1 of 2

ফলতা থেকে পলাশি – ১

২

সুতানুটির বাজারের সে জোশ নেই, জলুস নেই। রঙের বাহার নেই। নিয়ম করে বাজার বসেছে ঠিকই। কিন্তু কোথায় যেন সুর কেটে গিয়েছে। হোগলা, দরমার বেড়া ও খড়ের চালের সার দেওয়া দোকানপাটগুলো সব বন্ধ। ইংরেজরা কলকাতা ছেড়ে চলে যাওয়ায় কারবারিদের ভরসাটাই উবে গিয়েছে। এর উপরে রয়েছে ফৌজদারের সেপাইদের নিত্যনতুন উৎপাত।

গতকাল রাতে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে বেশ কয়েকটি দোকান ও গুদাম। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে এখনও দাঁড়িয়ে থাকা বেশ কয়েকটি আগুনে পোড়া শালখুঁটি গতকালের তাণ্ডবের স্মৃতি বহন করছে। ধমকে চমকে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মনের মতো তোলা আদায় করতে না পেরে বাজারে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল ফৌজদার মানিকচাঁদের পেয়াদারা।

পোড়া গুদামঘরের সামনে দাঁড়িয়ে উদাস দৃষ্টিতে কাপড়পোড়া ছাইয়ের দিকে চেয়েছিল নীলকণ্ঠ। মাঝে মাঝে ছাইয়ের গাদার মধ্যে উঁকি দিচ্ছে আধপোড়া শাদা কাপড়ের থান। নীলকণ্ঠর বুক মুচড়ে ওঠে। গলা ঠেলে বেরিয়ে আসতে চায় দলাপাকানো কান্না।

বছর দশেক আগে বর্গির হাঙ্গামায় সব হারিয়ে কেতুগ্রাম ছেড়ে কলকাতায় এসে আশ্রয় নিয়েছিল কিশোর নীলকণ্ঠ। সামান্য লেখাপড়া জানত। নতুন শহরে প্রচণ্ড লড়াই করে সে আবার নিজেকে গুছিয়ে নেয়। ফোর্ট উইলিয়ামের মুনশি নবকৃষ্ণর মদতে শোভারাম বসাকের কাছ থেকে পুঁজি ধার নিয়ে কাপড়ের ব্যবসায় নামে নীলকণ্ঠ। বুদ্ধিমান করিতকর্মা যুবক নীলকণ্ঠর ঘরে অল্পদিনের মধ্যেই থিতু হন মা লক্ষ্মী।

এবারে কোম্পানির বড়সড় বরাত, নবকৃষ্ণই উমেদারি করে পাইয়ে দিয়েছিলেন। বহু টাকার দাদনে তাঁতিদের দিয়ে কাপড় বুনিয়েছিল নীলকণ্ঠ, গঙ্গার পাড়ে গুদামঘর ভাড়া নিয়ে বরাতের কাপড় মজুত করেছিল। কড়ার ছিল এই মাল নিয়ে কোম্পানির জাহাজ বর্ষার পর বিলেতে পাড়ি দেবে। এবারে সরাসরি কোম্পানির ঘরে মাল বেচে মোটা টাকা মুনাফার স্বপ্ন দেখেছিল নীলকণ্ঠ। সে স্বপ্ন আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে। ইংরেজরা কলকাতা ছেড়ে পালিয়েছে। সুবে বাংলায় ইংরেজ কোম্পানির ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন নবাব।

নীলকণ্ঠ ভেবেছিল, ইংরেজরা কলকাতা ছাড়া হলেও ডাচ বা ফরাসিদের কাছে বেচে দেবে গুদামে জমা থাকা কাপড়। সে আশাও পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে গতকাল রাতে। ফৌজদারের পেয়াদারা পুড়িয়ে দিয়ে গিয়েছে গুদামঘর। পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে গাঁট গাঁট কাপড়।

হয়তো ছাইয়ের নীচে কিছু কাপড় এখনও অক্ষত আছে এই আশা নিয়ে ছাইয়ের গাদা হাতড়াতে থাকে নীলকণ্ঠ।

‘যা খুঁজছ, তা আর পাবে না কণ্ঠ। বৃথাই চেষ্টা করছ।’

ঘাড় ঘুরিয়ে নবকৃষ্ণকে দেখে পোড়া ছাইয়ে কালো হয়ে যাওয়া হাত ঝাড়তে ঝাড়তে এগিয়ে আসে নীলকণ্ঠ। ‘সর্বনাশ হয়ে গেল মুনশিজি। বহুত লোকসান হয়ে গেল।’

‘ভেবে আর করবে কী? ললাটের লিখন খণ্ডাবে কে?’

‘মন যে মানে না মুনশিজি।’

নবকৃষ্ণ বলেন, ‘পালাবদলের আঁচ সবার গায়েই কমবেশি লেগেছে। তুমি তো একা নও। মোতি বসাক, ব্রজ শেঠ, বারাণসী দাস, সব শাঁসালো কারবারি। এদের খবর রাখো?’

শুকনো হেসে হতাশ গলায় নীলকণ্ঠ বলে, ‘ওঁদের মাল অক্ষত আছে, বাজারে বিকিয়ে যাবে।’

‘ঘণ্টা বিকোবে! ইংরেজদের ব্যবসা বন্ধ। অত গাঁট গাঁট মাল কে কিনবে?’

‘কেন? ফরাসডাঙার সাহেবরা আছে। ওলন্দাজরা আছে…’

হেসে ওঠেন নবকৃষ্ণ। ‘এই বুদ্ধি নিয়ে কারবারে নেমেছ কণ্ঠ? তা যদি হত তাহলে শোভারাম বসাকের মতো ঝানু কারবারি আজ মাথা চাপড়ায়? আর যাদের কথা বলছ, ইংরেজদের মতো ট্যাঁকের জোর তাদের কোথায়? তাছাড়া আগাম বরাত না পেলে হুট করে অত মাল কাটানো যায় না বাজারে।’

নীলকণ্ঠ ভাবে, সত্যি তো, এসব তো আগে মনে হয়নি।

গুদামঘর পুড়লেও দিশি পাড়ায় নীলকণ্ঠর বসতবাটির কোনও ক্ষতি হয়নি। মাথার উপর ছাদটা অটুট আছে। সুতানুটি, গোবিন্দপুরের অনেকেরই তো এখন মাথা গোঁজার জায়গা নেই। যুদ্ধের গুঁতোয় তাদের বাড়িঘরদোর মাটিতে মিশে গিয়েছে। খোলা আকাশের নীচেই এখন তাদের ঘর গেরস্থালি।

কুলি-মজুরদের কী হবে? গাড়োয়ান, খালাসি এদের চলবে কী করে? সুতানুটির ঘাটে জাহাজ না ভিড়লে তারা খাবে কী? এদের অনেকেই তো বর্গির হাঙ্গামায় নীলকণ্ঠর মতো ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে আসা উদ্বাস্তু। কলকাতা আশ্রয় দিয়েছে সকলকে। কোম্পানির ফেঁপে ওঠা ব্যবসার কল্যাণে, গায়েগতরে খেটে দুপয়সা আয়ের পথ দেখেছিল এরা। কলকাতার বাতাসে টাকা ওড়ে টের পেয়ে বর্গির হাঙ্গামা মিটলেও অনেকেই আর নিজের গাঁয়ে ফেরার কথা ভাবেনি। এখন কোথায় যাবে এই মানুষগুলো? খাবে কী?

অসহায় গলায় নীলকণ্ঠ প্রশ্ন করে, ‘কবে শান্তি ফিরবে বলতে পারেন মুনশিজি?’

প্রত্যয়ের সঙ্গে নবকৃষ্ণ বলেন, ধৈর্য ধরো। সময় লাগবে। ইংরেজরা ঠিক ফিরে আসবে কলকাতায়। কোম্পানির ব্যবসা আবার চালু হবে।’

নীলকণ্ঠ আঁতকে উঠে বলে, ‘বলছেন কী? একথা ফৌজদারের কানে গেলে যে গর্দান যাবে!’

‘আরে রাখো তোমার ফৌজদার। নবমুনশি উচিত কথা বলতে ভয় পায় না। স্বয়ং নবাবই ওয়াপস আনবেন ইংরেজদের। মিলিয়ে নিও আমার কথা।’

নীলকণ্ঠর ভয়ের কারণটা খুব স্বাভাবিক। ফৌজদার মানিকচাঁদের চর সর্বত্র ঘুরছে। এরা লোককে বাজিয়ে দেখে, ইংরেজদের ভালো চায়, এমন লোকের হদিশ পেলে ধরে নিয়ে যায় কোতোয়ালিতে। চাবুক মারে। তারপর মুর্শিদাবাদে চালান করে দেয়। চারপাশ ভালো করে দেখে নিয়ে চাপা স্বরে নীলকণ্ঠ শুধোয়, ‘কী করে এত জোর দিয়ে বলছেন?’

‘কোম্পানির ব্যবসা বন্ধ হওয়ায় শুল্ক খাতে নিজামতের কত টাকা লোকসান হচ্ছে, সে খবর রাখো? এভাবে চললে নবাবি লাটে উঠবে। চলি ভায়া।’

‘পেট চালানোর একটা উপায় বাতলে দিতে পারেন মুনশিজি?’

‘সন্ধানে তেমন কিছু এলে খবর দেব।’

নবকৃষ্ণ হাঁটতে শুরু করেন, সুতানুটির বাজারের মধ্যে দিয়ে হাটখোলার পথ ধরে এগোতে থাকেন। পরনে খাটো ধুতি। কাঁধের উপর ফেলা একটা চাঁদর। পায়ে খড়ম। কপালে চন্দনের মোটা প্রলেপ। চেঁচেপুঁছে কামানো মাথার পিছনের দিকে ঝুলছে লম্বা শিখা। তাতে বাঁধা রয়েছে গোবিন্দের চরণে নিবেদিত গাঁদা ফুল।

প্রতিদিন সকালে গঙ্গাস্নান করে, গোবিন্দের নিত্য পুজো সেরে গোবিন্দপুরের বাড়ি থেকে এভাবেই কাজে বেরোন নবকৃষ্ণ। গোবিন্দপুর-সুতানুটির অনেকেই তাঁকে চেনে, খাতির করে।

বাংলা ও ফারসিতে নবকৃষ্ণর ভালো দখল। কাজ চালানোর মতো ইংরেজি জানেন। কথাবার্তায় তুখোড়। নবকৃষ্ণের পিতা, রামচরণ দেব ছিলেন কটকের সুবাদারের দেওয়ান। বছর পনেরো আগে কটক যাওয়ার পথে পিন্ডারি দস্যুদের হাতে তিনি মারা যান।

অভাবের ঢেউ আছড়ে পড়ে সুখের সংসারে। প্রবল দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করে রামচরণের বিধবা স্ত্রী মানুষ করে তোলেন তিন ছেলেকে। রামসুন্দর, মানিকচন্দ্র ও নবকৃষ্ণ। বড় দুই ছেলে কাজের তাগিদে দূরে চলে গিয়েছে। রামসুন্দর এখন পঞ্চকোটের দেওয়ান। মানিকচন্দ্র কাজ পেয়েছে দিল্লির বাদশার দরবারে। একহাজারি মনসবদার। সেই সঙ্গে পেয়েছে রায় উপাধি। ছোট ছেলে নবকৃষ্ণকে নিয়েই এখন বিধবা মায়ের সংসার। অনেক আশা। অনেক স্বপ্ন।

আলিবর্দির এন্তেকালের পর মসনদে বসেছেন সিরাজদ্দৌলা। মুর্শিদাবাদ দরবারের রাজনীতি উত্তাল। অভিজাতবর্গের বড় একটা অংশ সিরাজকে নবাব হিসেবে চায় না। আলিবর্দির দৌহিত্রকে মসনদচ্যুত করার জন্য তলায় তলায় ষড়যন্ত্রের জাল বোনা চলছে। একাজে জড়িয়ে পড়েছেন অনেকেই। এই দলে ইংরেজ বণিকরাও আছে। তারাও সিরাজদ্দৌলাকে পছন্দ করে না। নতুন নবাব পদে পদে কোম্পানির অবাধ বাণিজ্যে বাধার সৃষ্টি করছেন।

একদিন জগৎ শেঠের চিঠি নিয়ে ফোর্ট উইলিয়ামের গভর্নর রজার ড্রেকের কাছে এল এক বার্তাবাহক। জরুরি চিঠি। শেঠজির কড়া নির্দেশ মুনশি তোজাউদ্দিনকে দিয়ে কোনও মতেই যেন এ চিঠি পড়ানো না হয়। চিঠির কথা নবাবের কাছে ফাঁস হয়ে যেতে পারে। তাহলে বিপদ হবে অনেকের।

নকু ধরের কাছে চিরকুট পাঠালেন রজার ড্রেক। ‘বাবু, দক্ষ একজন হিন্দু মুনশির সন্ধান দিতে পারেন?’ নবকৃষ্ণকে পাঠালেন নকু ধর। চিঠিটা পড়ে নিমেষেই নবকৃষ্ণ জবাবি চিঠির মুশাবিদা করে দিলেন। ড্রেকসাহেব খুশি হলেন। তোজাউদ্দিনের চাকরি গেল। কোম্পানির মুনশির কাজে বহাল হলেন নবকৃষ্ণ। মাইনে মাসে ষাট টাকা।

কিছুদিন পরে কোম্পানির কেরানি হয়ে কলকাতায় এলেন এক সাহেব। তাঁর নাম ওয়ারেন হেস্টিংস। তাঁকে বাংলা ও ফারসি শেখানোর ভার পড়ল নবকৃষ্ণর উপর। কিছুদিন কলকাতায় কাটানোর পর কাশিমবাজার কুঠিতে বদলি হয়ে গেলেন হেস্টিংস। নবকৃষ্ণকেও চাকরির খাতিরে হেস্টিংসের সঙ্গে কাশিমবাজারে যেতে হল।

কাশিমবাজারে বসে মুর্শিদাবাদ দরবারের উত্তপ্ত রাজনীতির প্রত্যক্ষ আঁচ পেলেন নবকৃষ্ণ। তাঁর হাড় হিম হয়ে গেল। পরিস্থিতি ভয়ানক। মোহনলাল ও মিরমদন ছাড়া নবাব সিরাজদ্দৌলা কাউকে বিশ্বাস করেন না। ওমরাহ, মনসবদার, জমিদারদের অনেকেই নবাবের বিরুদ্ধে। এই বিরোধী পক্ষ বেশ শক্তিশালী। ইংরেজরাও বেশ ভালোভাবে জড়িয়ে পড়েছে দরবারের রাজনীতিতে। সর্বত্রই অবিশ্বাস ও সন্দেহের বাতাবরণ। যে কোনও সময় আগুন জ্বলে উঠতে পারে।

নবকৃষ্ণর বিচক্ষণ মন বলে উঠল, এ অবস্থায় মুর্শিদাবাদের ধারেকাছে থাকা ঠিক নয়। যে কোনও সময় বিপদ আসতে পারে। কিন্তু কী করবেন তিনি? কোম্পানির চাকরি। কর্তাদের হুকুম ছাড়া নড়ার উপায় নেই। কিন্তু হঠাৎই কাশিমবাজার ছেড়ে কলকাতায় যাওয়ার সুযোগ এল নবকৃষ্ণর কাছে।

কলকাতায় ধরা পড়েছে নবাবের গুপ্তচর নারান সিং। তার কাছ থেকে একগাদা চিঠি পাওয়া গিয়েছে। চিঠিগুলো পড়ার জন্য বিশ্বাসী লোক চাই। নবকৃষ্ণকে কলকাতায় ডেকে পাঠালেন রজার ড্রেক। নবমুনশি কলকাতায় পৌঁছনোর কয়েক’দিন পরে কাশিমবাজার অবরোধ করল নবাবের বাহিনী। রাতের অন্ধকারে পিছনের দরজা দিয়ে চোরের মতো চুপিচুপি পালিয়ে গেলেন ওয়ারেন হেস্টিংস।

ডুম-ডুম-ডুম-ডুম-ডুম-ডুম শব্দে ঢোল বেজে উঠল। ঘোড়ার পিঠে চেপে টহল দিতে বেরিয়েছে কোতোয়াল। বল্লম সড়কি হাতে মেলা পাইক-বরকন্দাজ চলেছে সঙ্গে। কোতোয়ালের ঘোড়ার সামনে নাচতে নাচতে চলেছে ঢুলির দল। পথ খালি করার জন্য কাটাওয়ালা চাবুক হাতে দৌড়চ্ছে দুজন বরকন্দাজ। লোকে শশব্যস্ত হয়ে পথ ছেড়ে দিচ্ছে। নকু ধরের বাড়ির দেউড়িতে ঢুকে আড়াল থেকে এই শোভাযাত্রা দেখতে লাগলেন নবকৃষ্ণ।

নবাব সিরাজদ্দৌলা কলকাতা ছেড়ে ফলতায় পালিয়ে যাওয়া ইংরেজদের একেবারে দগ্ধে দগ্ধে মারতে চান। হুকুমত এসেছে মুর্শিদাবাদ থেকে। শহরে ঢোলশোহরত জানানো হচ্ছে সেই হুকুমত—

‘শোনেন শোনেন, সবাই শোনেন। আলিনগরের তামাম আদমিরা শোনেন, কারবারিরা শোনেন, বানজারারা শোনেন, নবাবের হুকুমত। কেউ ভুলেও যেন ফলতায় খাদ্যদ্রব্য পাঠাবেন না, ইংরেজদের কোনও মদত দেবেন না। অন্যথায় বিধান হল প্রাণদণ্ড।’

ঢুলির দল শূন্যে লাফিয়ে উঠে ফের চাটি মারে ঢোলে। ডুম-ডুম-ডুম-ডুম-ডুম-ডুম।

ধীরে ধীরে নকু ধরের বাড়ির সামনে দিয়ে দূরে চলে যায় শোভাযাত্রা।

গৃহের অন্দরে প্রবেশ করেন নবকৃষ্ণ। দারোয়ানরা সসম্ভ্রমে পথ ছেড়ে দেয়। তারা সবাই জানে এই যুবকটিকে বাড়ির কর্তা বিশেষ পছন্দ করেন। ধরমশায়ের হাভেলিতে নবমুনশির অবাধ যাতায়াত।

দুপুরের আহার সারা হয়েছে। কাছারিঘরের ফরাসের উপর বসে কামদার মেহগিনি কাঠের জলচৌকিতে রাখা হিসেবের খাতায় চোখ বোলাচ্ছিলেন লক্ষ্মীকান্ত ধর। মাথার উপর দুলছে টানা পাখা। ফরাসের উপরে রাখা পিতলের খাঞ্চার উপর সাজানো রয়েছে রুপোলি তবকে মোড়া পানের খিলি। পাশে রয়েছে রুপোর পিকদান। সারা ঘরে ভুরভুর করছে আতরের গন্ধ। সাপের মতো এঁকেবেঁকে ফরসির নলটা পড়ে আছে ফরাসের এক পাশে।

লক্ষ্মীকান্ত ধরকে কলকাতা, সুতানুটি, গোবিন্দপুরের লোক নকু ধর নামে এক ডাকে চেনে। কোম্পানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যবসা করে অঢেল টাকা করেছেন তিনি। কেউ কেউ বলে ধনকুবের। তাঁর ঘরে সবসময় আসনপিঁড়ি হয়ে বসে থাকেন মা লক্ষ্মী। নকু ধরের কড়ির জোর প্রবাদপ্রতিম, এ নিয়ে সুতানুটির লোকে ছড়া কাটে। বিপদে-আপদে ইংরেজ বণিকরাও হাত পাতে নকু ধরের কাছে, টাকা ধার নেয়, দেনা মেটায় চড়া সুদে।

‘তলব করেছিলেন?’

হিসেবের খাতা থেকে চোখ তুলে নকু ধর বলেন, ‘এসো হে নবকৃষ্ণ। তোমার জন্যই বসে আছি।’

ফরাসের উপর বসে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘এ তো আমার খুশনসিবি। তা দেশের হালচাল কী বুঝছেন?’

‘শহরটার কী হাল হয়েছে তা তো দেখতেই পাচ্ছ। সাহেবরা অল্প সময়ের মধ্যে বেশ গড়ে তুলেছিল। সব গেল।’ এই বলে রেকাবি থেকে পানের একটা খিলি তুলে নিয়ে নবকৃষ্ণর হাতে দিয়ে, আরেকটা পানের খিলি নিজের মুখে ফেলে চোখ বুজে পান চিবোতে চিবোতে নকু ধর বলেন, ‘মা লক্ষ্মী চঞ্চলা।’

‘সে তো সর্বত্রই।’ পান মুখে ফেলে বলেন নবকৃষ্ণ।

‘সাহেবরা ফিরে না এলে কলকেতা মরবে। কারবারিদের সন্ন্যাস নিতে হবে।’

‘ঠিকই বলেছেন। নবাব তো আলিনগর নাম দিয়েই খালাস। এই যে সকলের এত লোকসান হল, দিশি কারবারিদের কপাল পুড়ল, এ নিয়ে নিজামতের কোনও হেলদোল আছে? অবশ্যি এসব নিয়ে ভাববার ফুরসত কোথায় নবাবের। মসনদই যে টলমলে। দরবারের খবর রাখেন নিশ্চয়ই।’

ফরসির নলে টান দিয়ে ভুরভুর করে খানিক ধোঁয়া ছেড়ে নকু ধর বলেন, ‘জানি। তা তুমি এখন করছ কী?’

‘কিচ্ছু না। বসে আছি। অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় কী?’

‘কীসের অপেক্ষা?’

‘সাহেবদের কলকাতায় ফিরে আসার।’

নবকৃষ্ণর মুখের দিকে স্থির চোখে চেয়ে থেকে নকু ধর বলেন, ‘বলছ? তারা ফিরবে?’

‘ইংরেজদের দেখে যা বুঝেছি ধরমশায়, তাতে সহজে হাল ছেড়ে দেওয়ার লোক এরা নয় বলেই তো মালুম হয়।’

ফরসির নলটা পাশে ফেলে দিয়ে হেসে ওঠেন নকু ধর। ‘এই জন্য তোমাকে এত ভালো লাগে নবকৃষ্ণ। এই সত্যি কথাটা বলার ধক কলকাতায় আজ অনেকেরই নেই। সবাই নবাবের ভয়ে সিঁটিয়ে আছে।’

‘তাদের আর দোষ কী? ঢোলশোহরত শুনলেন তো? স্বয়ং কোতোয়াল বেরিয়েছিল আজ।’

পিকদানে পানের পিক ফেলে নকু ধর প্রশ্ন করেন, ‘ফলতার খবর রাখো?’

‘কলকাতার খবর নিয়ে মানিংহ্যাম সাহেব মাদ্রাজ গেছেন। এইটুকু জানি।

‘ড্রেকসাহেব একখানা পত্র পাঠিয়েছেন।’

‘কী লিখেছেন? মাদ্রাজ থেকে জাহাজ এল নাকি?’ কৌতূহলী হয়ে ওঠেন নবকৃষ্ণ।

‘সেসব কিছু লেখেননি ড্রেকসাহেব। জানিয়েছেন, বড় কষ্টে আছেন সাহেবরা। আহার্যের অভাব। সাহেব জানতে চেয়েছেন আমি কিছু করতে পারি কিনা?’

নবকৃষ্ণ প্রশ্ন করে, ‘কী করবেন ঠিক করলেন?’

তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে থলথলে ভুঁড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে নকু ধর বলেন, ‘তুমিই বলো কী করা উচিত।’

‘এই বিপদে আপনি না দেখলে কে দেখবে ইংরেজদের?’

মাথা নেড়ে নকু ধর বলেন, ধম্মের দায় তো একটা আছেই রে ভাই? আমার কথাই ধরো বা শোভারাম বসাক, গোবিন্দ মিত্তিরের কথাই ধরো, চার্নকসাহেব সুতানুটির ঘাটে জাহাজ না ভেড়ালে, ইংরেজরা এখানে ঘাঁটি না গাড়লে ঘরে কি আর মা লক্ষ্মীর বসত হয়? যাদের জন্য দুটো কড়ির মুখ দেখলাম, তাদের সাহায্য করব না? এতটা অকৃতজ্ঞ হই কী করে?’

‘বড় ন্যায্য কথা বলেছেন ধরমশায়।’

‘বণিক চূড়োমণি খোজা ওয়াজিদকে বলে চুঁচুড়া থেকে ছোট একখানা জাহাজের বন্দোবস্ত করেছি। জাহাজে ওলন্দাজদের নিশান লাগানো থাকবে। তাতে খানাতল্লাশির ভয়টা কম। সুতানুটির চৌকিতে কড়াকড়ি বড্ড বেশি। ও তল্লাট সাবধানে পেরিয়ে গেলেই হল। ফলতা পৌঁছতে আর বেগ পেতে হবে না। জাহাজে রসদ ভরে দেওয়ার জন্য হুগলির এক মহাজনকে বলেছি।’

‘ঝুঁকির কথাটা ভেবেছেন?’

‘সে জন্য তো ড্রেকসাহেব বাজারদরের দ্বিগুণ কড়ি দেবেন। কড়ার এমনই। নবাবের গুঁতোয় কারবার তো শিকেয় উঠেছে। এই বাজারে এভাবে যদি বাড়তি কিছু উপায় করা যায়, সেটা মন্দ কি?’

‘আর ধরা পড়লে?’

মৃদু হেসে নকু ধর বলেন, ‘কাঞ্চন বটিকা। এ দেশে উৎকোচে কী না হয়।’

‘খাসা পরিকল্পনা! কিন্তু জাহাজ নিয়ে যাবে কে?’ শুধোন নবকৃষ্ণ।

সোজা হয়ে বসে ছড়ি দিয়ে পিঠ চুলকে নকু ধর বলেন, ‘সেটাই তো হল কথা। খুব হুশিয়ার চৌকস লোক চাই। আমি বলি কি, তোমাকেই এ কাজটা করতে হবে নবকৃষ্ণ।’

মনে মনে খুশি হন নবকৃষ্ণ। এই ধরনের রোমহর্ষক কাজেই তাঁর উৎসাহ বেশি। তাছাড়া নবকৃষ্ণ হিসেবি লোক। এমন কাজে নিজেকে দাখিল করতে পারলে ভবিষ্যতে বহুগুণ মুনাফার সম্ভাবনা আছে। নসিব ফিরলে ইংরেজরা মনে রাখবে তাঁকে।

তবে নকু ধরের মতো চতুর লোকের সামনে এ নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত উৎসাহ দেখানোটা ঠিক নয়। নিমরাজি ভাব দেখিয়ে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘সেরেছে! আর লোক পেলেন না?’

‘তুমিই বলো, হাতের কাছে তুমি ছাড়া আছেটা কে? যার উপর ভরসা করা যায়।’

উদাসীন ভাবে উরুতে হাত বোলাতে বোলাতে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘আপনার প্রস্তাব মুখের উপর প্রত্যাখ্যান করি কী করে? অগত্যা—’

‘বেশ কালই চুঁচড়োর দিকে রওনা হয়ে যাও।’

একটা চামড়ার থলে নবকৃষ্ণর হাতে ধরিয়ে নকু ধর বললেন, ‘এটা রাখো। তোমার রাহা খরচ, খাদ্যদ্রব্য খরিদের কড়ি, বহরদার, কুলিমজুরদের মজুরি, আর…’

‘আর?’ প্রশ্ন করেন নবকৃষ্ণ।

‘উৎকোচের কড়ি। কাঞ্চন বটিকা। নকু ধরের দাওয়াই। বিষহরি!’

সশব্দে হেসে ওঠেন নকু ধর। নবকৃষ্ণও তাল মিলিয়ে হেসে ওঠেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *