৭
‘বল দেখি রাধাকৃষ্ণ।’
পাখি বলে, ‘রাধাকৃষ্ণ।’
‘বা বা! বল দেখি এবার হরগৌরী।’
কাকাতুয়া বলে ওঠে, ‘হরগৌরী।’
মানিকচাঁদ বলেন, ‘এবার বল তো রাজা মানিকচাঁদ!’
কাকাতুয়া একটানা সুর করে বলতে থাকে, ‘রাজা মানিকচাঁদ, রাজা মানিকচাঁদ…’
খুশিতে হেসে উঠে মানিকচাঁদ বলেন, ‘বহুত আচ্ছা! দিব্যি কথা শিখেছিস তো-।’
কাকাতুয়া খাঁচার গায়ে ঠোকরায়।
মানিকচাঁদ বলেন, ‘বুঝেছি খিদে পেয়েছে। দাঁড়া-‘ এই বলে খাঁচার দরজা খুলে ছোলা ভর্তি একটা পাথরের রেকাবি কাকাতুয়ার সামনে রাখেন মানিকচাঁদ। ক্ষুধার্ত পাখিটা একমনে ছোলা সাবাড় করতে থাকে। মানিকচাঁদ হাত বোলাতে থাকেন পাখির গায়ে।
‘সালাম হুজুর!’
ঘুরে তাকান মানিকচাঁদ।
তোজাউদ্দিন কুর্নিশ জানায়।
খাঁচার দরজা বন্ধ করতে করতে মানিকচাঁদ শুধোলেন, ‘খবর কী তোজাউদ্দিন?’
প্রবল উৎসাহের সঙ্গে তোজাউদ্দিন বলল, ‘জোর খবর আছে হুজুর!’
পাখির খাঁচার সামনে থেকে সরে এসে তোজাউদ্দিনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানিকচাঁদ প্রশ্ন করেন, ‘শওকত জঙ্গের সঙ্গে নবাবের লড়াই বাঁধল নাকি?’
‘ওদিককার খবর এখনও কিছু পাইনি হুজুর। জানি না।’
মানিকচাঁদ ঠোঁট উলটে বললেন, ‘তাহলে কী এমন জোর খবর এনেছ হে?’
‘নব মুনশির বড় বাড় বেড়েছে হুজুর।’
‘নব মুনশি কে?’
‘ইংরেজদের মুনশি ছিল।’
‘যার জন্য তোমার নোকরি গেছিল?’
‘জি হুজুর।’
‘তা কী করেছে সে?’
‘হুজুর খবর একেবারে পাক্কা। ইংরেজদের রসদ পৌঁছে দিচ্ছে ফলতায়। নবাববাহাদুরের হুকুমতের বেইজ্জতি করছে। হুকুম করেন তো নবমুনশিকে গ্রেফতার করে মুর্শিদাবাদে চালান করে দিই?’
‘হুম।’ এই সংবাদে মানিকচাঁদের যে ঠিক কী প্রতিক্রিয়া হল, সেটা বুঝতে পারল না তোজাউদ্দিন। সে ভেবেছিল নবমুনশির খবর মানিকচাঁদের কানে তুলে কিছু ইনাম পাওয়া যাবে। কিন্তু সে গুড়ে বালি।
‘ফলতায় গেল কী করে?’ গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন মানিকচাঁদ।
তোজাউদ্দিন ঘাবড়ে গিয়ে বলে, ‘আজ্ঞে হুজুর রাতের অন্ধকারে চুপিচুপি গিয়েছে।’
মানিকচাঁদ ধমকে উঠলেন, ‘আস্ত একখানা জাহাজ রাতচৌকির নজর এড়িয়ে ফলতায় গেল, কেউ টের পেল না?’
তোজাউদ্দিন ঢোঁক গিলে বলে, ‘আমার কী কসুর হুজুর?’
‘কসুর তাহলে কার? আমার?’
‘নব মুনশি আচ্ছা ধড়িবাজ আদমি। ধোঁকা দিয়েছে। শুনলাম জাহাজে ডাচ নিশান লাগানো ছিল বলে ভালো করে কেউ তল্লাশি করেনি।’
তোজাউদ্দিন দরদর করে ঘামছে। সুতানুটি ও শিবপুরের চৌকিতে জাহাজ যেন তল্লাশি না করা হয়, সেই মর্মে একখানা পরোয়ানা লিখে সে তো নিজেই দস্তখত করে দিয়েছে। বিনিময়ে নব মুনশির কাছ থেকে মোটা উৎকোচ পেয়েছে সে। এখন কড়া যাচিমতেহানি হলে সেসব কথা বেরিয়ে পড়বে। তোজাউদ্দিন বুঝল, ইনামের আশায় নব মুনশির নামে শিকায়ত জানাতে এসে বড় আহাম্মকির কাজ করে ফেলেছে সে।
কাহারদের হুনহুনা হুনহুনা শব্দ শুনে বাইরে তাকিয়ে মানিকচাঁদ দেখলেন তাঁর হাভেলির ভিতরে ঢুকছে এক বাহারি পালকি। সামনে পিছনে চারজন করে বরকন্দাজ।
এমন বাহারি পালকিতে এই কলকাতা শহরে মানিকচাঁদ ছাড়া আর একজনই চড়েন। দ্বিতীয় ব্যক্তি হলেন, মস্ত বেনিয়া উমিচাঁদ। নবাব সিরাজদ্দৌলার খাতিরের লোক। তাঁর মতো বিত্তশালী কলকাতায় আর কেউ নেই। হালসিবাগানে বিরাট একখানা হাভেলি আছে তাঁর। সেই হাভেলি দেখে স্বয়ং নবাবেরও তাক লেগে গিয়েছিল।
মানিকচাঁদ গম্ভীর গলায় বললেন, ‘এখন এসো তোজাউদ্দিন। আমার কাজ আছে।’
‘সালাম হুজুর।’ দ্রুত পায়ে বিদায় নিল তোজাউদ্দিন। উমিচাঁদের হঠাৎ আগমনে নব মুনশির বিষয়টা ধামাচাপা পড়ে যাওয়ায় সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
মানিকচাঁদ বাঙালি। কায়েতের ঘরের ছেলে। পদবি ঘোষ। কোন্নগরে জন্ম। এক সময় তিনি ছিলেন বর্ধমান রাজার গোমস্তা। বেহালার কাছারিতে বসে ওদিককার জমিজায়গা দেখাশোনা করতেন। পরে আলিবর্দির সেরেস্তায় কাজ পান। চতুর মানিকচাঁদ তখন থেকেই ভাবী নবাব সিরাজের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন।
পদমর্যাদার দিক থেকে মুর্শিদাবাদ দরবারের অনেক ওমরাহদের থেকে মানিকচাঁদের অবস্থান বেশ নীচে। বহু ওজনদার লোককে টপকে আলিনগরের শাসক হওয়ার কথা তাঁর নয়। তা সত্ত্বেও সেই পদের জন্য নবাব যখন তাঁর নাম ঘোষণা করলেন, তখন আরও অনেকের মতো মানিকচাঁদ নিজেও চমকে গিয়েছিলেন। প্রথমে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারেননি। কলকাতা শহরের রাজা? আহ্লাদে আটখানা হয়ে পড়েন মানিকচাঁদ। কিছুদিন পরে অবশ্য তাঁর মোহভঙ্গ হয়।
নবাবের কলকাতা আক্রমণের সময় সেই যে দেশি লোকেরা শহর ছেড়ে পালিয়েছে, তাদের ফিরে আসার কোনও লক্ষণ নেই। কিছুদিন কলকাতায় কাটানোর পর মানিকচাঁদ বুঝলেন, নবাবের চেয়ে ইংরেজদের প্রতি কলকাতার লোকেদের আনুগত্য বেশি। সেই আনুগত্যের কথা প্রকাশ পেলে কোতোয়ালের হাতে হেনস্থা হওয়ার ভয় আছে, তাই তারা কলকাতায় ফিরে আসছে না।
যে শহরটাকে ইংরেজরা ধীরে ধীরে বেশ গড়ে তুলছিল, কয়েকদিনের যুদ্ধে সেই কলকাতাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে গেলেন সিরাজদ্দৌলা। শহরের নাম বদলে নতুন নামকরণ করলেন আলিনগর। কিন্তু মুর্শিদাবাদে ফিরে গিয়ে আলিনগরের কথা বেবাক ভুলে গেলেন তিনি। শহরটাকে নতুন করে গড়ে তোলার কোনও উদ্যোগই নিলেন না।
পথে বেরোলেই মানিকচাঁদের চোখে পড়ে কলকাতার হতশ্রী অবস্থা, যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন, আগুনে পোড়া বাড়ির দেওয়াল, আগলবিহীন পোড়ো বাড়ি। সাহেবদের বাড়িগুলো থেকে কাঠের জানালা দরজা খুলে নিয়ে রান্নার জ্বালানির কাজে লাগিয়েছিল নবাবের সৈন্যরা। দিশি পাড়া সুনসান। কয়েকঘর এখনও যারা কলকাতায় রয়েছে, তারা মুখে কুলুপ এঁটে কোনওরকমে টিকে রয়েছে।
এরকম মরা একটা শহরের রাজা হওয়া যে মোটেও সুখের নয়, সেটা ক’দিনের মধ্যেই মানিকচাঁদ টের পেলেন। কলকাতায় কাঞ্চনযোগের আশা করেছিলেন তিনি, সে আশা পূরণ হচ্ছে না। হবেই বা কেমন করে? ইংরেজরা চলে যাওয়ায় মুখ থুবড়ে পড়েছে কলকাতার অর্থনীতি। জাহাজ ভেড়ে না কলকাতার বন্দরে। অর্ধেকের বেশি দেশি প্রজা শহর ছাড়া। টাকা আদায়ের উৎসগুলোই সব শুকিয়ে কাঠ।
এদিকে কলকাতায় পড়ে থাকায় মুর্শিদাবাদ দরবারের হালহকিকত সম্বন্ধে কোনও সঠিক আন্দাজ পাচ্ছেন না মানিকচাঁদ। পরস্পর বিরোধী উড়ো খবর কানে আসে, কোনটা সত্যি, আর কোনটা মিথ্যে তিনি বুঝে উঠতে পারেন না। এ এক নিদারুণ অসোয়াস্তি। এর উপরে তাঁর কাছে বিষম হয়ে উঠেছে কলকাতার জলহাওয়া। হজমের গোলমাল দেখা দিয়েছে। হেকিম, কোবরেজ কারও চিকিৎসাতেই রোগের উপশম হচ্ছে না। সব মিলিয়ে মানিকচাঁদজির মন ভালো নেই।
মানিকচাঁদের বিমর্ষ ভাবটা উমিচাঁদের নজর এড়ায় না। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘রাজাজির তবিয়ত কী ঠিক নেই? কেমন যেন শুখা শুখা লাগছে?’
ফরসির নলে টান দিয়ে মানিকচাঁদ বলেন, ‘এ শহরে রস কোথায় যে রসাল থাকব?’
হে হে করে খানিকটা হেসে নিয়ে উমিচাঁদ বললেন, ‘তা ঠিকই বলেছেন। এ শহরে রস ঢালত ইংরেজ। তারা গেছে তো শহরটাও শুকিয়ে গেছে।’
‘তবে যাই বলুন, কলকাতার জলহাওয়া মোটেই ভালো নয়। এখানে এতকাল আপনি যে কী ভাবে রয়েছেন—।’
‘চাঁদির টান রাজাজি, চাঁদির টান।’
আক্ষেপের সুরে মানিকচাঁদ বললেন, ‘কলকাতার চাঁদির কথা কেবল শুনেই গেলাম উমিচাঁদজি। মুঠোয় ধরতে পারছি কোথায়?’
উমিচাঁদ বলেন, ‘পারবেন কী করে? যাদের জন্য রুপেয়া উড়ত হাওয়ায়, তারাই তো নেই’
আলোচনায় ছেদ পড়ে। রুপোর রেকাবিতে ফল ও মিঠাই সাজিয়ে, মিনা করা মোরাদাবাদি গেলাসে ডালিমের শরবত নিয়ে শ্বেতপাথরের গোল টেবিলের উপর রেখে যায় দুজন বান্দা।
ফরসির নলে টান দিয়ে ভুর ভুর করে খানিকটা অম্বুরি তামাকের ধোঁয়া ছেড়ে মানিকচাঁদ বলেন, ‘খেয়ে নিন। কালীঘাটের প্রসাদ।’
নারকেলের সন্দেশ কপালে ঠেকিয়ে মুখে ফেলেন উমিচাঁদ বলেন, ‘বাঃ চমৎকার। সকাল সকাল রাজদর্শন হল। খানিকটা পুণ্যও হল।’
‘দরবারের খবর কিছু রাখেন?’ প্রশ্ন করেন মানিকচাঁদ।
‘শওকত জঙ্গের সঙ্গে শিগগিরই লড়াই বাঁধবে!’
‘পাল্লা কোন দিকে ভারী?’
উমিচাঁদ বলেন, ‘মসনদে বসবে শওকত জঙ্গ। মিলিয়ে নেবেন আমার কথা। জাফর আলি খান, জগৎশেঠজি তলায় তলায় শওকত জঙ্গকে মদত দিচ্ছেন। আরও একটা জরুরি খবর আছে।’
নড়েচড়ে বসেন মানিকচাঁদ। ‘কী খবর?’
‘মোগল বাদশার কাছ থেকে শওকত জঙ্গের নামে নবাবির ফরমান আদায়ের জন্য জোর তদ্বির চলছে।’
‘কে করছে তদ্বির?’
‘যিনি করে থাকেন।’
‘জগৎশেঠজি?’
উমিচাঁদ হেসে বলেন, ‘সহি বাত।’
চোখ বিস্ফারিত করে মানিকচাঁদ বলেন, ‘বলছেন কী?’
‘একেবারে ঘোড়ার মুখের খবর। লড়াই বাঁধল বলে! শওকত জঙ্গ মসনদে বসলে ইংরেজদের নসিব ফিরবে।’ এই বলে উমিচাঁদ শরবতের গেলাসে চুমুক দিলেন।
উমিচাঁদের মনের তল খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করে চলেছেন মানিকচাঁদ। এই ধূর্ত বেনিয়ানের সাতসকালে হাজির হওয়ার আসল কারণটা কী, সেটা তিনি আন্দাজ করতে পারছেন না। অবশ্য বেশিক্ষণ তাঁকে আর উৎকণ্ঠা বয়ে বেড়াতে হল না।
শরবত শেষ করে ঠকাস শব্দে গেলাস নামিয়ে রেখে উমিচাঁদ বললেন, ‘এবার কাজের কথা বলি রাজাজি। আমি ড্রেকসাহেবের চিঠি নিয়ে এসেছি।’
মানিকচাঁদের স্নায়ু টানটান হয়ে উঠল। তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘ইংরেজদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে আপনার?’
উমিচাঁদ হেসে বলেন, ‘থাকবে না কেন?’
‘ড্রেকসাহেব আপনার এত ক্ষতি করল, ইতনা তকলিফ দিল, তার পরেও?’
‘হে হে হে!’ বেশ জোরেই হেসে ওঠেন উমিচাঁদ। হাসি থামিয়ে বলেন, ‘তা বলে কি গুসসা করে থাকব? শওকত জঙ্গ মসনদে বসলে ইংরেজরা কলকাতায় ওয়াপস আসবে। ফির কারবার শুরু হবে। বাতাসে চাঁদি উড়বে। গুসসা করে বসে থাকলে তো আমারই লোকসান।’
আচকানের জেব থেকে একটা ভাঁজ করা তুলোট কাগজ বের করে মানিকচাঁদের হাতে দিয়ে উমিচাঁদ বলেন, ‘ড্রেক সাহেবের চিঠি। ফলতায় বাজার বসানোর একটা পরোয়ানা লিখে দিন রাজাজি। ইংরেজরা ভুখা মরছে। সে কথাই লিখেছেন ড্রেকসাহেব।’
কাগজ খুলে চোখ বোলালেন মানিকচাঁদ। তারপরে কাগজটা ভাঁজ করে দ্বিধাজড়িত গলায় বললেন, ‘লেকিন নবাবের হুকুমত’
উমিচাঁদ হেসে বলেন, ‘এ কাম না করলে আপনারই পরেশান হবে।’
‘কীরকম?’ প্রশ্ন করেন মানিকচাঁদ।
‘নবাব সিরাজদ্দৌলার দিন শেষ হয়ে এসেছে। কলকাতায় ইংরেজদের ওয়াপসি হবে। এখন যদি আপনি সাহেবদের মদত না দেন, তাদের আঁখ লাল হবে। এরা শওকত জঙ্গের কান ভাঙিয়ে আপনাকে শেষ করে দেবে। ইংরেজ বড় খতরনক চিজ।’
‘কোনও কথা না বলে মুখ নামিয়ে ফরসির নলে টান দিতে থাকেন মানিকচাঁদ।’
নিস্তব্ধতা ভাঙেন উমিচাঁদ। বলেন, ‘ভাবছেন কী অত? ফলতায় বাজার বসানোর অনুমতি আপনি না দিলে ইংরেজরা কি না খেয়ে থাকবে? প্রায়ই খাবারের জাহাজ যাচ্ছে ফলতায়। জাহাজগুলোকে ছেড়ে দিয়ে বজবজের কেল্লাদার কত কামাই করছে, পুছতাছ করে দেখেছেন?’
ফরসির নলে টান দিতে গিয়ে থমকে গেলেন মানিকচাঁদ।
উমিচাঁদ বলে চলেন, ‘আর আপনি কিনা কলকাতার রাজা হয়ে চাঁদি ঢুন্ডে বেড়াচ্ছেন। এই তো সুযোগ রাজাজি…কামিয়ে নিন! দুছত্র লিখে দিন। ইংরেজরা চাঁদিতে আপনার ঘর ভরে দেবে। আমি জামিন রইলাম।’
ফরসির নল পাশে সরিয়ে রেখে মানিকচাঁদ বলেন, ‘লিখে না হয় দিলাম। সেই পরোয়ানা যদি নবাবের হাতে পড়ে?’
‘পড়বে না। আপনি লিখে দেবেন। আমি সে পরোয়ানা তুলে দেব ড্রেকসাহেবের হাতে। ড্রেকসাহেব সেই পরোয়ানা দেখিয়ে ফলতায় বাজার বসিয়ে নেবেন। পরোয়ানা তাঁর হাতছাড়া হবে না। আমার উপর ভরসা রাখতে পারেন।’
‘লেকিন…’
উমিচাঁদের ঠোঁটের কোণে হাসি। বুঝতে পারছেন, ফাঁদে পড়েছেন মানিকচাঁদ। মৃদু হাসির রেশ ধরে রেখেই উমিচাঁদ বললেন, ‘ছাড়ুন তো লেকিন-উকিন, ড্রেকসাহেব আপনার জন্য নজরানা পাঠিয়েছেন। আমার লোকের সঙ্গে আছে। কিসিকো বুলাইয়ে।’
ঘণ্টির দড়িতে টান দেন মানিকচাঁদ। একজন বান্দা ঘরে ঢোকে।
তার উদ্দেশে উমিচাঁদ বললেন, ‘মেরা আদমি শঙ্কর কো বুলাও।’
বান্দা চলে যায়। খানিকবাদে ঘরে ঢোকে শঙ্কর। পরনে শাটিনের কুর্তা ও পায়জামা। পায়ে নাগরা। মুখে গালপাট্টা দেওয়া মস্ত গোঁফ। মাথায় মস্ত রাজস্থানি পাগড়ি কপালটা প্রায় ঢেকে ফেলেছে। শঙ্করের হাতে রুপোর পেটিকা।
মানিকচাঁদকে কুর্নিশ জানায় শঙ্কর, ‘সেলাম হুজুর!’
উমিচাঁদ বলেন, ‘ইয়ে হ্যায় শঙ্কর। মেরা নয়া মুনশি।’
বাক্সের বাহার দেখেই মানিকচাঁদের চোখ চকচক করে ওঠে। মুখের অভিব্যক্তিতে ঝরে পড়ে লোভ। বাক্সটা হাতে নিয়ে উমিচাঁদকে প্রশ্ন করেন, ‘ভিতরে কী আছে উমিচাঁদজি?’
‘আসলি চিজ। লেকিন চাঁদি নয়, আশরফি। আরও পাবেন। কাজের পরে। এবার পরোয়ানাটা লিখে দিন।’
খোশমেজাজে বাক্সটা শ্বেত পাথরের টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়িয়ে মানিকচাঁদ বলেন, ‘পরোয়ানাটা নিজের হাতেই মুশাবিদা করতে হবে উমিচাঁদজি। অন্য কেউ জানলে আজই খবর চলে যাবে মুর্শিদাবাদে। চারিদিকে নবাবের চর রয়েছে। জানেনই তো নবাব কাউকে বিশ্বাস করেন না। আপনি বসুন। আমি পরোয়ানা লিখে নিয়ে আসছি।’
মানিকচাঁদ চলে যেতেই শঙ্করের উদ্দেশে উমিচাঁদ বলেন, ‘কেমন বুঝছ শঙ্কর?’
শঙ্কর হেসে বলে, ‘আপনি জাদু জানেন।’
‘জাদু আমার নয়। আশরফির। ওটাই জগৎ চালায়।’
‘জরুর! নকু ধর মশায়ও তাই বলেন। কাঞ্চন বটিকা বিষহরি।’
শঙ্করের মুখপানে চেয়ে উমিচাঁদ বলেন, ‘ওঃ! যা একখানা জব্বর গোঁফ লাগিয়েছ না!’
‘এ আপনার পাইক রতন সিংয়ের কীর্তি। বললাম আমি মাছেভাতে বাঙালি, অমন পেল্লায় গালপাট্টা কি আমায় মানাবে? সে বললে, বহুত মানাবে।’
উমিচাঁদ হেসে বলেন, ‘আঠা পোক্ত আছে তো? দেখো আবার গোঁফ খুলে গিয়ে বিপত্তি না হয়।’
গালপাট্টায় হাত বোলাতে বোলাতে শঙ্কর বলে, ‘খুলবে না। দেশি আঠা। কড়া তেজ। আসলি চিজ।’
‘ফলতায় বাজার বসানোর পরোয়ানাটা হাসিল করিয়ে দিলাম। তোমার সাহেবদের বোলো তাদের নসিব ফিরলে এই বান্দাকে যেন মনে রাখে।’
শঙ্করের ছদ্মবেশধারী নবকৃষ্ণ বললেন, ‘জি হুজুর।’
বিশাখাপত্তনমে নোঙর ফেলল সাইরেন। গোমড়া মুখ করে ক্যাপ্টেন জানালেন, আবহাওয়া ভালো নয়। সমুদ্র উত্তাল। আপাতত কিছুদিনের জন্য এখানেই দাঁড়াতে হবে। কথাটা শুনে ম্যানিংহামের মাথায় বাজ পড়ল। কলকাতা হাতছাড়া হওয়ার খবর নিয়ে তিনি ও লেফটেনান্ট লেবাম মাদ্রাজে চলেছেন। মাঝপথে জাহাজ দাঁড়িয়ে পড়লে যে জরুরি খবরটা পৌঁছে দিতে অনেক দেরি হয়ে যাবে।
লেবাম বললেন, ‘মিস্টার ম্যানিংহাম, এক কাজ করা যাক, আপনি জাহাজেই আসুন। আমি বাই রোড একটা ট্রাই নিয়ে দেখি। আশা করি পালকি জোগাড় করতে অসুবিধা হবে না।’
ম্যানিংহামও মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।
অবশেষে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে লেবাম ৬ সেপ্টেম্বর মাদ্রাজে পৌঁছলেন। ম্যানিংহাম অবশ্য পৌঁছেছিলেন আরও তিন সপ্তাহ পরে।
যাইহোক, লেবামের মুখে কলকাতার কথা শুনে মাদ্রাজ কাউন্সিলের গভর্নর পিগটের ভ্রুকুঞ্চিত হল। কাউন্সিলের জরুরি মিটিং ডাকলেন তিনি।
ফোর্ট সেন্ট জর্জের কনফারেন্সরুমে জরুরি মিটিং বসেছে। অ্যাডমিরাল ওয়াটসন, অ্যাডমিরাল পোকক, কর্নেল ক্লাইভ, লেফটেনান্ট লেবাম ও মাদ্রাজ কাউন্সিলের অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত। টেবিলের উপর রেকাবিতে সাজানো রয়েছে রকমারি শুকনো ফল ও ম্যাসওয়ানস বিয়ার।
প্রথমেই সবাইকে উদ্দেশ্য করে স্পষ্ট গলায় পিগট বললেন, ‘উই হ্যাভ টু রিগেইন ক্যালকাটা অ্যান্ড রিসিউম আওয়ার বিজনেস ইন বেঙ্গল।’
সশব্দে বিয়ারের বোতলের ছিপি খুলে গেলাসে ঢালতে ঢালতে পিগটের কথার পিঠে অ্যাডমিরাল ওয়াটসন বললেন, ‘ক্যালকাটা এপিসোড ইস অ্যা স্টিগমা আপ অন দ্য কিং।’
অ্যাডমিরাল পোকক বললেন, ‘উই মাস্ট রিটালিয়েট।’
পায়ের উপর পা তুলে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছেন কর্নেল ক্লাইভ। চোখ বোজা। ঠোঁটের ফাঁকে গোঁজা আছে পাইপ। আলোচনা শুনতে শুনতে নিবিষ্ট মনে ধোঁয়া ছাড়ছেন। পাইপের ধোঁয়া পাশে বসা অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের নাকের সামনে দিয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে উড়ে যাচ্ছে।
ক্লাইভের ধোঁয়া ছাড়ার এই উদ্ধত ভঙ্গিমায় মনে মনে খুবই বিরক্ত হলেন ওয়াটসন। সৌজন্য দেখিয়ে মুখে কিছু বললেন না, মনে মনে ভাবলেন, লোকটা শিষ্টাচারের তোয়াক্কা করে না। ছিলে তো বাপু সামান্য কেরানি। ফরাসিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কিছু কেরামতি দেখিয়ে না হয় কর্নেল হয়েছ, তবুও তো কোম্পানির কর্মচারী। আর আমি? অ্যাডমিরাল ওয়াটসন। রিপ্রেসেন্টেটিভ অফ দ্য কিং। ইংরেজ সমাজে আমার একটা রেসপেক্ট আছে। আমার নাকের ডগায় ধোঁয়া ওড়ানোটা কি আমাকে তাচ্ছিল্য করা নয়? গুম হয়ে বসে রইলেন ওয়াটসন।
পিগট বললেন, ‘চেস্টারফিল্ড ও ওয়ালপোল- দুটো জাহাজই কাল এখানে এসে পৌঁছেছে। খবর এসেছে ইওরোপে এখনও ফ্রেঞ্চদের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ বাঁধেনি। কাজেই এদেশে এখনই আমাদের সঙ্গে ফরাসিদের কনফ্লিক্টের কোনও সম্ভাবনা নেই। সুতরাং বেঙ্গলে আমরা ফোর্স পাঠাতে পারি।’
পিগটের এই কথায় মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল সবাই।
কাউন্সিলের এক সদস্য বললেন, ‘শুনেছি এই সময় বেঙ্গলের ফিভার ভেরি ডেঞ্জারাস। এখনই সেনা পাঠালে বেশ কিছু সৈন্য রোগে মারা যেতে পারে।’
লেফটেনান্ট লেবাম বলে উঠলেন, ‘ইউ সেইড রাইটলি। কিন্তু রওনা দিতে তো আরও কিছুদিন সময় লাগবে। সেক্ষেত্রে আমাদের আর্মি যখন পৌঁছবে তখন রেইনি সিজন ওভার হয়ে যাবে। তাই আমার মনে হয়, এখনই বেঙ্গল এক্সপিডিশনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।’
ক্লাইভ চোখ খুলে একবার আড়চোখে লেবামের দিকে তাকালেন। সে দৃষ্টি সম্মতিসূচক।
বিয়ারের গ্লাসে চুমুক দিয়ে পিগট বললেন, ‘আমিও তাই মনে করি। কর্নেল ক্লাইভ, হোয়াই আর ইউ সো সাইলেন্ট?’
পাইপ দিয়ে কান খোঁচাতে খোঁচাতে ক্লাইভ জবাব দিলেন, ‘আপনাদের আলোচনা শুনছি।’
ওয়ালস হেসে বললেন, ‘কর্নেল ক্লাইভ, কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী।’
পিগট বললেন, ‘রাইটলি সেইড। কর্নেল যে কাজের লোক, তা আমরা সবাই জানি। ফরাসিদের সঙ্গে যুদ্ধে, নেশনকে যে সার্ভিস তিনি দিয়েছেন তার কোনও তুলনা হয় না। কর্নেল ও অ্যাডমিরাল ওয়াটসন তুলাজি আংগ্রিয়াকে যে ভাবে শায়েস্তা করেছেন সে কথা ভোলার নয়। আমার মনে হয় বেঙ্গল এক্সপিডিশনের রেসপন্সিবিলিটি কর্নেল ক্লাইভের হাতে দেওয়া যেতে পারে। আর তাঁর ডেপুটি হিসেবে আমি ক্যাপটেন ওয়ালসের নাম প্রোপোজ করছি।’
সবাই টেবিল চাপড়ে এই প্রস্তাবে তাদের সম্মতি জানাল।
পিগট বললেন, ‘অ্যাডমিরাল ওয়াটসন উইল হেল্প কর্নেল উইথ হিজ ফ্লিট।’
ঠকাস করে বিয়ারের গ্লাস টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে ওয়াটসন বললেন, ‘নো। আই অ্যাম রিপ্রেসেন্টেটিভ অফ দ্য কিং। আমি কোম্পানির কোনও সারভেন্টের আন্ডারে কাজ করতে পারি না।’
গোটা ঘরে সহসা যেন আষাঢ়ের মেঘ ঘনিয়ে এল। সবাই চুপ।
খানিকবাদে স্তব্ধতা ভেঙে পিগট বললেন, ‘মিঃ ওয়াটসন, আমি বলতে চেয়েছি কর্নেল উইল লিড দ্য ল্যান্ড ফোর্স। আপনি তাকে সাহায্য করবেন।’
‘দেন ইন দ্য ওয়ারফিল্ড আই উড টেক মাই ডিসিশন ইন্ডিপেন্ডেন্টলি।’
চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে অসম্ভব আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে ক্লাইভ বললেন, ‘মিঃ ওয়াটসন। এই সব খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে কলহ করে লাভ নেই। কোম্পানি ইজ ইন ডেঞ্জার। ডিগনিটি অফ দ্য কিং ইজ টারনিশড। আমাদের বোঝাপড়াটা না হয় জাহাজে সেরে নেওয়া যাবে। চলুন দুজনে মিলে বেঙ্গলটা জিতে নিই।’
হাত বাড়িয়ে দিলেন ক্লাইভ। করমর্দন করলেন অ্যাডমিরাল ওয়াটসন।
চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে উঠলেন পিগট।
