1 of 2

ফলতা থেকে পলাশি – ১৯

১৯

ঘোড়ার খুরের ব্যস্ত খটাখট শব্দে, হাতির গলঘণ্টের ঠুংঠাং ধ্বনিতে, কামানের গাড়ি টেনে নিয়ে যাওয়ার ঘড়ঘড় আওয়াজে সহসা সচকিত হয়ে উঠল কলকাতা থেকে বজবজ যাওয়ার মূল সড়ক। কুয়াশা ও হিমের চাদরে মোড়া শেষ রাতের স্তব্ধতা ভেঙে চৌচির হয়ে গেল। দুহাজার সেপাই-লস্কর নিয়ে কোম্পানির ফৌজের মোকাবিলা করতে বজবজের কেল্লার দিকে ছুটে চললেন মানিকচাঁদ।

ওদিকে সারারাত ঝোপজঙ্গল, খানাখন্দে ভরা কঠিন পথ ভেঙে পরের দিন সকাল ন’টা নাগাদ ফৌজসহ বজবজ কেল্লার অদূরে এসে পৌঁছলেন কর্নেল ক্লাইভ। জায়গাটা নির্জন। ছায়াঘন। বড় বড় গাছপালা, বিশৃঙ্খল ভাবে বেড়ে ওঠা বুনো ঝোপ সবুজের দেওয়াল তুলেছে চারিদিকে। খুব বেশি দূরে দৃষ্টি যায় না।

কর্নেল ক্লাইভের চোখে পড়ল বেশ বড়সড় একটা মজা পুকুর। পুকুর না বলে দিঘি বলাই ভালো। যদিও একটুও জল নেই তাতে। একেবারে শুকনো খটখট করছে। গভীরতা প্রায় দশ ফুট। নীচের দিকে নেমে যাওয়া, জংলি ঘাস ও লতাপাতায় আচ্ছাদিত দিঘির চারদিকের ঢাল খুব একটা খাড়াই নয়।

এই দিঘির ঢাল বরাবর সৈন্য মোতায়েন করার নির্দেশ দিলেন কর্নেল ক্লাইভ। গুঁড়ি মেরে বন্দুক হাতে কনুইয়ে ভর দিয়ে উপুড় হয়ে ওত পেতে রইল ইংরেজ সৈন্যরা।

কিলপ্যাট্রিক বুঝলেন, চমৎকার জায়গা আবিষ্কার করেছেন কর্নেল। এখান থেকে প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে দিব্যি গুলিগোলা ছোড়া যাবে। ভূমি থেকে নীচে থাকায় বিপক্ষের গুলিগোলা চট করে কোম্পানির সৈন্যদের নিশানা করতে পারবে না।

অল্প কিছু সৈন্য সঙ্গে নিয়ে কর্নেল ক্লাইভ রইলেন এই দিঘি থেকে কিছুটা দক্ষিণে। এই জায়গা থেকে দেড় মাইল উত্তরে রয়েছে বজবজের কেল্লা। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে কেল্লার একটা বুরুজ। সকালের কুয়াশা কেটে যাওয়ায় বেশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

পুব দিকে বুনো ঝোপের আড়ালে মাইল খানেকের মধ্যে রয়েছেন ক্যাপ্টেন পাই। তাঁর অধীনের সেনারা নিজেদের মধ্যে নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে বজবজ-কলকাতা মূল সড়কের পাশে ঝোপের আড়ালে অপেক্ষা করছে। এরা ফ্ল্যাগ নাড়িয়ে মানিকচাঁদের বাহিনীর গতিবিধি জানাবে কর্নেল ক্লাইভকে।

পশ্চিম দিকে মাইল খানেকের মধ্যে গঙ্গা। তবে ঘন গাছপালার আড়াল থাকায় নদী দেখা যাচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে না অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের জাহাজগুলোকেও।

স্থলবাহিনীর অবস্থান এখন যে ঠিক কোথায়, সলিসবেরি জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে সেটা ওয়াটসনও বুঝতে পারলেন না। দূরবিনে চোখ রেখে কোম্পানির সেনাদলকে খোঁজার চেষ্টা করলেন। কিন্তু নদীর পাড়ের ঘন সবুজের সমারোহ ছাড়া আর কিছুই তাঁর চোখে পড়ল না। সবুজের ঘেরাটোপে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে কর্নেল ও অ্যাডমিরালের যোগাযোগ।

বজবজ কেল্লার মুখোমুখি নদীর উপর অপেক্ষা করছেন ওয়াটসন। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন বজবজের কেল্লাটা। এমন কিছু বড় নয়। তেমন শক্তপোক্ত বলেও মনে হচ্ছে না। কামান দাগার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছেন তিনি। কিন্তু স্থলবাহিনীর সেনারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছে কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে কামান দাগার হুকুম দিতে পারছেন না অ্যাডমিরাল। কামান দাগা মানে যুদ্ধ শুরু করে দেওয়া। স্থলবাহিনী প্রস্তুত না থাকলে কেল্লা থেকে পাল্টা হামলার মুখে বিপদ ঘটতে পারে।

ওয়াটসনের নির্দেশে মাস্তুল বেয়ে উপরে উঠলেন ক্যাপ্টেন ওয়েলার। দূরবিনে চোখ রাখতেই তিনি দেখতে পেলেন একটা দিঘির মধ্যে অস্ত্র হাতে প্রস্তুত রয়েছে ক্লাইভের সেনারা। দ্রুত নীচে নেমে এলেন ওয়েলার।

তারপরেই ভয়ানক শব্দে সলিসবেরি জাহাজ থেকে গোলা গিয়ে পড়ল বজবজ কেল্লার পাঁচিলের উপর। কেন্ট ও টাইগার জাহাজ থেকেও তোপ গর্জে উঠল। কেল্লা থেকে পালটা গোলা ছুড়তে শুরু করল মানিকচাঁদের সেপাইরা। তাদের তোপের পাল্লা খুব বেশি নয়। কামানের গোলাগুলো ওয়াটসনের জাহাজের নাগাল পেল না। জল ছলকে ডুবতে লাগল নদীতে।

কিছুক্ষণ বাদে মানিকচাঁদের দুহাজার সেনা গাছের আড়াল থেকে হামলা শুরু করল। দুপক্ষের গোলাগুলির শব্দে কানে তালা লেগে যাওয়ার জোগাড়। বারুদের গন্ধ মেশানো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল চারিদিক। শোনা যেতে লাগল গুলিবিদ্ধ ঘোড়ার করুণ চিঁ-হিঁ-হিঁ-হিঁ-হিঁ চিৎকার। সৈনিকদের মর্মান্তিক আর্তনাদ।

মানিকচাঁদের সৈন্যরা যুদ্ধে তেমন পটু নয়। তারাই মরতে লাগল বেশি। ঘণ্টাখানেক বাদে দেখা গেল মানিকচাঁদের সেপাই-লস্করদের মধ্যে প্রায় দুশোজন মাটি নিয়েছে। তুলনায় ইংরেজ পক্ষে ক্ষয়ক্ষতি অনেক কম। নিহত হয়েছে সাত-আটজন। তবে যুদ্ধের নিষ্পত্তি হওয়ার কোনও লক্ষণ নেই, দুপক্ষই সমানতালে গোলাগুলি চালিয়ে যাচ্ছে।

এতক্ষণ কেন্ট, টাইগার, সলিসবেরি জাহাজ থেকে দাগা গোলাগুলো আঘাত করছিল কেল্লার পাঁচিলে। এবারে আরও বড় পাল্লার কামান থেকে গোলা দাগার নির্দেশ দিলেন ওয়াটসন। দুটো গোলা কেল্লার দেওয়াল টপকে একেবারে প্রাঙ্গণে গিয়ে পড়ল।

এত বড় আকারের গোলা আগে চোখে দেখেনি মানিকচাঁদের সেপাইরা। পিলে চমকে গেল তাদের। বেশ কয়েকজন প্রাণের ভয়ে তখনই ঘোড়ায় চড়ে গোপন পথে কেল্লা ছেড়ে পালিয়ে গেল। রাধাকৃষ্ণ মল্লিক ও জনা কুড়ি সেপাই রয়ে গেল কেল্লায়।

রাধাকৃষ্ণ মল্লিকের মনটা নেচে উঠল খুশিতে। কেল্লা ছেড়ে সেপাইদের পালাতে দেখেই সে বুঝে ফেলেছে কী হতে চলেছে যুদ্ধের ফলাফল। এখন কর্নেল ক্লাইভ ফৌজ নিয়ে সদর ফটকে উপস্থিত হলেই ফটকটা শুধু খুলে দিতে হবে। তারপরেই হাতে আসবে বহু কাঙ্ক্ষিত আশরফির খেরিয়া। সুখস্বপ্নে মশগুল হয়ে পড়ল রাধাকৃষ্ণ মল্লিক।

গুড়ুম! মেজর কিলপ্যাট্রিকের ছোড়া একটা গুলি মানিকচাঁদের পাগড়ি উড়িয়ে নিয়ে চলে গেল। শিউরে উঠলেন মানিকচাঁদ। তাঁর হৃৎপিণ্ড ছুটতে লাগল অত্যন্ত দ্রুতগতিতে। মুহূর্তের জন্য সাক্ষাৎ মৃত্যুদূতকে যেন প্রত্যক্ষ করলেন তিনি। সামান্য এদিকওদিক হলেই গুঁড়িয়ে যেত মাথাটা। নিথর দেহটা ছিটকে পড়ত ঘোড়ার পিঠ থেকে। তারপর শয়ে-শয়ে ঘোড়ার খুরের চাপে থেতলে যেত দেহটা। নিজের বিকৃত মুদ্দত ভেসে উঠল মানিকচাঁদের চোখে। ফের একবার শিউরে উঠলেন তিনি।

 মুহুর্মুহু ছুটে আসছে ইংরেজদের গুলি। কোনওটা এসে বিঁধছে কোনও সিপাই-লস্করের বুকে, কোনওটা বিঁধছে ঘোড়ার গায়ে। মানুষ ও পশুর যুগপৎ আর্তনাদে কান পাতা দায়। লক্ষ্য ফসকে কখনও বা মড়মড় শব্দে গাছের ডাল ভাঙছে বুলেট, কখনও বা গাছের পাতা ভেদ করে হারিয়ে যাচ্ছে দূরে কোথাও। ইংরেজরা আক্রমণের ঝাঁঝ ততক্ষণে আরও বাড়িয়েছে।

কোমর থেকে দেহটাকে সামনে ঝুঁকিয়ে ঘোড়ার পিঠের সঙ্গে প্রায় মিশে রইলেন মানিকচাঁদ। তাঁর পরমাত্মা যেন ফিসফিস করে বলে উঠল, পালাও মানিকচাঁদ পালাও! না হলে বেঘোরে মরবে।

নিমেষে লাগাম টেনে ধরে ঘোড়ার গতিপথ বদলে নিলেন মানিকচাঁদ। ঘোড়াটা সামনে দু’পা উঠিয়ে চিঁ-হিঁ-হিঁ-হিঁ-হিঁ করে ডেকে উঠল। মানিকচাঁদ দুপায়ের গোড়ালি দিয়ে ঘোড়ার পেটে প্রচণ্ড জোরে গুঁতো মারতেই মনিবের ইঙ্গিত টের পেরে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে তিরবেগে ছুটে চলল ঘোড়া। মানিকচাঁদ পালিয়ে গেলেন।

হইচই বেঁধে গেল সেপাই-লস্করদের মধ্যে। লড়াই ছেড়ে সেনাপতি পালিয়ে গিয়েছেন। নিমেষে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল মানিকচাঁদের বাহিনী। যে যেদিকে পারল ছুটে পালাল। তাদের কামানের গাড়ি, বারুদের পিপে, কিছু অস্ত্রশস্ত্র, সহযোদ্ধা, জানোয়ারের মুদ্দত পড়ে রইল জঙ্গলের মধ্যে। শেষ হয়ে গেল বজবজের যুদ্ধ।

রণক্ষেত্রে পড়ে থাকা মৃতদেহের লোভে আকাশে উড়ছে একগাদা শকুন। মাটিতে গর্ত খুঁড়ে দ্রুত জানোয়ার ও মানুষের দেহগুলোকে গোর দেওয়ার ব্যবস্থা করল কোম্পানির ফৌজিরা। কিছু মৃতদেহকে গঙ্গার পাড়ে টেনে নিয়ে গিয়ে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হল।

সূর্য ডুবেছে। ক্রমশ কালো হয়ে আসছে চারিদিক। ওয়াটসনের বার্তা নিয়ে ক্লাইভের কাছে ছুটে এলেন আয়ারকুট। ক্লাইভকে স্যালুট জানিয়ে বললেন, ‘অ্যাডমিরাল চাইছেন রাতের অন্ধকারে হানা দিয়ে আজই কেল্লাটা দখল করতে।’

গতকাল সারারাত ধরে পথ ভাঙার পরিশ্রম, তারপরে যুদ্ধ। ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে ক্লাইভের শরীর। তাঁর সৈন্যরাও সকলে ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে ভয়ানক ক্ষুধার্ত। ক্লাইভ বললেন, ‘আজ আর কেল্লা দখল সম্ভব নয়। উই আর টু টায়ার্ড। উই উইল স্টর্ম দ্য ফোর্ট টুমরো মর্নিং।’

ক্লাইভের বার্তা নিয়ে ফিরে গেলেন আয়ারকুট।

আঁধার নামতে না নামতেই রাতের আহার সেরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল ক্লাইভের বাহিনী। জেগে রইল শুধু স্ট্রন। তাকে সুরের নেশায় পেয়েছে আজ। একের পর এক মন উদাস করে দেওয়া সুর তুলছে ট্রাম্পেটে। সেই সঙ্গে সমানে গলায় ঢেলে চলেছে পাইট পাইট আরক।

গভীর রাতে বাজনা থামল। নিজের তাঁবু থেকে টলতে টলতে বেরিয়ে এল স্ট্রন। আরকের নেশায় একেবারে বেসামাল।

চারিদিকে নিকষ কালো অন্ধকার। বিচিত্র ছন্দে নেচে বেড়াচ্ছে জোনাকি। ঝিঁঝির ডাক তীব্র। ডানা ঝাপটে এক গাছ থেকে আরেক গাছে উড়ে যাচ্ছে বাদুড়, প্যাঁচা।

এলোমেলো পা ফেলতে ফেলতে এগিয়ে চলল স্ট্রন। তার হাতে একটা বন্দুক। কোমরে জড়ানো রয়েছে মোটা একটা দড়ি। কোমর থেকে ঝোলা চামড়ার খাপে রয়েছে ফলতার হাটে গড়িয়ে নেওয়া সেই খাঁড়াটা। স্ট্রনের পরনে চামড়ার ব্রিচেস ও জ্যাকেট। বুকের বোতাম খোলা। ডিসেম্বর শেষের হিমেল হাওয়া সুঁচ ফোটাচ্ছে গায়ে। কিন্তু স্ট্রনের শরীরে তেমন শীত বোধ নেই। কড়া দিশি মদের প্রভাবে তার গোটা শরীরটা যেন আগ্নেয়গিরির মতো ফুটছে।

বজবজের কেল্লাকে ঘিরে রাখা পরিখার পাশে এসে দাঁড়াল স্ট্রন। পরিখার জল কালো কাচের মতো। একদম স্থির।

দুপাশে দুহাত ছড়িয়ে জড়ানো গলায় হেঁকে উঠল স্ট্রন, ‘হেই লিসন! আই অ্যাম গ্রাহাম স্ট্রন। দ্য প্রিন্স অফ ইংল্যান্ড।’

উন্মুক্ত প্রান্তর। হাঁটু পর্যন্ত লম্বা বুনো ঘাসে ঢাকা। এ দিকটায় বড় বড় গাছপালা কম। শুধু স্ট্রন যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে তার কাছেই রয়েছে বহু পুরোনো ঝাঁকড়া একটা অশ্বত্থ গাছ। অদূরে বয়ে যাচ্ছে বিরাট চওড়া নদী। কালি ঢালা জল একেবারে শান্ত। চরাচর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। স্ট্রনের এই ঘোষণা শুনতে পেল না কেউ।

ডানা ঝাপটে উড়ে গেল একদল রাতচরা পাখি। জড়ানো গলায় ফের হাঁক ছাড়ল স্ট্রন, ‘হেই লিসন! আই অ্যালোন ক্যান স্টর্ম অ্যা ফোর্ট।’

কেল্লার দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিত হল স্ট্রনের কথা। কেল্লার দিকটা একেবারে নিঝুম। গোটা কেল্লাটা যেন কালো চাদরে মাথা মুড়ে রয়েছে। শুধু অনেক উঁচুতে কয়েকটি বাতিস্তম্ভে ধিকিধিকি জ্বলছে মশাল।

হাতের বন্দুকটাকে চামড়ার জ্যাকেটের ভিতরে ঢুকিয়ে পাকা সাঁতারুর ভঙ্গিমায় এই কনকনে শীতের রাতে পরিখার জলে লাফ দিয়ে পড়ল স্ট্রন। সাঁতার দিয়ে সে কেল্লার দিকে এগিয়ে চলল। চোখের নিমেষে পরিখা পার হয়ে ওপাড়ে গিয়ে উঠল। এই কড়া শীতে গা-মাথা থেকে টপটপ করে জল ঝরছে। কিন্তু স্ট্রনের তা নিয়ে কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই।

কোমর থেকে মোটা দড়িটা খুলে নিয়ে উপরের দিকে ছুড়ে দিল স্ট্রন। দড়ির ফাঁস আটকে গেল একটা লোহার বাতিস্তম্ভের গায়ে। দড়ি বেয়ে ট্রাপিজের খেলায় পটু স্ট্রন চোখের নিমেষে উপরে উঠে কেল্লার ছাতের উপর এসে দাঁড়াল।

‘হা-হা-হা-হা-হা-হা!’ সাফল্যের আনন্দে ছেলেমানুষের মতো সজোরে হেসে উঠল স্ট্রন। নিশুত রাতে প্রেতাত্মার হাসির মতো সে হাসি প্রতিধ্বনিত হল চারিদিকে।

ছাতে জ্বলতে থাকা মশালের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠল স্ট্রনের মুখ। এক হাতে বন্দুক ও এক হাতে খাঁড়া। অস্ত্রসমেত হাতদুটোকে উপরের দিকে তুলে ইংরেজ শিবিরের দিকে মুখ করে বিজয়োল্লাসে চেঁচিয়ে উঠল স্ট্রন। ‘অ্যালোন আই স্টর্মড দ্য ফোর্ট। কাম অ্যান্ড সি। এই দুর্গের মালিক আমি।’

ঘুম ভেঙে গেল লাশিংটন ও রাসেলের। কার যেন গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে এই গভীর রাতে! কী ব্যাপার? মশাল হাতে বেরিয়ে এল লাশিংটন ও রাসেল। স্ট্রনের গলার আওয়াজ পেয়ে নবকৃষ্ণকে ডেকে তুলল নীলকণ্ঠ। মশাল হাতে বেরিয়ে এল তারাও।

পরিখার কাছে এসে সকলের চক্ষু চড়কগাছ। কেল্লার ছাতে জ্বলতে থাকা মশালের আলোয় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ছাতের উপরে বিপজ্জনক ভাবে দাঁড়িয়ে আছে একজন ইংরেজ সৈনিক। এ দৃশ্য দেখে হতভম্ব হয়ে গেল রাসেল, লাশিংটন, নবকৃষ্ণ ও নীলকণ্ঠ।

ফের চেঁচিয়ে উঠল স্ট্রন, ‘দেখে যাও। দেখে যাও। দেখে যাও সবাই। আই অ্যালোন স্টর্মড দ্য ফোর্ট। এই কেল্লার মালিক আমি। আমি গ্রাহাম স্ট্রন। দ্য প্রিন্স অফ ইংল্যান্ড।’ কারও আর বুঝতে বাকি রইল না, এ কীর্তি কার।

গোলমাল হইচইয়ের শব্দে ঘুম ভেঙে গিয়েছে ইংরেজ শিবিরের আরও অনেকের। শঙ্কিত হয়ে পড়ল তারা। কেল্লা থেকে নবাবের সেনারা হঠাৎ আক্রমণ করল নাকি? বন্দুক হাতে অনেকে ছুটে আসতে লাগল পরিখার দিকে।

কেল্লার ছাতের পাশে একটা ঘরে ঘুমিয়ে ছিল রাধাকৃষ্ণ মল্লিক। স্ট্রনের চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে গেল তার। ব্যাপারটা কী বোঝার জন্য ঘুম থেকে উঠে ছাতে আসতেই সে হাঁ হয়ে গেল। এক হাতে খাঁড়া, আরেক হাতে বন্দুক। ছাতের উপর এই নিশুত রাতে নৃত্য করছে এক গোরা পল্টন। মানুষ না অশরীরী?

রাধাকৃষ্ণ মল্লিকের গায়ের রোমকূপ খাড়া হয়ে উঠল। বিষয়টা ভালো করে বোঝার জন্য সামনের দিকে সে দু’পা এগোতেই দুম করে গুলি চালিয়ে বসল স্ট্রন। আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল রাধাকৃষ্ণ মল্লিক। নিমেষে নিথর হয়ে গেল তার দেহটা।

গুলি ও আর্তনাদের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল কেল্লায় থাকা কয়েকজন সেপাই-লস্করের। তলোয়ার হাতে তিনজন ছুটে এল ছাতে। আবার গুলি চালাল স্ট্রন আরেকজন লুটিয়ে পড়ল। প্রবল বিক্রমে আরেকজন তরোয়াল হাতে ছুটে আসতেই বিদ্যুৎবেগে সরে গিয়ে লোকটার হাতে খাঁড়া দিয়ে প্রবল আঘাত করল স্ট্রন। তরোয়াল সমেত কাটা হাতটা ছিটকে পড়ল পাশে। খাঁড়ার আরেক কোপে স্ট্রন তার মুন্ডু উড়িয়ে দিল।

এই দৃশ্য দেখে তৃতীয়জন দুদ্দাড় করে নীচে নেমে চেঁচাতে লাগল, ‘ভাগো ভাগো। কোম্পানির ফৌজ হামলা করেছে।’ আতঙ্কে দুর্গের বাকি লস্কর পেয়াদারা সব পালিয়ে গেল রাতের অন্ধকারে।

কেল্লার প্রাকারের উপর উঠে দাঁড়িয়ে স্ট্রন চেঁচাতে লাগল, ‘ভিকট্রি! ভিকট্রি!’

তারপরই পরিখার ওপারে জড়ো হওয়া ইংরেজ বাহিনীর সকলকে চমকে দিয়ে দুর্গের উপর থেকে স্ট্রন ঝাঁপিয়ে পড়ল পরিখার জলে। মুফতের এই সার্কাস দেখে স্তম্ভিত নীলকণ্ঠর হাত থেকে খসে পড়ে গেল মশালটা। কাঁপা গলায় রাসেল চিৎকার করে উঠল, স্ট্র-অ-অ-ন!

বিস্ফারিত চোখে সকলে চেয়ে রইল জলের দিকে। ডুবে মারা গেল নাকি ছেলেটা? খানিকবাদে শুশুকের মতো ভু-উ-উ-উ-স করে জল থেকে মাথা তুলল স্ট্রন। তারপর পরম নিশ্চিন্তে চিৎসাঁতার কেটে এগোতে লাগল পাড়ের দিকে।

পরের দিন সকালে মেজর কিলপ্যাট্রিক ডেকে পাঠালেন স্ট্রনকে। গত রাতের নেশা তখন তার ছুটে গিয়েছে। নেশার ঘোরে যা কাণ্ড ঘটিয়েছে গতরাতে, সে কথা ভেবে দিনের আলোয় শিউরে উঠল স্ট্রন। শাস্তির ভয়ে তার হাত-পা কাঁপতে লাগল। নিশ্চয়ই এবার কোর্ট মার্শাল হবে। চাকরি তো যাবেই, এই বেলেল্লাপনার জন্য ক্লাইভ সাহেব হয়তো তাকে কয়েদ করে দেশে পাঠিয়ে দেবেন। রুজিরোজগারের খোঁজে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল স্ট্রন। সব শেষ হয়ে গেল। নিঃশব্দ কান্নায় গলা বুজে এল তার।

কর্নেল ক্লাইভের তাঁবুর বাইরে উত্তেজিত হয়ে পায়চারি করছিলেন মেজর কিলপ্যাট্রিক। গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন ক্যাপটেন বার্কার, ক্যাপটেন কিং, ক্যাপটেন পাই। কর্নেল ক্লাইভ সকলকেই তলব করেছেন। স্ট্রন এসে মাথা নীচু করে দাঁড়াল।

কিলপ্যাট্রিক ধমকে উঠলেন, ‘কাল রাতে কী সাংঘাতিক কাণ্ড করেছ তুমি জান? আর ইউ অ্যা ক্লাউন? হোয়াট ডু ইউ থিঙ্ক? ব্যাটল ইস অ্যান অবজেক্ট অফ জোক? ও ভাবে কেল্লায় ঢুকে মারামারি বাঁধিয়েছিলে কোন সাহসে? উই ওয়্যার স্লিপিং ইন দ্য নাইট। যদি ফোর্ট থেকে আমাদের উপর অ্যাটাক হত? বেওকুফ ছোকরা কোথাকার? কর্নেল ক্লাইভ তোমার মুন্ডু ছিঁড়ে নেবেন।

‘সরি স্যার। ভুল হয়ে গেছে।’

‘ভুল না, স্টুপিডিটি?’

‘প্যার্ডন মি স্যার।’

‘আমি মাফ করার কে? কর্নেল ক্লাইভ আসছেন। টের পাবে এবার। হি উইল টিচ ইউ অ্যা লেসন।’

হঠাৎ সাড়া পড়ে গেল সকলের মধ্যে। অ্যাটেনশনে দাঁড়িয়ে পড়লেন ক্যাপটেন বার্কার, ক্যাপ্টেন পাই ও ক্যাপ্টেন কিং। কর্নেল ক্লাইভ তাঁবু থেকে বেরিয়ে আসছেন। ঠোঁটের কোণে গোঁজা রয়েছে পাইপ। কিলপ্যাট্রিক এগিয়ে গিয়ে স্যালুট করলেন তাঁকে।

কর্নেল ক্লাইভের মুখটা ভয়ানক গম্ভীর ও থমথমে। আড়চোখে একবার কর্নেলকে দেখে ফের মাথা নামিয়ে নিল স্ট্রন। তার টুকটুকে লাল গালদুটো চোখের জলে ভেসে যেতে লাগল। স্ট্রনের সামনে এসে দাঁড়ালেন কর্নেল ক্লাইভ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *