৩১
ভোরের আলো সবে ফুটছে। ঘন কুয়াশার আবরণ ভেদ করে বাঁকিপুরের দিক থেকে চিৎপুর যাওয়ার সড়ক ধরে সুতানুটির অভিমুখে ছুটে চলেছে আট বেহারার একটা ঝালরদার পালকি। পালকির সামনে কাহারদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছুটছে একজন বান্দা। তার হাতে নিজামতের নিশান। এই পালকির গন্তব্য হালসিবাগান। মুর্শিদাবাদের কাজ সেরে মাস তিনেক পরে কলকাতায় ফিরছেন বণিক চূড়োমণি উমিচাঁদ।
কলকাতা যুদ্ধের আগে নবাবের ধারণা হয়েছিল উমিচাঁদ ইংরেজদের পক্ষে। উমিচাঁদের জন্য তা হয়ে দাঁড়িয়েছিল এক বিষম অস্বস্তির ব্যাপার। নবাবের রোষে পড়লে কারবার শেষ। ইংরেজ কোম্পানির হালত দেখে একথা তিনি হাড়ে হাড়ে বুঝেছেন। এখন নবাব তাঁর সম্বন্ধে কী ভাবছেন তা যাচাই করতে উমিচাঁদ ছুটলেন মুর্শিদাবাদে। নবাবের সঙ্গে একান্তে সাক্ষাৎ করতে চাইলেন। কয়েক’দিন পর সুযোগ মিলল।
বিদ্রুপের সুরে নবাব শুধোলেন, ‘ফলতার আখবরাত কী আছে?’
‘আমি কোত্থেকে জানব হুজুর?’
‘জানেন না? ওই টোপিওয়ালারা সঙ্গে তো আপনার বহুত দিনের দোস্তি?’
এই যাচ ইমতেহানিতে উমিচাঁদের বুক কেঁপে উঠল। মনের ভাব লুকিয়ে রেখে যতটা সম্ভব মাথা ঝুঁকিয়ে উমিচাঁদ বললেন, ‘যারা হুজুরের দুশমন, তারা আমার দোস্ত হতে পারে না।’
‘শুনতে পাই আলিনগরের কেউ কেউ টোপিওয়ালাদের মদত দেওয়ার কোশিস করছে। আপনিও কি সেই দলে?’
এই প্রশ্ন আচমকা কামানের গোলার মতো উড়ে এল উমিচাঁদের দিকে। বিনয়ে আরও গলে পড়ে তিনি জবাব দিলেন, ‘হুজুর আমি সওদা করে খাই। আমি বুঝদার আদমি, বেওকুফ নই। যাদের শায়েস্তা করতে হুজুরের একপাটি পায়জোরই কাফি, তাদের মদত দিতে গিয়ে আমি খামাখা নিজের তকলিফ বাড়াব কেন?’
আত্মতৃপ্তিতে হেসে উঠে সিরাজদ্দৌলা বললেন,’সাবাস! ইয়ে সচ বাত—ওই টোপিওয়ালাদের জন্য আমার একপাটি পায়জোরই কাফি।’
নবাবের হালকা মেজাজ দেখে উমিচাঁদ এবার বেশ নাটকীয় ঢঙে বললেন, ‘ইংরেজরা আমায় বহুত পরেশান করেছে হুজুর। আমার হাভেলি লুঠ করেছে, আলিনগরের লড়াইয়ের সময় আমাকে কয়েদ করেছিল কিল্লায়। যারা আমার সঙ্গে এতনা দুশমনি করল তাদের আমি মদত দেব? হুজুর আমি আপনার গোলাম। আমাকে আপনি বিশ জুতা মারুন, সেও ভি আচ্ছা। লেকিন ভুল বুঝবেন না।’
ধূর্ত বেনিয়ার কথাবার্তার চতুর মারপ্যাঁচে নরম হয়ে পড়লেন নবাব। উমিচাঁদের হাতে ধরা লাল তাফেতায় মোড়া জিনিসটা দেখে শুধোলেন, ‘হাতে কী? কিতাব?’
এই প্রশ্নে খুশি হলেন উমিচাঁদ। মুখোমুখি হতেই গোলার মতো ধেয়ে আসা নবাবের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তিনি নজরানা পেশ করার ফুরসত পাননি।
উমিচাঁদ বললেন, ‘হুজুরের মবারকে ভেট এনেছে বান্দা।’ এই বলে লাল তাফেতা সরিয়ে হাতে ধরা মেহগিনি কাঠের উপর সুন্দর কারুকাজ করা একটা বাক্স নবাবের সামনে পেশ করে ফের তসলিম জানালেন উমিচাঁদ।
বাক্সটা খুলে অবাক হলেন সিরাজদ্দৌলা। ভিতরে রয়েছে পিতলের নকশাদার একটা চাবি। ইঞ্চি ছয়েক লম্বা।
নবাব ঠাট্টার মেজাজে শুধোলেন, ‘এ তো শুধু চাবি। লেকিন খজানে কি মেজ কাঁহা?’
উমিচাঁদ বিগলিত হয়ে বললেন, ‘এটা চাবি নয় হুজুর পিস্তল।’
চমকে উঠলেন সিরাজদ্দৌলা, ‘অ্যাঁ?’
জিনিসটা এবারে ভালো করে নেড়েচেড়ে দেখে সিরাজদ্দৌলা বুঝলেন সত্যিই জিনিসটা আসলে চাবির মতো দেখতে একটা পিস্তল। ভারী শৌখিন জিনিস। ‘বহুত আচ্ছা। কোথায় পেলেন এ চিজ?’
নবাবের মুখে হাসি ফুটল।
‘ফরাসি দেশের জিনিস। হুজুরের জন্য অনেক মেহনত করে জোগাড় করেছি।’ বললেন উমিচাঁদ।
কীরকম নজরানা পেলে নবাব-বাদশারা খুশি হন—এ বিষয়ে উমিচাঁদের ব্যুৎপত্তি অসামান্য। অনেক দামি জিনিসের চেয়ে মামুলি ছোটোখাট জিনিসে কাজ দেয় বেশি। একথা উমিচাঁদের চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। নবাব আলিবর্দি খাঁকে একবার লোমশ শাদা ফটফটে একজোড়া কাবলি বেড়াল তোফা দিয়ে উমিচাঁদ সোরার একচেটিয়া কারবারের পরোয়ানা নিজের নামে আদায় করে নিয়েছিলেন।
‘পিস্তলে গোলি ভরা আছে?’ নবাব শুধোলেন।
‘জি হুজুর।’
‘পিস্তলটা হঠাৎ উমিচাঁদের দিকে তাক করে ট্রিগারে হাত রাখলেন সিরাজদ্দৌলা।’
উমিচাঁদ আঁতকে উঠলেন। ‘হেই ব্বাপ!’
বন্দুকটা নামিয়ে রেখে হো হো করে হেসে উঠলেন সিরাজদ্দৌলা। তারপর বললেন, ‘উমিচাঁদজি আজ থেকে আপনি আমার দোস্ত।’
‘হুজুর বহুত মেহেরবান। আমি আপনার গোলাম।’
উমিচাঁদের উপর থেকে নবাবের সব সন্দেহ দূর হয়ে গেল। কে দোস্ত আর কে দুশমন তার যাচ ইমতেহানি করতে গিয়ে মানুষকে তলিয়ে দেখার মতো ধৈর্য সিরাজদ্দৌলার নেই। খুব দ্রুত তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছে যান। যাকে পছন্দ করেন, আবেগের বশে তাকে একেবারে আঁকড়ে ধরতে পছন্দ করেন নবাব।
‘আমি পূর্ণিয়া যাচ্ছি উমিচাঁদজি। আমার সঙ্গে চলুন।’ আবদারের সুরে বললেন নবাব।
উমিচাঁদ মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, ‘এ তো আমার কাছে বহুত খুশনসিব কি বাত!’
পূর্ণিয়া যাওয়ার পথে একান্ত আলাপচারিতায় নবাবের সঙ্গে সম্পর্কটা আরও ভালো করে ঝালিয়ে নিলেন উমিচাঁদ। তিনি যা চেয়েছিলেন, তাই হল। নবাব মনে করলেন, উমিচাঁদ তাঁর পরম শুভানুধ্যায়ী।
পূর্ণিয়া থেকে মুর্শিদাবাদে ফিরেই লুৎফা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে কয়েকদিনের জন্যে ছুটি কাটাতে নবাব গেলেন পলাশির শিকারবাড়িতে। উমিচাঁদ তখনও মুর্শিদাবাদে। প্রবীণ ওমরাহদের মনের গতির আন্দাজ পাওয়ার কোশিস করছেন। এই সময় সহসা মুর্শিদাবাদে ছুটে এলেন আলিনগরের ফৌজদার মানিকচাঁদ। তাঁর জবানে উমিচাঁদ শুনলেন—ফোর্ট উইলিয়াম বেদখল হয়েছে। আলিনগরে ফিরে এসেছে ইংরেজরা। তেলেঙ্গানা থেকে ফৌজ নিয়ে এসেছেন সাবিৎ জঙ্গ কর্নেল ক্লাইভ। হুগলির দিকে রওনা হয়েছে ইংরেজদের নওয়ারা।
উমিচাঁদের মনটা ভীষণ চঞ্চল হয়ে উঠল। বন্ধুত্বের স্মারক হিসেবে নবাবের কাছ থেকে তিনি পেয়েছিলেন আট বেহারার ঝালরদার এক পালকি। তাতে চড়ে কলকাতার পথে রওনা দিলেন তিনি। ফেরার তাড়া বড্ড বেশি। ষোলো জন বেহারা পালা করে পালকি কাঁধে নিয়ে একটানা ছুটে চলল কলকাতার দিকে।
নানারকম চিন্তার ঝড় উমিচাঁদের মনটাকে তোলপাড় করে তুলল। তিনি এখনও অবধি যা শুনেছেন, তাতে তাঁর মনে হয়েছে কর্নেল ক্লাইভ সত্যিই বাহাদুর লোক। ত্রিবেণীতে এসে উমিচাঁদ শুনলেন হুগলি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে কোম্পানির ফৌজ। হুগলি বন্দর থেকে নদী পেরিয়ে এপারে আসার সময় ধ্বংসলীলার খানিকটা প্রত্যক্ষ করলেন নিজের চোখে। বেশ জাহাঁবাজ ফৌজ নিয়ে এসেছেন কর্নেল ক্লাইভ! উমিচাঁদ ভাবেন কলকাতায় ফিরেই একবার সাক্ষাৎ করতে হবে কর্নেলের সঙ্গে। কর্নেলকে বুঝিয়ে দিতে হবে তিনি ইংরেজদের পক্ষে।
নবাবের পূর্ণিয়া জয়ের পর ষড়যন্ত্রের কারবারিরা গা ঢাকা দিয়েছে ঠিকই কিন্তু ভিতরের আগুন এখনও নেভেনি। ধিকিধিকি জ্বলছে। মুর্শিদাবাদে বসে তা টের পেয়েছেন উমিচাঁদ। কর্নেল ক্লাইভের মতো একজন বাহাদুরকে হাতের কাছে পেলে রাজধানীর চাপা আগুন হয়তো ফের দাউ দাউ করে জ্বলে উঠতে পারে যেভাবে আগেনগারের নিভু নিভু আগুনকে তাগদ দেয় অভ্রের নতুন পাত।
উমিচাঁদের অভিজ্ঞ মন বলছে সামনে একটা গোলমেলে সময় আসতে চলেছে। মনে মনে তিনি ঠিক করে ফেললেন—আপাতত যুযুধান দুই পক্ষের হয়েই তাল ঠুকে যাবেন তিনি। পরে পাল্লা যেদিকে ঝুল খাবে সেদিকে ঝুঁকে পড়বেন। আপাতত এই কৌশলে নিজেকে বাঁচিয়ে চলতে হবে।
রাতের অন্ধকার সরে গিয়ে ধীরে ধীরে ফরসা হচ্ছে চারিদিক। কুয়াশার পর্দা বেশ ঠাসবুনোট। বরানগরের কাছে এসে হঠাৎ চমকে উঠল উমিচাঁদের পালকিবাহকরা। তাদের কানে ভেসে এল তীব্র হুংকার—’হল্ট! হল্ট!’
সামনে দেখা যাচ্ছে বেশ কয়েকটা অস্পষ্ট মানবমূর্তি। তারা কুয়াশা ভেদ করে এগিয়ে আসছে পালকির দিকে। এবারে স্পষ্ট হল লোকগুলোর চেহারা। পরনে লাল কোট, শাদা ব্রিচেস, মাথায় তেকোনা টুপি। হাতে রাইফেল। গোরা পল্টন।
ভয় পেয়ে পালকি বাহকেরা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। ইশারায় পালকি মাটিতে নামানোর হুকুম করল গোরা পল্টনের দল। ভোরের দিকে উমিচাঁদের দু-চোখের পাতা জুড়ে এসেছিল। পালকি মাটিতে নামানোর ঝাঁকুনিতে ঢুলুনি চটকে গেল।
‘কী রে এখানে থামলি কেন?’ এই বলে পর্দা সরিয়ে বাইরে মুখ বাড়িয়ে চমকে উঠলেন উমিচাঁদ। পালকি ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে দশবারোজন ইংরেজ সৈন্য।
উমিচাঁদ থতমত খেয়ে পালকি থেকে বেরিয়ে এসে শুধোলেন, ‘ব্যাপার কী? পালকি আটকালে কেন?’
‘খানাতল্লাশি হবে।’
‘তোমরা কারা?’
‘কোম্পানির আর্মি।’
‘খানাতল্লাশি কেন?’
‘সাহেবের হুকুম।’
‘এ তো কোম্পানির এলাকা নয়।’
‘শাট আপ।’
জনৈক গোরা পল্টনের কাছে বাঘা ধমক খেয়ে গুটিয়ে গেলেন উমিচাঁদ। বহুদিন ধরে তিনি কলকাতাবাসী। সাহেব দেখেছেন ঢের। তবে এমন দানবাকৃতির গোরা পল্টন দেখেননি কখনও। উমিচাঁদের মনে কেমন যেন একটা খটকা লাগল। সুতানুটি এখনও ঢের দূর। সেখান থেকে কোম্পানির এলাকা শুরু। এই জংলা জায়গায় কী করছে গোরা পল্টনের দল?
উমিচাঁদ নরম গলায় প্রশ্ন করলেন, ‘খানাতল্লাশি কোন সাহেবের হুকুমে?’
‘কর্নেল রবার্ট ক্লাইভের হুকুমে।’
ভিতরে ভিতরে কেঁপে উঠলেন উমিচাঁদ।
জনৈক গোরা পল্টন প্রশ্ন করল, ‘কোথায় যাচ্ছিলেন?’
‘আমি উমিচাঁদ। যাব হালসিবাগানে। গভর্নর ড্রেক সাহেব, হলওয়েল সাহেব আমাকে চেনেন।’
এই সব হোমরাচোমরা সাহেবের নামে কোনও কাজ হল না। গোরা পল্টন গর্জন করে উঠল, ‘কোত্থেকে আসছেন?’
‘মুর্শিদাবাদ থেকে।’
ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট।
আঁতকে উঠলেন উমিচাঁদ, ‘অ্যাঁ?’
‘চলুন ক্যাম্পে যেতে হবে।’
কীসের ক্যাম্প? কোথায় ক্যাম্প? উমিচাঁদ এসব প্রশ্ন করার সুযোগ পেলেন ন। দুজন গোরা পল্টন এগিয়ে এসে তার হাতদুটোকে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলে পালকির মধ্যে ঢুকিয়ে দিল তাঁকে।
পালকি ফের চলতে শুরু করল। মূল সড়ক ছেড়ে সরু পথ ধরল পালকি। দুপাশে লম্বা লম্বা বুনো ঘাসের ঝোপ। কিছুদূর চলার পর পালকি থামল। বাইরে বেরিয়ে অবাক হয়ে গেলেন উমিচাঁদ।
বোঝাই যাচ্ছে এখানকার ঝোপজঙ্গল কেটে সাফ করা হয়েছে সদ্য। বিরাট এলাকা জুড়ে রয়েছে সারি সারি তাঁবু। জায়গায় জায়গায় উড়ছে কোম্পানির পতাকা। গো-গাড়ির উপর বসানো রয়েছে তিরিশ-চল্লিশখানা তোপ! খড়ের ছাউনি দেওয়া অস্থায়ী আস্তাবলের নীচে পা বদলাচ্ছে তাগড়াই চেহারার বেশ কয়েকখানা ওয়েলার ঘোড়া। বুটের খটাখট শব্দ তুলে কুচকাওয়াজ করছে একদল গোরা পল্টন। আরেকদিকে চাঁদমারি অনুশীলন করছে কোম্পানির কয়েকজন সিভিলিয়ান ছোকরা। রাইটার হয়ে এসেছে তারা কোম্পানির চাকরিতে। ইংরেজদের সৈন্যসংখ্যা কম। নবাবের সঙ্গে ফের যুদ্ধ বাধতে পারে। বাহিনীর সংখ্যা বাড়িয়ে নেওয়ার জন্য এই উদ্যোগ। টিম লরেন্সও আছে এই দলে।
একদিকে প্যারেড কমান্ডারের গগনভেদী হুংকার অন্যদিকে চাঁদমারির বন্দুক দাগার আওয়াজ দুইয়ে মিলে কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন উমিচাঁদ। গোল্লা গোল্লা চোখে এদিকওদিক তাকাতে লাগলেন। তিনি বুঝলেন, ইংরেজদের সেনা ছাউনিতে এসে পড়েছেন। ভয়ে উমিচাঁদের বুক ধুকপুক করতে লাগল।
তাঁবুর ভিতরে নিজের কাজের টেবিলে বসে কলকাতার ম্যাপে চোখ বোলাচ্ছিলেন ক্লাইভ।
হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে কর্নেলকে স্যালুট জানিয়ে ক্যাপ্টেন ওয়ালস বললেন, ‘নাকার সেন্ট্রিরা একটা লোককে অ্যারেস্ট করেছে। মুর্শিদাবাদ থেকে আসছিল। লোকটা স্পাই হতে পারে। নাম বলছে উমিচাঁদ।’
ম্যাপ থেকে চকিতে চোখ তুলে ক্লাইভ বললেন, ‘লোকটাকে এখানে নিয়ে আসতে বল।’
দুজন গোরা পল্টন উমিচাঁদকে নিয়ে এল ক্লাইভের কাছে। পরনে ঝলমলে পোশাক, মাথায় ঘিয়ে রঙের কাপড়ের উপর জরির কাজ করা পাগড়ি। পাগড়িতে শোভা পাচ্ছে একটা দামি পাথর। গলায় মুক্তোর মালা। অনামিকায় পরা আংটির হিরেটা বেশ বড়সড়। ঈষৎ স্থূলকায়, মাঝবয়সি লোকটির দিকে ক্ষণিকের জন্য একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন ক্লাইভ। তারপর নীরবতা ভেঙে দুই সেন্ট্রির উদ্দেশে বললেন, ‘আরে করেছ কি? ইনি মানী লোক। হাতের বাঁধন খুলে দাও।’
হুকুম তামিল করে তাঁবু থেকে বেরিয়ে গেল সেন্ট্রিরা।
উমিচাঁদ মাথা ঝুকিয়ে বললেন, ‘সেলাম হুজুর! বহুত সুক্রিয়া। আপনিই কর্নেল ক্লাইভ ?’
মুচকি হেসে ক্লাইভ বললেন, ‘আপনি শুনেছেন আমার কথা?’
‘শুনব না? আপনার মতো বাহাদুর আদমি কজন হয়? আপনি সাবিৎ জঙ্গ।’
চকমকি ঠুকে পাইপ ধরালেন ক্লাইভ।
‘আমি উমিচাঁদ। সওদাগর। হালসিবাগানে হাভেলি আছে।’ কর্নেলের মেজাজটা ইয়াদদস্ত করতে থাকেন উমিচাঁদ।
পাইপের ধোঁয়া ছেড়ে ক্লাইভ বলেন, ‘জানি। আই হার্ড অ্যাবাউট ইউ ফ্রম মাই মুনশি।’
‘আপনার মুনশি নবকৃষ্ণ আমাকে চেনে।’
‘আপনাকে পথ থেকে এভাবে ধরে আনার জন্য আমি দুঃখিত।’ ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে বললেন ক্লাইভ।
হাত কচলে উমিচাঁদ বলে, ‘ভালোই তো হয়েছে। আপনার সঙ্গে জানপহেচান হয়ে গেল।’
হঠাৎ উমিচাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন ক্লাইভ, ‘এত সকালে কোত্থেকে আসছিলেন?’
‘মুর্শিদাবাদ থেকে ফিরছিলাম হুজুর।’
‘শুনেছি নবাব আপনার দোস্ত আছেন।’
উমিচাঁদ বললেন, ‘ইয়ে গলত বাত। আমি কোম্পানির দোস্ত।’
ফের ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়িয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘লাস্ট ইয়ার নবাব তো আপনার হাভেলিতেই উঠেছিলেন।’
‘এতে আমার কসুর কী আছে হুজুর? নবাবের খায়েশ হলে আমি কী না বলতে পারি?’
মাটির দিকে চেয়ে থেকে ক্লাইভ বললেন, ‘দ্যাটস ট্রু।’
উমিচাঁদ নিজের হয়ে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করেন, ‘নবাবের সঙ্গে আমার কোনও দোস্তি নেই হুজুর। আপনি খুদ যাচ ইমতেহানি করে নিতে পারেন।’
হঠাৎ মুখ তুলে উমিচাঁদের চোখে চোখ রেখে ক্লাইভ বললেন, ‘আমি শুনেছি লাস্ট ইয়ারে ক্যালকাটা অ্যাটাকের জন্য নবাবকে প্রোভোক করেছিলেন আপনি। আপনার লোকেরাই নবাবের বাহিনীকে কলকাতায় ঢোকার পথঘাট দেখিয়ে দিয়েছিল।’
কর্নেল ক্লাইভের অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে কেঁপে উঠলেন উমিচাঁদ। কর্নেল কি তাকে কয়েদ করতে চাইছেন? মরিয়া হয়ে মিনতির সুরে উমিচাঁদ বললেন, ‘ইয়ে ঝুটমুট বাত। আপনি নতুন এসেছেন কলকাতায়। আমার দুশমনরা আমার নামে আপনার কাছে ঝুট শিকায়ত করেছে।’
ক্লাইভ বললেন, ‘কোম্পানির উপর আপনার ও আপনার লোকেদের রিসেন্টমেন্ট তো কোয়ায়েট ন্যাচারাল।’
‘কোম্পানি তো আমার সঙ্গে কোনও দুশমনি করেনি হুজুর।’
‘করেনি? আপনার হাভেলি র্যানিস্যাকড হয়েছে। ইউ ওয়্যার ইমপ্রিসনড ইন ফোর্ট উইলিয়াম।’
শুকনো হাসি হেসে উমিচাঁদ বলেন, ‘বড়ে খানদানে এমন মামুলি ঝামেলা হয়েই থাকে হুজুর। এ নিয়ে গুসসা করলে চলে? তাছাড়া কোম্পানির সঙ্গে সওদা করে আমার রুটিরুজি। আমি কি বেওকুফ যে কোম্পানির সঙ্গে দুশমনি করে আমি আমার কারবার নষ্ট করব?’
‘মুর্শিদাবাদে গিয়েছিলেন কেন?’
‘ব্যবসার কাজে।’
‘পূর্ণিয়াতে আপনার কী কারবার ছিল?’
চমকে গেলেন উমিচাঁদ। কর্নেল ক্লাইভ সব খবরই রাখেন। একেবারে ধুরন্ধর লোক। উমিচাঁদ ঢোক গিলে বললেন, ‘পূর্ণিয়া গিয়েছিলাম নবাবের ফরমায়েসে।’
‘দোস্তের উপরেই তো এমন ফরমায়েস করে থাকে লোকে।’
‘বিশ্বাস করুন হুজুর আমার একমাত্র দোস্ত আপনারা। ভগবানের কাছে আমি এতদিন ধরে দোয়া মেঙেছি। তিনি যেন আপনাদের কলকাতায় ফিরিয়ে দেন। ভগবান শুনেছেন আমার কথা। নবকৃষ্ণকে জিগ্যেস করে দেখবেন হুজুর, ফলতায় কোম্পানির লোকেদের রসদ পাঠানোর জন্য আমি অনেক মেহনত করেছি।’
‘সো ইউ আর অ্যা রিয়েল ফ্রেন্ড অফ ইংলিশমেন।’
‘জি হুজুর।’
‘ইন ফিউচার আই ওয়ান্ট ইওর হেল্প।’
‘জানকবুল করে আমি আপনাদের মদত দেব হুজুর।’
‘ভেরি গুড। ইউ আর নাউ রিলিসড। আপনি যেতে পারেন মিঃ উমিচাঁদ। ইন নিড আপনাকে আমি ডেকে পাঠাব।’
ক্লাইভের তাঁবু থেকে বেরিয়ে এসে পালকিতে উঠে উমিচাঁদের যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। বরানগরের মাঠে কর্নেল ক্লাইভের তাঁবু ফেলার কারণটা এখন স্পষ্ট বুঝতে পারছেন উমিচাঁদ। নবাব যদি ফের ফৌজ নিয়ে এদিকে আসেন, তবে কলকাতায় ঢোকার আগেই তাঁকে কড়া মোকাবিলায় ফেলতে চান ক্লাইভ। হুগলির যা হালত করে ছেড়েছে এরা তাতে নবাবের ফের কলকাতায় ধেয়ে আসাটা অসম্ভব কিছু নয়।
পালকি এসে পড়ল চিৎপুরের সড়কে। উমিচাঁদ ঠিক করে ফেললেন আজই একজন গুপ্তচরের হাত দিয়ে চিঠি পাঠিয়ে সতর্ক করে দিতে হবে নবাবকে। কলকাতায় এলে নবাব যেন এবার চিৎপুরের রাস্তা না ধরে বারাসত হয়ে দমদমের পথ ধরেন।
ধূর্ত উমিচাঁদের মুখে হাসি খেলে যায়। এই চিঠির জন্য হয়তো তিনি কিছু পেশকাসও পাবেন নবাবের কাছ থেকে। তাতে চাবি পিস্তলের দামটা উঠে আসতে পারে। পালকির ভিতরে আপন মনেই হাসতে থাকেন উমিচাঁদ।
