1 of 2

ফলতা থেকে পলাশি – ৫

৫

ওয়ারেন হেস্টিংস বললেন, ‘মুনশি দেখো কী অপূর্ব দৃশ্য।’

আজ পূর্ণিমা। ভরা শ্রাবণের রাতেও আকাশ বেশ পরিষ্কার। চাঁদের রুপোলি আলোয় ভেসে যাচ্ছে চরাচর।

চাঁদের দিকে চেয়ে হেস্টিংস কাব্যিক ঢঙে বলে উঠলেন, হার সিলভার লকস ডিসপ্লে দ্য মুন।

নবকৃষ্ণ জানেন, এই ছোকরা ফ্যাক্টর সাহেবকে মাঝে মাঝে কাব্যে ভর করে। তখন সাহেবের মনটা বড্ড দরাজ হয়ে যায়। ইংরেজি কাব্য আওড়াতে থাকেন। সাহেবের মাথাটা খুব পরিষ্কার। এদেশে এসে ফারসিটা অল্প দিনে দিব্যি রপ্ত করে ফেলেছেন।

‘দেখছ মুনশি জলে কেমন রুপোলি রং ধরেছে। আহা এ সব দৃশ্য চোখে দেখার জন্যই বেঁচে থাকাটা সার্থক।’

নবকৃষ্ণ ঘোর বাস্তববাদী লোক। নদীর জলে, চাঁদের আলোর ঝিকিমিকি তিনি ঢের দেখেছেন। এসব তার মনকে তেমন পুলকিত করে না। এ দৃশ্য দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ার অবকাশও তার এখন নেই। বরানগরের কাছে জাহাজ নোঙর করেছে। লেঠেল, পাইকের সঙ্গে তিনি নিজেও সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন চারিদিকে। নবাবের গুপ্তচরের অভাব নেই। একে ইংরেজদের জন্য খাবার বোঝাই জাহাজ নিয়ে চলেছেন ফলতায়। তার উপরে কাশিমবাজার কুঠি থেকে পলাতক ওয়ারেন হেস্টিংস রয়েছেন জাহাজে। কখন কোন বিপদ এসে হাজির হয় কে জানে?

এদিকে সাহেবের কথায় ধুয়ো না ধরলে সাহেব অসন্তুষ্ট হতে পারেন। নবকৃষ্ণ বললেন, ‘চমৎকার দৃশ্য সাহেব। চাঁদনি রাতে নৌবিহারের মজাই আলাদা।’

‘তোমাদের দেশটা সত্যি বড় সুন্দর।’

‘যা বলেছেন সাহেব।’

খুব আবেগজড়িত গলায় ওয়ারেন হেস্টিংস বললেন, ‘আই অ্যাম রিয়েলি গ্রেটফুল টু ইউ অ্যান্ড কান্ত।’

‘একথা বলছেন কেন?’

‘তোমরা না থাকলে আমার কী হতো?’

নবকৃষ্ণ হেসে বলেন, ‘আমরা তো নিমিত্তমাত্র। সবই গোবিন্দের ইচ্ছে।’

হেস্টিংস অবাক হয়ে বলেন, ‘হু ইজ গোবিন্দ?’

‘হিন্দুদের অলমাইটি গড।’

হেস্টিংস হেসে বলেন, ‘দেন তুমি আর কান্তই হলে আমার গোবিন্দ।’

সাহেবের এই রসিকতায় নবকৃষ্ণও হেসে উঠে বলেন, ‘এভাবে বলছেন কেন? আপনি আমাদের দেশের অতিথি। অতিথি হল নারায়ণ। অলমাইটি গড।’

‘এই যে বললে গোবিন্দ?’

‘গোবিন্দের আরেক নাম নারায়ণ।’

‘বাপরে কত নাম তোমাদের গডের। ধাঁধা লেগে যায়।’

হাঁটতে হাঁটতে কিছুটা এগিয়ে এসে ডেকের রেলিং ধরে জলের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন হেস্টিংস। নবকৃষ্ণ এসে তাঁর পাশে দাঁড়ান। হেস্টিংস বলেন, ‘যদি ভবিষ্যতে কোম্পানির উঁচু পদে উঠতে পারি মুনশি, তোমাদের আমি মনে রাখব।’

নবকৃষ্ণ মনে মনে বললেন, লোক চিনতে নবকৃষ্ণর ভুল হয় না সাহেব। তোমাকে যতটুকু আমি চিনেছি, তাতে বুঝেছি তুমি একটি রত্ন। কাজের প্রতি তোমার যে নিষ্ঠা আমি লক্ষ করেছি, তাতে বাংলার ম্যালেরিয়াটা সামলে নিতে পারলে তুমি যে অনেক উপরে উঠবে তাতে আমার কোনও সন্দেহ নেই। এই যে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে, তোমাদের আহারের রসদ নিয়ে, তোমাকে নিয়ে ফলতায় চলেছি, সে কি এমনি? হিসেব না কষে নবকৃষ্ণ কোনও কাজ করে না। এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হল ভবিষ্যতের গর্ভে বিনিয়োগ। তবে দেখো সাহেব, তেমন দিন এলে কৃষ্ণকান্তর দিকে আবার বেশি ঝুঁকে পড়ো না যেন।

নবকৃষ্ণ মুখে বললেন, ‘আপনার নসিব ফিরলে আমাদের কথা কি আপনার মনে থাকবে?’

এ কথায় ওয়ারেন হেস্টিংস আহত হয়ে বলেন, ‘বলছ কী মুনশি? ভুলে যাব তোমাদের! তুমি আর কান্ত না থাকলে আমি বাঁচতাম কিনা সন্দেহ।’

‘বালাই ষাট। বনমালী আপনাকে রক্ষা করেছেন। আপনাকে মারে কে?’

ভুরু কুঁচকে ওয়ারেন হেস্টিংস প্রশ্ন করেন, ‘বনমালী? হু ইজ হি?’

‘আমাদের অলমাইটি গডের আরও একটা নাম।’

ওয়ারেন হেস্টিংস এবার সশব্দে হেসে ফেলেন।

হঠাৎ পাড়ের দিকে চোখ পড়তে নবকৃষ্ণর চোখ স্থির হয়ে যায়। পাড়ের কাছে জ্বলছে কয়েকটা মশাল। নিঝুম রাতে জাহাজের গায়ে এসে ধাক্কা খাওয়া জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দকে ছাপিয়ে কানে আসছে ছিপনৌকোর দাঁড়টানার আওয়াজ।

আলোর উৎসগুলো এগিয়ে আসছে জাহাজের দিকে। ওয়ারেন হেস্টিংস চাপা গলায় বললেন, ‘বোম্বেটে।’

‘মনে হচ্ছে তা নয় সাহেব।’ চিন্তিত গলায় উত্তর দিলেন নবকৃষ্ণ।’

ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে এল নীলকণ্ঠ। ‘মুনশিজি, কোতোয়ালির নৌকো।’

‘নবকৃষ্ণ বললেন, বাধা দেওয়ার চেষ্টা করো না কণ্ঠ। কোনও লাভ হবে না। ওদের জাহাজে আসতে দাও। আপনি দ্রুত নিজের ঘরে চলে যান সাহেব। দোর বন্ধ করে দিন। এদিকটা আমি দেখছি।’

খানিকবাদেই জাহাজের খুব কাছেই এসে হাজির হল চারটে নৌকো। নদীতে রাতচৌকি দিচ্ছিল এরা। এদের হাঁকডাকে শান্ত নীরব রাত মুখর হয়ে উঠল। দড়ির মই নামিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন নবকৃষ্ণ। বেশ কয়েকজন সশস্ত্র লোক উঠে এল জাহাজে।

এদের মধ্যে তোজাউদ্দিনকে দেখে চমকে উঠলেন নবকৃষ্ণ। বুঝলেন সেই এদের পান্ডা। একসময় তোজাউদ্দিন ছিল ইংরেজদের মুনশি। একেই বরখাস্ত করে নবকৃষ্ণকে মুনশির কাজে বহাল করেছিলেন রজার ড্রেক। নবকৃষ্ণ শুনেছিলেন কাজ হারিয়ে তোজাউদ্দিন কোতয়ালের কাছারিতে চাকরি নিয়েছে। কথাটা তাহলে সত্যি।

জাহাজে নবকৃষ্ণকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠে তোজাউদ্দিন প্রশ্ন করে, ‘এ কী? নব মুনশি তুমি? তুমি এখানে কেন? জাহাজের কারবার শুরু করেছ নাকি?’

নিস্পৃহ গলায় নবকৃষ্ণ বললেন, ‘চাকরি গেলে কী করব বলো? কিছু তো একটা করতে হবে। হঠাৎ কাজ হারানো আদমির তকলিফ যে কতটা তা তো তুমি ভালোই জানো।’

‘জাহাজ নিয়ে চললে কোথায়?’

‘আগে বল এত রাতে খানাতল্লাশির নামে এই উৎপাত কেন?’

‘সাহস তো তোমার কম নয়? উৎপাত বলছ? এটা নবাবের হুকুম।’

‘তা ওলন্দাজদের ব্যবসার উপরেও কি নিষেধ জারি হয়েছে?’

এই প্রশ্নে একটু ঘাবড়ে গিয়ে তোজাউদ্দিন বলে, ‘ওলন্দাজদের জাহাজ? মতলব?’

নবকৃষ্ণ বলেন, ‘রাতের অন্ধকারে বোধহয় ডাচ নিশানটা চোখ এড়িয়ে গিয়েছে তোমাদের।’

‘জাহাজে ডাচ নিশান আছে বুঝি?’

‘তোমার লোকেদের বলো ভালো করে দেখে নিতে।’

‘ইংরেজদের ছেড়ে তুমি কি এখন ওলন্দাজদের সঙ্গে কারবার করছ?’

হেসে উঠে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘ইংরেজদের আমি ছাড়লাম কোথায়? নবাবের গুঁতো খেয়ে ওরাই তো কলকাতা ছেড়ে পালিয়েছে। নোকরি খুইয়ে কী করি বলো? তোমার মতো নসিব তো আর সবার হয় না, ছিলে ইংরেজদের মুনশি, সে কাজ গেল তো জুটিয়ে নিলে কোতোয়ালির নোকরি। বাহাদুর আদমি তুমি, একধাপ উপরে উঠে গেলে। আর আমি? বাঁধা কাজ হারিয়ে এখন ওলন্দাজদের ফাইফরমাস খাটছি।’

‘জাহাজ নিয়ে চলেছ কোথায়?’ তোজাউদ্দিনের গলায় সন্দেহের সুর।

কথোপকথনে বাধা পড়ে। একজন বরকন্দাজ এসে তোজাউদ্দিনকে জানায়, ‘জাহাজে বহুত খাবারদাবার মজুত আছে হুজুর। লেকিন আদমি জেয়াদা নেই।’

তোজাউদ্দিন প্রশ্ন করে, ‘জাহাজ কোথায় যাবে মুনশি?’

শান্ত গলায় নবকৃষ্ণ জবাব দেন, ‘বালেশ্বর।’

বরকন্দাজ চমকে উঠে বলে, ‘অ্যাই বাপ! ইসি লিয়ে ইতনা চাউল, গেঁহু? খুদ আপকি আখোসে দেখ লি জিয়ে হুজুর।’

ধন্দে পড়ে জাহাজের খোলের ভিতর ঢুকে পড়ে তোজাউদ্দিন। সঞ্চিত খাবারদাবারের বহর দেখে তার পিলে চমকে যায়। কড়া গলায় সে প্রশ্ন করে, ‘এত গোলদারি মাল, চিড়িয়া-মুরগি এসব নিয়ে কোথায় চলেছ মুনশি?’

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘বললাম তো বালেশ্বর। ওলন্দাজদের দুখানা জাহাজ বালেশ্বরের কাছে বিকল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাসখানেক হয়ে গেল। সারানোর উদ্যোগ চলছে। ওদিকে জাহাজিদের রসদও প্রায় খতম। সেই উদ্দেশেই যাত্রা।’

নবকৃষ্ণর এই যুক্তিতে ঠিক যেন প্রত্যয় হয় না তোজাউদ্দিনের। প্রশ্ন করে, ‘জাহাজ ফলতায় যাচ্ছে না তো?’

হো হো করে হেসে ওঠেন নবকৃষ্ণ।

‘হাসছ যে?’

নবকৃষ্ণ বলেন, ‘আমি ছাপোষা কায়েত। তবে বেওকুফ নই। নবাবের হুকুমত কী, সে আমি কি জানি না? ও কাজ করতে গিয়ে কি বেঘোরে মরব? তাছাড়া ফলতায় খাবার পাঠিয়েই বা কী হবে? খাবে কে? এতদিনে লালমুখো ইংরেজ সাহেবগুলো হয় বাঘের পেটে গেছে না হলে ওলাওঠায় মরেছে।’

ওয়ারেন হেস্টিংসের কেবিনের বন্ধ দরজার সামনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে তোজাউদ্দিন। দরজা ঠেলতে গিয়ে দেখে ভিতর থেকে দরজা বন্ধ।

‘ঘরে কে আছে?’

তোজাউদ্দিনের প্রশ্নের জবাবে লাজুক মুখে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘পরিবার। বালেশ্বর অবধি যখন যাচ্ছি, তখন আর একটু এগিয়ে জগন্নাথধামটা একবার ঘুরে আসব। গৃহিণীর অনেক দিনের ইচ্ছে।’

‘বেশ। নবাবের হুকুমতের কথাটা খেয়াল থাকে যেন, ভুলেও যেন ফলতায় জাহাজ থামিও না।’

নবকৃষ্ণ হেসে বলেন, ‘মনে থাকবে এই হুঁশিয়ারি। এক কাজ করো না ভাই তোজাউদ্দিন, একটা পরোয়ানা লিখে দাও না যে, এ জাহাজ তুমি ভালো করে খানাতল্লাশি করে দেখেছ। ডাচ জাহাজ ব্যবসার কাজে বালেশ্বরে যাচ্ছে। তোমার দস্তখত করা পরোয়ানা দেখালে হয়তো সুতানুটি, থানা বা বজবজের চৌকির তল্লাশি থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।’

মেহেন্দি রাঙানো দাড়িতে হাত বুলিয়ে তোজাউদ্দিন বলে, ‘লেকিন আমার ইনাম?’

তবিল থেকে কয়েকটা আশরফি বের করলেন নবকৃষ্ণ, মশালের আলোয় ঝকমক করে ওঠা আশরফিগুলো দেখে তোজাউদ্দিনের চোখ চকচক করে উঠল। নকু ধরের দাওয়াই, কাঞ্চন বটিকা সত্যিই বিষহরি।

ফলতায় পা দিয়েই মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করলেন মেজর কিলপ্যাট্রিক। গঙ্গাপাড়ের অস্থায়ী গোরস্থানে জন গ্রান্টকে সমাহিত করা হল। আরো একটা মৃত্যুর সাক্ষী হয়ে রইল বাদাবনে নির্বাসিত অসহায় ইংরেজরা।

দূর থেকে কিলপ্যাট্রিকের জাহাজ দেখে সকলের মনে যে আশার সঞ্চার হয়েছিল তা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। এই অসহনীয় অবস্থা থেকে উদ্ধার পাওয়ার আশু কোনও সম্ভাবনা নেই।

মেজর কিলপ্যাট্রিক মাত্র দুশো চল্লিশজন সৈন্য সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। সঙ্গে গোলা, বারুদ, কামান কিছুই নেই। এই শক্তি নিয়ে বজবজের কেল্লাই দখল করা যাবে না, কলকাতা পুনর্দখল তো অলীক ভাবনা।

গতকাল সন্ধের মুখে এসে পৌঁছনোয় নিজের জাহাজ থেকে আর নামেননি কিলপ্যাট্রিক। জলযাত্রার ক্লান্তিতে নিজের কেবিনে ঢুকে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। শুধু কালেটের সঙ্গে তার মামুলি দুয়েকটা কথা হয়েছিল। কালেটের মুখেই প্রথম শুনলেন কলকাতা ইংরেজদের হাতছাড়া হয়েছে। আসলে কিলপ্যাট্রিক যখন মাদ্রাজ থেকে রওনা দেন তখনও কলকাতার খবর মাদ্রাজে পৌঁছয়নি।

পরের দিন সকালে গ্রান্টকে সমাহিত করার পর ফলতার অস্থায়ী শিবির পর্যবেক্ষণ করে কিলপ্যাট্রিকের চোখ কপালে উঠে গেল। কলকাতা হাতছাড়া হওয়ার পরিণাম যে কী ভয়ানক, তা বুঝতে পারলেন তিনি। এই অস্বাস্থ্যকর স্থানে বসবাস মানে তো যমের দুয়ারে এক পা বাড়িয়ে বসে থাকা। তিনি রজার ড্রেককে ডেকে বললেন, ‘আজই জরুরি মিটিং ডাকুন।’

ফোর্ট উইলিয়ামেরই একটা কেবিনে গোল টেবিল বসিয়ে ঘরটাকে মিটিংরুমে পরিণত করা হয়েছে। এই ঘরেই দুপুরের পরে মিটিং বসল।

রজার ড্রেককে উদ্দেশ্য করে কিলপ্যাট্রিক বললেন, ‘দুটো চিঠি আপনারা মাদ্রাজে পাঠিয়েছিলেন। তাতে বলা ছিল, কাশিমবাজার হাতছাড়া হয়েছে।’

‘ও চিঠি আগেই পাঠানো হয়েছিল। কলকাতার খবর নিয়ে মাদ্রাজে গিয়েছেন ম্যানিংহাম ও লেফটেনান্ট লেবাম।’ বললেন ওয়াটস।

‘আমি যখন রওনা হই তখনও তাঁরা পৌঁছননি।’

কালেট বললেন, ‘আপনি রওনা হয়েছেন দিন পনেরো আগে। এতদিনে ম্যানিংহাম ও লেবামের পৌঁছে যাওয়ার কথা। কলকাতার খবর পেলে মাদ্রাজ কাউন্সিল নিশ্চয়ই আরও সৈন্য পাঠাবে।’

কিলপ্যাট্রিক বললেন, ‘সেটাই ভরসা। আপাতত আমার কিছু করার নেই।’

চুরুট ধরিয়ে ড্রেক বললেন, ‘সে তো বুঝতেই পারছি। বজবজ কেল্লাতেই নবাবের আড়াই হাজার সেনা আছে।

‘খুব বেশিদিন এখানে পড়ে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এই পরিবেশে আমার সৈন্যরা মারা পড়বে। আপনারা হয়তো জানেন না, দক্ষিণে ফরাসিদের সঙ্গে আমাদের বড় লড়াই বাধতে পারে। তাছাড়া মাসখানেকের মধ্যে যদি মাদ্রাজ থেকে কোনও খবর না আসে তাহলে ধরে নিতে হবে কলকাতার বিষয়ে মাদ্রাজ কাউন্সিলের কোনো আগ্রহ নেই। সেক্ষেত্রে আমাকে ফিরে যেতে হবে।’

কিলপ্যাট্রিকের কথা শুনে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন হলওয়েল, ওয়াটস ও কালেট।

নীরবে চুরুটের ধোঁয়া ছাড়তে লাগলেন রজার ড্রেক। খানিক পরে তিনি বললেন, ‘আপনার জাহাজে খাবারদাবারের রসদ কতটা বেঁচে আছে?’

‘উইন্ড ফেবারেবল থাকায় তাড়াতাড়ি চলে এসেছি। প্রভিশন বেশ কিছুটা রয়েছে। পরিমাণে ভালোই হবে।’

চেয়ারের গায়ে দেহ এলিয়ে দিয়ে রজার ড্রেক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘কলকাতা দখলের চেয়ে ওটাই এখন আমাদের কাছে অনেক ইমপরট্যান্ট।’

কিলপ্যাট্রিক অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘মানে?’

ড্রেক বললেন, ‘অ্যাকিউট ফুড ক্রাইসিস। নবাবের ভয়ে কেউ খাবার দিচ্ছে না আমাদের।’

‘বলছেন কী?’

ড্রেক বললেন, ইয়েস মেজর! এখানে বাজার বসানোর অনুমতি নেই। ডাচরা একবার হেল্প করেছিল, তাতে নবাব এমন ফিউরিয়াস হয়ে ওঠেন যে তারা আর প্রভিশন পাঠানোর সাহস পাচ্ছে না।’

কিলপ্যাট্রিক আঁতকে উঠে বললেন, ‘বলছেন কী মিস্টার ড্রেক! আমার আর্মি যে না খেয়ে মরবে।’

হলওয়েল বললেন, ‘এতটা ভয় পাওয়ার কিছু নেই। নিশ্চয়ই একটা সুরাহা হবে।’

‘কোন ভরসায় একথা বলছেন? আপনাদের সাহায্য করতে এসে তো ভালো ফ্যাসাদে পড়লাম।’ তীব্র বিরক্ত ও উত্তেজনায় চেয়ার থেকে উঠে ঘরের ভিতর পায়চারি করতে লাগলেন কিলপ্যাট্রিক।

‘কিছু দেশীয় বণিক আমাদের বন্ধু। তাদের কাছে সাহায্যের জন্য অনুরোধ করেছি।’

‘নবাবকে ইগনোর করে এরা সাহায্য করবে আপনাদের? নবাবের সঙ্গে রিলেশনটা এভাবে তলানিতে কী করে নিয়ে গেলেন আপনারা?’

বেশ জোর গলায় প্রায় কৈফিয়ৎ চাওয়ার ভঙ্গিতে প্রশ্নটা করেন কিলপ্যাট্রিক। রজার ড্রেকের চোয়াল শক্ত হল। শত হলেও তিনি এখনও কোম্পানির নির্দেশে কলকাতা কাউন্সিলের গভর্নর। মেজর কিলপ্যাট্রিক তার উপরওয়ালা নন, যে তাঁকে কারণ দর্শাতে হবে। তবু কিলপ্যাট্রিকের প্রশ্নটা তিনি নীরবে হজম করলেন।

কিছুক্ষণ অস্থিরভাবে ঘরের মধ্যে বিচরণ করে ফের চেয়ারে এসে বসে কিলপ্যাট্রিক বললেন, ‘দেখুন, ফুড ক্রাইসিস হলে আমার সৈন্যদের কিন্তু সামলে রাখা শক্ত হবে। আমার মনে হয় এখানে বসে থেকে সময় নষ্ট না করে আমার মাদ্রাজে ফিরে যাওয়া উচিত। কলকাতার পরিস্থিতি ভালো করে বুঝিয়ে বলতে হবে মাদ্রাজ কাউন্সিলকে।’

ক্রুটেনডন বললেন, ‘সেই কাজেই তো গেছেন ম্যানিংহাম।’

বুকের কাছে হাতদুটো ভাঁজ করে চেয়ারে সোজা হয়ে বসে রজার ড্রেক বললেন, ‘আপনি মাদ্রাজ কাউন্সিলের নির্দেশে এসেছেন। ফিরে যেতে চাইলে ফিরে যেতে পারেন। এ নিয়ে আমাদের কিছু বলার নেই। তবে প্রতিকূল হাওয়ায় এখন মাদ্রাজে ফিরতে আপনার অনেক সময় লেগে যাবে। কিন্তু ম্যানিংহামের মুখে কলকাতার কথা শুনে মাদ্রাজ কাউন্সিল যদি আরও সৈন্য পাঠায় তাহলে হয়তো মাঝপথ থেকে আপনাকে আবার ফিরতে হতে পারে। এই ধকলের কথাটা ভেবে দেখেছেন কি?’

হলওয়েল বললেন, ‘একটা কথা মনে রাখবেন মেজর, বাংলার ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে এদেশ কোম্পানি উইল বি রুইনড। আমার মনে হয় বাংলার ব্যবসার খাতিরে কড়া পদক্ষেপ মাদ্রাজ কাউন্সিলকে নিতেই হবে। আপনি কিছুদিন ওয়েট করুন।’

আলোচনায় ছেদ পড়ল। দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে লরেন্স জানাল, ‘স্যার! কলকাতার দিক থেকে একটা জাহাজ এসে নোঙর করছে। জাহাজে রয়েছে ডাচ ফ্ল্যাগ।’

মিটিংরুম থেকে দুদ্দাড় করে বেরিয়ে এলেন সবাই। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে তাঁরা দেখলেন, ইতিমধ্যেই জাহাজ থেকে ছিপ নৌকা নামানো হয়েছে। নৌকোর মাঝে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন এক সাহেব। তার পাশে একজন নেটিভ। নৌকো ফোর্ট উইলিয়ামের দিকে একটু এগোতেই চেঁচিয়ে উঠলেন ওয়াটস, ‘ওয়ারেন! লুক হি ইস ওয়ারেন!’

‘সঙ্গের লোকটা আমাদের মুনশি না?’ প্রশ্ন করলেন ড্রেক।

হলওয়েল বললেন, ‘ইয়েস। ইয়েস! মুনশি নবকিসেন।’

খানিকবাদে ফোর্ট উইলিয়াম জাহাজে উঠে এলেন ওয়ারেন হেস্টিংস ও নবকৃষ্ণ। হেস্টিংসকে জড়িয়ে ধরে ওয়াটস বললেন, ‘ওয়ারেন ইউ? হোয়াট আ সারপ্রাইজ!’

‘আই অ্যাম অ্যালাইভ মিস্টার ওয়াটস।’

‘সে তো দেখতেই পারছি। তোমার মতো কর্মীকে হারালে কোম্পানির অনেক ক্ষতি হয়ে যেত।’

‘আমি যে বেঁচে এখানে পৌঁছতে পেরেছি, সেটা পসিবল হয়েছে দু’জনের জন্য। কান্ত ও নবকিসেন।’

রজার ড্রেক প্রশ্ন করেন, ‘কী ব্যাপার হে মুনশি?’

নবকৃষ্ণ বলেন, ‘সে অনেক কথা সাহেব। এখন বলতে শুরু করলে মহাভারত হয়ে যাবে। নকু ধর মশায়ের কাছে শুনলাম আপনারা বড় আতান্তরে পড়েছেন। খাবারদাবার জুটছে না। তাই মেলা আহার্য বস্তু নিয়ে এসেছি। জাহাজের খোলে ঠাসা রয়েছে।’

ড্রেক আনন্দে প্রায় লাফিয়ে ওঠেন, ‘বলছ কী মুনশি?’

মাথা ঝুঁকিয়ে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘আমাকে সাবাশি দিয়ে লজ্জা দেবেন না। পাঠিয়েছেন ধর মশায়। আমি নিয়ে এলাম। চুঁচড়োয় হেস্টিংস সাহেবের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।’

প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে নবকৃষ্ণকে বুকের মধ্যে জাপটে ধরেন ড্রেক। ‘মুনশি ইউ আর ভেরি সুইট। ইউ আর গ্রেট।’

বিশাল বপু রজার ড্রেকের মুগুরের মতো হাতের বন্ধনে আবদ্ধ নবকৃষ্ণ হাঁসফাঁস করতে করতে বলেন, ‘করছেন কী সাহেব? ছাড়ুন আমাকে, মারা যাব যে।’

রজার ড্রেকের ছেলেমানুষি দেখে হেসে ওঠেন সবাই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *