি পড়ে যায় হাটে। কোড়া হাঁকাতে হাঁকাতে সামনে ছুটে যায় দুজন সেপাই—’দূর বাশ! দূর বাশ!’

করিমের সামনে ভিড় করা লোকজন হুড়োহুড়ি করে পালায়। বাজনা থামিয়ে সচকিত হয়ে পড়ে করিম। নিশ্চয়ই কেউকেটা কেউ আসছে। এইসব নবাবি কেতায় করিমের কোনও উৎসাহ নেই। সে এক মনে সারেঙ্গির ছড় টানতে থাকে।

এগিয়ে চলেছে চার বেহারার পর্দা ঢাকা ডুলি। তার সামনে ও পিছনে কয়েকজন সেপাই। একেবারে পিছনে ঘোড়ার পিঠে আক্রম। নিজামুদ্দিন ভাবে নির্ঘাত মোহনলালের খানদানের কোনও জেনানা চলেছে মোরাদবাগ প্যালেসের দিকে। হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে ডুলি।

আক্রম ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে ডুলির কাছে দ্রুত এগিয়ে যায়।

খানিকবাদেই সে করিমের দিকে ছুটে আসে। ভড়কে যায় করিম। ফের মারধর করবে নাকি?

পান চিবোতে চিবোতে শরিফ মেজাজে আক্রম শুধোয়, ‘ফুলের কিম্মত কত?’

করিম ঘাবড়ে গিয়ে বলে, ‘মতলব?’

‘আরে বাপু মাগনা নয়। কড়ি দেব। সব ফুল চাই।’

‘ইতনা ফুল খরিদ করবেন?’ বিস্ময়ে করিমের চোখ কপালে উঠে যায়।

‘তুমি তো আজিব আদমি। সওদা তোমার। মুনাফা তোমার। এত পুছতাছ করার কী আছে?’

ফুলগুলো নেড়েচেড়ে দেখে পিচিক করে পানের পিক ফেলে আক্রম ফের বলে, ‘একটাও তো তাজা নেই। তোমার নসিব ভালো। মালকিনের খেয়াল। সব ফুল চাই।’

কোমরের তবিল খুলে করিমের হাতের উপর উপুড় করে দেয় আক্রম। ঝনঝনাৎ শব্দে বেশ কয়েকটা রুপোর টাকা এসে পড়ে করিমের হাতে।

করিম বলে, ‘লেকিন ফুলের কিম্মত তো ইতনা যেয়াদা নয়।’

‘রেখে দাও। মালকিনের হুকুম।’

‘কে তোমার মালকিন?’ প্রশ্নটা কৌতূহলের বশে করেই ফেলে করিম।

ফের একবার পিচিক পানের পিক ফেলে ফুলের ডালি তুলে নিয়ে আক্রম বলে, ‘দেওয়ানজির গুলাব। খুশবু বাই।’

করিম স্তম্ভিত হয়ে যায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *