1 of 2

ফলতা থেকে পলাশি – ৩২

৩২

ফৌজ নিয়ে ত্রিবেণী পৌঁছে গেলেন নবাব সিরাজদ্দৌলা।

নগরীর বাইরে গঙ্গাতীরের উন্মুক্ত চরের উপর নবাবের তাঁবু পড়ল। বিশ খুঁটির তাঁবু। ভিতরে অনেকগুলি কক্ষ। কাঠের দেওয়ালওয়ালা কক্ষগুলিকে ঘিরে চারিদিকে রয়েছে চিলমন ঘেরা চওড়া অলিন্দ। মাথার উপর মসলিনের শাদা চাঁদোয়ার গায়ে সোনার সুতোর কারুকার্য করা। একই ছাতের নীচে রয়েছে দরবার ঘর, খাসমহল, জেনানামহল, মজলিস ঘর—সব কিছু। ঠিক যেন ছোটখাটো একটা প্রাসাদ।

নবাবের তাঁবুকে ঘিরে আরও অসংখ্য তাঁবু অর্ধবৃত্তাকারে কয়েক ক্রোশ জুড়ে বিস্তৃত। পদমর্যাদা অনুযায়ী আকারে বড়-ছোট এই তাঁবুগুলো ওমরাহ, মনসবদার, ঘোড়সওয়ার আহেদী, পদাতিক, বন্দুকচি, ধানুকি, বেলদার, গোলাম, দাখিলা, আবদার, খানসামা বাঁদি— এদের থাকার জায়গা।

সেই সঙ্গে রয়েছে অস্থায়ী আবদারখানা, দস্তরখানা, খাজাঞ্চিখানা, তোপখানা, বারুদঘর। ঘোড়া, উট, হাতি, বলদের ছাউনি। নবাবের কাফেলা মানেই মানুষ ও জানোয়ারের বিশাল এক সমারোহ। বিরাট এক হুজ্জুতি। নবাব সচল হলে মসনদসহ একখণ্ড রাজধানী তাঁর সঙ্গে চলতে থাকে।

গঙ্গা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তৈরি হওয়া অগভীর এক বাওড়ের জলে হাতিগুলোকে নামিয়ে গায়ের ধুলোবালি ধুইয়ে দিচ্ছে মেঠ ও ভৈয়ের দল। লম্বা পথ ভেঙে এসেও বেহেদর জাতের এই হাতিগুলোর ক্লান্তি নেই। জলে নেমে শুঁড় দিয়ে জল ছিটিয়ে একে অপরকে ভিজিয়ে দামালপনা করে চলেছে।

হাঁটু-জলে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে জল খাচ্ছে ক্লান্ত ঘোড়ার দল। মাঝে মাঝে তারা ল্যাজের ছিপটি মেরে দাবনায় বসা পোকা তাড়াচ্ছে। চামড়ার পাত্রে বাওড়ের জল তুলে তাদের গা ধুইয়ে দিচ্ছে সহিসরা। পথের ধুলো মেখে ধুসর হয়ে যাওয়া তাগড়াই ইরানি ঘোড়াগুলোর গা ফের দুধের মতো সফেদ হয়ে উঠছে। শাদা চকচকে চামড়ায় পড়ে পিছলে যাচ্ছে মরা বিকেলের তেজহীন আলো।

তোপের গাড়ি টেনে পরেশান বিরাট চেহারার বলদগুলো বাওড়ের পাড়ে দাঁড়িয়ে মস্ত মস্ত মাটির জালায় মুখ ঢুকিয়ে গমের ভুষি ও খোল সাবাড় করে চলেছে। একদল গোলাম সদ্য কেটে আনা কলাগাছ, জংলা ঘাস, খড়-বিচুলি মজুত করছে এক জায়গায়। গা ধুয়ে উঠে এসে হাতি ও ঘোড়াগুলো খাবে।

কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে সেনাছাউনির কোলাহল। সে কোলাহলের শব্দ ছড়িয়ে পড়ছে অনেক দূর পর্যন্ত। হাজার হাজার মানুষ ও জানোয়ারের কলকলানির বিচিত্র ঐকতান।

পদাতিক, ধানুকি, বন্দুকচিরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে মাটির উনুন তুলে রাতের খানা পাকানোর উদ্যোগ করছে। আহার এদের সামান্যই। কয়েকখানা মোটা রুটি বা সস্তা চালের ভাত, সঙ্গে ঘর থেকে সঙ্গে নিয়ে আসা একটু নুন ও আচার বা তোলা উনুনে রাঁধা কোনও একটা আনাজ।

উনুন তোলার জায়গার দখল নিয়ে দুই দলে বচসা বেঁধেছে। হররোজই এমন হয়ে থাকে। বচসা থেকে কখনও কখনও হাতাহাতিও বেঁধে যায়। বেশিরভাগ সময় নিজেরাই মিটমাট করে নেয়। হইহল্লা, কাজিয়া বাড়াবাড়ি রকমের হয়ে গেলে মনসবদার তার খাস বাহিনী নিয়ে ঘোড়া দাবড়ে ছুটে আসে। কোড়া হাঁকড়ে সামাল দেয়।

নবাবের বাহিনীতে নানা জায়গার, নানা জাতের পদাতিক সেপাই আছে। এদের বেশির ভাগই সেনাদলে নাম লিখিয়েছে পেটের টানে। তালিম পাওয়া সেপাই এরা নয়। অনেকে হাতিয়ারটাও ঠিক করে ধরতে জানে না। অথচ এই আনপঢ় সেপাইরা থাকে সেনাবাহিনীর একেবারে সামনে। বিপক্ষের গোলার ঝাঁঝ প্রথম এদের উপরেই এসে পড়ে।

গোলা ফাটতে শুরু করলেই আনাড়ি সেপাইরা লড়াই ফেলে প্রাণভয়ে ছুটতে থাকে। কেউ পালিয়ে বেঁচে যায়। পালাতে গিয়ে কেউ ধরা পড়ে। কয়েদ হয়। কেউ বা গোলার আঘাতে বিকৃত লাশ হয়ে যায়। সে খবর তার ঘরে পৌঁছয় না। নিশুত রাতে জোছনা ভেজা ঘরের দাওয়ায় বসে আঁধার পথের দিকে অধীর আগ্রহে চেয়ে থাকে নিহত সেপাইয়ের বিবি। আশায় বুক বাঁধে—এখনই হয়তো তার মরদ ফিরে আসবে।

বিপজ্জনক ভাবে বেঁচে থাকা—তবুও সামান্য কড়ি ছড়ালেই ফৌজে নাম লেখানোর জন্য গাদা গাদা বেহুদা ইনসান মেলে এদেশে। পেটের খিদে বড় দায়। তার জন্যই জান কবুলের কসম খেয়ে ফৌজের নোকরি। এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়ানো।

কখনও কখনও সেপাইদের একটানা কুচ করতে হয়। বিশ্রাম মেলে না। পিঠে বাঁধা পুটুলিতে থাকে শুকনো চানা বা মুড়ি। তাই চিবোতে চিবোতে এরা পথ ভাঙে। যখন তাঁবু পড়ে তখন খানা পাকানোর ফুরসত মেলে। রাতের আহার সেরে আগুনের চারপাশে গোল হয়ে বসে সুখ-দুঃখের গল্পগাছা করে এই সেপাইরা। বিবি-বাচ্চার কথা ভাবে। ঘরের কথা চিন্তা করে। সস্তা দিশি মদ খায়। হাততালি দিয়ে, বর্তন বাজিয়ে দেশোয়ালি গান গায়। ধারেকাছে সস্তাদরের স্বৈরিণীর খোঁজ মিললে কেউ কেউ শরীরের আরাম কিনতে ছোটে।

এইরকম গাদা গাদা বেনসিব ইনসান জীবন বাজি রেখে রুটিরুজির খোঁজে জঙ্গবাজির ময়দানে ময়দানে লড়াই করে। কোনও শাহজাদা, বাদশা বা নবাবের জিন্দেগি রওশন করতে গিয়ে নিজেরা বরবাদ হয়ে যায়। এই দুনিয়ার সব শাহির ক্ষেত্রে এই একই নিয়ম।

গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতী এই তিন নদী হুগলির ত্রিবেণী থেকে তিন দিকে চলে গিয়েছে। তাই ত্রিবেণী ‘মুক্তবেণী’। হিন্দু শাস্ত্র মতে ত্রিবেণীতে স্নান পরম পুণ্যের। আজ মকর সংক্রান্তি। ত্রিবেণীতে গঙ্গা স্নানে এসেছে হাজার হাজার পুণ্যার্থী। গঙ্গার ঘাটে বাঁধা রয়েছে সারি সারি নৌকো। মেলা বসেছে মুকুন্দদেবের ঘাটে। বহু সোপান বিশিষ্ট এরকম ঘাট কাশী ছাড়া আর কোথাও নেই।

বাংলায় তখন পাঠান শাসক সোলেমান করণানীর শাসনকাল। সম্রাট আকবরের মদতে ১৫৬৫ সালে বাংলা আক্রমণ করেন ওড়িশার স্বাধীন হিন্দু রাজা হরিচরণ মুকুন্দদেব। পাঠানদের হটিয়ে তিনি হুগলির সপ্তগ্রাম পর্যন্ত নিজের শাসন প্রতিষ্ঠা করলেন। বঙ্গবিজয়ের স্মারক হিসেবে ত্রিবেণীতে একটি ঘাট তিনি নির্মাণ করেছিলেন। সেই ঘাটই মুকুন্দদেবের ঘাট নামে পরিচিত।

জগৎশেঠের পালকি এসে থামল মুকুন্দদেবের ঘাটে। ত্রিবেণী পৌঁছেই গঙ্গাস্নানে এসেছেন জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ। ত্রিবেণীস্নান মানুষের অন্তরের নিদ্রিতা শক্তি কুন্ডলিনীকে জাগ্রত করে। সুপ্ত শক্তি জাগ্রত হলে মনস্কামনা পূর্ণ হয়। অপার্থিব শান্তি লাভ করা যায়।

পুণ্যস্নান সেরে ঘাটে দাঁড়িয়ে সারা গা চন্দনে চর্চিত করলেন জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ। নতুন বস্ত্র পরিধান করে দামি কাশ্মীরি শাল উড়নির মতো জড়িয়ে নিলেন গায়ে। তারপর একহাতে সোনার প্রদীপগাছ নিয়ে আরেক হাতে চামর দুলিয়ে গঙ্গাআরতি করলেন। একশো আট দীপবর্তিকা ভাসিয়ে দিলেন নদীর জলে।

জগৎশেঠের সঙ্গে আসা গোলাম, দাখিলা, সেপাইদের বিরাট দল ও পুজোর ঘটা দেখে মিশকিনরা বুঝল, কেউকেটা কেউ এসেছেন গঙ্গাস্নানে। খয়রাতির আশায় শেঠজির চারপাশে বিরাট ভিড়। স্নান সেরে নিজের তাঁবুর দিকে এগিয়ে চললেন জগৎশেঠ। তাঁর এক গোলাম খেরিয়ার মুখ খুলে ঝরনার মতো সোপানের ধাপে ধাপে রুপোর টাকা ছড়াতে ছড়াতে চলল।

হঠাৎ শেঠজির কানে ভেসে এল পুরুষ কণ্ঠের গান। দরাজ ও সুরেলা গলায় ধারে কাছেই কেউ গাইছে। সে সুরে ভক্তির প্লাবন—

‘মন তোর এত ভাবনা কেনে।

একবার কালী বলে বসরে ধ্যানে।।

জাঁকজমকে করলে পূজা,

অহঙ্কার হয় মনে মনে।

তুমি লুকিয়ে তারে করবে পূজা,

 জানবে না রে জগজ্জনে।’

ক্ষণেকের জন্য থমকে দাড়ালেন জগৎশেঠ। তারপরে ফের হেঁটে চললেন সেনাছাউনির দিকে।

হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির মিলনক্ষেত্র ত্রিবেণী। মুকুন্দদেবের ঘাটের অদূরে রয়েছে পাঁচ গম্বুজ বিশিষ্ট এক মসজিদ। চতুর্দশ শতকের শুরুতে সপ্তগ্রামের শাসক ছিলেন জাফর খাঁ। মন্দির ভেঙে এই মসজিদ তিনি তৈরি করেন। এই মসজিদের পূর্বদিকে গঙ্গাতীরে রয়েছে জাফর খাঁ ও তাঁর পুত্রদের সমাধিকে ঘিরে এক সৌধ। লোকে বলে জাফর খাঁ গাজীর দরগা। জাফর খাঁর এক পুত্রবধূ ছিলেন হিন্দু। তার সমাধিও রয়েছে এখানে। এই দরগা তিনদিকে বড় বড় গাছপালা দিয়ে ঘেরা। গঙ্গার দিকটা উন্মুক্ত।

সন্ধে থেকেই দরগা চত্বরে চরম ব্যস্ততা। বাতিকরের দল মশালের আলোয় চারিদিক আলোকিত করে তুলেছে। জাফর খাঁ ও তাঁর পুত্রদের সমাধি বেদির চারপাশ দিয়ে একের পর এক মৃৎচিরাগ বসিয়ে চলেছে একদল মোয়াজ্জিন। তদারক করছেন একজন ইমাম।

খবর হয়েছে—নবাব সিরাজদ্দৌলা এখানে আসবেন। চিরাগ জ্বালাবেন জাফর খাঁ গাজীর দরগায়। ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাফল্য কামনায় ইবাদত করবেন। বহু সাধারণ মানুষ ভিড় জমিয়েছে দরগার সামনে। বাংলার নবাবকে কেমন দেখতে তারা জানে না। নবাব দর্শনের আশায় সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। চাবুক হাঁকিয়ে এদের নিয়ন্ত্রণে রাখছে ফৌজদারের বরকন্দাজরা।

খানিকবাদে শোনা গেল কাড়া নাকাড়ার জোরদার আওয়াজ। সামনে আলো দেখিয়ে ছুটে আসছে মশালচির দল। তাদের পিছনে বাজনদারেরা। তার পিছনে ধীর গতিতে এগিয়ে আসছে আটজন ঘোড়সওয়ার। এরা নবাবের খাস রিসালার সৈনিক। এদের পিছনে আসছে নবাবের আট বেহারার তাঞ্জাম। নবাবের পিছনে চিক দিয়ে ঘেরা ডুলিতে লুৎফুন্নেসা বেগম। একেবারে পিছনে ঘোড়ার পিঠে হুগলির ফৌজদার নন্দকুমার।

নবাবের দর্শন পাওয়ার আশায় দাঁড়িয়ে থাকা আমজনতা হতাশ হল। নবাবের তাঞ্জাম ও বেগমের ডুলি সিধা ঢুকে গেল দরগার চৌহদ্দির মধ্যে। নবাব-বেগমের দর্শন পেল না কেউই।

জাফর খাঁর কবরের পাশে হাঁটু মুড়ে বসলেন সিরাজদ্দৌলা। ধূপ জ্বালালেন। সোনার সুতো দিয়ে লতাপাতা আঁকা মসলিনের চাঁদর চড়ালেন দরগায়। দামি আতর ঢেলে দিলেন। ইবাদত করলেন। সিরাজের কল্যাণ কামনা করে সিরনি চড়ানোর মানত করলেন লুৎফুন্নেসা। তারপরে নবাব ও বেগম একসঙ্গে চিরাগগুলো জ্বেলে দিলেন।

ফেরার পথে আমজনতার ইচ্ছেপূরণ করে তাদের দর্শন দিলেন নবাব।

সৌম্যকান্তি নবাবকে দেখে আনন্দে উদ্বেল হয়ে পড়ল সকলে। হইহই করে উঠে নবাবের নামে তারা জয়ধ্বনি দিল। বেশিরভাগই দুবেলা ভালো করে খেতে না পাওয়া হাড় জিরজিরে মানুষ। এদের কাছে নবাব এক রূপকথার দুনিয়ার ইনসান। আসমানের তারা। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যাদের দিন গুজরান করতে হয়, নবাব তাদের কাছে এক অলীক স্বপ্নের মতো। আচমকা এভাবে নবাবের দর্শন পাওয়া আমআদমির কাছে এক খুশির খোয়াব। খুশিতে ও উচ্ছ্বাসে সকলের তাই প্রায় বেহুশ হয়ে যাওয়ার জোগাড়।

মিশকিনদের মধ্যে অঢেল খুরমা ও মিছরি বিতরণ করলেন সিরাজদ্দৌলা। খেরিয়ার বাঁধন খুলে ছড়ালেন সিক্কা টাকা, আসরফি। তারপরে তাঞ্জামে চড়ে বসলেন। গঙ্গার পাড় ধরে ফিরে চলল নবাবের বাহিনী। মুকুন্দদেবের ঘাটের কাছে এসে তাঞ্জাম থামাতে বললেন নবাব।

অদূরে বড় একটা অশ্বত্থ গাছের নীচে জ্বলছে বেশ কয়েকটা মশাল। গাছের নীচে উঁচু মাটির চাতালের উপর বসে গান গাইছে সুদর্শন চেহারার এক তরুণ। এরই গান শুনে ক্ষণেকের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ। দরাজ গলা। মিঠে সুর। গৌরবর্ণ দিব্যকান্তি চেহারা গায়কের। মাথায় ঠাসা বাবরি চুল। মুখে ঘন দাড়ি। পরনে রক্তাম্বর পোশাক। গলায় স্ফটিক মেশানো রুদ্রাক্ষের মালা। চোখ দুটি বোজা। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুধারা। তার পাশে ভিড় জমিয়েছে বেশ কিছু ভক্ত মানুষ। আত্মসমাহিত সেই তরুণ গেয়ে চলেছেন –

‘আয় মন, বেড়াতে যাবি।

কালীকল্পতরুতলে চারিফল কুড়ায়ে পাবি।।

প্রবৃত্তি নিবৃত্তি জায়া, নিবৃত্তিরে সঙ্গে লবি।

ওরে বিবেক নামে জ্যেষ্ঠ পুত্র, তত্ত্বকথা তায় শুধাবি।।’

গানের সুরে ও কথায় এমন এক মাদকতা যে সিরাজদ্দৌলা মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগিয়ে গেলেন সেই অশ্বত্থ গাছের তলায় বসে গাইতে থাকা সেই আত্মসমাহিত তরুণের দিকে।

চারিদিকে সহসা গুঞ্জন উঠল, নবাব! নবাব!

নবাবের পিছনে এগিয়ে আসছে আটজন হাতিয়ারবন্ধ আহেদি। গান শুনতে যে ভক্তের দল ভিড় করেছিল, ভয়ে ছুটে পালাল। গায়কের কোনও হুঁশ নেই। যেন ভাবসমাধি হয়েছে।

সিরাজদ্দৌলা সেই তরুণ গায়কের সামনে হাঁটু মুড়ে বসলেন। ফৌজদার নন্দকুমার অবাক হয়ে দেখলেন, নবাবের দু-চোখে জলের ধারা।

নন্দকুমার চেনেন এই গায়ককে। নিবাস কুমারহট্ট। মাঝেমাঝেই নৌকো বেয়ে ত্রিবেণীর ঘাটে এসে আপনমনে একের পর এক গান গেয়ে যান এই তরুণ। কেউ বলে পাগল। কেউ বলে সাধক।

‘ওরে বিবেক নামে জ্যেষ্ঠপুত্র, তত্ত্বকথা তায় শুধা।।

অহঙ্কারে অবিদ্যা তোর পিতামাতায় তাড়িয়ে দিবি।

যদি মোহ গর্তে টেনে লয় ধৈর্য খোটা ধরে রবি।।

আয় মন, বেড়াতে যাবি।’

গান শেষ করে চোখ খুলে নবাব সিরাজদ্দৌলাকে দেখে চমকে উঠলেন গায়ক। সামনে সুন্দরকান্তি এক পুরুষ। পরনে দামি ঝলমলে পোশাক। উষ্ণীষে ও গলায় শোভা পাচ্ছে মুক্তোর মালা। সঙ্গে রয়েছে দেহরক্ষীর দল। বাংলার নবাবকে আগে কখনও দেখেননি এই তরুণ গায়ক। পোশাক-আশাক সেপাই-আহেদি দেখে তিনি ভাবলেন, এই সুপুরুষ যুবক এই নিশ্চয়ই বড় কোনও রাজপুরুষ হবেন।

সিরাজদ্দৌলা বললেন, ‘বহুত আচ্ছা! আমি আপনার ভাষা বুঝি না। লেকিন জাদু আছে আপনার সুরে।’

গায়ক বিস্মিত গলায় প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি?’

‘নবাব সিরাজদ্দৌলা।’

চমকে উঠলেন গায়ক। মুহূর্তের মধ্যে উঠে দাঁড়িয়ে তসলিম জানালেন নবাবকে। বিস্মিত গলায় বললেন, আপনি নবাব সিরাজদ্দৌলা?

নবাব প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার পরিচয়?’

‘হুজুর, আমার নাম রামপ্রসাদ সেন। নিবাস কুমারহট্ট।’

পাশ থেকে নন্দকুমার বললেন, ‘ইনি মস্ত সাধক জাঁহাপনা। লোকে বলে সাধক রামপ্রসাদ।’

‘সাধক বললে অহঙ্কারের প্রকাশ হয়। আমি মা ব্রহ্মময়ীর দাস।’

নিজের অনামিকা থেকে হিরের আংটি খুলে নিয়ে সিরাজদ্দৌলা বললেন, ‘এটা আপনার মবারকে নবাবের নজরানা।’

হাতজোড় করে রামপ্রসাদ বললেন, ‘মাফ করবেন হুজুর। জগজ্জননী ব্রহ্মময়ী মা কালীর চরণকমলে ঠাঁই নিয়েছি আমি। কাঞ্চনে আমার প্রয়োজন নেই।’

অপ্রতিভ হয়ে বাড়িয়ে দেওয়া হাত ফিরিয়ে নিয়ে সিরাজদ্দৌলা বললেন, ‘আমি কলকাতায় চলেছি ইংরেজদের শায়েস্তা করতে। হুগলির কী হাল করেছে টোপিওয়ালা ইংরেজরা—আপনি জানেন নিশ্চয়ই।’

‘জানি।’

‘আপনি রেহমত করুন, যেন আমি জঙ্গবাজির ময়দান থেকে কামেয়াব হয়ে ফিরি।’

‘আমি এক মামুলি ইনসান। বিধিলিপি লেখেন মা ব্রহ্মময়ী। মা যা চাইবেন তাই হবে।’

‘তবে আমার হয়ে ইবাদত করুন আপনার মায়ের কাছে।’

মাথা ঝুঁকিয়ে রামপ্রসাদ বললেন, ‘নিশ্চয়ই করব হুজুর।’

নবাব এবারে আবদার করলেন, ‘আর একটা গান শোনান।’

রামপ্রসাদ উৎসাহিত হয়ে বললেন, ‘আমি ফারসি জানি হুজুর। অনুমতি করেন তো একটা গজল গেয়ে শোনাই। আপনার ভালো লাগবে।’

গজল ধরলেন রামপ্রসাদ। অনবদ্য গায়কি। নিখুঁত ফারসি উচ্চারণ। কিন্তু নবাবের মন ভরল না। কীসের যেন অভাব। মাঝপথে রামপ্রসাদের গান থামিয়ে দিয়ে নবাব বললেন, ‘এ গান নয়। আপনার নিজের গান শোনান।’

চোখ বুজে রামপ্রসাদ এবারে গান ধরলেন –

‘ভেবে দ্যাখ মন কেউ কারও নয়, মিছে ভ্রম ভূমণ্ডলে।

ভুল না দক্ষিণাকালী, বদ্ধ হয়ে মায়াজালে।।

দিন দুই তিনের জন্য ভবে, কর্তা বলে সবাই মানে,

সেই কর্তারে দিবে ফেলে, কালাকালের কর্তা এলে।।’

নবাব থেমেছেন। তাই দাঁড়িয়ে পড়েছে সঙ্গে থাকা গোটা বাহিনী। বাহকরা বেগমসাহেবার ডুলি একটা ঝাঁকড়া শিমুলগাছের নীচে নামিয়ে রেখে দুদণ্ড জিরিয়ে নিচ্ছে। চিকের আড়াল থেকে গায়ক রামপ্রসাদকে দেখছিল লুৎফা। কী অনিন্দ্যকান্তি চেহারা! ঠিক যেন ঈশ্বরের দূত। লুৎফার মন ভক্তিতে পূর্ণ হয়ে ওঠে। চিকের আড়াল থেকেই সে প্রণতি নিবেদন করে এই সাধকপুরুষের উদ্দেশে। কলকাতা অভিযানের পথে এই সাধক পুরুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ অবশ্যই এক শুভ সংকেত। সিরাজ নিশ্চয়ই বিজয়ী হয়ে ফিরবে। লুৎফার মন আনন্দে ভরে ওঠে সহসা।

বেগম সাহেবার পালকিকে ঘিরে খয়রাতির আশায় খানিকটা দূরে জড়ো হয়েছে বেশ কয়েকজন ভিখারি ও ভিখারিনী। মলিন তাদের বেশবাস। এই কড়া শীতেও তাদের গায়ে গরম কাপড় নেই। হঠাৎ লুৎফুন্নেসার চোখ আটকে যায় একটি যুবতী মেয়ের উপর। ভিক্ষের থালি হাতে মলিন মুখে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে জীর্ণ ঘাগরা ও কুর্তি। গায়ের রং ঈষৎ চাপা। কাটাকাটা চোখমুখ নজর টানে।

লুৎফার নজরে পড়ল তাঁর পাহারায় থাকা কয়েকজন বরকন্দাজ চোখ দিয়ে গিলছে মেয়েটিকে। এই পাইক-বরকন্দাজদের ভালো করেই জানে লুৎফা। আজ রাতেই হয়তো এই ভিখারিনী এদের পাশবিক লালসার শিকার হবে।

লুৎফা নবাবের মাশুকা। তামাম বাংলা জুড়ে সে নবাববেগমের মর্যাদা পায়। অনেক ক্ষেত্রে তাঁর ইচ্ছাই হুকুমত। দুনিয়াদারের খায়েশে সে আজ এক খুশনসিব আওরাত। সে কি বাঁদি হিসেবে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে বাঁচাতে পারে না বেনসিব, বেসাহারা এই জেনানাকে? আলিবর্দির খানদানে জারিয়া হিসেবে ঠাঁই না পেলে তাঁকেও হয়তো আজ এই মিশকিন মেয়েটির মতো বেইজ্জত হয়ে কোনও নগরের পথে পথে ঘুরে বেড়াতে হতো।

চিকের আড়াল সরিয়ে একজন বাঁদিকে ডেকে হুকুম করল লুৎফা, ‘ওই মেয়েটাকে ডাক তো।’

খানিকবাদে ভীরু পায়ে এগিয়ে আসে মেয়েটি। বেগম সাহেবার উদ্দেশে কুর্নিশ করে।

লুৎফা শুধোয়, ‘ঘর কোথায় তোমার?’

‘ঘর নেই।’

‘বাপ-মা—মরদ?’

ক্লান্ত গলায় মেয়েটি বলে, ‘কেউ নেই।’

‘থাক কোথায়?’

‘ত্রিবেণীর ঘাটে। খোলা আসমানের নীচে।’

‘এখানে দাঁড়িয়ে আছ যে?’

‘খয়রাতির আশায়। ভিক্ষে করে খাই।’

মেয়েটির কথা শুনে চোখে জল এসে যায় লুৎফার। কথা হারিয়ে যায়।

দুচোখে উৎসাহ ঢেলে মেয়েটি শুধোয়, ‘আপনি লুৎফা বেগম?’

‘হ্যাঁ। তোমার নাম?’

‘হিরেমন।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *