৩০
মসনদে বসার পর গত আট মাসে একদণ্ডের জন্যও সোয়াস্তি পাননি নবাব সিরাজদ্দৌলা। মসনদের পথে সব কাঁটা উপড়ে ফেলতে বহুত পরেশানি হয়েছে তাঁর। প্রথমে কাশিমবাজার। সেখান থেকে ফিরে পূর্ণিয়া যাওয়ার পথে রাজমহল থেকে ফৌজের মুখ ঘুরিয়ে কলকাতা। ইংরেজদের তাড়িয়ে কলকাতাকে আলিনগর বানিয়ে মুর্শিদাবাদে ফিরেই ফের আবার পূর্ণিয়ার উদ্দেশে কুচ করা। তারপরে শওকত জঙ্গের সঙ্গে বোঝাপড়া সেরে ঘর ওয়াপসি।
ক্লান্ত নবাব লুৎফাকে সঙ্গে নিয়ে কয়েকদিনের জন্য ছুটি কাটাতে গেলেন পলাশির শিকারবাড়িতে।
যেখান থেকে শুরু হয়েছে পলাশির আমবাগান, তার ঠিক দক্ষিণে শিকারবাড়ি। চারিদিকে অনুচ্চ প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। এই শিকারবাড়ি তৈরি করেছিলেন নবাব আলিবর্দি খাঁ। এর দক্ষিণে এক-দেড় ক্রোশের মধ্যে থেকে শুরু হয়েছে ঘন জঙ্গল। বিরাট তার বিস্তৃতি।
অবসর সময়ে কখনও কখনও এই অরণ্যে শিকার খেলতে আসতেন আলিবর্দি খাঁ। নানাজির সঙ্গে এ বাড়িতে আগে বারকয়েক এসে থেকেছেন কিশোর সিরাজ। একবার নানি বেগমও সঙ্গে ছিলেন। এই শিকারবাড়ি সিরাজের খুব পছন্দের। নবাব হওয়ার পর এই প্রথম এখানে আসার ফুরসত পেলেন।
শিকারবাড়ির পশ্চিমদিকে বাড়ির কোল ঘেঁষে চলে গিয়েছে গঙ্গা। উত্তরে বাড়ির চৌহদ্দি পেরিয়ে শুরু হয়েছে এক লাখ গাছে ঠাসা বিরাট আমবাগান। ছেলেবেলায় আলোছায়ায় ঢাকা এই আমবাগানে অনেক খেলা করেছেন সিরাজদ্দৌলা। পাখি শিকার করেছেন। তাঁর প্রিয় সফেদ টাট্টু রুস্তমকে ছুটিয়েছেন। আমগাছের ডালের সঙ্গে ঝুলা বেঁধে দোল খেয়েছেন। নানাজির সঙ্গে এখানে ছুটি কাটানোর দিনগুলো ছিল খুব মজার, আনন্দের।
পলাশির আমবাগানের ভিতরে একদিকে গঙ্গার দিকে রয়েছে ফুট চারেক উঁচু মাটির তৈরি ঢিবি। উপরটা মঞ্চের মতো সমতল। এর উপরে ওঠার জন্য মাটির ধাপ রয়েছে। উঁচু এই জায়গা থেকে থেকে গঙ্গা খুব স্পষ্ট দেখা যায়।
শিকারবাড়িতে এসেছেন নবাব সিরাজদ্দৌলা। এই মঞ্চকে ঘিরে টানানো রয়েছে গাঢ় লাল মসলিনের উপর রুপোর সুতোর কাজ করা নকশাদার চাঁদোয়া।
চাঁদোয়ার নীচে নরম ফরাসের উপর কাত হয়ে শুয়ে লুৎফার সঙ্গে অলস সময় কাটাতে কাটাতে সিরাজের মনে পড়ছিল পুরোনো দিনের কথা। শীতের মরশুমি ফল নিজের হাতে ছুরি দিয়ে কেটে মিনা করা রুপোর রেকাবিতে সাজিয়ে রাখছেন লুৎফুন্নেসা।
আমগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে একফালি রোদ এসে পড়েছে সিরাজের বুকের উপরে। সেই আলোয় ঝকমক করছে নবাবের গলার মুক্তোর মালা।
নবাব আলিবর্দি খাঁর খুব প্রিয় পানীয় ছিল কফি। নানাজির কাছ থেকে সিরাজ কফি পান শিখেছিলেন। ঘন দুধ দিয়ে বানানো কফি সিরাজেরও খুব প্রিয়। একজন দাখিলা এসে রেখে গেল ধোঁয়া ওঠা গরম কফির পিরিচ। কফির পিরিচ হাতে নিয়ে আলতো চুমুক দিলেন সিরাজ।
অচেনা একটা পাখির ডাক ভেসে এল নবাবের কানে। কেমন যেন গা ছমছমে কর্কশ আওয়াজ। নবাবের বিরক্তি উদ্রেক করে পাখিটা ডেকে চলেছে একটানা। কফির পিরিচ নামিয়ে রেখে বিলিতি দূরবিনটা চোখে লাগিয়ে পাখিটাকে খুঁজলেন সিরাজ। ফরাসের উপর পড়ে রয়েছে শৌখিন একটা বন্দুক। আলিবর্দির নাবালক নাতিকে উপহার দিয়েছিল ফরাসিরা। এটা এখনও সিরাজের খুব প্রিয়।
নানাজির সঙ্গে বেড়াতে এসে পলাশির আমবাগানে এই বন্দুক হাতে পাখি খুঁজে বেড়াতেন সিরাজ। তখন তাঁর কিশোর বয়স। সঙ্গে থাকত ইয়ারদোস্তের দল। মোহনলাল, মেহেদি নেসার খাঁ ও আরও অনেকে।
দূরবিনটা নামিয়ে রাখলেন নবাব সিরাজদ্দৌলা। নাহ, বেয়াড়া পাখিটার খোঁজ পাওয়া গেল না। বোধহয় উড়ে পালিয়েছে। কর্কশ আওয়াজটাও আর শোনা যাচ্ছে না। কফির পিরিচটা ফের হাতে নিতে গিয়ে সিরাজের চোখ আটকে গেল লুৎফার মুখের উপর। নরম আলোয় ভেজা মুখ। একই রকম। পলাশির এই আমবাগানে ঠিক যেমন দেখেছিলেন অনেক বছর আগে।
সেবার নানাজির সঙ্গে নানিবেগমও এসেছিলেন এখানে। সিরাজের ইয়ারদোস্তরা ওই সফরে কেউ সঙ্গে আসেনি। নানি বেগম সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন জারিয়া লুৎফাকে। শৈশব পার হয়ে কৈশোরের চিহ্ন তখন সবে ফুটে উঠতে শুরু করেছে লুৎফার শরীরে। তখনও লুৎফার দিকে ভালো করে তাকানোর অবকাশ হয়নি কিশোর সিরাজের।
পড়ন্ত বিকেলের আলোয় নদীর পাড়ে ঘাসের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সফেদ টাট্টু ঘোড়া রুস্তমের পিঠে চড়ে আসছিল সিরাজ। কাঁধে পাখি মারার বন্দুক। সে পাখি শিকার করতে গিয়েছিল নদীর চরে। সিরাজ দেখল হাভেলির কাছেই আমবাগানের একটা গাছের থেকে ঝোলানো ঝুলায় একা একা দোল খাচ্ছে লুৎফা। সূর্যের মরে আসা আলোয় অপূর্ব দেখাচ্ছে তাকে। ঠিক যেন ফেরেস্তা। ঘাসের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে আসায় শব্দ হচ্ছিল না ঘোড়ার খুরের। ছোটে নবাবের উপস্থিতি টের পেল না লুৎফা।
সিরাজের মাথায় এক দুষ্টু বুদ্ধি এল। ঘোড়া থামিয়ে সে নেমে পড়ল। চুপিসারে পিছন থেকে এসে দুহাতে লুৎফার চোখ টিপে ধরল ছোটে নবাব। ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠতে যাচ্ছিল লুৎফা। তাঁর চোখের সামনে থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে সিরাজ বলল, ‘শোর মাত কর লুৎফা। আমি ছোটে নবাব।’
ভয়ে ও বিস্ময়ে লুৎফার চোখে পলক পড়ে না। ‘ছোটে নবাব!’ ঝুলা থেকে লাফিয়ে নামে লুৎফা।
লুৎফার মুখোমুখি এসে দাঁড়ায় সিরাজ।
ভয়ে কাঁপতে থাকে লুৎফা। পরনে বেগনি কাপড়ের উপর জরির কাজ করা সস্তা সালোয়ার-কুর্তা। বুকের দুপাশ দিয়ে নেমে এসেছে মোটা মোটা দুটো বেণি। সোনালি ফিতে জড়ানো তাতে। চোখের পাতা নামিয়ে লুৎফা পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে মাটিতে আঁচড় কাটতে থাকে।
সিরাজ মুগ্ধ চোখে লুৎফার মুখের দিকে চেয়ে থাকে।
এই নিভৃতে ছোটে নবাবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকতে খুব অস্বস্তি লাগছে লুৎফার। সে ভাবে দোষ তারই। ছোটে নবাবকে ঝুলায় দুলতে দেখে তাঁরও দোল খাওয়ার শখ হয়েছিল। নিশ্চয়ই খুব রেগে গিয়েছেন ছোটে নবাব। রাগবেই তো যেমন তাঁর আহাম্মকি! জারিয়াদের কোনও শখ থাকতে নেই—একথা তো তাঁর অজানা নয়।
সিরাজ শুধোয়, ‘একা একা কী করছিলে এখানে?’
লুৎফা কাঁদো কাঁদো গলায় বলে, ‘আমার কসুর মাফ করুন মালিক। নানি বেগমকে বলবেন না।’
‘কী বলব না?’
‘এই যে আমি আপনার ঝুলায় দুলছিলাম।’
হেসে উঠে সিরাজ বলে, ‘এতে কসুরের কী আছে? বেশ করেছ। যখন ইচ্ছে করবে এসে ঝুলায় চড়ো। আমি নানি বেগমকে বলে দেব।’
অবাক হয়ে মুখ তুলে তাকায় লুৎফা।
সিরাজ চকিতে তাঁকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো চুমু খেতে থাকে। শিহরিত হয়ে ওঠে লুৎফা। স্নায়ু অসাড় হয়ে আসতে থাকে।
খানিকবাদে ছোটে নবাবের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে লজ্জায় রাঙা হয়ে শিকারবাড়ির দিকে দ্রুত এলোমেলো ভাবে ছুটতে থাকে কিশোরী লুৎফা।
পিছন থেকে কানে ভেসে আসে ছোটে নবাবের হাসি ও কথা, ‘রোজ ঝুলায় দুলতে আসবে কিন্তু।’
লুৎফার ঠোঁটদুটো জ্বলে যাচ্ছে। রক্ত জমাট বেধেছে ঠোঁটে। কিন্তু মনের মধ্যে দারুণ এক খুশির অনুভূতি। সে ছুটতেই থাকে।
সেদিনের সেই খুশির মুহূর্তকে যেন স্বপ্নে দেখছিলেন সিরাজ। হুঁশ ফিরল লুৎফার কথায়।
‘কী ভাবছেন মেহের?’
সোজা হয়ে বসে সিরাজদ্দৌলা বলেন, ‘সেই গাছটা চিনতে পারবে লুৎফা?’
‘কোন গাছ?’
‘সেই আমগাছটা। যেখানে ঝুলা বাঁধা ছিল?’
শরমে হঠাৎ লাল হয়ে ওঠে লুৎফার মুখটা।
সিরাজ হেসে বলেন, ‘চলো দেখি। সেই গাছটা খুঁজে পাই কি না।’
উঠতে গিয়ে বাধা পড়ল। সিরাজের কানে ভেসে এল ঘোড়ার খুরের শব্দ।
সিরাজ ঘুরে তাকিয়ে দেখলেন তির বেগে ছুটে আসছে এক ঘোড়সওয়ার।
বিরক্ত হলেন নবাব। সবাই জানে লুৎফার সঙ্গে একান্তে সময় কাটাচ্ছেন তিনি। কে এই বেতমিজ? এ সময় এ ভাবে ঘোড়া দাবড়ে এদিকে আসছে?
নবাবকে ঘিরে আমবাগানের মধ্যে দূরে দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে হাতিয়ারবন্ধ সেপাইরা। তারা নিরুপায়। এই সওয়ারির পথ আটকানোর সাহস তাদের নেই।
নবাবের মঞ্চের কাছে এসে দ্রুত ঘোড়া থেকে নামলেন মোহনলাল। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এলেন। হঠাৎ এভাবে মোহনলালকে হাজির হতে দেখে অবাক হলেন সিরাজদ্দৌলা। অজানা এক আশঙ্কায় লুৎফার বুক কেঁপে উঠল।
নবাবকে কুর্নিশ জানিয়ে মোহনলাল বললেন, ‘হুজুর সহি সালামত।’
চিন্তিত মুখে সিরাজ বললেন, ‘লাগতা হ্যায় সমাচার কুছ গহেরা।’
মাথা নেড়ে মোহনলাল বললেন, ‘গহেরা। কোম্পানি ওয়াপস এসেছে কলকাতায়। আলিনগর বেদখল হয়ে গেছে। তেলেঙ্গানা থেকে এসেছে কোম্পানির ফৌজ। নওয়ারা এসেছে। এসেছেন সাবিৎ জঙ্গ। লড়াইয়ে হেরে মানিকচাঁদ পালিয়ে এসেছে রাজধানীতে।’
রাগে ফুঁসতে লাগলেন সিরাজদ্দৌলা।
লুৎফার মুখে সহসা আঁধার নেমে এল। ফের কি তবে যুদ্ধ?
মোহনলাল বললেন, ‘তুরন্ত আপনার রাজধানীতে ফেরা উচিত।’
সিরাজ মাথা নেড়ে বললেন, ‘সহি বাত।’
সেদিনই বজরায় চেপে দ্রুত মুর্শিদাবাদে ফিরে চললেন সিরাজদ্দৌলা। নিরুদ্বেগ অবসর যাপন তাঁর নসিবে নেই।
মুর্শিদাবাদে সিরাজের ফিরে আসার পর দুদিন বাদে বিধ্বস্ত চেহারায় এসে হাজির হলেন খোজা ওয়াজিদ ও নন্দকুমার।
নন্দকুমার বললেন, ‘বেতমিজ টোপিওয়ালারা হুগলি জ্বালিয়ে দিয়েছে হুজুর।’
খোজা ওয়াজিদ বললেন, ‘সালামত-মোবারক মঞ্জিল-মদিনা বক্স, আমার তিনটে জাহাজ কোম্পানির ফৌজ বরবাদ করে দিয়েছে জাঁহাপনা। আমার কোঠি, গুদাম সব পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। বহুত লোকসান হয়েছে।’
নন্দকুমার যোগ করলেন, ‘কোম্পানি হুগলিতে কুড়ি কামানের নওয়ারা পাঠিয়েছিল হুজুর। ব্যান্ডেলের শস্যগোলা পুড়িয়ে দিয়েছে। হুগলির ফৌজের সারা বছরের রসদ মজুত ছিল ওখানে।’
রাগে কুরসি ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে গর্জন করে উঠলেন সিরাজদ্দৌলা, ‘বেতমিজ লালমুখোদের ইতনা হিম্মত?’
মোহনলাল বললেন, ‘গতবছর কুত্তাগুলোকে ফলতা অবধি তাড়া করে দরিয়ায় ডুবিয়ে মারলেই ভালো হত। নবাব মেহেরবান। তাই রেহাই দিয়েছিলেন ওদের। কিন্তু এরা ভেবেছে কী? এদেশে বসে এরা এভাবে দুশমনি করবে নবাবের সঙ্গে? এবারে জবরদস্ত বদলা নিতে হবে হুজুর।’
ফের গর্জন করে উঠলেন সিরাজদ্দৌলা। ‘এবারে ওদের দরিয়া পার করিয়ে দেব মোহললাল। আভি ফৌজ তৈয়ার কর। ফির আলিনগর চলো।’
হঠাৎ দরবার ঘরে এসে ঢুকলেন আমিনা বেগম ও শরফ উন্নেসা। দুই বেগম সাহেবাকে দেখে দ্রুত বিদায় নিলেন মোহনলাল, খোজা ওয়াজিদ ও নন্দকুমার।
শরফ উন্নেসা বললেন, ‘আলিনগর ও হুগলির কহানি শুনেছি মির্জা।’
‘শয়তানগুলোকে শেষ করব। কালই আমি আলিনগরের দিকে কুচ করব নানি বেগম।’
শরফ উন্নেসা ও আমিনা বেগম দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠলেন, ‘না।’
সিরাজ অবাক হয়ে তাঁর আম্মিজান ও নানি বেগমের দিকে তাকালেন।
শরফ উন্নেসা বললেন, ‘না মির্জা। তুমি আলিনগরে ফির যেও না।’
সিরাজদ্দৌলা বললেন, ‘কী বলছ তোমরা? ইতনা বেইজ্জতির পরেও আমি ডরপোকের মতো চুপ করে থাকব?’
শরফ উন্নেসা বললেন, ‘তোমার নানাজি বলতেন ইংরেজ কোম্পানি বহুত খতরনক। সিরাজ যেন এদের সঙ্গে লড়াই না বাধায়।’
হেসে উঠে সিরাজদ্দৌলা বললেন, ‘তোমরা ভাবো, আমি এখনও নেহায়েত নালায়েক আছি? ডরো মাত।’
আমিনা বেগম বললেন, ‘না বেটা না। তুমি আলিনগরে যাবে না।’
‘তুমি তো নিজের চোখেই দেখেছ আম্মিজান। গেলবার কেমন শায়েস্তা করে এসেছিলাম এদের। ওই তো সামান্য ক’টা লালমুখো। আমার এক পাটি পয়জারই এদের সবক শেখাবার জন্য কাফি। নেহায়েত গেলবার আমি এদের রেহাই দিয়েছিলাম। তাই ফলতায় পালিয়ে যেত পেরেছিল ওরা। এবার হয় আমি ওদের বারদরিয়া পার করিয়ে দেব, নয়তো দরিয়ায় ডুবিয়ে মারব।’
শরফ উন্নেসা বললেন, ‘আমাদের কথা শোনো মির্জা। শুধু জঙ্গবাজিতে সব কিছুর সুরাহা হয় না। নবাবি চালাতে হলে কৌশল করতে হয়।’
‘কীসের কৌশল নানি বেগম? আমি এই বেইজ্জতির বদলা নেব না?’
শরফ উন্নেসা বললেন, ‘বদলা নাও। তবে অন্য কায়দায় নাও। তুমি চিঠি লিখে ওদের কড়া ধমক দাও। হুগলিতে হামলার খেসারত চাও।’
‘যারা নিজামতের খাজনা ফাঁকি দেয়, খেসারত চাইলেই কি তারা দেবে?’
আমিনা বেগম বললেন, ‘তোমাকে ফাঁদে ফেলার জন্য হুগলিতে আগ লাগিয়েছে ইংরেজ কোম্পানি। এরা চায়, তুমি আবার জঙ্গবাজির ময়দানে ছুটে যাও। ভালো করেই তুমি জানো যে তোমার ফৌজেরই অনেকে তোমার বরবাদি চায়। জঙ্গবাজির ময়দানে সেই বেতমিজরা যদি ইংরেজদের মদত দেয়? তোমার সঙ্গে বেইমানি করে?’
‘ডরো মাত আম্মিজান। দরবারের বুড়া শয়তানগুলো পূর্ণিয়ার লড়াইয়ের পর ঢিট হয়েছে।’
‘সুযোগ পেলে ফের যে তারা গদ্দারির কোশিস করবে না, একথা তুমি জোর দিয়ে বলতে পারো কি?’
মা ও দিদিমাকে অভয় দিয়ে সিরাজ বললেন, ‘ভেবো না তোমরা। আমার সঙ্গে মোহনলাল আছে, মিরমদন আছে। এই বেইজ্জতির বদলা আমি নেবই।’
নানি বেগম বললেন, এমনিতেই তুমি শায়েস্তা করতে পারো ইংরেজদের। তার জন্য লড়াইয়ের প্রয়োজন নেই।’
সিরাজ অবাক হয়ে শরফ উন্নেসার মুখের দিকে তাকালেন।
‘ইংরেজদের ব্যবসা এখনও বন্ধ। তুমি ব্যবসা চালু করার হুকুমত না দিলে সারা বাংলাজুড়ে ব্যবসা চালু করার হিম্মত নেই তাদের। সব জায়গায় তো ওরা ওদের নওয়ারা পাঠাতে পারবে না। কারবার বন্ধ থাকলে কোম্পানির লোকসান অনেক। ইংলিশস্তানে কোম্পানির বড় সাহেবরা বেশিদিন এসব বরদাস্ত করবে না। তারাই এদেশের টোপিওয়ালাদের চাপ দেবে তোমার কাছে এসে মাফি মাঙার জন্য। কিছুদিন তুমি শান্ত থাকো। টোপিওয়ালা ইংরেজরা মুর্শিদাবাদে ছুটে এসে তোমার সামনে শির ঝোঁকাবে। তোমার শর্তে বোঝাপড়া করতে চাইবে। এ আমার নিজের কথা নয় মির্জা। এইসব কৌশলের কথা আমি শুনেছি তোমার নানাজির জবানে।’
‘এসব কৌশল আমি বুঝি না নানি বেগম। ইংরেজ কোম্পানিকে এবার আমি বাংলা থেকে তাড়িয়ে ছাড়ব।’
আমিনা বেগম বললেন, ‘গলত চালে নিজেকে খতরার মধ্যে টেনে নিয়ে যেও না মির্জা। ইংরেজরা ব্যবসা গুটিয়ে চলে গেলে নিজামতের লোকসান হবে অনেক।’
বিরক্তির সঙ্গে সিরাজ বললেন, ‘তোমার সোরার কারবার বন্ধ হয়ে যাবে বলে কি একথা বলছ আম্মিজান?’
আমিনা বেগম বললেন, ‘বেওকুফের মতো কথা বোলো না মির্জা। আমি আর তোমার নানি বেগম যা বলছি, তা তোমার ভালোর জন্য। তোমার নানি বেগম যে কৌশলের কথা বলছেন, সেই কৌশলেই নরমে গরমে ইংরেজদের তাঁবে রেখেছিলেন নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ ও নবাব আলিবর্দি খাঁ। জঙ্গবাজির ময়দানে তাঁরা কেউ ইংরেজদের সঙ্গে লড়াই করেননি।’
‘শোনো আম্মিজান। শোনো নানি বেগম। এত কৌশল আমি বুঝি না, বুঝতে চাইও না। বজবজের কিল্লা, মেটিয়াবুরুজের কিল্লা, আলিনগরের কিল্লা দখল করে, হুগলি শহর, হুগলি বন্দর তছনছ করে নবাবকে বেইজ্জত করেছে ইংরেজ কোম্পানি। এর বদলা চাই আমি।’
এই বলে দরবার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন সিরাজদ্দৌলা।
পরের দিন সকালে শিঙা দিগর কাড়ানাকাড়ার শব্দে মুর্শিদাবাদের আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠল। শোরগোল পড়ে গেল চকবাজারে।
সকলে চোখ কচলে দেখল, নবাব কুচ করে চলেছেন আলিনগরের দিকে। নবাবের সঙ্গে ইংরেজ কোম্পানির ফের লড়াই বাধতে চলেছে। লড়াই কিছুতেই নবাবের পিছু ছাড়ছে না।
মুর্শিদাবাদ নগরী ছাড়িয়ে দ্রুত কলকাতার দিকে এগিয়ে চলল, নবাবের কাফেলা চল্লিশ হাজার ঘোড়সওয়ার, ষাট হাজার পায়দল ফৌজ, পঞ্চাশটা হাতি, গো-গাড়ির উপর বসানো তিরিশটা কামান। সেই সঙ্গে উট ও বলদে টানা ফৌজিদের রসদ বওয়ার গাড়ি, তাঁবু ফেলার সরঞ্জামের গাড়ি, আবদার, দাখিলা, খানসামা, বাঁদি, গোলাম—সব মিলিয়ে বিরাট অজগরের মতো এক বাহিনী।
