১৮
১৭৫৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর।
ভোরের আলো ফুটতেই রুল ব্রিটানিয়ার সুর বেজে উঠল ব্যান্ডে। ফলতা থেকে বজবজের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করল ইংরেজদের স্থলবাহিনী। নেতৃত্বে মেজর কিলপ্যাট্রিক। সঙ্গে ক্যাপটেন কিং, ক্যাপটেন বার্কার, ক্যাপটেন পাই ও দক্ষিণ থেকে আসা দেশি শ তিনেক সেনা।
গতকাল সারারাত ধরে চলেছে যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতি। বহু মানুষের কলরবে, বলদ-মহিষের হাঁকডাকে, তাদের গলঘণ্টার শব্দে, গো-গাড়ির ক্যাঁচকোচ আওয়াজে মুখর হয়েছে রাতের স্তব্ধতা। তার আগে সন্ধেবেলা অবশ্য ইংরেজ শিবিরে ঘটে গিয়েছে একপ্রস্থ চমকপ্রদ নাটক।
সন্ধের মুখে তিরিশখানা গো-গাড়ি ইংরেজ শিবিরের দিকে আসতে দেখে রজার ড্রেকের চোখ কপালে উঠে যায়। নব মুনশির সাহায্যে কর্নেল ক্লাইভ যে এত সহজে গোরুর গাড়ি জোগাড় করে ফেলবেন, সেটা তিনি ভাবতেও পারেননি। সত্যি সত্যিই তাহলে আগামীকাল সকালে যুদ্ধযাত্রা করবেন কর্নেল!
রজার ড্রেক ছুটে গেলেন হলওয়েলের কাছে। এখনই যুদ্ধযাত্রায় হলওয়েলেরও সায় নেই। আসলে কলকাতা আক্রমণের বিভীষিকা, অন্ধকূপের স্মৃতি এখনও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে দুজনকে। ফের একবার নবাবের সঙ্গে টক্কর নিতে যাওয়ার কথা ভেবে দুজনেরই গা কাঁপছে।
রজার ড্রেক বললেন, ‘দিস ইস অ্যা সুইসাইডাল অ্যাকশন। গোঁয়ার্তুমির একটা সীমা থাকা দরকার। ভেবেছেন কী কর্নেল ক্লাইভ? ব্যাটেলফিল্ড উনি একাই বোঝেন? আমরা বুঝি না? কতটুকু চেনেন উনি নবাব সিরাজদ্দৌলাকে? নবাবের ফরমিডেবল ফোর্স সম্বন্ধে কোনও ধারণা আছে তাঁর? এ যে আগুনে ঝাঁপ দেওয়া! তবুও তো এখানে একরকম বেঁচে আছি আমরা। এবারে হয়তো সবাইকে মরতে হবে।’
শেষ বিকেলের আলোয় ফোর্ট উইলিয়াম জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে ছিলেন রজার ড্রেক ও হলওয়েল। হলওয়েলের চোখ দূরবিনে। ডেক থেকে দেখা যাচ্ছে নদীর পাড়ে সারবদ্ধ ভাবে দাঁড় করানো গোরুর গাড়িগুলোকে। মালপত্র বোঝাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। প্রচণ্ড ব্যস্ততার সঙ্গে সে কাজ তদারক করছেন কিং, পাই, বার্কার, ওয়ালস ও লাশিংটন। পাড়ের দিক থেকে একটা তীব্র কোলাহলের শব্দ ভেসে আসছে।
দূরবিন থেকে চোখ নামিয়ে হলওয়েল গম্ভীর ভাবে বললেন, ‘আপনি ঠিকই বলছেন মিঃ ড্রেক। যুদ্ধের ব্যাপারে এত হেস্টের কী আছে সেটা আমিও বুঝতে পারছি না। ওই তো সামান্য ক’জন সোলজার রয়েছে কর্নেল ও অ্যাডমিরালের সঙ্গে। কর্নেল নিজেই বলেছেন তাঁর বেস্ট কনটিনজেন্ট আসছে মার্লবরো ও কামবারল্যান্ড জাহাজে। এই জাহাজদুটো পৌঁছনোর জন্য কি অপেক্ষা করা যেত না?’
রজার ড্রেক ব্যঙ্গের ছলে বললেন, ‘হুঁ! সাবিৎ জঙ্গ! ইনভিনসিবল ইন ওয়ার! সাউথের নেটিভরা কর্নেলের মাথাটা খেয়েছে।’
হলওয়েল বললেন, ‘মিঃ ড্রেক আমার মনে হচ্ছে এখনই সিলেক্ট কমিটির একটা মিটিং ডাকা উচিত। এখনও সময় আছে। কর্নেলকে থামাতেই হবে। আগে অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের সঙ্গে একবার আলোচনা করা দরকার।’
ওয়াটসনের কাছে ছুটলেন হলওয়েল ও ড্রেক।
ক্লাইভ একগুঁয়ে জেদি লোক। তিনি যা মনে করেন, তাই করে ছাড়েন। নিজের মত অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে তিনি ভালোবাসেন। একথা অল্প ক’দিনেই বুঝে গিয়েছেন হলওয়েল ও ড্রেক। দুজনের কারওরই ক্লাইভের খবরদারি সহ্য হচ্ছে না। কিন্তু কিছু করার নেই। কর্নেল ক্লাইভকে বেঙ্গল এক্সপিডিশনের দায়িত্ব দিয়েছে মাদ্রাজ কাউন্সিল। তাই কর্নেলের সব হম্বিতম্বি মুখ বুজে হজম করতে হচ্ছে। কিছুদিন আগেও আদায়-কাঁচকলায় সম্পর্ক ছিল হলওয়েল ও ড্রেকের। কর্নেল ক্লাইভের বিরোধিতা করতে এখন এক হয়েছেন দুজনে।
যাই হোক না কেন, কোম্পানির আদেশ অনুযায়ী কলকাতা কাউন্সিলের গভর্নর এখনও রজার ড্রেক। তাঁর থেকে বয়সে সিনিয়র হলেন হলওয়েল। রজার ড্রেক ফোর্ট উইলিয়াম থেকে পালিয়ে আসার পর এক কঠিন সময়ে অ্যাকটিং গভর্নর হিসেবে সিরাজদ্দৌলার মুখোমুখি হতে হয়েছিল হলওয়েলকে। সেই ভয়ানক রাতে ফোর্ট উইলিয়ামের ভিতরে অন্ধকূপে তিনিও ছিলেন। কোনওরকমে জানে বেঁচে গিয়েছেন। সে স্মৃতি হলওয়েলকে ভয়ানক ভাবে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে এখনও।
ফের নবাবের সঙ্গে যুদ্ধ? তাও আবার মাত্র পাঁচশো সৈন্যের ভরসায়! কলকাতায় মানিকচাঁদের হাতেই নাকি রয়েছে হাজার পাঁচেক সেনা। হলওয়েল ও ড্রেক ভাবেন, সেবার তাও ফলতায় পালিয়ে বেঁচেছিল ইংরেজরা, এবার না কর্নেলের আহাম্মকির জন্য সব জ্যান্ত গোরে যায়।
এখন ওয়াটসনই ভরসা। তিনি বেঁকে বসলে কর্নেল ক্লাইভের পক্ষে এই মুহূর্তে যুদ্ধে যাওয়া কিছুতেই সম্ভব হবে না।
রজার ড্রেক সিলেক্ট কমিটির জরুরি মিটিং-এর কথা তুলতেই ওয়াটসন বললেন, ‘আই অ্যাম নট এ মেম্বার অফ সিলেক্ট কমিটি। কাজেই এইসব মিটিং-এ আমার কোনও ইনটারেস্ট নেই। আর আপনাদের কোনও ডিসিশনের মধ্যে আমাকে জড়াবেন না। আফটার অল আই অ্যাম নট অ্যা সারভেন্ট অফ দ্য কোম্পানি। আপনারা যদি মনে করেন যুদ্ধ করবেন, তবে আমি জাহাজ নিয়ে এগোব। এটাই আমার উপর ম্যাড্রাস কাউন্সিলের অর্ডার। আপনারা যা করবেন দ্রুত ঠিক করুন। তবে একটা কথা, আমি খুব বেশিদিন এই জঙ্গলে এ ভাবে আইডল বসে বসে মশার কামড় খেতে পারব না।’
হতাশ হয়ে ফিরে এলেন হলওয়েল ও ড্রেক।
সিলেক্ট কমিটির মিটিং বসল কেন্ট জাহাজে।
মিটিং কোনওদিনই খুব একটা ভালো লাগে না ক্লাইভের। মিটিং-এ বসলে তাঁর ঘুম পায়। তিনি মনে করেন বসে বসে মিটিং করা হল অলস লোকের কাজ। কর্নেল ক্লাইভ চান গরমাগরম অ্যাকশন, উপভোগ করেন দুঃসাহসী অ্যাডভেঞ্চার, গায়ের রক্ত গরম করা উত্তেজনা।
মিটিং রুমে চেয়ারে গা এলিয়ে বুকের কাছে হাত ভাঁজ করে, চোখ বুজে, পায়ের উপর পা তুলে বসে ছিলেন কর্নেল ক্লাইভ।
রজার ড্রেকের চোখেমুখে উৎকণ্ঠা। বললেন, ‘আপনার প্ল্যানটা যদি একটু ওপেনলি বলেন কর্নেল।’
চোখ খুলে নিরুদ্বেগ গলায় কর্নেল বললেন, ‘সিক্রেট তো কিছু নেই। দুদিন আগের মিটিং-এও বলেছি, এখনও বলছি টুমরো মর্নিং আই উইল মুভ ফর বজবজ।’
‘সব দিক ভেবে দেখেছেন?’
পাখির পালক দিয়ে কান খোঁচাতে খোঁচাতে ক্লাইভ বললেন, ‘হুঁ।’
রজার ড্রেক প্রশ্ন করলেন, ‘হোয়াট ইস দ্য নিড ফর সাচ অ্যা হারি?’
অবাক চোখে রজার ড্রেকের দিকে তাকিয়ে কর্নেল বললেন, ‘হারি? আপনারা কি এখানেই বসে থেকে মরতে চান?’
‘সেকথা হচ্ছে না।’
এবার একটু চড়া গলায় কর্নেল বললেন, ‘তাহলে হঠাৎ মিটিং ডেকে এসব কথা আলোচনা করছেন কেন?’
হলওয়েল বললেন, ‘আপনার দুটো জাহাজ মার্লবরো ও কামবারল্যান্ড এখনও পৌঁছয়নি।’
উদ্ধত ভঙ্গিতে ক্লাইভ বললেন, ‘সো হোয়াট?’
ড্রেক বললেন, ‘আপনিই বলেছেন আপনার বেস্ট কনটিনজেন্ট রয়েছে ওই জাহাজদুটোতে।’
কাঁধ ঝাঁকিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘দ্যাটস ট্রু।’
হলওয়েল বললেন, ‘ওই জাহাজদুটো আসা পর্যন্ত আর কয়েকটা দিন কি ওয়েট করা যায় না?’
ক্লাইভ বললেন, ‘ওয়েট করতাম। এখানকার অবস্থা যদি ফেভারেবল হত। এখানে এসে দশ দিনের মধ্যে আমার তিরিশজন সোলজার অসুস্থ হয়ে পড়েছে। দুজন মারা গেছে। এখানে বেশিদিন বসে থাকলে আমার সোলজাররা সব ভ্যানিশ হয়ে যাবে।’
‘নবাবের ফোর্স সম্বন্ধে কোনও ধারণা আছে আপনার?’ প্রশ্ন করলেন হলওয়েল।
ক্লাইভ অবজ্ঞার সুরে বললেন, ‘না নেই।’
‘তা সত্ত্বেও যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিয়ে আপনি কি খুব বেশি রিস্ক নিয়ে ফেলছেন না?’
বুকের কাছে হাত দুটোকে ভাঁজ করে ক্লাইভ বললেন, ‘আমি রিস্ক নিতে ভালোবাসি।’
ড্রেক বললেন, ‘ইফ উই লুজ দ্য ব্যাটেল?’
অবজ্ঞার মুচকি হাসি ছুড়ে দিয়ে কর্নেল ক্লাইভ বললেন, ‘হারজিতের কথা ভেবে যুদ্ধ করা যায় না। তাছাড়া আপনারা তো হেরেই আছেন, এই জঙ্গলে পড়ে আছেন লাইক ওয়াইল্ড অ্যানিমালস। আর কি হারানোর আছে আপনাদের? মনে সাহস আনুন।’
রজার ড্রেক ধৈর্য হারিয়ে বেশ উত্তেজিত হয়ে ব্যঙ্গের সুরে বললেন, ‘আমি কাওয়ার্ড নই। তবে আমি মনে করি দেয়ার ইস অ্যা সাটল ডিফারেন্স বিটুইন কারেজ অ্যান্ড স্টুপিডিটি।’
প্রচণ্ড জোরে টেবিলের উপর মুষ্ঠাঘাত করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন কর্নেল ক্লাইভ। বললেন, উঠলেন, ‘হোয়াট ডু ইউ মিন? আমি আপনাদের সঙ্গে ঝগড়া করতে আসিনি। যুদ্ধ আমি অনেক দেখেছি। কখন কী করতে হয়, আই নো ওয়েল। আপনাদের সাহায্য করার জন্য আমাকে পাঠানো হয়েছে ম্যাড্রাস থেকে। আপনাদের যদি কলকাতায় ফেরার কোনও তাগিদ না থাকে, তাহলে আপনারা এই এঁদো জায়গাতেই পড়ে থাকুন। নবাবের ভয়ে গর্তে লুকিয়ে থাকুন। আমি আমার কনটিনজেন্ট নিয়ে সাউথে ফিরে যাচ্ছি।’
এই বলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ক্লাইভ উদ্যত হতেই ছুটে এসে তার পথ আটকালেন স্ক্র্যাফটন ও কিলপ্যাট্রিক।
কর্নেল ক্লাইভ যে হঠাৎ এভাবে রিঅ্যাক্ট করবেন সেটা ড্রেক ও হলওয়েল কল্পনাও করতে পারেননি। দুজনেই হতভম্ব হয়ে বেশ বেকায়দায় পড়ে গেলেন। সিলেক্ট কমিটির বাকি সদস্যসহ বেশিরভাগ ইংরেজই ক্লাইভের পক্ষে। তাদের কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছে ফলতা। এখনই তারা গায়ের জোরে কলকাতা ফিরে পেতে চায়। নবাবের হাতে হয়রানির প্রতিশোধ নিতে চায়। এই মনোভাব টের পেয়ে পিছিয়ে গেলেন ড্রেক ও হলওয়েল। সিলেক্ট কমিটিতে সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়ে গেল বজবজ অভিযান।
এইসব নাটক মিটে যাওয়ার পর সকলকে ডেকে ক্লাইভ বললেন, ‘লেট আস সেলিব্রেট আওয়ার ভিকট্রি ওয়েল ইন অ্যাডভান্স। ল্যাম্ব রোস্ট অ্যান্ড শ্যাম্পেন।’
এই প্রস্তাব শুনে উৎসাহে হইহই করে উঠল অনেকে। পার্টি শুরু হয়ে গেল কেন্ট জাহাজে। খানাপিনায় মেতে উঠল সাহেবরা। কিলপ্যাট্রিক, স্ক্র্যাফটন, কিং, বার্কার, আয়ারকুট, পাই, ওয়েলার, হেস্টিংস, ওয়ালস, লাশিংটন, ওয়াটস, ক্লাইভ, ওয়াটসন-সবাই।
ড্রেক ও হলওয়েল স্তম্ভিত হয়ে গেলেন কর্নেল ক্লাইভের ঔদ্ধত্য ও আত্মবিশ্বাস দেখে।
গঙ্গার পাড় বরাবর অপরিসর শুঁড়িপথ। এ পথে লোকজন বড় একটা চলাচল করে না। পথের উপর হুমড়ি খেয়ে এসে পড়েছে আশেপাশের উচ্ছৃঙ্খল গাছপালা, ঝোপঝাড়। এ পথে গো-গাড়ি নিয়ে যাওয়া খুবই কঠিন। মেজর কিলপ্যাট্রিকের নেতৃত্বে গাছের ডালপালা কাটতে কাটতে এগোতে লাগল কোম্পানির ফৌজ।
পথে পড়ছে নানারকম ছোট ছোট নালা। এখন জল নেই। তবে নালার মাটি বেশ নরম। নরম মাটির উপর গাছের ডালপালা ফেলে অনেক কসরত করে গড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে গোরুর গাড়িগুলোকে। সামনের দুটো গোরুর গাড়িতে রয়েছে দুটো ফিল্ড পিস কামান। বাকিগুলো গোলা, বন্দুক, বারুদের পিপে, ফৌজিদের রসদ, তাঁবু ফেলার সরঞ্জাম-এসবে বোঝাই।
বিকেল চারটে নাগাদ মায়াপুরে পৌঁছল কোম্পানির ফৌজ। পরিশ্রান্ত সৈন্যরা অনেকেই এলিয়ে পড়ল ঘাসের উপর। গঙ্গার পাড়ে সবুজে মোড়া উঁচু একটা ঢিবির উপর উঠে চামড়ার বোতল খুলে ঢক ঢক করে গলায় জল ঢাললেন মেজর কিলপ্যাট্রিক। সারা গা থেকে দরদর করে ঘাম ঝরছে।
মরে আসছে বিকেলের আলো। ধীরে ধীরে কুয়াশার চাঁদর নেমে আসছে গঙ্গার বুকে।
দূরবিনে চোখ রেখে দক্ষিণমুখো হয়ে দাঁড়ালেন কিলপ্যাট্রিক। চোখে পড়ল কেন্ট জাহাজের মাস্তুল। অনেকটা দূরে। কর্নেল ক্লাইভ আসছেন ওই জাহাজে। নামবেন এখানে। তারপরে স্থলবাহিনীকে নিয়ে কর্নেল এগোবেন বজবজ কেল্লার দিকে। কেন্ট, টাইগার ও সলিসবেরি জাহাজ তিনটে নিয়ে অ্যাডমিরাল ওয়াটসন নদীর বুকে বজবজ কেল্লার সামনে গিয়ে দাঁড়াবেন। জাহাজ থেকে গোলা ছুড়বেন কেল্লায়। পরিকল্পনা এইরকম।
জাহাজের ভোঁ শোনা গেল। টাইগার, কেন্ট ও সলিসবেরি জাহাজ তিনটির অবয়ব ক্রমশ বড় হতে লাগল। মায়াপুরে এসে থামল কেন্ট। টাইগার ও সলিসবেরি সোজা এগিয়ে গেল বজবজ কেল্লার দিকে। সুলুপে চেপে পাড়ে এসে উঠলেন কর্নেল ক্লাইভ। সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর দল, নব মুনশি ও নীলকণ্ঠ।
ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজে রাখা পাইপটা হাতে নিয়ে কর্নেল বললেন, ‘বেশ কিছুদিন রেস্টে ছিলাম আমরা। আর রেস্ট নয়। এখনই আমি বজবজের দিকে এগোতে চাই।’
মেজর কিলপ্যাট্রিক বললেন, ‘ইয়েস স্যার।’
অন্ধকার নামল। জ্বলে উঠল শয়ে শয়ে মশাল। গঙ্গার পাড়ের এঁদো নিঝুম এলাকাগুলো হঠাৎ মানুষের কলরবে সচকিত হয়ে উঠল। ঘুম চটকে গেল গ্রামের মানুষের। চাদরে মাথা মুড়ে চোখ কচলে তারা দেখল, বজবজ কেল্লার দিকে এগিয়ে চলেছে কোম্পানির ফৌজ। আবার যুদ্ধ বাঁধতে চলেছে। সে রাতেই গ্রাম ছেড়ে পালাবার জন্য তোড়জোড় করতে লাগল অনেকে।
ক্লাইভের নির্দেশে ছোট একটা দল নিয়ে পুব দিকে সরে যেতে লাগলেন ক্যাপ্টেন পাই। মশাল হাতে তাদের পথ চিনিয়ে নিয়ে চলল নীলকণ্ঠ। এই দলটা ঘাঁটি গাড়বে কলকাতা থেকে বজবজে আসার মূল সড়কের পাশে। এপথ দিয়েই আসতে হবে মানিকচাঁদের বাহিনীকে। ক্যাপটেন পাই তাঁর ঘাঁটি থেকে কর্নেল ক্লাইভের ক্যাম্প পর্যন্ত খানিক দূরে দূরে মোতায়েন করবেন আর্মড গার্ড। যাতে এরা নিশান দেখিয়ে মানিকচাঁদের বাহিনীর আগমন সংবাদ সঠিক সময়ে কর্নেলকে জানাতে পারে।
বেলভেডিয়ারে নিজের হাভেলির প্রশস্ত অলিন্দে উত্তেজিত হয়ে পায়চারি করতে করতে মানিকচাঁদ বললেন, ‘ঠিক বলছ?’
জোড় হাত হয়ে রাধাকৃষ্ণ মল্লিক বলল, ‘জি হুজুর। বিলকুল ঠিক। এতকাল আপনার নিমক খেয়েছি, আপনাকে কি ঝুটমুট বলতে পারি? মায়াপুরে পৌঁছে গেছে কোম্পানির ফৌজ। তিনটে জাহাজ গেছে কেল্লার দিকে।’
বিরক্তির সঙ্গে মানিকচাঁদ বললেন, ‘সাহেবরা মাল বওয়ার গো-গাড়ি জোগাড় করল কী করে?’
ঢোক গিলে কাঁদো কাঁদো গলায় রাধাকৃষ্ণ মল্লিক বলল, ‘লালমুখো সাহেবগুলো জাঁহাবাজ।’
সটান রাধাকৃষ্ণের চোখের দিকে তাকিয়ে মানিকচাঁদ শুধোলেন, ‘পরোয়ানা অনুযায়ী ফলতায় ঢোল শোহরত হয়েছিল?’
একটা পোকা দেওয়ালগিরির আগুনে ঝাঁপিয়ে পুড়ে ছাই হয়ে গেল। মানিকচাঁদের প্রশ্ন শুনে চমকে উঠল রাধাকৃষ্ণ মল্লিক। তার বেইমানির কথা কোনও কাসিদ কি মানিকচাঁদের কানে পৌঁছে দিয়েছে? মানিকচাঁদ সন্দেহ করছেন তাকে?
ব্যস্ত হয়ে রাধাকৃষ্ণ মল্লিক বলে উঠল, ‘জি হুজুর। আমার কাজে কোনও কসুর হয়নি। গোটা এলাকা জুড়ে ঢোল শোহরত হয়েছে। তিনদিন ধরে হয়েছে।’
‘তবু হুকুমত অমান্য করল প্রজারা?’
ডান গালের বড় আঁচিলটা চুলকে রাধাকৃষ্ণ মল্লিক বলল, ‘এদেশের নচ্ছাড় মিনসেরা সাহেবদের ভারি ন্যাওটা। এদের মুরুব্বি হল নব মুনশি।’
‘নব মুনশি?’ ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন করলেন মানিকচাঁদ।
‘ফোর্ট উইলিয়ামে মুনশিগিরি করত। নাম নবকৃষ্ণ। গোবিন্দপুরে ভিটে। শুনছি এখন নাকি সাবিৎ জঙ্গের খুব পেয়ারের লোক হয়েছে। শুনলাম সে ছলচাতুরি করে কান ভাঙিয়েছে প্রজাদের।’
‘আমার পরোয়ানা অমান্য করে নব মুনশির কথায় প্রজারা গো-গাড়ি দিয়ে দিল?’
বুক ঢিবঢিব করতে লাগল রাধাকৃষ্ণ মল্লিকের। সে দ্রুত বলে উঠল, ‘শুনেছি ও তল্লাটে নব মুনশির মাতুলঘর। অনেকেই চেনে তাকে। তার উপরে হল গিয়ে সাহেবদের কড়ির জোর, গা জোয়ারি-সব মিলিয়ে আর কি ‘
রাধাকৃষ্ণ মল্লিককে বাধা দিয়ে মানিকচাঁদ বলে ওঠেন, ‘গর্দান যাওয়ার ভয় নেই প্রজাদের?’
‘আজ্ঞে আমিও তো সেই কথাই ভাবছি। সব বেইমান। নিমকহারামের দল।’
‘গদ্দারগুলোকে পরে উচিত শিক্ষা দিতে হবে।’
‘ঠিক কথা। একেবারে ধুনে দেবেন হুজুর। বজ্জাতের দল! হুজুরের পরোয়ানা অমান্য করে!’
মানিকচাঁদ পায়চারি করতে থাকেন।
রাধাকৃষ্ণ মল্লিক বলে, ‘বজবজ কেল্লায় মাত্র ষাটজন বরকন্দাজ রয়েছে। এখনই আপনার সেনা পাঠানো উচিত।’
‘রাতের অন্ধকারে কোম্পানির ফৌজ কিছু করবে বলে মনে হয় না। যা হবে কাল সকালে দেখা যাবে। তুমি বজবজ কেল্লায় ফিরে যাও। কেল্লার সব ফটক যেন বন্ধ থাকে।’
‘জি হুজুর।’
ঘাম দিয়ে যেন জ্বর ছাড়ল রাধাকৃষ্ণ মল্লিকের। আর যাই হোক, মানিকচাঁদ তাকে সন্দেহ করেননি। মানিকচাঁদের হাভেলি থেকে বেরিয়ে এসে ঘোড়ার পিঠে চেপে বসল রাধাকৃষ্ণ মল্লিক। ঘোড়া তিরবেগে ছুটে চলল বজবজ কেল্লার দিকে।
চিন্তিত হয়ে পড়লেন মানিকচাঁদ। যুদ্ধটা শেষ পর্যন্ত এড়ানো গেল না। ইংরেজদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল বণিক চূড়োমণি উমিচাঁদের। এসময় তাঁকে হাতের কাছে পেলে ইংরেজদের থামানোর একটা শেষ চেষ্টা করা যেত। উমিচাঁদ নবাবের সঙ্গে পূর্ণিয়ায় গিয়েছেন।
এ যুদ্ধ ঠেকানোর কোনও উপায় নেই। এখনই ফৌজ নিয়ে রওনা হতে হবে বজবজের পথে। কোনওদিন সেভাবে যুদ্ধ করেননি মানিকচাঁদ। অজানা আশঙ্কায় বুক ধড়ফড় করতে লাগল তাঁর। সুযোগ থাকলে এখনই হয়তো তিনি পালিয়ে যেতেন আলিনগর থেকে। কিন্তু সে পথ বন্ধ। ইংরেজদের সঙ্গে লড়াই না করে পালিয়ে গেলে গর্দান নেবেন নবাব সিরাজদ্দৌলা।
