1 of 2

ফলতা থেকে পলাশি – ৪২

৪২

মোতিঝিল-কাশিমবাজার-কলকাতা-পূর্ণিয়া। একের পর এক লড়াই। মসনদে বসার পর থেকে একেবারেই দম ফেলার ফুরসত পাননি নবাব সিরাজদ্দৌলা। পূর্ণিয়া থেকে ফিরেই ফের ছুটতে হল কলকাতায়। সিরাজ ভেবেছিলেন, এবারে কলকাতার লড়াই ফতে করে ফেরার পর কিছুদিন বিশ্রাম মিলবে। আপাতত আর কোনও ঝক্কি পোহাতে হবে না। সম্পূর্ণ নিষ্কণ্টক হবে মসনদ। বিগত দশ মাসের একটানা লড়াইয়ের ধকলে সত্যিই তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।

নাঃ! নবাব সিরাজদ্দৌলার নসিবে সুখ নেই। শান্তি নেই। কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদে ফিরতে হল শূন্য হাতে। অপমানজনক শর্তে আলিনগরের সুলেনামা সাক্ষর করে ইংরেজদের ভয়ে কার্যত কলকাতা থেকে পালিয়ে এলেন নবাব। ভোরের এক ঝটিকা আক্রমণে কর্নেল ক্লাইভ চুরমার করে দিলেন সিরাজের দম্ভ। দুমড়েমুচড়ে দিলেন তাঁর আত্মবিশ্বাস।

উত্তর ভারতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন আহম্মদ শা আবদালি। বাংলায় তাঁর হানা দেওয়ার সম্ভাবনাটা এখনও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তার উপরে মুর্শিদাবাদ ফিরতে না ফিরতেই নবাব শুনতে পাচ্ছেন ইংরেজরা নাকি চন্দননগর আক্রমণের তোড়জোড় করছে। সত্যিই যদি তাই হয়, তবে ফের আগুন জ্বলবে বাংলায়। মসনদ নিরাপদ থাকবে কি?

ইংরেজদের চিঠি দিলেন নবাব। লিখলেন, ‘…সুবা বাংলায় তোমাদের সওদা ফের শুরু করার হুকুমত দিয়েছি আমি। তোমাদের সঙ্গে সমঝোতা করেছি। তোমরা এরই মধ্যে আবার আমার রাজ্যে আগুন জ্বালানোর মতলব করছ কেন? তোমরা যদি সত্যিই চন্দননগরে হামলা কর, আমাকে তাহলে ফরাসিদের পাশে দাঁড়াতে হবে। মনে রেখো, আমি কোনওমতেই আলিনগরের সুলেনামা ভাঙতে চাই না, তোমরাও বাংলাকে ফের অশান্ত করার কোশিস কোরো না…।’

এই চিঠি লিখেও সিরাজদ্দৌলার দুশ্চিন্তা দূর হল না। ইংরেজরা কি শুনবে তাঁর কথা? ইংরেজদের হাতে চন্দননগর আক্রান্ত হলে ফরাসিদের মদত দেওয়ার জন্য তিনি হুকুম দিয়েছেন হুগলির ফৌজদার নন্দকুমারকে। হুগলিতে পাঠিয়ে দিয়েছেন আড়াই হাজার জবরদস্ত ঘোড়সওয়ার। কিন্তু এই ফৌজ ক্লাইভ ও ওয়াটসনকে ঠেকানোর জন্য আদৌ যথেষ্ট কি?

মিরজাফরকে ডেকে পাঠিয়ে বিরাট এক ফৌজ নিয়ে হুগলির দিকে তুরন্ত কুচ করার হুকুম দিলেন নবাব।

এই হুকুমত শুনে কেঁপে উঠলেন মিরজাফর। হালসিবাগানে সেই ভোরের স্মৃতি এখনও দুঃস্বপ্নের মতো তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। কামানের গর্জনের কানফাটানো শব্দে তাঁর ঘুম ভেঙেছিল সেদিন। মিরজাফর ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসতে না বসতেই একটা গোলা দেওয়াল এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়ে আছড়ে পড়ে তাঁবুর ভিতরে। গোলার ধাক্কায় বাতিদান উলটে গিয়ে তাঁবুতে আগুন ধরে যায়। কোনওরকমে ছুটে বেরিয়ে এসে প্রাণ বাঁচান মিরজাফর। একথা মনে পড়লে এখনও তিনি শিউরে ওঠেন।

কর্নেল রবার্ট ক্লাইভ—এই নামটা রীতিমতো ত্রাসের সঞ্চার করেছে মিরজাফরের মনে। ফের একবার কর্নেলের মুখোমুখি হতে হবে ভেবেই ভয়ে সিঁটিয়ে গেলেন মিরজাফর। বেজার মুখ করে দরবার থেকে বিদায় নিলেন।

উমিচাঁদকে তলব করলেন নবাব। ছুটে এসে নবাবকে সেলাম জানালেন উমিচাঁদ।

নবাব শুধোলেন, ‘এসব কী শুনছি উমিচাঁদজি? কর্নেল ক্লাইভ নাকি চন্দননগরের দিকে কুচ করে আসছেন?’

ভারি অবাক হওয়ার মতো ভান করে উমিচাঁদ বললেন, ‘কার কাছে এই আজিব বাত শুনলেন হুজুর?’

‘ল সাহেব বারবার এসে এ নিয়ে দরবার করছেন আমার কাছে।’

‘এ ঝুটমুট বাত। আপনি পরেশান হবেন না হুজুর। আপনার কাছ থেকে সুবিধা আদায়ের জন্য ইংরেজদের উপর ফরাসিরা ঝুটা ইলজাম লাগাচ্ছে।’

ক্ষণেক ভেবে নিয়ে সিরাজদ্দৌলা চিন্তিত মুখে বললেন, ‘একটা কথা অবশ্য ঠিক, ভিন দেশি সওদাগরেরা সুবা বাংলায় নিজেদের মধ্যে কখনও লড়াই করেছে বলে তো শুনিনি।’

‘ইয়ে হ্যায় আসলি বাত। ইংরেজ ও ফরাসি দু-পক্ষই ঝানু কারবারি। লড়াই-ঝামেলা বাধলে তো এদের নিজেদেরই লোকসান। তাছাড়া আলিনগরের সুলেনামার বরবাদি ইংরেজরা চায় না। আপনাকে তকলিফ দেওয়ার কোনও মতলব নেই ইংরেজদের। ল সাহেব ঝুট বলছেন।’ শেষ কথাটা উমিচাঁদ বেশ জোরের সঙ্গে বললেন।

নবাবের দুশ্চিন্তা উমিচাঁদের কথায় দূর হয় না। তিনি বলেন, ‘লেকিন ইংরেজ কোম্পানির নামে এমন ফরিয়াদ উঠলে আমি কি চুপ থাকতে পারি?’

‘আমি সচ বলছি হুজুর। চন্দননগরে হামলা করবে না ইংরেজ কোম্পানি। তবে তাদের কিছু শিকায়ত আছে।’

‘শিকায়ত? কী শিকায়ত?’ ভুরু কুচকে প্রশ্ন করলেন নবাব।

উমিচাঁদ বললেন, ‘কর্নেল ক্লাইভ জানতে চান, আপনি কেন আলিনগরের সুলেনামার শর্ত মানছেন না?’

এ কথা শুনে সিরাজদ্দৌলা যেন আকাশ থেকে পড়লেন। বললেন, ‘ইয়ে তো আজিব বাত! আমি আবার সুলেনামার বেইজ্জতি করলাম কখন? কসুর কেয়া হ্যায় মেরা?’

‘হুজুর, আপনার সঙ্গে ফরাসিদের নয়, ইংরেজদের সমঝোতা হয়েছে।’

উমিচাঁদের কথার ইঙ্গিত বুঝতে না পেরে তাঁর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন নবাব।

উমিচাঁদ বললেন, আলিনগরের সুলেনামায় ইংরেজদের সঙ্গে আপনার দোস্তি হয়েছে। অতএব আপনার দোস্তের যারা দুশমন, তারা আপনারও দুশমন।

‘তাজ্জব! ইয়ে ক্যায়সা বাত?’

‘ইংরেজরা তাই মনে করে হুজুর। দরিয়ার ওপারে ফরাসিদের সঙ্গে ইংরেজদের লড়াই লেগেছে। আমি শুনলাম, ক্লাইভ সাহেব জানতে চান, এই সময়ে ফরাসিদের সঙ্গে আপনার দোস্তির কারণটা কী? ইংরেজদের দুশমনের সঙ্গে আপনার কীসের রিশতাদারি? এতে কি আলিনগরের সুলেনামার বেইজ্জতি হচ্ছে না?’

সিরাজদ্দৌলা স্তম্ভিত হয়ে উমিচাঁদের মুখপানে চেয়ে রইলেন।

মাথা ঝুঁকিয়ে উমিচাঁদ বললেন, ‘গোস্তাকি মাফ করবেন জনাব। এসব আমার জবান নয়। বলেছেন ক্লাইভ সাহেব।’

সিরাজদ্দৌলা বেশ ঝাঁঝের সঙ্গে বললেন, ‘কর্নেল ক্লাইভের বোঝা উচিত, ইংরেজরা যেমন আমার প্রজা তেমনি ফরাসিরাও আমার প্রজা।’

‘লেকিন আপনার দোস্ত ইংরেজ কোম্পানি। সুলেনামায় এমনই লেখা আছে।’

খানিকটা থতমত খেয়ে নবাব বললেন, ‘মতলব?’

উমিচাঁদ ফের মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, কর্নেল ক্লাইভ জানতে চান, ‘ফরাসিদের নসিব কী করে এমন খুলে গেল? তারা দুর্গ মেরামতের অনুমতি পেল, তনখা ছাপানোর হুকুমত পেল, নগদ একলাখ টাকাও পেল। আর জেনারেল বুসি? তিনি কী মতলবে নওয়ারা নিয়ে বাংলায় আসছেন? নবাব কি ফরাসিদের সঙ্গে দোস্তি পাতিয়ে ইংরেজদের খতম করতে চান?’

চেঁচিয়ে উঠলেন সিরাজদ্দৌলা, ‘ইয়ে গলত বাত। ঝুটা ইলজাম।’

মাথা ঝুঁকিয়ে তসলিম জানিয়ে নরম গলায় উমিচাঁদ বললেন, গোস্তাকি মাফ করবেন হুজুর। এসব আমার কথা নয়, কর্নেল ক্লাইভ বলছেন।

সিরাজদ্দৌলা বেশ গলা চড়িয়েই বললেন, ‘এ আমার দেশ। কার নামে কী পরোয়ানা আমি দেব, সে সওয়াল খুদ আমার। তাই বলে চন্দননগরে হামলা করে আমার দেশে ফির আগ লাগাতে পারে না ইংরেজ কোম্পানি।’

নবাবের চড়া মেজাজ দেখে ঘাবড়ে গিয়ে উমিচাঁদ বললেন, ‘জরুর। জরুর। ইয়ে খাস বাত। কর্নেল ক্লাইভ ইমানদার আদমি। এসব ঠিকই বোঝেন।’

‘তাহলে চন্দননগরে কেন হামলা করতে চায় ইংরেজরা? কর্নেল ক্লাইভ কেন ফৌজ নিয়ে এগোচ্ছেন চন্দননগরের দিকে?’ নবাব উত্তেজিত হয়ে পড়েন।

উমিচাঁদ শান্ত গলায় বললেন, ‘ইয়ে গলত বাত হুজুর। আজ সকালেও আমি খবর পেয়েছি। কর্নেল ক্লাইভ বরানগরের ক্যাম্পেই আছেন। সেখান থেকে নড়েননি।’

‘আপনি সচ বলছেন?’

‘হুজুরকে ঝুট বলব, এত হিম্মত আমার আছে? আমি বহুত সাল ইংরেজদের সঙ্গে কারবার করছি। তারা কখনও কথার খেলাপ করে না।’

খাস-দরবারে হাজির হয়ে নবাবকে তসলিম জানালেন জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ।

তাঁকেও তলব করেছিলেন নবাব। ইংরেজমহলে জগৎশেঠের এখন খুবই খাতির। আলিনগরের সুলেনামা নিয়ে আলোচনার সময় কর্নেল ক্লাইভ স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, তাঁরা একমাত্র জগৎশেঠের মারফত কথা বলবেন। কর্নেল ক্লাইভের এই খায়েশে নসিব ফিরেছে শেঠজির।

নবাব বুঝেছেন জগৎশেঠকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা যাবে না। কেননা ইংরেজরা তাঁকে মানে। সিরাজদ্দৌলা তাই আজকাল বেশ খাতির করছেন শেঠজিকে। এতে অবশ্য জগৎশেঠ উল্লসিত নন। তিনি বোঝেন, ইংরেজভীতির জন্য দায়ে পড়ে আজ তাঁকে খাতির করছেন নবাব। এটা সাময়িক। ক্লাইভ ও ওয়াটসন সৈন্যবাহিনী সমেত মাদ্রাজে ফিরে গেলেই নবাব সিরাজদ্দৌলা অন্য মূর্তি ধরবেন।

জগৎশেঠের উদ্দেশে উষ্ণ গলায় নবাব বললেন, ‘আসুন শেঠজি। অসময়ে আপনাকে তকলিফ দিলাম।’

‘কীসের তকলিফ?’

‘আপনি বোধ হয় বিশ্রাম করছিলেন।’

‘আপনি মালিক। সুবে বাংলার নবাব। আপনি তলব করলে তুরন্ত হাজির হওয়াই তো দস্তুর। এতে তকলিফ হবে কেন?’

জগৎশেঠের উদ্দেশে উমিচাঁদ বললেন, ‘ইংরেজরা কি কখনও কথার খেলাপ করে শেঠজি? আপনিও তো ইংরেজ কোম্পানির সঙ্গে কম কারবার করেননি।’

‘উমিচাঁদজি সহি বাত বলছে হুজুর। ইংরেজলোগ বহুত ইমানদার। যতবারই আমার কাছ থেকে তনখা ধার নিয়েছে ততবারই ঠিক সময়ে কড়ায় গণ্ডায় সব মিটিয়ে দিয়েছে। বরং কথা রাখে না ফরাসিরা। আমার কাছে তাদের অনেক টাকার দেনা। তাগাদা দিতে দিতে আমি থকে গেলাম।’

উমিচাঁদ এবার মৃদু হেসে হাত কচলে বললেন, ‘শুনলেন তো হুজুর, আমরা আপনার গোলাম। আপনাকে কি ঝুটমুট কিছু বলতে পারি?’

জগৎশেঠ বললেন, ‘আপনি খুশ মেজাজে থাকুন হুজুর। ইংরেজরা চন্দননগরে হুজ্জুতি করবে না। শুনলাম আপনি জাফর আলি খাঁ সাহেবকে ফৌজসহ হুগলিতে কুচ করার হুকুম দিয়েছেন। এ হুকুম ফিরিয়ে নিন। এতে ইংরেজ কোম্পানি আপনাকে ভুল বুঝবে।’

উমিচাঁদ বললেন, ‘ইয়ে বড়িয়া বাত।’

জগৎশেঠ ও উমিচাঁদের কথায় আশ্বস্ত হলেন নবাব। মিরজাফরের উপর থেকে হুগলির উদ্দেশে কুচ করার হুকুম প্রত্যাহার করে নিলেন।

আপাতত নিশ্চিন্ত হলেন উমিচাঁদ। কর্নেল ক্লাইভকে বড় মুখ করে তিনি কথা দিয়ে এসেছেন যে মুর্শিদাবাদ দরবারে ইংরেজদের স্বার্থ দেখবেন। মিরজাফর ফৌজসহ হুগলির দিকে কুচ করলে কর্নেল ক্লাইভের কাছে আর মুখ দেখাতে পারতেন না উমিচাঁদ। বেইজ্জতির একশেষ হত।

উইলিয়াম ওয়াটসের কথার আভাস ইঙ্গিতে উমিচাঁদ বুঝে গিয়েছেন, ইংরেজরা চন্দননগরে হামলা করবেই। কাজেই এই সময়ে ফরাসিদের সাহায্য করার জন্য নবাবের সেনা পাঠানোর মতলব ভেস্তে দিয়ে কর্নেল ক্লাইভের কাজটা সহজ করে দিতে পেরে খুব খুশি উমিচাঁদ। আপাতত কর্নেল ক্লাইভের সুনজরে থাকতে চান তিনি।

উমিচাঁদ দিব্যি বুঝতে পারছেন, সুবে বাংলার ভাগ্য নিয়ন্তা হয়ে উঠতে চলেছেন রবার্ট ক্লাইভ। কলকাতা থেকে নবাবের ফিরে আসার পর দরবারে ফের সক্রিয় হয়ে উঠছে মুর্শিদাবাদ দরবারের সাজিশের কারবারিরা। তারা ফিসফাস করছে কর্নেল ক্লাইভই হলেন সেই কাবিল ইনসান, যিনি নবাবকে মসনদচ্যুত করতে পারবেন। ক্রমশ কালো মেঘে ছেয়ে আসছে সুবে বাংলার রাজধানীর আসমান। আঁধি এল বলে।

কর্নেল ক্লাইভ ও ওয়াটসন চন্দননগর আক্রমণ করতে পারেন, এ কথা কানে আসতে ঘুম উড়েছে জগৎশেঠের। কারণটা বৈষয়িক। কিছুদিন আগেও ফরাসিদের কারবারে মোটা টাকা বিনিয়োগ করেছেন শেঠজি। এখন ইংরেজদের হাতে মার খেয়ে ফরাসিদের কারবারই যদি উঠে যায়, তবে টাকা শুধবে কে?

মহিমাপুর কুঠির গদিঘরে ফরাসিদের কাছে তাঁর পাওনাগণ্ডার হিসেব করতে বসে চোখ কপালে উঠে গেল জগৎশেঠের। লাখ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। এখনই কাশিমবাজারের ফরাসি কুঠিতে ফের একবার তাগাদা দিয়ে চিঠি লেখার জন্য দেওয়ান রণজিৎ রায়কে ডেকে আদেশ দিলেন তিনি।

কিছুক্ষণ পর জাঁ ল নিজেই এসে হাজির হলেন মহিমাপুরের কুঠিতে।

ল-কে দেখেই শেঠজি বলে উঠলেন, ‘সালামত সাহেব। আপনার কথাই ভাবছিলাম।’

‘এ তো আমার জন্য বহুত খুশনসিব কি বাত। সুবে বাংলায় জগৎশেঠ যাঁকে ইয়াদ করেন, তাঁর আর কোনও ভাবনা থাকে না।’ এই বলে সৌজন্যের হাসি হাসলেন ল সাহেব।

‘এদিকে আমার নসিব যে খুশ থাকছে না সাহেব। আপনাদের জন্য আমার কারবার যে বরবাদ হওয়ার জোগাড়।’

ল হেসে বললেন, ‘কেন আমাদের কসুর কী হয়েছে?’

‘আমার কাছে কত টাকা দেনা, হুঁস আছে আপনাদের?’

‘জরুর আছে। আপনি আছেন তাই আমাদের কারবারও সালামত আছে। আপনিই আমাদের ভরসা শেঠজি।’

জগৎশেঠ বললেন, ‘দেখুন ল সাহেব, পাওনা না পেলে আমি কিন্তু আপনাদের কারবারে ফের বিনিয়োগ করতে পারব না।’

‘ফরাসিরা ইমানদার জাত। বকেয়া আপনি শিগগিরই পেয়ে যাবেন, তবে আজ আমি কিন্তু আপনার কাছে টাকা চাইতে আসিনি। অন্য কথা আছে। বিষয়টা খুব গুরুতর।’

আলোচনায় ছেদ পড়ে। একজন দাখিলা এসে পাথরের গেলাস ভর্তি লস্যি রেখে যায় নীচু চৌপাইয়ের উপর।

জগৎশেঠ বললেন, ‘নিন সাহেব। কেশর লস্যি। বহুত আচ্ছা। দিল-তবিয়ত সব খুশ হয়ে যাবে।’

পাথরের গেলাস হাতে তুলে নিয়ে জাঁ ল বললেন, ‘আপনি কী চান? আমাদের বরবাদি?’

জগৎশেঠ হেসে বললেন, ‘এ আপনি কী বলছেন? আমি আপনাদের বরবাদি চাইব কেন? আপনাদের কারবার বরবাদ হয়ে গেলে আমার দেনা শুধবে কে?’

‘আপনি নবাবকে ভুল বোঝাচ্ছেন কেন?’ প্রশ্ন করলেন জাঁ ল।

ফের ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়িয়ে জগৎশেঠ জবাব দিলেন, ‘কী ভুল বোঝালাম?’

‘হুগলিতে ফৌজ পাঠাতে রাজি আছেন নবাব। আপনি বাধা দিচ্ছেন কেন?’

‘ফৌজ দিয়ে কী হবে আপনাদের?’

‘কী হবে মানে? কী বলছেন আপনি? কর্নেল ক্লাইভ চন্দননগর আক্রমণ করতে চান, এ তো এখন সবাই জানে। নবাব মদত না দিলে আমরা বাঁচব কেমন করে?’

‘আপনি নিজের উপরে ফালতু তকলিফ নিচ্ছেন। ইংরেজরা আপনাদের সঙ্গে লড়াই করবে না।’

‘আপনি জানেন ইউরোপে ইংরেজদের সঙ্গে আমাদের লড়াই বেধেছে?’

‘জানি।’

‘এটা বুঝতে পারছেন না, এই অজুহাতে ইংরেজরা হামলা করতে চায় চন্দননগরে। ইংরেজদের ফৌজের মতো জবরদস্ত ফৌজ আমাদের নেই শেঠজি। নবাবের সাহায্য না পেলে আমাদের সর্বনাশ হয়ে যাবে। আপনি তাই চান?’ ল-এর গলায় ফুটে উঠল করুণ আর্তি।

জগৎশেঠ নরম তাকিয়াটা কোলের উপর তুলে নিয়ে বললেন, ‘আপনারা তো শুধু নিজের দিকটাই ভাবছেন, নবাবের দিকটা ভেবে দেখেছেন কী?’

এ প্রশ্নের অর্থ বুঝতে না পেরে জগৎশেঠের মুখপানে চেয়ে থাকেন জাঁ ল।

শেঠজি বললেন, ‘আপনাদের জন্য নবাব কি বে-ইমানদারের মতো কাজ করতে পারেন?’

‘এ আপনি কেমন কথা বলছেন? আমরা নবাবের প্রজা। প্রজাদের রক্ষা করাই তো ইমানদার নবাবের দায়িত্ব।’

জগৎশেঠ মুচকি হেসে বললেন, ‘আলিনগরের সুলেনামায় বাংলায় শান্তি বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। আমি যত দূর জানি, কর্নেল ক্লাইভ এখনও বরানগরে রয়েছেন। তিনি মোটেই ফৌজ নিয়ে চন্দননগরের দিকে কুচ করছেন না। এই সময় নবাব যদি চন্দননগরে সেপাই-লস্কর পাঠান তাহলে তো ইংরেজ কোম্পানি বলবে—তাদের সঙ্গে বেইমানি করছেন নবাব। তাঁর জবানের কোনও কিম্মত নেই। নবাব আলিনগরের সুলেনামা মানছেন না। তিনি নিজেই শান্তি বিঘ্নিত করছেন।’

জগৎশেঠের যুক্তি শুনে হতাশ হয়ে পড়লেন জাঁ ল। তিনি অভিমানের সুরে বললেন, ‘বেশ উঠি এখন। আপনি তাহলে আমাদের জন্য কিছু করবেন না। ইংরেজদের বিরুদ্ধে আপনারা যেতে চান না কেন বুঝতে পারছি। আসলে আপনারা ইংরেজদের সাহায্য নিয়ে সিরাজদ্দৌলাকে মসনদচ্যুত করতে চান, তাই তো?’

একথা শুনে জগৎশেঠের চোখদুটো বিস্ফারিত হয়ে গেল। তিনি চাপা গলায় বললেন, ‘এসব কী বলছেন ল সাহেব? এসব কথা নবাবের কানে গেলে আর রক্ষে নেই। গলা নামিয়ে শেঠজি বললেন, ‘এসব কী বলছেন আপনি? আমার গর্দান নিতে চান?’

আর কথা বাড়ালেন না জাঁ ল। একরাশ হতাশা নিয়ে মহিমাপুর কুঠির গদিঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।

জগৎশেঠের নির্দেশমতো চিঠির মুসাবিদা করে কাগজ হাতে গদিঘরের দিকে আসছিলেন রণজিৎ রায়। ল সাহেবকে দেখতে পেয়ে শুকনো হাসি হেসে তিনি শুধোলেন, ‘কেমন আছেন? মুখটা এত শুকনো দেখাচ্ছে কেন?’

‘মেজাজ শরিফ নেই দেওয়ানজি।’

‘আপনারা কি ইংরেজদের হামলার ভয় পাচ্ছেন?’

‘সবই তো বোঝেন। আপনি বিচক্ষণ লোক। আমাদের হয়ে শেঠজিকে বলুন তিনি যেন হুগলিতে ফৌজ পাঠানোর বিষয়ে নবাবকে ভুল না বোঝান।’

হালকা চালে রণজিৎ রায় বললেন, ‘আপনি ফরাসি মর্দান। এত ভয় পাচ্ছেন কেন? ইংরেজরা হামলা করলে আপনারা লড়বেন।’

একথা শুনে তাজ্জব বনে গিয়ে জাঁ ল বললেন, ‘আপনি চান লড়াই হোক?’

‘অসুবিধে কী আছে এতে? আপনাদের তাগদও তো কম নয়। দক্ষিণে তো ভালোই লড়ছেন আপনারা।’

রণজিৎ রায়ের এই রসিকতায় ল-এর মাথায় যেন আগুন জ্বলে উঠল। তিনি বেশ ঝাঁঝের সঙ্গে বললেন, ‘জগৎশেঠজি এদেশের একজন মস্ত সওদাগর। আপনি তার দেওয়ান। একজন সওদাগরের খাস আদমি হয়ে আপনি চাইছেন ফের আগুন জ্বলুক বাংলায়? তাতে আপনাদের কি কোনও ক্ষতি হবে না? আগুনের আঁচে আপনারাও তো ঝলসে যাবেন।’

ল-এর এই কথা শুনে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে রণজিৎ রায় বললেন, ‘ভাবীকালের ভাবনা পরে না হয় ভাবা যাবে সাহেব।’

ল বললেন, ‘আজ হাসছেন, পরে না আপনাদের সবাইকে আফশোস করতে হয়।’

এই বলে আর দাঁড়ালেন না জাঁ ল। মাথায় তাঁর আগুন জ্বলছে। মহিমাপুরের শেঠদের কুঠি থেকে বেরিয়ে এসে তিনি দ্রুত ঘোড়ায় চেপে বসলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *