১১
ফের যুদ্ধ। ১৭৫৬ সালের নভেম্বর মাস। হাতি, ঘোড়া, উটের পায়ের শব্দে, কামানের গাড়ির লোহার চাকার কর্কশ যান্ত্রিক আওয়াজে, কাড়া-নাকাড়ার ভীমনাদে সহসা সচকিত হয়ে উঠল রাজমহল, সাহেবগঞ্জ, মণিহারি, সোমদহ, হিয়াৎপুরের বিস্তীর্ণ জনপদ। ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে লাগল সাধারণ মানুষ। পালাও, পালাও, পালাও সবাই! নবাবের ফৌজ আসছে!
শওকত জঙ্গকে সবক শেখাতে পূর্ণিয়ার পথে চলেছেন নবাব সিরাজদ্দৌলা।
পিয়ারি লুৎফার আবদার রেখেছেন নবাব। এবারে সে নবাবের সফর-সঙ্গিনী। হাতির পিঠে রুপোর হাওদায়, লাল মখমলের আসনে বসে আছেন সিরাজদ্দৌলা। নবাবের হাতি লতাগুল্ম তছনছ করে এগিয়ে চলেছে রাজমহলের পথে। পিছনে চতুর্দোলায় আসছে লুৎফুন্নেসা।
দুদিক থেকে পূর্ণিয়া আক্রমণের কৌশল নিয়েছেন সিরাজ। আরেকটি দল সোমদহ, হিয়াৎপুর হয়ে এগিয়ে চলেছে। সে দলের নেতৃত্বে মোহনলাল। মিরজাফর, জগৎশেঠ চলেছেন নবাবের সঙ্গে। এদের চোখেচোখে রাখতে চান নবাব।
নবাবের বাহিনীর সঙ্গে চলেছে বাঁদিদের বড়সড় একটা দল। সব সমর অভিযানেই তারা যায়। এরা অস্থায়ী শিবিরে নবাবের দেখভাল করে। ওমরাহদের খিদমত খাটে। এদলের বেশ কয়েকজনকে কসিদের কাজে লাগিয়েছে লুৎফা। সৈন্যদলে কে কী করছে, কে কী ভাবছে তার হালহকিকত হররোজ বেগমসাহেবাকে জানাবে এরা। কড়ার এমনই। কাজ ভালো হলে মোটা ইনাম।
মিরজাফর, জগৎশেঠের কূটবুদ্ধিকে ভয় করে লুৎফুন্নেসা। লুৎফা জানে, কৌশলের খেলায় সিরাজ একেবারেই আনাড়ি। নবাবের মন খুব সরল, তিনি যা করেন তা আবেগ দিয়ে করেন। তখন তিনি রাজনীতির হিসেবনিকেশের ধারকাছ দিয়েও যান না। আবেগের বশে ভুলও করে বসেন। তাঁর সরল মনকে বিষিয়ে দিয়ে নিজেদের স্বার্থে অন্যায় কাজ হাসিল করিয়ে নেয় অনেকে।
দূর থেকে যারা নবাবকে দেখে, তারা ভাবে নবাব দাম্ভিক, নবাব নিষ্ঠুর। লুৎফার চোখে নবাব মোটেই এমন নন। তাঁর একটা শিশুসুলভ মন আছে। লুৎফা ছাড়া এ মনের হদিশ কেউ রাখে না।
নবাব সিরাজদ্দৌলা ভালোবাসার কাঙাল। তাঁর জন্য নিজের অন্তরকে উজাড় করে দিয়েছে লুৎফা। সেখানে কোনও ফাঁকি নেই, নাইবা হল শরিয়তের নিয়ম মেনে সিরাজের সঙ্গে তাঁর শাদি। এ নিয়ে কোনও ক্ষোভ, কোনও অনুশোচনা, কোনও আক্ষেপ নেই লুৎফার। শাদি না হলেও নবাবের খাসবেগমের ইজ্জত সে পেয়েছে, পেয়েছে সিরাজের অকৃত্রিম ভালোবাসা, পেয়ার, মহব্বত।
তখনও লুৎফা সেভাবে আসেনি সিরাজের জীবনে, ফৈজি বাইকে নিয়ে আবর্তিত হচ্ছে সিরাজের দিনরাত্রি। একদিন যাকে হৃদয়ের মসনদে বসিয়েছিলেন, সেই ফৈজিকে জ্যান্ত গোর দিয়েছিলেন সিরাজদ্দৌলা। এই নিষ্ঠুরতার কথা শুনে কেঁপে উঠেছিল তামাম হিন্দুস্থান।
সিরাজের তাৎক্ষণিক ক্রোধের বলি হয়েছিলেন ফৈজি। ভালোবাসার ক্ষেত্রে বিশ্বাসঘাতকতা মেনে নিতে পারেননি সিরাজ। তাঁর ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত হৃদয় ফৈজির জ্যান্ত গোরের নিদান দিয়েছিল। এই নৃশংসতার কথা লোকে জানে, যা জানে না তা হল, এ নিয়ে সিরাজের অনুশোচনা।
নবাব একান্তে লুৎফাকে একাধিকবার বলেছেন, ফৈজিকে ওভাবে শাস্তি না দিলেই ভালো হতো লুৎফা। মুর্শিদাবাদ থেকে বিতাড়িত করে দিলেই চলত। তখন যে কী হল আমার।’
লুৎফা সান্ত্বনা দিয়ে বলে, ‘এসব নিয়ে কেন ভাবেন আপনি? আপনার দিল জখম করেছিল ফৈজি, তার শাস্তি সে পেয়েছে।’
‘আমি খুব নিষ্ঠুর না লুৎফা?’
‘আমি তা মনে করি না।’
‘তোমার ভয় করে না?’
‘কীসের ভয়?’
‘এই যে তুমি আমাকে এত পেয়ার কর, যদি কোনওদিন ফৈজির মতো তোমায়ও…।’
নবাবের মুখের সামনে হাত রেখে তাঁকে বাধা দিয়ে ফৈজি বলে, ‘সে ভয় আমার নেই। ফৈজি আপনার পেয়ারের কিম্মত দেয়নি, আপনার সাচ্চা মহব্বতকে বোঝেনি, আমি বুঝি।’
কাতর চোখে সিরাজ বলেন, ‘আমার পাশ থেকে কখনও সরে যেও না লুৎফা।’
নবাবের গলা জড়িয়ে ধরে লুৎফা বলে, ‘আমি শুধু আপনার মেহের, একান্তই আপনার।’
এইরকম আলাপচারিতায় কত রাত কেটে যায়। ম্লান হয়ে আসে অভ্রের বাতিদানের আলো। চাঁদ অস্ত যায়। মিলিয়ে যায় আকাশের বুটিদার নকশা। ভোরের পাখি ডেকে ওঠে। লুৎফার কোলে মাথা দিয়ে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকেন সিরাজ।
লুৎফার ঘুম আসে না। অপলক চোখে সে চেয়ে থাকে নবাবের মুখপানে। সবাই বলে সিরাজদ্দৌলা হিংস্র, নৃশংস, অত্যাচারী। কেউ জানে না তাঁর অন্তরের কথা। জানে শুধু লুৎফা। একমাত্র লুৎফার কাছেই নিজের অন্তরকে অর্গলমুক্ত করেন সিরাজ। এ নিয়ে লুৎফার গর্বের শেষ নেই।
চতুর্দোলায় বসে এসব কথা ভাবছিল লুৎফা। শীতের বেলা ফুরিয়ে আসছে। দূরে দেখা যাচ্ছে রাজমহলের সবুজ পাহাড়। খানিকবাদেই সূর্য হারিয়ে যাবে পাহাড়ের পিছনে।
হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল নবাবের কাফেলা। সামনে প্রশস্ত সমতলভূমি। এখানেই আজ তাঁবু গাড়ার হুকুম দিলেন নবাব।
চতুর্দোলার ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে লুৎফা প্রাণ ভরে শ্বাস নেয়। এদিকে ঠান্ডা বেশি। উত্তুরে হাওয়ায় শীতের কামড় বড় তীব্র। সোনার সুতোর নকশা করা লাল রংয়ের পশমিনা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নেয় লুৎফুন্নেসা।
আলো কমে আসছে দ্রুত। মশালচিরা আলো জ্বালানোর তোড়জোড় করছে। তাঁবু খাটাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে মুটের দল। চারিদিকে শয়ে শয়ে পদাতিক, ধানুকী, বন্দুকচি, হাতি, ঘোড়া, উট, বলদ। নবাবের কাফেলা মানেই মানুষে ও জানোয়ারে মিলে বিরাট এক হইচই।
বলদে টানা তোপের গাড়িগুলোকে একদিকে সার বেঁধে পরপর দাঁড় করাচ্ছে মির আতশের লোকজন। পাকশালার লোকেরা উনুন জ্বালিয়েছে। বড় বড় পিতলের হান্ডিতে চাল চড়ানো হয়েছে। হামানদিস্তার ঠকঠক শব্দ ভেসে আসছে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে জাফরানের গন্ধ। বোধ হয় বিরিয়ানি তৈরি হবে।
সেনাশিবিরের এই বিশাল আয়োজন লুৎফা আগে কখনও দেখেনি। এই প্রথম সে চেহেল সেতুনের বাইরে এসেছে। রাজমহলের পথে, চারিপাশে উপচে পড়ে আছে প্রকৃতির রূপসুধা। সে সব উপভোগ করার অবকাশ নেই লুৎফার। তার মনের কোণে জমেছে আশঙ্কার মেঘ।
এই যে এত আয়োজন, এত লোক-লশকর, জন্তুজানোয়ারের সমারোহ, কাড়া-নাকাড়া, ঢাক-ঢোল-দিগরের বাতাস কাঁপানো শব্দ, এর কারণ দুই ভাইয়ের লড়াই। আর লড়াই মানেই একজনের জিত, একজনের হার। একজনের মসনদ, আরেকজনের মওত। একজনের রওশন, আরেকজনের বরবাদি। লুৎফার চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে আসে।
বেগমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে আসেন নবাব।
নবাবকে দেখে বেগমকে ঘিরে থাকা খোজা ও বাঁদির দল দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যায়।
নবাব বলেন, ‘এদিকটায় ঠান্ডা বড় জবরদস্ত।’
লুৎফা বলে, ‘আমার বেশ লাগছে।’
‘চতুর্দোলার ঘেরাওয়ের মধ্যে হাত-পা গুটিয়ে বসে এত পথ এলে, তোমার অনেক তকলিফ হল।’
‘আমি ঠিক আছি মেহের। আপনি দূরে থাকলে, আপনাকে দেখতে না পেলে, আমার তকলিফ জেয়াদা হয়। সে জন্য তো জোর করে এলাম।’
‘মিরজাফর ও জগৎশেঠজির তাম্বু শিবিরের দুই মাথায় ফেলতে বলেছি। দুজনে এক হয়ে গুলজার করতে পারবে না।’
‘এমন না করলেই পারতেন।’
‘বলছ কী? এক জায়গায় হলেই এঁরা গদ্দারির ছক কষে আমাকে পরেশান করবে।’
‘এখানে পারবে না। তাঁদের মনের খবর আমি ঠিক জেনে যাব।’
অবাক হয়ে সিরাজ প্রশ্ন করেন, ‘কীভাবে?’
‘কসিদ আছে।’
‘কসিদ?’ বলে সিরাজ একচোট হাসলেন। তারপর বললেন, ‘নিজামতের কসিদরা একেবারে ফালতু আদমি। এরা ঠিক খবর আমাকে দেয় না।’
‘আমি নিজামতের কসিদদের কথা বলছি না।’
‘তাহলে?’
‘মিরজাফর ও জগৎশেঠজির বাঁদিদের আমি হাত করেছি। আশরফি দেব। এরা আমাকে ঠিক খবর এনে দেবে।’
খুশিতে চোখমুখ উদ্ভাসিত করে সিরাজ বলেন, ‘চমৎকার! জঙ্গবাজির ময়দানে পা দিয়েই তুমি দেখছি নানি বেগম হয়ে উঠেছ!’
‘আপনি যে বলেন, আমি ননীর পুতুল!’
দূরে আবছা হয়ে আসা কুয়াশামাখা রাজমহল পাহাড়ের দিকে চেয়ে হঠাৎ উদাস হয়ে যান নবাব। লুৎফার কথার জবাব না দিয়ে খানিকটা অসহায় গলায় বলেন, ‘আমি আর শওকত ভাইয়া ছেলেবেলায় খোশবাগে নানাজির সঙ্গে অনেক খেলা করেছি। নানি বেগমকে জড়িয়ে ধরে পাশাপাশি দু-ভাই ঘুমিয়েছি। কহানি শুনেছি। আজ শওকত ভাইয়ার বিরুদ্ধে হাতিয়ার ওঠাতে হচ্ছে আমাকে। আমি জানি, মসনদের লালচ কোনওদিনও শওকত ভাইয়ার ছিল না। সে অল্পে খুশি এক রঙ্গিলা ইনসান। বুড়া বেতমিজের দল তাঁকে আমার বিরুদ্ধে লড়িয়ে দিল।’
ব্যাকুল গলায় লুৎফা বলে, ‘এ লড়াই থামানো যায় না মেহের?’
‘সম্ভব নয় লুৎফা। শওকত ভাইয়া মসনদের খোয়াব দেখছে এখন। আমি না চাইলেও সে লড়াই করবে। তাই আমাকেও লড়তে হবে। মসনদ হল তাগদ, মসনদ হল খুশি, মসনদ হল রংদার রোশনি। এমনি এমনি ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে যাওয়া যায় না। নসিবে যা আছে, তাই হবে।
ঘন অন্ধকার নামল বলে। ধীরে ধীরে কুয়াশার চাদরে দেহ মুড়ে নিচ্ছে প্রকৃতি।
মৌলবির সুরেলা গলায় ভেসে এল আজানের সুর। সেই মিঠে আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে। নামাজের সময় হয়েছে—
আশহাদু-আল্লা-মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।
আশহাদু-আল্লা-মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।
হাইয়া আলাস সালাহ।
হাইয়া আলাস সালাহ।
হাইয়া আলাল ফালাহ।
হাইয়া আলাল ফালাহ।
মখমলের মতো সবুজ ঘাসের উপর মসলিনের সাদা চাদর পেতে দিয়ে গিয়েছে একজন দাখিলা। তার উপরে পশ্চিমমুখী হয়ে মগরেবের নামাজ কবুল করতে বসলেন নবাব ও বেগম।
নবাবগঞ্জ ও মণিহারির মাঝে মস্ত এক বিলের একপ্রান্তে আছে অরণ্যে ঢাকা টিলা। এই উঁচু পাথুরে জমিকে বিলটি প্রাকৃতিক পরিখার মতো তিনদিক থেকে ঘিরে রেখেছে। একদিকে রয়েছে একটি মাত্র সরু পথ। এই পথটি আটকে দিতে পারলে পিছনের ভূমি দুর্গের মতো সুরক্ষিত।
বিলে এখন জল কম, কাদা বেশি। পায়ে হেঁটে এ বিল পেরিয়ে যাওয়া যায়। তবে পুরু পাঁক ঠেলে হাঁটা বেশ কষ্টকর। বিলের অগভীর জলে চরে বেড়াচ্ছে অজস্র বক। টিলার উপর থেকে দেখলে তাদের কুচো টগরের মতো দেখায়।
সহসা শীতের এক সকালে চঞ্চল হয়ে উঠল বকের দল। দুম করে তোপ দাগার শব্দে চমকে উঠল তারা। প্রাণভয়ে ডানা ঝাপটে উড়তে লাগল সবাই। কামানের গোলা বিল অতিক্রম করতে পারল না। খানিকটা কাদা ছিটকে গেঁথে গেল বিলের বুকে। অবশ্য তার আগে উড়তে থাকা একটি নিরীহ বককে ধরাশায়ী করে দিল।
মোহনলাল হুকুম করলেন, ‘বড় কামান লে আও। ছোট পাল্লার কামানের গোলা বিল পেরিয়ে দুশমনকে আঘাত করতে পারবে না।’
দুশমন হল শওকত জঙ্গের বাহিনী। বিল পরিবেষ্টিত বন্ধুর এলাকায় প্রবেশের সরু পথটি তারা আগে থেকেই দখল করে রেখেছে। এই প্রতিরোধ ভাঙতে না পারলে মোহনলালের পক্ষে আর এগোনো কঠিন। প্রতিরোধ ভাঙতে হলে তোপই ভরসা। বিলের কাদা ভেঙে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কাদায় আটকে পড়বে সৈন্যরা। তখন সুবিধেজনক উঁচু জায়গা থেকে কামান দেগে নাস্তানাবুদ করে দেবে বিপক্ষ বাহিনী।
এই পরিকল্পনা মতোই সরু পথ আগলে বসে আছেন শওকত জঙ্গের প্রবীণ সেনাপতি ওমর খাঁ ও কারগুজার খাঁ। হঠাৎ কাড়ানাকাড়ার শব্দ শুনে সচকিত হয়ে উঠলেন দুই প্রবীণ সেনাপতি। ছোটে নবাব হাজির হয়েছেন সমরক্ষেত্রে।
প্রমাদ গুনলেন দুজনে। যার হয়ে তাঁরা যুদ্ধে এসেছেন, স্বয়ং সেই ছোটে নবাবই সব ভণ্ডুল করে দেওয়ার জন্য একাই যথেষ্ট।
শওকত জঙ্গ কখনও তরবারি হাতে জঙ্গবাজির ময়দানে নামেননি, কিন্তু তার অহং বড় বেশি। তিনি মনে করেন যুদ্ধের সব কলাকৌশল তিনি সবার থেকে ভালো বোঝেন। যুদ্ধে রওনা হওয়ার আগে প্রবীণ সেনাপতিদের তিনি বলেছেন, ‘আমি পরে আসছি। এসে দেখব কেমন কৌশল তৈয়ার করেছেন আপনারা। কোনও বেতমিজি আমি বরদাস্ত করব না। লড়াইয়ের কায়দা সঠিক না হলে জুতা মারব সবকটাকে।’
কারগুজার খাঁ ও ওমর খাঁ সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন। ছোটে নবাব এখানে হাজির হয়ে আবার কী মূর্তি ধরবেন, কে জানে?
হাতির পিঠ থেকে নেমে এলেন শওকত জঙ্গ। ভাঙের নেশায় এখনও দুপা টলমল করছে। ওমর খাঁ ও কারগুজার খাঁকে ডেকে পাঠালেন তিনি। দুই প্রবীণ সেনাপতি এসে কুর্নিশ করলেন।
শওকত জঙ্গ গর্জন করে বলে উঠলেন, ‘কেমন লড়াই করছেন আপনারা? সব অলস বেতমিজের দল। হাত গুটিয়ে বসে আছেন?’
ওমর খাঁ সংকুচিত হয়ে বললেন, ‘সব ঠিক হ্যায় জনাব। আমরা পূর্ণিয়ায় ঢোকার পথ আটকে রেখেছি। সেই জন্য মোহনলাল আর এগোতে পারছেন না।’
ছোটে নবাব রেগে প্রায় হুংকার দিয়ে উঠলেন, ‘উজবুক কাহেকা।’
কারগুজার খাঁ মরিয়া হয়ে বললেন, ‘জনাব, এটা যুদ্ধের কৌশল।’
‘আমাকে বুদ্ধু সমঝেছেন আপনারা? জঙ্গবাজি আমি বুঝি না? আপনারা এগিয়ে গিয়ে হামলা করছেন না কেন?’
কারগুজার খাঁ বললেন, ‘সামনে কাদায় ভরা বিল। এগোতে গেলে আমরা বিপদে পড়ব। সহজেই শত্রুপক্ষ আমাদের সাবাড় করে দেবে।’
‘আমি যা বলছি তাই করুন। এগিয়ে গিয়ে হামলা করুন। আজই জঙ্গবাজির ফয়সালা চাই আমি। সব ডরপোকের দল। বুড়া গাধা কোথাকার। যান যান! এখনই সেনা নিয়ে সামনে এগোন।’
কারগুজার খাঁ ও ওমর খাঁ আর কথা বাড়ালেন না। ছোটে নবাবের কথামতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানটি ছেড়ে সেনাবাহিনীকে কাদা ভেঙে সামনে এগোনোর হুকুম দিলেন। এ যুদ্ধে যা আত্মহত্যার সামিল। ওদিকে নিশ্চিন্ত হয়ে নিজের তাঁবুতে ফিরে গেলেন শওকত জঙ্গ। যাক, এবারে তাহলে হামলা হবে।
মোহনলাল অবাক হয়ে দেখলেন, কাদা ভেঙে সামনে এগোচ্ছে শওকত জঙ্গের সৈন্যরা। সরু পথটা ছেড়ে দিয়ে কাজ সহজ করে দিয়েছে শত্রুপক্ষ। এবারে সহজেই পূর্ণিয়ায় প্রবেশ করা যাবে। গর্জে উঠল মোহনলালের কামান। সেই সঙ্গে আরও অজস্র কামান গর্জন করে উঠল। বিলের মাঝে কাদার মধ্যে বেকায়দায় পড়ে পোকামাকড়ের মতো মরতে লাগল শওকত জঙ্গের সৈন্যরা।
তাঁবুর ভিতরে বসে তখন ভাঙের শরবতে গলা ভেজাচ্ছেন শওকত জঙ্গ। ঝড় তুলছে সারেঙ্গিবাদক বসির খাঁ। তবলার বোল দোলা লাগাচ্ছে রক্তে। উড়ছে আবরোয়ানের ওড়না। রক্তলাল ইরানি গালিচার উপর পায়ের ছন্দে, ঘুঙুরের শব্দে তুফান তুলছে খুশবু বাই। গোলাপি ঘাগরার দুরন্ত ঘূর্ণি কামনার আগুনকে একটু একটু করে উসকে দিচ্ছে শওকত জঙ্গের বুকের মধ্যে। তারিফ জানাতে চেঁচিয়ে উঠছেন শওকত জঙ্গ, ‘বহুত আচ্ছা বিবিজান।’
ভয়ানক শব্দে কাছেই হঠাৎ আছড়ে পড়ল একটা কামানের গোলা। নাচ থেমে গেল খুশবুর। ত্রস্ত হয়ে উঠল বাদকের দল।
তাঁবুর ভিতর পাহারারত রক্ষীরাও শঙ্কিত হয়ে পড়ল।
শুধু ভাঙের নেশায় বেসামাল শওকত জঙ্গ বিচলিত হলেন না। শুধোলেন, ‘কেয়া হুয়া পিয়ারি? নাচ থামালে যে, তবিয়ত আচ্ছা নেহি?’
ভয় পাওয়া গলায় খুশবু বলল, ‘তোপের আওয়াজ, জনাব। তবে কি…!’
হেসে উঠলেন শওকত জঙ্গ। টলমলে পায়ে উঠে এসে খুশবুর চিবুক ধরে বললেন, ‘ডরো মাত পিয়ারি। জিত আমার হয়েছে। খুশিতে তোপ দাগছে আমার সেনারা। এখন থেকে তুমি তামাম বাংলার নবাব বেগম।’
আশেপাশে দাঁড়িয়ে আছে রক্ষীরা। সহবতের তোয়াক্কা না করে দুহাতে বুকের মধ্যে খুশবু বাইকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন শওকত জঙ্গ।
হঠাৎই ভগ্নদূতের মতো তাঁবুতে প্রবেশ করল কয়েকজন সেনানী।
ছোটে নবাবের বুক থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ছিটকে সরে গেল খুশবু বাই। শওকত জঙ্গের ক্রোধ আছড়ে পড়ল সেনানীদের উপর। ‘অন্দরমে আয়া ক্যায়সে? কিঁউ আয়া?’
একজন বলল, ‘ওমর খাঁ ও কারগুজার খাঁর এন্তেকাল হয়েছে। দ্রুত এগিয়ে আসছে মোহনলালের সেনা। জনাব পালিয়ে যান আপনি!’
পা টলমল করছে শওকত জঙ্গের। তাঁকে ধরে রেখেছে একজন রক্ষী। জড়ানো গলায় শওকত জঙ্গ বললেন, ‘জঙ্গবাজি বুড্ডা লোগোকা কাম নেহি।’ তারপর হেঁকে উঠলেন, ‘মেরা হাতি তৈয়ার হ্যায়?’
হাতির পিঠে চেপে মোহনলালের মোকাবিলা করতে ছুটলেন শওকত জঙ্গ। হাওদার উপর ঠিক হয়ে বসতে পারছেন না, নেশার ঘোরে মাথা ঢলে পড়ছে মাহুতের পিঠের উপরে। শিথিল হয়ে যাচ্ছে হাতের তরবারি। এরই মধ্যে তাল দেওয়ার ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলছেন, ‘বহুত আচ্ছা বিবিজান, বহুত আচ্ছা।’
খানিকটা উজ্জীবিত হল পূর্ণিয়ার সেনারা। যাই হোক, স্বয়ং ছোটে নবাব হাজির হয়েছেন জঙ্গবসজির ময়দানে। প্রবল উৎসাহে রে রে করে তারা এগিয়ে চলল। কিন্তু মোহনলালের বাহিনীকে তখন ঠেকানো প্রায় অসাধ্য। তাদের মনের তখন দারুণ জোশ। জিত হাসিল হল বলে।
শওকত জঙ্গকে খুব বেশিক্ষণ যুদ্ধের ঝক্কি পোয়াতে হয়নি। কামানের একটা গোলা উড়ে এসে লাগল তাঁর মাথায়। হাতির পিঠ থেকে নিথর দেহটা ছিটকে পড়ল মাটিতে। পূর্ণিয়ার যুদ্ধের ফয়সালা হয়ে গেল। মসনদের অধিকার কার, সে প্রশ্নেরও নিষ্পত্তি হল।
খুশবু বাই আগেই আঁচ করেছিল যুদ্ধের কী পরিণতি হতে চলেছে। শওকত জঙ্গ হাতির পিঠে চেপে ময়দানের দিকে রওনা হতেই একজন দেহরক্ষী ও সারেঙ্গিবাদক বসির খাঁকে সঙ্গে নিয়ে সৈন্য শিবির থেকে সরে পড়ল খুশবু।
বজরা দাঁড়িয়ে ছিল গঙ্গার ঘাটে। বসির খাঁ ও খুশবু বজরায় উঠতেই কাছি খুলে সবেগে দাঁড় টানতে লাগল বহরদারেরা।
গঙ্গা বেয়ে উত্তর মুখে এগিয়ে চলল বজরা। কক্ষের দ্বার বন্ধ করে সোনার সুতোর ফুল আঁকা কালো চাঁদরের আড়াল থেকে গয়নার বাক্সটা বের করল খুশবু। ডালা খুলতেই রেড়ির তেলের আলোয় ঝলমল করে উঠল হিরে, পান্না, চুনি।
বসির বলল, ‘আর আমাদের ভাগ্যের খোঁজে ঘুরতে হবে না খুশবু। এবারে আমরা ঘর বাঁধতে পারব।’ বসিরের বুকে মাথা রেখে কান্নায় ভেঙে পড়ল খুশবু বাই।
