৯
১৭৫৬ সালের ১৬ অক্টোবর।
বঙ্গোপসাগরের ঢেউ ভেঙে মাদ্রাজ থেকে বাংলার উদ্দেশে রওনা হল ইংরেজদের নৌবহর। কলকাতা পুনরুদ্ধারের অভিযানে চলেছে ন’শো গোরা সৈন্য ও তেরোশো দেশি সিপাই ও লস্কর। সারিবদ্ধভাবে পরপর অনেকগুলো জাহাজ চলেছে।
কেন্ট, কামবারল্যান্ড, টাইগার, সলিসবেরি ও ব্রিজওয়াটার এই পাঁচটি জাহাজের মাথায় উড়ছে ইউনিয়ন জ্যাক। এগুলি ইংল্যান্ডের নৌবাহিনীর জাহাজ। ইঙ্গ-ফরাসি যুদ্ধের কথা ভেবে ভারতে পাঠানো হয়েছিল এই জাহাজগুলিকে। এদের পিছন পিছন চলেছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজ-ওয়ালপোল ও মারলবরো।
ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে তটভূমি। ফোর্ট সেন্ট জর্জ নজরে ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। প্রায় মাসখানেকের সমুদ্রযাত্রা। দূরবিনে চোখ রেখে তটভূমিকে শেষবারের মতো দেখে নিচ্ছিলেন রবার্ট ক্লাইভ। ওয়াটসনের চোখ আকাশের দিকে। ক্লাইভ ও ওয়াটসন দুজনেই কেন্ট জাহাজের আরোহী।
বুকে ক্রস এঁকে প্রভু জেসাসের উদ্দেশে বিড় বিড় করে প্রার্থনা জানালেন ওয়াটসন। ইংল্যান্ডের নৌসেনার দাপুটে এই অ্যাডমিরাল নানা কুসংস্কারে বিশ্বাস করেন। যাত্রার শুরুতেই আকাশের মুখ ভার দেখে মেজাজ তাঁর খিচড়ে গিয়েছে। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ কি কোনও অশনি সংকেত? এসময়ে ভারতের পূর্ব উপকূলে আশ্বিনের ঝড় খুব মারাত্মক, সমুদ্রযাত্রার পক্ষে বিভীষিকা।
‘আকাশের দিকে চেয়ে কী অত দেখছেন অ্যাডমিরাল?’ প্রশ্ন করলেন রবার্ট ক্লাইভ।
উপরের দিকে চেয়ে থেকেই ক্লাইভের প্রশ্নের উত্তরে ওয়াটসন বললেন, ‘ডাল স্কাই। যাত্রার শুরুতে গোমড়া মুখো আকাশ আমার ডিসগাস্টিং লাগে।’
‘মর্নিং শোজ দ্য ডে—প্রবাদটা নিয়ে ভাবছেন বুঝি?’
‘এ সময়ের আবহাওয়া বড় খামখেয়ালি।’
পাইপের ধোঁয়া ছেড়ে ক্লাইভ বললেন, ‘সাইক্লোন আসবে?’
‘সে রকমই তো মনে হচ্ছে। আকাশের অবস্থা ভালো নয় কর্নেল।’
ক্লাইভ বললেন, ‘ভালোই তো। সমুদ্রের বুকে প্রকৃতির সঙ্গে একপ্রস্ত লড়াই করা যাবে। তাতে বাংলার লড়াইয়ের মহড়াটা সারা হয়ে যাবে। কী বলেন অ্যাডমিরাল?’
সামুদ্রিক ঝড় নিয়ে ক্লাইভের এই রসিকতা অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের ঠিক পছন্দ হল না।
বড় অদ্ভুত এই রবার্ট ক্লাইভ লোকটা। একে যত দেখছেন, তত অবাক হচ্ছেন ওয়াটসন। দুর্ভাবনা, দুশ্চিন্তা একেবারেই লোকটার ধাতে নেই। বিপদের সময় মাথাটা দারুণ কাজ করে। ভয়ংকর প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে থেকেও সফল হয়ে বেরিয়ে আসার আশ্চর্য ক্ষমতা ইনি রাখেন। কর্নেল প্রতিভাবান লোক, একথা মানতে হবে। তবে একটা কারণেই রবার্ট ক্লাইভকে ওয়াটসনের ঠিক পছন্দ হয় না, লোকটা ভয়ানক উদ্ধত, দুর্বিনীত।
মেঘাচ্ছন্ন আকাশের মতোই ওয়াটসনের গোমড়া মুখ দেখে ক্লাইভ বুঝলেন, তার রসিকতাটা ওয়াটসন সাহেবের ঠিক পছন্দ হয়নি। রাজার প্রতিনিধি বলে লোকটার গুমর বড় বেশি। ক্লাইভ ভেবে দেখলেন, এখন লোকটাকে খামোখা না চটানোই ভালো। বাংলার লড়াইটা হাসিল করতে গেলে অ্যাডমিরালের মদত দরকার।
ক্লাইভ বললেন, ‘ভাববেন না অ্যাডমিরাল। আমার সঙ্গে থাকলে আপনার কোনও বিপদ হবে না। সামুদ্রিক সাইক্লোন আপনাকে কাবু করতে পারবে না।’
‘কী করে এত জোর দিয়ে বলছেন? জাস্ট টোয়েন্টি ইয়ারস ব্যাক ইস্ট কোস্টের সেই ডিসাসট্রাস সাইক্লোনের কথা আপনি শোনেননি?’
‘শুনেছি। তবে অপঘাতে মৃত্যু আমার কপালে লেখা নেই। না হলে দু-দুবার সুইসাইড করতে গিয়ে কেউ ফস্কায়?’
‘অন্যের মুখে শুনেছি এ কথা, বিশ্বাস হয়নি।’ আকাশের দিক থেকে মুখ নামিয়ে ক্লাইভের দিকে তাকালেন অ্যাডমিরাল।
‘বিশ্বাস করুন সত্যি বলছি। নিজের মাথা লক্ষ্য করে দু-দুবার ট্রিগার টিপলাম, গুলি বেরোল না। শুনেছেন কখনও এমন কথা? দু-দুবারই বন্দুকে গুলি ছিল না। হাউ স্ট্রেঞ্জ!’
মুখে একটু সৌজন্যের হাসি টেনে ওয়াটসন বললেন, ‘চলি। কয়েকদিন বড্ড ধকল গেছে। একটু রেস্ট নেওয়া দরকার।’
‘সন্ধেবেলা আপনার কেবিনে বসব। সঙ্গে ম্যাসওয়ানসের প্রচুর স্টক আছে।’
কথাটা শুনে ওয়াটসনের চোখমুখ চকচক করে উঠল। মরা আলোতেও সেটা ধরা পড়ল ক্লাইভের চোখে। ম্যাসওয়ানস বিয়ারের প্রতি অ্যাডমিরালের দুর্বলতার কথা তিনি জানেন।
মাথা ঝাঁকিয়ে ওয়াটসন বললেন, ‘ওকে।’
সমুদ্রের বুকে সন্ধে নামছে। ঘন নীল জলে যেন ধীরে ধীরে কেউ যেন কালি ঢেলে দিচ্ছে। খুব ধীর গতিতে চলেছে জাহাজ। দোতলার ডেকের উপর দাঁড়িয়ে একদল গোরা সৈন্য ব্যান্ডে রুল ব্রিটানিয়ার মহড়া দিচ্ছে। সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এলেন ক্লাইভ।
ছেলেগুলো বেশ ভালোই বাজাচ্ছে। একজনকে বিশেষভাবে নজর করতে লাগলেন কর্নেল ক্লাইভ। ট্রাম্পেট বাজানোর কায়দায় বোঝা যাচ্ছে, ছেলেটি বেশ দক্ষ। মুখের অভিব্যক্তি দেখে মালুম হচ্ছে ছেলেটির মধ্যে প্রবল উৎসাহ ও আবেগ রয়েছে। এমন তরতাজা ছেলেদের উপরই ক্লাইভের ভরসা। এরাই অনেক সময় যুদ্ধক্ষেত্রে আবেগের জোরে মিরাকল ঘটিয়ে দেয়। এদের দুঃসাহসকে পুঁজি করে প্রায় হেরে যাওয়া লড়াইও জিতে নেওয়া যায়।
দক্ষিণের অভিজ্ঞতা থেকে ক্লাইভ বুঝেছেন, এদেশের নবাব-বাদশাদের সেনাবাহিনী ভীষণ উশৃঙ্খল। এদের প্রশিক্ষণ সেকেলে আমলের। লড়াইয়ের আধুনিক কায়দা এরা জানে না। তাই বিপক্ষ সেনাসংখ্যার অনুপাতে অতিকায় হলেও যুদ্ধের ফলাফল এর উপর নির্ভর করে না। ন’শো সুদক্ষ গোরা সেনা নিয়ে অনায়াসে ন’হাজার এদেশীয় সৈন্যের সঙ্গে লড়াই করা যায়। সেই ভরসাতেই বেঙ্গল অভিযানে চলেছেন কর্নেল ক্লাইভ।
রুল ব্রিটানিয়ার মহড়া শেষ হল। ছেলেটিকে ডাকলেন ক্লাইভ। ‘ওহে ছোকরা এদিকে শোনো।’
কর্নেল ক্লাইভ ডাকছেন। ছেলেটি থতমত খেয়ে ছুটে এসে পেল্লায় এক স্যালুট ঠুকে বলল, ‘ইয়েস স্যার।’
‘কী নাম তোমার?’
‘গ্রাহাম স্ট্রন।’
‘এত ভালো ট্রাম্পেট বাজাতে শিখলে কোথায়?’
‘সার্কাসে।’
ক্লাইভ চমকে উঠে প্রশ্ন করেন, ‘সার্কাসে?’
‘লন্ডনের এমারেল্ড সার্কাসে ব্যান্ডের দলে ছিলাম।’ স্ট্রন উত্তর দেয়।
ক্লাইভ প্রশ্ন করেন, সৈন্যদলে এলে কেন?’
‘হঠাৎ সার্কাস পার্টি উঠে গিয়ে কাজ গেল তাই।’
ক্লাইভ একটু অবাক হয়ে বলেন, ‘তাই বলে সার্কাস থেকে ন্যাভাল ফোর্সে?’
সহজভাবে উত্তর দেয় স্ট্রন, ‘অন্য কাজ পাইনি। কিছু একটা না করলে খাব কী স্যার?’
অকাট্য যুক্তি। একটু থমকে গিয়ে ক্লাইভ ফের প্রশ্ন করেন, ‘যুদ্ধ করেছ কখনও?’
‘না। চাকরি দিয়েই তো ইন্ডিয়ায় পাঠিয়ে দিল।’
‘সাউথ ইন্ডিয়ায় যুদ্ধ করোনি?’
‘না। তখন ট্রেনিং-এ ছিলাম স্যার।’
‘কী শিখলে?’
‘নতুন কিছু শেখাল কোথায় স্যার? সবই তো জানতাম।’
ক্লাইভ প্রশ্ন করেন, ‘কী রকম?’
‘ব্যান্ড বাজানো ছাড়াও সার্কাসে অনেকরকম খেলা দেখাতাম আমি। ওখানেই শিখেছি। বন্দুকের নিশানা, আগুনের উপর দিয়ে লাফ দেওয়া, ট্রাপিজের খেলা…।’
গম্ভীর হয়ে ক্লাইভ প্রশ্ন করেন, ‘সার্কাস আর যুদ্ধ কি এক?’
‘আমার তো মনে হয় স্যার সার্কাস আর যুদ্ধে কোনও তফাত নেই। দুটোই তো খেলা। সার্কাসে মানুষকে মেসমেরাইজ করতে হয় আর যুদ্ধে মার্ডার।’
ক্লাইভের গম্ভীর মুখে এবার হাসির ঝিলিক দেখা দিল। হাতে ধরা পাইপটা ঠোঁটে গুঁজে গলগল করে খানিকটা ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘আর্মির চাকরিটা এনজয় করছ?’
‘ডেফিনিটলি স্যার। এটা সার্কাসের চেয়েও রোমাঞ্চকর।’
‘কঠিন কাজ অনায়াসে হাসিল করতে পারবে?’
‘পারব।’
‘ওয়ার ফিল্ডে তোমার মৃত্যুও হতে পারে। সে ভয় নেই?’
‘ও কথা ভাবলে কি চলে স্যার, মরার ভয় তো ট্রাপিজের খেলায়ও আছে। সময়ের সামান্য ভুলচুক হলে হাত ফসকে নীচে পড়ে মরতে হবে। আসলে মনের জোশটাই আসল। সেটা থাকলে সব কিছু সামলে নেওয়া যায়।’
স্ট্রনের পিঠ চাপড়ে দিয়ে ক্লাইভ বলেন, ‘ওয়েল সেইড। বেঙ্গলে গিয়ে তুমি আমার বাহিনীতে কাজ করবে। আমি অ্যাডমিরাল ওয়াটসনকে বলে দেব। গড ব্লেস ইউ।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।’
হাঁটতে হাঁটতে নিজের কেবিনের দিকে চলে গেলেন ক্লাইভ। কর্নেল চোখের আড়াল হতেই ঢোলা ট্রাউজারের পকেট থেকে আরকের বোতল বের করে গলায় ঢকঢক করে ঢেলে দিল স্ট্রন। তারপর মাস্তুল বেয়ে তরতর করে খানিকটা উপরে উঠে গিয়ে মাস্তুলের গায়ে হেলান দিয়ে ট্রাম্পেট বাজিয়ে গানের সুর ভাঁজতে লাগল।
অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের আশঙ্কা সত্যি হল। দিনদুয়েক বাদে মাঝ সমুদ্রে ধেয়ে এল ঝড়। এলপাথাড়ি হাওয়ার ঝাপটায় জাহাজ নিয়ে এগোনো দায় হয়ে দাঁড়াল। মাতাল সমুদ্রের বুকে ভয়ানক দুলতে লাগল জাহাজ। ইষ্ট নাম জপতে লাগলেন ওয়াটসন।
সকলে শঙ্কিত। শুধু রবার্ট ক্লাইভ অবিচল। তিনি সবার মনে ভরসা জুগিয়ে চলেছেন।
সে সময়ে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বিদায়ের পর কোনও জাহাজ মাদ্রাজ থেকে বাংলার উদ্দেশে রওনা হলে বিপরীতমুখী উত্তুরে হাওয়ার কবলে পড়ত। এই পরিস্থিতি এড়াতে জাহাজগুলো উপকূল বরাবর অগ্রসর না হয়ে বার্মার উপকূল ছুঁয়ে, বালেশ্বর হয়ে সামনে এগিয়ে গঙ্গার মোহনায় ঢুকত।
ঝড় যখন এল, তখন বার্মা উপকূল অভিমুখে চলেছে ক্লাইভ ও ওয়াটসনের জাহাজ। সামুদ্রিক ঝড়ে পড়ে জাহাজডুবি হল না ঠিকই কিন্তু দামাল হাওয়ার খামখেয়ালিপনায় জাহাজ যে ভুল পথে চলেছে সেটা প্রথমে বুঝতে পারল না কেউই।
কয়েক’দিন বাদে আবহাওয়ার উন্নতি হওয়ার পর নানারকম হিসেবনিকেশ করে জাহাজের ক্যাপ্টেন যে কথা শোনালেন, তাতে ক্লাইভ ও ওয়াটসন দুজনেই চমকে উঠলেন।
ক্যাপ্টেন বললেন, ‘জাহাজ সিলোন উপকূলের কাছাকাছি চলে এসেছে।’
‘ও মাই গড! তার মানে আমরা সামনে না এগিয়ে অনেক পিছিয়ে এসেছি?’ প্রশ্ন করলেন ওয়াটসন।
ঘাড় নাড়লেন ক্যাপ্টেন। ‘বেঙ্গলে পৌঁছতে অনেক বেশি সময় লাগবে।’
এবারে চিন্তিত হয়ে পড়লেন ক্লাইভ। চিন্তাটা দেরিতে পৌঁছনোর জন্য নয়, চিন্তা হল রসদ আর পানীয় জল নিয়ে। মাদ্রাজ থেকে রওনা হয়ে চার-পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে বেঙ্গলে পৌঁছে যাওয়ার কথা। সেইমতো রসদ ও পানীয় জল আছে জাহাজে। তারপরে কী হবে?
অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের সঙ্গে আলোচনায় বসলেন কর্নেল ক্লাইভ। ঠিক হল এখন থেকেই দৈনিক খাবারদাবার ও জলের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হবে। একথা শুনে ঘোর দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়ে গেল ক্লাইভ ও ওয়াটসনের বাহিনী।
কয়েকদিন পর আরও একটা বড় বিপদের মুখোমুখি হল ইংরেজ বাহিনী। সবে ভোর হয়ে সূর্য উঠেছে। শান্ত সমুদ্র। হাওয়া নেই তেমন। আকাশ ঝকঝকে। কেবিনের জানালা দিয়ে ঘরে এসে পড়ছে ভোরের নরম আলো। ঘুম ভেঙে গেল ক্লাইভের। বিছানা ছেড়ে উঠে পাইপ ধরিয়ে ডেকের উপর এসে দাঁড়ালেন। জাহাজের কাছেই ভুস ভুস করে ভেসে উঠছে একগাদা ডলফিন।
হঠাৎ দূরের দিকে চাইতেই কর্নেল ক্লাইভের চোখ স্থির হয়ে গেল। আনুমানিক দুশো মিটার দূরে জলের উপর ভাসছে সলিসবেরি। জাহাজটা একদিকে কেমন যেন হেলে গিয়েছে। ছবিটা কর্নেলের অভিজ্ঞ চোখে কেমন যেন বিষম ঠেকল। দূরবিনে চোখ রাখলেন ক্লাইভ। সলিসবেরি থেকে কেউ পতাকা নেড়ে ক্লাইভ ও ওয়াটসনের জাহাজ কেন্টের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে। পতাকার চিহ্ন দেখে বোঝা গেল, ক্লাইভের অনুমান সত্যি। সলিসবেরি বিপদে পড়েছে।
ক্লাইভের হাঁকডাক শুনে অনেকেই ছুটে এল ডেকে। ছুটে এলেন ওয়াটসন। কেন্ট থেকে তখনই বোট নামানোর হুকুম দিলেন ক্লাইভ। ক্লাইভের আদেশে দ্রুত বোটে উঠে পড়ল জাহাজ মেরামতির দক্ষ কারিগরেরা। ক্লাইভ নিজেও নামতে উদ্যত হলেন। বাধা দিল অনেকে। কোনও কথাই শুনলেন না ক্লাইভ। তাঁর মাথায় তখন অন্য চিন্তা। তাঁর বাহিনীর প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র মজুত রয়েছে সলিসবেরিতে।
ক্লাইভ বললেন, ‘সলিসবেরি যেভাবে কাত হয়ে গেছে তাতে আমার অনুমান, ফুটো হয়েছে জাহাজ। সলিসবেরি ডুবলে আমাদের বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। সলিসবেরির সমস্যাটা কী, নিজের চোখে দেখতে চাই।’
স্ট্রন এগিয়ে এসে বলল, ‘আমি আপনার সঙ্গে যেতে চাই স্যার।’
ক্লাইভ মুচকি হেসে বললেন, ‘এসো।’
সলিসবেরিতে উঠে এসে ক্লাইভ দেখলেন, যা অনুমান করেছিলেন ঠিক তাই। জাহাজের খোলের পিছন দিকে বড়সড় একটা ছিদ্র তৈরি হয়েছে। দ্রুত গতিতে জল ঢুকছে ভিতরে। সমস্যাটা দেখা দেয় গতকাল রাতে। সারারাত সমানে জল বাইরে ফেলে জাহাজকে কোনওরকমে ভাসিয়ে রেখেছে মাঝিমাল্লারা। কিন্তু ছিদ্র মেরামতের কোনও সুরাহা হয়নি।
ক্লাইভের সঙ্গে আসা কারিগরের দল তখনই কাজে লেগে পড়ল। হাত লাগাল স্ট্রনও। প্রায় চব্বিশ ঘণ্টার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ছিদ্র মেরামত করা গেল। এ যাত্রা বেঁচে গেল সলিসবেরি। অক্ষত রইল ইংরেজদের যুদ্ধের রসদ।
মানুষ নিজের ভাগ্য নিজেই গড়ে নেয়। এই তত্ত্বে বিশ্বাস করেন ক্লাইভ। ভাগ্যদেবী বলে যদি কেউ থেকেও থাকেন, তিনি উদ্যমী পুরুষদেরই সাহায্য করে থাকেন। এমনটাই মনে করেন কর্নেল ক্লাইভ। উদ্যমী কর্নেল অতীতে অনেকবারই ভাগ্যদেবীর আশীর্বাদ পেয়ে এসেছেন। এবারে গতিক মনে হচ্ছে অন্যরকম।
সলিসবেরি বেঁচে গেল ঠিকই কিন্তু সমুদ্রের বুকে সামান্য যে হাওয়া ছিল, সেটা একেবারেই পড়ে গেল। অত্যন্ত মন্থর গতিতে চলতে লাগল জাহাজ।
দেখতে দেখতে খাবার ও পানীয় জল প্রায় ফুরিয়ে এল। চাল, গম শেষ। আহার্য বলতে রয়েছে কেবল গরু ও শুয়োরের শুকনো জারানো মাংস। এ দিয়ে গোরা সৈন্যদের কোনোরকমে ঠেকিয়ে রাখা যাবে। কিন্তু তেলেঙ্গানার দেশি সিপাইদের কী হবে? ক্লাইভ জানেন, তারা না খেয়ে মরলেও গোরু বা শুয়োরের মাংস মুখে দেবে না।
কেন্ট জাহাজের পাইলট জানালেন, বালেশ্বর এখনও সাত-আট দিনের পথ।
ক্লাইভ ও ওয়াটসন দুজনেই চোখে অন্ধকার দেখলেন। স্কার্ভি ইতিমধ্যেই জাহাজিদের মধ্যে থাবা বসিয়েছে। পথ্য নেই। দিশি সৈন্যরা অভুক্ত। এভাবে সাত-আট দিন চললে তো বেঙ্গলে পৌঁছনোর আগেই গোটা সৈন্যবাহিনী উজাড় হয়ে যাবে। চারিদিকে শুধু জল আর জল। ক্লাইভ ও ওয়াটসন দূরবিনে চোখ লাগিয়ে সারাদিন বসে থাকেন। যদি দৈবক্রমে ডাঙার দেখা পাওয়া যায়।
দুদিন পর, পড়ন্ত বিকেলে দূরবিনে চোখ রেখে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন অ্যাডমিরাল ওয়াটসন, ‘কর্নেল দেখে যান, ল্যান্ড দেখা যাচ্ছে।’
ছুটে এলেন ক্লাইভ। জাহাজের পাইলটও ছুটে এলেন। সত্যিই দূরে চোখে পড়ছে সবুজ তটভূমি। অভুক্ত, অর্ধভুক্ত সৈন্যরা উল্লাসে ফেটে পড়ল।
ক্লাইভ প্রশ্ন করলেন, ‘এটা কোন জায়গা?’
কম্পাস ও ম্যাপ নিয়ে কিছুক্ষণ গবেষণার পর পাইলট জানালেন, ‘আমরা বালাসোর পৌঁছে গেছি!’
ওয়াটসন শুধোলেন, ‘সে কী? আপনি যে বলেছিলেন আরও সাত-আট দিন।’
মাথা চুলকে পাইলট বললেন, ‘তখন ক্যালকুলেশনে ভুল হয়েছিল।’
ক্লাইভ হেসে বললেন, ‘সাবাস ক্যাপ্টেন! এমন ভুল বারবার করলে ক্ষতি নেই।’
ক্যাপ্টেন চলে গেলেন বালেশ্বর বন্দরে জাহাজ ভেড়ানোর তোড়জোড় করতে। আকাশের দিকে চেয়ে বুকে ক্রস আঁকলেন অ্যাডমিরাল ওয়াটসন- স্বস্তি! স্বস্তি! পরম স্বস্তি।
ক্লাইভ বললেন, ‘ক্যালকাটার সিলেক্ট কমিটিকে লেখা মাদ্রাজ কাউন্সিলের চিঠিটা ভালো করে পড়ে দেখেছেন অ্যাডমিরাল?’
‘কেন? বিশেষ কী আছে তাতে?’
‘কাউন্সিল বলেছে, নবাব সোজা কথায় ক্যালকাটা ফিরিয়ে না দিলে একটু আধটু বলপ্রয়োগ করতে হতে পারে। নবাবের রাইভাল গ্রুপের সঙ্গে হাত মেলানোর কথাও বলা আছে চিঠিতে।’
‘তাই বুঝি?’
‘ইট মিনস, বেঙ্গল লুঠ করার পারমিশন কার্যত দিয়েই দিয়েছে মাদ্রাজ কাউন্সিল।’
ওয়াটসনের চোখ চকচক করে উঠল। তিনি বললেন, ‘শুনেছি বেঙ্গল না কি গোল্ড মাইন!’
‘রাইট। বেঙ্গলের লড়াইটা জিততে পারলে আর ভাবনা নেই। তবে একটা কথা, ওয়েস্ট কোস্টে আংগ্রিয়ার সঙ্গে লড়াইয়ে আপনার লাভ হয়েছে বেশি। সেখানে লুঠের ভাগ আপনি বেশি পেয়েছেন। আমার ভাগে কম পড়েছে। এবারে বেঙ্গল লুঠের বখরা কিন্তু আমার ও আপনার মধ্যে ফিফটি-ফিফটি হবে।’
ভুরু কুঁচকে ক্লাইভের দিকে তাকালেন ওয়াটসন।
রবার্ট ক্লাইভের শেষ কথাটা বোধ হয় ঠিক শুনতে পেলেন না। কেননা ঠিক তখনই মস্ত এক ভোঁ বাজিয়ে বালেশ্বর বন্দরে ঢুকল জাহাজ।
