৫১
মুর্শিদাবাদের চকবাজারে ভোর হয় ত্রিপলিয়া তোরণদ্বারের নহবতখানা থেকে ভেসে আসা সানাইয়ের মিঠে আওয়াজে। আজও শাহি মেজাজে খুশির সুর বাতাসে ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন সানাইবাদক। কিন্তু হঠাৎই থেমে গেল বাজনা। তোরণদ্বারের মাথায় নহবতখানা থেকে দৃষ্টি অনেক দূর পর্যন্ত যায়। সানাইবাদক দেখল একদল সৈন্য দ্রুত এগিয়ে আসছে তোরণদ্বারের দিকে। বাতাসে উড়ছে ফরাসিদের নিশান। শোনা যাচ্ছে মিলিটারি ব্যান্ডের শব্দ।
ভয় পেয়ে সানাইবাদকসহ নহবতের অন্যান্য বাজনদারেরা দ্রুত নেমে এল নীচে। ভারী জুতোর শব্দে শিহরিত হয়ে উঠল সদ্য ঘুম থেকে জেগে ওঠা চকবাজারের আমজনতা। কৌতূহলের বশে পথের দুপাশে জড় হতে লাগল অনেকে। ব্যাপার কী? সাতসকালে কুচ করে ফরাসি সৈন্যরা নিজামত কেল্লার দিকে চলেছে কেন? লড়াই বাধবে নাকি?
খানিকবাদে ভুল ভাঙল সকলের। না, লড়াই নয়। রাস্তায় মোতায়েন কোতয়ালির সেপাইদের মুখ থেকে লোকে জানল, কাশিমবাজার থেকে ফরাসিদের বহিষ্কার করেছেন নবাব। কুঠিপ্রধান ল সাহেব তাঁর দলবল নিয়ে চলে যাচ্ছেন পাটনার দিকে।
একথা শুনে আশ্চর্য হল অনেকে। নবাবের গোলমাল তো ইংরেজদের সঙ্গে। ফরাসিদের কসুর কী হল?
জনৈক সেপাই বললে, ‘চন্দননগরের লড়াইয়ে জিত হয়েছে ইংরেজদের। সেখান থেকে অনেক ফরাসি পালিয়ে এসে কাশিমবাজারে আশ্রয় নিয়েছে। এটা ইংরেজদের না-পসন্দ। ইংরেজদের দাবি মেনে নিয়ে সব ফরাসিকে কাশিমবাজার ছেড়ে চলে যেতে বলেছেন নবাববাহাদুর।’
ক্রমশ এগিয়ে আসে চড়া সুরে বাজতে থাকা ব্যান্ডের উদ্ধত শব্দ। সেই শব্দের মধ্যে কোথায় যেন লুকিয়ে আছে প্রতিবাদের ভাষা। বিনা অপরাধে সাজা হয়েছে ফরাসিদের। তারা মাথা হেঁট করে চুপচাপ চলে যাবে কেন? ফরাসিরা বুটের শব্দ তুলে হেঁটে চলেছে দৃপ্ত ভঙ্গিতে।
পথের দুপাশের কৌতূহলী মুখগুলিকে ইয়াদদস্ত করে তাদের উদ্দেশে মসিয়ে ল নীরবে ছুড়ে দিলেন একটা প্রশ্ন—’আমরা না হয় চললাম তোমাদের দেশ ছেড়ে, কিন্তু তোমাদের নবাব তাঁর মসনদটা রক্ষা করতে পারবেন তো?’
চকবাজার অতিক্রম করে দলবল নিয়ে পাটনার পথ ধরলেন জাঁ ল।
কিছুক্ষণ পরে চকবাজারের ভিতর দিয়ে জগৎশেঠের কুঠির দিকে ছুটে চলল দুটো পালকি। মাথায় ইংরেজ কোম্পানির নিশান। পালকি দুটোর সামনে ও পিছনে হন হন করে হেঁটে চলেছে চারজন করে বন্দুকধারী গোরা পল্টন। মজবুত চেহারার কাহাররা হনহন করে ছুটছে। কীসের যেন খুব ব্যস্ততা।
মুর্শিদাবাদের রাজনীতির হাওয়া যে বেশ গরম তা টের পাচ্ছেন অনেকেই। হালসিবাগান থেকে এই গরম হাওয়ার উৎপত্তি। চন্দননগর হয়ে সে হাওয়া এখন প্রবল ভাবে বইছে রাজধানীর দিকে। ভাবীকালের গর্ভে কোন বিধিলিপি প্রচ্ছন্ন আছে তা নিয়ে মানুষের কৌতূহলের অন্ত নেই।
মুর্শিদাবাদে নবাব বদলানোর জন্য সাজিশের কারবারিরা নাকি কোমর কষে নেমে পড়েছে। এসব কথা চকবাজারে কান পাতলেই শোনা যায়। নানারকম পরস্পর বিরোধী মতামত রাজধানী শহরের বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। এর মধ্যে কোনটা সত্যি আর কোনটা ঝুটা তার আন্দাজ পাওয়া কঠিন।
ক্লাইভের নির্দেশে দিনকয়েক আগে কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদে এসে ঘাঁটি গেড়েছেন লিউক স্ক্র্যাফটন নামে এক সিভিলিয়ান। এই ছোকরাকে নিয়ে ইদানীং বেশ অস্বস্তিতে রয়েছেন উইলিয়াম ওয়াটস। ঢাকার কুঠিয়াল ছিলেন স্ক্র্যাফটন। তিনি মুখে বলছেন বটে যে আলিনগরের সমঝোতা মোতাবেক ঢাকার কুঠির পাওনা বুঝে নেওয়ার জন্য তাঁকে মুর্শিদাবাদে পাঠিয়েছেন ক্লাইভ। কিন্তু ওয়াটস জানেন কারণটা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আলিনগরের সমঝোতা সেরে নবাব যখন মুর্শিদাবাদে ফিরলেন সেই সময় তাঁর সঙ্গেই মুর্শিদাবাদে আসেন ওয়াটস। একদা কাশিমবাজারের কুঠিয়াল ওয়াটসের এবারে মুর্শিদাবাদে আসা নবাব-দরবারে ইংরেজদের প্রতিনিধি হিসেবে। আলিনগরের সমঝোতা অনুযায়ী ইংরেজদের পাওনাগণ্ডা আদায় করে নেওয়ার পাশাপাশি দরবারের বিক্ষুব্ধদের নিয়ে নবাবের বিরুদ্ধে দ্রুত একটা দল পাকিয়ে তোলার দায়িত্ব তাঁকে দিয়েছিলেন ক্লাইভ।
সত্যি কথা বলতে কি এই দল পাকানোর বিষয়ে ওয়াটস সাহেব এখনও খুব বড় কিছু একটা করে উঠতে পারেননি। ক্লাইভকে আশা দেখাচ্ছেন, নানারকম সম্ভাবনার কথা তিনি লিখছেন চিঠিতে, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। তবে ওয়াটস যে হাত গুটিয়ে বসে আছেন, এমনটা নয়। এসব কাজে সময় লাগে। কিন্তু কর্নেল ক্লাইভ খুব বেশি সময় দিতে রাজি নন। এ নিয়ে বেশ চাপে আছেন ওয়াটস। তাঁর উপরে পুরোপুরি ভরসা রাখতে পারছেন না বলে স্ক্র্যাফটনকে মুর্শিদাবাদে পাঠিয়েছেন কর্নেল। এটা ওয়াটস মেনে নিতে পারছেন না।
উইলিয়াম ওয়াটস সাবধানী লোক। খুব মেপে পা ফেলতে চান। গতবছরে নবাবের হাতে বন্দি হয়ে কাশিমবাজার থেকে নিজামত কেল্লায় চালান হয়েছিলেন তিনি। নবাবের আগুনে মেজাজে ভাজা ভাজা হয়ে জীবনের আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। নানি বেগম শরফ উন্নেসার হস্তক্ষেপে সে যাত্রা কোনওরকমে তিনি রক্ষা পান। তাই এবারে খুব সাবধানে এগোতে চাইছেন তিনি।
অন্যদিকে লিউক স্ক্র্যাফটন বেশ ডাকাবুকো। মনে ভয়ডর কম। উত্তেজনা ও আবেগে ছটফট করছেন। এইরকম ছেলেছোকরাদের পছন্দ করেন ক্লাইভ। আর কর্নেলের হাত মাথার উপর থাকায় ওয়াটসকে ততটা পাত্তা দেন না স্ক্র্যাফটন। যদিও তাঁর থেকে পদমর্যাদায় ওয়াটস অনেকটাই সিনিয়র। এ নিয়ে ওয়াটসের ক্ষোভের শেষ নেই। তার উপরে ওয়াটসের আশঙ্কা হল, এই ছোকরা নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকিয়ে তোলার কৃতিত্ব আর কর্তৃত্ব দুটোই না তাঁর হাত থেকে কেড়ে নেয়। সেক্ষেত্রে উপরওয়ালাদের চোখে অপদার্থ বলে প্রতিপন্ন হবেন ওয়াটস। চাকরিতে উন্নতির পথটা আর মসৃণ থাকবে না। এসব কথা ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন ওয়াটস। দাঁড়িয়ে পড়ল পালকি। হুঁশ ফিরল ওয়াটসের।
পালকি এসে থেমেছে মহিমাপুরে জগৎশেঠের কুঠির দেউড়িতে।
দুই অতিথির জন্য সদর দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন দেওয়ান রণজিৎ রায়। তিনি এগিয়ে গিয়ে দুজনকে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে বললেন, ‘হুজুর আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। আসুন।’
মহিমাপুরের কুঠির চৌহদ্দিতে বিরাট এক দিঘির মাঝে এক জলটুঙি। আটকোনা এই সৌধের আটটি স্তম্ভ। তার মেঝেতে ইটালিয়ান মার্বেল। ছাত গোম্বুজের মতো। যোধপুর ও জয়সলমিরের বেলেপাথরে গড়া। চমৎকার নির্মাণশৈলী। পাড় থেকে জলের উপর দিয়ে এক মজবুত সাঁকো চলে গিয়েছে জলটুঙি পর্যন্ত।
জলটুঙির মেঝেতে বাহারি সুজনিতে ঢাকা ফরাসের উপরে তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে বসেছিলেন জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ। তার সামনে বসে রয়েছেন উমিচাঁদ। ওয়াটস ও স্ক্র্যাফটনকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে হাজির হলেন রণজিৎ রায়।
হাসিমুখে জগৎশেঠ শুধোলেন, ‘আপনারা এখন খুশি তো?’
ওয়াটসের মুখের দিকে একবার চেয়ে চোখ নাচিয়ে উমিচাঁদ বললেন, ‘খুশি কি বাত তো বটেই। মসিয়ে ল-এর মতো পাজি চুঁহাটা শেষ পর্যন্ত নবাবের পাশ থেকে দূর হল। কী বলেন সাহেব?’
ফরাসের উপরে থেবড়ে বসে বিমর্ষ মুখে ওয়াটস বললেন, ‘লেকিন কর্নেল ক্লাইভ কি এটা মেনে নেবেন?’
চোখ গোল্লা করে জগৎশেঠ বললেন, ‘বলছেন কী? নারাজ হবেন কর্নেল? তিনি তো এমনটাই চেয়েছিলেন।’
ওয়াটস বললেন, ‘কথা ছিল, কাশিমবাজারের সব ফরাসিদের কলকাতায় পাঠিয়ে দেবেন নবাব।’
মাথা নেড়ে উমিচাঁদ বললেন, ‘ইয়ে সচ বাত। লেকিন…’
‘মসিয়ে ল-কে পাটনায় কেন যেতে দিলেন নবাব?’ উমিচাঁদকে বাধা দিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন স্ক্র্যাফটন।
ফরসির নল মুখে দিয়ে ভুরভুর করে খানিকটা তামাক টেনে জগৎশেঠ বললেন, ‘এতে তো আপনাদেরই লাভ হল।’
‘মতলব?’ ভুর কঁচকে প্রশ্ন করলেন ওয়াটস।
জগৎশেঠ মুচকি হেসে বললেন, ‘নবাব কথা রাখেননি, তাই আলিনগরের সুলেনামা ভেঙে মুর্শিদাবাদে হামলার যুক্তি খাড়া করাটা আসান হবে কর্নেলের কাছে।’
স্ক্র্যাফটন প্রশ্ন করলেন, ‘আপনারা কি সত্যিই নবাবকে গদি থেকে হঠাতে চান?’
আলোচনায় বাধা পড়ল। রুপোর রেকাবিতে নরম তালশাঁস, কেশর লাড্ডু এবং পাথরের গেলাসে করে লস্যি এনে ফরাশের উপরে রাখল দুইজন দাখিলা। তারা বিদায় নেওয়ার পর স্ক্র্যাফটন ফের প্রশ্ন করলেন, ‘সত্যি আপনারা নবাবকে হঠাতে চান?’
স্ক্র্যাফটনের প্রশ্নের ঢঙে খানিকটা বিস্মিত হয়ে জগৎশেঠ বললেন, ‘জরুর। আজ আপনাদের হাতে বেকায়দায় পড়েছেন নবাব। এখন কর্নেল ক্লাইভ ও অ্যাডমিরাল যদি ফিরে যান তাহলে অন্য মূর্তি ধরবেন নবাব। তিনি তখন হাতে মাথা কাটবেন অনেকের। নবাবকে আমরা অবশ্যই কুর্সি ছাড়া করতে চাই। এসব তো নতুন কথা নয়।’
লস্যির গেলাসে চুমুক দিয়ে স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘মাদ্রাজে ফেরার জন্য ঘন ঘন তলব আসছে কর্নেলের কাছে।’
জগৎশেঠ আঁতকে উঠে বললেন, ‘অ্যাঁ বলছেন কী? ফিরে যাবেন কর্নেল?’
‘হাতে সময় খুব কম। আপনারা যা করতে চান, তা খুব জলদি করতে হবে।’
জগৎশেঠ বললেন, ‘আমরা তো জলদিই কাজটা হাসিল করতে চাইছি।’
ওয়াটস বললেন, ‘এ নিয়ে আপনাদের জবরদস্ত কোনও কোশিস কিন্তু কর্নেলের নজরে পড়ছে না।’
সোজা হয়ে বসে জগৎশেঠ বললেন, ‘আমাদের উপর কেন ঝুটা ইলজাম লাগাচ্ছেন সাহেব? আমরা তো তৈয়ার আছি। কর্নেল ফৌজ নিয়ে এগিয়ে আসলেই কাজ হাসিল হয়ে যাবে।’
ওয়াটস শান্ত গলায় বললেন, ‘সিরাজদ্দৌলাকে সরিয়ে কাকে মসনদে বসাবেন, সেটা আপনারা ঠিক করেছেন?’
গম্ভীর হয়ে গেলেন জগৎশেঠ। এ প্রশ্নটা বেশ কিছুদিন ধরেই তাঁর মাথায় পাক খাচ্ছে। উত্তর নেই। সত্যিই তো মসনদে বসবে কে? যে বসবে, তাঁর একটা গ্রহণযোগ্যতা থাকা চাই। সুবে বাংলার নবাব বলে কথা! নামটা বেশ ওজনদার হতে হবে। মিরজাফর সব দিক থেকেই উপযুক্ত ছিলেন। কিন্তু জগৎশেঠ বাজিয়ে দেখেছেন তাঁকে। তিনি নবাব হতে রাজি নন।
স্ক্র্যাফটন বেশ ঝাঁঝের সঙ্গেই কৈফিয়ত চাওয়ার ঢঙে বলে ফেললেন, ‘আপনারা এখনও ঠিক করে উঠতে পারলেন না, কাকে বসাবেন মসনদে। নবাব বদলানোর এই সাজিশে আপনাদের মদত দেওয়ার জন্য কোম্পানি কী সুবিধে পাবে, কর্নেল ক্লাইভ ও অ্যাডমিরাল ওয়াটসনসহ কাউন্সিলের অন্যান্য সদস্যরা কী দস্তুরি পাবেন তার খসড়াও এখনও তৈরি হল না। এই কাজগুলো তো করতে হবে আপনাদের। না হলে কোন ভরসায় ইনকিলাব ঘটাতে মুর্শিদাবাদে আসবেন কর্নেল ক্লাইভ?’
লিউক স্ক্র্যাফটনের এমন মেজাজি কথার চালে কেমন যেন থতমত খেয়ে গেলেন জগৎশেঠ।
তাঁর উপস্থিতিতে স্ক্র্যাফটনের এই মাতব্বরি পছন্দ হচ্ছে না ওয়াটসের। সিনিয়রের উপস্থিতিতে জুনিয়রদের যে বেশি কথা বলতে নেই সেটা কি জানে না এই ছোকরা? খামোখা মাথাগরম করে কি এই সব কাজে সফল হওয়া যায়? ক্লাইভের উপর বেশ বিরক্ত বোধ করলেন ওয়াটস। এমন এক আনাড়ি ছোকরাকে তিনি মুর্শিদাবাদে পাঠিয়েছেন সাজিসের জাল দ্রুত গুটিয়ে নেওয়ার জন্য? হুড়োহুড়ি করতে গিয়ে সব না বানচাল করে দেয় এই ছোকরা!
স্ক্র্যাফটন কি জানে না যে জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ নিজামতের অন্দরে এক মস্ত বড় নাম। তাঁর সঙ্গে এভাবে কথা বলাটা বেসহবত কাণ্ড। কাশিমবাজার কুঠিতে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে নিজামতের হোমরাচোমরা লোকেদের চরিত্র খুব ভালো করেই বুঝেছেন ওয়াটস। আজ হয়তো অনেকে নবাবের বিরুদ্ধে। কিন্তু নবাব যদি একবার কড়া হাতে রাশ টেনে ধরেন, সব আবার সুড়সুড় করে নবাবের দলে ভিড়ে যেতে পারে। শেষে সাজিসের সব দায় এসে পড়বে ইংরেজদের ঘাড়ে। ক্লাইভ ও ওয়াটসন দূরে আছেন, বেঁচে যাবেন। মাঝের থেকে বিপদে পড়বেন তিনি। কয়েদ হতে পারেন আবার কোতলও হয়ে যেতে পারেন।
গেল বছর নিজামত কেল্লায় কয়েদ হয়ে থাকার স্মৃতি মনের মধ্যে ভেসে উঠতেই শিউরে উঠলেন ওয়াটস।
ওয়াটস বললেন, ‘আপনি লিউকের কথায় কিছু মনে করবেন না শেঠজি। উত্তেজনার বশে আপনার উপর ইলজাম এনে ফেলেছে। আপনি একা কী করবেন, মসনদের মালিক ঠিক করার দায় তো কেবল আপনার একার নয়—’
ওয়াটসকে বাধা দিয়ে মহাতপচাঁদ বললেন, ‘স্ক্র্যাফটন সাহেব ঠিকই বলেছেন। আমাদের আরও তৎপর হওয়া দরকার। কিন্তু কাকে বসানো যায় মসনদে?’
উমিচাঁদ বলে উঠলেন, ‘আমি একজনের কথা বলতে পারি। আশা করি শেঠজি আপনারও পছন্দ হবে নামটা।’
ওয়াটস স্ক্র্যাফটন ও জগৎশেঠ প্রবল কৌতূহলের সঙ্গে উমিচাঁদের মুখের দিকে তাকালেন।
উমিচাঁদ বললেন, ‘ইয়ার লতিফ খান।’
ওয়াটস বললেন, ‘ভেরি গুড।’
নামটা ঠিক মনে ধরল না জগৎশেঠের। ইয়ার লতিফ খানের খানদান তেমন জবরদস্ত নয়। দুহাজারি মনসবদার ইয়ার লতিফ খান কোনওমতেই মিরজাফরের বিকল্প হতে পারেন না। কিন্তু মিরজাফর যখন রাজি নন, এদিকে তেমন জুতসই আর কাউকেই যখন হাতের কাছে পাওয়া যাচ্ছে না, অগত্যা ইয়ার লতিফ খানকেই সামনে খাড়া করে এগোনো যেতে পারে।
বর্তমানে শেঠদের মহিমাপুরের কুঠির পাহারার দায়িত্বে রয়েছেন ইয়ার লতিফ খান। তার মাহিনার তনখা গোনেন জগৎশেঠ। তিনি ভেবে দেখলেন, ইয়ার লতিফ নবাব হলে একদিক থেকে ভালো। খুব সহজেই তাঁবে রাখা যাবে তাঁকে।
ময়ূরের পালক দিয়ে কান চুলকে জগৎশেঠ বললেন, ‘হ্যাঁ। ইয়ার লতিফ নবাব হলে মন্দ হয় না।’
স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘তিনি রাজি হবেন তো?’
উমিচাঁদ উৎসাহের সঙ্গে বললেন, ‘হবেন না মানে? ষোলো আনা ইচ্ছে আছে তাঁর। আমি কৌশলে বাজিয়ে দেখেছি তাঁকে। শুধু ভয় পাচ্ছিলেন, এসব কথা শেঠজির কানে গেলে কী ভাববেন তিনি। তাঁর নবাব হওয়ার প্রস্তাবে শেঠজির আপত্তি নেই শুনলে খুশিতে ফেটে পড়বে ইয়ার লতিফ।
দ্রুত পরবর্তী পরিকল্পনাও ছকে দিলেন ওয়াটস। জাঁ ল-সহ ফরাসিদের গ্রেপ্তার করার জন্য পাটনা অভিযানের নাম করে এগিয়ে আসবেন কর্নেল ক্লাইভ। তিনি মুর্শিদাবাদের কাছে এসে পড়লে হাজার দুয়েক সেনা নিয়ে কর্নেলের সঙ্গে যোগ দেবেন ইয়ার লতিফ খান।
‘চমৎকার। রায়দুর্লভ ও মিরজাফর যাতে ফৌজ নিয়ে নবাবের সঙ্গে যোগ না দেন সেটা আমি দেখে নেব।’ বললেন জগৎশেঠ।
উমিচাঁদ চাপা গলায় বললেন, ‘কাজটা সেরে ফেলতে হবে খুব দ্রুত। এখনও মোহনলাল পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেননি। বেতমিজ কাশ্মীরিটা দরবারে ফিরে আসার আগেই খেল খতম হওয়া দরকার। না হলে গোটা পরিকল্পনাটা তিনি ভেস্তে দিতে পারেন।’
উমিচাঁদের এই কথায় সহমত হল সকলেই।
ওয়াটস বললেন, ‘আমি তাহলে এই পরিকল্পনার কথা কর্নেলকে লিখে জানিয়ে দিচ্ছি।’
বেশ খুশির মেজাজেই শেষ হয়ে গেল এই গোপন আলোচনাসভা।
