1 of 2

ফলতা থেকে পলাশি – ২৩

২৩

ত্রিপলিয়া তোরণদ্বারের রোশনচৌকিতে সানাই বাজছে বিলাসখানি টোড়িতে। দিনের শুরুয়াতে সেই সুর খুশির ঝরনা হয়ে উঠেছে। গতকাল রাত থেকেই অবশ্য রংদার হয়ে উঠেছে চকবাজার। আতর-গুলাল-সিরাজির কারবারিদের নাস্তা-আহার-আয়েশের ফুরসত নেই। রইস আদমিদের কোঠি ঘুঙুরের বোল আর মুজরোর হাসি-হররায় মাতোয়ারা। হাভেলিগুলো সেজে উঠেছে আলোর মালায়। হাজার হাজার চিরাগবাতির আলোয় উজালা হবে রাত। আতশবাজির রওশনে হারিয়ে যাবে আসমানের তারা। মুর্শিদাবাদে এখন শুধুই উৎসব।

নানি বেগমের খায়েশে নিজামত কেল্লা থেকে বিলি করা হচ্ছে সরু চাল, মাংস ও ঘি দিয়ে তৈরি এক বিশেষ ধরনের খাবার। মাহেঙ্গা এই খাবারের শাহি নাম তোরা। মালসা বোঝাই তোরার আশায় ভোর থেকেই কেল্লার সামনে ভিড় জমিয়েছে বুভুক্ষু মিশকিনের দল। কোড়া হাঁকিয়ে তাদের সার বেঁধে দাঁড় করাচ্ছে বরকন্দাজেরা।

পূর্ণিয়ার লড়াই ফতে করে গতকাল মুর্শিদাবাদে ফিরে এসেছেন সিরাজদ্দৌলা। হাতির পিঠে চেপে নবাব যখন রাজধানীতে প্রবেশ করলেন, ঘন ঘন তোপ দেগে কুর্নিশ জানাল নিজামত কেল্লা। যারা পূর্ণিয়ার প্রান্তরে সিরাজের বরবাদি চেয়েছিল তারা ঢোঁক গিলে দেখল নবাব ফিরে এসেছেন জিন্দা। বসে আছেন গাদেলায়। মুখে মৃদু হাসির রেশ, খুশ তবিয়ত, সহি সলামত।

অনেকদিনের অদর্শন। প্রিয় নাতিকে দেখতে অলিন্দে ছুটে এলেন শরফ উন্নেসা। সোনার লতাপাতা আঁকা তনসুখ কাপড়ের পর্দার আড়াল থেকে নানি বেগম দেখলেন নবাবি কেতায় হাতির পিঠের গাদেলা থেকে সিরাজের নেমে আসা।

আনন্দে নানি বেগমের চোখের পাতা ভিজে উঠল। তাঁর মনে হল যে—মির্জাকে তিনি চিনতেন, এ সে নয়। হাতির পিঠ থেকে যে সুকুমারকান্তি যুবক নেমে এল, সে অন্য কেউ। সেই নাদান লেড়কা মির্জা নয়, আলিসান এক মরদ, কামিল-ই-ইনসান। যাঁর দেহের ভাষায় চুইয়ে পড়ছে তাগদবাজির জোশ। এই জোশ এসেছে একের পর এক কামেয়াবি থেকে। কাশিমবাজার-কলকাতা-পূর্ণিয়া।

আলিবর্দির উদ্দেশে শরফ উন্নেসা মনে মনে বলে উঠলেন, আসমান থেকে তুমি দেখ নবাব। প্রাণভরে দেখ। কে বলে তোমার নাতি নালায়েক, আনপঢ়? পরপর তিনটে কঠিন লড়াই হাসিল করেছে তোমার নাতি। সিরাজকে নিয়ে তোমার তো ভাবনার অন্ত ছিল না। আমি জানি, এন্তেকালের এক পল আগেও তুমি সিরাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেবেছ। আর পরেশান হয়ো না নবাব, ঘুমোও শান্তিতে। শ-সাল জিন্দা থাকবে তোমার সিরাজ। সহি সলামত থাকবে। তুমি এখন শান্তিতে ঘুমোও নবাব। ঘুমোও।

‘নানি বেগম!’

সুনহারি খোয়াবের তাল কেটে যায়। শরফ উন্নেসা ঘুরে তাকান।

পর্দার ঘেরাটোপে ঢাকা ডুলি এসে থেমেছে জেনানা মহলের অন্দরে। ডুলি থেকে নেমে বাঁধভাঙা ঢেউয়ের মতো ছুটে এসে নানি বেগমের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল লুৎফুন্নেসা। তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে খুশিতে কেঁদে উঠলেন নানি বেগম।

‘কাঁদছ নানি বেগম?’

চোখের জল মুছে শরফ উন্নেসা বলেন, ‘এ পানি খুশির বেটি।’

‘কী ভাবছিলে এখানে দাঁড়িয়ে?’

‘কী আবার? তোর কথা।’

‘উঁহু। ঝুট বাত। তুমি ভাবছিলে তোমার মির্জার কথা।’

স্নেহের সঙ্গে লুৎফার চিবুক নেড়ে দিয়ে শরফ উন্নেসা বলেন, ‘সব যেন কত বুঝিস তুই—’

‘বুঝি তো। সব বুঝি। মির্জাই তোমার সব। আমি তো তোমার কেউ নই।’ কপট অভিমানে ঠোঁট ফোলায় লুৎফা।

কপালে বিন্দিয়া। চোখে সুরমা। লুৎফার সুডৌল মুখখানা মুহূর্তে যেন বেহেস্ত হয়ে ওঠে নানি বেগমের কাছে। স্নেহের সুরে শরফ উন্নেসা বলেন, ‘তুই তো সব। আমার মির্জার খুশনসিব।’

‘মসনদ রিশতাদারি বোঝে না কেন নানি বেগম?’ লুৎফার মুখে হঠাৎ আঁধার নেমে আসে।

নিজের অজান্তেই কেঁপে ওঠেন শরফ উন্নেসা। ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে লুৎফা।

আর্দ্র কণ্ঠে শরফ উন্নেসা বলেন, ‘বেটি—’

লুৎফুন্নেসা বলে, ‘যেদিন শওকত ভাইয়া মাটি নিল তোমার মির্জা সেদিন সারারাত কেঁদেছে।’

শরফ উন্নেসার চোখের পাতা ভিজে ওঠে।

লুৎফা বলে, ‘তোমার মির্জা বারবার বলছিল, এ খবর মুর্শিদাবাদে পৌঁছলে নানি বেগমের বুক ফেটে যাবে। নানি বেগমের সামনে গিয়ে কী করে দাঁড়াব আমি? শওকত ভাইয়াকে বড় ভালোবাসত তোমার মির্জা। মসনদ কেন রিশতেদারি বোঝে না নানি বেগম?’

সবই নসিব বেটি। এ দুনিয়াদারের খায়েশ। ইনসানের কী হাত এতে। যে যাওয়ার সে গেছে। আমার মির্জা জিন্দা থাক। শ-সাল জিন্দা থাক। সহি সলামত থাক। তুই আগলে রাখিস তাঁকে। এই বলে লুৎফুন্নেসাকে বুকে টেনে নিয়ে তাঁর কপালে চুম্বন করেন শরফ উন্নেসা।

ওমরাহ, জমিদার, বেনিয়ানদের সুক্রিয়া জানিয়ে নিজামত কেল্লার অন্দরে প্রবেশ করেই বেগম উমাদাত উন্নেসার মহলে এলেন নবাব সিরাজদ্দৌলা।

উমাদাত উন্নেসা সিরাজের একমাত্র শাদি করা বেগম। ওমরাহ ইরাজ খাঁর কন্যা। দিল্লির সৈয়দ ভাইদের অন্যতম হোসেন আলি খাঁর দোস্ত ইরাজ খাঁ একসময় মোগল দরবারে উঁচু পদে আসীন ছিলেন। মুর্শিদকুলির দামাদ সুজাউদ্দিনের শাসনকালে তিনি বাংলায় আসেন। গিরিয়ার যুদ্ধে সরফরাজ খাঁর পক্ষে ছিলেন ইরাজ খাঁ। পরে নবাব আলিবর্দির সঙ্গে তাঁর সমঝোতা হয়। ইরাজ খাঁর অভিজাত বংশ মর্যাদার কথা ভেবে তাঁর মেয়ের সঙ্গে সিরাজের বিয়ে দিয়েছিলেন নবাব আলিবর্দি খাঁ।

সিরাজ তখন ফৈজির বিশ্বাসঘাতকতায় ক্ষতবিক্ষত, অবসাদগ্রস্ত। আলিবর্দি ভেবেছিলেন শাদিই হল এ রোগের একমাত্র ইলাজ। খুব ধুমধাম হয়েছিল সিরাজের বিয়েতে। চেহেল সেতুনে ভোজ চলেছিল এক মাসেরও উপর। অঢেল মণিমুক্তো ও খেলাত বিতরণ করেছিলেন আলিবর্দি খাঁ। কিন্তু এই শাদি সিরাজের পক্ষে সুখের হল না।

উমাদাত উন্নেসা শান্ত ধীর স্থির। সিরাজের চোখে, বড় নাজুক, নরমসরম এই আওরত। ঠিক যেন কলের পুতুলের মতো। লুৎফার মতো ভালোবাসায় নিজেকে উজাড় করতে জানে না। চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে না। আলিঙ্গনে, রতিক্রিয়ায় ধরা দেয় নিয়মমাফিক। কিন্তু সুখ দিতে পারে না। শিরায় শিরায় ইশকের তুফান তুলতে পারে না। যা পারে লুৎফা।

লুৎফুন্নেসার ভালোবাসায় বাহার এল সিরাজের জীবনে। মনে মনে খুশি হলেন আলিবর্দি। খুশি হলেন শরফ উন্নেসা। কিন্তু লুৎফার সঙ্গে বিয়ে হল না সিরাজের। লুৎফা জারিয়া। ছেলেবেলায় দাসবাজারে বিক্রি হয়ে নসিবের খেলায় কোন শিশুকালে ঠাঁই পেয়েছিল আলিবর্দির পরিবারে। আলিবর্দির খানদানেই লুৎফার বেড়ে ওঠা। কোন ঘরে, কোথায় তাঁর পয়দায়িস, কেউ জানে না। এমন মেয়ের সঙ্গে বাংলা-বিহার-ওড়িশার নবাব আলিবর্দির দৌহিত্রের শাদি হয় কী করে? কী বলবে সমাজ? চিরকালই তাই সিরাজের মাশুকা হয়ে রইল লুৎফা।

এ নিয়ে অবশ্য লুৎফার কোনও শিকায়ত নেই। সিরাজের বৈধ বেগম হওয়ার স্বীকৃতি সে দাবিও করে না। সে শুধু ভালোবাসে সিরাজকে। সে ভালোবাসায় খাদ নেই। সিরাজই তাঁর দুনিয়া। সে সিরাজের ছায়াসঙ্গী।

উমাদাত উন্নেসার মনে লুৎফার প্রতি কিন্তু কোনও বিদ্বেষ নেই। লুৎফাকে সে বোনের মতোই ভালোবাসে। উমাদাত উন্নেসা ভাবে, নাই বা সে পেল সিরাজের মহব্বত, তবুও খোদাতালার দয়ায় কম তো সে কিছু পায়নি জীবনে। সিরাজ তাঁকে দিয়েছেন উম্মেসায়েরার মতো একটি ফুল।

বছর দেড়েক বয়স উম্মেসায়েরার। টলমল করে হাঁটে। সদ্য হাঁটা শিখেছে। এখনও মুখে স্পষ্ট বুলি ফোটেনি মেয়ের। কয়েকটা দুধের দাঁত উঠেছে সবে। উম্মেসায়েরা যখন খিলখিল করে হেসে ওঠে উমাদাত উন্নেসার মনে হয়, গোটা দুনিয়া যেন ঝলমল করে উঠল।

তখনও উম্মেসায়েরা আসেনি পৃথিবীতে। লুৎফার সঙ্গে আশনাইয়ে মাতোয়ারা সিরাজ। উমাদাত উন্নেসার মহলে নবাব রাত কাটান কালেভদ্রে। একদিন উমাদাত উন্নেসা বুঝলেন তিনি গাভান হয়েছেন। ছোট্ট একটা জান বেড়ে উঠছে তার শরীরের ভিতরে। বেগম লাজুক মুখে নবাবকে জানালেন কথাটা। সিরাজ উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে শুধোলেন, ‘সচ?’

মন ভরে গেল উমাদাত উন্নেসার। পয়দায়িসের পর উম্মেসায়েরাকে দেখে আনন্দে পাগল হয়ে যাওয়ার অবস্থা সিরাজের। মসলিনের কাপড়ে মোড়া ছোট্ট একতাল মাংসপিণ্ড। খুদে খুদে দুটো চোখ। বুকটা ওঠানামা করছে। সিরাজ মুগ্ধ হয়ে মেয়ের মুখপানে চেয়ে রইলেন। খুশি উপচে পড়ল নবাবের চোখে।

এই ফুলের মতো শিশুকন্যার শরীরে বইছে তাঁর খুন! নবাব আলিবর্দির খানদানের রক্ত! খোদার রহেমে আমি এমন একটা ফুলের মতো মেয়ের আব্বাজান আমি! আমার চেয়ে খুশনসিব আর কে আছে এই দুনিয়ায়?

মসনদ-লালচ-সাজিস! খুন—পসিনা-পরেসানি। ফৌজ-হাতিয়ার-হামলা। নবাব হওয়ার পর থেকে তিষ্ঠোতে পারছিলেন না সিরাজ। একের পর এক লড়াই। কাশিমবাজার-কলকাতা—পূর্ণিয়া।

পূর্ণিয়ার লড়াই লড়তে গিয়ে গত প্রায় দেড় মাস তিনি মুর্শিদাবাদ ছাড়া। মেয়ের জন্য সিরাজের মনটা তাঁর অস্থির হয়ে পড়েছিল। নিজামত কেল্লায় পা দিয়েই নবাব তাই ছুটে এলেন বেগম মহলে। অনেক’দিন পর মেয়ের সঙ্গে তাঁর মোলাকাত। ফুলের মতো ছোট্ট মেয়েটাকে দুচোখ ভরে দেখতে চান তিনি।

উমাদাত উন্নেসা তসলিম জানালেন নবাবকে।

বাপকে দেখেই চঞ্চল হয়ে উঠল বাঁদির কোলে থাকা উম্মেসায়েরা। হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চাইল বাবাকে। মাটিতে নামিয়ে দিতেই টলমল পায়ে মেয়ে ছুটে এল মেয়ে। পরম তৃপ্তিতে উম্মেসায়েরাকে কোলে তুলে নিলেন সিরাজ। চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিলেন তুলোর মতো নরম লালচে গালদুটো। কচি কচি হাতদুখানা দিয়ে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে আধ ফোটা বুলিতে মেয়ে বলে উঠল, ‘আ-ব-বা।’

খুশিতে জল এল নবাবের চোখে। তাঁর মনে হল দুনিয়া বহুত রংদার। এত রঙ আগে দেখিনি কখনও। কে এই শিশুটি? তাঁর ঔরসজাত সন্তান? নাকি বেহেস্তের কোনও ফেরেস্তা?

সিরাজের পূর্ণিয়া জয়ের পর অনেক ওমরাহ, বেনিয়ান, জমিদারের দেহের ভাষা বদলে গেল। যারা কয়েক’দিন আগেও সিরাজের বরবাদি কামনা করত, তাদের অনেকে নবাবের একান্ত অনুগত হয়ে ওঠার চেষ্টায় মেতে উঠল।

দুশমনদের একে একে চিহ্নিত করে নিজামতের নোকরি থেকে বরখাস্ত করতে লাগলেন সিরাজদ্দৌলা। দরবার থেকে বিতাড়িত হলেন আলিবর্দির আমলের ওমরাহ, সেনাপতি ওমর খাঁ। এই ঘটনায় কেঁপে উঠল প্রবীণদের অনেকে। নিজামতের নোকরি গেলে আরাম, আয়েশ সব যাবে।

মিরজাফর, রায়দুর্লভ, জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ ও তার ভাই মহারাজ স্বরূপচাঁদ গভীর সঙ্কটে পড়লেন। সিরাজদ্দৌলাকে যে পছন্দ নয়, সে কথা বড় উৎকট ভাবে প্রকাশ করে ফেলেছেন এঁরা। এসব কথা চকবাজারের আম আদমিও জানে। নবাবের হুকুমে দরবারে রোজ হাজিরা দিতে হয় ঠিকই কিন্তু এদের কাছে এই হাজিরাকে দোজখ যাতনার সমান করে তুললেন সিরাজ। হররোজ সকলের সামনে নবাব এদের বেইজ্জত করেন। মজার মজার নামকরণ করেন। নবাবের পেয়ারের দোস্তরা হাসিতে ফেটে পড়ে।

গিরিয়ার পুনরাবৃত্তি ঘটল না পূর্ণিয়ার প্রান্তরে। তাই জগৎশেঠ, মিরজাফর, রায়দুর্লভের এই বদনসিবি। এ নিয়ে তাদের আফশোসের শেষ নেই। ১৭৩৯ সালে গিরিয়ার প্রান্তরে অপছন্দের নবাব মুর্শিদকুলির দৌহিত্র সরফরাজ খাঁর মৃত্যু হয়েছিল আলিবর্দির হাতে। বাংলার মসনদে বসেছিলেন আলিবর্দি খাঁ।

সেবার আলিবর্দি ছিলেন মুর্শিদাবাদের ষড়যন্ত্রী ওমরাহ-বেনিয়ান-মুৎসুদ্দিদের ঘোড়া। সেবারে সেই পরিকল্পনা রূপায়িত হয়েছিল নিখুঁত ভাবে। এবারে হল না। গিরিয়ার ধাঁচের সাজিশি বেবাক বরবাদ হয়ে গেল। এ জন্য দায়ী শওকত জঙ্গ। মগজদার ইনসান হলে আজ সে হতো তামাম বাংলার নবাব। সেভাবেই ঘুঁটি সাজিয়েছিলেন মিরজাফর-রায়দুর্লভ-জগৎশেঠ। শওকত জঙ্গের বেওকুফিতে সব বানচাল হয়ে গেল।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরজাফর বললেন, ‘কিছু একটা উপায় বাতলান শেঠজি। হররোজ এই বেইজ্জতি আর বরদাস্ত হয় না। দরবারে গিয়ে সেদিন শুনতে হল আমি নাকি বুড়া খচ্চর।’

রায়দুর্লভ বললেন, ‘আর আমার কথাটা ভাবুন? নবাবের জবানে আমি হলাম বুড়ো বলদ। আমার ঘর ভর্তি বিবি। হালে আঠেরো বছরের এক ইরানি খুবসুরতিকে না হয় রংমহলে তুলেছি। নবাব সবার সামনে এ নিয়ে মশকরা করে আমায় বললেন, খোজা করে দেবেন। এসব সহ্য করি কী করে? আপনিই ভরসা শেঠজি। টাকা আপনার হাতে। নবাবের রাশ টেনে ধরুন।’

ইস্পাহানি শতরঞ্জিতে বসে ঝালরদার তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ বললেন, ‘নবাবকে বাগে আনা এখন খুব কঠিন—দিনকাল বদলে গেছে।’

কপাল চাপড়ে মিরজাফর বলেন, ‘তাহলে তো খুদখুশি করতে হয়।’

মহারাজ স্বরূপচাঁদ বলে ওঠেন, ‘বাগী হওয়ার সাহস আছে আপনাদের?’

একথা শুনে রায়দুর্লভ কেঁপে উঠে বললেন, ‘সামলে রাজাজি। এ কথা মুখে আনলে গর্দান যাবে।’

‘তাহলে চুপ করে বসে থাকুন।’

রায়দুর্লভ প্রবল ঘৃণার সঙ্গে বললেন, ‘এরই নাম নসিব! ওই ইবলিশের বাচ্চা মোহনলালকে রোজ সেলাম ঠুকতে হবে।’

মিরজাফর বললেন, ‘আমার চুলদাড়ি সফেদ হয়ে গেল, আমি এখনও নবাবি রিয়াসতে তিন হাজারি মনসবদার। আর মোহনলাল? কাশ্মীরের আজনবি এক ছোকরা, মামুলি খানদান। সে হয়ে গেল সুবা বাংলার দেওয়ান। পাঁচ হাজারি মনসবদার! এই নৌটঙ্কি বরদাস্ত হয় না।’

রায়দুর্লভ বলেন, ‘আমি নিজামতের দেওয়ান। মোহনলাল কথায় কথায় আমাকে তলব করে। হিসেব চায়। বেইজ্জত করে। বর্গি দমনে কত মদত দিয়েছি আমরা নবাব আলিবর্দিকে। এই তার তোফা? ‘

স্বরূপচাঁদ বলেন, ‘শুধু কি আপনাদের পরেশানি হচ্ছে? তামাম বাংলার আম-আতরফ আদমি জানে নবাবি চলে আমাদের কড়ির জোরে। অথচ আজকাল দরবারে আমাদের কোনও ইমান নেই। শেঠ খানদানকে বেদৌলত করতে চান নবাব। তামাম বাংলার খাজনা জমা পড়ে এই কোঠিতে। তা দিয়ে আমাদের কারবার চলে। টাকা বাড়ে। সময়মতো নবাবকে টাকা জোগাই আমরা। এ ব্যবস্থা করে গিয়েছেন আলিবর্দি খাঁ। এটা নবাবের না পসন্দ। তিনি সব কিছু নিতে চান নিজের হাতে। চান আমাদের বরবাদি।’

মিরজাফর প্রশ্ন করেন, ‘এর পরেও আপনারা চুপ করে থাকবেন রাজাজি?’

মহাতপচাঁদ বললেন, ‘তা করব কী? এ নিয়ে শোর মাচিয়ে জান খোয়াব নাকি? আপাতত নবাবের সঙ্গে সমঝোতা করে টিকে থাকতে হবে আমাদের।’

রায়দুর্লভ বললেন, ‘ক’দিন টিকে থাকবেন শেঠজি? নবাব আমাদের সবাইকে শেষ করবে।’

স্বরূপচাঁদ বলেন, ‘এখন সব কিছু বসে বসে দেখা ছাড়া উপায় কী আছে? নবাবকে হঠাতে গেলে বাহাদুর লোকজন চাই। আমরা আড়াল থেকে মদত দিতে পারি। কিন্তু সামনে থেকে লড়াই দেবে কে? কোথায় সেই বাহাদুর ইনসান?’

গভীর রাতে মহিমাপুরে জগৎশেঠের হাভেলির এক গোপন কক্ষে বসে আলোচনা হচ্ছিল এসব কথা। নবাবের গুপ্তচরদের ভয়ে দিনের আলোয় শেঠ ভাইয়েরা, রায়দুর্লভ ও মিরজাফরকে এড়িয়ে চলেন। কিন্তু মাঝেমধ্যেই গভীর রাতে পর্দা ঢাকা জেনানা-পালকি চেপে মহিমাপুরে শেঠদের কুঠিতে আসেন মিরজাফর ও রায়দুর্লভ। সিরাজের বিরুদ্ধে ফের ঘুঁটি সাজানোর পরিকল্পনায় তাঁরা মেতে ওঠেন। পথ হাতড়ে বেড়ান। কিন্তু প্রতিদিনই আলোচনা থমকে যায় ওই একটি বিষয়ে এসে—সিরাজদ্দৌলাকে মসনদ থেকে টেনে নামাতে গেলে একজন বাহাদুর লোক চাই। কোথায় সেই বাহাদুর? হাতড়ে বেড়ায় সকলে। কিন্তু খোঁজ মেলে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *