1 of 2

ফলতা থেকে পলাশি – ৪১

৪১

দারুণ ব্যস্ততা চন্দননগরে। শয়ে শয়ে কুলি-মজুর-বেলদার-মুটেদের হাঁকডাকে ফরাসিদের দুর্গের আশপাশ সরগরম।

দুর্গের গা ঘেঁষেই ঘনবসতি। দেশি মানুষ ও ফরাসিদের ঘরবসত। কোঠাবাড়িগুলো সাহেবদের। দিশি মানুষদের বসবাস দরমার বেড়া ও গোলপাতায় ছাওয়া কুঁড়েঘরে। বিশাল বিশাল হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে একদল কুলি-মজুর মজবুত কোঠা বাড়িগুলোকে ভেঙে ফেলছে। মোটা রশি দিয়ে কুঁড়েঘরগুলোকে বেড় দিয়ে ধরে, ঘোড়া দিয়ে রশি টেনে ঘরগুলোকে মাটিতে মিশিয়ে দিচ্ছে একদল লোক। এই দৃশ্য দেখে অনেকের বুক মুচড়ে উঠছে। সাজানো গোছানো সুন্দর শহরটা শেষ হয়ে গেল!

এই ধ্বংসলীলার বিরাম নেই। দিনরাত চলছে। রাতে কাজ হচ্ছে মশাল জ্বেলে। রাতের আঁধারেও ফোর্ট অঁরলিওর চারিদিক আলোয় আলোয় ছয়লাপ। একদল ক্লান্ত হয়ে পড়লে কাজে যোগ দিচ্ছে আরেক দল। সীমাহীন হুড়োহুড়ি ও তৎপরতা।

ফরাসি কাউন্সিলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে থেকে কাজের তদারক করছেন। হাতে সময় খুব কম। চন্দননগরে ফরাসিদের গভর্নর পিয়েরে রেনল্ট হুকুম করেছেন, দুর্গের চারিপাশে বেশ কিছুদূর পর্যন্ত একটা ঘরবাড়িও যেন চোখের সামনে আগল তুলে না রাখে। শত্রুপক্ষ ধেয়ে এলে দূর থেকে তাদের দেখতে পাওয়া চাই, যাতে গোলা ছুড়ে কেল্লা আক্রমণ থেকে তাদের নিরস্ত করা যায়।

ঘরবাড়ি হারিয়ে হাহাকার করছে মানুষ। ঘর বাঁচানোর তাগিদে ফরাসি কাউন্সিলের কাছে তদ্বির করছে কেউ কেউ। সব কাতর আবেদনই গম্ভীর মুখে খারিজ করে দিচ্ছেন পিয়েরে রেনল্ট। তিনি নিরুপায়।

আসলে আলিনগরের সমঝোতা ঘুম উড়িয়েছে চন্দননগরের গভর্নর রেনল্ট সাহেবের। বাতাসে যেন বারুদের গন্ধ পাচ্ছেন তিনি। ইংরেজ ও ফরাসিদের মধ্যে যুদ্ধ বেধেছে ইউরোপে। চন্দননগর নিরাপদ নয়।

মাদ্রাজ থেকে যুদ্ধজাহাজ ও সৈন্যসামন্ত নিয়ে এসেছেন ক্লাইভ ও ওয়াটসন। ইংরেজরা বাংলায় এখন যথেষ্ট শক্তিশালী। সে তুলনায় ফরাসিরা খুবই দুর্বল। ইউরোপে যুদ্ধের অজুহাত দিয়ে যে কোনও সময় ইংরেজরা হামলা করতে পারে চন্দননগরে। তাই খুব দ্রুত অঁরলিও দুর্গকে সুরক্ষিত, নিরাপদ ও মজবুত করে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন পিয়েরে রেনল্ট।

শুধু কেল্লার আশপাশের ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলা নয়, দিনরাত কোদাল-বেলচা চালিয়ে দুর্গকে বেড় দিয়ে ঘিরে ধরা পরিখাটাকে চওড়া করছে বেলদাররা। পরিখার দুপাশে পাহাড়ের মতো জমছে মাটি। সেই মাটি ঝুড়িতে করে মাথায় বয়ে ঠাসবুনোট শালবল্লার খাঁচার ভিতরটা ভরাট করছে মজুরেরা। এ ভাবে ফোর্ট অঁরলিওর প্রাচীরের বাইরে চারফুট দূরে রাতারাতি গড়ে উঠছে আরেকটা দেওয়াল।

ফরাসিদের পণ্ডিচেরি কাউন্সিলের উপর রীতিমতো বিরক্ত মসিয়ে রেনল্ট। বাংলার হাওয়া গরম—একথা জানিয়ে তিনি চিঠির পর চিঠি দিয়েছেন পণ্ডিচেরিতে। বারবার দুর্গ মজবুত করার জন্য টাকাকড়ি চেয়েছেন, সৈন্যসামন্ত পাঠানোর জন্য তাগাদা দিয়ে যাচ্ছেন গত একবছর ধরে। কোনও কথাই কানে নিচ্ছে না কাউন্সিল।

মাঝে মাঝে খুব অবাক লাগে রেনল্টের। বাংলার ব্যবসা তো কম মুনাফা দিচ্ছে না ফরাসি কোম্পানিকে, তবুও চন্দননগরের প্রতি একটুও কি মমতা নেই উপরতলার কর্তাদের? গত বছরে কলকাতা জয় করে ফেরার সময় দুর্বল ফরাসিদের ভয় দেখিয়ে তিন লাখ টাকা আদায় করেছিলেন নবাব সিরাজদ্দৌলা। কেল্লা মজবুত থাকলে, জবরদস্ত ফৌজ মোতায়েন থাকলে এই টাকাটা হয়তো গুণাগার দিতে হত না।

এবারে ইংরেজদের সঙ্গে কলকাতায় লড়তে গিয়ে মান খুইয়ে মুর্শিদাবাদে ফিরছেন সিরাজদ্দৌলা। ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে তাঁর দম্ভ। দুর্গপ্রাকারে দাঁড়িয়ে রেনল্ট দেখেছেন, কয়েকদিন আগে প্রায় মাথা নীচু করে নিঃশব্দে চন্দননগর পার হয়ে গেল নবাবের কাফেলা। যে বিষয়গুলো নিয়ে নবাবের সঙ্গে ইংরেজদের বিরোধ ছিল তার প্রায় সবই নবাব মেনে নিয়েছেন আলিনগরের সুলেনামায়। কোনও সন্দেহ নেই, ভয় পেয়েছেন সিরাজদ্দৌলা। তাঁর এই ইংরেজ ভীতি ফরাসিদের কাছে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাঁর রাজত্বে রয়েছে ফরাসিরা, তিনিই যদি ভীত হয়ে পড়েন, তাহলে আক্রান্ত হলে ফরাসিদের বাঁচাবে কে?

ইংরেজদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় পা রেখেছিল ১৬৫০ সালে। প্রথম কুঠি গড়েছিল হুগলিতে। এর অনেক পরে ১৬৭৬ সালে ফরাসিরা চন্দননগরে কুঠি গড়ে ব্যবসা শুরু করলেও গত কয়েক বছরে বাংলার বাণিজ্যে ইংরেজদের কড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে ফেলেছে ফরাসিরা। ইংরেজরা চায় একচেটিয়া ব্যবসা, চন্দননগরের ফরাসিদের সর্বনাশ। এসব রেনল্ট বোঝেন।

ফরাসি জেনারেল বুসি যুদ্ধজাহাজ নিয়ে আসতে পারেন বাংলায়। একথা বাতাসে উড়ছে। কিন্তু আদৌ আসবেন কি? দক্ষিণ উপকূলে যে কোনও সময় ইংরেজদের সঙ্গে ফরাসিদের লড়াই বাধতে পারে। এই মুহূর্তে বুসির পক্ষে কি বাংলায় আসা সম্ভব?

আর নবাব? ফরাসিরা আক্রান্ত হলে তিনি কী বাঁচাবেন তাদের? শুধু কেল্লা মজবুত করে তো আর ইংরেজদের ঠেকানো যাবে না, কী করা যায় এখন? ফোর্ট অঁরলিওতে কাউন্সিলের জরুরি মিটিং ডাকলেন রেনল্ট।

থমথম করছে মিটিং হল। গম্ভীর মুখে বসে আছে কাউন্সিলের সদস্যরা—ফার্নিয়ের, ক্যালট, ল্যাপর্তে, নিকোলাস ও পিকস।

চুরুটের ধোঁয়া ছেড়ে রেনল্ট বললেন, ‘নবাবের সাহায্য আমাদের খুবই প্রয়োজন। চন্দননগরে সেনা মোতায়েন খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। এ ব্যাপারে নবাবের সঙ্গে কথা বলার জন্য কাশিমবাজারের কুঠি চিফ মসিয়ে ল’কে একটা চিঠি দেওয়া যেতে পারে।’

ল্যাপর্তে বললেন, ‘আলিনগরের সুলেনামায় অনেক সুবিধা নবাব ইংরেজদের দিয়েছেন। সেগুলো আমরাও দাবি করতে পারি।’

ক্যালট বললেন, ‘ঠিক কথা। ইংরেজরা যদি কলকাতায় মিন্ট বসানোর অনুমতি পায় তবে আমরা পাব না কেন? এর পরে বাটা দিতে গিয়ে আমাদের যা লোকসান হবে, তাতে ইংরেজদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আমরা পেরে উঠব না।’

মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে রেনল্ট বললেন, ‘এসব কথাই আমি ল’কে লিখে দিচ্ছি। সে কথা বলুক নবাবের সঙ্গে।’

ফার্নিয়ের বললেন, ‘আমাদের দুর্গে পঞ্চাশজন মহিলা আছেন। তাদের কথাটা ভাবা দরকার। ইংরেজরা আক্রমণ করলে তাদের কী হবে?’

নিকোলাস বললেন, ‘ডাচ ও ডেনিশদের সঙ্গে কথা বলে তাদের আমরা চুঁচুড়া ও শ্রীরামপুরে নিরাপদ জায়গায় পাঠিয়ে দিতে পারি।’

সকলেই টেবিল চাপড়ে বলল, ‘C’est une belle offer—এটা চমৎকার প্রস্তাব।’

রেনল্ট বললেন, ‘হুগলি নদীর তীর বরাবর যে ইউরোপিয়ান নেশনসগুলো কলোনি গড়েছে তাদের মধ্যে শান্তি ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য একটা চুক্তি অনেক আগে থেকেই ছিল। এ ব্যাপারে ইংরেজদের সঙ্গে কথা বলা যায়।’

ফার্নিয়ের বললেন, ‘সে ক্ষেত্রে তো কলকাতায় দূত পাঠাতে হয়।’

‘হ্যাঁ ফার্নিয়ের। আমি চাই, তুমি ও নিকোলাস এই কাজটা করো। কলকাতায় গিয়ে কর্নেল ক্লাইভ ও অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের সঙ্গে তোমাদের কথা বলতে হবে।’

মিটিং শেষ হল সন্ধের মুখে। রেনল্ট ফের বেরিয়ে পড়লেন পরিখা চওড়া করার কাজ তদারক করতে। দু-দণ্ড দম ফেলার সময় নেই তাঁর।

কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদে ফিরে চলেছেন নবাব। কাটোয়ার কাছে অগ্রদ্বীপে ভাগীরথীর তীরে সেনাছাউনি পড়েছে।

ঝকঝকে সকাল। কুয়াশা নেই। মাঘ শেষ হয়ে ফাল্গুন এসেছে। পিছু হটছে শীত। সকালের নাস্তা সেরে তাঁবুর বাইরে বালির উপরে কুরসিতে এসে বসেছেন নবাব। বসন্তের বাতাসে খুশির আমেজ। কিন্তু নবাবের মুখ থমথমে। অনিদ্রা চোখের কোণে কালি লেপেছে। মেজাজ শরিফ নেই। মনের মধ্যে ভিড় করে আছে দুশ্চিন্তার কালো মেঘ।

সামনে দিগন্ত বিস্তৃত বালুচর। নবাবের চোখে পড়েছে সারি সারি তাঁবু নদীর তীর বরাবর অর্ধচন্দ্রাকারে বিস্তৃত। কতদূর পর্যন্ত যে এই ফৌজি শিবির ছড়িয়ে রয়েছে তা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ঠাহর করা যায় না। অনেক দূরে বালুচরের উপর এলোমেলো ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে কয়েকটা উট, ঠিক যেন পুতুলের মতো।

নবাবের ফৌজ মানেই উট-হাতি-ঘোড়া, সারবান-মেঠ-ভৈ-সহিস, সেপাই-লস্কর-বন্দুকচি-ধানুকি, মুটে-মজুর-বেলদার সব মিলিয়ে এক বিরাট হই-হট্টগোল। এই ফৌজ যেখানে ছাউনি ফেলে সেখানে মেলা বসে যায়। মানুষের হইচইয়ে, জানোয়ারের হাঁকডাকে চারিদিক সরগরম হয়ে ওঠে।

সিরাজদ্দৌলা ভাবতে থাকেন, এই বিশাল ফৌজ নিয়ে এত ধকল করে কলকাতায় গিয়েও ফিরতে হচ্ছে শূন্য হাতে। কীসের জন্য তাহলে এত বড় ফৌজ? এর পিছনে হর মাহিনা কেন মোটা টাকা গোনা?

হতাশা কুরে কুরে খাচ্ছে সিরাজদ্দৌলাকে। অনুভব করছেন, আলিনগরের সন্ধি নবাবের ইজ্জতকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। সিরাজের মনে পড়ে নানাজি আলিবর্দি খাঁর কথা। তিনি বলতেন, চল্লিশ তরবারি এক হলে জোশ দিয়ে লড়াই করলে একটা দেশ জিতে নেওয়া যায়। সিরাজ নিজের চোখে দেখেছেন কীভাবে চল্লিশ হাজার ঘোড়সওয়ার নিয়ে গড়া অমন দুর্ধর্ষ বর্গিদের বারবার প্রতিহত করে বাংলার মসনদের ইজ্জত রক্ষা করেছিলেন আলিবর্দি খাঁ।

আর তিনি? চল্লিশ হাজার ঘোড় সওয়ার ও ষাট হাজার পদাতিক সঙ্গে থাকা সত্ত্বেও সামান্য কিছু সংখ্যক গোরা পল্টনের হাতে নাকাল হয়ে, মান খুইয়ে কলকাতা থেকে পালিয়ে এলেন! তামাম সুবে বাংলার আম-আদমি বলবে নবাব নালায়েক ডরপোক। বেইজ্জতি। ঘোর বেইজ্জতি! দুহাতে মুখ ঢাকেন নবাব। মোহনলাল লড়তে চেয়েছিল ইংরেজদের সঙ্গে। কিন্তু তাঁকে অনুমতি দিলেন না তিনি। কেন তিনি ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়েছিলেন? আসলে উমিচাঁদের একটা কথায় নবাবের মনে দারুণ ত্রাসের সঞ্চার হয়েছিল।

ইংরেজদের সঙ্গে উমিচাঁদের অনেকদিনের যোগাযোগ। ইদানীং আবার উমিচাঁদকে খুব পছন্দ করেন নবাব। গুরত্ব দেন তাঁর মতামতকে। নবাব মনে করেন ইংরেজদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাটা উমিচাঁদের ভান। তিনি ইংরেজদের বন্ধুবেশী শত্রু। ইংরেজদের সঙ্গে তাঁর দহরম মহরম উপর উপর। উমিচাঁদ আসলে তাঁর লোক।

সেদিন ভোর রাতে ক্লাইভের দুঃসাহসিক হালসিবাগান অভিযানের পর উমিচাঁদ এসে নবাবকে বললেন, ‘হুজুর আসলি বাত—কর্নেল ক্লাইভ আপনাকে গ্রেপ্তার করে জাহাজে চাপিয়ে বড় দরিয়ার ওপারে ইংলিশস্তানে নিয়ে যেতে চান। এই মতলবেই সেদিন ভোর রাতে অচানক হামলা করেছিল কোম্পানির ফৌজ।’

উমিচাঁদের মুখে এই কথা শুনে ভিতরে ভিতরে কেঁপে উঠেছিলেন নবাব। কলকাতায় লড়াইয়ে এসে অনেক সেনাপতিরই মনের হদিশ পাচ্ছেন না তিনি। এদের হাতেই ফৌজের বড় অংশের ভার। অন্তর্ঘাতের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সত্যিই যদি কর্নেল ক্লাইভ তাঁকে গ্রেপ্তার করে বড় দরিয়ায় নিয়ে ফেলেন তখন? চারিদিকে অথই জল। আর ভাবতে পারেননি নবাব। তড়িঘড়ি সমঝোতার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

এসব কথা ভাবতে ভাবতে নবাব অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন। ঘোড়ার খুরের খটাখট শব্দ কানে আসতে সচকিত হলেন। দূরে ধুলোর ঝড়। দ্রুত এগিয়ে আসছে একদল ঘোড়সওয়ার।

দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন সিরাজদ্দৌলা চমকে উঠলেন। ইংরেজ ফৌজ তাঁর পিছু নিয়ে এসে পড়ল নাকি? পরক্ষণেই ভুল ভাঙল নবাবের। না—এ ইংরেজদের ঘোড়সওয়ার বাহিনী নয়। এরা আসছে উত্তর দিক থেকে। কারা এরা?

খানিকবাদে নবাবের তাঁবু থেকে বেশ কিছুটা দূরে ঘোড়া থামালেন ফরাসিদের কাশিমবাজার কুঠির প্রধান জাঁ ল। তিনি একা নন, সঙ্গে এসেছেন বণিক খোজা ওয়াজিদ ও একদল ঘোড়সওয়ার পল্টন।

নবাবের সামনে হাজির হয়ে কুর্নিশ জানিয়ে ল বললেন, ‘সেলাম হুজুর। সহি সলামত।’

হঠাৎ এভাবে ব্যস্তসমস্ত হয়ে ল’কে হাজির হতে দেখে সিরাজদ্দৌলা বেশ অবাক।

ল বললেন, ‘হুজুর আপনি সুবে বাংলার মালিক। আমাদের বাঁচান।’

নবাব শুধোলেন, ‘ইতনা পরেশান কিঁউ?’

‘হুজুর ইউরোপে ইংরেজদের সঙ্গে ফরাসিদের লড়াই বেধেছে। আমরা শুনতে পাচ্ছি কর্নেল ক্লাইভ ও ওয়াটসন চন্দননগর আক্রমণ করতে পারেন। এখন আপনি পাশে না থাকলে আমরা খতম হয়ে যাব।’

কথাটা ঠিক বিশ্বাস হল না নবাবের। তিনি বললেন, ‘দরিয়ার ওপারে কী হচ্ছে তা নিয়ে ইংরেজরা এখানে হুজ্জুতি বাধাবে কেন? এই তো ক’দিন আগে তারা বাইবেল ছুঁয়ে স্বাক্ষর করেছে আলিনগরের সুলেনামায়। উনহোনে বাঙ্গালমে চ্যাহেন বানায়ে রাখনে কা ওয়াদা কিয়া।’

‘আমি সচ বলছি হুজুর।’

খোজা ওয়াজিদের মুখের দিকে তাকালেন নবাব।

খোজা ওয়াজিদ মাথা নেড়ে বললেন, ‘ল সাহেব বিলকুল সহি বাত বলছেন। আমিও এরকম খবর পেয়েছি জাঁহাপনা।’

গভীর চিন্তায় পড়ে গেলেন নবাব।

ল বললেন, ‘আপনি এখনই হুগলির ফৌজদার নন্দকুমারের কাছে কিছু সেনা পাঠান। আমাদের মদত দিতে বলুন।’

ক্ষণিকের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে পড়লেন নবাব। তারপর বললেন, ‘মঞ্জুর। আমি নন্দকুমারকে বলে রাখছি, আর আড়াই হাজার সওয়ারির রিসালা পাঠিয়ে দিচ্ছি হুগলিতে।’

‘হুজুর বহুত মেহেরবান।’ মাথা ঝুঁকিয়ে ফের তসলিম জানালেন ল। তারপর বললেন, ‘আউর এক বাত হুজুর। ইংরেজরা আপনার প্রজা, আমরাও আপনার প্রজা। আপনি আলিনগরের সুলেনামায় ইংরেজদের যে সুবিধে দিলেন, তাতে যে আমাদের কারবারের বহুত লোকসান হয়ে যাবে।’

সিরাজদ্দৌলা ভুর কুঁচকে বললেন, ‘মতলব?’

‘আপনি ইংরেজদের মিন্ট বসানোর হুকুমত দিয়েছেন। আমরা কী দোষ করলাম?’

গম্ভীর হয়ে গেলেন সিরাজদ্দৌলা। ল সাহেব যা বলছেন, তার মধ্যে যথেষ্ট যুক্তি আছে। ডাচ, ইংরেজ, ফরাসি, ডেনিশ—এরা সকলেই সওদা করতে এসেছে বাংলায়। তিনি বাংলার নবাব হয়ে কেবল ইংরেজ বণিকদের বিশেষ সুবিধা দিতে পারেন না। তাছাড়া নবাব এও ভেবে দেখলেন, ইংরেজরা যদি আলিনগরের সুলেনামার শর্ত না মানে তবে তাঁর সঙ্গে তাদের ফের লড়াই বাধতে পারে। সেক্ষেত্রে ফরাসিদের মদত তাঁর দরকার হবে। ফরাসি জেনারেল বুসির যুদ্ধজাহাজ নিয়ে বাংলায় আসার কথা আছে। এ ক্ষেত্রে ফরাসিদের সঙ্গে আচ্ছা রিশতাদারি কাজে আসবে। ইংরেজদের যে সব সুবিধা তিনি আলিনগরের সুলেনামায় দিয়েছেন, সেসব যদি ফরাসিদের তিনি দিয়ে দেন, তাহলে কেউ বলতে পারবে না ইংরেজদের ভয়ে তিনি তাদের সব দাবি মঞ্জুর করেছেন।

নবাব বললেন, ‘বেশ তো আপনারা চন্দননগরে টাঁকশাল বসান।’

এই হুকুমত যে এত সহজে পাওয়া যাবে, তা কল্পনাই করতে পারেননি ল। তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। মুখে জমাট বাঁধল খুশির রং।

নবাব বললেন, ‘আপনারা দুর্গ মজবুত করতে পারেন। আমি পরোয়ানা লিখে দিচ্ছি।’

মেঘ না চাইতেই জল। ল সাহেব দেহটাকে কোমর থেকে সামনের দিকে যথাসম্ভব ঝুঁকিয়ে বললেন, ‘বহুত বহুত সুক্রিয়া। হুজুর বহুত মেহেরবান।’

নবাব বললেন, ‘গেল বছর কলকাতা থেকে ফেরার সময় আপনাদের কাছ থেকে আমি তিন লাখ টাকা নজরানা আদায় করেছিলাম। পরে ভেবে দেখেছি, ও কাজ করাটা বাংলার নবাবের পক্ষে উচিত হয়নি। আমি আপনাদের ওই টাকা ধাপে ধাপে ফিরিয়ে দিতে চাই। এখনই এক লাখ টাকা আপনার হাতে দিয়ে দিচ্ছি।’

বাক্যহারা হয়ে হাঁ করে নবাবের দিকে চেয়ে রইলেন ল সাহেব। এ কোন সিরাজদ্দৌলা? ক্ষণিকবাদে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে নবাবকে ফের তসলিম জানিয়ে আবেগ ভরে গদগদ কণ্ঠে ল বলে উঠলেন, ‘আমি জানতাম আপনার কাছে এলে ন্যায় বিচার পাব।’

নবাব বললেন, ‘আপনাদের সঙ্গে ইংরেজদের কোথায় লড়াই হচ্ছে তা জানার দরকার নেই আমার। আমি বাংলার নবাব। আমার রাজ্যের শান্তি বিঘ্নিত করে ইংরেজরা যদি চন্দননগরে হামলা করে, তবে আপনাদের মদত দেব আমি। প্রজাদের রক্ষা করা নবাবের কাজ। রেনল্ট সাহেবকে বলবেন, তিনি যেন এ নিয়ে দুশ্চিন্তা না করেন।’

খুশি হয়ে বিদায় নিলেন জাঁ ল।

নবাব অনুভব করলেন তাঁর মনটা এখন বেশ হালকা লাগছে। আলিনগরের সুলেনামার শর্তগুলো যে পাষাণভার চাপিয়েছিল তাঁর বুকের উপরে তা যেন সরে গেল খানিকটা। যে সুবিধা তিনি ইংরেজদের দিয়েছেন, তার প্রায়ই দিয়ে দিলেন ফরাসিদের। কিছুটা হলেও মুখরক্ষা হল। ইংরেজ ও ফরাসি দুই দল সওদাগরকেই সমান চোখে দেখে নবাব রাজধর্ম পালন করেছেন—একথাই আলোচিত হবে চকবাজারের অলিতে গলিতে। কে বলে তিনি ইংরেজদের ভয়ে ভীত? ডরপোক?

অদূরে নদীর তীরে কাদার মধ্যে জলজ পোকার সন্ধানে পা টিপে টিপে ঘুরে বেড়াচ্ছে একগাদা বক। দুধের মতো সফেদ। সূর্যের আলো পড়ে চিকচিক করছে ভাগীরথীর রুপোলি জলধারা। মাঝ নদীতে ছোট ছোট ডিঙি নৌকো নিয়ে মাছ একদল জেলে। কুয়াশা না থাকায় দৃষ্টি যাচ্ছে অনেক দূর পর্যন্ত। আকাশ ঘন নীল। ওপারের সবুজও বেশ স্পষ্ট। প্রকৃতির সুন্দর ছবিটা ধরা পড়ল নবাবের চোখে। দুনিয়া বহুত রংদার।

মেয়ে উম্মেসায়েরার জন্য নবাবের মনটা হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠল। একটু তাড়াতাড়ি কুচ করলে কালই মুর্শিদাবাদে পৌঁছে যাওয়া যাবে। সেনাপতিদের ডেকে দ্রুত তাঁবু গোটানোর হুকুম দিলেন নবাব।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *