১৭
পরোয়ানাটা গুটিয়ে নিয়ে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘চমৎকার!’
রাধাকৃষ্ণ মল্লিক বলল, ‘আমি পরোয়ানা হাতে পেয়েই আপনার কাছে ছুটে আসছি।’
নবকৃষ্ণ বলেন, ‘খাসা কাজ করেছ হে।’
রাধাকৃষ্ণ ভয়ে ভয়ে বলে, ‘কিন্তু মুনশিজি, আমার কোনও বিপদ হবে না তো?’
‘বিপদ? কীসের বিপদ?’
‘গদ্দারির ইলজাম লাগবে আমার উপর। হুকুম যে তামিল হয়নি, তা তো মানিকচাঁদজি জানতে পারবেন পরে।’
মুচকি হেসে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘মানিকচাঁদের তালুকদারি আর ক’দিন? কলকাতা ছেড়ে পালাতে হবে তাঁকে।’
রাধাকৃষ্ণ মল্লিক মনে সংশয় নিয়ে বলে, ‘আপনি যা বলছেন, তা যদি না হয়?’
‘এখনও সন্দেহ আছে তোমার?’
‘নিজামতের নোকরিতে বেইমানের গর্দান যায়।’
‘বেইমান কে নয় বাপু? মুর্শিদাবাদের ওমরাহ, জমিদার বেনিয়ানরা যে আড়ালে সবসময় নবাবকে মসনদছাড়া করার সাজিস নিয়ে মেতে আছে, সেই বেলা? কারও গর্দান যাচ্ছে কি?’
‘উপর মহলের রইস লোকেদের কিসসা আলাদা। আমি তিরিশ রুপেয়া বেতনের নোকর।’
‘ভয় নেই রাধাকৃষ্ণ। নিজামতের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। নতুন যুগ আসছে। থাক ওসব কথা।’ এই বলে কোমরের গেঁজের থেকে কয়েকটা রুপোর টাকা বের করে রাধাকৃষ্ণ মল্লিকের হাতে গুঁজে দিয়ে নবকৃষ্ণ বলেন, আপাতত এটা রাখো। তোমার বকশিশ।’
রুপোর টাকা দেখে মুখটা বেজার করে রাধাকৃষ্ণ মল্লিক বলে, ‘আপনি যে আশরফির কথা বলেছিলেন!’
মৃদু হেসে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘নগদে কেবল খুচরো কারবার চলে। মোটা মুনাফার জন্য প্রথমে শুধু বিনিয়োগ করতে হয়। একটু ঝুঁকি নিতে হয় রাধাকৃষ্ণ।’
এ কথার অর্থ বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসু চোখে নবকৃষ্ণর মুখপানে চায় রাধাকৃষ্ণ মল্লিক।
নবকৃষ্ণ বলেন, ‘বুঝলে না তো কথাটা? সবুরে মেওয়া ফলে—শুনেছ নিশ্চয়ই।’
‘শেষে নসিব যদি ধোঁকা দেয়? যদি সব হারাই? ভয় হয় মুনশিজি।’
সামান্য বিরক্তির সুরে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘তুমি কি মনে করো আমি বেওকুফ?’
রাধাকৃষ্ণ মল্লিক জিভ কেটে বলে, ‘কী যে বলেন? আপনি বিদ্যাবুদ্ধিতে দশের এক।’
‘দিবারাত্র এই যে ক্লাইভ সাহেবের খিদমত খেটে চলেছি, সে কি এমনি ভেবেছ? এখন যা করছি, তা হল ভবিষ্যতের গর্ভে বিনিয়োগ, সময় যেদিন আসবে সেদিন নিজের মুনাফা আমি বুঝে নেব। দেখে নিও।’
মোসাহেবির ভঙ্গিতে রাধাকৃষ্ণ বলে, ‘আপনি ক্ষণজন্মা পুরুষ। আপনার সঙ্গে আমাদের তুলনা?’
আদেশের সুরে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘এবারে কাজের কথা শোনো। হাতে সময় বেশি নেই। ক্লাইভ সাহেব দুয়েক’দিনের মধ্যেই ফৌজ নিয়ে বেরিয়ে পড়বেন। গো-গাড়ি, বলদ, মুটে এসব জোগাড় করার ফরমায়েশ হয়েছে। বজবজের কেল্লার খবর কী?’
‘তোপ আছে গোটা দশেক। দুটো অকেজো।’
‘সেপাই-লস্কর?’
সামান্য ভেবে নিয়ে রাধাকৃষ্ণ মল্লিক বললে, ‘মেরেকেটে জনাপঞ্চাশ হবে।’
‘তুমি বজবজের কেল্লায় ফিরে যাও। ক্লাইভ সাহেব কেল্লা আক্রমণ করার পর সুযোগ বুঝে সদরফটক খুলে দেবে।’
‘তারপর?’
মুচকি হেসে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘তারপর আর কী? বজবজের কেল্লাটা দখল হলে আশরফি ভরতি খেরিয়া নিজেই তোমার হাতে তুলে দেবেন ক্লাইভ সাহেব। পাওনা-গণ্ডা নিয়ে চিন্তা কোরো না। সাহেব দরাজ মনের লোক।’
‘আমার দিকটা একটু দেখবেন মুনশিজি। আসি তাহলে।’
‘এসো। সাবধান। জয় গোবিন্দ!’
নদীর পাড় বেয়ে তরতর করে নেমে গিয়ে ছিপ নৌকোয় চেপে বসে রাধাকৃষ্ণ মল্লিক। বজবজের উদ্দেশে দাঁড় বাইতে শুরু করে।
ইংরেজদের যেন কেউ গো-গাড়ি, মোষ, বলদ এসব দিয়ে সাহায্য না করে। এই মর্মে হুকুমত জারি করেছিলেন মানিকচাঁদ। ফলতায় ঢোল শোহরত করানোর আদেশ দিয়েছিলেন রাধাকৃষ্ণকে। কাজটা না করে আশরফির আশায় সেই পরোয়ানাটা নব মুনশির হাতে তুলে দিয়ে গেল রাধাকৃষ্ণ মল্লিক।
নবকৃষ্ণ দ্রুত হাঁটতে লাগলেন ফলতার হাটের উদ্দেশে। হাতে তেল চকচকে বাঁশের লাঠি। আজ হাটবার। নবকৃষ্ণ ভাবেন, মানিকচাঁদের হুকুমটা তামিল না করে মস্ত উপকার করেছে রাধাকৃষ্ণ মল্লিক। তবুও কাজটা অত সহজে হাসিল হবে কি? এমনিতেই সাহেবদের সন্দেহের চোখে দেখে গাঁয়ের মানুষ। নবাবের তাড়া খেয়ে কোম্পানির সাহেবেরা ফলতায় এসে আশ্রয় নিয়েছে। এ তো আর গোপন কথা নয়। সবাই জানে।
দক্ষিণ দেশ থেকে ইংরেজদের বড় বড় জাহাজ এসেছে। ফৌজ এসেছে। সাহেবরা আবার নবাবের সঙ্গে লড়াই বাঁধানোর উদ্যোগ করছে। একথা স্থানীয় লোকেরা কানাকানি করছে। নবাবের সঙ্গে গদ্দারির ভয়ে কেউ কি ইংরেজদের রসদ টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য গো-গাড়ি, বলদ জোগান দিতে রাজি হবে?
এদিকে ক্লাইভ সাহেব বড্ড অস্থির হয়ে পড়েছেন। একদণ্ডও আর ফলতায় থাকার ইচ্ছে নেই তাঁর। দ্রুত কলকাতা উদ্ধার করতে চান। তার প্রথম ধাপ হল বজবজের কেল্লা দখল করা।
হুকুম হয়েছে আজই সব জোগাড়যন্তর করতে হবে। স্থলবাহিনীর অস্ত্র-শস্ত্র, কামান-গোলা-বন্দুক, রসদ-এসব বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বেশ কিছু গো-গাড়ির প্রয়োজন। নবকৃষ্ণ বড় মুখ করে ক্লাইভ সাহেবকে বলেছেন, ‘ভাববেন না হুজুর, জোগাড় হয়ে যাবে। তবে কড়ি হয়তো একটু বেশি ছড়াতে হবে।’
কিন্তু বাড়তি কড়ি ছড়িয়েও কাজটা হাসিল হবে কি? নীলকণ্ঠ মারফত গাঁয়ের কয়েকজনকে বাজিয়ে দেখেছেন নবকৃষ্ণ। তারা এই গোরা পল্টনদের সাহায্য করার কথা শুনে আঁতকে উঠেছে।
চিন্তিত মুখে হাঁটতে থাকেন নবকৃষ্ণ।
সাতসকালেই জমে উঠেছে ফলতার হাট। দূরদূরান্ত থেকে এসেছে কারবারিরা। শয়ে-শয়ে বলদ, মোষে টানা গাড়ি বোঝাই হয়ে আছে জিনিসপত্রে। আসলে খবরটা ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে-ইংরেজদের জাহাজ এসেছে, এসেছে অনেক সেপাই-পল্টন-লস্কর। অতএব অনেক রসদ, আনাজ, আটা, মাংস, চাল, ডাল, ফলমূল দরকার হবে সাহেবদের।
কারবারিদের মধ্যে যারা খুব চতুর, তারা ধরেই নিয়েছে, দক্ষিণ দেশ থেকে জাহাজ আসার অর্থ সাহেবরা এবার ফলতা থেকে সরে পড়বে। আবার নাকি নবাবের সঙ্গে কোম্পানির লড়াই বাঁধবে। চারিদিক ঝোপজঙ্গলে ভরা ফলতায় এই একটা হাটের উপরেই নির্ভরশীল সাহেবরা। পাঁচটা বাজার ছেঁচে দরদাম বুঝে নেওয়ার সুযোগ তাদের নেই। মোটা দামে জিনিস বিকোবে। এই ভেবে আশায় বুক বেঁধেছে অনেকে।
কারবারিদের প্রত্যাশা মতোই রসদ সংগ্রহের জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছে গোরা ফৌজিদের মধ্যে। দাঁড়িপাল্লার মস্ত মস্ত পাটায় ওজন হচ্ছে চাল, ডাল, আনাজপাতি। সেগুলো বোঝাই হচ্ছে গো-গাড়িতে, মুটের মাথায়। ব্যস্তসমস্ত হয়ে এ কাজের তদারকি করছে স্ক্র্যাফটন। তাঁকে সাহায্য করছে রাসেল।
আরকের গুমটিতে ভিড় লেগেছে সেপাই-পল্টনদের। এরই মধ্যে অনেকে নেশায় বেসামাল হয়ে গিয়েছে। হাটজুড়ে গোরা পল্টনদের দাপাদাপি দেখে স্থানীয় মানুষ ভয়ে আজ হাটের দিকে বড় একটা আসেনি।
হাটের একপ্রান্তে বহু প্রাচীন এক বটগাছের পাশে কামারের ঝুপরির সামনে উবু হয়ে বসে আছে গ্রাহাম স্ট্রন। পাশে দাঁড়িয়ে আছে নীলকণ্ঠ। গনগনে লাল লোহার পাতটা পিটিয়ে চলেছে কামার। সেদিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে স্ট্রন। তার প্রিয় ট্রাম্পেটটা রাখা রয়েছে পাশে।
ফলতায় আসার পথে জাহাজে ট্রাম্পেট বাজাতে দেখে অত লস্কর-সিপাইদের মধ্যে স্ট্রনকে আলাদা করে চিহ্নিত করেছিলেন কর্নেল ক্লাইভ। মাঝসমুদ্রে সলিসবেরি জাহাজটা মেরামতির সময় তিনি দেখেছিলেন ছেলেটির অসীম সাহস ও উপস্থিত বুদ্ধি।
কুড়ি-একুশ বছরের দুঃসাহসী, ফূর্তিবাজ ছেলে স্ট্রন। সে ছিল অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের বাহিনীর এক সৈনিক। এমন চনমনে ছেলেছোকরাদের বরাবরই খুব পছন্দ করেন ক্লাইভ। এদের সম্পদ হল বুক ভরা আবেগ, যা যুদ্ধক্ষেত্রে অনেক সময় মিরাকল ঘটিয়ে দেয়। ফলতায় আসার পর ওয়াটসনকে বলে স্ট্রনকে নিজের দেহরক্ষী বাহিনীতে বহাল করেছেন কর্নেল ক্লাইভ।
ফলতায় আপাতত তেমন কোনও কাজ নেই স্ট্রনের। রোজ সকালে নদীর পাড়ে কুচকাওয়াজ করতে হয়। তারপর ব্যান্ডের সুরে রুল ব্রিটানিয়া বাজে। ব্যান্ডে ট্রাম্পেট বাজায় স্ট্রন। এরপরে সারাদিনে অনেকটাই ফাঁকা সময়। প্রায় সমবয়সি নীলকণ্ঠর সঙ্গে বেশ খাতির জমে গিয়েছে স্ট্রনের।
নীলকণ্ঠকে সঙ্গে নিয়ে আশেপাশের গ্রামে ঘুরে বেড়ায় স্ট্রন। এদেশের এই ঝোপঝাড়, গাছপালা, সবুজে ভরা এলাকা অল্প দিনেই খুব ভালো লেগে গিয়েছে স্ট্রনের। ছেলেটার কেরামতি দেখে মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যায় নীলকণ্ঠ। কখনও চোখের নিমেষে গাছ বেয়ে মগডালে উঠে পড়ে। আবার কখনও তরতর করে নারকেল গাছে উঠে কচি ডাব, নারকেল পেড়ে আনে। বড় দুরন্ত ছেলে।
মাঝে মাঝে ঘরের জন্য মন কেমন করে স্ট্রনের। তখন সে চুপ করে নদীর পাড়ে বসে থাকে। এ ভাবে বসে থাকতে থাকতে কোনও কোনও দিন গভীর রাত হয়ে যায়। শিবিরে ফেরার কথা আর মনেই থাকে না।
কয়েক’দিন আগে নীলকণ্ঠর সঙ্গে ফলতার পাশে বাসুলাট গ্রামে ঘুরতে ঘুরতে নদীর পাড়ে একটি মন্দিরে মা কালীর মূর্তি দেখে চমকে উঠেছিল স্ট্রন। অমন ভয়ংকর চেহারার দেবী মূর্তি যে বাংলায় পূজনীয়া পরম কল্যাণময়ী মা কালী, নীলকণ্ঠর মুখে একথা শুনে কিছুতেই তার বিশ্বাস হতে চায় না। যাই হোক, মা কালীর হাতের খাঁড়াটা দেখে খুব পছন্দ হয় স্ট্রনের।
স্ট্রন বলে, ‘বিউটিফুল ওয়েপন।’
নীলকণ্ঠ শুধোয়, ‘তোমার চাই একটা?’
মাথা ঝাকিয়ে স্ট্রন বলে, ‘ইয়েস।’
নীলকণ্ঠ বলে, ‘পরশু হাট বসবে। হাটে পাওয়া যাবে।’
খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে স্ট্রনের মুখটা।
সেই খাঁড়া গড়িয়ে নেওয়ার জন্যই আজ হাটের দিন সকালে স্ট্রন এসে হত্যে দিয়ে পড়ে আছে কামারের ঝুপরিতে।
দেখতে দেখতে গরম লোহা পিটিয়ে, বেঁকিয়ে খাঁড়াটা তৈরি করে ফেলল কামার।
স্ট্রন বলল, ‘ভেরি নাইস।’
কামার প্রশ্ন করে, ‘এত হাতিয়ার থাকতে শেষে মায়ের খাঁড়াটা পছন্দ হল সাহেবের। সাহেব কী কালীভক্ত হবেন?’
কথাটা বুঝতে পারে না স্ট্রন। বুঝিয়ে দেয় নীলকণ্ঠ। স্ট্রন হেসে ওঠে।
সহসা একটা হইচইয়ের শব্দ শুনে দূরের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠে কামার বলে, ‘উরিঃবাপ! বরা।’
চকিতে ঘুরে তাকায় নীলকণ্ঠ ও স্ট্রন। একদল দাঁতাল বুনো শুয়োর হাটে ঢুকে পড়ে এলোমেলো ভাবে ছুটোছুটি করছে। নিমেষে প্রবল আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে লোকজনের মধ্যে। হুড়োহুড়ি দৌড়োদৌড়ি পড়ে যায়। মানুষজনের পায়ের ধাক্কায় জিনিসপত্র, হাড়ি, কলসি, আনাজপাতি, তরিতরকারি গড়াতে থাকে মাটিতে। ভয়ে চিৎকার করতে থাকে অনেকে।
আত্মরক্ষার জন্য কেউ কেউ লাঠি হাতে রুখে দাঁড়ায়, কেউ বা খুঁজতে থাকে নিরাপদ আশ্রয়। আচমকা একটা বুনো শুয়োর তির বেগে ছুটে আসতে থাকে কামারশালার দিকে। হাড় হিম হয়ে যায় নীলকণ্ঠর।
চকিতে বটগাছের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা কামারশালার খানকয়েক বল্লমের মধ্যে থেকে একখানা বল্লম হাতে নিয়ে আরেক হাতে বটগাছের ঝুরি আঁকড়ে ধরে শূন্যে উঠে যায় স্ট্রন। ঝুলন্ত অবস্থাতেই ছুড়ে মারে বল্লমটা। নিখুঁত নিশানা। শুয়োরের গলায় গিয়ে বিদ্ধ হয় বল্লম। তীব্র চিৎকার করে উঠে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে শুয়োরটা। ভয় পেয়ে ছুটে পালিয়ে যায় বাকি শুয়োরগুলো।
ছোকরা সাহেবের কেরামতি দেখে তাজ্জব হয়ে যায় হাটের লোকজন। ছুটে এসে তারা ঘিরে ধরে স্ট্রনকে। ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘বহুত আচ্ছা সাহেব। আপনি না থাকলে আজ অনেকের প্রাণ যেত।’
অনেকে বলে ওঠে, ‘ঠিক বলেছেন মুনশিজি। এই সাহেব সত্যিই বাহাদুর বটে।’
‘তা সাহেবকে তো কিছু নজরানা দেওয়া উচিত আপনাদের।’
একজন বলল, ‘এ ঠিক কথা বটে।’
স্ট্রনের কাছে সরে এসে চাপা গলায় কিছু বললেন নবকৃষ্ণ।
স্ট্রন ‘ইয়েস ইয়েস’ বলে মাথা নাড়ল।
নবকৃষ্ণ জড়ো হওয়া লোকজনের উদ্দেশে বললেন, ‘সাহেব যা চায় দেবেন আপনারা? তবে মাগনা নয়। তার জন্য উচিত কড়ি পাবেন। অনেকেই তো গোরুর গাড়ি নিয়ে এসেছেন হাটে। সাহেব চান খান তিরিশ গো-গাড়ি।’
মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানায় স্ট্রন। ‘ইয়েস। ইয়েস। বুলক কার্ট।’
একজন অবাক হয়ে শুধোয়, ‘গো-গাড়ি?’
নবকৃষ্ণ বলেন, ‘হ্যাঁ। সাহেব অবশ্য নিজের জন্য চাইছেন না। চাইছেন কোম্পানির ফৌজের জন্য।
‘ফৌজের জন্য গো-গাড়ি?’
‘রসদ বয়ে নিয়ে যেতে হবে। গাড়ির দাম বাবদ ন্যায্য মূল্য পাবেন সবাই।’
একজন প্রশ্ন করে, ‘নবাবের সঙ্গে কোম্পানির ফের যুদ্ধ লাগবে বুঝি?’
‘সে খোঁজে আপনাদের কী প্রয়োজন?’
‘কিন্তু মুনশিজি আমরা নবাবের প্রজা। কোম্পানির ফৌজের জন্য গো-গাড়ি জোগান দিলে নবাবের সঙ্গে যে গদ্দারি করা হয়। পরে হয়তো গর্দান নেবেন নবাব। আমরা ছাপোষা লোক।’
কিছু একটা বলে ওঠে স্ট্রন তার দেশি ভাষায়।
নবকৃষ্ণ বলেন, ‘সাহেব বলছেন, তিনি যে বুনো শুয়োরের দলকে ঢিট করে এতজনের প্রাণ বাঁচালেন তার বিনিময়ে কোম্পানির জন্য এই উপকারটুকু করতে পারবেন না আপনারা?’
‘আমরা রাজরোষে পড়ব যে মুনশিজি।’
নবকৃষ্ণ বলেন, ‘আপনারাই তো রসদ জুগিয়ে এতদিন কোম্পানির এই সাহেবদের বাঁচিয়ে রেখেছেন।’
‘হাট তো বসেছে ফৌজদারের হুকুমে।’
নবকৃষ্ণ বলেন, ‘বাঃ! রসদ জুগিয়ে কোম্পানির সাহেবদের জান বাঁচালেন, তাতে দোষ হল না, খানকয়েক গো-গাড়ি জোগান দিলেই নবাবের সঙ্গে দুশমনি করা হবে? এ তো ভারী আজব যুক্তি! মাল তো আপনারা আজ কাটিয়েছেন প্রচুর। গো-গাড়িগুলো সব খালি হয়ে গেছে। সওদা আজ মন্দ হয়নি, কী বলেন? গো-গাড়ির বাজার মূল্যের দ্বিগুণ দাম দেবেন ক্লাইভ সাহেব। ভেবে দেখুন সবদিক থেকেই আপনাদের লাভ। সেই সঙ্গে নিখরচায় এই ছোকরা সাহেবের উপকারের মূল্যও চুকিয়ে দেওয়া যাবে।’
হঠাৎ ট্রাম্পেটে ফুঁ দিয়ে মনোরম একটা সুর বাজায় স্ট্রন। এ সুর দেশজ গানের। গাঁয়ের লোকের কাছে খুবই পরিচিত। গঙ্গায় দাঁড় বেয়ে যাওয়া দেশি নৌকোর মাঝির গান শুনে সুরটা তুলে নিয়েছে স্ট্রন। লোকজন হাঁ হয়ে যায় সাহেবকে এই সুর বাজাতে দেখে। আশ্চর্য বাদ্যযন্ত্রটা জুলজুলে চোখে দেখতে থাকে অনেকে। এমন আশ্চর্য বাঁশি আগে কখনও দেখেনি তারা।
একজন বলে, ‘সাহেবের দেখছি অনেক গুণ!’
নবকৃষ্ণ বলেন, ‘হ্যাঁ! একেবারে কেষ্টঠাকুরটি। শুধু বাঁশিটি ভিন্ন এই যা—’
ভিড় ঠেলে সামনে এসে একজন বলে ওঠে, ‘আমি পনেরো খানা গো-গাড়ি নিয়ে আজ হাটে এসেছিলাম। মাল সব বিকিয়ে গেছে।’
নবকৃষ্ণ লোকটিকে জরিপ করে বলেন, ‘সনাতন না? বাপ রে! সেই সুতানুটি থেকে তুমিও এসেছ ফলতার হাটে?’
সনাতন বলে, ‘কী করব মুনশিজি! সবই তো জানেন আপনি। মাঝে মধ্যে আনাজপাতি, চাল, ডাল জোগান দিতাম ফোর্ট উইলিয়ামে। সাহেবরা কলকাতা ছাড়া হল, কারবারও ডুবল। আলিনগর এখন খালিনগর। মরা শহর। মাল কাটানোর লোক নেই। কারবারিদের অনাহারে মরার দশা। একজনের মুখে শুনলাম ফলতায় ইংরেজদের জাহাজ এসেছে। ফৌজ এসেছে। ভাবলাম সওদা জবর হবে। তা কাল মধ্যরাতে এখানে এসে পৌঁছেছি। গো-গাড়িগুলো আমি দিতে রাজি আছি মুনশিজি। দামটা আর একটু বেশি পাওয়া যায় না?’
‘ধন্যি কারবারি বটে তুমি! যাদের জন্য আজ সওদা করলে, সুযোগ বুঝে তাদেরই দুইয়ে নিতে চাও? বেশ তাই হোক। তা চাই কত তোমার?’
সনাতন হাত কচলে বলে, ‘অতগুলো গো-গাড়ি নিয়ে সুতানুটি থেকে এতটা পথ এসেছি, রাহা খরচের একটা ব্যাপার আছে, তাছাড়া কোতোয়াল-ফৌজদারের বিষনজরে পড়ার ঝুঁকিও একটা আছে। তা গাড়ি পিছু বাজার মূল্যের আড়াই গুণ ধরলেই হবে।’
‘বেশ তাই পাবে।’ বললেন নবকৃষ্ণ।
অন্য একজন বলে উঠল, ‘এমন দাম পেলে আমিও পাঁচখানা গো-গাড়ি দিতে পারি।’
দেখতে দেখতে তিরিশখানা গোরুর গাড়ি জোগাড় হয়ে গেল। সার বেঁধে গাড়োয়ানরা গাড়িগুলো নিয়ে চলল গঙ্গার দিকে। একটা মোষের পিঠে চড়ে বসে ট্রাম্পেটে সুর তুলল স্ট্রন। ট্রাম্পেটের শব্দের সঙ্গে, বলদ ও মোষের গলার ঘন্টির ঠুং ঠাং ধ্বনি যুক্ত হয়ে সৃষ্টি হল এক অনবদ্য ঐকতান।
গো-গাড়ির সারির পিছনে লাঠি হাতে দৃপ্ত পদক্ষেপে হেঁটে চললেন নবকৃষ্ণ। পৌষের শেষ বিকেলের আলো তখন প্রায় নিভে এসেছে।
