1 of 2

ফলতা থেকে পলাশি – ২০

২০

গম্ভীর মুখে স্ট্রনকে আপাদমস্তক একবার জরিপ করলেন কর্নেল ক্লাইভ। মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে বলির পাঁঠার মতো কাঁপছে স্ট্রন। ক্লাইভের মুখের দিকে চেয়ে রয়েছেন বার্কার, কিং ও পাই। মেজর কিলপ্যাট্রিক স্থানুবৎ দাঁড়িয়ে। স্ট্রনের শাস্তির কী নিদান দেবেন কর্নেল, জানার জন্য উৎসুক সবাই।

স্ট্রনের গাল বেয়ে এক ফোঁটা চোখের জল টপ করে মাটিতে পড়ল। ভিজে গেল খানিকটা শুকনো ধুলো। এদেশে এসেই স্ট্রন মজেছিল দিশি আরকে। দামে সস্তা, কিন্তু খুব কড়া। অল্পতেই মৌতাত বেশ জমে ওঠে। পরিশ্রমের ক্লান্তি দূর করতে গতকাল রাতে সে মাত্রাতিরিক্ত পান করে ফেলেছিল।

মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে স্ট্রন—আর কোনওদিন সে দিশি আরক ছোঁবে না। এ বড় বিপজ্জনক পানীয়। এর প্রভাবে পরিখা সাঁতরে একা একা গোটা একটা কেল্লা দখল করে নেওয়া যায়, তারপরে কোর্টমার্শাল হয়, নোকরি যায়, এমনকি মুন্ডুখানাও খসে যেতে পারে। স্ট্রনের বুক ঠেলে কান্না উঠে আসে। পরিবারের কারও সঙ্গে আর বোধ হয় দেখা হল না।

কড়া গলায় ধমকে উঠলেন কর্নেল ক্লাইভ, ‘মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছ কেন? লুক অ্যাট মি।’

ধমক খেয়ে থরথর করে কেঁপে উঠল স্ট্রন। জলে টইটম্বুর অসহায় চোখদুটো তুলে কর্নেলের মুখের দিকে তাকাল। তার মনে হল, কর্নেলের রাগী মুখ থেকে যেন আগুন ঝরছে। এখনই ভয়ংকর কোনও নিদান হাঁকবেন। স্ট্রনের একুশ বছরের ছোট্ট জীবনটা একেবারে বরবাদ হয়ে যাবে।

কর্নেল গর্জন করে উঠলেন, ‘ইউ এনডেনজারড দ্য এনটায়ার আর্মি। ডিফেন্ড ইওর অ্যাকশন।’

চোখদুটো ফের মাটির দিকে নামিয়ে নিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল স্ট্রন।

‘স্পিক আউট।’

স্ট্রনের মনে হল, কর্নেলের পায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে বলে—প্যার্ডন মি স্যার। গিভ মি অ্যা চান্স। আমি কি কাল রাতে আমার মধ্যে ছিলাম? হুঁশ থাকলে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে কেল্লায় হানা দিতে যাই কখনও? নিজের ভালো তো পাগলেও বোঝে স্যার। আমি কথা দিচ্ছি, আর কোনওদিন আর্মির ডিসিপ্লিন আমি ভাঙব না।

‘হা-হা-হা-হা-হা-হা!’ সকলকে চমকে দিয়ে হঠাৎ সজোরে হেসে উঠলেন কর্নেল ক্লাইভ।

বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে মুখ তুলে তাকাল স্ট্রন।

কর্নেল ক্লাইভ সামনের দিকে দু’পা এগিয়ে এসে স্ট্রনকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘ওয়েলডান মাই বয়। ইউ হ্যাভ ডান এ গ্রেট জব!’

স্ট্রন স্তম্ভিত হয়ে গেল। নাটক করছেন নাকি কর্নেল?

ক্লাইভ বললেন, ‘যা করেছ, করেছ। ডোন্ট রিপিট সাচ অ্যাকশন ইন ফিউচার। ভবিষ্যতে এমন দুঃসাহসী কাজ কখনও করতে যেও না যেন। এখন যাও। টেক রেস্ট অ্যান্ড রিল্যাক্স।’

মাথা ঝুঁকিয়ে বড় সাহেবদের দিকে মুখ করে কিছুদূর পিছিয়ে গেল স্ট্রন। তারপরে চকিতে উলটোদিকে ঘুরে টেনে এক দৌড় লাগাল। সেই দৌড়ের ভঙ্গি দেখে ফের সশব্দে হেসে উঠলেন কর্নেল ক্লাইভ।

পাইপের ধোঁয়া ছেড়ে স্থানুবৎ দাঁড়িয়ে থাকা কিলপ্যাট্রিক, কিং, বার্কার ও পাই-এর উদ্দেশে কর্নেল বললেন, ‘এই স্ট্রন ছোকরার জন্য আজ সকালে কেল্লা দখলের লড়াইটা আমাদের আর লড়তে হল না। সোলজাররা একটু বেশি বিশ্রাম পেল। বেশ কিছু গোলাগুলি বেঁচে গেল।

‘তোমরা বলতে পার গ্রাহাম স্ট্রন ব্রোক দ্য ডিসিপ্লিন। সে শাস্তি না পাওয়ায় অন্য সোলজাররা ইনডালজড হবে। তারাও ডিসিপ্লিন ভাঙবে। আমি মনে করি, তা হবে না। গ্রাহাম স্ট্রন ইস অ্যান একসেপশন। অন্য কোনও সাধারণ সোলজারের পক্ষে স্ট্রন হয়ে ওঠা সম্ভব নয়।

‘আরও একটা কথা—ব্যাটলফিল্ডে নিয়মের বাইরে গিয়ে অনেক সময় অ্যাকশন নিতে হয়। সেসব ডেসপারেট অ্যাকশনই মিরাকল ঘটায়। আই এক্সপিরিয়েন্সড দিস ইন সাউথ ইন্ডিয়া। আমি এসব খুব এনজয় করি। স্ট্রন যা করেছে তা জেনেবুঝে করেনি। নাউ ফরগেট হিজ অ্যাকশন। হোয়াট ইস দ্য আউটকাম? উই হ্যাভ ক্যাপচারড দ্য ফোর্ট উইদাউট অ্যা ক্যানন শট। দ্যাটস অল।’

কর্নেলকে স্যালুট জানিয়ে কিলপ্যাট্রিক ও ক্যাপটেনরা চলে গেলেন নিজের নিজের কাজে। ক্লাইভের কাছে এসে হাত কচলে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘আপনি মহান বলেই স্ট্রন ছোকরাকে বেকসুর খালাস করে দিলেন। আপনার জায়গায় অন্য কেউ হলে নির্ঘাত ছোকরার গর্দান যেত। আপনাকে যত দেখছি, তত অবাক হচ্ছি স্যার।’

ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজে রাখা থেকে পাইপটা হাতে নিয়ে কর্নেল বললেন, ‘আরও অনেক কিছু দেখবে মুনশি।’

‘সে আর বলতে। আপনার কাজের তল পাওয়া মুশকিল।’

হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন ক্লাইভ। দূরের দিকে দৃষ্টি ভাসিয়ে দিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘রবার্ট ক্লাইভ ইতিহাস হওয়ার জন্য জন্মেছে মুনশি। তবে ইতিহাস তাঁকে হিরো বানাতে পারে আবার ভিলেনও বানাতে পারে। তাতে তাঁর কিছু এসে যায় না। বুঝলে মুনশি, ইতিহাস হওয়াটাই বড় কথা।’

বজবজের কেল্লা থেকে ইংরেজদের হাতে এল, আঠেরোটা কামান ও চল্লিশ ব্যারেল বারুদ। বজবজ ছাড়ার আগে কেল্লাটাকে মাটিতে গুঁড়িয়ে দিল কোম্পানির ফৌজ। বজবজ থেকে ফের কেন্ট জাহাজে চড়ে বসলেন কর্নেল ক্লাইভ। কোম্পানির স্থলবাহিনী পূর্বের মতোই মেজর কিলপ্যাট্রিকের নেতৃত্বে মার্চ করে কলকাতার দিকে এগোতে লাগল।

ঘোড়া দাবড়ে গোবিন্দপুরের এক নির্জন খেয়াঘাটে এসে পৌঁছলেন মানিকচাঁদ। কালো চাদরে মাথা মোড়া। বজরা প্রস্তুত হয়েই ছিল। মানিকচাঁদ তড়িঘড়ি চেপে বসলেন বজরায়। বহরদাররা দ্রুত দাঁড় বাইতে লাগল। মূলাজোড়ের উদ্দেশে ভেসে চলল মানিচাঁদের বজরা।

সুতানুটি পার হয়ে এসে খানিকটা যেন হাঁফ ছাড়লেন মানিকচাঁদ। ইংরেজদের ভয়টা গিয়েছে, তবে তার মনের মধ্যে ধীরে-ধীরে চেপে বসছে অন্য ভয়।

বিচক্ষণ মানিকচাঁদ দিব্যি বুঝতে পারছেন, ফোর্ট উইলিয়াম হাতছাড়া হল বলে। এ খবর শুনে নবাবের প্রতিক্রিয়া কী হবে, এই নিয়ে তিনি ভয়ানক চিন্তিত হয়ে পড়লেন। রাগে ফুঁসে ওঠা নবাবের আগুনে চোখদুটো কল্পনা করে মানিকচাঁদের প্রাণ কেঁপে উঠল। কানে যেন স্পষ্ট শুনতে পেলেন নবাবের হুঙ্কার, ‘উল্লুক, ডরপোক কাঁহেকা।’

হাতজোড় করে কাঁপতে কাঁপতে মানিকচাঁদ বললেন, ‘হুজুর! আমার কসুর কী?’

‘নবাবের ইজ্জত তুমি মিট্টিতে মিশিয়ে দিয়ে এসেছ।’

‘সাবিৎ জঙ্গ বহুত খতরনক জঙ্গবাজ।’

‘ফলতায় মান্ডি বসানোর হুকুমত দিয়েছিলে কেন?’

‘বেসাহারা ইংরেজরা যে ফের ফোঁস করতে পারে, এ আমি কল্পনাও করিনি।’

‘তুমি গদ্দারি করেছ আমার সঙ্গে। টোপিওয়ালাদের নিমক খেয়েছ।’

মানিকচাঁদের পায়ের তলায় মাটি কাঁপতে থাকে। মরিয়া হয়ে বলেন, ‘নেহি হুজুর। ইয়ে ঝুটা ইলজাম।’

গর্জন করে উঠলেন সিরাজদ্দৌলা। ‘তুমকো জিন্দা নেহি ছোড়েঙ্গে। মোহনলাল, কয়েদ করো এই দুশমনকে।’

‘হুজুর মাফ কিজিয়ে।’ চেঁচিয়ে ওঠেন মানিকচাঁদ। তন্দ্রা ছুটে গেল। ধড়ফড় করে জেগে উঠলেন। এই কড়া শীতেও দরদর করে তিনি ঘামছেন। ছুড়ে ফেলে দিলেন গায়ে জড়িয়ে রাখা মাহেঙ্গা কাশ্মিরী শাল।

মানিকচাঁদের চিৎকার শুনে একজন দাখিলা ছুটে এল। হাতের ইশারায় তাকে চলে যেতে বললেন তিনি। মেহগিনি কাঠের আরামকেদারা থেকে উঠে জানলার পাশে এলেন মানিকচাঁদ। চিলমনের পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালেন। কুলকুল শব্দে বয়ে চলেছে গঙ্গা। একেবারে শান্ত, নিরুদ্বেগ, নিরুত্তাপ নদী।

সন্ধের মুখে মূলাজোড়ে এসে পৌঁছলেন মানিকচাঁদ। বসতবাটির দেউড়ি থেকে ঘাট পর্যন্ত নেমে এসেছে সিঁড়ি। নোঙর ফেলল বজরা। কাশ্মিরী শালে মাথা মুড়ে মানিকচাঁদ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলেন। তাঁর পারিবারিক দেবালয় থেকে তখন মঙ্গলশঙ্খের ধ্বনি ভেসে আসছে।

বজবজ থেকে ফোর্ট উইলিয়াম যাওয়ার পথে পড়ে দুটো কেল্লা। একটা মেটিয়াবুরুজে, আরেকটা শিবপুরে। মেটিয়াবুরুজের কেল্লার নাম আলিগড়। শিবপুরের কেল্লার নাম থানা। এই কেল্লা দুটোও খুব সহজেই দখল করে নিল ইংরেজরা। কোনও প্রতিরোধের মুখে পড়তে হল না। নদীতে বড়বড় তিনটে যুদ্ধজাহাজ দেখেই পালিয়ে গিয়েছিল কেল্লার পাইক-বরকন্দাজরা। থানা দুর্গ থেকে ইংরেজরা পেয়ে গেল গো-গাড়ির উপর বসানো চল্লিশটা কামান। এগুলো ছিল ইংরেজদেরই সম্পত্তি। কোম্পানির ফৌজের মোকাবিলা করার জন্য ফোর্ট উইলিয়াম থেকে থানা দুর্গে নিয়ে যাওয়ার হুকুম দিয়েছিলেন মানিকচাঁদ।

১৭৫৭ সালের ২ জানুয়ারি। সবে ভোরের আলো ফুটেছে। বাতাসে কড়া শীতের আমেজ। কুয়াশার ছিটেফোঁটা নেই। পুব আকাশে সদ্য জেগে ওঠা কুসুম রঙের সূর্যটা নিঁখুত গোল। মেটিয়াবুরুজে নেমে পড়লেন ক্লাইভ। এখান থেকে স্থলবাহিনীর সঙ্গে মার্চ করে তিনি ফোর্ট উইলিয়ামের দিকে এগোবেন।

গঙ্গা বেয়ে কেন্ট, টাইগার, সলিসবেরি ও ব্রিজওয়াটার-এই চারটে রণতরী ফোর্ট উইলিয়ামের মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। সলিসবেরির প্রশস্ত ডেকের উপর এসে দাঁড়ালেন অ্যাডমিরাল ওয়াটসন। ভুরু কুঁচকে কোমরে হাত রেখে তাকালেন কেল্লার দিকে। মুখে বার্মা চুরুট।

অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের মেজাজটা গত কয়েক’দিন ধরে একেবারেই শরিফ নেই। মনে একরাশ বিরক্তি। এর কারণ কর্নেল ক্লাইভ। জেদি, একগুঁয়ে, বেয়াড়া ধরনের এই মানুষটাকে তাঁবে রাখা খুব কঠিন—এটা ওয়াটসন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সামান্য একজন কর্মচারী হলেও রবার্ট ক্লাইভের হাবভাব, হাঁকডাক একেবারে নবাব-বাদশার মতো। অ্যাডমিরাল চার্লস ওয়াটসন যে ইংল্যান্ডের রাজার প্রতিনিধি, রাজার নৌবহরের একজন সেনানি—এই বিষয়টা কর্নেল ক্লাইভ যেন গ্রাহ্যই করেন না। ব্যক্তিত্বের লড়াইয়ে দক্ষিণে জিৎ হয়েছিল ক্লাইভের। বাংলায় গিয়ে ক্লাইভের উপর খবরদারি করে তিনি এর শোধ তুলবেন—এমনই ভেবেছিলেন ওয়াটসন। কিন্তু তা হচ্ছে কোথায়?

ঠোঁট থেকে চুরুটটা হাতে নিয়ে ওয়াটসন ভাবতে থাকেন, দক্ষিণের যুদ্ধে কম বাহাদুরি দেখাননি তিনি। কিন্তু কৃতিত্বের সব আলোটুকুই যেন কোন জাদুবলে কেড়ে নিলেন কর্নেল ক্লাইভ। তাঁরই নাম ছড়াল বেশি। নেটিভরা নাম দিল সাবিৎ জঙ্গ-যুদ্ধে অপরাজেয়।

যুদ্ধজাহাজগুলো নিয়ে অ্যাডমিরাল ওয়াটসন পাশে না দাঁড়ালে অত সহজে দক্ষিণে জঙ্গ ফতে করতে পারত কোম্পানি? বাহাদুর হিসেবে নাম কিনতে পারতেন কর্নেল? এসব না হয় পুরোনো কথা। সম্প্রতি ওয়াটসনের প্রবল বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বজবজের কেল্লা দখলের লড়াইটা।

অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের ইচ্ছে ছিল রাতেই বজবজের কেল্লাটা দখল করে নেওয়া। এমনটা হলে বাংলার প্রথম দুর্গ জয়ের গৌরবের অধিকারী হতে পারতেন ওয়াটসন। কর্নেল ক্লাইভ ও তাঁর সৈন্যরা ছিল খুব ক্লান্ত। সক্রিয়ভাবে তারা রাতের অভিযানে অংশ নিতে পারত না। কিন্তু কিছুতেই ওয়াটসনের প্রস্তাবে রাজি হলেন না কর্নেল। বললেন, পরের দিন সকালে কেল্লা দখলের বিষয়টা নিয়ে ভাবা যাবে। তাঁর এই জেদই বহাল থাকল।

কিন্তু মাঝের থেকে কী হল? স্ট্রন ছোকরা মাঝরাতে অমন একটা দুঃসাহসী কাণ্ড ঘটিয়ে বসায় অপ্রত্যাশিত ভাবে দখল হয়ে গেল কেল্লাটা। একটা গোলাগুলিও ছুড়তে হল না। স্ট্রন বহাল ছিল কর্নেলের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাবাহিনীতে। কাজেই খুব বেশি করেই যেন কেল্লা দখলের কৃতিত্বটা চেপে বসল কর্নেল ক্লাইভের কাঁধে। এরই নাম ভাগ্য। নসিব। ভাগ্যদেবী আগলে রেখেছেন কর্নেলকে—এটা অ্যাডমিরাল ওয়াটসন যেন প্রতি মুহূর্তে অনুভব করছেন।

চুরুটের আগুন উত্তুরে হাওয়ায় নিভে গিয়েছে। আধপোড়া চুরুটটা বিরক্তির সঙ্গে জলে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ক্যাপ্টেন আয়ারকুট, ওয়েলার, স্পেক ও ল্যাথামকে তলব করলেন অ্যাডমিরাল ওয়াটসন। পরিকল্পনা তিনি মনে মনে ছকে ফেলেছেন। এবারে একতরফা ভাবে তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কেল্লাটা দখল করে নেবেন। কলকাতা পুনর্দখলের গৌরবটা কিছুতেই কর্নেল ক্লাইভকে অর্জন করতে দেবেন না তিনি।

আয়ারকুট, ওয়েলার, স্পেক ও ল্যাথাম এসে স্যালুট করতেই ফোর্ট উইলিয়ামের উপর কামান দাগার আদেশ দিলেন ওয়াটসন।

আয়ারকুট চিন্তিত মুখে বললেন, ‘কিন্তু ল্যান্ড ফোর্সসহ কর্নেল যে এখনও পৌঁছননি।’

‘আমরা কর্নেলের হেল্প ছাড়াই ফোর্ট উইলিয়াম দখল করতে পারব।’ গম্ভীর গলায় কেটে কেটে কথাগুলো বললেন ওয়াটসন।

কামান দাগতে শুরু করলেন আয়ারকুট, ওয়েলার, স্পেক ও ল্যাথাম।

ফের গোলার শব্দে কেঁপে উঠল কলকাতা। একের পর এক গোলা আছড়ে পড়তে লাগল ফোর্ট উইলিয়ামের উপর। দুয়েকটা গোলা উড়ে গিয়ে পড়ল কেল্লার ভিতরে। ফোর্ট উইলিয়ামের দিক থেকে সামান্য প্রতিরোধ এল। বারকয়েক গর্জন শোনা গেল কামানের। তারপর সব চুপচাপ। কোনও সাড়াশব্দ নেই। মানিকচাঁদের যে কয়েকজন সেপাই-লস্কর ফোর্ট উইলিয়ামের ভিতরে ছিল তারা কেল্লার ভিতরে এসে পড়া গোলার আকার দেখেই পুব দিকের ফটক খুলে পালিয়ে গেল।

গোলার আঘাতে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল গঙ্গার দিকে কেল্লার পাঁচিলের একাংশ। এই পথ দিয়ে খুব সহজেই কেল্লার ভিতরে ঢুকে পড়া যাবে। অবিলম্বে জাহাজ থেকে সুলুপ নামানোর হুকুম দিলেন ওয়াটসন। উৎসাহের চোটে তিনি নিজেও চড়ে বসলেন সুলুপে।

হইহই করে অ্যাডমিরাল ও তাঁর সৈন্যরা ঢুকে পড়ল ফোর্ট উইলিয়ামের ভিতরে। কেল্লা একেবারে শুনশান। ভিতরটা পুরোপুরি অক্ষত। পরিপাটি করে সাজানোগোছানো। অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের ধারণা ছিল, কলকাতা জয় করার পর নবাব সিরাজদ্দৌলা নিশ্চয়ই কেল্লার ভিতরটা তছনছ করে দিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু তা নয়। অবাক হলেন অ্যাডমিরাল ওয়াটসন। ইংরেজদের ফিরে আসার অপেক্ষায় ফোর্ট উইলিয়াম যেন সেজেগুঁজে প্রস্তুত হয়ে বসে রয়েছে। দুর্গের ভিতরে রয়েছে অনেকগুলো কামান আর যথেষ্ট পরিমাণে গোলাবারুদ ও খাবারদাবার।

কেল্লার খোলা চত্বরে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে মুখ ও দুহাত তুলে অ্যাডমিরাল ওয়াটসন চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘আই, অ্যাডমিরাল চার্লস ওয়াটসন কংক্যার্ড দিস ফোর্ট। রেসটোরড কোম্পানিস সেটলমেন্ট ইন ক্যালকাটা।’ বিজয়োল্লাসের এই হুঙ্কার ফোর্ট উইলিয়ামের ইটের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল।

কেল্লার ভিতরের সব ঘরগুলোয় হুড়কো এঁটে দিল ওয়াটসনের সেনারা। চাবির গোছা আয়ারকুটের হাতে তুলে দিয়ে অ্যাডমিরাল বললেন, ‘কেল্লাটা আমি দখল করেছি। আমার অনুমতি ছাড়া কাউকে যেন কেল্লার ভিতরে ঢুকতে দেওয়া না হয়।’

‘ইয়েস স্যার।’

সুলুপে চড়ে অ্যাডমিরাল ওয়াটসন গিয়ে উঠলেন সলিসবেরি জাহাজে। কেল্লার দায়িত্ব রইল ক্যাপটেন আয়ারকুটের হাতে।

ফোর্ট উইলিয়াম কেল্লার মাথায় ফের কোম্পানির নিশান উড়তে দেখে টাইগার জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে থাকা হলওয়েল ও রজার ড্রেক বুঝলেন কেল্লা পুনর্দখল হয়ে গিয়েছে। তার মানে কলকাতা আবার ইংরেজদের হাতে।

আনন্দে হলওয়েল ও ড্রেক দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরলেন। ফলতার নির্বাসন ছেড়ে ফের কলকাতায় পা রাখতে চলেছে ইংরেজরা। সব যন্ত্রণার অবসান। ছ’মাসের অভিশপ্ত জীবনের ইতি। ফের কলকাতা। বড় সাধের কলকাতা। গঙ্গার তীরে ঠিক যেন একখণ্ড লন্ডন। আনন্দে চোখে জল এসে গেল হলওয়েল ও ড্রেকের। আর তর সইল না দুজনের। ছিপ নৌকোয় চেপে দুজনে পাড়ে এসে উঠলেন। এই তো সেই পাথরে বাঁধানো পথ, কেল্লার গা ঘেঁষে চলে গিয়েছে।

এখনও নবাবের কলকাতা আক্রমণের ক্ষত দগদগ করছে। কেল্লার আশেপাশের আগুনে পোড়া ঘরবাড়িগুলো প্রেতপুরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। পোড়ো দেওয়ালের গায়ে হাঁ করে রয়েছে খোলা জানালা-দরজাগুলো। কোনওটারই পাল্লা নেই। সেসব উপড়ে নিয়ে খানা পাকানোর উনুন ধরিয়েছিল নবাবের সেপাই-লস্করের দল।

হাঁটতে হাঁটতে লালদিঘির কাছে এসে পড়েন দুজনে। কেল্লায় প্রবেশের সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।

‘হল্ট। হল্ট।’

কেল্লায় ঢুকতে গিয়ে বাধা পেলেন হলওয়েল ও ড্রেক। বেয়নেট উঁচিয়ে ধরেছে একজন সেপাই। এ তো নবাবের সেপাই নয়। উর্দিধারী গোরা পল্টন। হতভম্ব হয়ে গেলেন হলওয়েল ও ড্রেক। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাওয়া ভাবটা কাটিয়ে ড্রেক গর্জন করে বললেন, ‘আই অ্যাম রজার ড্রেক।’

সেপাই বিনীত ভাবে বলল, ‘কেল্লার ভিতরে যাওয়ার অর্ডার নেই।’

চোখ পাকিয়ে ড্রেক বললেন, ‘অর্ডার নেই মানে? আই অ্যাম রজার ড্রেক। গভর্নর অফ ফোর্ট উইলিয়াম।’

‘কেল্লার গভর্নর এখন ক্যাপ্টেন আয়ারকুট।’

রাগে ফেটে পড়লেন ড্রেক। ‘হোয়াট ননসেন্স আর ইউ টকিং?’

‘অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের অর্ডার। কেল্লার গভর্নর ক্যাপ্টেন আয়ারকুট।’

‘ডাকো তোমার ক্যাপ্টেনকে।’

‘তিনি এখন বিশ্রাম নিচ্ছেন।’

জনৈক সেপাইয়ের সঙ্গে রজার ড্রেককে তর্কাতর্কি করতে দেখে বন্দুক হাতে ছুটে এল আরও কয়েকজন। তাদের মারমুখী মূর্তি দেখে পিছু হটলেন ড্রেক ও হলওয়েল। লালদিঘির পাড়ে একটা গাছের ছাওয়ায় এসে বসলেন দুজনে।

হলওয়েল স্তম্ভিত। একেবারে বাক্যহারা হয়ে গিয়েছেন। রজার ড্রেক সমানে আস্ফালন করে যাচ্ছেন। দুজনের কেউই হজম করতে পারছেন না এই অপমানটা- কলকাতা পুনরুদ্ধার হয়েছে, ফোর্ট উইলিয়াম এখন ইংরেজদের হাতে, আর সেখানে ঢুকতে গিয়ে সামান্য কয়েকজন সেপাইয়ের কাছে বাধা পেয়ে কিনা ফিরে আসতে হল তাঁদের?

হঠাৎ দূর থেকে ভেসে এল ব্যান্ডের শব্দ। মুখ ঘুরিয়ে সেদিকে তাকালেন হলওয়েল ও ড্রেক। দূরে দেখা যাচ্ছে ধুলোর ঝড়। কানে ভেসে আসছে আর্মির ব্যান্ডে বাজান রুল ব্রিটানিয়ার সুর। খুব দ্রুত গতিতে মার্চ করে ফোর্ট উইলিয়ামের দিকে এগিয়ে আসছে কর্নেল ক্লাইভের ফৌজ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *