৫০
মুনশি এসে তসলিম জানাল। তারপর নবাবের হাতে একটা চিঠি তুলে দিয়ে বলল, ‘কাশিমবাজার থেকে ওয়াটস সাহেব পাঠিয়েছেন হুজুর।’
চিঠিটা হাতে নিয়ে চোখের সামনে মেলে ধরলেন নবাব। ক্লাইভের চিঠি।
কর্নেল লিখেছেন, ‘…আলিনগরের সমঝোতার কোনও ইজ্জত আপনি দিচ্ছেন না বলে এই চিঠি লিখতে হচ্ছে। আমাদের পাওনা এখনও অনেক বাকি। কোম্পানির যে সমস্ত কামান আপনার হেফাজতে রয়েছে সেগুলো জলদি উইলিয়াম ওয়াটসের হাতে আপনি ওয়াপস করবেন। আমাদের যারা দোস্ত নয়, তারা আপনারও দোস্ত নয়। এ কথাটা ইয়াদ রাখবেন। শুনতে পাচ্ছি চন্দননগর থেকে পালিয়ে যাওয়া ফরাসিদের আপনি কাশিমবাজারে আশ্রয় দিচ্ছেন। এদের কেউ কেউ আপনার ফৌজে নাম লেখাচ্ছে। যাদের নামে ফরিয়াদ রয়েছে তাদের আপনি মদত দেন কী করে? কেন আপনি তাদের আপনার রাজ্য থেকে বিতাড়িত করছেন না? এই সব অন্যায় কাজ আপনি যদি মঞ্জুর করেন তাহলে আপনার সঙ্গে আমাদের দোস্তি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।…’
গম্ভীর মুখে চিঠিটা ভাঁজ করে মুনশির হাতে ফিরিয়ে দিলেন নবাব।
মুনশি শুধোল, ‘তলব করেছিলেন জাঁহাপনা?’
‘হুঁ। একটা চিঠির মুসাবিদা করতে হবে।’
কাগজ-কলম নিয়ে প্রস্তুত হল মুনশি। নবাব বলে চললেন—
‘…মসিয়ে বুসি বাহাদুর মহাশয়, শুনলাম আপনি নওয়ারা নিয়ে বাংলায় আসতে চান। এ সমাচার শুনে আমি আনন্দিত। আপনার সঙ্গে মোলাকাত হলে আমি খুবই খুশি হব। ইংরেজদের বেতমিজির কথা কী আর লিখব আপনাকে? আপনি হয়তো শুনে থাকবেন যে আমার হুকুমত ছাড়াই অকারণে ইংরেজরা মসিয়ে রেনল্টের সঙ্গে কাজিয়া বাধিয়ে আপনাদের চন্দনগরের কেল্লা দখল করেছে। কাশিমবাজার থেকে দলবলসহ মসিয়ে ল-কে তাদের হেফাজতে জিম্মা করে দেওয়ার জন্য তারা দরবার করছে আমার কাছে। কিন্তু একজন ইমানদার নবাব হিসেবে এ কাজ আমি কি করতে পারি? আমি আপনাদের ভালো চাই। বাংলায় এলে আমার মদত আপনি পাবেন।…’
এই অবধি বলে নবাব থামলেন। দক্ষ মুনশি ঝড়ের গতিতে লিখে নিয়েছে সবটাই। সে নবাবকে পড়ে একবার শুনিয়ে দিল চিঠিটা। আলবোলার রুপোর নল হাতে মন দিয়ে শুনলেন নবাব। শ্রুতিলিখনে এতটুকু ভুল নেই।
অম্বুরি তামাকের ধোঁয়া ছেড়ে খোশ মেজাজে নবাব বললেন, ‘বহুত খুব। ল-সাহেবের আসার কথা আছে আজ। চিঠিটা তাঁর হাতে দিয়ে দেবেন।’
‘জি হুজুর।’ তসলিম জানিয়ে বিদায় নিল মুনশি।
জেনারেল বুসিকে চিঠিটা লিখে মনের মধ্যে বেশ প্রশান্তি অনুভব করলেন সিরাজদ্দৌলা। চন্দননগরে হামলা করে ইংরেজরা নতুন অশান্তি বাধিয়েছে এদেশে। কাশিমবাজার থেকে বিতাড়িত করতে চাইছে ফরাসিদের। এদেশ থেকে ফরাসিদের তাড়িয়ে দিতে হবে এমন তো কোনও শর্ত ছিল না সুলেনামায়। ইংরেজরা জোর করে আরোপ করছে নানারকম শর্ত। ইংরেজদের দোস্ত নবাবেরও দোস্ত। ইংরেজদের দুশমন, নবাবেরও দুশমন—এই এক অদ্ভুত যুক্তি খাড়া করে গোটা সুবে বাংলায় ফরাসিদের কারবারকে চিরকালের মতো বরবাদ করে দিতে চাইছে।
ইংরেজদের এই আবদার মেনে নেওয়া কি একজন স্বাধীন নবাবের পক্ষে সম্ভব? রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে সিরাজদ্দৌলার। মনে মনে তিনি ভাবলেন, ফের একবার টোপিওয়ালা ইংরেজদের সবক শেখানো দরকার হয়ে পড়েছে। জেনারেল বুসি এসে পড়লে এবারে ইংরেজদের উচিত জবাব দেবেন তিনি। ইংরেজরা শায়েস্তা হলে ঢিট হবে দিশি বেইমানের দলও, যাঁরা ইংরেজদের সাহায্য নিয়ে তাঁকে মসনদচ্যুত করতে চায়।
একজন দাখিলা এসে জানাল ওয়াটস সাহেব দেখা করতে এসেছেন।
বিরক্ত হলেন নবাব। উইলিয়াম ওয়াটসের কোনও সময়-অসময় জ্ঞান নেই। আজকাল যখন তখন এসে পড়ে সাক্ষাৎ চাইছেন। হালে কলকাতা থেকে এসে এক ছোকরা ওয়াটসকে মদত দিচ্ছে। তার নাম লিউক স্ক্র্যাফটন। হালসিবাগানে যে তিনজন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা করতে এসেছিল সেই ছোকরা নাকি তাদের মধ্যে একজন। রাতে পালিয়ে যায় সেনাছাউনি থেকে। নিশ্চয়ই ফিরে গিয়ে কর্নেল ক্লাইভকে কাকভোরে হামলা করার জন্য উসকেছিল। মুর্শিদাবাদ দরবারে ওয়াটসের সঙ্গে স্ক্র্যাফটনের ঘুরঘুর করাটা ভালো চোখে দেখছেন না নবাব।
নবাব শুধোলেন, ‘ওয়াটস সাহেব কি একেলা এসেছেন?’
দাখিলা সামনে ঝুঁকে পড়ে জবাব দেয়, ‘জি হুজুর। একেলা।’
খানিকটা বিরক্তির সঙ্গেই সিরাজদ্দৌলা বললেন, ‘অন্দরে আসতে বলো।’
দরবারঘরে ঢুকেই মাথা ঝুঁকিয়ে ওয়াটস বললেন, ‘হুজুর সহি সালামত। গোস্তাকি মাফ করবেন। এই অনক্তে এসে পড়তে বাধ্য হলাম।’
‘ইতনা জরুরি বাত কী আছে?’
ওয়াটস বললেন, ‘কাশিমবাজারের ফরাসি কুঠি আপনি আমাদের জিম্মায় দিয়ে দিন আর জাঁ ল সহ চন্দননগর থেকে পালিয়ে আসা ফরাসি সেনাদের কলকাতায় চালান করে দিন। এটা কর্নেল ক্লাইভের খায়েশ।’
চমকে উঠলেন সিরাজদ্দৌলা। এমন একটা অন্যায় আবদার করতে কোনও শরম নেই এই ইংরেজ সাহেবের। ‘কী করে তা সম্ভব?’ গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন সিরাজদ্দৌলা।
মুচকি হেসে ওয়াটস বললেন, ‘কেন সম্ভব নয় হুজুর? যারা আমাদের দুশমন, তারা আপনারও দুশমন। আলিনগরের সুলেনামায় আমাদের দুশমনকে শায়েস্তা করার ওয়াদা করেছেন আপনি।’
‘মোগল বাদশার ফরমানের জোরে এদেশে ব্যবসা করছে ফরাসিরা। আমি তাদের উপর অন্যায় জুলুম করতে পারি না।’ বেশ ঝাঁঝের সঙ্গেই কথাটা বললেন সিরাজদ্দৌলা।
শান্ত গলায় ওয়াটস বললেন, ‘মোগল বাদশা দুর্বল হয়ে পড়েছেন। সুবে বাংলায় আপনার ইচ্ছাই হুকুমত।’
‘লেকিন ইয়ে বেকানুনি আবদার।’
‘আপনি আলিনগরের সুলেনামার বেইজ্জতি করছেন।’ বিনীত ভাবে বললেন ওয়াটস।
নবাব এবারে ধৈর্যচ্যুত হয়ে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘খামোশ!’
নবাবকে রেগে উঠতে দেখে মোটেই ঘাবড়ালেন না ওয়াটস। শান্ত মেজাজে বললেন, ‘আপনি যদি কাশিমবাজার কুঠি ও চন্দননগর থেকে পালিয়ে আসা সেনাদের আমাদের জিম্মায় না দেন তাহলে কিন্তু কর্নেল ক্লাইভ কুচ করে মুর্শিদাবাদের দিকে আসবেন।’
এ কথা শুনে কেঁপে উঠলেন সিরাজদ্দৌলা।
নবাবকে ইয়াদদস্ত করে ওয়াটস বললেন, ‘এতে আপনারই তকলিফ হবে। সামান্য কয়েকজন ফরাসির জন্য কর্নেল ক্লাইভের সঙ্গে দোস্তির শর্ত ভেঙে নিজের জানকে খতরার মধ্যে ফেলবেন কেন আপনি? আমরা আপনার ভালো চাই হুজুর। আমরা চাই আপনি সহি সালামত থাকুন। এখন আপনি যা ভালো বোঝেন তাই করুন।’
নবাবকে তসলিম জানিয়ে দরবার ছেড়ে চলে গেলেন ওয়াটস।
জেনারেল বুসিকে চিঠি লিখে যে জোশ এসেছিল সিরাজদ্দৌলার মনে, তা ওয়াটসের বার্তায় এক নিমেষে উড়ে গেল। ভয়ানক দুশ্চিন্তায় পড়ে জগৎশেঠকে তলব করলেন নবাব।
জগৎশেঠ বললেন, ‘ইংরেজদের আবদারকে জবরদস্তি বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না হুজুর।’
‘বলছেন কী আপনি? এটা ফরাসিদের উপর জুলুম নয়?’
‘চন্দননগরে জিত হয়েছে ইংরেজ কোম্পানির। রেনল্ট সাহেব যে শর্তে সমঝোতা করেছেন তা মানছেন না জাঁ ল।’
অবাক চোখে জগৎশেঠে মুখের দিকে তাকালেন সিরাজদ্দৌলা।
জগৎশেঠ বললেন, ‘ফরাসি ফৌজিদের কাশিমবাজারে পালিয়ে আসাটা অন্যায়। ইংরেজদের হাতে তাদের কয়েদ থাকার কথা। যাদের নামে ফরিয়াদ রয়েছে তাদের মদত দিচ্ছেন জাঁ ল। এতে ইংরেজ কোম্পানির গুসসা হবে না কেন?’
সিরাজদ্দৌলা বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘চন্দননগরের লড়াই বাধানোটা যে ইংরেজদের মস্ত বেতমিজি।’
‘ইয়ে সচ বাত। লেকিন যে লড়াই আপনি রুখতে পারেননি, এখন তা নিয়ে ভেবে লাভ নেই।’
এবারে কেমন যেন অসহায় বোধ করলেন সিরাজদ্দৌলা।
‘আপনি কি চান গোরা পল্টন মুর্শিদাবাদে এসে হামলা করুক?’ প্রশ্ন করলেন জগৎশেঠ।
‘না।’ কথাটা যেন আতঙ্কে ছিটকে বেরিয়ে এল নবাবের গলা থেকে।
জগৎশেঠ বললেন, ‘ইংরেজরা আপনার দোস্ত। কর্নেল ক্লাইভ ও ওয়াটসন খতরনক জঙ্গবাজ। মসিয়ে ল-এর জোর বলতে শ-দেড়েক সেনা। এই ফরাসিদের মদত দিতে গিয়ে ইংরেজ কোম্পানির সঙ্গে রিশতাদারি নষ্ট করা কি উচিত হবে হুজুর?’
কাঁধ ঝুলে পড়েছে সিরাজদ্দৌলার। হালসিবাগানে যে জোশ হারিয়ে এসেছেন তা আর ফিরে পাচ্ছেন না কিছুতেই। হারিয়ে গিয়েছে আত্মবিশ্বাসও। দোটানায় ভুগছেন নবাব। এই মনে সাহস আনছেন তো পরক্ষণেই ইংরেজদের ভয়ে চুপসে যাচ্ছেন। ফরাসি জেনারেল বুসিকে আঁকড়ে ধরে ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু কোথায় জেনারেল বুসি? আদৌ আসবেন কি বাংলায়? এদিকে কর্নেল ক্লাইভ যদি মুর্শিদাবাদে ফৌজ নিয়ে এসে পড়েন তাহলে?
‘এখন কী করা উচিত বলে মনে হয় আপনার?’ ব্যক্তিত্বহীন গলায় প্রশ্ন করলেন নবাব।
‘আপনি ওয়াটস সাহেবের প্রস্তাব মেনে নিন। মসিয়ে ল-কে ডেকে পাঠিয়ে আপনার হুকুমতের কথা জানিয়ে দিন। দুই দল কারবারির কাজিয়ার মধ্যে আপনার জড়িয়ে পড়ার কোনও মানে হয় না।’
বুকটা যেন মুচড়ে উঠল সিরাজের। মনে হল কে তিনি? বাংলার স্বাধীন নবাব? নাকি ক্লাইভ ও ওয়াটসনের ইচ্ছের দাস! আক্রান্ত হয়ে ফরাসিরা আশ্রয় চাইছে তাঁর কাছে। তিনি তাদের তুলে দেবেন ইংরেজদের হাতে? ল-কে ডেকে পাঠিয়ে কী করে বলবেন—আপনাদের কাশিমবাজারের কুঠি ওয়াটস সাহেবের হাতে তুলে দিন মসিয়ে।
জগৎশেঠের মনটা খুশিতে উড়ছে। বুঝতে পারছেন গভীর সঙ্কটে পড়েছেন নবাব। মনের ভাব গোপন করে গলায় গাম্ভীর্য নিয়ে শেঠজি বললেন, ‘আপনি ভেবে দেখুন হুজুর মসিয়ে ল-এর কসুরও কিন্তু কম নয়। কাশিমবাজারের কুঠিকে ঘিরে মাটির দেওয়াল তৈরির হুকুমত ফরাসিদের কে দিল বলতে পারেন?’
সিরাজদ্দৌলা অবাক হয়ে বললেন, ‘সে কী? কুঠিকে ঘিরে দিওয়ার গড়ছেন ল-সাহেব?’
‘স্পষ্টতই এটা লড়াইয়ের তৈয়ারি। কুঠিকে কেল্লার মতো মজবুত করছে ফরাসিরা। নিজামতের হুকুমত ছাড়াই মসিয়ে ল-এর এই কীর্তি ইংরেজদের গুসসাকে উসকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয় কী? মসিয়ে ল-এর মতো একজন ইমানদার আদমি আপনার পরোয়ানা ছাড়া এমন কাজই বা করেন কী করে?’
ক্ষুব্ধ গলায় সিরাজ বললেন, ‘ইয়ে বেসহবত কারবার।’
‘এর তো একটা বিহিত করা উচিত। তাই নয় কি?’
কাশিমবাজার কুঠির চারিদিকে রাতারাতি গড়ে ওঠা মাটির প্রাকার ভেঙে ফেলার হুকুম জারি করলেন নবাব।
পরের দিন ভোরবেলায় দূর থেকে ভেসে আসা কাড়া-নাকাড়ার শব্দ শুনে ছুটে এসে কুঠির বুরুজে দাঁড়িয়ে দূরবিনে চোখ লাগিয়ে জাঁ ল দেখলেন নবাবের ফৌজ কুচ করে এগিয়ে আসছে কুঠির দিকে। নেতৃত্বে মিরমদন।
কুঠির সেনাদের দ্রুত সমরসজ্জায় সজ্জিত হওয়ার হুকুম দিলেন মসিয়ে ল। নিজের বাহিনী নিয়ে কুঠির বাইরে বেরিয়ে এসে নবাবের ফৌজের মুখোমুখি দাঁড়ালেন। ফরাসিরা যে প্রতিরোধ করতে পারে সেটা আন্দাজ করতে পারেননি মিরমদন। ফরাসিদের রণংদেহি মূর্তি দেখে বিচলিত হয়ে পড়লেন তিনি।
‘ব্যাপার কী?’ এগিয়ে এসে মিরমদনকে শুধোলেন জাঁ ল।
‘কুঠির চারিদিকে যে মাটির দিওয়ার গড়েছেন আপনারা সেটা এখনই ভেঙে ফেলতে হবে। নবাবের হুকুম।’ বললেন মিরমদন।
‘পরোয়ানা কোথায়?’
নবাবের সিলমোহর দেওয়া হুকুমনামা ল-এর হাতে তুলে দিলেন মিরমদন। সেটায় চোখ বুলিয়ে ল-এর মুখটা ভয়ানক গম্ভীর হয়ে গেল।
মিরমদন বললেন, ‘আপনারা নিজেরা যদি দিওয়ার তোড়ার কাজে হাত না লাগান, তবে আমরাই কাজটা করে দেব। আমাদের সঙ্গে মুটে-মজুর-বেলদার আছে। আজই হাসিল করতে হবে কাজটা। নবাবের খায়েশ।’
মসিয়ে ল দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, ‘না। এ কাজ করতে দেব না আমি।’
হাতিয়ার উঁচিয়ে ধরল ফরাসি সেনারা।
ল বললেন, ‘আমি বেঁচে থাকতে এই দিওয়ারের গায়ে হাত দিতে পারবেন না আপনারা। যদি জোর করে কাজটা হাসিল করতে চান, আমরা লড়ব। আমার ফৌজ প্রস্তুত আছে।’
এবারে সঙ্কটে পড়লেন মিরমদন। কাশিমবাজার কুঠিকে ঘিরে রাতারাতি গড়ে তোলা মাটির দেওয়াল ভাঙার পরোয়ানা দিয়েছেন নবাব তবে ফরাসিদের সঙ্গে মুখোমুখি লড়াই করার হুকুম নেই। কী করা যাবে এখন? দ্রুত হিরাঝিলের প্রাসাদে বার্তা পাঠালেন মিরমদন।
বিকেলের দিকে উত্তর এল হিরাঝিল থেকে। মসিয়ে ল-এর উদ্দেশে নবাব লিখলেন—
‘…আপনার সঙ্গে আমার কোনও বিরোধ নেই। দেশ চালাতে গেলে নিজের খায়েশের বিরুদ্ধেও অনেক কাজ করতে হয়। আমি কিন্তু কাশিমবাজারের কুঠি আপনাদের হাত থেকে কেড়ে নিতে চাইছি না। আমার একান্ত অনুরোধ কুঠির চারিদিকে মাটির দেওয়াল ভেঙে ফেলার কাজে আপনি বাধা দেবেন না। যে দেওয়াল আপনি মাটি দিয়ে গড়ে তুলেছেন, সেই দেওয়াল পরে আমি ইট দিয়ে আরও পোক্ত করে তৈরি করিয়ে দেব। আমায় ভুল বুঝবেন না। আগামীকাল হিরাঝিলে আসুন। মুখোমুখি কথা হবে আপনার সঙ্গে।…’
নবাবের এই চিঠি পাওয়ার পর প্রতিরোধের পথ থেকে সরে এলেন জাঁ ল। কাজে হাত লাগাল কয়েক হাজার মুটে-মজুর-বেলদার। সে রাতেই মাটিতে মিশে গেল কাশিমবাজারের ফরাসিদের কুঠিকে আরও সুরক্ষিত করে তোলার উদ্দেশ্য নিয়ে গড়ে তোলা মাটির দেওয়াল।
১৩ এপ্রিল ১৭৫৭ সাল। এত্তেলা দিয়েছেন নবাব। কাশিমবাজার থেকে হিরাঝিল প্রাসাদের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লেন জাঁ ল। সঙ্গে ছয় জন বন্দুকধারী দেহরক্ষী।
হিরাঝিল প্রাসাদের দরবার ঘরের সামনে জাঁ ল যখন উপস্থিত হলেন নবাব তখনও অন্দরমহলে। খানিকবাদে দরবার বসবে। জাঁ ল দেখলেন তিনি ছাড়াও দরবারঘরের সামনে হাজির হয়েছেন জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ। সঙ্গে তাঁর দেওয়ান রণজিৎ রায়। এছাড়াও উপস্থিত আছেন উইলিয়াম ওয়াটস ও উমিচাঁদ। এত লোকের উপস্থিতি ঠিক পছন্দ হল না ল-সাহেবের। তিনি নবাবের সঙ্গে একান্তে কথা বলতে চান।
উইলিয়াম ওয়াটস এগিয়ে এসে ল-এর সঙ্গে করমর্দন করে বললেন, ‘আপনি কাশিমবাজারের কুঠিটা আমাদের হাতে ছেড়ে দিয়ে দলবল নিয়ে কলকাতা যাওয়ার জন্য তৈরি আছেন তো?’
ওয়াটসের কথায় যারপরনাই বিরক্ত হয়ে ল বললেন, ‘নবাব চাইলে একমাত্র তাঁর হাতেই আমরা কাশিমবাজারের কুঠি ছেড়ে দিতে পারি। আপনাদের দেব কেন?’
ওয়াটস সহজ গলায় বললেন, ‘আপনি আমার উপর শুধু শুধু চটে যাচ্ছেন মসিয়ে।’
বেশ উত্তেজিত গলাতেই ল বললেন, ‘আর একটা কথা মনে রাখবেন মিঃ ওয়াটস, আমার সঙ্গে যারা কাশিমবাজারে আছেন তারা সবাই স্বাধীন। কলকাতায় যাওয়ার কোনও ইচ্ছে আমাদের নেই। নবাব যদি একান্তই তাঁর দেশ ছেড়ে আমাদের চলে যেতে হুকুম করেন, তবে আমাদের যেখানে খুশি সেখানে আমরা চলে যাব।’
উমিচাঁদ মৃদু হেসে বললেন, ‘আপনি দিমাক শান্ত করুন মসিয়ে। নবাব যা চান সেটাই ওয়াটস সাহেব বলেছেন আপনাকে।’
ল বললেন, ‘নবাব কী চান, সেটা আমি তাঁর কাছ থেকেই শুনতে চাই।’
রণজিৎ রায় খানিকটা বিরক্তির সুরে ল-এর উদ্দেশে বললেন, ‘আপনি কী ভেবেছেন বলুন তো? কেন তকলিফ দিচ্ছেন নবাবকে? সাকুল্যে তো মাত্র শ-দেড়েক সৈন্য আছে আপনার হাতে। আপনাকে মদত দিতে গিয়ে নবাব কেন ইংরেজদের সঙ্গে কাজিয়ায় জড়াবেন?’
অপমানে ফুঁসতে লাগলেন মসিয়ে ল।
রণজিৎ রায় ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘ওয়াটস সাহেব যা বলছেন, তা মেনে নিলে আপনারই ভালো হবে।’
এবারে রাগে ফেটে পড়লেন ল। বললেন, ‘আমরা কী করব, তা নিয়ে আপনার পরেশান হওয়ার কোনও জরুরত নেই। নবাব যা হুকুম করবেন তা আমরা অবশ্যই মেনে নেব। তবে তিনি কী বলতে চান তাঁর মুখ থেকেই শুনতে চাই।’
‘আরে মশায় আপনি বুঝছেন না কেন কথাটা? নবাব আপনার সঙ্গে দেখাই করতে চান না।’
রণজিৎ রায়ের সঙ্গে ল-এর এই উত্তপ্ত বাদানুবাদে ছেদ পড়ল। একজন পেশকার এসে জানাল মসিয়ে ল-এর সঙ্গে একান্তে সাক্ষাৎ করতে চান নবাব। রণজিৎ রায়ের দিকে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ছুড়ে দিয়ে দরবারঘর সংলগ্ন নবাবের ব্যক্তিগত কক্ষে প্রবেশ করলেন জাঁ ল।
‘সেলাম হুজুর। সহি সালামত।’ নবাবকে তসলিম জানালেন ল।
উষ্ণ গলায় সিরাজদ্দৌলা বললেন, ‘আসুন মসিয়ে। আপনার জন্যই অপেক্ষা করছি।’
এই উষ্ণ অভ্যর্থনায় খুশি হলেন জাঁ ল। তিনি হাসি মুখে কুরসিতে বসতে না বসতেই নবাব বললেন, ‘আমায় ভুল বুঝবেন না মসিয়ে। আমি নিরুপায়। এ আমার দিল কি বাত নয়। তবুও বলছি- আপনাকে মদত দিলে আমার অনেক তকলিফ হবে।’
দ্রুত মিলিয়ে গেল ল-এর মুখের হাসি।
সামান্য ইতস্তত করে মৃদু গলায় নবাব বললেন, ‘কাশিমবাজারের কুঠি ইংরেজদের হাতে ছেড়ে দিয়ে আমার রাজ্য ছেড়ে আপনাদের চলে যেতে হবে।’
প্রবল হতাশায় নিমজ্জিত হলেন জাঁ ল। উইলিয়াম ওয়াটস, জগৎশেঠ, রণজিৎ রায় যে কথাগুলো বলছিলেন, সবই তাহলে সত্যি! নবাবকে দিয়ে এই পরিকল্পনা আগেই পাশ করিয়ে নিয়েছেন তাঁরা।
নবাবের চোখ ইটালিয়ান মার্বেলের মেঝের উপর পাতা রংদার গালিচার উপর স্থির হয়ে আছে। জাঁ ল-এর চোখের দিকে তাকাতে পারছেন না নবাব। শরমে লাল হয়ে উঠেছেন। দরদর করে ঘামছেন তিনি।
হতাশ গলায় ল শুধোলেন, ‘আপনি কি আমাদের কলকাতায় পাঠাতে চান?’
‘ইংরেজরা তাই চায়।’ চোখ না তুলেই জবাব দিলেন নবাব।
‘আর আপনি?’
নবাব বললেন, ‘আমি চাই, আপাতত দলবল নিয়ে আপনি পাটনার দিকে চলে যান। ওদিকে গেলে ইংরেজরা সহজে আপনাদের নাগাল পাবে না।’
উঠে দাঁড়িয়ে জাঁ ল বললেন, ‘বেশ আপনি যা চাইছেন তাই হবে। তবে একটা কথা—আগেও বলেছি, আবার বলছি, আপনি সাবধানে থাকবেন। আপনার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। দরবারের একদল লোক ইংরেজদের মদতে আপনাকে মসনদ থেকে হঠাতে চায়।’
ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলেন ল। সিরাজদ্দৌলা মরিয়া গলায় বললেন, ‘তেমন বিপদ বুঝলে আপনাকে আমি ডেকে নেব।’
দরওয়াজার কাছে গিয়ে মসিয়ে ল থমকে দাঁড়ালেন। ঘুরে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, ‘সেই সুযোগ আপনি বোধ হয় আর পাবেন না। খুব সম্ভবত এই আমাদের শেষ সাক্ষাৎ হুজুর। সহি সালামত থাকুন। আলবিদা।’
নবাবকে তসলিম জানিয়ে দৃপ্ত ভঙ্গিতে হেঁটে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন মসিয়ে ল।
হতাশায় দুহাতে মুখ ঢাকলেন সিরাজদ্দৌলা।
