৪
শেষ পর্যন্ত লরেন্স ও গ্রান্টের ঘর ছেয়ে ডাঙায় থাকা হয়ে ওঠেনি। জঙ্গলে শুয়োর শিকার করে ফেরার দিন রাতেই গ্রান্ট অসুস্থ হয়ে পড়ে। দিনসাতেক হয়ে গেল, রোগের কোনও উপশম হচ্ছে না। রোজ সন্ধেবেলা কাঁপুনি দিয়ে ধুম জ্বর আসে। দুটো তিনটে কম্বল চাপা দিলেও শরীরের কাঁপুনি যায় না। বর্ষার সময়, বাংলা মুলুকে এ ধরনের জ্বরের প্রকোপ নতুন কিছু নয়। অনেকেই ভোগে। কেউ সেরে ওঠে, কেউ গোরে যায়।
খাটের পাশে কুরসিতে বসে গ্রান্টের কপালে হাত রাখতেই লরেন্সের হাতে ছ্যাঁকা লাগে। গা একেবারে পুড়ে যাচ্ছে! আজ জ্বরটা আরও বেড়েছে। রুমাল ভিজিয়ে গ্রান্টের কপালে বিছিয়ে দেয় লরেন্স।
শুধু গ্রান্ট নয়, আরও অনেকে জ্বরে ভুগছে। জাহাজের একটা ছোট কেবিনে ঠাসাঠাসি করে রাখা হয়েছে ছ’জন রোগীকে। ডাক্তার একজন আছে বটে। কিন্তু ওষুধ নেই, পথ্যি নেই। প্রভু যিশুই ভরসা এখন।
কাশির দমকে বিছানায় উঠে বসে গ্রিফিথ। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বেচারা ছেলেটা। মাত্র মাসদুয়েক আগে এসেছে কলকাতায়। কলকাতার হাওয়া গায়ে লাগতে না লাগতেই অসুখে পড়েছে। ডাক্তার আথারটন বলছেন সর্দিগরমি। বুকে কফ বসেছে।
খোলা জানালা দিয়ে হু-হু করে ঢুকছে গঙ্গার জোলো হাওয়া। অসুস্থ রোগীর পক্ষে ক্ষতিকারক। কিন্তু উপায় নেই। জানালার আগল ফেললে এই ছোট কেবিনে দম আটকে আসবে।
রেড়ির তেলের দীপ জ্বলছে ঘরে। দেওয়ালের উপর পড়েছে গ্রিফিথের অতিকায় ছায়া। সামনের দিকে পিঠ ঝুকিয়ে কাশছে গ্রিফিথ। কেশেই চলেছে।
গ্রিফিথের ছায়ার দিকে চোখ পড়তে হঠাৎ লরেন্সের মনটা কেমন এক অজানা ভয়ে কেঁপে ওঠে। এ যেন মৃত্যুর ছায়া পড়েছে দেওয়ালে। কোনও অশুভ আত্মা মৃত্যুর বার্তা নিয়ে এসেছে। একে একে গ্রাস করবে সবাইকে। এই জলা-জঙ্গলে পড়ে থাকা একজন ইংরেজও বাঁচবে না।
পায়ের শব্দ শুনে দরজার দিকে তাকায় লরেন্স। ব্যস্ত হয়ে ঘরে ঢোকেন মেরি বুকানন।
লরেন্স কুরসি ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।
গ্রিফিথের খাটের পাশে এসে দাঁড়ান মেরি। তার পিঠে হাত বুলিয়ে দেন।
জলের পাত্রের দিকে ইঙ্গিত করে গ্রিফিথ। জলের পাত্র তার মুখের সামনে এগিয়ে দেন মেরি।
জল খেয়ে হাঁপাতে থাকে গ্রিফিথ। কাশির বেগ কমেছে। ধীরে ধীরে সে শুয়ে পড়ে বিছানায়।
লরেন্স সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে মেরি বুকাননের উদ্দেশে বলে, ‘গুড ইভিনিং ম্যাডাম!’
লরেন্সকে দেখে মুচকি হেসে এগিয়ে আসেন মেরি। দুগালে টোল পড়ে। মেরি জবাবে বলেন, ‘গুড ইভিনিং। তোমার বন্ধু আজ কেমন আছে?’
‘জ্বর বেড়েছে।’
গ্রিফিথের খাটের পাশ থেকে সরে এসে গ্রান্টের খাটের পাশে রাখা কুরসিতে এসে বসেন মেরি বুকানন।
গ্রান্ট জ্বরের ঘোরে প্রায় বেহুশ। ঠোঁট ফাঁক হয় তার, বিড়বিড় করে কিছু বলে। কথাটা শোনার জন্য লরেন্স ঝুঁকে পড়ে তার উপরে। কথাটা এবারে স্পষ্ট শোনা যায় কথা। ‘মেরি, মেরি মাই সুইট হার্ট, মাই সুইটি।’
দারুণ অস্বস্তিতে পড়ে যায় লরেন্স। সংকোচের সঙ্গে সে মেরি বুকাননের মুখের দিকে তাকায়। মেরি বুকাননের মুখ গম্ভীর। যদিও লরেন্স ভালোই জানে গ্রান্টের এই মেরি ইয়র্কশায়ারের এক ষোড়শী ব্রুনেট, কখনোই মেরি বুকানন নন, তবুও কী বিড়ম্বনা!
মেরি প্রশ্ন করেন, ‘কী বলছে ও?’
‘রোগের বিকারে ভুল বকছে।’
‘মেরি কে?’
‘মেরি চেস্টারফিল্ড। ইয়র্কশায়ারের এক ষোড়শী ব্রুনেট।’
‘তোমার বন্ধুর গার্লফ্রেন্ড?’
‘গার্লফ্রেন্ড ঠিক বলা যায় না। মেয়েটিকে খুব পছন্দ করত গ্রান্ট, তবে মেয়েটি আমল দেয়নি।’
লরেন্সের দিকে মুখ তুলে চেয়ে মুচকি হেসে মেরি বলেন, ‘ও মাই গড। পুওর ফেলো।’
গ্রান্টের শরীরটা আনচান করতে থাকে। হঠাৎ ধড়ফড় করে উঠে বসে বলে, ‘জেসাস, জেসাস। লরেন্স, জেসাস এসেছেন। দেখতে পাচ্ছ না? ঘরে কত আলো?’
‘জন, শান্ত হও। শান্ত হও। তুমি সেরে উঠবে। জাহাজ আসছে মাদ্রাজ থেকে। শিগগিরই এসে পড়বে। আমরা আবার কলকাতায় ফিরে যাব।’
সাময়িক এই উত্তেজনার পর গ্রান্ট আবার নেতিয়ে পড়ে। তাকে ধরে মেরি বুকানন ও লরেন্স বিছানায় শুইয়ে দেয়। অবসন্ন দেহে বিছানায় অসাড় হয়ে পড়ে থাকে গ্রান্ট।
প্রায় শুকিয়ে যাওয়া রুমাল আবার জলে ভিজিয়ে গ্রান্টের কপালে বিছিয়ে দিয়ে মেরি বলেন, ‘যাও, বাইরে ডেকে গিয়ে কিছুক্ষণ হাওয়া খেয়ে এসো টিম, আমি তোমার বন্ধুকে দেখছি।’
ঘরের বাইরে বেরিয়ে ডেকের একপ্রান্তে এসে দাঁড়ায় লরেন্স। এই মেরি ম্যাডামকে খুব ভালো লাগে তার। মেরি ম্যাডাম বেশ বড় ঘরের মেয়ে। ক্যাপ্টেন জন বুকাননকে বিয়ে করে এদেশে এসেছিলেন। পদমর্যাদায় ও সামাজিক অবস্থানের দিক দিয়ে জন বুকাননের স্থান ছিল লরেন্সের মতো ছোকরা কেরানির চেয়ে অনেক উপরে।
লরেন্স লক্ষ করে দেখেছে, উপরতলার সাহেব ও তাদের বিলিতি মেমদের অহংকারে মাটিতে পা পড়ে না। এরা যেন ভিনগ্রহের মানুষ। দূরের তারা। নীচুতলার কর্মচারীদের মানুষ বলেই মনে করেন না। চোখের দৃষ্টিতে সবসময় অবজ্ঞা ছুড়ে দেন। কিন্তু মেরি বুকানন ও জন বুকানন ছিলেন একেবারে বিপরীত প্রকৃতির। খুব সহজভাবেই সবার সঙ্গে তাঁরা মেলামেশা করতেন। এজন্য বুকানন দম্পতিকে উপরতলায় অনেক টিপ্পনি শুনতে হত। তাঁরা অবশ্য এসবে কিছু মনে করতেন না, মজা পেতেন।
কলকাতার যুদ্ধের সময় মেরিকে ফলতাগামী জাহাজে তুলে দিয়ে জন বুকানন নিজে থেকে যান কলকাতায়। তখনও লড়াই চলছে। সহযোদ্ধাদের ফেলে রেখে পালিয়ে যেতে চাননি ক্যাপ্টেন বুকানন। যুদ্ধ শেষে বিধ্বস্ত অবস্থায় আরও অনেকে কলকাতা থেকে পালিয়ে এসে ফলতায় আশ্রয় নেন। কিন্তু ক্যাপ্টেন জন বুকাননের আর ফলতায় আসা হয়নি। অনেক হতভাগ্য ইংরেজের মতো ফোর্ট উইলিয়ামের অন্ধকূপে তিনি মারা যান।
স্বামীর মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই খুব ভেঙে পড়েছিলেন মেরি। পাশে আপনজন বলতে কেউ নেই। চট করে ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়ারও কোনও উপায় নেই। সাময়িক অবসাদ কাটিয়ে উঠে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন মেরি, অসুস্থ হয়ে পড়া ইংরেজদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন।
কাঠের রেলিংয়ে ভর দিয়ে ডেকের উপর দাঁড়িয়ে ছিল লরেন্স। দৃষ্টি গেল পাড়ের দিকে। চোখে পড়ল মশালের আলো। ওখানে ইংরেজদের অস্থায়ী চার্চ। সুন্দরী গাছের গুঁড়ি খোদাই করে ক্রস বানিয়ে দরমার বেড়া ও গোলপাতার ছাউনি দেওয়া বড়সড় একটা ঘরের মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। জাহাজের প্রেয়ার রুমের মধ্যে এত লোকের ধর্মাচারণে অসুবিধা হচ্ছিল, তাই এই ব্যবস্থা। প্রতি রবিবার ইংরেজরা ওই অস্থায়ী চার্চে গিয়ে জড়ো হয়। প্রেয়ার করে। এই দুঃসহ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য প্রভু যিশুর কাছে প্রার্থনা জানায়।
দুম দুম দুম!
গুলি ছোড়ার শব্দ শুনে কেঁপে ওঠে লরেন্স। পরে বুঝতে পারে, জানোয়ার তাড়ানোর জন্য ব্ল্যাঙ্কফায়ার করছে গোরস্থানের পাহারায় মজুত পল্টনরা।
চার্চের পাশেই গোরস্থান। জায়গাটা বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা হয়েছে সদ্য। তবুও বেড়ার ফোকর দিয়ে শেয়াল ঢুকে পড়ে। কবরের মাটি খুঁড়ে সমাধি অপবিত্র করে। পচাগলা শবদেহ থেকে মাংস খুবলে খায়। তাই গোরস্থান পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পল্টনরা বন্দুক ছুড়ে শেয়াল তাড়ায়। এখনও পর্যন্ত সাতআটজনকে সমাহিত করতে হয়েছে ওই গোরস্থানে। প্রায় সকলেই মরেছে বাংলার অজানা জ্বরে।
হঠাৎ লরেন্সের মনটা কেমন অস্থির হয়ে ওঠে। গ্রান্ট সেরে উঠবে তো?
ফোর্ট উইলিয়াম জাহাজের ডেকে এসে পড়েছে শেষ বিকেলের মরা হলুদ আলো। নিজের কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে বাইরের খোলা হাওয়ায় দাঁড়ালেন রজার ড্রেক, কলকাতা কাউন্সিলের গভর্নর। চোখেমুখে তীব্র উদ্বেগ। দুই আঙুলের ফাঁকে ধরা আছে বার্মাচুরুট। গলায় ঝোলানো আছে দূরবিন।
কয়েকবার ঘনঘন ধোঁয়া ছেড়ে দূরবিনে চোখ রাখেন ড্রেকসাহেব। দৃষ্টি দক্ষিণপথে। মনে একরাশ আশা, যদি মাদ্রাজ থেকে আসা কোম্পানির কোনও জাহাজের মাস্তুল চোখের পর্দায় ভেসে ওঠে। খানিকবাদে হতাশ হয়ে নামিয়ে রাখেন দূরবিন। আজও জাহাজের দেখা নেই। কতদিন যে এভাবে কাটাতে হবে কে জানে!
কাশিমবাজার হাতছাড়া হওয়ার খবর পাঠানো হয়েছে অনেক’দিন আগে। দু-দুটো চিঠি পাঠিয়েছেন রজার ড্রেক। চিঠি কি পায়নি মাদ্রাজ কাউন্সিল? কলকাতার খবর জানাতে মাদ্রাজ গিয়েছেন লেফটেনান্ট লেবাম ও ম্যানিংহাম। তাঁদের তো এতদিনে মাদ্রাজে পৌঁছে যাওয়ার কথা।
ড্রেক ভাবেন, তাঁর চিঠি না পেলেও এতদিনে লেবাম ও ম্যানিংহামের মুখ থকে মাদ্রাজ কাউন্সিল নিশ্চয়ই শুনেছে সব কথা। তাহলে সাহায্য পাঠাতে এত দেরি হচ্ছে কেন? কাউন্সিলের কর্তারা কি বুঝতে পারছে না যে সুবে বাংলায় ইংরেজরা কতটা অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়েছে?
দুই আঙুলের ফাঁকে গুঁজে রাখা চুরুটটা নিভে গিয়েছে। বিরক্তির সঙ্গে আধপোড়া চুরুটটা জলে ছুড়ে ফেলেন রজার ড্রেক। হঠাৎই তাঁর দৃষ্টি আটকে গেল পাড়ের দিকে। ওদিকে তুমুল হইচই। সারাদিন বনেজঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোর পর ছোট ছোট শালতিতে চেপে জাহাজের ডেকে ফেরার তোড়জোড় করছে কোম্পানির হতভাগ্য কর্মচারীরা।
এরপর সব ডেকে উঠে শুরু করবে বেজায় চিৎকার, চেঁচামেচি, গোলমাল। অল্প জায়গায় একগাদা লোক থাকলে যা হয়। জাহাজে স্থান সংকুলান হচ্ছে না সবার। তার উপরে রোজই লোক সংখ্যা বাড়ছে। নবাব সিরাজদ্দৌলা গোটা বাংলায় ইংরেজদের ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। বাংলার বিভিন্ন জায়গা থেকে রোজই কুঠিয়াল ও কেরানিরা এসে জড়ো হচ্ছে ফলতায়।
এদিকে খাবারদাবারেরও চরম সংকট। ওলন্দাজ ও ফরাসিদের কাছে সাহায্য চেয়েও পাওয়া যাচ্ছে না। একবার মাত্র কিছু আহার্য পাঠিয়ে সাহায্য করেছিলেন ডাচ গভর্নর বিসডাম। একথা জানতে পেরে নবাব সিরাজদ্দৌলা তাঁকে এমন কড়কেছেন যে তিনি আর ও পথে হাঁটার সাহস করছেন না।
মনে অনেক আশা নিয়ে সাহায্যের কথা লিখে নকু ধরকে গোপনে চিঠি পাঠিয়েছিলেন রজার ড্রেক। ওদিক থেকেও এখনও কোনও সাড়া নেই। বেশি পয়সার প্রলোভন দেখালেও স্থানীয় বাজার থেকে কিছুই মিলছে না। নবাবের ভয়ে কেউ ইংরেজদের খাদ্যসামগ্রী বেচতে রাজি নয়।
রসদ প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। ক’দিন পরে কী হবে? এ প্রশ্নের কোনও উত্তর জানা নেই কারও। আকাশের দিকে মুখ তুলে জেসাসকে খোঁজেন রজার ড্রেক। পশ্চিমের সূর্যকে ঢেকে ফেলে ছুটে আসা মেঘ। গুমরে ওঠা শ্রাবণের মেঘের মন্দ্র আওয়াজ শুনে সহসা চমকে ওঠেন ড্রেক। জেসাসের অভয়বাণীর পরিবর্তে সহকর্মীদের সমবেত বিক্ষোভ যেন প্রতিধ্বনিত হয় তাঁর কানে। সহকর্মীরা যেন তাকে বলছে, ‘মিঃ ড্রেক, আজ ইংরেজ বণিকদের এই দুর্দশার জন্য তুমি দায়ী! তোমার নির্বুদ্ধিতার জন্য ডুবছে কোম্পানি, মরছি আমরা। এজন্য তোমাকে কৈফিয়ত দিতে হবে!’
ঘসেটি বেগমের দেওয়ান রাজবল্লভের ছেলে কৃষ্ণবল্লভকে ফোর্ট উইলিয়ামে আশ্রয় দিয়েছিলেন রজার ড্রেক। এই ঘটনায় রুষ্ট হন নবাব সিরাজদ্দৌলা। কিন্তু এর দায় কি ড্রেকের একার? উইলিয়াম ওয়াটস তো কাশিমবাজার থেকে জোর দিয়ে লিখে পাঠিয়েছিলেন, সিরাজদ্দৌলা ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন না। মসনদের দখল নেবেন ঘসেটি বেগম ও রাজবল্লভ। ওই প্রেক্ষিতে রাজবল্লভের ছেলে কৃষ্ণবল্লভকে আশ্রয় দেওয়া কি ভুল সিদ্ধান্ত?
আর পেরিন পয়েন্টে নতুন করে একটা কেল্লা গড়ে তোলার প্রয়োজন কি ছিল না? দরকারটা বিশেষভাবে অনুভূত হয় বর্গির হাঙ্গামার সময়। উত্তরে শহরের কোনও আগল নেই। সত্যিই যদি বর্গিরা কলকাতায় আসত, শুধু মারাঠা ডিচ দিয়ে কি ঠেকানো যেত তাদের? ইংরেজরা কচুকাটা হয়ে যেত না কি? হাজার হাজার সৈন্য নিয়েও কি বর্গিদের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে পেরেছিলেন আলিবর্দির মতো নবাব? আর তাঁর দৌহিত্র? সে তো নালায়েক। তাঁর আপত্তি বলে পেরিন পয়েন্টের দুর্গ ভেঙে ফেলতে হবে?
পড়ন্ত বিকেলে রোদে জাহাজের ডেকে পায়চারি করতে করতে নিজের মনে মনেই জবাব সাজাতে থাকেন রজার ড্রেক। তবে আহাম্মকি একটু হয়েছে বইকি, নবাবের গুপ্তচর নারান সিংকে ওভাবে অপমান করে তাড়িয়ে দেওয়া ঠিক হয়নি। উমিচাঁদকে হেনস্থা করাটাও উচিত হয়নি। উমিচাঁদ ধূর্ত শাপ। তাকে গুড হিউমারে রাখলেই ঠিক হত। কিন্তু সিদ্ধান্ত তো তিনি একা নেননি, নিয়েছে কাউন্সিল। হ্যাঁ এ কথা ঠিক যে, তিনি তাঁর নিজের মতটা কাউন্সিলের উপর জোর করে চাপিয়ে দিয়েছিলেন।
পায়চারি করতে করতে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়েন রজার ড্রেক। দূরে কী একটা যেন দেখা যাচ্ছে। দূরবিনে চোখ রেখে উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠলেন ড্রেক, ‘জাহাজ! জাহাজ! মাদ্রাজ থেকে জাহাজ আসছে!’
গভর্নরের চিৎকার শুনে ছুটে আসেন ওয়াটস, কালেট, হলওয়েল ও ক্রুটেনডন। তাঁদের দেখে খুশি উপচে পড়া গলায় বলেন ড্রেক বললেন, ‘মাই ফ্রেন্ডস, জাহাজ আসছে। জাহাজ আসছে!’
ড্রেকের কথায় তাঁর সহকর্মীদের ঠিক প্রত্যয় হয় না। আগেও একবার জাহাজের মাস্তুল দেখে একইভাবে রজার ড্রেক জাহাজ! জাহাজ! বলে চেঁচিয়ে উঠেছিলেন। পরে দেখা যায়, সেটা ইংরেজদের জাহাজ নয়, ডাচ জাহাজ।
দূরবিনে চোখ রাখেন ওয়াটস। আলো কমে এসেছে। একটা জাহাজ আসছে, তাতে কোনও ভুল নেই। কিন্তু মরা আলোয় মাস্তুল থেকে উড়তে থাকা পতাকাটা ঠিক চেনা যাচ্ছে না।
জোরালো দখিনা বাতাস ও জোয়ারে ভর করে তিরবেগে সামনের দিকে আসছে একটা জাহাজ।
এবারে হলওয়েল দূরবীনে চোখ রেখে দেখলেন, সত্যিই এটা ইংরেজদের জাহাজ। মাস্তুল থেকে উড়ছে ইউনিয়ন জ্যাক। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। জাহাজের নামটাও পড়া যাচ্ছে- ডেলাওয়ার।
ওয়াটস, কালেট, হলওয়েল ও ক্রুটেনডন উল্লাসে মেতে ওঠেন।
জাহাজের বাকি লোকজনও ডেকে এসে জড়ো হয়েছে।
কিন্তু এ কী? ডেলাওয়ারের যে থামার কোনও লক্ষণ নেই। সোজা কলকাতার দিকে তার অভিমুখ। ইংরেজরা কলকাতা থেকে বিতাড়িত এ কথা কি পাইলটের জানা নেই?
ভয়ানক উত্তেজিত হয়ে পড়লেন রজার ড্রেক। দ্রুত ফোর্ট উইলিয়াম থেকে একটা ছিপ নৌকা নামানো হল জলে। কালেট, ক্রুটেনডন ও আরও কয়েকজন কোম্পানির পতাকা দোলাতে দোলাতে দ্রুত দাঁড় বেয়ে ডেলাওয়ারের দিকে এগিয়ে চলল।
গুরুম! গুড়ুম! গুড়ুম!
পরপর তিনটে ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করেন ক্রুটেনডন।
বন্দুকের শব্দ শুনে ডেলাওয়ারের ডেকের উপর ছুটে এসে মেজর কিলপ্যাট্রিক দেখলেন, অদূরে নোঙর করে আছে কোম্পানির জাহাজ ফোর্ট উইলিয়াম। কিন্তু একি! একটা ছিপ নৌকা ডেলাওয়ারের দিকে এগিয়ে আসছে যে। তাতে পতপত করে উড়ছে কোম্পানির নিশান। ডেলাওয়ারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে এরা। ব্যাপার কী?
জাহাজের মুখ ঘোরাবার হুকুম দিলেন কিলপ্যাট্রিক।
মাদ্রাজ থেকে জাহাজ আসার খবরে খুশি হয়ে ডেকের উপর যারা ফুর্তি করছিল লরেন্সও তাদের মধ্যে ছিল। হঠাৎ লরেন্সের মনে পড়ল গ্রান্টের কথা। গ্রান্টকে জাহাজের খবরটা দেওয়ার জন্য ছুটে গিয়ে কেবিনে ঢুকেই চমকে উঠল লরেন্স। চাঁদরে গ্রান্টের গলা পর্যন্ত ঢাকা। বাঁ-হাতটা ঝুলছে। ছুটে গিয়ে গ্রান্টের হাত ধরতেই দেখল তা একেবারে পাথরের মতো ঠান্ডা। নাড়ির স্পন্দন টের পাওয়া যাচ্ছে না।
অস্ফুটে লরেন্স ডাকল, ‘গ্রান্ট। গ্রান্ট। মাই ফ্রেন্ড!’
কোনও সাড়া নেই। বুকের ওঠানামা নেই। গ্রান্টের দেহ নিথর নিঃসাড়। পার্থিব জগৎ ছেড়ে অপার্থিব জগতের উদ্দেশে যাত্রা করেছে গ্রান্ট। জাহাজের খবরে তার আর কোনও প্রয়োজন নেই।
