1 of 2

ফলতা থেকে পলাশি – ৬

৬

খুশির তুফান উঠেছে মুর্শিদাবাদে। মজলিশে, মেহফিলে, মুজরোয় সুবা বাংলার রাজধানী জমজমাট, শাহি বিরিয়ানি ও গিলৌটি কাবাবের জিভে জল আনা খুশবুতে মাতোয়ারা। ত্রিপলিয়া তোরণদ্বারের পাশে রোশনচৌকি থেকে মিঠে আওয়াজ তুলছে সানাই। পশ্চিমদেশ থেকে এসেছে তওয়ায়েফের দল। ওমরাহদের হাভেলি থেকে ভেসে আসছে সারেঙ্গির আওয়াজ, তবলার শব্দ, ঘুঙুরের বোল।

চকবাজারে আতর, গুলাবজল, শরাব, সুরমা দেদার বিকোচ্ছে। খদ্দের সামলাতে ব্যাপারিরা হিমসিম। ফুলমান্ডিতে নানা রংয়ের ফোয়ারা। গাঁদা, বেল, জুই, রজনীগন্ধা, তাজা গুলাবের খুশবু খুশি ছড়াচ্ছে বাতাসে। ক’দিন পরেই বেরা উৎসব। পথের ধারে হরেক কিসিমের মাটির চিরাগের পসরা নিয়ে বসেছে কুমোরের দল। লোকজন হুমড়ি খেয়ে পড়ে দরদাম করছে। কোতোয়ালের বাহিনী হাঁকডাক করে ভিড় সামলাতে ব্যস্ত।

এবারে সুবে বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদে বেরা উৎসবের জলুস খুব বেশি। ক’দিন আগে আলিনগরের লড়াই ফতে করে মুর্শিদাবাদে ফিরে এসেছেন নবাব সিরাজদ্দৌলা। দুর্বিনীত ইংরেজ সাহেবরা নবাবের হাতে পর্যুদস্ত হয়ে কলকাতা ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে ফলতায় আশ্রয় নিয়েছে। একদিকে নবাবের এই কামালিয়ত, অন্যদিকে বেরা উৎসব সব মিলিয়ে মুর্শিদাবাদ রঙ্গিলা হয়ে উঠেছে।

নবাবের কেরামতির কথা হাওয়ায় উড়ছে। আলিবর্দি খাঁর মতো কুশলী নবাব যাদের ঘাঁটাতে সাহস করেননি, শুধু নরমে-গরমে নিজের তাঁবে রেখেছিলেন, সেই টোপিওয়ালা ইংরেজদের সবক শিখিয়ে এসেছেন সিরাজদ্দৌলা। ইংরেজরা যেভাবে তম্বি করে নবাবকে চিঠিপত্র লিখেছিল, যেভাবে তার হুকুমত ইনকার করার সাহস দেখিয়েছিল, তাতে স্বয়ং নবাবেরও ধারণা হয়েছিল, টোপিওয়ালা লালমুখো বণিকরা জবরদস্ত তাগদ রাখে। মুখোমুখি লড়াইয়ে নবাব প্রমাণ করে দিয়েছেন ইংরেজরা নালায়েক। তাদের আস্ফালন শুধু মুখেই।

এত সহজে যে কলকাতা ফতে হবে, সেটা সিরাজ নিজেও কল্পনা করতে পারেননি। মুর্শিদাবাদে ফেরার পর পাত্রমিত্র, অমাত্য, ইয়ারদোস্তরা লড়াইয়ের কথা তুললেই হেসে গড়িয়ে পড়ছেন নবাব। হাসতে হাসতে বলছেন, ‘আরে ছাড় লড়াইয়ের কথা। লড়াই হল কোথায়? ওই টোপিওয়ালা ইংরেজদের শায়েস্তা করতে হাতি, ঘোড়া, কামান, বন্দুক সৈন্য কিচ্ছুর জরুরত নেই। আমার একপাটি পয়জারই কাফি।’ হিরাঝিল প্রাসাদের দিবার টপকে একথাটা ছড়িয়ে পড়েছে মুর্শিদাবাদের সর্বত্র।

নবাবের ইয়ারদোস্তরা বেজায় খুশি, কেননা নবাব এখন খোশমেজাজে রয়েছেন। নবাব খুশি থাকলে তখন শাহি কেতায় ফুর্তির তুফান ওঠে। রংদার মজা লোটা যায়। সেই মসনদে বসার পর থেকে নানা ঝক্কিতে বড় পরেশান হয়ে পড়েছিলেন নবাব। তাঁকে ঘিরে থাকা পরগাছা স্তাবকের দল মুষড়ে পড়েছিল। এতদিনে হাসি ফুটেছে তাদের মুখে। ঘসেটি বেগম ও দেওয়ান রাজবল্লভের চক্রান্ত ব্যর্থ হয়েছে। ইংরেজরা এখন কলকাতা ছাড়া। মসনদকে ঘিরে শঙ্কার মেঘ আপাতত সরে গিয়েছে। এই তো ফুর্তির ওয়াক্ত, রঙ্গিলা হয়ে ওঠার সময়।

দেওদার পাতায়, লতায়, দেশিবিদেশি ফুলে সেজে উঠেছে হিরাঝিল, নিজামত কেল্লা। সকালে সিরাজের খুশনসিবিতে খোশবাগের মসজিদে গিয়ে দোয়া মেঙেছেন নানি বেগম। নিজের হাতে মিশকিনদের পোলাও খাইয়েছেন। বিলিয়ে দিয়েছেন মুঠো মুঠো রুপোর টাকা। একহাজার কবুতরকে আজাদ করে আসমানে উড়িয়ে দিয়েছেন।

আজ বেরা উৎসব। সূর্য ডোবার পর অন্ধকার ঘনিয়ে আসতেই নিজামত কেল্লা থেকে গর্জে উঠল কামান। শয়ে শয়ে বাতিকর জ্বেলে দিল প্রদীপ। হাজার হাজার মৃৎপ্রদীপের আলোয় সহসা ঝলমল করে উঠল নিজামত কেল্লা। আলোর রোশনাইয়ে হাসতে লাগল হিরাঝিল। গঙ্গার দুধারের সমস্ত হাভেলিও আলোকমালায় সজ্জিত। চারিদিক আলোয় আলোয় উদ্ভাসিত।

হুশ হুশ করে উড়ে যাচ্ছে হাউই। আসমানে আলোর নকশা তৈরি করছে আতশবাজি। অজানা ঠিকানার উদ্দেশে ভেসে চলেছে অসংখ্য ফানুস। হিরাঝিলের কাননে নির্মিত অস্থায়ী মঞ্চের উপর স্থাপিত মসনদে আসীন নবাব সিরাজদ্দৌলা। সপারিষদে বাজি প্রদর্শনী দেখছেন। হাউই, আতশবাজি, ফানুসের কেরামতি দেখে মাঝে মাঝে শিশুর মতো উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ছেন। নবাবের মঞ্চের পাশে একটু নীচু ধাপে বসে থাকা অমাত্য, ওমরাহ, জমিদারের দলও নবাবের দেখাদেখি আহ্লাদে মেতে উঠছেন।

আলোর খেলা দেখে কচি কচি দুহাতে তালি দিয়ে উঠছে লাল মসলিনের পোশাকে সুসজ্জিত ফুলের মতো সুন্দর উম্মেসায়েরা। সিরাজের একমাত্র শাদি করা বেগম উমাদাত-উন্নেসার গর্ভে তার জন্ম। এখনও উম্মেসায়েরার মুখে ভালো করে কথা ফোটেনি। নবাবের শ্বশুরমশায় ইরাজ খাঁর কোলে বসে সেও দুর্বোধ্য শব্দগুচ্ছের মাধ্যমে নিজের মতো করে আনন্দ প্রকাশ করছে।

অতিথি অভ্যাগতদের চারপাশে হুঁকো হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে হুঁকোবরদারের দল। অম্বুরি তামাকের গন্ধে ভুরভুর করছে বাতাস। সোনার রেকাবিতে সাজানো বিলিতি শরাবের পাত্র, শরবতের গেলাস ও সুগন্ধি তাম্বুল নিয়ে অতিথিদের সমুখে ঘুরছে আবদারের দল।

নবাবের হাতে ধরা বেলজিয়ামের কাটগ্লাসের পাত্রে আঙুরের শরবত। একসময়ে সুরায় প্রবলভাবে আসক্ত ছিলেন সিরাজ, নবাব হওয়ার পর থেকে আর শরাব স্পর্শ করেন না। আলিবর্দি মৃত্যুর আগে কোরান ছুঁইয়ে তাঁকে শরাব ছাড়ার শপথ করিয়ে নিয়েছিলেন। সেই থেকে সিরাজ তাঁর ওয়াদায় অটল রয়েছেন। আজকাল নবাবের সামনে শরাবের পাত্র হাতে নিতে ইতস্তত করেন অনেকে, তবে নবাব আজ সবাইকে শরাব পানের অনুমতি দিয়েছেন।

দুম দুম শব্দে কাড়ানাকাড়া বেজে উঠল। মঞ্চ থেকে নবাব নেমে এসে গঙ্গার তীরে শ্বেতপাথরের চবুতরার নীচে দাঁড়িয়ে তির ও ধনুক হাতে তুলে নিলেন। এই পরিকল্পনা মোহনলালের। আলিনগরের যুদ্ধে ইংরেজ বণিকরা নবাবের হাতে কীভাবে ধ্বংস হয়েছে, সেটা রূপকের মাধ্যমে দেখান হবে তামাম মুর্শিদাবাদবাসীকে।

গঙ্গার দুপারে ভিড় করেছে অগুনতি মানুষ। মেলা বসে গিয়েছে। মাঝ নদীতে ভাসছে ইংরেজদের জাহাজের বেশ বড় প্রতিকৃতি। সেই জাহাজকে বৃত্তাকারে ঘিরে রেখেছে ভাসমান আলোকবর্তিকা। সেই আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে বাঁশ ও কলার বাসনা দিয়ে তৈরি নকল জাহাজটি। মাটির তৈরি লাল উর্দিপরা গোরা পল্টন বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে জাহাজের উপরে। এই খেলনা জাহাজের খোল ঠাসা হয়েছে বারুদে।

ওমরাহ, অমাত্য, জমিদার, কাশিমবাজারের ফরাসি কুঠির অধ্যক্ষ জাঁ ল এরা সব এসে নবাবের পিছনে দাঁড়িয়েছেন। ধনুকের ছিলায় টান দিলেন নবাব। তিরের মাথায় জ্বলছে আগুন। জ্যা-মুক্ত হয়ে সেই অগ্নিবাণ গিয়ে পড়ল নকল জাহাজের উপর। সঙ্গে সঙ্গে তীব্র বিষ্ফোরণের শব্দে ও আলোকছটায় চমকে উঠল সকলে। খেলনা জাহাজ পুড়ে ছাই হয়ে যেতে লাগল নদীর বুকে। উল্লাসে ফেটে পড়ল গঙ্গার দুপাশের মানুষ। করতালি দিয়ে উঠল অমাত্যরা। খুশি হলেন নবাব।

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মোহনলালের উদ্দেশে জাঁ ল বললেন, ‘জাফর আলি খাঁকে দেখছি না তো, গেলেন কোথায়?’

দায়সারাভাবে মোহনলাল বললেন, ‘আসেননি। বার্তা পাঠিয়েছেন, ওঁর তবিয়ৎ ঠিক নেই।’

জাঁ ল খেয়াল করে দেখলেন, শুধু মিরজাফর নন, প্রবীণ ওমরাহদের অনেকেই উপস্থিত নেই আজকের এই উৎসবে। রহিম খান, ওমর খান কেউই আসেননি।

মুর্শিদাবাদ দরবারের হালচাল ভালোই জানেন জাঁ ল। প্রবীণ ওমরাহদের কেউই নবাবের উপর সন্তুষ্ট নয়। নবাবের দোস্ত, দেওয়ান মোহনলালের রক্তচক্ষুর ভয়ে তাঁরা ত্রস্ত, জনসমক্ষে নবাবের বিদ্রুপের ভয়ে শঙ্কিত। মশকরা করে একেকজনের মজার নামকরণ করেছেন নবাব, রহিম খানের নাম দিয়েছেন বুড়া বলদ, ওমর খানের নাম দিয়েছেন বুদ্ধু ভোঁদড়।

প্রবীণ ওমরাহরা অপমানিত হওয়ার ভয়ে আজকাল দরবারি জমায়েতকে এড়িয়ে চলেন। জাঁ ল বুঝলেন, ঘসেটি বেগম, রাজবল্লভকে দমন করে, আলিনগরের লড়াইয়ে ইংরেজদের দুরমুশ করে যতই ফুর্তিতে থাকুন না কেন নবাব, তাঁর মসনদ এখনও নিষ্কন্টক নয়।

রাত অনেক হয়েছে। বেরা উৎসবের কোলাহল থেমেছে। ম্লান হতে হতে নিভে গিয়েছে নদীর দুপাশের আলোকমালা। শুধু উৎসবের স্মৃতি নিয়ে নদীর বুকে এখনও টিম টিম করে জেগে আছে দু-একটি প্রদীপের শিখা। মজলিশ শেষ করে হিরাঝিলের অতিথিরা ঘরে ফিরে গিয়েছেন। অতিথিদের বিদায় করে গোপন মন্ত্রণাকক্ষে মোহনলালকে নিয়ে জরুরি আলোচনায় বসেছেন নবাব।

নিঝুম হয়ে আসা হিরাঝিল প্রাসাদের বেগমমহলের গবাক্ষে জেগে আছে আনার দানার মতো সুন্দর একটি মুখ। চোখে সুরমা, ওষ্ঠে কুমকুম। সিঁথিতে টায়রা, নাকে বেশর। বাহুতে, মণিবন্ধে, গলায় হিরের অলংকার। তরন্দাম মসলিনের পায়জামার কিনারায় সোনালি জরি। সলমা চুমকি বসানো আবরোয়ানের ওড়নার নীচে আশমানি রংয়ের আঙিয়া আগলে রেখেছে উপচে পড়া যৌবনের তরঙ্গকে। নিজের কক্ষের খোলা জানালায় দাঁড়িয়ে গঙ্গার অন্তহীন স্রোতের দিকে চেয়েছিলেন লুৎফুন্নেসা। সিরাজের প্রিয়তমা।

ঘরের কোণে শ্বেতপাথরের বাতিদানে জ্বলতে থাকা অভ্রের পাত প্রায় নিভে এসেছে। একজন বাঁদি এসে আগুনটা উসকে দিয়ে গেল। সে আলো চার দেওয়াল ও ছাতের বেলজিয়াম কাচের আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে গোটা ঘরকে আলোয় ভরে তুলল।

কাজ সেরে নীরবে চলে গেল বাঁদি। লুৎফুন্নেসার ভ্রুক্ষেপ নেই। সে উদাস দৃষ্টিতে নদীর দিকে ঠায় চেয়ে আছে। হিরাঝিলের বাগানে দুটো রাতজাগা অজানা পাখি ডেকে উঠল।

চুপিসাড়ে কক্ষে ঢুকে লুৎফার কাঁধে হাত রাখলেন সিরাজ। ‘অমন মশগুল হয়ে কী দেখছ লুৎফা?’

চমকে ওঠে লুৎফা, ‘ওঃ! মেহের আপনি?’

‘কী দেখছিলে?’

‘কিছু না।’

‘আতশবাজির খেলা দেখেছ?’

‘দেখেছি।’ সিরাজের বুকে মাথা রাখে লুৎফুন্নেসা। মুখ নামিয়ে এনে লুতফুন্নেসার চোখের পাতায় চুম্বন করলেন সিরাজ, লবণাক্ত জলের আস্বাদ পেলেন ঠোঁটে।

‘এ কি লুৎফা তোমার চোখে পানি?’

‘আমার ভয় করে মেহের।’

‘কীসের ভয়?’

‘ভয় মসনদের কাঁটাকে।’

সিরাজ মৃদু হেসে বলেন, ‘আমি জানি তুমি আমাকে বহুত পেয়ার করো। লেকিন ইতনা শোচ মাত। কেউ আমার সঙ্গে দুশমনি করে পেরে উঠবে না।’

‘সে জন্য তো সবসময় দোয়া মাঙ্গি খোদাতাল্লার কাছে।’

‘সে আমি জানি।’

‘আপনার চারপাশে এত আদমি, কে সাচ্চা কে ঝুটা, কে দোস্ত, কে দুশমন, আপনি বুঝতে পারেন?’

‘খানিকটা বুঝি লুৎফা। তবে সব কি বোঝা যায়? লেকিন কী হল তোমার বলো তো? এসব ভাবছ কেন?’

‘মসনদকে ঘিরে থাকে সাজিস। সেই সাজিসকে আমার ভয়। আপনি সালামত থাকুন, সেই জন্যই দোয়া মাঙ্গি। আপনি ছাড়া আমার আর কে আছে?’

লুৎফার চিবুক ছুঁয়ে সিরাজ বলেন, ‘আমারই বা তুমি ছাড়া কে আছে? আর কে এমন করে পেয়ার করে আমায়?’

বাদলকিনারি ওড়না দিয়ে সিরাজের কপালের ঘাম মুছিয়ে দিতে দিতে লুৎফুন্নেসা বলে, ‘মসনদে বসার পর থেকে কত তকলিফ যাচ্ছে আপনার।’

‘কোন নবাবের তকলিফ ছিল না বলো দেখি?’

‘তাঁদের কথা আলাদা।’

খানিকটা ক্ষোভের সুরে সিরাজ বলেন, ‘কেন, আলাদা কেন? তুমি কী আমাকে নালায়েক ভাবো? নিজেকে সালামত রাখার ক্ষমতা আমার নেই?’

‘তা নয় নবাব। মসনদকে ঘিরে থাকে বহু মানুষের লালচ। এই লালচকে আমার ভয়। ভয় ভাবীকালকে। ভয় আমার নসিবকে।’

‘তোমার নসিব মন্দ কি? তুমি নবাবের পিয়ারী।’

লুৎফা বলে, ‘কে আমার আম্মিজান, কে আব্বাজান জানি না। বাবা-মায়ের ভালোবাসা কেমন হয়, জানা নেই আমার। কটকের দাসবাজার থেকে আমাকে কিনে নিয়ে এলেন নানি বেগম। এই খানদানে আশ্রয় পেলাম। নানি বেগম, নানাজির স্নেহ পেলাম। আপনাকে পেলাম। আপনার পেয়ার পেলাম। নসিবের বদখেয়ালে সব যদি আবার হারিয়ে যায়?’

আহত গলায় সিরাজ বলেন, ‘ডরো মাত লুৎফা কিচ্ছু হারাবে না। আমি আছি।’

‘আমি জানি আপনার মহব্বত সাচ্চা। আমার ভয় করে। দুশমনেরা আপনার যদি কোনও ক্ষতি করে?’

‘এখনও কি আমার উপর ভরসা হয় না তোমার? দেখলে তো ঘসেটি বেগম ও রাজবল্লভের চাল কেমন ভেস্তে দিলাম, একটুও খুন ঝরল না। টোপিওয়ালা ইংরেজদের খেদিয়ে দিলাম কলকাতা থেকে। বেনিয়া খোজা ওয়াজিদ বলে ফরাসিদের তাগদ ইংরেজদের চেয়েও বেশি। ফরাসিরা আমার দোস্ত। আর কীসের ভয় লুৎফা?’

‘যারা আপনাকে নবাব হিসেবে চায়নি, তারা দুশমনি করবে।’

সিরাজ মৃদু হেসে বলেন, ‘যারা একদিন আমাকে চায়নি, তারা এখন তিন ওয়াক্ত কুর্নিশ করে।’

‘দুশমনির তেজ কি তাতে নিভে যায়?’

‘দুশমনিকে আমি খতম করতে জানি লুৎফা।’

‘আপনি নানাজির আমলের ওমরাহদের ইজ্জত দেন না কেন?’

বাইরের ঘন অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ক্রুদ্ধ গলায়, প্রবল আক্রোশে সিরাজ বলেন, ‘বেতমিজ, বুড়া গর্ধবের দল আমাকে মনে করে নালায়েক। হাতের পুতুলের মতো চালনা করতে চায়।’

সিরাজদ্দৌলার মেজাজের আঁচ দেখে খানিকটা অপ্রতিভ হয়ে পড়ে লুৎফা। তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় সিরাজ বলেন, ‘তুমি কি চাও তোমার নবাব এমন হোক?’

‘আমি সে কথা বলছি না মেহের। এদের পাকা মাথা। সাজিশিতে এরা চৌকস।’

‘কিছু করতে পারবে না ওই বুড়ো বেতমিজের দল। আমি সব ব্যাটাকে দেশ থেকে তাড়িয়ে ছাড়ব। এসব নিয়ে ভেবো না।’

‘শওকত ভাইয়া নাদান, নালায়েক। শুনতে পাই শওকত ভাইয়াকে মদত দিয়ে এরা আপনার বিরুদ্ধে লড়িয়ে দেবে।’

অবাক হয়ে সিরাজ বলেন, ‘বেগম মহলে থেকে এত খবর তুমি রাখো কী করে লুৎফা?’

লুৎফা বলে, ‘নানি বেগমের কাছ থেকে শিখেছি।’

মজা করে সিরাজ বলেন, ‘সে তো বুঝতেই পারছি। কালে কালে দেখছি তুমি নানি বেগমকেও ছাপিয়ে যাবে।’

‘আপনি কলকাতা ফতে করতে গেলেন, আমি বসে বসে কত ভেবেছি আপনার জন্য। এরপর লড়াইয়ে গেলে আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন। আপনার সুবিধা, অসুবিধা সব কিছু কি বাঁদিদের হাতে ছেড়ে দিলে চলে?’

সিরাজ বলেন, ‘পথে অনেক কষ্ট। পারবে তুমি?’

‘নানি বেগম তো নানাজির সঙ্গে সব জায়গায় গেছেন।’

‘নানি বেগম অন্য ধাতুতে গড়া।’

এবারে কোমল দুটি বাহু দিয়ে সিরাজের গলা জড়িয়ে ধরে লুৎফুন্নেসা। ‘আর আমি?’

‘তুমি আমার লুৎফা, আমার ননীর পুতুল।’

লুৎফুন্নেসার কপালে এসে পড়া চুলের গোছা সরিয়ে নরম সুন্দর মুখটা হাত দিয়ে তুলে মুখ নামিয়ে এনে প্রিয়তমা বেগমের ওষ্ঠে প্রবল অনুরাগের চিহ্ন এঁকে দেন সিরাজ। লুৎফুন্নেসার শিরায় শিরায় অগ্নি সংযোগ হয়। সুডৌল দুই বাহু দিয়ে লতার মতো সিরাজকে আঁকড়ে ধরে লুৎফুন্নেসা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *