1 of 2

ফলতা থেকে পলাশি – ৪৯

৪৯

একটা গোলমালের শব্দে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল ল সাহেবের। কাশিমবাজার কুঠির সদর ফটকের বাইরে একদল লোকের গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। দুর্গের মতো সুরক্ষিত ফরাসিদের কাশিমবাজারের কুঠি। রাত ন’টার দিকে সদর ফটক বন্ধ হয়ে যায়। কারা এল এত রাতে? চিন্তিত হয়ে পড়লেন জাঁ ল। দরজায় করাঘাতের শব্দ। সেই সঙ্গে ভেসে আসছে ঘোড়ার চিঁ-হি-হি চিৎকার।

শশব্যস্ত হয়ে মশাল হাতে নীচে নেমে এলেন জাঁ ল। সদর দরজার সামনে জড়ো হয়েছে রাতপাহারার সেপাইরা। হামলার আশঙ্কায় তারা হাতিয়ার হাতে প্রস্তুত। অধৈর্য গলায় বাইরে থেকে কেউ একজন চেঁচিয়ে উঠল।

‘কুঠির দরজা খোল। আমি সিনফ্রে।’

চমকে উঠলেন জাঁ ল। এ যে স্পষ্ট চন্দননগর কাউন্সিলের সচিব মসিয়ে সিনফ্রের গলা! মসিয়ে সিনফ্রে এত রাতে? তবে কী…। আশঙ্কায় বুক কেঁপে উঠল ল সাহেবের। দ্রুত কুঠির দরজা খোলার হুকুম দিলেন তিনি।

সদর দরজা খুলতেই ঘোড়া নিয়ে হুড়মুড়িয়ে ভিতরে প্রবেশ করলেন সিনফ্রে ও একদল ফরাসি। চন্দননগর থেকে কাশিমবাজার—এতটা পথ দৌড়ে আসার ধকলে ঘোড়াগুলো ধুকছে। ফেনা বেরোচ্ছে মুখ দিয়ে। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমেই ক্লান্তিতে কুঠির ভিতরের খোলা চাতালের উপরেই গা এলিয়ে শুয়ে পড়ল সৈন্যরা। কারও গায়ে আর এক বিন্দু শক্তি নেই।

জাঁ ল-এর মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন সিনফ্রে। দেহের অভিব্যক্তিতে ঝরে পড়ছে হতাশা। শুকিয়ে গিয়েছে মুখটা। গায়ে চোট আঘাতের চিহ্ন। ল সাহেবের চোখমুখ থমথমে। আন্দাজ করতে পারছেন কী ঘটেছে।

হতাশায় প্রায় ভেঙে পড়লেন সিনফ্রে। বললেন, ‘আমরা চন্দননগর খুইয়েছি। গভর্নর রেনল্ট আত্মসমর্পণ করেছেন। আমরা কয়েকজন পালিয়ে এসেছি।’

চন্দননগর আর ফরাসিদের হাতে নেই। এ কথাটা ভাবতে বুক ফেটে যাচ্ছে ল-সাহেবের। নিজের আবেগকে সামলে নিয়ে শান্ত গলায় জাঁ ল বললেন, ‘আপনি ক্লান্ত মসিয়ে। বিশ্রাম করুন।’

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সিনফ্রে বললেন, ‘বিশ্রামে দেহের ক্লান্তি হয়তো জুড়োবে। মনের জ্বালা কী করে জুড়োই বলতে পারেন? নবাব আমাদের বাংলা থেকে তাড়িয়ে দিলেও এতটা দুঃখ হত না। শেষ পর্যন্ত কিনা ইংরেজদের ঔদ্ধত্যের কাছে সারেন্ডার করতে হল আমাদের?’

‘এখনও সব শেষ হয়নি মসিয়ে। কাশিমবাজার কুঠি আছে। নবাব সিরাজদ্দৌলা আছেন।’

রাগে হঠাৎ জ্বলে উঠে সিনফ্রে বললেন, ‘আপনি এখনও নবাবের উপর ভরসা রাখছেন? দেওয়ান নন্দকুমার আড়াই হাজার ঘোড়সওয়ারকে দাঁড় করিয়ে রাখলেন হুগলিতে। তারা চন্দননগরে এল না।’

‘বলছেন কি মসিয়ে? দেওয়ান নন্দকুমার বেইমানি করলেন আমাদের সঙ্গে?’

‘শুনেছি উমিচাঁদের মাধ্যমে ইংরেজরা তাঁকে ঘুষ দিয়ে দলে টেনেছিল।’

‘উমিচাঁদ একটা আস্ত শয়েতান। এখন অবশ্য তাঁকেই সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করেন নবাব।’

কাঁধ ঝাঁকিয়ে হতাশ গলায় সিনফ্রে বললেন, ‘আর এই নির্বোধ নবাবের উপর ভরসা করছেন আপনি?’

‘ভুলে যাবেন না মসিয়ে, নবাব কিন্তু আমাদের সাহায্য করার জন্য চন্দননগরে সেনা পাঠাতে চেয়েছিলেন। হুকুম দিয়েছিলেন রায়দুর্লভকে।’

‘কিন্তু কী করলেন রায়দুর্লভ? হুগলি আসার পথে ফৌজ নিয়ে পলাশিতে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন ক্লাইভের ভয়ে। নবাবের হুকুম তামিল হল না। ইংরেজরা শেষ করে দিল আমাদের।’

‘এখনই সব কিছু শেষ বলে ধরে নেবেন না মসিয়ে। নবাবের উপরেই ভরসা রাখতে হবে আমাদের। তাঁকে সব কথা বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করতে হবে।’

সন্দিহান হয়ে সিনফ্রে প্রশ্ন করেন, ‘আলিনগরের সুলেনামা ভুলে নবাব দাঁড়াবেন আমাদের পাশে—একথা আপনি বিশ্বাস করেন?’

ল বললেন, ‘তাঁকে বোঝাতে হবে যে আমরাই তাঁর সাচ্ছা দোস্ত। আমাদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর নসিবও। আমাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি যদি এখনই ইংরেজদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন, তবে তিনিও বাঁচবেন। আমরাও হয়তো আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারব। অন্যথায় আমাদের বাংলার ব্যবসা পুরোপুরি বরবাদ হয়ে যাবে। আর মসনদ হারাবেন নবাব।’

‘এসব কি সিরাজদ্দৌলা বুঝবেন?’ প্রশ্ন করলেন সিনফ্রে।

‘বোঝাতে হবে মসিয়ে। সেটাই এই মুহূর্তে সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ আমাদের। আশা করা যায় কিছুদিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে মোহনলাল দরবারে ফের আসবেন। তিনি নবাবের ভালো চান। তিনি নিশ্চয়ই আমাদের কথা বুঝবেন। তাঁকে পাশে পেলে নবাবকে সব কথা বোঝাতে সুবিধা হবে আমাদের।’

সিনফ্রে অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘দেওয়ান সাহেব অসুস্থ? কী হয়েছে তাঁর?’

‘কেউ বিষ দিয়ে হত্যা করতে চেয়েছিল তাঁকে।’

চমকে উঠলেন সিনফ্রে, ‘বলছেন কী মসিয়ে? অন্তর্ঘাত?’

‘জানি না। তবে খুব বিপদের মধ্যে আছেন নবাব। দরবারে প্রবল ভাবে বইছে ষড়যন্ত্রের চোরাস্রোত।’

‘আপনি যা বলছেন—এই অবস্থায় ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা নবাবের পক্ষে কি সম্ভব?

‘বুসি এখন কটকের কাছে। নবাব যদি চিঠি লিখে বুসিকে ডেকে আনেন বাংলায় আর ফৌজ নিয়ে তিনি যদি জেনারেল বুসির সঙ্গে যোগ দেন তাহলে এখনও বাংলা থেকে ইংরেজদের উৎখাত করা যায়।’

সিনফ্রে যেন আশার আলো দেখতে পেলেন। প্রতিহিংসার স্পৃহা তাঁর দুচোখে ঝকঝক করে উঠল।

জাঁ ল বললেন, ‘এই কথাটাই নবাবকে বোঝাতে হবে আমাদের। অনেক রাত হয়েছে, এখন আপনি বিশ্রাম নিন মসিয়ে।’

নবাব সিরাজদ্দৌলার হাতে এসে পড়ল কর্নেল ক্লাইভের চিঠি। ক্লাইভ লিখেছেন, ‘…চন্দননগরে আমার কামেয়াবির কথা শুনে আপনি নিশ্চয়ই খুশি হবেন। আপনাকে সহি সালামত রাখার জন্য আমি আন্তরিক ভাবে দায়বদ্ধ। আমাদের দুশমন আপনারও দুশমন। আশা করি, আপনার শুভেচ্ছা ও আশীর্বাদে সুবে বাংলা থেকে আপনার সব দুশমনদের বিতাড়িত করতে আমরা কামেয়াব হব।…’

চিঠিটা পড়ে সিরাজদ্দৌলা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। কী নির্মম রসিকতা!

সন্ধে নামছে। গাছগাছালিতে ফিরে আসছে পাখিরা। হিরাঝিলের জলের রং সিসার মতো কালো। ঝিলের দিকে প্রলম্বিত ছাতবিহীন প্রশস্ত অলিন্দের উপর এসে দাঁড়ালেন সিরাজদ্দৌলা। মন ভালো নেই তাঁর। গভীর অবসাদে তিনি আচ্ছন্ন।

অন্যায় ভাবে গায়ের জোরে ইংরেজরা চন্দননগর দখল করে নিল, অথচ এর কোনও প্রতিকার করতে পারলেন না নবাব। ফরাসিরা কাতর ভাবে তাঁর সাহায্য চেয়েছিল অথচ ফরাসিদের কোনও সাহায্য করতে পারলেন না তিনি। কেন পারলেন না? কেন তাঁর হুকুম তামিল করল না নন্দকুমার ও রায়দুর্লভ? নিজের অবচেতনে উত্তর খুঁজে বেড়ান সিরাজদ্দৌলা।

চন্দননগরের যুদ্ধে পরাজয় শুধু ফরাসিদের নয় তাঁর নিজেরও পরাজয়। তিনি নিজেই কি এই বিপর্যয়ের জন্য দায়ী নন? ফরাসিদের বাঁচানোর কোনও ঐকান্তিক ইচ্ছে কি তাঁর ছিল? শুধু নন্দকুমার ও রায়দুর্লভের উপর হুকুম দিয়ে নিজের দায় ঝেড়ে ফেলেছিলেন তিনি। তাই নয় কি? আসলে নবাবের বিশ্বাস ছিল দুই দল বিদেশি কারবারি কখনোই নিজেদের মধ্যে লড়াই করবে না। হিসেবে বড্ড ভুল হয়ে গিয়েছে তাঁর।

অদ্ভুত এক সংকটে পড়েছেন নবাব। একদিকে ইংরেজদের প্রতি তাঁর তীব্র বিদ্বেষ অন্যদিকে গোরা পল্টনের ভয়। ক্লাইভকে ভয়। ওয়াটসনকে ভয়। ইচ্ছে করছে এখনই ফের কলকাতার দিকে কুচ করে লড়াইয়ের ময়দানে ইংরেজদের বেতমিজির জবাব দিতে। পরক্ষণেই ভয়ে সিঁটিয়ে যাচ্ছেন সিরাজদ্দৌলা। মনে পড়ছে হালসিবাগানের সেই ভোরের ছবি। মাটিতে গুঁড়িয়ে যাওয়া ফরাসি দুর্গের স্বকল্পিত চিত্র।

হিরাঝিলের কাজলা জলের দিকে একদৃষ্টে চেয়েছিলেন নবাব। লুৎফা এসে পাশে দাঁড়ায়।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিরাজ বললেন, ‘কিছু ভালো লাগছে না লুৎফা। বারবার নসিবের খেলায় হেরে যাচ্ছি আমি।’

‘আপনি তকলিফ নেবেন না মেহের। আপনি তো ফৌজ পাঠিয়েছিলেন চন্দননগরে। এ ফরাসিদের বদনসিবি।’ নরম গলায় বলল লুৎফা।

‘বেইমানি করলেন নন্দকুমার। রায়দুর্লভ হুগলি না গিয়ে পলাশিতে বসে রইলেন। বদনসিব শুধু ফরাসিদের নয়, আমারও। আমার ফৌজ আমার হুকুম তামিল করল না। এর চেয়ে শরমের বাত একজন আজাদ নবাবের পক্ষে আর কী হতে পারে? নানাজি কত কঠিন লড়াই লড়েছিলেন জীবনে। কামেয়াব হয়েছিলেন। আর আমি? একদল কারবারির হাতে পরেশান হয়ে পড়েছি। আমি কি নালায়েক লুৎফা? বরবাদ হয়ে যাচ্ছি?’

শিউরে উঠল লুৎফুন্নেসা। ‘মেহের! এসব কী বলছেন আপনি?’

‘বাইরে কেমন আঁধার নামছে দেখ লুৎফা—ঘন কালো। আমার জিন্দেগিও কেমন যেন আন্ধেরার কালিতে ভরে উঠছে। কোথায় আলো?’

কেঁপে ওঠে লুৎফা। নবাবকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পায় না। মনের মধ্যে পুঞ্জীভূত শঙ্কার মেঘ হঠাৎই বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। সিরাজের বুকে মাথা রেখে নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে লুৎফুন্নেসা।

হিরাঝিলের উপর গাঢ় হয়ে আসে অন্ধকার। ঝিকমিক করে বিচিত্র নকশা বুনে বেড়ায় অসংখ্য জোনাকি।

ক্লাইভ গুঁড়িয়ে দিয়েছেন ফোর্ট অঁরলিও। সুবে বাংলায় ফরাসিদের ব্যবসা বিস্তারের সব আশা কার্যত শেষ হয়ে গিয়েছে। এখানেই থেমে থাকতে চান না কর্নেল ক্লাইভ। বাংলা লুঠের স্বপ্ন এখনও যে পূরণ হয়নি। আলিনগরের সমঝোতায় যে দাবিদাওয়ার কথা বলা হয়েছে, তার সবটা এখনও আদায় হয়নি। নবাবের হুকুমতের তোয়াক্কা না করে ইংরেজরা চায় নিজের শর্তে ব্যবসা। সেটা এখনও প্রতিষ্ঠা করা যায়নি।

এদিকে মাদ্রাজ থেকে ঘন ঘন তাগাদা আসছে কর্নেল ক্লাইভের কাছে। সৈন্যসামন্ত নিয়ে তাড়াতাড়ি বাংলা থেকে ফিরে এসো। আপাতত মাদ্রাজে ফেরার কোনও ইচ্ছে নেই কর্নেলের। কলকাতাতেও ফিরতে চান না তিনি।

 চন্দননগর ও চুঁচুড়ার মাঝে তাঁবু ফেলেছেন ক্লাইভ। এখানেই আপাতত অবস্থান করবেন। রাজনীতির ঘুঁটি চালাবেন এখান থেকেই। এবারে লক্ষ্য মুর্শিদাবাদ।

তবে ওয়াটসন ফিরে যাবেন কলকাতায়। আগামীকালই নৌবহর নিয়ে রওনা দেবেন। ফিরতেই হবে তাঁকে। কেননা কলকাতা অরক্ষিত। ফরাসি জেনারেল বুসির নৌসেনাসহ বাংলায় এসে পড়ার খবরটা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ওয়াটসনের ফিরে যাওয়ার প্রাক্কালে নিজের ক্যাম্পে ডিনার পার্টির আয়োজন করেছেন কর্নেল ক্লাইভ। ফরাসিদের সঙ্গে যুদ্ধের টানটান উত্তেজনার ধকলের পর অবসন্ন হয়ে পড়া স্নায়ুযন্ত্রকে ফের উজ্জীবিত করে তোলার জন্য হুল্লোড়ে মেতেছে ক্লাইভ ও ওয়াটসনের অধীনস্থ সেনা অফিসারেরা।

ইংরেজদের সেনাছাউনিতে ফূর্তির তুফান উঠেছে। ফোর্ট অঁরলিও থেকে পাওয়া গিয়েছে অঢেল পরিমাণ ক্ল্যারেট, শ্যাম্পেন, বিয়ার, মদিরা। একেবারে জমজমাট মৌতাতের আয়োজন।

খানসামার দল ভাঁটির আগুনে ঝলসাচ্ছে মশল্লায় জারানো দিশি মুরগি, বেলেহাঁস, ভেড়া ও শুয়োরের মাংস। সঙ্গে তাওয়ায় স্যাঁকা ময়দার নরম রুটি ও তাজা আনাজ কেটে তৈরি স্যালাড। চাঁদনি রাতে খোলা আকাশের নীচে কাঠের আগুনের আলোয় পান ও ভোজনের জবরদস্ত আয়োজন।

মদের গেলাস উঁচু করে ধরে ক্লাইভ বললেন, ‘চিয়ার্স এভরিবডি।’

সমবেত ধ্বনি ভেসে এল, ‘চিয়ার্স।’

অ্যাডমিরাল বললেন, ‘উই মে ডেডিকেট ক্যাপচার অফ চন্দননগর টু আওয়ার কিং।’

সবাই হর্ষধ্বনি করে এই প্রস্তাবে সম্মতি জানাল।

হাতে ধরা পানপাত্রে চুমুক দিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘আই ওয়ান্ট টু শেয়ার উইথ ইউ অ্যান ইন্টারেস্টিং নিউজ। আজ ওয়াটসের চিঠি পেয়েছি। আমরুল্লা বলে একজন হুগলির ফৌজদার হয়ে আসছেন। নবাব ইজ ভেরি অ্যাংরি উইথ নন্দকুমার। গুলাব কি ফুল তাজা নেহি হ্যায়।’

ক্লাইভের এই লঘু রসিকতায় হেসে উঠল সকলে।

ভুর ভুর করে অম্বুরি তামাকের ধোঁয়া ছেড়ে ওয়াটসন বললেন, ‘বাট উই প্রমিসড টু গিভ হিম ফিফটিন থাউস্যান্ড রুপিজ।’

ক্লাইভ বললেন, ‘নন্দকুমার ইজ অ্যা স্টুপিড, অ্যান্ড অ্যা ফুল। তার পিছনে আর পনেরো হাজার টাকা খরচ করার এখন আর কোনও মানে হয় না। র‌্যা দার উই মে গিভ অ্যা স্পেশ্যাল থ্যাঙ্কস টু উমিচাঁদ।’

ওয়াটসন বললেন, ‘উমিচাঁদ লোকটা কিন্তু ডেঞ্জারাস।’

ক্লাইভ বললেন, ‘ওয়েল অ্যাসেসড। আপাতত আমাদের কাজ হাসিলের জন্য তাঁকে গুড হিউমারে রাখা যেতে পারে।’

আয়ারকুট বললেন, ‘ফ্রেঞ্চ পাওয়ারকে কিন্তু এখনও আমরা পুরোপুরি ডেস্ট্রয় করতে পারিনি কর্নেল। ওদের কাশিমবাজারের কুঠিটা অক্ষত আছে। খবর পেয়েছি অনেক ফ্রেঞ্চ ফাজিটিভ কাশিমবাজারে শেল্টার নিয়েছে।’

পাইপের ধোঁয়া উড়িয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘রাইট। এটা চিন্তার কথা।’

স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘মসিয়ে ল ইজ অ্যা ভেরি ক্লেভার পারসন। তিনি আমাদের বিরুদ্ধে নবাবকে খেপিয়ে তুলতে পারেন।’

মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘জেনারেল বুসি যদি এসে পড়েন আর নবাব যদি তাঁর সঙ্গে যোগ দেন, উই উইল বি ইন অ্যা স্যুপ। কাশিমবাজার থেকে জাঁ ল-কে ইমিডিয়েটলি তাড়িয়ে দিতে হবে আমাদের।

কিলপ্যাট্রিক প্রশ্ন করলেন, ‘কী ভাবে তা সম্ভব? কাশিমবাজার তো খোদ নবাবের এলাকা।’

কিলপ্যাট্রিকের কথা শুনে রোস্টেড মুরগির ঠ্যাং চিবোতে চিবোতে মুচকি হাসলেন ক্লাইভ।

হিরাঝিল প্রাসাদের ঘাটে এসে থামল একটা বজরা। মাথায় ফরাসি কোম্পানির পতাকা। বজরা থেকে নামলেন মসিয়ে ল ও সিনফ্রে। নবাবের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাতে এসেছেন দুজনে।

নবাবের সামনে হাজির হয়ে কোমর থেকে দেহটা যথা সম্ভব ঝুঁকিয়ে তসলিম জানাল দুজনে।

কেমন যেন একটা অপরাধবোধ আচ্ছন্ন করেছে সিরাজদ্দৌলাকে। দুই ফরাসি প্রতিনিধির দিকে সোজা চোখে তাকাতে পারছেন না।

নবাবের অভিব্যক্তি দেখে অবাক হলেন সিনফ্রে। গেল বছর কলকাতা জয় করে ফেরার সময় চন্দননগরের ফরাসিদের ভয় দেখিয়ে তিন লাখ টাকা আদায় করেছিলেন নবাব। তখন সিরাজদ্দৌলার গর্বোদ্যত দেহভঙ্গিমা দেখেছিলেন সিনফ্রে। আগের দেখা মানুষটার সঙ্গে আজকের এই নবাবের যেন কোনও মিল নেই। কোথায় সেই দেমাক? সেই আত্মবিশ্বাস? সেই জোশ?

নবাবের জন্য করুণা হল সিনফ্রের। ক্লাইভ ও ওয়াটসনের সঙ্গে টক্কর নিতে গিয়ে স্নায়ুর লড়াইয়ে হেরে ব্যক্তিত্বটাই খুইয়ে বসেছেন নবাব।

জাঁ ল বললেন, ‘চন্দননগর আমাদের হাতছাড়া হয়েছে হুজুর। ইনি মসিয়ে সিনফ্রে। চন্দননগর থেকে পালিয়ে এসেছেন।’

কথাটা যেন বিদ্রুপের চাবুক হয়ে আছড়ে পড়ল নবাবের উপর। যা বললেন না ল সাহেব, সেটাও যেন স্পষ্ট শুনতে পেলেন নবাব মোগল বাদশার ফরমানের জোরে এদেশে ব্যবসা করতে এসেছি আমরা। নিজামতের প্রাপ্য শুল্ক মিটিয়ে গিয়েছি নিয়মিত। তবু আপনার রাজত্বে ফরাসিরা আজ ঘরছাড়া। নিজের রাজত্বে একদল প্রজাকে সালামত রাখার ক্ষমতা নেই আপনার?

মুখ থমথম করছে নবাবের। কীভাবে কথা চালাবেন দুই ফরাসির সঙ্গে, তাল পাচ্ছেন না।

ল বললেন, ‘নন্দকুমার বেইমানি করেছেন। আপনার নির্দেশ সত্ত্বেও মদত দেয়নি আমাদের।’

গম্ভীর গলায় সিরাজদ্দৌলা বললেন, ‘নন্দকুমার সাজা পাবে।’

‘হুজুর, আমাদের কারবার বন্ধ হয়ে গেল সুবে বাংলায়।’ জাঁ ল-এর গলায় অনুযোগের সুর।

সিরাজ বললেন, ‘কাশিমবাজার কুঠি তো আছে আপনাদের। কারবার চালিয়ে যান আপনারা। আমি তো নিষেধ করিনি।’

নিজের কথাই কেমন যেন হাস্যকর শোনাল নবাবের কানে। ফরাসিদের কলোনি জোর করে কেড়ে নিয়েছে ইংরেজরা। কোনও প্রতিকার করতে পারেননি তিনি। সেই তিনিই আবার ফরাসিদের ব্যবসা চালিয়ে যেতে বলছেন? এটা কি নির্মম রসিকতা নয়?

নবাবের কথার প্রত্যুত্তরে ল বললেন, ‘ইয়ে তো খুশি কি বাত। আপনিই আমাদের ভরসা।’

ফের যেন বিদ্রুপের চাবুকের আঘাতে খুন ঝরল নবাবের।

‘দরবারে আপনার বিরুদ্ধে গহেরা সাজিশ চলছে। আমরা জানি।’ বললেন জাঁ ল।

এবারে মৃদু হেসে সিরাজদ্দৌলা বললেন, ‘এ নিয়ে ভাবতে হবে না আপনাদের।’

‘আমরা আপনার ভালো চাই হুজুর। আপনি সহি সালামত থাকলে আমরা আবার নিজেদের কলোনি বাংলায় গড়ে তুলতে পারি।’

কৌতূহলী চোখে ল-এর দিকে তাকালেন সিরাজ। কী বলতে চাইছেন মসিয়ে ল?

ল বললেন, ‘জেনারেল বুসি এখন কটকে। আপনি যদি বাংলায় আসার জন্যে জেনারেল বুসিকে একটা চিঠি লেখেন আর ফৌজ নিয়ে যদি জেনারেলের সঙ্গে যোগ দেন, তবে বেতমিজ ইংরেজদের সুবে বাংলা থেকে আপনি তাড়িয়ে দিতে পারেন।’

চকচক করে উঠল সিরাজের চোখদুটো। ষড়যন্ত্রের ঘুঁটি চালাচালি হচ্ছে দরবারে। একথা সিরাজদ্দৌলার অজানা নয়। ক্লাইভ ও ওয়াটসনের চাপে বেকায়দায় আছেন নবাব। তাই ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে তিনি কড়া পদক্ষেপ নিতে পারছেন না।

সিরাজদ্দৌলা অনুভব করতে পারছেন, দিনে দিনে তিনি যেন ইংরেজদের ইচ্ছের দাস হয়ে পড়ছেন। দুর্বল হয়ে পড়ছে তাঁর ব্যক্তিত্ব। হারিয়ে যাচ্ছে আত্মবিশ্বাস। জেনারেল বুসির মদত পেলে সত্যিই এই অসহায় অবস্থা থেকে হয়তো পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। যোগ্য জবাব দেওয়া যাবে ইংরেজদের।

জাঁ ল-এর সামনে নিজের মনের কথা প্রকাশ করলেন না নবাব। নিরাশক্ত ভাবে বললেন, ‘ঠিক আছে। জেনারেল বুসিকে চিঠি লেখার কথা ভেবে দেখব।’

খুশি হয়ে জাঁ ল বললেন, ‘সহি সালামত থাকুন হুজুর। শ’বরস জিন্দা থাকুন।’

নবাবকে তসলিম জানিয়ে বিদায় নিলেন জাঁ ল ও সিনফ্রে।

কিছুক্ষণ অস্থির ভাবে ঘরের মধ্যে পায়চারি করলেন নবাব। তারপর মুনশিকে ডেকে পাঠালেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *