1 of 2

ফলতা থেকে পলাশি – ২৪

২৪

সপ্তদশ শতকের শেষের দিকে ভাগ্যের খোঁজে এক যুবক রাজস্থানের নাগর থেকে পাটনায় এসে হাজির হল। যুবকটির সম্বল বলতে সামান্য কিছু কড়ি, কাপড়ের পুঁটলিতে বাঁধা ছাতু ও লংকার আচার এবং দুচোখ ভরা স্বপ্ন। গঙ্গা, শোণ, গণ্ডক নদীর সংযোগস্থলে অবস্থিত পাটনা সে সময় হিন্দুস্থানের গুরুত্বপূর্ণ এক বাণিজ্য নগরী।

সারাদিন কাজের সন্ধানে বণিকদের গদিতে গদিতে ঢুঁ মেরে বেড়ায় ছেলেটি। যে কোনও একটা কাজের প্রত্যাশায় বণিকদের কাছে গিয়ে সে করজোড়ে কাকুতি-মিনতি করে। এই আনপঢ় ছোকরা কী কাজ করবে? কেউ রূঢ় ব্যবহার করে, কেউ মুখ ঘুরিয়ে নেয়, কেউ বা মিষ্টি কথায় বিদায় জানায়।

অনেক চেষ্টাতেও রোজগারের কোনও উপায় করতে না পেরে ছেলেটি অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। একদিন এলোমেলো ভাবে ঘুরতে ঘুরতে সে এসে পড়ে নগরের উপকণ্ঠে এক গহীন অরণ্যের মধ্যে। শ্বাপদসংকুল সেই অরণ্যের ভিতর শুঁড়ি পথ ধরে সে উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটতে থাকে। এদিকে দ্রুত ফুরিয়ে আসছে দিনের আলো। কালো হয়ে আসছে গাছের পাতার সবুজ রং। পাখির দল ঘরে ফিরছে। পুবাকাশে ধীরে ধীরে প্রকট হচ্ছে পূর্ণিমার চাঁদ। যুবকটির কোনও হুঁশ নেই। বনজঙ্গল ভেঙে সে হেঁটেই চলেছে।

সহসা তার কানে এল মানুষের আর্তনাদ। কেউ যেন তীব্র যন্ত্রণায় চিৎকার করছে। চমকে উঠল যুবকটি। এই অরণ্যের মধ্যে কে এমন কাতর আর্তনাদ করছে? শব্দ লক্ষ্য করে এগিয়ে গিয়ে সে আশ্চর্য হয়ে দেখল, জঙ্গলের মধ্যে এক বহু পুরোনো জীর্ণ কুঠি। সেই কুঠির ভিতর থেকে আসছে শব্দটা। কুঠির অন্দরে প্রবেশ করে যুবকটি শিউরে উঠল।

একটি কক্ষে শুয়ে আছেন এক বৃদ্ধ। তাঁর শিয়রে জ্বলতে থাকা রেড়ির তেলের প্রদীপটি নিভু নিভু। বৃদ্ধের সারা গায়ে দগদগ করছে বিষাক্ত ঘা। মুখ যন্ত্রণাক্লিষ্ট। থেকে থেকেই বৃদ্ধ রোগযন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠছেন।

যুবটির দিকে চোখ পড়তে বৃদ্ধ বলে উঠলেন, ‘কে তুমি? কেন এসেছ? এ মৃত্যুপুরী। চলে যাও। শিগগির চলে যাও। তুমি মরবে। দেখছ না আমার সারা শরীরে বিষ। অসহ্য বেদনা। তোমারও এই দশা হবে। আমার পরিবার, আমার আপনজনেরা সবাই আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আমি নিঃসঙ্গ- একা। মৃত্যুর প্রহর গুনে চলেছি।’ এই বলে কান্নায় ভেঙে পড়লেন বৃদ্ধ।

বৃদ্ধের কষ্ট দেখে যুবকটিরও চোখে জল এল। এগিয়ে গিয়ে বৃদ্ধের মাথায় হাত রেখে সে বলল, ‘আমার সেবা দিয়ে আপনাকে সারিয়ে তুলব আমি।’

কে এই যুবকটি? ঈশ্বরের দূত? আবেগে বিহ্বল হয়ে পড়লেন বৃদ্ধ। ঘোলাটে চোখে যুবকটির দিকে চেয়ে শুধোলেন, ‘তুমি কে বাবা?’

যুবকটি জবাবে বলল, ‘আমার নাম হীরানন্দ ওসওয়াল। নাগর প্রদেশ থেকে সম্প্রতি এসেছি পাটনায়।’

বৃদ্ধের সেবায় নিজেকে নিবেদিত করল হীরানন্দ। বিছানার পাশে বসে বৃদ্ধের যন্ত্রণা লাঘবের প্রাণপণ চেষ্টা করে চলল দিনরাত। নিজের কোনও পরিচয় হীরানন্দকে দিলেন না বৃদ্ধ। হীরানন্দও জানতে চাইল না।

কিছুদিন পর বৃদ্ধের অন্তিম সময় উপস্থিত হল। বন্ধ হল কথা। ঘরের এক কোণের দিকে অঙ্গুলি সঙ্কেত করে চোখ বুজলেন বৃদ্ধ। দাহকার্য সেরে সেই ঘরের কোণে মাটি খুঁড়ে স্তম্ভিত হয়ে গেল হীরানন্দ।

সাতঘড়া মোহর!

দরিদ্র যুবক হীরানন্দ রাতারাতি প্রভূত সম্পদের অধিকারী হয়ে গেল। পাটনায় গদি স্থাপন করে প্রাপ্ত অর্থ বিনিয়োগ করল ব্যবসায়। এবারে সদয় হলেন ভাগ্যলক্ষ্মী। অল্পদিনের মধ্যেই হীরানন্দ বিপুল ধনসম্পত্তির অধিকারী হয়ে উঠল। দেশজোড়া নাম হল তাঁর। বৃদ্ধ বয়সে হীরানন্দ তাঁর সাত সুপুত্রকে হিন্দুস্থানের বিভিন্ন বাণিজ্য নগরে গদিয়ানের কাজে নিযুক্ত করলেন। ঢাকার গদিতে বসলেন হীরানন্দের কনিষ্ঠ পুত্র মানিকচাঁদ।

১৭০৪ সালে সুবা বাংলার দেওয়ানখানা ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত করলেন দেওয়ান মুর্শিদকুলি খাঁ। সেই সময় মানিকচাঁদ ঢাকা ছেড়ে মুর্শিদাবাদে চলে এলেন। ভাগীরথীর পূর্ব তীরে মহিমাপুরে গড়ে তুললেন বিরাট বসতবাটি। মুর্শিদকুলির পরামর্শে ভাগীরথীর পরপারে, মহিমাপুরের কুঠির ঠিক উলটো দিকে স্থাপন করলেন টাঁকশাল। ঔরঙ্গজেব বাদশার মৃত্যুর পর দিল্লির দরবারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে বাংলার প্রথম স্বাধীন নবাব হয়ে মসনদে বসলেন মুর্শিদকুলি খাঁ। শেঠ মানিকচাঁদ হয়ে উঠলেন তাঁর অন্যতম প্রধান মন্ত্রণাদাতা।

মানিকচাঁদের সহোদরা ধনবাঈ। তার বিয়ে হয়েছিল বারাণসীর শেঠ উদয়চাঁদের সঙ্গে। ধনবাঈ ও উদয়চাঁদের পুত্র ফতেচাঁদ। শেষ বয়সে অপুত্রক মানিকচাঁদ ভাগনে ফতেচাঁদকে দত্তক নিলেন। শেঠ মানিকচাঁদের সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হলেন ফতেচাঁদ।

১৭২৪ সালে মোগল সম্রাট মুহম্মদ শাহ এক ফরমান জারি করে ফতেচাঁদকে ‘জগৎশেঠ’ উপাধিতে ভূষিত করলেন। সেই ফরমানে বাদশা লিখলেন, ফতেচাঁদের উত্তরপুরুষরাও ‘জগৎশেঠ’ নামে খ্যাত হবেন। জগৎশেঠ- জগতের শ্রেষ্ঠ মহাজন। জগৎশেঠ- নির্দিষ্ট কোনও ব্যক্তি নয়, উপাধি।

ফতেচাঁদই প্রথম জগৎশেঠ। মুর্শিদাবাদ দরবারের যে সমস্ত গণ্যমান্য ব্যক্তির ষড়যন্ত্রে মুর্শিদকুলির দৌহিত্র সরফরাজ খাঁকে মসনদচ্যুত হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ফতেচাঁদ ছিলেন অন্যতম। গিরিয়ার যুদ্ধে সরফরাজ খাঁকে হত্যা করে মসনদে বসলেন আলিবর্দি খাঁ। তাঁর পরম সুহৃদ জগৎশেঠ ফতেচাঁদ। তিনি দিল্লির দরবারে ঘুষ দিয়ে আলিবর্দির নামে নবাবির পরোয়ানা আনিয়ে দিয়েছিলেন।

ফতেচাঁদের জীবদ্দশাতেই তাঁর পুত্রদের মৃত্যু হওয়ায় তিনি তাঁর দুই পৌত্র মহাতপচাঁদ ও স্বরূপচাঁদকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যান। ১৭৪৮ সালে মোগল বাদশার কাছ থেকে ‘জগৎশেঠ’ উপাধি পান মহাতপচাঁদ, মহারাজ উপাধিতে ভূষিত হন স্বরূপচাঁদ।

মহাতপচাঁদ ও স্বরূপচাঁদ এই দুই ভাইকে বিশেষ স্নেহ করতেন নবাব আলিবর্দি খাঁ। নবাবের স্নেহের হাত মাথার উপর থাকায় পারিবারিক ব্যবসাকে উন্নতির উত্তুঙ্গ শিখরে নিয়ে গেলেন মহাতপচাঁদ ও স্বরূপচাঁদ। গোটা হিন্দুস্থান জুড়ে তাঁদের কারবার। আবর্তিত মূলধন দশ কোটি টাকা। শয়ে শয়ে লোকের অন্ন সংস্থান হয় জগৎশেঠের কারবার থেকে। নবাব-বাদশা থেকে ভিনদেশি বণিক, অর্থের প্রয়োজন হলেই সবাই হাত পাতে জগৎশেঠের কাছে।

বাংলার জমিদারদের বড় বলভরসা জগৎশেঠ। মহিমাপুরের কুঠির সঙ্গে জমিদারদের নিত্য যোগাযোগ। জগৎশেঠের কুঠিতে জমিদারেরা রাজস্ব জমা দেয়। আলিবর্দির সময় থেকে এই ব্যবস্থার সূচনা। জমিদারেরা সময়ে খাজনা দিতে না পারলে তাদের হয়ে নবাবের খাতায় তা জমা করে দেন জগৎশেঠ। পরে জমিদারেরা সুদে-আসলে দেনা শোধ করে। এতে জমিদারদের জমিদারি হাতছাড়া হয় না, রাজস্ব আদায়ে নিজামতেরও ঝক্কি থাকে না। নবাবের অর্থের প্রয়োজন হলে মোহরের থলে হাতে হাজির হন জগৎশেঠ— প্রথমে ফতেচাঁদ, পরে মহাতপচাঁদ।

মহিমাপুরে যে বসতবাটি স্থাপন করেছিলেন মানিকচাঁদ, সেই বসতবাটিকে তাঁর সুযোগ্য উত্তরপুরুষরা আরও অনেক বড় করে তুলেছিলেন। বাগান, গাছপালা, বড় বড় হাভেলি দিয়ে সাজানো বিরাট এক চৌহদ্দি। পরিখা খুঁড়ে সেই সুবিশাল বসতবাটিকে কার্যত দুর্গে পরিণত করলেন মহাতপচাঁদ। কুঠির উত্তর, দক্ষিণ, পূর্বে পরিখা, পশ্চিমে গঙ্গা। সব দিক থেকে সুরক্ষিত।

সিরাজদ্দৌলা নবাব মসনদে বসার পরপরই মহিমাপুর কুঠির উপর শঙ্কার মেঘ ঘনীভূত হল। নবাবের বিষনজরে পড়লেন মহাতপচাঁদ। নবাব দেখলেন, জগৎশেঠ মহাতপচাঁদের বশংবদ বাংলার জমিদারেরা। তাঁরা চলেন জগৎশেঠের অঙ্গুলিহেলনে। কাজেই দরবার-রাজনীতির রাশ অনেকটাই জগৎশেঠের হাতে। জগৎশেঠকে কেন্দ্র করে জমিদারেরা বিরাট এক অক্ষশক্তি। এঁরা অনেকটাই স্বাধীন। এ ব্যবস্থা সিরাজদ্দৌলার পছন্দ নয়। পুরো ক্ষমতা তিনি নিজের হাতে রাখতে চান, চান একচ্ছত্র আধিপত্য। মুর্শিদাবাদের দরবারের রাজনীতিতে জগৎশেঠ বংশের প্রবল প্রতিপত্তি ধ্বংস করতে চান নবাব। একই সঙ্গে তিনি খর্ব করতে চান আলিবর্দির আমলের প্রবীণ ওমরাহদের আধিপত্য।

ত্রস্ত হয়ে পড়লেন মহাতপচাঁদ-স্বরূপচাঁদ-রায়দুর্লভ-মিরজাফর। সিরাজকে মসনদচ্যুত করতে শওকত জঙ্গের হয়ে ঘুঁটি চাললেন জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ। উৎকোচের বিনিময়ে তিনি দিল্লির দরবার থেকে শওকত জঙ্গের নামে বাংলার নবাবির পরোয়ানা আনিয়ে দিলেন। ক্ষিপ্ত হয়ে প্রকাশ্য দরবারে মহাতপচাঁদকে অপমান করলেন সিরাজদ্দৌলা। মহাতপচাঁদ আশায় ছিলেন—পূর্ণিয়ার যুদ্ধে জিত হবে শওকতের, বেশিদিন আর সইতে হবে না সিরাজের ঔদ্ধত্য, কিন্তু এই পরিকল্পনা বিফলে গেল।

সেই থেকে মহাতপচাঁদের মনে শান্তি নেই। স্বস্তি নেই। নবাবের রোষানলে দগ্ধ হওয়ার ভয়ে তিনি সর্বদা ভীত। ইদানীং গুপ্তঘাতকের ভয়ে তিনি চলাফেরা করেন অতি সন্তর্পণে। মহাতপচাঁদ তাঁর নিজের ও কুঠির নিরাপত্তায় নিয়োগ করেছেন ইয়ারলতিফ খানকে। ইয়ারলতিফ খানের দুহাজার ঘোড়সওয়ার বাহিনী নিত্য পাহারা দেয় মহিমাপুরের কুঠি।

প্রতিদিন ভোরবেলায় গঙ্গা স্নান সেরে মহিমাপুর কুঠির ভিতরের নাটমন্দিরে প্রবেশ করে মদনমোহন জিউয়ের মূর্তির সামনে যোগাসনে বসেন মহাতপচাঁদ। কুলপুরোহিত সকালের আরতি শুরু করেন। আরতির শেষে মদনমোহনের প্রসাদি ফুল কপালে ঠেকিয়ে গৃহের অন্দরে প্রবেশ করেন মহাতপচাঁদ। রোজ এভাবেই শুরু হয় তাঁর দিন।

হীরানন্দ ছিলেন জৈন ধর্মাবলম্বী। বাংলায় এসে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হন মানিকচাঁদ। সেই থেকে জগৎশেঠ পরিবারের কুলদেবতা মদনমোহন জিউ।

কুলদেবতার নিত্য পুজোর পর সকালের দিকে মহাতপচাঁদের বেশ খানিকটা সময় কাটে হাভেলির প্রশস্ত ছাতে কবুতরের পরিচর্যায়। নিজের হাতে কবুতরদের গেঁহুর দানা খাওয়ান মহাতপচাঁদ। কড়া হুকুম মহাতপচাঁদের-সকালে এই সময় কেউ যেন তাঁকে বিরক্ত না করে। আধঘণ্টা খানেক কবুতরদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে মহাতপচাঁদ নেমে আসেন নীচে। নাস্তা সেরে গদিতে গিয়ে বসেন। দেওয়ান রণজিৎ রায় আসে। কাজের কথা শুরু হয়।

আজও কবুতরদের গেঁহুর দানা খাওয়াচ্ছিলেন মহাতপচাঁদ। কিন্তু তাল কাটল। হঠাৎই ছাতে এসে উপস্থিত হলেন দেওয়ান রণজিৎ রায়। ক্ষুরধারবুদ্ধিসম্পন্ন এই মানুষটি মহাতপচাঁদের প্রধান পরামর্শদাতা। রণজিৎ রায়ের সঙ্গে আলোচনা না করে কী ব্যবসায়িক, কী রাজনৈতিক কোনও বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন না মহাতপচাঁদ।

রণজিৎ রায় বললেন, ‘গোস্তাকি মাফ করবেন হুজুর! এ সময়ে আসতে হল।’

অচেনা লোকের গলার আওয়াজ শুনে ডানা ঝাপটে উড়ে গেল বেশ কয়েকটা কবুতর। বিরক্ত হলেন মহাতপচাঁদ। ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘কী ব্যাপার দেওয়ানজি? এই অসময়ে?’

‘জানি হুজুর এখন আপনাকে বিরক্ত করা মানা। তবু—’

‘তবু কী?’

রণজিৎ রায় বললেন, ‘মানিকচাঁদ দেখা করতে চান।’

‘কে মানিকচাঁদ?’ মহাতপচাঁদের মুখমণ্ডলে বিরক্তির ভাবটা আরও প্রকট হয়।

কন্ট্রিত হয়ে রণজিৎ রায় বললেন, ‘আজ্ঞে হুজুর আলিনগরের ফৌজদার।’

তাচ্ছিল্যের সুরে মহাতপচাঁদ বললেন, ‘অঃ! সে তো নবাবের পেয়ারের আদমি। তা এখানে কী মতলবে?’

‘আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্য ভয়ানক ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।’

‘টাকা চায়?’

‘না। এ বিষয়ে পুছতাছ করেছিলাম।’

‘তাহলে?’

‘বললেন আপনার সঙ্গে খুব জরুরি দরকার। এখনই দেখা করতে চান। গদিঘরে বসিয়েছি। মনে হচ্ছে বাত কুছ গহেরা।’

মাটির দিকে চেয়ে ক্ষণিক ভেবে নিয়ে মহাতপচাঁদ বললেন, ‘এখানেই নিয়ে আসুন।’

কার কী মতলব ঠিক নেই। সময়টা বড় উত্তাল। কয়েকজন দেহরক্ষী হাতিয়ার হাতে মহাতপচাঁদকে ঘিরে খানিক দূরে দাঁড়িয়ে পড়ল।

মানিকচাঁদ এসেই হুমড়ি খেয়ে জগৎশেঠের পায়ে পড়ে প্রায় কেঁদে উঠলেন, ‘শেঠজি জান বাঁচান।’

দু-পা পিছিয়ে গিয়ে ভয়ানক ব্যস্ত হয়ে মহাতপচাঁদ বলে ওঠেন, ‘আরে করছেন কী? আপনি ইমানদার আদমি। নবাবের খাস লোক। আমি আপনার জান বাঁচাব কী? বরং আপনি আমার গর্দান নিতে পারেন।’

মানিকচাঁদ উঠে দাঁড়িয়ে করজোড়ে বলেন, ‘আপনি জগৎশেঠ। আপনার কড়ির জোরে বাংলার নবাবি চলে। তামাম হিন্দুস্থানের লোক জানে একথা। নবাবের কাছে আপনি আমার হয়ে দরবার করলে জান বাঁচতে পারে।’

মানিকচাঁদের কাণ্ড দেখে রণজিৎ রায় ও মহাতপচাঁদ দুজনেই হতবাক। মহাতপচাঁদ প্রশ্ন করেন, ‘কী হয়েছে? এত পরেশান কেন আপনি? কীসের এত ডর আপনার?’

‘আলিনগর বেদখল হয়ে গেছে শেঠজি।’

চমকে উঠে মহাতপচাঁদ বললেন, ‘অ্যাঁ? বেদখল মতলব?’

‘ইংরেজরা ফিরে এসেছে আলিনগরে।’

‘বলছেন কী?’

‘বজবজ-মেটিয়াবুরুজ-শিবপুরের কেল্লা বেহাত হয়ে গিয়েছে।’

‘আর ফোর্ট উইলিয়াম?’ বিস্ফারিত চোখে প্রশ্ন করেন মহাতপচাঁদ।

‘ফোর্ট উইলিয়ামও হাতছাড়া। কেল্লার মাথায় ফের উড়ছে কোম্পানির নিশান।’

‘লেকিন আপনার কাছে তো অনেক সেপাই ছিল। কী করে এমন হল?’

‘আমি সচ বলছি শেঠজি। কোম্পানির ফৌজকে আমি বাধা দেওয়ার বহুত কোশিস করেছিলাম। আমার বেনসিবি। বজবজ থেকে জান নিয়ে পালিয়ে এসেছি। নবাবের সামনে গিয়ে এ বাত বলার সাহস নেই আমার। নির্ঘাত গর্দান যাবে। এখন আপনিই ভরসা।’

মহাতপচাঁদ বললেন, ‘ফলতায় বসে কোম্পানি এত তাগদবাজ হল কেমন করে?’

‘তেলেঙ্গানা থেকে ইংরেজদের ফৌজ এসেছে। পাঁচখানা বড় বড় যুদ্ধজাহাজ। এসেছেন কর্নেল ক্লাইভ ও ওয়াটসন। দুজনেই খতরনক জঙ্গবাজ! এসব শুনলে নবাবের মেজাজ কি শরিফ থাকবে? ইংরেজদের হাতে বেইজ্জত হওয়ার গুসসায় হয়তো আমারই গর্দান নেওয়ার হুকুম দেবেন নবাব।’

প্রবল উত্তেজনায় পায়চারি করতে করতে নিজের মনেই জগৎশেঠ বললেন, ‘ফের কি তাহলে কোম্পানির সঙ্গে নবাবের লড়াই বাঁধবে?’

মানিকচাঁদ বললেন, ‘লড়াই বাঁধবেই শেঠজি। কর্নেল ক্লাইভ জাঁহাবাজ ইনসান। নবাবকে দেওয়ার জন্য একখানা চিঠি আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন কর্নেল। সে চিঠি ভয়ে আমি মুর্শিদাবাদে পাঠাতে পারিনি।’

‘কেন?’

‘কোনও তসলিম-আদাব নেই। সহি-সলামত জানানো নেই। বেতমিজ চালে লেখা চিঠি। অমন চিঠি নবাবকে পাঠানো মানে তাঁকে বেইজ্জত করা। বাংলায় পা দিয়েই যিনি নবাবকে অমন চিঠি লিখতে পারেন, তিনি লড়াই বাঁধাবেন না? আলিনগর বেদখল। নবাবও কি বরদাস্ত করবেন এই বেইজ্জতি? আজ না হোক কাল লড়াই বাঁধবেই শেঠজি। লড়াইয়ের কড়ি জোগান আপনি। এ সময় তো নবাব খুশ রাখতে চাইবেন আপনাকে। একমাত্র আপনিই পারেন নবাবের রোষ থেকে আমাকে বাঁচাতে। দোহাই শেঠজি।’

কপালে চিন্তার ভাঁজ এনে জগৎশেঠ বললেন, ‘কিসসা বহুত গহেরা। নবাবকে তুরন্ত জানাতে হবে সব কুছ। তার আগে অবশ্য মোহনলালকে সব কথা জানানো দরকার। ভয় নেই। আমি আপনার সঙ্গে যাব। আপাতত আপনি বিশ্রাম করুন আমার কুঠিতে।’

‘আপনার গোলাম হয়ে থাকব শেঠজি।’ এই বলে মানিকচাঁদ বিদায় নিলেন। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে রণজিৎ রায় নেমে গেলেন নীচে।

ছাতের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন মহাতপচাঁদ। গেঁহুর দানা খেয়ে উড়ে গিয়েছে কবুতরের দল। মাথার উপরে আসমান ঘন নীল। খুশিতে হঠাৎ চকচক করে উঠল জগৎশেঠের চোখদুটো। ইংরেজ ফিরে এসেছে কলকাতায়। তেলেঙ্গানা থেকে এসেছে কোম্পানির ফৌজ। পাঁচখানা বড় বড় যুদ্ধজাহাজ। সেই সঙ্গে এসেছেন ক্লাইভ ও ওয়াটসন নামে দুই যুদ্ধবাজ সেনাপতি। বাংলার নবাবকে এরা পরোয়া করে না। মহাতপচাঁদ বুঝতে পারছেন ফের একটা যুদ্ধের ছায়া ঘনিয়ে আসছে।

মহাতপচাঁদের মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে একটা কথা—নবাবকে মসনদ থেকে হঠাতে চাই একদল বাহাদুর লোক। নবাবের হাতে অমন বিপর্যস্ত হয়ে ছ’মাসের মধ্যে যারা কলকাতা কেড়ে নিতে পারে, এমন ঘামাসান লড়াই দিতে পারে, তাদের চেয়ে বাহাদুর আর কে আছে?

গুড়ুম!

তোপের শব্দে কেঁপে উঠল জগৎশেঠের হাভেলি। সকাল দশটার ঘন্টি। এর পরেই কাছারির নিত্যদিনের কাজকম্মের শুরুয়াত হয়।

তোপের শব্দে ভয় পেয়ে ঘন নীল আকাশের বুকে ডানা ঝাপটে উড়তে লাগল একঝাঁক সফেদ কবুতর। এ দৃশ্য প্রায়ই দেখেন মহাতপচাঁদ। আজ তাঁর মনে হল, নীল আকাশের বুকে সফেদ কবুতরের দল যেন খুশির ঝরনা হয়ে উড়ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *